হেযবুত তওহীদ

মানবতার কল্যাণে নিবেদিত

ব্রিটিশদের তৈরী মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থার বিষফল

আদিবা ইসলাম

প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থায় মাদ্রাসা বলতেই ধর্মীয় মূল্যবোধ ও নীতি-নৈতিকতার আধারকে বোঝা হয়। মানুষের আত্নিক পরিবর্তন, ধর্মের প্রতি অনুরাগ সৃষ্টি, তাকওয়াবান ও নীতি নৈতিকতার আদর্শে আদর্শিত মানুষ গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়েই মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। অর্থাৎ মানুষের ধর্মীয় সেন্টিমেন্ট এখানে একটি বড় উপাদান। যা সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থার ক্ষেত্রে কাজ করে না। কারণ সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থা ধর্মীয় কোন চুক্তি নিয়ে গড়ে উঠেনি। বরং সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থার লক্ষ্যই হচ্ছে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, প্রকৌশলী, অর্থনীতিবিদ প্রভৃতি তৈরি করা। এই শিক্ষাব্যবস্থা থেকে যারা বের হয় তারা আস্তিক হয়ে বের হলো নাকি নাস্তিক হয়ে বের হলো সেই বিষয়ের চেয়েও যেটা গুরুত্বপূর্ণ তা হলো জীবন-জীবিকা নির্বাহের জন্য কতটুকু বাস্তব জ্ঞান তারা অর্জন করতে পারলো। এখানে ধর্মীয় মূল্যবোধ ও নীতি নৈতিকতাসম্পন্ন আদর্শ মানুষ সৃষ্টির কোন চুক্তি নেই।

অন্যদিকে মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থা অন্যান্য সকল উপাদান বাদ দিয়ে কেবল ধর্মীয় পবিত্রতা, শিক্ষাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। এজন্য মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থাকে ধর্মীয় জ্ঞান, তাকওয়া ও নীতি নৈতিকতার ধারক বাহক মনে করা হয়। যার কারণে আমাদের দেশের ধর্মপ্রাণ জনগোষ্ঠী মাদ্রাসায় তাদের সন্তানদের শিক্ষা দেওয়াকে সওয়াব মনে করে। অনেকে এও মনে করে যে পরিবারের একজন মাদ্রাসায় পড়াশোনা করলে তার উছিলায় পুরো পরিবার জাহান্নামের আগুন থেকে বেঁচে যাবে। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে মানুষের ধর্মানুভূতির খাতিরে দেশের মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থাগুলো টিকে আছে। একারণে মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থা থেকে যারা পাশ করে বের হয় তাদের জীবন জীবিকা নির্বাহের জন্য বাস্তবমুখী কোন জ্ঞান না থাকলেও এবং সমাজের ধর্ম প্রাণ মানুষের দয়া-দাক্ষিণ্যের উপর বেঁচে থাকলেও সমাজে তাদের আলাদা গুরুত্ব দেওয়া হয় কেবল ধর্মের খাতিরে। নীতি-নৈতিকতা ও ধর্মীয় মূল্যবোধের ধারক বাহক হিসেবে সমাজে মূল্যায়ন করা হয় তাদের। কিন্তু এখন আমরা দেখতে পাচ্ছি, মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থার এই একমাত্র অবলম্বন অর্থাৎ ধর্মীয় মূল্যবোধ ও নৈতিকতার বুলি, এই জায়গাতেও তারা ব্যর্থতার প্রমাণ দিয়ে চলেছে। ধর্মীয় লেবাসের আড়ালে লুকিয়ে থাকা তাদের কলুষিত চরিত্র ও বিকৃত মানসিকতা প্রতিনিয়ত আমাদের সামনে আসছে।

ধর্ষণ, হত্যা, গুম, শ্লীলতাহানি, বলাৎকার ইত্যাদি যেন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাড়িয়েছে মাদ্রাসাগুলোতে। অর্থাৎ এটা পরিষ্কার যে, মানুষের আত্নাকে পরিশুদ্ধ করতে স্কুল-কলেজের পাশাপাশি মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থাও ব্যর্থ হয়েছে। লেবাস ধারণ করে সমাজের ধর্মগুরু সেজে যখন তারা নৈতিকতা বিবর্জিত এসব নোংরামি করে তখন তার প্রভাব পড়ে ইসলামের উপর। ফলে অনেকেই ইসলামকে কালিমালিপ্ত করে। মনে করে এটা ইসলামের ব্যর্থতা। কিন্তু তাদের এই ব্যর্থতার মানে ইসলামের ব্যর্থতা মনে করার কোন কারণ নেই। এই ব্যর্থতার দায়ভার তাদের যারা সাধারণ মানুষের ধর্মবিশ্বাসকে কাজে লাগিয়ে ধর্মের অপব্যাখা দিচ্ছে, নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য আল্লাহর রসুলের প্রকৃত ইসলামকে ভুলে গিয়ে নিজেদের মনগড়া বিধি বিধান ইসলামের নামে চালিয়ে দিচ্ছে এবং এর প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে গিয়ে বিকৃত ইসলামের ফল ভোগ করছে।

আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে, এই মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থা ব্রিটিশদের ষড়যন্ত্রের একটি ফসল। একটি জাতিকে সারাজীবনের মতো পঙ্গু করে দেওয়ার জন্য, দাস বানিয়ে ফেলার জন্য কি পৈশাচিক পরিকল্পনা। ব্রিটিশ পন্ডিতরা অনেক গবেষণা করা এই বিকৃত ইসলাম তৈরী করেছিল যেখানে আল্লাহ ও রসুলের প্রকৃত শিক্ষাকে বাদ দিয়ে অর্থাৎ অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের চেতনাকে বাদ দিয়ে দেওয়া হয় এবং ব্যক্তিগত জীবনের মাসলা মাসায়েল, ফতোয়া, দোয়া-কালাম বিশেষ করে দ্বীনের যে বিষয়গুলো পূর্ব থেকেই বিভিন্ন মাজহাবের-ফকীহদের মধ্যে মতবিরোধ ছিল সেগুলোই ইসলামের নামে শিক্ষা দেওয়া হয় যাতে মাদ্রাসা শিক্ষিতরা তর্ক, বাহাস ও মারামারিতে লিপ্ত থাকে। আল্লাহর রসুলের প্রকৃত ইসলাম ভুলিয়ে দিয়ে ব্রিটিশদের রচিত এই বিকৃত ইসলামটিকে জাতির মন মগজে গেঁথে দিতে বড়লাট লর্ড ওয়ারেন হেস্টিংস ১৭৮০ সনে ভারতের তদানীন্তন রাজধানী কোলকাতায় আলিয়া মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করে। সেখানে নিজেরা অধ্যক্ষ থেকে পর পর ২৬ জন খ্রিষ্টান (প্রথম খ্রিষ্টান অধ্যক্ষ এ.এইচ. স্প্রিঙ্গার এম.এ. এবং শেষ খ্রিষ্টান অধ্যক্ষ এ. এইচ. হার্টি এম.এ.) ১৯২৭ সন পর্যন্ত ১৪৬ বছর ধরে মুসলিম জাতিকে সেই বিকৃত ইসলামটি শেখায়।

মাদ্রাসা শিক্ষা প্রবর্তনের উদ্দেশ্য কী ছিল তা আলিয়া মাদ্রাসার প্রাক্তন অধ্যক্ষ ইয়াকুব শরীফ “আলিয়া মাদ্রাসার ইতিহাস” বইয়ের ভূমিকায় লিখেছেন, “মুসলমানরা ছিল বীরের জাতি, ইংরেজ বেনিয়ারা ছলে-বলে-কৌশলে তাদের কাছ থেকে ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে তাদের প্রচলিত ধর্ম, শিক্ষা ও মর্যাদা হরণ করার জন্য পদে পদে যেসব ষড়যন্ত্র আরোপ করেছিল, আলিয়া মাদ্রাসা তারই একটি ফসল। বাহ্যত এই প্রতিষ্ঠানের পত্তন করা হয়েছিল আলাদা জাতি হিসাবে মুসলমানদের স্বার্থ সংরক্ষণের নিমিত্তে, যাতে মুসলমানদের ধর্ম, কৃষ্টি ও আদর্শ রক্ষা পায়। কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মুসলমানদের ধোঁকা দেওয়াই ছিল তাদের আসল উদ্দেশ্য।”

অথচ এই মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থা থেকে বের হওয়া আলেম-ওলামারাই তাদের শিক্ষার অহংকারে মাটিতে পা ফেলতে চান না। কাজেই তাদের বলা কথা বা কর্মকান্ডকে দেখে তা ইসলামের কর্মকান্ড ভাবলে চলবে না। দীনের প্রাকৃতিক ভারসাম্যকে অস্বীকার করে নিজেদের মনগড়া বিধিবিধান তথা বিকৃত ইসলামের বিষফল হচ্ছে তাদের এই বর্তমান মানসিক বিকৃতি। আমাদের মনে রাখতে হবে, ব্রিটিশদের রচিত এই শিক্ষাব্যবস্থা থেকে পাশকৃতদের মধ্যে কখনোই ইসলামের প্রকৃত রূপরেখা ফুটে উঠবে না। বরং দিন দিন ইসলামের লেবাসে করা তাদের অনৈসলামিক কর্মকান্ড ও ভিতরের কলুষতা মানুষের সামনে প্রকট হয়ে উঠবে।

লেখাটি শেয়ার করুন আপনার প্রিয়জনের সাথে

Email
Facebook
Twitter
Skype
WhatsApp
সার্চ করুন

যুক্ত হোন আমাদের ফেসবুক পেজের সাথে...