প্রতি বছরের মতো এবারও পালিত হলো আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস। কোভিড ১৯, ইউক্রেন রাশিয়া যুদ্ধ, আমেরিকা-ইরান যুদ্ধ, মুদ্রাস্ফীতি- সব মিলিয়ে একের পর এক সংকটে আমাদের দেশের শ্রমজীবী শ্রেণির মানুষেরা ভয়াবহ আর্থিক অনটনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। কারণ কর্মহীনতা। তাই শ্রমজীবী মানুষ সম্পর্কে ইসলামের বক্তব্য এখন অন্য সময়ের চেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক। আল্লাহ মানবজাতিকে শ্রমনির্ভর ও সামাজিক জীব হিসাবেই সৃষ্টি করেছেন (সুরা বালাদ ৪)। তাই মানুষ যখন শ্রমনির্ভর না হয়ে পরনির্ভর হয়, সামাজিক না হয়ে স্বার্থকেন্দ্রিক হয় তখন অবধারিতভাবে এর বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয় এবং অপ্রাকৃতিক অবস্থার সৃষ্টি হয়, যা অশান্তি ও বিপর্যয়ের কারণ। এ কারণেই আমাদের সমাজে শ্রমবিমুখতা, শ্রমের অবমূল্যায়ন ও বেকারত্ব একটি বৃহৎ সমস্যা।
আমাদের সমাজের রাজনীতিকদের অনেকেই শ্রমিকের অধিকার নিয়ে সোচ্চার ভূমিকা পালন করেন। বিশেষ করে মে দিবস এলে তারা বেশি বেশি সভা-সমাবেশ করে নিজেদের নেতৃত্ব ও ক্ষমতাকে শানিয়ে নেন। সে তুলনায় আমাদের সমাজের যারা ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব তাদেরকে আমরা শ্রমিকের অধিকার নিয়ে সোচ্চার হতে দেখি না। তাদের এই নিষ্পৃহতার কারণ হচ্ছে-
প্রথমত, তারা ধর্ম বলতে নামাজ, রোজা, ওয়াজ ও মিলাদ মাহফিল ইত্যাদিকে বুঝে থাকেন। সমাজের অন্যায়-অবিচার, বঞ্চিত শ্রেণির দুঃখ-যন্ত্রণা লাঘবের প্রচেষ্টার চেয়ে তসবিহর দানা গুনে গুনে আমলের পাল্লা ভারী করাকেই তারা নাজাতের কার্যকর পথ বলে বিশ্বাস করেন। তারা শ্রমিকদের কষ্ট দূর করার মতো দুনিয়াবি কাজের চেয়ে শ্রমিকদের মসজিদে এনে নামাজ পড়াতেই বেশি সচেষ্ট। এবাদত, ধর্ম, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের পথ সম্পর্কে বিকৃত ধারণার কারণে আলেমরা শ্রমিকদের দুঃখ-কষ্ট নিয়ে চিন্তিত নন।
দ্বিতীয়ত, ধর্মনেতাগণ কেবল মাদ্রাসা-শিক্ষার বদৌলতে কিছু দোয়া-কালাম, মাসলা-মাসায়েল শিখে সেটাকেই পুঁজি করে অনায়াসে কাটিয়ে যাচ্ছেন। তাই শ্রমিকের হাড়ভাঙা খাটুনির কষ্ট তারা কী করে বুঝবেন? যাকে দু’মুঠো ভাতের জন্য কখনো মাথার ঘাম পায়ে ফেলতে হয় না, শ্রমিকের ঘাম শুকানোর আগেই তার মজুরি কেন পরিশোধ করতে হবে- সেটা তিনি কী করে বুঝবেন?
তৃতীয়ত, শ্রমিক দিবস আলেম ওলামাদের দৃষ্টিতে ইসলামের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়, যেহেতু এর উদ্ভবের সঙ্গে ইসলামের ইতিহাস বা মুসলিম উম্মাহর কোনো যোগসূত্র নেই। তাই মুসলিমদের জন্য মে দিবস পালন করাকে অনেকে কাফের-মুশরিকদের অনুসরণ, বেদাত বা অপ্রয়োজনীয় বলে মনে করেন। সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির কারণে তারা এই মহাসত্যটি বুঝতে অক্ষম যে, ইসলাম এসেছে সমগ্র মানবজাতির জন্য। তাই মানবজাতির সুখ-শান্তি নিয়ে কাজ করাও ইসলামের কাজ। তারা ভুলে যান যে, সমাজের শ্রমজীবী বঞ্চিত শ্রেণিকে মনুষ্যত্বের মর্যাদা দান করার মধ্যেই রয়েছে ইসলামের মাহাত্ম্য। আল্লাহর শেষ রসুল সেটাই করে গেছেন- মারিয়া কিবতিয়াকে (রা.) স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ, উম্মে আয়মান ও যায়েদকে (রা.) দাসত্ব থেকে মুক্ত করে পরিবারে অন্তর্ভুক্ত করা এবং বেলালকে (রা.) সম্মানের সর্বোচ্চ স্থানে উন্নীত করার মাধ্যমে। সুতরাং বঞ্চিত শ্রেণির মুক্তির জন্য সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়া উম্মতে মোহাম্মদীর জন্য অপরিহার্য কাজ- এটাই তাদের এবাদত।
আল্লাহর রসুল পরনির্ভরশীলতার বিরুদ্ধে আজীবন সোচ্চার ছিলেন। তিনি নিজেও জীবিকার জন্য পরিশ্রমের কাজ করতেন, উট-বকরি পালতেন। জেহাদের প্রয়োজনে কায়িক শ্রমের কাজেও তিনি সর্বাগ্রে থাকতেন। মসজিদে নববী নির্মাণ ও খন্দক খননের সময় আমরা তাকে হাতুড়ি দিয়ে পাথর ভাঙতে, মাটি খনন করতে এবং মাথায় করে ইট ও মাটি বহন করতে দেখি। আলী (রা.), যাকে জ্ঞান নগরীর দুয়ার বলা হয়েছে, তিনিও কিছু খেজুরের বিনিময়ে একজন ইহুদি নারীর জন্য কুয়া থেকে পানি তুলে দিয়েছেন। কিন্তু যারা আমাদেরকে ধর্মের নসিহত করেন তারা রসুলের এই সুন্নাহ পালনের প্রতি কতটুকু মনোযোগী?
আমাদের আদিপিতা আদমকে (আ.) সেই আদিম পৃথিবীর অনাবাদি জমিকে কৃষিজমিতে পরিণত করতে হয়েছে এবং কঠোর পরিশ্রম করে জীবনধারণ করতে হয়েছে। পবিত্র বাইবেলে বর্ণিত আছে, “…তোমার খাদ্যের জন্যে তুমি কঠোর পরিশ্রম করবে যে পর্যন্ত না মুখ ঘামে ভরে যায়… তুমি মরণ পর্যন্ত পরিশ্রম করবে…”
সুতরাং আদমের সন্তানদের কর্তব্য- পরিশ্রম করে রোজগার করা এবং পরিবারকে প্রতিপালন করা। নামাজ (সালাহ) পড়ানোর বিনিময়ে বা অন্য কোনো ধর্মীয় কাজের বিনিময়ে অর্থগ্রহণকে আল্লাহ হারাম করেছেন (সুরা বাকারা ১৭৪)। আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন- জুমার আজানের সময় বেচাকেনা বন্ধ করে সালাতে যোগ দিতে এবং সালাহ শেষে পুনরায় জীবিকার সন্ধানে বের হতে (সুরা জুমা ৯-১০)। লক্ষণীয় যে, হুজরাখানায় বসে থেকে অন্যের ওপর নির্ভর করতে বলা হয়নি। এমনকি জুম্মার দিনেও স্থায়ী কর্মবিরতির নির্দেশ নেই।
প্রকৃতপক্ষে ইসলামসহ সকল ধর্মই কর্মের প্রতি মানুষকে উৎসাহিত করেছে। বৈরাগ্যবাদ ও আলস্য উভয়ই ইসলাম নিষিদ্ধ করে, কারণ এতে সমাজের ভারসাম্য নষ্ট হয়। ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা মানুষকে কর্মমুখী করে তোলে। কোনো ধর্মেই ধর্মের নামে ব্যবসা করার অনুমতি নেই।
মহানবী বলেছেন, জীবিকা অর্জনের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করা মানুষের দায়িত্ব, এবং আল্লাহর ওপর ভরসা মানে চেষ্টা ত্যাগ করা নয়। তিনি আরও বলেন, সকল নবী-রসুল নিজেরা পরিশ্রম করে জীবিকা অর্জন করেছেন; তাই অন্যের ওপর বোঝা না হয়ে নিজের শ্রমে উপার্জন করাই উত্তম। ভিক্ষাবৃত্তি ইসলাম কঠোরভাবে নিরুৎসাহিত করেছে।
একই শিক্ষা অন্যান্য ধর্মগ্রন্থেও পাওয়া যায়। গীতায় কর্মের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে, এবং বাইবেলেও মানুষের জন্য শ্রমকে অপরিহার্য বলা হয়েছে। সকল ধর্মগ্রন্থে শ্রমের মাধ্যমে জীবিকা অর্জনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। শ্রমিক শ্রেণি অনেক সময় ‘ধার্মিক’ না হয়েও এই শাশ্বত নির্দেশ মান্য করে। শ্রমিকের ঘাম ঝরার সঙ্গে সঙ্গে তার প্রাপ্য মজুরি প্রদান করলে যে সন্তুষ্টি সৃষ্টি হয়, তা কেবল একজন শ্রমিকই উপলব্ধি করতে পারে। তাই একজন শ্রমজীবী সাধারণত আরেকজন শ্রমিককে বঞ্চিত করে না।
অন্যদিকে, যে ব্যক্তি আল্লাহর নির্দেশ মেনে শ্রমিককে ন্যায্য অধিকার প্রদান করে, সেও বঞ্চনা করবে না। এই দুই চেতনার সমন্বয় ছাড়া শ্রমিকের প্রকৃত অধিকার প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।
কেবল ধর্মজীবীরাই নয়, রাজনীতিজীবীরাও একটি পরনির্ভরশীল শ্রেণি। তাই তারা শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে যে বক্তব্য দেয়, তা অনেক সময় প্রবঞ্চনামূলক। শ্রমিকদের হতাশা, বঞ্চনা ও দুর্ভোগ তাদের রাজনৈতিক পুঁজি হয়ে দাঁড়ায়। এই বাস্তবতা শ্রমিকশ্রেণিকে বুঝতে হবে, যেন তারা প্রতারিত না হয়।
পশ্চিমা বস্তুবাদী সভ্যতাও দীর্ঘদিন শ্রমিকদের বঞ্চিত করেছে। যখন শ্রমিকরা অধিকার আদায়ের জন্য প্রতিবাদ করেছে, তখন তাদের ওপর দমন-পীড়ন চালানো হয়েছে। পরবর্তীতে সেই শক্তিগুলোই মে দিবস পালনের মাধ্যমে নতুন রাজনৈতিক বয়ান তৈরি করেছে। কিন্তু বাস্তবে শ্রমিকদের অবস্থার তেমন উন্নতি হয়নি; বরং বঞ্চনা ও হাহাকার বেড়েছে- যা পরিসংখ্যানেই স্পষ্ট।