কওমে লুত: এক অভিশপ্ত জাতির ইতিহাস –ওবায়দুল হক বাদল
নবী ইব্রাহিম (আ.) এর ভ্রাতিষ্পুত্র লুত তখনো নবুয়ত প্রাপ্ত হননি। তবে তিনি বহুকাল ধরে পিতৃব্য ইব্রাহিমের সাথেই অবস্থান করেছিলেন। এক পর্যায়ে এই পুন্যবান ভ্রাতুষ্পুত্র লুতকে আল্লাহ তাআলা নবুয়ত দান করেন। নবুয়ত দানের পর লুত (আ.) কে একটি স্পেশাল দায়িত্ব প্রদান করেন আল্লাহ রাব্বুল আলামিন।
তৎকালীন জর্ডান ও বায়তুল মোকাদ্দাসের মধ্যবর্তী স্থানে একটি সমৃদ্ধ নগরী ছিল। যার নাম সাদূম। এখানকার জমি ছিল অতি উর্বর। ফলে সাদূমের অধিবাসীদের ছিল অঢেল শস্য আর সম্পদের প্রাচুর্য। স্বভাবতই তারা ছিল এক সমৃদ্ধ জাতি। তাদের এই সমৃদ্ধি তাদেরকে বিপথগামী করে তোলে। সম্পদের প্রাচুর্য আর লালসায় মত্ত সাদূমের মানুষেরা তাদের প্রতি সৃষ্টিকর্তার অপার অনুগ্রহের কথা ভুলে যায়। তাদের এই প্রাচুর্যই তাদেরকে টেনে নিয়ে যায় পাপাচারের দিকে। তারা তাদের প্রতিপালককে ভুলে গিয়ে আচ্ছন্ন হয়ে পরে আমোদ, প্রমোদে। নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা, উদ্যাম নৃত্য আর মদ্যপান, এসবই ছিল তাদের প্রতিদিনকার কাজ। নগ্নতা, অশ্লীলতা, কাম-প্রবৃত্তি তাদেরকে পেয়ে বসে প্রবলভাবে। পৃথিবীর ইতিহাসে তারা প্রথম সমকামিতার মতো ভয়ানক অশুদ্ধ চর্চায় লিপ্ত হয়।
এই সাদূম এলাকার অধিবাসীদেরকে পথ প্রদর্শনের জন্যই লুত (আ.) কে প্রেরণ করেন আল্লাহ রাব্বুল আলামিন। তিনি একজন সতর্ককারী হিসেবে ঐ কওমের কাছে যান। পুরো কওমকে পাপাচার ছেড়ে শুদ্ধতার পথে ফিরে আসার আহ্বান জানান। তাদেরকে ভয়ানক পরিণতির ব্যাপারে সতর্ক করেন। কিন্তু অবাধ্য জাতি তাদের অপকর্মের ব্যাপারে অনুশোচনা করতে অস্বীকার করে, আর সেই পাপাচারকেই আকড়ে ধরে রাখে, যেখানে তারা আপাদমস্তক ডুবে ছিল। অতঃপর তাদের উপর নেমে আসে ভয়ানক শাস্তি, আল্লাহর লানত।
নবী লুত (আ.) সতর্ককারী হিসেবে আল্লাহর নির্দেশমতো তার অনুসারীদের নিয়ে সাদূম এলাকায় যান। তিনি তার সম্প্রদায়কে বলেন, তোমরা এমন এক পাপে লিপ্ত হয়েছ, যা পৃথিবীর ইতিহাসে আর কোনো জাতি কখনো করেনি। সুতরাং আমি আশঙ্কা করছি, তোমাদের উপর আপতিত হবে এমন এক শাস্তি, যা ইতোপূর্বে আর কোনো জাতির উপর আপতিত হয়নি। হে আমার সম্প্রদায়, আমি তোমাদের জন্য মনোনীত হয়েছি। আর আমি আদিষ্ট হয়েছি তোমাদেরকে সতর্ক করার জন্য। আমি আহ্বান করছি, তোমরা এই অন্যায় থেকে নিজেদেরকে নিবৃত করো, আর মহান আল্লাহ পাকের বিধানের কাছে নিজেদেরকে সমর্পন করো। আমার এই আহ্বানের বিনিময়ে আমি তোমাদের নিকট কোনো প্রতিদান চাই না। আমার প্রতিদান তো রয়েছে মহান প্রতিপালকের নিকট। তোমরা কি তোমাদের ভাইয়ের আহ্বানকে গ্রহণ করবে না? তোমরা কি সর্বশক্তিমান আল্লাহ পাককে ভয় করবে না? তোমরা কি জান না, তিনি শাস্তিদানে কতটা কঠোর?
আল্লাহর নবীর এই আহ্বানকে সহাস্যে প্রত্যাখ্যান করে পাপাচারী কওমের লুত। তারা তার সতর্কবার্তাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বলে, ও হে লুত। আমরা তোমার এই কাল্পনিক শাস্তির ব্যাপারে বিচলিত নই। তুমি যতই চিৎকার করো, তা আমাদের হৃদয়ে প্রবেশ করবে না। আমরা সেভাবেই উদ্যাম জীবনযপাপন করবো, যেভাবে আমরা এতকাল করে এসেছি। আমরা ঠিক সেভাবেই রাত্রিকালে এই নগরীকে প্রমোদময় করে তুলব, ঠিক যেভাবে আমরা এতকাল করে এসেছি। আর আমরা সেভাবেই নিজেদের সকল বাসনা পূর্ণ করব, ঠিক যেভাবে আমরা এতকাল করে এসেছি।
তারা আল্লাহর নবীর সতর্কবাণী বারবার প্রত্যাখ্যান করে আসছিল। তথাপিও লুত (আ.) তার জাতিকে আল্লাহর কঠোর শাস্তি থেকে বাঁচাতে পিছপা হন না। তিনি বারংবার তাদেরকে পাপাচারের পথ থেকে ফিরে আল্লাহর হুকুমে প্রত্যাবর্তনের আহ্বান জানাতে থাকেন। কিন্তু তারা বরাবরই নবীকে প্রত্যাখ্যান করে আসছিল।
এক পর্যায়ে তারা বিরক্ত হয়ে আল্লাহর নবী লুত (আ.)কে কটাক্ষ করে বলেন, ও হে লুত! তুমি তো শুদ্ধাচারী! তুমি কেন আমাদের এই পাপের নগরীতে? তুমি এই জনপদ ছেড়ে চলে যাও, আর কোনো গর্তের মধ্যে দিয়ে নিজেকে লুকিয়ে রাখ। অতঃপর তারা সহাস্যে কৌতুক করতে থাকে আল্লাহর নবীকে উদ্দেশ্য করে। তারা তাকে অপমান করে তাড়িয়ে দেয়, আর নির্যাতন করতে থাকে তার অনুসারীদের উপর।
লুত (আ.) তার সাধ্যের সবটুকু দিয়ে চেষ্টা করেছিলেন, অভিশাপের দুয়ারে দাঁড়িয়ে থাকা, লানতের ফরমান জারি হওয়া এই সম্প্রদায়কে তাদের অবধারিত পরিণতি থেকে ফিরিয়ে আনতে। কিন্তু শতচেষ্টার পরেও তিনি ব্যর্থ হন। ঔদ্ধত, অভিশপ্ত জাতি যখন লুত (আ.) এর আহ্বানকে প্রত্যাখ্যান করল তখন তিনি সব কিছু আল্লাহর সিদ্ধান্তের উপর ছেড়ে দেন।
অতঃপর একদিন নগরীতে আসেন তিন আগন্তুক। তারা ছিলেন যুবক, আর ছিলেন অত্যন্ত সুদর্শন। তাদের কমনীয় চেহারায় না ছিল দাড়ি, না ছিল গোঁফের রেখা। তারা লুত আঃ এর অনুসন্ধান করেন, আর তার ঘরে অতিথি হিসেবে আশ্রয় প্রার্থনা করেন। আল্লাহর নবী আগন্তুকদেরকে সাদরে অভ্যর্থনা জানান। তবে নগরীতে সুদর্শন তিন যুবকের এই আগমন, দৃষ্টি এড়ায়নি বিকারগ্রস্ত সমকামীদের। তারা ওই যুবকদের প্রতি তীব্র আকর্ষণ অনুভব করে, আর তাদের পিছু নিয়ে লুত (আ.) এর দরজা পর্যন্ত পৌঁছে যায়। এরপর তারা দরজায় কড়া নেড়ে বলে, ও হে লুত! তুমি তো সমকামী নও। সুতরাং ওই সুদর্শন যুবকদের সাথে তোমার কোনো কাজ নেই। তুমি বরং তাদেরকে আমাদের কাছে ছেড়ে দাও।
বিকৃত যৌন বাসনায় বিকারগ্রস্ত নগরবাসীর বক্তব্যে আল্লাহর নবী কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েন। নিরূপায় হয়ে তিনি বলেন, আমি আমার কন্যাদেরকে তোমাদের কাছে বিয়ে দিতে পারি, কিন্তু আমার মেহমানদেরকে তোমাদের লালসার শিকার হতে দিতে পারি না। কেননা তারা আমার আশ্রয়প্রার্থী।
বিকারগ্রস্ত লোকগুলো উত্তরে বলে, ও হে লুত, আমরা তোমার কন্যাদের ব্যাপারে আগ্রহী নই। তুমি ভালো করেই জানো, কোনো নারীর প্রতি আমাদের আকর্ষণ নেই। সুতরাং ওই যুবকদেরকে ছাড়া আমরা ফিরে যাচ্ছি না।
তাদের এমন বক্তব্যে আল্লাহর নবী অতিথিদের সামনে ভীষণ লজ্জিত আর অসহায় অনুভব করেন। তার এই অবস্থা দেখে আগত অতিথিরা তাকে অভয় দান করেন। তারা বলেন, হে আল্লাহর পয়গম্বর, আপনি বিচলিত হবেন না। আপনার কোনো ভয় নেই, কেননা আপনার নিরাপত্তার দায়িত্ব আমাদের কাঁধে। আমরা সাধারণ যুবকের বেশে এখানে এসেছি বটে, তবে আমরা সাধারণ নই। এরপর তারা প্রকাশ করেন নিজেদের সত্যিকার পরিচয়। তারা ছিলেন মূলত আল্লাহর প্রেরিত তিনজন ক্ষমতাশালী মালায়েক অর্থাৎ ফেরেশতা। তারা এসেছিলেন, পাপাচারে পূর্ণ এই শহরকে ধ্বংস করে দিতে।
এরপর আল্লাহর নবী লুত (আ.) কে তাঁরা বলেন, রাত পোহাবার আগেই আপনি এই নগরী পরিত্যাগ করুন। কেননা ভোরের আলো ফোটার সাথে সাথে আমরা একে মাটির সাথে মিশিয়ে দেব। যারা আপনাকে অনুসরণ করবে, তারা আল্লাহর ক্রোধ থেকে রক্ষা পাবে। তবে কেউ যদি পেছন ফিরে তাকায়, সেও ধ্বংস হয়ে যাবে।
অতঃপর ভোরের আলো ফুটে ওঠার আগেই নিজের পরিবার আর অনুসারীদেরকে নিয়ে পাপের ওই নগরী থেকে বের হয়ে পরেন আল্লাহর নবী লুত (আ.)। তার স্ত্রীও ছিল অবাধ্যদের অন্তর্ভুক্ত। তথাপি লুত নবীর উপর্যুপরি অনুরোধে সে স্বামীর সাথে শহর ত্যাগ করতে রাজি হয়। আল্লাহর নবী ও তার সঙ্গীরা যখন শহরের সীমানা অতিক্রম করেন, ততক্ষণে পেছনে ধ্বংসলীলা শুরু হয়ে যায়। প্রচণ্ড নিনাদের সাথে শুরু হয় কম্পন। আর ধসে পড়ে প্রাসাদতুল্য একেকটি দালান। উল্কাপিণ্ডের মতো ধেয়ে আসে আগুনের লেলিহান শিখা, আর ভস্ম করে দেয় সম্পূর্ণ নগরী। মানুষগুলো পাগলের মতো ছুটতে থাকে নিজেকে রক্ষা করতে, কিন্তু তারা ব্যর্থ হয়। কারণ আল্লাহর লানত থেকে কেউ বাঁচতে পারে না।
তাদের সামনে উপস্থিত হয়েছিল সেই সময় যখন তওবার পথ খোলা ছিল। যখন একজন সতর্ককারী তাদেরকে সতর্ক করেছিলেন। কিন্তু তারা তাকে প্রত্যাখ্যান করেছে, কটাক্ষ করেছে। তারা যখন সীমা লঙ্ঘন করল তখন সর্বশক্তিমান আল্লাহর ক্রোধের পাত্রে পরিণত হয়েছিল। এরা সেই জাতি যারা হেদায়াতের পরিবর্তে ভ্রান্তির পথ বেছে নিয়েছিল, আর ক্ষমার বদলে ক্রয় করেছিল শাস্তি।
পবিত্র কোরআনে আল্লহ তায়ালা বলেছেন- ‘আর লুতকে আমি প্রজ্ঞা ও জ্ঞান দান করেছিলাম। আমি তাকে এমন এক জনপদ থেকে উদ্ধার করেছিলাম, যার অধিবাসীরা অশ্লীল কাজে লিপ্ত ছিল। তারা ছিল এক মন্দ ও পাপাচারী কওম। আর আমি তাকে আমার রহমতের মধ্যে শামিল করে নিয়েছিলাম। সে ছিল সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভূক্ত।’ (সূরা আম্বিয়া : আয়াত ৭৪-৭৫)।
আল্লাহ তাআলা আরো বলেন, "অতঃপরযখনআমারহুকুমএসেপৌঁছল, তখনআমিঐভূখণ্ডেরউপরিভাগকেনিচেকরেদিলামএবংতারওপরস্তরেস্তরেপুঞ্জীভূতপোড়ামাটিরপাথরবর্ষণকরলাম।" সূরা হুদ (১১:৮২)
আরেকটি আয়াতে তিনি বলেছেন, “তোমার প্রতিপালকের শাস্তি এমনই! তিনি কোনো জনগোষ্ঠীতে শাস্তি দেন, যখন তারা সীমা লঙ্ঘন করে। নিশ্চয়ই তাঁর শাস্তি মর্মন্তুদ আর কঠিন।” (সূরা হুদ ১০২)
অপবিত্র ওই নগরীর একজন পাপাচারীকেও ক্ষমা করেন নি আল্লাহ তাআলা। এমনকি নিস্তার পায় নি স্বয়ং লুত আঃ এর স্ত্রী। নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও সে পেছনে ফিরে তাকায় আর এক মুহূর্তের ব্যবধানে পাথরে পরিণত হয়। সে ছিল নবীপত্নি, অথচ আল্লাহর অনুগ্রহের পথ থেকে বিচ্যুত এক অবাধ্য নারী।
কওমে লুতের এই ইতিহাস অজানা নয় কারো কাছে। পবিত্র গ্রন্থ কোরআনে নয় কেবল, ওল্ড টেস্টামেন্ট, আর নিউ জেনেসিসেও এই ঘটনার উল্লেখ রয়েছে। সেখানেও বর্ণিত আছে অবাধ্য কওমে লুতের ইতিহাস। মৃত সাগরের তীরে আজও কালের সাক্ষী হয়ে আছে সেই ধ্বংসপ্রাপ্ত নগরীর কিঞ্চিত নিদর্শন। অথচ এই স্পষ্ট নিদর্শনকে অস্বীকার করে মানবজাতি আজও সেই পাপাচারে লিপ্ত। বিশেষ করে বাংলাদেশের কিছু ধর্মীয় শিক্ষালয়ে, প্রতিষ্ঠানে এই পাপাচার যেন মহামারী আকার ধারণ করেছে। রাতের অন্ধকারে মাদ্রাসার অন্ধ প্রকোষ্ঠে কোমলমতি মাছুম বাচ্চাদের উপর চলে যৌন নির্যাতন। মাদ্রাসার বড় ভাই, শিক্ষক, ওস্তাদ কারো কাছেই নিরাপদ নয় তারা। কওমে লুতকেও ছাপিয়ে গেছে যেন তাদের অপকর্ম। অন্যদিকে এক শ্রেণির তথাকথিত প্রগতিশীলরা এটাকে নিজেদের অধিকার বলে দাবি করে। তাদের কাছে সতর্কবার্তা নিছক রূপকথার গল্প। তাদের এই সীমালংঘন কি আরেকটি ধ্বংস নিয়ে আসছে?
আল্লাহ সকলকে সঠিক বুঝ দান করুক। সকলকে ক্ষমা করুক। আমিন।
মন্তব্য সমূহ (0)
আপনার মতামত দিন
ক্যাটাগরি সমূহ
জনপ্রিয় নিবন্ধ
-
আসুন জান্নাতের রাস্তা চিনে নিই
28 Dec, 2017 -
ইসলাম কীভাবে দাসত্বপ্রথাকে নির্মূল করেছে?
22 Nov, 2023 -
যে সভ্যতা তেলা মাথায় তেল দেয় ওই সভ্যতাকে ঘৃণা...
27 Aug, 2015 -
শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করতে একমাত্র...
01 May, 2026 -
দাঙ্গাকারীদের স্বর্গ নেই
22 Jan, 2016
সাম্প্রতিক নিবন্ধ
-
মসজিদের উদ্দেশ্য কি শুধুই নামাজ পড়া?
06 Oct, 2026 -
কোরআনের প্রতিশ্রুতি বনাম বর্তমান মুসলিম বিশ্ব
06 Oct, 2026 -
মক্কায় ঈদ নয়, মদিনায় কেন ঈদ
06 Oct, 2026 -
কওমে লুত: এক অভিশপ্ত জাতির ইতিহাস –ওবায়দুল হক...
06 Oct, 2026 -
হেযবুত তওহীদ সম্পর্কে অপপ্রচারের জবাব
29 Sep, 2026
বর্তমানে কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!