অনুষ্ঠান ও কর্মসূচি

মুসলিম উম্মাহর অধঃপতন ও আলেমদের দায়বদ্ধতা

20 Sep, 2026 Admin User 7 ভিউ
মুসলিম উম্মাহর অধঃপতন ও আলেমদের দায়বদ্ধতা

সমকালীন বিশ্বব্যবস্থার দিকে দৃষ্টি দিলে যে নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়, তা বিবেকবান যেকোনো মানুষকে গভীরভাবে আলোড়িত করে। বিশ্বজুড়ে আজ অন্যায়, অবিচার ও বহুমুখী হানাহানির মহোৎসব চলছে। তবে এই বৈশ্বিক সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে সবচেয়ে দুঃখজনক দৃশ্যপট রচনা করছে ‘মুসলমান’ নামের আত্মপরিচয়হীন জনগোষ্ঠীটি। দুনিয়াজুড়ে আজ সংখ্যায় মুসলিমরা প্রায় ১৮০ কোটি। বৈশ্বিক মানচিত্রে তাকালে স্পষ্ট দেখা যায়- তেল, খনিজ সম্পদ আর উর্বর ভূখণ্ডের কোনো ঘাটতি তাদের নেই। অথচ দিনশেষে এই বিশাল ভূরাজনৈতিক শক্তিটিই আজ পরাশক্তিগুলোর কাছে চরম লাঞ্ছিত, অপদস্থ আর অভিভাবকহীন এক জাতিতে পরিণত হয়েছে।

ফিলিস্তিন থেকে কাশ্মীর, আরাকান কিংবা সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যে আজ একই রক্তক্ষরণের দৃশ্য। একের পর এক আগ্রাসনে জনপদগুলো মাটির সাথে মিশে যাচ্ছে; ভূমধ্যসাগরের নোনা পানিতে বেওয়ারিশ লাশ হয়ে ভাসছে মুসলিম শরণার্থীরা। কৃত্রিম দুর্ভিক্ষের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে অনাহারে ধুঁকে মরছে হাজারো বনি আদম। একসময়ের সমৃদ্ধ ও সভ্যতার সূতিকাগার ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়া আর আফগানিস্তানকে পরিণত করা হয়েছে শ্মশানে। গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো। 

অথচ ইতিহাসের পাতায় এই জাতির পরিচয় এমন ছিল না। যে জাতি একসময় মরুঝড়ের গতিতে জেগে উঠে রোমান আর পারস্য সাম্রাজ্যের ভিত্তিমূল কাঁপিয়ে দিয়েছিল, মাত্র পাঁচ লাখের এক অপরাজেয় কাফেলা হয়ে অর্ধ-পৃথিবীতে ন্যায়ের পতাকা উড়িয়েছিল- সেই একই কোর’আন ও হাদিসের উত্তরাধিকারী আজকের ১৮০ কোটির বিশাল জনসংখ্যা কেন সবার দ্বারা লাঞ্ছিত, নিপীড়িত ও পদদলিত?

এই ঐতিহাসিক সংকটের মূল কারণ অনুসন্ধান করলে দেখা যায়- নদীর উৎস দূষিত হলে যেমন তার ভাটির জলও বিষাক্ত হয়ে পড়ে, তেমনি মুসলিম উম্মাহও তার অস্তিত্বের শিকড় ‘তওহীদের সর্বজনীন মর্মবাণী’ হারিয়ে ফেলেছে। স্রষ্টার দেওয়া পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধানকে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক জীবন থেকে নির্বাসনে পাঠিয়ে তারা মানব রচিত মতবাদ ও ঔপনিবেশিক বিধিব্যবস্থাকে আঁকড়ে ধরেছে আছে। অথচ পবিত্র কোর’আনে আল্লাহ মানবরচিত সকল বিধিব্যবস্থার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা ফরজ করে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, তোমরা যুদ্ধ করতে থাকো যতদিন না সকল ফেতনা দূরীভূত হয় এবং শুধু আল্লাহর দেওয়া জীবনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়। (সুরা আনফাল ৩৯)। আর যদি এই উম্মাহ দীন প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম ত্যাগ করে তাহলে তার পরিণতিও তিনি জানিয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন- “যদি তোমরা আল্লাহর রাস্তায় সংগ্রামে বের না হও, তবে তিনি তোমাদের কঠিন শাস্তি দেবেন এবং তোমাদের ওপর অন্য জাতিকে চাপিয়ে দেবেন।” (সুরা তাওবা: ৩৯)

একই সাথে অভ্যন্তরীণ অনৈক্যের বিষয়ে সতর্ক করে বলা হয়েছিল: “তোমরা নিজেদের মধ্যে বিবাদ করো না; তাহলে তোমরা সাহস হারাবে এবং তোমাদের শক্তি নিঃশেষ হয়ে যাবে।” (সুরা আনফাল: ৪৬)

আজ ইতিহাসের পাতায় আল্লাহর এই সতর্কবার্তা অক্ষরে অক্ষরে সত্যে পরিণত হয়েছে। অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও রেষারেষিতে আমাদের জাতীয় শক্তি বিনষ্ট হয়েছে, আল্লাহর দীন প্রতিষ্ঠার জেহাদ পরিত্যক্ত হয়েছে; যার অনিবার্য পরিণতি হিসেবে পশ্চিমা পরাশক্তিগুলোর আধিপত্যের শৃঙ্খল মুসলিম বিশ্বের ওপর চেপে বসেছে।

জাতীয় পরিমণ্ডলে তাকালেও এই সংকটের অভিন্ন রূপ ফুটে ওঠে। কয়েক বছর অন্তর রাজনৈতিক পটপরিবর্তন কিংবা সরকার বদলের পর সংস্কারের নানা আলোচনা হয়। বাহাত্তরের সংবিধান পুনর্লিখন বা সংশোধনের দাবিও ওঠে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই সংবিধানকে সতেরো বার কাটাছেঁড়া করার পর আঠারো বা উনিশতম বার পরিবর্তন করলেও জাতির ভাগ্যের কোনো মৌলিক পরিবর্তন আসবে না। সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা হবে না, দুর্নীতির সিন্ডিকেট ভাঙবে না এবং সাধারণ নাগরিকের জানমালের নিরাপত্তাও নিশ্চিত হবে না। 

এর কারণ, আধুনিক পোস্ট-কলোনিয়াল রাষ্ট্রব্যবস্থার গোড়াপত্তন হয়েছিল ব্রিটিশ বেনিয়াদের হাত ধরে। প্রায় দুইশ বছর ধরে এই অঞ্চলের সম্পদ লুণ্ঠনের পাশাপাশি তারা এমন এক প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো দাঁড় করিয়ে গেছে, যা শোষণকেই প্রতিষ্ঠা করে। ১৯৪৭ সালে তারা ভূখণ্ড ছেড়ে গেলেও তাদের সুদভিত্তিক অর্থনীতি, রোমান-ব্রিটিশ আইনের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা বিচারব্যবস্থা এবং গণবিরোধী আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থা অক্ষুণ্ন রয়ে গেছে। দীর্ঘ কয়েক দশকে কেবল শাসকের মুখ পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু কাঠামোগত পরাধীনতার শিকল ভাঙেনি। 

পবিত্র কোর’আনের সুরা বাকারার ৮৫ নম্বর আয়াতে এই ধরনের দ্বিচারিতা সম্পর্কে কঠোর প্রশ্ন তোলা হয়েছে- মানুষ কি কিতাবের কিছু অংশ মানবে আর কিছু অংশ অগ্রাহ্য করবে? যারা এমনটি করে, তাদের পরিণতি পার্থিব জীবনে চরম লাঞ্ছনা এবং পরকালে কঠিনতম শাস্তি। আজকের মুসলিম সমাজ যেন নিজেদের অজ্ঞাতেই সেই পরিণতিকে বরণ করে নিয়েছে। ব্যক্তিগত নামাজ-রোজার ক্ষেত্রে ধর্মীয় আনুগত্য দেখানো হলেও আদালত, অর্থনীতি, আইন ও রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে ঔপনিবেশিক প্রভুদের রেখে যাওয়া ব্যবস্থার অন্ধ অনুকরণই যেন চূড়ান্ত নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই সামগ্রিক পতনের জন্য সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক দায় বর্তায় আলেম সমাজের ওপর। সাধারণ জনসমাজ ধর্মগ্রন্থ ও আইনের জটিল তাত্ত্বিক দিকগুলো গভীরভাবে বিশ্লেষণ করতে পারে না; তারা আলেমদের নির্দেশনার ওপর আস্থা রাখে। আলেমরা সমাজে নামাজ পরিচালনা করেন, দোয়া মোনাজাত করেন এবং ধর্মীয় দিকনির্দেশনা দেন। কিন্তু নির্মম সত্য হলো, বহিরাগত শত্রুর আগ্রাসনের চেয়েও সমাজকে ভেতর থেকে বেশি দুর্বল করে দিয়েছে আমাদের আলেমদের নির্লিপ্ততা, আপসকামী দৃষ্টিভঙ্গি এবং দীনকে পার্থিব উপার্জনের হাতিয়ারে পরিণত করার মানসিকতা।

ধর্মের বাণিজ্যিকীকরণ ও পার্থিব স্বার্থের অনুপ্রবেশ

বর্তমান সমাজের অন্যতম ব্যাধি হলো ধর্মব্যবসা। ধর্ম কোনো কেনাবেচার পণ্য নয় এবং এটি কারও বৈষয়িক রুটি-রুজির দোকান হতে পারে না। পবিত্র কোর’আনে আল্লাহ এই বিষয়ে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় ঘোষণা করেছেন: “যারা আল্লাহর নাজেল করা কিতাব গোপন করে এবং বিনিময়ে তুচ্ছ মূল্য গ্রহণ করে, তারা কেবল তাদের পেটে আগুন ছাড়া আর কিছুই ভরছে না। কেয়ামতের দিন আল্লাহ তাদের সাথে কথাও বলবেন না, তাদের পবিত্রও করবেন না; বরং তাদের জন্য রয়েছে ভয়ংকর আজাব।” (সুরা বাকারা: ১৭৪)

সুরা ইয়াসীনের ২১ নম্বর আয়াতেও সুস্পষ্ট পথনির্দেশ দেওয়া হয়েছে: “তোমরা তাদেরই অনুসরণ করো, যারা তোমাদের কাছে কোনো বিনিময় চায় না এবং যারা সঠিক পথে প্রতিষ্ঠিত।”

অথচ আজকের বাস্তবতা হতাশাজনক। আজান দেওয়া, নামাজ পড়ানোসহ বিভিন্ন ধর্মীয় কাজ, মিলাদ, জানাজা থেকে শুরু করে কোর’আন তিলাওয়াত, তাফসির ও দোয়া মাহফিল আজ পেশাদার চুক্তির বিষয়ে পরিণত হয়েছে। কোন বক্তা ঘণ্টায় কত অর্থ দাবি করবেন, তার আগাম চুক্তিপত্র সই হচ্ছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) স্পষ্ট সতর্ক করেছিলেন যে, হারাম উপার্জনে যার শরীর পুষ্ট হয়, তার দোয়া আল্লাহর দরবারে কবুল হয় না। অতএব, ধর্মব্যবসার এই অপসংস্কৃতি দূর না হওয়া পর্যন্ত ওয়াজ-নসিহত দিয়ে সমাজে কোনো নৈতিক পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়।

ঐতিহাসিক ভবিষ্যদ্বাণী ও অভ্যন্তরীণ বিভক্তি

হাদিস শরিফে আখেরী যামানার সংকট সম্পর্কে আলী (রা.) থেকে বর্ণিত যে বিবরণ এসেছে, তার সাথে সমকালীন বাস্তবতার বিস্ময়কর সাদৃশ্য পাওয়া যায়। সেখানে উল্লেখ আছে- এমন এক সময় আসবে যখন ইসলামের শুধু নাম থাকবে, কোর’আনের শুধু অক্ষর থাকবে, মসজিদগুলো হবে চাকচিক্যময় ও লোকে লোকারণ্য, কিন্তু সেখানে হেদায়াহ থাকবে না। এই উম্মাহর আলেমরা হবে আসমানের নিচে নিকৃষ্টতম জীবন। তারা ফেতনা সৃষ্টি করবে এবং সেই ফেতনা তাদের দিকেই ধাবিত হবে। (বায়হাকি ও মেশকাত)। 

আজকের আধুনিক মসজিদগুলো দেখুন। শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, সোনালী গম্বুজ, টাইলস, ঝাড়বাতি, মার্বেল পাথরের চাকচিক্য থাকলেও সেই মিম্বরগুলো থেকে সমাজে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব ও তাঁর দেওয়া জীবনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার আহ্বান ওঠে না। সেখানে ধর্মকে নিছক কিছু আনুষ্ঠানিকতার গণ্ডিতে আটকে রাখা হয়েছে। ফলে ব্যক্তিজীবনে সুদ, ঘুষ, মিথ্যা সাক্ষ্য কিংবা অন্যায়ের সাথে আপসকারী ব্যক্তিও মসজিদে এসে কোনো আত্মগ্লানি ছাড়াই প্রথম কাতারে দাঁড়িয়ে যায়। আর যারা এসব মসজিদে ইমামতি করছেন তারাও নিজেদের এবাদত ও আমলকে টাকার বিনিময়ে বিক্রি করছেন যা আল্লাহ হারাম করেছেন। 

অন্যদিকে, আলেম সমাজের বাহাসপ্রীতি ও সংকীর্ণতা উম্মাহকে খণ্ডবিখণ্ড করে ফেলেছে। গত কয়েক শতাব্দী ধরে শিয়া, সুন্নী, হানাফী, শাফেয়ী, মালেকী, হাম্বলী, আহলে হাদিস কিংবা সালাফী ধারার মতো নানা পরিচয়ে মুসলিম সমাজকে টুকরো টুকরো করা হয়েছে। নামাজে হাত কোথায় বাঁধা হবে, আমিন জোরে বলবে না আস্তে বলবে, কোন দোয়ার কী ফজিলত এসব খুটিনাটি মাসলা-মাসায়েল নিয়ে কোটি কোটি পৃষ্ঠার বই লেখা হয়েছে। তুচ্ছ বিষয়কে কেন্দ্র করে একে অপরকে ‘কাফের’ বা ‘জাহান্নামী’ ফতোয়া দেওয়া হচ্ছে যা এই জাতিকে শতধাবিভক্ত করে দিচ্ছে।

ঔপনিবেশিক মাদ্রাসাশিক্ষার ষড়যন্ত্র

আমরা আজ কওমি বা আলিয়া যে মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থা দেখছি, একটু ইতিহাসের দিকে তাকালেই বোঝা যায় এর শিকড় আসলে কোথায়। অনেকে ভাবেন এটা হয়তো রাসুলুল্লাহ (সা.) কিংবা খোলাফায়ে রাশেদীনের আমলের জ্ঞানচর্চার ধারাবাহিকতা, আসলে কিন্তু তা নয়। আজকের এই কাঠামোর পেছনে ছিল ব্রিটিশদের এক সুদূরপ্রসারী চাল। 

১৭৮০ সালে লর্ড ওয়ারেন হেসটিংস যখন কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসা বানালেন, তারপর থেকে ১৯২৭ সাল পর্যন্ত টানা ১৪৬ বছর এই প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেছেন ইংরেজরা। এই মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল ছিলেন পর পর ২৬ জন ব্রিটিশ খ্রিস্টান পণ্ডিত। ভাবা যায়? যে ইংরেজরা তিতুমীর আর হাজী শরীয়তুল্লাহর আন্দোলনকে নির্মমভাবে গুঁড়িয়ে দিয়েছিল, তারা হঠাৎ ইসলামকে ভালোবেসে সরকারি খরচে মাদ্রাসা চালাতে যাবে কেন? উদ্দেশ্য পরিষ্কার, মুসলমানদের ভেতরের দীন প্রতিষ্ঠার চেতনা আর জেহাদের আগুনটা ভেতর থেকে নিভিয়ে দেওয়া।

তারা এমন এক সিলেবাস বানিয়ে দিল, যেখান থেকে রাষ্ট্র পরিচালনা, অর্থনীতি, বিজ্ঞান আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রামের শিক্ষাকে পুরোপুরি বাদ দেওয়া হলো। সেখানে জায়গা পেল কেবল ব্যক্তিগত আচার-অনুষ্ঠান আর খুঁটিনাটি চুলচেরা মাসলা-মাসায়েল। ব্রিটিশদের টার্গেট ছিল এমন একদল আলেম তৈরি করা, যারা সারাদিন নিজেদের মধ্যে ছোটখাটো ফতোয়া নিয়ে বাহাস করবে, কিন্তু রাষ্ট্রক্ষমতা বা ব্রিটিশদের শাসন নিয়ে টুঁ শব্দটিও করবে না।

ফল যা হওয়ার তাই হয়েছে। আধুনিক বিজ্ঞান, রাজনীতি ও প্রযুক্তি থেকে দূরে সরিয়ে দিয়ে এই শিক্ষাব্যবস্থা আলেমদেরকে নেতৃত্বের আসন থেকে নামিয়ে পরনির্ভরশীল গোষ্ঠীতে পরিণত করেছে। দুঃখের বিষয় হলো, ইংরেজরা চলে গেছে ঠিকই, কিন্তু তাদের চাপিয়ে দেওয়া সেই ডাইস আজও বদলায়নি। আর সেই খেসারত দিতে গিয়ে আধুনিক বিশ্বের চ্যালেঞ্জগুলোর সামনে পুরো মুসলিম জনগোষ্ঠী ব্যর্থ হচ্ছে। 

ধর্ম নিয়ে রাজনীতি ও ভারসাম্যহীন সুফিবাদ

একই সাথে ইসলামি রাজনীতির সাথে যুক্ত আলেম সমাজের ভূমিকাও আজ গভীর প্রশ্নের মুখে। প্রচলিত গণতান্ত্রিক নির্বাচন আর ক্ষমতার রাজনীতির পেছনে ছুটতে গিয়ে অনেকেই নিজেদের মূল নীতি ও তাকওয়া বিসর্জন দিচ্ছেন। ক্ষমতায় যাওয়ার অসুস্থ প্রতিযোগিতায় আপস করার ফলে পুরো ধর্মীয় আদর্শই আজ জনমানসে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। আবার অন্য প্রান্তে কেউ কেউ উগ্রতার পথ বেছে নিচ্ছেন, যার সুযোগ নিয়ে বিশ্বমঞ্চে ইসলামের গায়ে সন্ত্রাসের তকমা এঁটে দেওয়া সাম্রাজ্যবাদীদের জন্য আরও সহজ হচ্ছে। অথচ মক্কার কুরাইশরা যখন রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে রাষ্ট্রক্ষমতা ও বিপুল সম্পদের প্রস্তাব দিয়েছিল, তিনি আদর্শ জলাঞ্জলি দিয়ে সেই সমঝোতায় যাননি। অতএব, ত্রুটিপূর্ণ রাজনৈতিক কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে দ্বীন প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখা বালির ওপর প্রাসাদ নির্মাণের নামান্তর।

অন্যদিকে আধ্যাত্মিক সাধনা ও তাসাউফের অঙ্গনে থাকা পীর-মাশায়েখ ও দরবারগুলোর ভূমিকাও বর্তমান সংকটে দৃশ্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে। আত্মশুদ্ধির চর্চা নিঃসন্দেহে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু ইসলাম কেবল চার দেয়ালের ভেতর চোখ বুজে জিকির করার কোনো বৈরাগ্যবাদী দর্শন নয়। রাসুল (সা.) কিংবা তাঁর সাহাবিরা সমাজবিচ্ছিন্ন হয়ে সংসার ত্যাগ করেননি; বরং সামাজিক সুবিচার প্রতিষ্ঠা ও অন্যায়ের প্রতিরোধে ময়দানে জীবন বাজি রেখেছেন। অথচ আজ যখন সমাজে অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে, নীতিহীনতা বাড়ছে কিংবা ধর্মীয় উগ্রতা মাথাচাড়া দিচ্ছে, তখন লাখ লাখ অনুসারী থাকা সত্ত্বেও খানকা ও দরবারগুলো কার্যকর কোনো সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারছে না। প্রতিরোধ তো দূরের কথা, উগ্রগোষ্ঠীর ধারাবাহিক হামলার মুখে তারা আজ নিজেদের আস্তানা ও ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলোর নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে পারছে না। ধর্মীয় জীবনকে কেবল বার্ষিক ওরশ আর আনুষ্ঠানিক জিকির-আজকারের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ করে রাখলে জাতির  পতন ও বিপর্যয় কিছুতেই ঠেকানো সম্ভব নয়। 

আলেম চেনার আসল মাপকাঠি

আসল আলেম আসলে কে? নামের আগে-পিছে লম্বা লম্বা উপাধি আর ডিগ্রি থাকলেই আল্লাহর কাছে আলেম হওয়া যায় না। সুরা ফাতিরের ২৮ নম্বর আয়াতে আল্লাহ পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন, বান্দাদের মধ্যে কেবল জ্ঞানীরাই তাঁকে ভয় করে।

প্রকৃত আলেম তিনিই, যাঁর মনে শুধু আল্লাহর ভয় থাকবে। যাঁর ভেতর এই ভয় সত্যি থাকে, তিনি দুনিয়ার কোনো পরাশক্তি, অন্যায় ব্যবস্থা বা শাসকের রক্তচক্ষু তোয়াক্কা করেন না। আবু হুরায়রা (রা.)-এর হাদিসটা মনে রাখা দরকার, কেয়ামতের দিন সবার আগে যাদের বিচারের মুখোমুখি করা হবে, তাদের একজন সেই আলেম, যে মানুষের বাহবা আর নাম কামানোর জন্য জ্ঞান চর্চা করেছিল। তাই অহংকার আর পদের বড়াই বাদ দিয়ে আধুনিক বিজ্ঞান, ভূরাজনীতি আর রাষ্ট্রচিন্তার সাথে দ্বীনি জ্ঞানের সমন্বয় ঘটানোই একজন সত্যনিষ্ঠ আলেমের আসল পরিচয়।

বাঁচার পথ 

সব দলাদলি আর অপপ্রচার ছেড়ে এখন রূঢ় সত্যের মুখোমুখি হওয়ার সময়। তওহীদের ডাক নতুন কোনো মতবাদ নয়, নতুন কোনো ফেরকা নয়, এটা ইসলামের মূল সত্যের দিকে ফিরে আসার ডাক। আর যেকোনো কথা শুনেই হুজুগে না মেতে যাচাই-বাছাই করার যে তাগিদ সুরা হুজরাতে দেওয়া হয়েছে, তা মানা এখন আলেমদের জন্য সবচেয়ে জরুরি।

‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’-এর সোজা অর্থ হলো, জীবনের কোনো ব্যাপারেই আল্লাহ ছাড়া আর কারও বিধান বা আইনকে চূড়ান্ত না মানা। পশ্চিমা বস্তুবাদী চিন্তার বাইরে এসে কোরআনের বুনিয়াদেই পুরো জাতিকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। আমাদের পায়ের তলার মাটি দ্রুত সরে যাচ্ছে। বিশ্বরাজনীতিতে মুসলমানদেরকে একেবারে কোণঠাসা করে ফেলা হয়েছে। এখনও যদি কওমি-আলিয়া, দেওবন্দী-বেরেলভী কিংবা দল আর মাজহাবের দেয়াল ভেঙে তওহীদের পতাকাতলে এক হতে না পারি, আল্লাহর ক্রোধ, গজব কাউকে মাফ করবে না। সেই আগুনে মাদ্রাসাও ছারখার হবে, খানকার অস্তিত্বও মুছে যাবে। চোখ খুলে ফিলিস্তিন, ইরাক, সিরিয়া, আর আফগানিস্তানের দিকে তাকান; আজকের দুনিয়ায় এর চেয়ে বড় প্রমাণ আর কী হতে পারে? 

তাই সংখ্যার আস্ফালন, পরস্পরের বিরুদ্ধে হামলা, হুমকি, উস্কানি ও ফতোয়াবাজি এবার বন্ধ করুন। আপনাদের এই অনৈক্যগুলো নিতান্তই গৌণ ও অপ্রয়োজনীয় বিষয়কে কেন্দ্র করে। এটা উপলব্ধি করুন যে, এই জাতি কোর’আনকেই তাদের জাতীয় ও রাষ্ট্রীয় জীবন থেকে বাদ দিয়েছে। আল্লাহ বলেছেন, যারা আল্লাহর হুকুম অনুযায়ী বিচার-ফয়সালা করে না, তারা কাফের, জালেম, ফাসেক (সুরা মায়েদা ৪৪, ৪৫, ৪৭)।

যেখানে কোর’আনের স্পষ্ট হুকুম অস্বীকার করলে ঈমানই থাকে না, মুসলিমই থাকা যায় না, সেখানে অন্যান্য বিষয়ে মতবিরোধ করা অবান্তর। জাতির ক্রান্তিকালে একজন নেতার নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ হয়ে আগে দীন কায়েমের সংগ্রামে নামুন। আল্লাহ তো পরিষ্কার বলে দিয়েছেন, তোমরা মতভেদ করো না, দ্বীন কায়েম করো (সুরা শুরা ১৩)। তাই নিজেদের মধ্যে এই আত্মঘাতী সংঘাত বন্ধ করে আল্লাহর সার্বভৌমত্বভিত্তিক দীন কায়েম করাই আজ আমাদের বাঁচার একমাত্র রাস্তা।

 

মন্তব্য সমূহ (0)

বর্তমানে কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!

আপনার মতামত দিন

ক্যাটাগরি সমূহ
আকিদা ও আদর্শ 0 হামলা 0 আদর্শিক ও ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি 1628 লাইভ আপডেট 5 সেবামূলক ও সচেতনতা কার্যক্রম 8 অনুষ্ঠান ও কর্মসূচি 188 অপপ্রচারের জবাব ও আইনি লড়াই 102 নির্যাতনের ইতিহাস ও মানবাধিকার 19 কার্যক্রমের অনুমোদন ও বৈধতা 29 নিবন্ধ ও সম্পাদকীয় 122 English Articles 1 সাধারণ আলোচনা 89 প্রেস রিলিজ ও বিবৃতি 9 সাংস্কৃতিক নীতিমালা 25 সাংস্কৃতিক চর্চা 18 আমাদের নারী নীতি 31 নারী বিষয়ক কার্যক্রম 24 মসজিদভিত্তিক কার্যক্রম 15 ঈদের জামাত 13 উন্নয়ন কর্মকাণ্ড 20 সভা সমাবেশ 60 সর্বধর্মীয় অনুষ্ঠান 16 সংবাদ সম্মেলন ও স্মারকলিপি 45 জেলা ও কার্যালয় উদ্বোধন 32 ইফতার মাহফিল 26 প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ও জাতীয় দিবস উদযাপন 6 ছাত্র ও যুব সম্মেলন 4