মুস্তাফিজ শিহাব

আমাদের মুসলমানদের সমাজে একটি ভ্রান্ত ধারণা প্রতিষ্ঠিত রয়েছে যে শুধু নামাজ, রোজা, হজ, যাকাত ইত্যাদিই ইসলামের মূল বিষয়। যদি এ সমস্ত আমল ঠিকভাবে করা যায় তাহলেই আল্লাহ খুশি হয়ে জান্নাত দান করবেন। কিন্তু তারা ভুলে যান যে এই আমলগুলো করার জন্য যে বিষয়টি অত্যাবশ্যক সেই বিষয়টি হচ্ছে ঈমান। বুখারী শরীফে রয়েছে ইসলামের মৌলিক বিষয় পাঁচটি। কিন্তু অনেককে প্রশ্ন করলে তারা প্রথমটির কথা বেমালুম ভুলে যান। তারা নামাজ থেকে শুরু করে যাকাত পর্যন্ত এক তালে মুখস্থ বললেও সর্বপ্রথম যে ঈমান, কলেমা, তওহীদ সেটার কথা উচ্চারণ করতেও অনেকে ভুলে যান। কোনো কাজ আপনি তখনই করবেন যখন আপনাকে সে কাজ করার অনুমতি দেয়া হবে বা সেই কাজটি আপনার জন্য প্রযোজ্য কর্তব্য হবে। আপনাকে কেউ একটি কাজের ব্যাপারে নিয়োগ দিলে তারপর যদি আপনি কাজটি করেন তখন আপনি সেই কাজের জন্য প্রতিদান পাবেন। নিয়োগপ্রাপ্ত না হয়ে কাজ করলে বিনিময় পাওয়া যায় না।

আমাদের সমাজের ধার্মিকরা ঠিক এ কাজটিই করে যাচ্ছেন। তারা খুব নিষ্ঠার সাথে বহুবিধ আমল করে যাচ্ছেন। ফরদ নামাজের সঙ্গে আরো বহু রকম সুন্নত, নফল নামাজ পড়ছেন, ফরদ রোজার সাথে বিভিন্ন দিবসে নফল রোজা করছেন, কোর‘আন পাঠ করছেন, দোয়াকালাম শিখছেন আর উঠতে বসতে, খেতে, ঘুমাতে, প্রাকৃতিক কর্ম সারতে সেগুলোর চর্চা করছেন, ঘড়ি ধরে, তসবিহর দানা গুনে জিকির করছেন। সবই করছেন একটি উদ্দেশ্যে- তাদের সওয়াব হবে আর সেই সওয়াব হাশরের দিন পাল্লায় তোলা হবে। যত বেশি আমল তত বেশি সওয়াব। তারা এভাবে আমল করে করে আমলের পাহাড় তৈরি করে ফেলছেন কিন্তু তাদের এ সকল আমল যে ব্যর্থ সেটা তাদের বোধগম্য হচ্ছে না। আমাদের এই কথা শুনে অনেকেই প্রশ্ন করতে পারেন যে, আমল কবুল হচ্ছে কি হচ্ছে না সেটা আপনি কী করে বুঝবেন? আপনি সেটা বলার কে? কার কোন আমল কবুল হবে সেটা আল্লাহ পাকই জানেন।

আমি তাদের উদ্দেশে সবিনয়ে বলব, না। আল্লাহ নন, আপনিও বুঝতে পারবেন আপনার আমল কবুলযোগ্য কিনা। ইসলামে অন্ধবিশ্বাসের কোনো জায়গা নেই, কোনো বিষয়ে অস্পষ্টতার কোনো সুযোগ নেই, ইসলামে জ্ঞানের আলোকবঞ্চিত কোনো অঙ্গন নেই। আমরা যে কাজটি যে উদ্দেশ্যে করি সেটা সফল হলেই বলে থাকি যে কাজটি সার্থক হয়েছে। ইসলামের প্রতিটি আমলের এমনিভাবে আলাদা আলাদা উদ্দেশ্য আছে। যেমন কিছু আমল আছে চরিত্র গঠনের জন্য। নামাজ রোজা ইত্যাদি এ ধরনের প্রশিক্ষণমূলক আমল যা মো‘মেনকে তার জীবনের লক্ষ্য অর্জনের যোগ্যতা প্রদান করে। যখন কেউ সেই যোগ্যতা লাভ করে তখনই তার আমল কবুল হয়েছে বলে ধারণা করা যায়। আর যখন তা থেকে কাক্সিক্ষত ফলাফল পাওয়া যায় না তখন বুঝতে হবে আমল গৃহীত হচ্ছে না। সেই আমল অর্থহীন। সুরা ফোরাকানে ২৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ এই আমলকারীদের কথাই বলেছেন যাদের আমল আল্লাহ বিক্ষিপ্ত ধুলিকণা করে দিবেন। আল্লাহ বলেছেন, নামাজ মানুষকে অন্যায় আর অশ্লীল কাজ থেকে বিরত রাখে। যদি একটি সমাজে লক্ষ লক্ষ নামাজি হওয়া সত্তে¡ও যদি দিনকে দিন অপরাধ বৃদ্ধি পায়, অশ্লীলতার প্রসার ঘটে তাহলে আমরা বুঝতেই পারি যে লক্ষ লক্ষ নামাজির নামাজ কোনো কাজে আসছে না, অর্থাৎ কবুল হচ্ছে না। মনে রাখতে হবে, ইসলামের প্রতিটি আমলের ফলাফল দুই জগতেই পাওয়া যাবে।

তাহলে এখন করণীয় কী? এ সকল আমলই আমাদের জন্য অকল্পনীয় সুখ বয়ে আনতে পারত যদি আমরা ইসলামের মৌলিক বিষয়ের প্রথমটির উপর গুরুত্ব দিতাম। সেই বিষয়টি কী? সেই বিষয়টি হচ্ছে ঈমান, তওহীদ, কলেমা। এই কলেমা মেনে নেয়ার পর একজন মানুষ ইসলামের ঘরে প্রবেশ করে। তখন তার জন্য বিভিন্ন আমল প্রযোজ্য হয়। একটি ছাত্র স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর তার জন্য ঐ স্কুলের সিলেবাস, রুটিন, পরীক্ষা, ড্রেসকোড ইত্যাদি প্রযোজ্য হয়। স্কুলে ভর্তি না হয়ে ওসব কারিকুলামের যতই চর্চা করা হোক কর্তৃপক্ষের কাছে সেসব গৃহীত হবে না। একইভাবে তওহীদের চুক্তিতে আবদ্ধ হওয়ার মাধ্যমে একজন মানুষ মো‘মেন হয়। বংশগতভাবে কেউ মো’মেন বা মুসলিম হয় না। আমাদের সমাজের প্রায় সবাই জন্মসূত্রে মুসলমান। তারা মুসলিম বা মোমেন কাকে বলে এ সংজ্ঞাটিও কোর’আনের আলোকে জানেন না, তারা ধরেই নিয়েছেন যে তারা আল্লাহর দৃষ্টিতে মোমেন মুসলিম হয়েই আছেন। এখন কাজ হচ্ছে নামাজ রোজা ইত্যাদি যত বেশি করা যায়।

অনেকেই ভাবেন আমরা হলাম মুসলিম। যারা একটু বেশি পরহেজগার অর্থাৎ তথাকথিত সুন্নতি লেবাস আর সুরত আছে, আমল আখলাক ভালো, জিকিরে ফিকিরে চলেন তারা হলেন আল্লাহর মো’মেন বান্দা। এজন্য মো’মেন হওয়টা সময়সাপেক্ষ এবং পরিশ্রমের কাজ। তাই তারা একটু বয়স হলে দাড়ি রেখে, লম্বা কোর্তা পরে, ধর্মকর্মে মন দিয়ে মোমেন বান্দা হয়ে যাবেন। কিন্তু তাদের ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। মোমেন হওয়ার সঙ্গে আমলের সম্পর্ক নেই। মো’মেন হওয়া হচ্ছে আমলের পূর্বশর্ত, যেমন করে ওজু নামাজের পূর্বশর্ত। আমল করতে করতে কেউ মোমেন হতে পারে না, বরং মোমেন হওয়ার পরই আসে আমলের প্রশ্ন। আল্লাহ পবিত্র কোর’আনে যে কোনো আমলের নির্দেশ দেওয়ার আগেই বলেছেন, হে মোমেনগণ। যারা মোমেন নন, তাদের জন্য এসব আমলের কোনো প্রয়োজনীয়তা নেই, করলেও তা গৃহীত হবে না।

তাই এখন আমাদের সর্বপ্রথম কর্তব্য হচ্ছে মো’মেন হওয়া। মহান আল্লাহ পবিত্র কোর’আনের বিভিন্ন জায়গায় মো’মেনের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করেছেন কিন্তু মো’মেনের সংজ্ঞা দিয়েছেন শুধু একটি আয়াতে। সুরা হুজরাতের ১৫ নম্বর আয়াতে বলেন, “তারাই মো’মেন যারা আল্লাহ ও তাঁর রসুলের উপর ঈমান আনে ও কোন সন্দেহ পোষণ না করে আল্লাহর রাস্তায় জীবন ও সম্পদ দিয়ে সংগ্রাম করে।” এ সংজ্ঞায় আল্লাহ দুটো বিষয়কে অঙ্গীভূত করেছেন। প্রথমটি হচ্ছে আল্লাহ ও তাঁর রসুলের উপর ঈমান আনা ও পরেরটি হচ্ছে আল্লাহর রাস্তায় জীবন সম্পদ বাজি রেখে সর্বাত্মক সংগ্রাম করা।

প্রথম অংশ অর্থাৎ আল্লাহ ও তাঁর রসুলের উপর ঈমান আনার মাধ্যমে বুঝানো হয়েছে কলেমার উপর ঈমান আনা। কলেমা অর্থাৎ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রসুলাল্লাহ এ কথার উপর ঈমান আনা। বর্তমানে এ কলেমার ভুল অনুবাদ করা হয়। ইলাহার স্থলে বাংলা যেখানে হবে হুকুমদাতা সেখানে মাবুদ বা উপাস্য করা হয়। কিন্তু ইলাহ ও মাবুদ উভয়ই আরবি শব্দ ও একটি আরবি শব্দের বাংলা অনুবাদে আরেকটি আরবী শব্দ ব্যবহার করা সমীচীন নয়। কলেমার উপর বিশ্বাস স্থাপনের মাধ্যমে বান্দা আল্লাহকে জীবনের সর্বস্তরে হুকুমদাতা হিসেবে মেনে নেয়ার অঙ্গীকার করে। ব্যক্তিজীবন, সামাজিকজীবন, রাষ্ট্রীয় জীবন অর্থাৎ সার্বিক জীবনে যেখানে যেখানে আল্লাহর হুকুম রয়েছে সেখানে সেখানে আল্লাহর হুকুম ছাড়া আর কারো হুকুম মানবে না। কিন্তু বর্তমানে আমরা, শুধু আমরা নই গোটা মুসলিম জাতিই, আল্লাহর হুকুম সমূহ শুধু ব্যক্তিজীবনে মানছি কিন্তু রাষ্ট্রজীবন এবং সামাজিক জীবনে মানুষের তৈরি তন্ত্র-মন্ত্র মেনে চলছি। এর ফলে আমরা আল্লাহর সাথে স্পষ্ট শিরক করছি যেই শিরকের গুনাহ আল্লাহ মাফ করবেন না বলে তিনি সে কথা কোর’আনে বেশ কিছু জায়গায় স্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন। কলেমার শেষের অংশ হচ্ছে আল্লাহর রসুলকে শেষ নবী ও রসুল হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া।

দ্বিতীয় অংশে জীবন ও সম্পদ দিয়ে সর্বাত্মক সংগ্রাম অর্থাৎ জেহাদ করার কথা বলা হয়েছে। বর্তমানে ইসলামের ভুল ব্যাখ্যার ফলে অনেকেই জেহাদকে সন্ত্রাসের সাথে গুলিয়ে ফেলেন। ইসলামের সঠিক আকিদা না থাকার ফলে এ ধরনের ভুল হয়। আবার অনেকে ঘরে বসে নিজের নফসের বিরুদ্ধে জেহাদ করাকে বড় জেহাদ মনে করেন কিন্তু সুরা ফোরকানের ৫২ নম্বর আয়াতে আল্লাহ স্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন যে যারা ন্যায়ের বিপক্ষে অবস্থান গ্রহণ করবেন তাদের বিরুদ্ধে জেহাদ করাই হবে বড় জেহাদ। এ সংগ্রাম কোন নির্দিষ্ট ধর্ম, গোত্র বা বিশেষ সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে নয়, এ সংগ্রাম তাদের সকলের বিরুদ্ধে যারা ন্যায়ের বিপক্ষে অন্যায়ের পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করেন। এ সংগ্রাম লেখনী দ্বারা হতে পারে, বক্তব্য দ্বারা হতে পারে। এর চূড়ান্ত পর্যায় হচ্ছে যুদ্ধ যা করার এখতিয়ার শুধু রাষ্ট্রের রয়েছে, কোন ব্যক্তি, আন্দোলন বা গোষ্ঠীর নেই। যদি আল্লাহ সত্যদীন অর্থাৎ ইসলাম প্রতিষ্ঠিত না থাকে তবে তা প্রতিষ্ঠার জন্য সর্বাত্মক সংগ্রাম করতে হবে আর যদি তা প্রতিষ্ঠিত হয় তবে তা রক্ষার জন্য সংগ্রাম বজায় রাখতে হবে। সর্বাত্মক সংগ্রাম করা মো’মেনের জন্য অত্যাবশ্যক।

অনেকের মনেই আরেকটি ধারণা রয়েছে যে মো’মেন ও মুসলিম মূলত একই জিনিস। কিন্তু ও মো’মেন ও মুসলিম মোটেও এক নয়। আল্লাহ পবিত্র কোর’আনে স্পষ্ট বলেছেন যে, “হে মো’মেনগণ, তোমরা আল্লাহ কে যথাযথ ভয় কর ও মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ কর না (সুরা ইমরান ১০২)।” এই একটি আয়াত থেকে স্পষ্ট যে মো’মেন ও মুসলিম এক বিষয় নয়। আরেকটি জিনিসও এখান থেকে স্পষ্ট যে আগে মো’মেন হতে হবে এর পর মুসলিম। মো’মেনরা আল্লাহর বিধান সার্বিক জীবনে প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মুসলিম হবেন। আল্লাহর বিধান প্রতিষ্টার ফলে সার্বিক জীবনে নেমে আসবে শান্তি, ন্যায় ও সুবিচার। অতএব আমাদের এখন সর্বপ্রথম কর্তব্য হচ্ছে মো’মেন হওয়া। মো’মেন হওয়ার পর আমরা এখন যে সকল আমল করছি সে সকল আমলই আমাদের উপকারে আসবে। এ আমলগুলো আমাদের জান্নাতের স্তর বাড়াতে সহায়তা করবে এবং আমাদের ইহকালেও সম্মানিত করবে। মো’মেন না হয়ে আমাদের এ সকল আমল যতই করা হোক সেগুলো কোনো কাজে আসছে না বরং পণ্ডশ্রম হচ্ছে।