শাহাদৎ হোসেন:
প্রায় ১৬ বছরের দীর্ঘ আইনি লড়াই শেষে মিথ্যা মামলা অব্যাহতি পেয়েছেন হেযবুত তওহীদের ১২ জন সদস্য। বুধবার (২৩ জুলাই ২০২৫) ঢাকা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিজ্ঞ বিচারক তাদের সকলকে বেকসুর খালাস প্রদান করেন। একটি মিথ্যা মামলার জেরে জীবনের মূল্যবান সময় ও সম্মান হারানোর পাশাপাশি অবর্ণনীয় নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন খালাসপ্রাপ্তরা।
খালাসপ্রাপ্তদের মধ্যে রয়েছেন সংগঠনটির বর্তমান সদস্য আনিসুর রহমান সাকিব, আমিনুল ইসলাম, মোফাজ্জল হোসেন, এবিএম রায়হান সরকার, মোঃ মোস্তফা তালুকদার, রেনুআরা বেগম, সুফিয়া বেগম, শাহিনুর আক্তার এবং সাবেক সদস্য মোঃ আব্দুর রাকিব, মোঃ রাজু আহমেদ, মোঃ নুরুল ইসলাম সজল ও রুমি ইসলাম।
জানা যায়, ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ঢাকার ফায়দাবাদ এলাকার বাসা থেকে গভীর রাতে ঘুমন্ত অবস্থায় হেযবুত তওহীদের এই সদস্যদের গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারের পর তাদের বিরুদ্ধে প্রথমে ৫৪ ধারায় এবং পরে ১৫৩/১৫৩-ক/৫০৫/৫০৫(ক) ধারায় রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা দেওয়া হয়। আড়াই বছর আটক থাকার পর ২০১২ সালে জামিনে মুক্তিলাভ করেন তারা। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, এরপর পৃথক পৃথকভাবে তাদের কয়েক দফায় পুলিশ, ডিবি ও র্যাব রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের নামে অমানবিক নির্যাতন চালানো হয়।
আদালতের রায়ে খালাস পাওয়ার পর ভুক্তভোগীরা তাদের দীর্ঘ ১৬ বছরের যন্ত্রণা ও হয়রানির কথা তুলে ধরেন এ প্রতিবেদকের কাছে। তাদের বক্তব্যে বারবার উঠে এসেছে মিথ্যা মামলায় জীবন ধ্বংস হয়ে যাওয়ার আক্ষেপ এবং প্রকাশ পায় বিচার ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতার উপর ক্ষোভ।
ভুক্তভোগী মোফাজ্জল হোসাইন বলেন, “আমরা যখন ঘুমিয়ে ছিলাম, তখন পুলিশ আমাদের ১২ জনকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যায়। আমরা হেযবুত তওহীদ নামে একটি অরাজনৈতিক আন্দোলন করতাম, এটাই ছিল আমাদের ‘অপরাধ’। বিনা কারণে আমাদের ২৯ মাস জেল খাটতে হয়েছে। একটি মিথ্যা মামলা প্রমাণ করতে রাষ্ট্রের ১৫ বছর সময় লাগলো! আজ আমরা খালাস পেয়েছি, কিন্তু আমাদের জীবনের যে ১৫টি বছর কেড়ে নেওয়া হলো, তার দায় কে নেবে?”
আরেক ভুক্তভোগী সদস্য মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম জানান, প্রায় ১৬ বছর আগে ঢাকার ফায়দাবাদ এলাকার বাসা থেকে তাদের ঘুমন্ত অবস্থায় তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর অবর্ণনীয় নির্যাতন করা হয়েছে আমাদের। প্রথমে ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখালেও তিন মাস পর আমাদের বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ মিথ্যা একটি রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা দেওয়া হয়।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, এই মামলার কারণে তাদের ২৯ মাস জেল খাটতে হয়েছে এবং দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ায় চরম হয়রানির শিকার হতে হয়েছে। তিনি বলেন, “এই মিথ্যা মামলার ঘানি আমাদের ১৬ বছর ধরে টানতে হয়েছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আমাদের সদস্যরা, এমনকি নারী ও শিশুসহ, আদালতে হাজিরা দিতে আসতো। অবশেষে দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে আদালত আমাদের নির্দোষ সাব্যস্ত করে বেকসুর খালাস দিয়েছেন। সরকারপক্ষ আমাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগই প্রমাণ করতে পারেনি।”
এই ঘটনাকে ‘স্বৈরাচারের জ্বলন্ত উদাহরণ’হিসেবে উল্লেখ করে মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম বলেন, “আমরা কোনো সহিংস বা অবৈধ কর্মকাণ্ডে জড়িত নই। আমরা মানবতার কল্যাণে কাজ করি। আমাদের বাড়ি তল্লাশি করেও অবৈধ কোনো কিছুই পাওয়া যায়নি। এই দীর্ঘ হয়রানি প্রমাণ করে আমরা কী পরিমাণ নির্যাতনের শিকার হয়েছি।”
নারী সদস্যরা তাদের বক্তব্যে তুলে ধরেছেন মাতৃত্ব ও পারিবারিক জীবনের অপূরণীয় ক্ষতির কথা। ভুক্তভোগী রেনুয়ারা বেগম বলেন, “এই মিথ্যা মামলা শুধু আমার জীবন নয়, আমার সন্তানদের ভবিষ্যতও কেড়ে নিয়েছে। আমি যখন জেলে, আমার ছোট ছোট বাচ্চারা আমাকে ছাড়া বড় হয়েছে। জেল থেকে বেরিয়ে দেখি, তারা আমাকে ঠিকমতো চিনতে পারছে না।”
আরেক ভুক্তভোগী সুফিয়া আক্তার কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “১৫ বছর পর খালাস পেয়েছি, কিন্তু এটাকে আমি বিজয় মনে করি না। এটা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় পরাজয়। এই মামলার কারণে আমি আমার বাবার লাশ দেখতে পারিনি। ফ্যাসিস্ট সরকারের জীবন্ত বলি আমরা।”
এই রায় প্রসঙ্গে হেযবুত তওহীদের কেন্দ্রীয় তথ্য সম্পাদক এসএম সামসুল হুদা বলেন, “এই মামলাটি ছিল সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট, যা কেবল হয়রানির উদ্দেশ্যে করা হয়েছিল। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে বিষয়টি প্রমাণিত হওয়ায় আদালত তাদের নির্দোষ হিসেবে রায় দিয়েছেন। একটি মিথ্যা মামলার নিষ্পত্তির জন্য প্রায় ১৬ বছর অপেক্ষা করতে হওয়ায় আমরা দেশের বিচার ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রিতা নিয়ে উদ্বিগ্ন।”
তিনি আরও বলেন, “হেযবুত তওহীদ সারা দেশে রাষ্ট্রীয় আইন মেনে বই বিক্রি, সভা-সমাবেশ ও সেমিনারের মাধ্যমে কাজ করে। গত ৩০ বছরে আমরা কোনো আইন ভঙ্গ করিনি এবং ভবিষ্যতেও করব না। পুলিশ প্রথমে ৫৪ ধারায় আটক করার তিন মাস পর রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা করে, কিন্তু আমাদের বক্তব্য কোনোভাবেই রাষ্ট্রদ্রোহী কর্মকাণ্ডের সাথে সম্পৃক্ত নয়, যা আজ আদালতের রায়ে আবারও প্রমাণিত হলো। আমরা আমাদের সদস্যদের বিরুদ্ধে চলমান অন্য ষড়যন্ত্রমূলক ও মিথ্যা মামলাগুলোরও দ্রুত নিষ্পত্তি চাই।”