গতকাল ছিল ২৩ আগস্ট। ঠিক তিন বছর আগে এই দিনে পাবনা সদর উপজেলার চরঘোষপুরে হেযবুত তওহীদের কার্যালয়ে নৃশংস হামলায় কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছিল হেযবুত তওহীদ সদস্য ও ওয়ার্কশপ মিস্ত্রি সুজন মন্ডলকে (৩০)। তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী শাহানা খাতুনের কোলজুড়ে এসেছে নতুন সন্তান, কিন্তু বাবার মুখ দেখার সৌভাগ্য হয়নি তার। তিন বছর পেরিয়ে গেলেও সুজনের পরিবার পায়নি কাক্সিক্ষত বিচার। মামলাটি এখনও চার্জ গঠনের পর্যায়েই আটকে আছে, আর এই দীর্ঘসূত্রতার মধ্যেই একই গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে উঠেছে নতুন করে হামলা ও হুমকির অভিযোগ, যা ন্যায়বিচার পাওয়া নিয়ে তৈরি করেছে গভীর শঙ্কা।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০২২ সালের সেই কালরাতে শুধু সুজনই নন, গুরুতর আহত হয়েছিলেন আরও দশজন। তাদের মধ্যে আমিনুল ইসলাম মাথায় মারাত্মক আঘাত নিয়ে আজও বয়ে বেড়াচ্ছেন দুঃসহ স্মৃতি। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, তার মস্তিষ্কজনিত জটিলতা সারতে দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা প্রয়োজন। জানা যায়, সুজন হত্যা মামলার বিচার প্রক্রিয়া এখনও প্রাথমিক পর্যায়েই রয়েছে। মামলার প্রধান আসামি মো. আলাল শেখ বর্তমানে কারাগারে থাকলেও বাকি ১৩ জন আসামি জামিনে মুক্ত। এই বিলম্ব বিচারপ্রার্থী পরিবারকে হতাশ করেছে।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে নিহত সুজনের স্ত্রী শাহানা খাতুন বলেন, “জীবন্ত একটা মানুষ বাসা থেকে বের হলো কিন্তু ফিরে আসলো রক্তাক্ত নিথর দেহে। আমার সন্তানটা তার বাবাকেই দেখল না। আমি আর কিছু চাই না, আমার স্বামীকে যারা হত্যা করেছে, আমি তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি, অর্থাৎ মৃত্যুদণ্ড চাই।” হেযবুত তওহীদের সহযোগিতায় সন্তানকে নিয়ে জীবন সংগ্রাম চালিয়ে গেলেও স্বামীর শূন্যতা তাকে প্রতিনিয়ত তাড়া করে ফেরে।
বিচারহীনতার সুযোগে আসামিরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ হেযবুত তওহীদ সদস্যদের। সংগঠনের পাবনা জেলার বর্তমান সভাপতি মো. মাহতাব উদ্দিন জানান, “এই মামলায় আমাদের আইনি লড়াই চলমান আছে। আমরা দ্রুত সাক্ষ্য গ্রহণ ও বিচার কার্যক্রম শুরুর দাবি জানাচ্ছি।” তিনি আরও অভিযোগ করেন, “২০২২ সালের হত্যাকাণ্ডের পরেও ওই একই এলাকায় হেযবুত তওহীদের কার্যালয়ে আবারও হামলা হয়েছে। সেই সঙ্গে এখনও উগ্র একটি শ্রেণি আমাদের হুমকি-ধামকি দিয়ে যাচ্ছে। প্রশাসনের কাছে আমরা কঠোর পদক্ষেপ কামনা করছি।”
এই অভিযোগের সত্যতা মেলে সাম্প্রতিক ঘটনায়। সুজন হত্যা মামলার প্রধান আসামি মো. আলাল শেখ অন্য একটি হামলা মামলায় (মামলা নং-৪৩/২০২৫) গত ১৭ আগস্ট আদালতে হাজিরা দিতে গেলে তার জামিন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানো হয়। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, জামিনে মুক্ত থাকা অবস্থায়ও আসামিরা নতুন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত হচ্ছেন।
উল্লেখ্য, ২০২২ সালের ২৩ আগস্ট রাতে চরঘোষপুর নফসারের মোড়ে হেযবুত তওহীদের কার্যালয়ে আদর্শিক বিরোধের জেরে শতাধিক লোক লাঠিসোঁটা ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে হামলা চালায়। হামলাকারীরা সুজন মণ্ডলসহ অন্যদের এলোপাতাড়ি কোপাতে থাকে। গুরুতর আহত অবস্থায় সুজনকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে ২৪ আগস্ট ভোরে তিনি মারা যান। এ ঘটনায় তৎকালীন জেলা সভাপতি সেলিম শেখ বাদী হয়ে ১৪ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত আরও কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন।
তিন বছর পেরিয়ে গেলেও মামলার চার্জ গঠন না হওয়ায় বিচার প্রক্রিয়ার গতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। যদিও পুলিশ বলছে, তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, কিন্তু বাস্তবে নতুন হামলা সেই আশ্বাসকে ম্লান করে দিচ্ছে।
সুজনের রক্ত আর তার পরিবারের চোখের জল বিচারহীনতার আঁধারে শুকিয়ে যায়নি। বরং নতুন হামলার ঘটনা সেই ক্ষতে বারবার আঘাত করছে, আর প্রশ্ন তুলছে- ন্যায়বিচার কি তবে অধরাই থেকে যাবে? দ্রুত চার্জ গঠন করে বিচারিক কার্যক্রম শুরু করার মাধ্যমে এই প্রশ্নের উত্তর দেবে আদালত, এমনটাই প্রত্যাশা ভুক্তভোগী পরিবার ও হেযবুত তওহীদের সদস্যদের।