প্রকৃত ইসলামের নারীনীতি

রুফায়দাহ পন্নী:
গত কয়েক শতাব্দী ধরে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মধ্যে সভ্যতার সংঘাত চলছে। ব্রিটিশরা উপনিবেশ স্থাপন করলে তাদের ইউরোপীয় ধ্যান-ধারণা, মূল্যবোধ ও জীবনপদ্ধতি শিক্ষাব্যবস্থা ও বিভিন্ন মাধ্যমে ভারতবর্ষসহ অন্যান্য উপনিবেশে বিস্তার পেতে শুরু করে। এর অংশ হিসেবে নারী সংক্রান্ত পশ্চিমা দৃষ্টিভঙ্গি এদেশেও প্রভাব ফেলতে থাকে। পশ্চিমা দৃষ্টিভঙ্গির সাথে প্রাচ্যের নারীনীতি ও সংস্কারের ভিন্নতা থেকে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়। এই দ্বন্দ্ব নিয়ে কয়েক শতাব্দী আমরা পার করেছি, কিন্তু এর কোনো কিনারা হচ্ছে না।

পশ্চিমা প্রস্তাব ও ধর্মনেতাদের প্রতিক্রিয়া
বিগত ইন্টেরিম সরকারের সময়ে নারীনীতি সংক্রান্ত একটি সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়। এ কমিশনে শিক্ষাবিদ, আইনজ্ঞ, নারী অধিকার কর্মী, এনজিওকর্মী এবং সমাজকর্মীদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তারা যে নারীনীতি প্রস্তাব করে তা আমাদের ধর্মনেতাদের দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হয়। তাদের উত্তেজনা বুঝতে পেরে সরকার এ বিষয়ে আর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।

এভাবে তাদের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হওয়ার প্রধান কারণ ছিল এটি পশ্চিমা নারীনীতির প্রতিফলন। এর কিছু দাবি আমাদের ধর্মের মৌলিক শিক্ষার সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক। উদাহরণস্বরূপ, এতে বলা হয়েছিল পিতার ওয়ারিশ হিসাবে ছেলে ও মেয়ে সমান সম্পত্তি পাবে। অথচ আল্লাহর বিধান অনুযায়ী মেয়ে পায় ছেলের অর্ধেক। আপাতদৃষ্টিতে এটি বৈষম্য মনে হলেও, মেয়ে তার স্বামী ও পুত্রের থেকেও সম্পত্তির অংশ পায় এবং তার ভরণপোষণের দায়িত্ব স্বামীর উপর ন্যস্ত থাকে। অন্যদিকে, ছেলের উপরে বাবা-মায়ের ভরণপোষণের দায়িত্বও থাকে, যা মেয়ের উপর নেই। তাই আল্লাহ ভারসাম্য রক্ষা করেই এই বিধান দিয়েছেন।

এছাড়া কমিশন প্রস্তাব দিয়েছিল যে যৌনকর্মীরা শ্রমিক হিসেবে মর্যাদা লাভ করবে। অথচ পতিতাবৃত্তি ইসলামসহ সকল ধর্মেই হারাম। পশ্চিমা অশালীন এই সংস্কৃতিকে উদারতার নামে আমাদের নারীনীতিতে প্রবেশ করানোর চেষ্টা করা হলো। তাই নারীনীতি নিয়ে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের কাছে সুস্পষ্ট হওয়া অত্যন্ত প্রয়োজন।

বর্তমান বিকৃত মোল্লাতন্ত্র বনাম ইসলামের প্রকৃত শিক্ষার বাস্তবতা
সমস্যা হচ্ছে, কোনটা ইসলামের শিক্ষা আর কোনটা মোল্লাতন্ত্রের বাড়াবাড়ি সেটা আমরা প্রায়ই আলাদা করতে পারি না। তাই ইসলামের কথা উঠলেই সামনে আসে আফগানিস্তান, সৌদি আরব এবং ইরানের মোল্লাতন্ত্রের উদাহরণ। ২০২২ সালে হিজাব সঠিকভাবে না করার অভিযোগে ২২ বছরের মেয়ে মাহসা আমিনিকে শরীয়াহ পুলিশের হেফাজতে মারা গিয়েছিল। সেই ঘটনার প্রতিবাদ করতে গিয়ে পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারায় আরো পাঁচ শতাধিক মানুষ। অথচ ইসলামের সোনালি যুগে শরিয়াহ পুলিশ বলে কোনো কিছুর অস্তিত্বই ছিল না। এছাড়া ২০২৫ সালে আফগানিস্তানের পূর্বাঞ্চলে ভূমিকম্পে নারীরা বাড়িঘরের নিচে চাপা পড়লে অনাত্মীয় পুরুষ উদ্ধারকর্মীরা তাদেরকে উদ্ধার করবে কিনা সেটা নিয়েও জটিলতা তৈরি হয়েছিল। আফগানিস্তানে নারীরা শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত। রাষ্ট্রের কোনো দায়িত্বশীল পদে নারীদের নিয়োগ দেওয়া হয় না। এমনকি সেখানে নারী মন্ত্রণালয়ের প্রধান থেকে শুরু করে সকল কর্মকর্তাই পুরুষ। সেখানে নারীদের প্রবেশ করতেও দেওয়া হয় না। নারীদেরকে ঘরের বাইরে যেতে হলে আপাদমস্তক ঢেকে বের হতে হয়। কোথাও যেতে হলে মাহরুম পুরুষের সাথে যেতে হয়।

নারীদের স্বাধীনতা হরণের এসব চিত্র দেখেই শিক্ষিত সচেতন মানুষ ইসলামকে রাষ্ট্রীয় জীবনে দেখতে চান না। এছাড়া ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়া ইসলামী দলগুলো তিনশত আসনে প্রার্থী দিলেও একজন নারীকেও তারা মনোনয়ন দেয়নি। এমনকি হিন্দু প্রার্থীও তারা দিয়েছে, কিন্তু কোনো নারীকে দিতে পারে নাই। এর কারণ তারা মনে করে ইসলামে নারীনেতৃত্ব হারাম। তাদের নারীরাও এমনটাই বিশ্বাস করে। এ প্রসঙ্গে তারা কোর’আনের একটি আয়াতকে দলিল হিসাবে উপস্থাপন করে যেখানে আল্লাহ বলেছেন, পুরুষরা নারীদের অভিভাবক কারণ তারা ব্যয় করে (সুরা নিসা ৩৪)। মূলত এ আয়াত পারিবারিক শৃঙ্খলার প্রেক্ষিতে এসেছে। অর্থাৎ এটি মানুষের পারিবারিক জীবনে একটি নিয়ম, যেখানে পুরুষ নারীর ভরণপোষণ করবে এবং তার যাবতীয় দায়িত্ব গ্রহণ করবে। কিন্তু পারিবারিক একটি ব্যবস্থাকে সামাজিক-রাষ্ট্রীয় সকল অঙ্গন থেকে নারীদের নেতৃত্বকে হারাম করে দেওয়া বাড়াবাড়ি এবং ইসলামের নারীনীতির পরিপন্থী।

কোরআনে নারীর অংশগ্রহণ ও ক্ষমতায়ন
কাজেই নারীদের ব্যাপারে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি কী সেটা আগে পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন। প্রথমত ইসলামের যেকোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে মানদণ্ড হচ্ছে পবিত্র কোর’আন এবং রসুল (সা.) সমগ্র জীবনী। পবিত্র কোর’আনে এমন কোনো আয়াত আমরা খুঁজে পাই না যেখানে আল্লাহ নারী নেতৃত্বকে নিষিদ্ধ করেছেন কিংবা সামাজিক-জাতীয় অঙ্গনে নারীর অংশগ্রহণের উপর সীমাবদ্ধতা আরোপ করেছেন। কোর’আনে আল্লাহ যখন কোনো আদেশ বা নিষেধাজ্ঞা প্রদান করেছেন, তিনি সাধারণভাবে “হে মো’মেনগণ” বলে সম্বোধন করেছেন। এই সম্বোধন কেবল পুরুষদের উদ্দেশে নয়; বরং সকল ঈমানদার নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্য প্রযোজ্য। ফলে ইসলামের মৌলিক দায়িত্বসমূহ, যেমন নামাজ, রোজা, আল্লাহর পথে সংগ্রাম, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, তাকওয়া অবলম্বন ও সত্যবাদিতা- এসবই নারী-পুরুষ উভয়ের ওপর সমভাবে ফরজ। যেমন আল্লাহ বলেন, “হে মো’মেনগণ! তোমরা সবাই মিলে আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরো এবং বিভক্ত হয়ো না।” (সুরা ইমরান ৩:১০৩) এই নির্দেশ নারী-পুরুষ নির্বিশেষে পুরো মো’মেনদের জন্য প্রযোজ্য। নারীরাও যে সকল সামষ্টিক কাজে অংশ নিবে তা অপর একটি আয়াতে বিশেষভাবে উল্লেখ করে আল্লাহ বলেছেন, “মো’মেন পুরুষ ও মো’মেন নারী- তারা একে অপরের সহযোগী; তারা সৎকাজের আদেশ দেয় এবং অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করে।” (সুরা তওবা ৯:৭১) অতএব, কুরআনের শিক্ষা অনুযায়ী সমাজ ও রাষ্ট্রজীবনের দায়িত্ব কোনো একক লিঙ্গের জন্য সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি নারী ও পুরুষ উভয়ের যৌথ দায়িত্ব।

লিঙ্গভিত্তিক নির্দেশনা
কুরআনে যেসব নির্দেশ বিশেষভাবে নারীদের জন্য, সেখানে আল্লাহ সরাসরি নারীদেরই সম্বোধন করেছেন- “মো’মেন নারীদেরকে বল, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থান হেফাজত করে” (সুরা আন-নূর ২৪:৩১); একইভাবে পুরুষদের জন্যও আলাদা নির্দেশ এসেছে- “মো’মেন পুরুষদেরকে বল, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থান হেফাজত করে” (সুরা নূর ২৪:৩০)। ফলে বোঝা যায়, যেখানে যে লিঙ্গের জন্য নির্দিষ্ট বিধান, সেখানে তাদের আলাদাভাবে উল্লেখ করা হয়েছে; আর যেখানে “হে মো’মেনগণ” বলে সম্বোধন করা হয়েছে, তা নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য প্রযোজ্য।

ইসলামের যুগে নারীর অংশগ্রহণ ও নেতৃত্ব
কাজেই ইসলাম নারীদের সামাজিক বা জাতীয় জীবনে অংশগ্রহণকে নিষিদ্ধ করে- এ ধারণা সঠিক নয়। বিভিন্ন দেশে মোল্লাতন্ত্র যেটা করছে সেটা তারা কোর‘আনের নীতি মেনে করছে না। তারা রসুলাল্লাহর ইন্তেকালের শত শত বছর পরে যেসব ফতোয়ার কেতাব লেখা হয়েছে, সেসব কেতাবের অনুসরণ করছে যা কোর‘আনের হুকুম ও রসুলাল্লাহর জীবনাদর্শের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কারণ রসুল (সা.) জীবনের সমস্ত অঙ্গনে নারী-পুরুষের সমান উপস্থিতি নিশ্চিত করেছেন। মসজিদ, সভা-সমাবেশ, এমনকি যুদ্ধক্ষেত্রের মতো বিপদসংকুল স্থলেও নারীরা পুরুষদের সঙ্গে অংশগ্রহণ করেছেন।

যুদ্ধের মাঠে রসদ সরবরাহর কাজের ক্ষেত্রে অনেকাংশে নারীদের উপরই আল্লাহর রসুল (সা.) নির্ভর করতেন। নারীরা খাদ্য প্রস্তুত করত, আহতদের সৈন্যদের চিকিৎসা করত এবং কোনো কোনো সংকটময় মুহূর্তে সরাসরি অস্ত্র হাতেও রসুলাল্লাহর (সা.) সঙ্গে থেকে যুদ্ধ করত। উহুদের যুদ্ধে উম্মে আম্মারার বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা সম্পর্কে রসুলাল্লাহ মন্তব্য করেছিলেন, উহুদের দিনে আমি ডানে-বামে যেদিকেই তাকিয়েছি উম্মে আম্মারাকে দেখতে পেয়েছি।

রসুলের যুগে নারীরা জুমা, ঈদ, পাঁচ ওয়াক্ত সালাত নয় কেবল, তাহাজ্জুদেও মসজিদে উপস্থিত হয়েছেন। শুধু অংশগ্রহণই নয়, তারা বাজার ব্যবস্থাপনার মতো নেতৃত্বমূলক কাজও করেছেন, যেটা এই যুগেও নারীদের ক্ষেত্রে অকল্পনীয়। অথচ শিফা বিনতে আব্দুল্লাহ (রা.) মদিনার বাজার এবং সামারা বিনতে নাহিক (রা.) মক্কার বাজার নিয়ন্ত্রণ করতেন। যুদ্ধাহত সৈন্যদের জন্য পরিচালিত হাসপাতালের অধ্যক্ষ ছিলেন নারী সাহাবি রুফায়দাহ আসলামিয়া (রা.)। তার অধীনে অনেক নারী ও পুরুষ সাহাবি কাজ করেছেন এবং প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। আমাদেরকে যুদ্ধাহতদের সেবার জন্য ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেলের নাম শেখানো হয়েছে, কিন্তু রুফায়দাহর (রা.) নাম শেখানো হয়নি। এছাড়া আয়েশা (রা.) ও উম্মে সালামা (রা.) রসুলের ইন্তেকালের পর সাহাবী ও তাবেঈদেরকে দ্বীনের জ্ঞান শিক্ষাদান করতেন যেখানে শত শত লোকের জমায়েত হতো।

যুদ্ধক্ষেত্রে নারীর নেতৃত্ব
জাতীয় কর্মকাণ্ডে নারীদের অংশগ্রহণের অধিকারের কথা বললেই অনেকে বলেন, “এটা তো পর্দার আয়াত নাজিল হওয়ার আগের ঘটনা।” তদের এই যুক্তি সম্পূর্ণ ভ্রান্ত। কারণ নারীরা রসুলের ইন্তেকালের পরেও যুদ্ধক্ষেত্রে একই প্রকার ভূমিকা রেখেছেন। খলিফা উমরের (রা.) সময় ইয়ারমুকের যুদ্ধে খাওলা বিনতে আজওয়ার (রা.) সেনাপতি খালিদ বিন ওয়ালিদের (রা.) অধীনে একটি বাহিনীর কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। রোমান সেনারা যখন তার ভাই দেরারকে (রা.) কে বন্দি করে নিয়ে যায়, তখন খাওলা (রা.) শত্রুর ব্যুহ ভেদ করে ভাইকে রোমান সৈন্যদের হাত থেকে উদ্ধার করে আনেন।

ইসলামের প্রকৃত নারীনীতি
সুতরাং এটা প্রমাণিত যে ইসলাম নারীদের জাতীয় সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের অধিকার দেয় এবং এগিয়ে যেতে উদ্ধুদ্ধ করে। কিন্তু পরবর্তীতে ইসলামের সঠিক আকিদা হারিয়ে যাওয়ার দরুন পর্দার বিধান নিয়ে বাড়াবাড়ি করে নারীদের গৃহবন্দী করা হয়েছে। তাই এখন আমাদের ইসলামের নামে চলমান ভ্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গির বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে এবং ইসলামের প্রকৃত শিক্ষার আলোকে নারীনীতি নির্ধারণ করতে হবে। মনে রাখতে হবে, মোল্লাতন্ত্র মানেই ইসলাম নয়। বরং একমাত্র আল্লাহ প্রদত্ত নারীনীতিই জীবনের প্রতিটি অঙ্গনে নারীদের মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর সুযোগ প্রদান করে।

[লেখক: কেন্দ্রীয় নারী বিভাগের প্রধান হেযবুত তওহীদ।]