মাওলানা আব্দুর রহমান:
মুসলিম শব্দের অর্থ হলো আল্লাহর আদেশ-নির্দেশ, হুকুম-আহকাম তসলিম করে নেওয়া অর্থাৎ সাদরে গ্রহণ করে নেওয়া। আল্লাহর ইচ্ছার কাছে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করা, আল্লাহর অনুগত হওয়া। সহজ কথায়, আল্লাহর সামনে নিজের স্বাধীনতা ও ইচ্ছাকে স্বেচ্ছায় বিসর্জন দেওয়া। আর দ্বীন হলো আল্লাহর হুকুমভিত্তিক জীবনব্যবস্থা; যা প্রতিষ্ঠার ফলে সমাজে যে ফলাফলটা আসবে তার নাম ইসলাম অর্থাৎ শান্তি।
যে ব্যক্তি নিজের জীবনের যাবতীয় কাজ আল্লাহর হাতে সঁপে দেয়, সেই প্রকৃত মুসলমান। পক্ষান্তরে, যে ব্যক্তি নিজের খেয়ালখুশি মতো চলে কিংবা আল্লাহর পরিবর্তে অন্য কারো হাতে নিজের বিষয়ের ফয়সালা ছেড়ে দেয়, সে প্রকৃত অর্থে মুসলমান নয়।
আল্লাহর ওপর পূর্ণ সমর্পণের অর্থ হলো, তিনি তাঁর কিতাব এবং নবীর মাধ্যমে যে পথ ও বিধান পাঠিয়েছেন, তা কোনো প্রকার আপত্তি ছাড়াই পুরোপুরি গ্রহণ করা। জীবনের প্রতিটি ধাপে এবং প্রতিটি কাজে শুধুমাত্র পবিত্র কুরআন ও রসুল (সা.) এর আদর্শ অনুসরণ করাই একজন মুমিনের প্রধান কাজ।
কারা প্রকৃত মুসলমান?
প্রকৃত মুসলমান সেই ব্যক্তি, যে প্রতিটি পদক্ষেপে আল্লাহর কিতাব ও রাসূলের হাদীসের কাছে সঠিক পথের সন্ধান জানতে চায়। সে সর্বদা নিজেকে প্রশ্ন করে, “আমার এখন কী করা উচিত আর কী করা উচিত নয়?” যখনই সে কোনো সঠিক নিয়ম বা বিধান খুঁজে পায়, তা কোনো দ্বিধা ছাড়াই মেনে নেয় এবং এর বিপরীত সব কিছুকে অস্বীকার করে।
এর উল্টো দিকে, যে ব্যক্তি নিজের মনের ইচ্ছা অনুযায়ী চলে কিংবা দুনিয়ার স্রোতে গা ভাসিয়ে দেয়, সে প্রকৃত মুসলমান হতে পারে না। যদি এমন কেউ কুরআন ও হাদীসের বিধান জানার পর বলে যে, তার বিবেক এটি গ্রহণ করছে না অথবা তার বাপ-দাদার কাল থেকে চলে আসা নিয়মের বাইরে সে যাবে না, তবে সে নিজেকে মুসলমান হিসেবে দাবি করলেও প্রকৃতপক্ষে মুসলমান নয়।
ইসলামের কিছু ভুল অনুশীলন
বর্তমানে ইসলামকে কেবল কিছু আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলা হয়েছে। অনেকে মনে করেন কিছু নির্দিষ্ট ব্যক্তিগত ইবাদত পালন করাই বুঝি ইসলাম। ফলে মানুষের কর্মজীবন দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে গেছে:
১. নির্দিষ্ট সময়ে একনিষ্ঠ হয়ে আল্লাহর ইবাদত করা।
২. জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রে আল্লাহর বিধানের তোয়াক্কা না করে শিরক, কুফরী ও হারামের পথে চলা।
অথচ সাহাবায়ে কেরাম তাদের পুরো সত্ত্বাকে আল্লাহর কাছে সঁপে দিয়েছিলেন। তাঁদের চিন্তা-চেতনা এবং কর্মজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে এক আল্লাহর আদেশ-নির্দেশ ও নিষেধের প্রাধান্য ছিল। পবিত্র কুরআনে এ বিষয়ে বলা হয়েছে:
“সৎকর্ম শুধু এই নয় যে, পূর্ব কিংবা পশ্চিমদিকে মুখ করবে, বরং বড় সৎকাজ হল, এই যে ঈমান আনবে আল্লাহর উপর, কিয়ামত দিবসের উপর, ফেরেশতাদের উপর এবং সমস্ত নবী রাসুলগণের উপর; আর সম্পদ ব্যয় করবে তাঁরই মহব্বতে আত্মীয়-স্বজন, এতিম-মিসকিন, মুসাফির, ভিক্ষুক ও মুক্তিকামী ক্রীতদাসদের জন্যে। আর যারা নামাজ প্রতিষ্ঠা করে, যাকাত আদায় করে এবং যারা কৃত প্রতিজ্ঞা সম্পাদনকারী এবং অভাবে, রোগে-শোকে ও যুদ্ধের সময় ধৈর্যধারণকারী, তারাই হলো সত্যাশ্রয়ী, আর তারাই পরহেজগার।” (সূরা বাকারাহ: ১৭৭)
হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) বলেছেন, মো’মেন হওয়ার আকাক্সক্ষা করা এবং মুমিনের মত অবয়ব বানিয়ে নিলেই ঈমান সৃষ্টি হয় না বরং ঈমান সেই সুদৃঢ় আকিদা যা হৃদয়ের মাঝে পূর্ণরূপে বদ্ধমূল হয়ে যায় এবং যাবতীয় কাজ তার সততার সাক্ষ্য বহন করে।
ইসলামে পরিপূর্ণ প্রবেশ
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা নির্দেশ দিয়েছেন, “ওহে যারা ঈমান এনেছো পরিপূর্ণরূপে ইসলামে প্রবেশ কর।” (সূরা বাকারাহ: ২০৮)
ইসলামে পরিপূর্ণ প্রবেশের অর্থ হলো জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে এর বিধান মেনে চলা। ইসলামের কিছু বিধান মানা আর কিছু বর্জন করা যাবে না। ইসলামকে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। একজন মুমিনের মূল কথা হবে:
“নিশ্চয় আমার নামাজ, আমার ইবাদতসমূহ এবং আমার জীবন ও আমার মৃত্যু ঐ আল্লাহর জন্য যিনি বিশ্বজাহানের রব। তাঁর কোন শরীক বা অংশীদার নেই। এভাবেই আমি আদিষ্ট হয়েছি এবং আমি প্রথম আত্মসমর্পণকারী ও আনুগত্যশীল।” (সূরা আন-আম: ১৬২-১৬৩)
একজন সত্যিকারের মুসলমান এক মুহূর্তের জন্যও আল্লাহর আনুগত্যের বাইরে যান না। তিনি আমৃত্যু শিরকমুক্ত থাকেন এবং ইসলামের ওপর অবিচল থেকে মৃত্যুবরণ করতে সচেষ্ট থাকেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন, “হে ঈমানদারগণ, আল্লাহকে যেমনভাবে ভয় করা দরকার ঠিক তেমনভাবে ভয় করো। আর তোমরা অবশ্যই মুসলমান না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না।” (সূরা আলে ইমরান: ১০২)
মো’মেন ও কাফেরের পার্থক্য
আল্লাহর কাছে মানুষ দুই প্রকার। তিনি কোর’আনুল কারীম এ বলেছেন, তিনিই তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর তোমাদের মধ্যে কেউ কাফের ও কেউ মো’মেন।” (সুরা তাগাবুন: ২)
প্রকৃত মুসলিম হওয়ার জন্য কুফর ও ইসলাম সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা থাকা প্রয়োজন। আল্লাহর হুকুম পালনে অস্বীকার করাই হলো ‘কুফর’। আর আল্লাহর হুকুম মেনে চলা এবং আল্লাহর দেওয়া পবিত্র কুরআনের বিপরীত যে কোনো নিয়ম বা আইনকে অস্বীকার করাই হলো মুমিনের বৈশিষ্ট্য। ইসলাম এবং কুফরের এই পার্থক্য কুরআন মাজিদে স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। আল্লাহ বলেন, “আল্লাহর দেওয়া বিধান অনুসারে যারা বিচার-ফয়সালা করে না, তারা কাফের” (সুরা মায়েদা: ৪৪)
অপরদিকে মুমিনের সঙ্গা দিতে গিয়ে আল্লাহ বলেছেন- “তারাই মো’মেন, যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের প্রতি ঈমান আনার পর আর সন্দেহ পোষণ করে না এবং আল্লাহর পথে প্রাণ ও ধন-সম্পদ দ্বারা জিহাদ করে। তারাই সত্যনিষ্ঠ।” (সুরা হুজরাত: ১৫)
লেখক: অনার্স (হাদিস), আরবী বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।
মোবাইল: ০১৯১০-৯৩১৪৩৪