সকল নবী-রসুল যে বালাগ দিয়েছেন

Untitled-4রিয়াদুল হাসান

আল্লাহ আদম (আ.) থেকে শুরু করে শেষ নবী মোহাম্মদ (সা.) পর্যন্ত যত নবী ও রসুল পৃথিবীর বিভিন্ন মানব সম্প্রদায়ের প্রতি প্রেরণ করেছেন তাদের প্রত্যেকের প্রতি একটি অভিন্ন দায়িত্ব অর্পণ করেছেন, তা হলো বালাগ। নবী ও রসুলগণ প্রত্যেকে তাঁদের স্ব স্ব সম্প্রদায়কে বলেছেন, “আমাদের দায়িত্ব তো কেবল সুস্পষ্টভাবে সংবাদ পৌঁছে দেয়া” (সুরা ইয়াসীন ১৭)। এখানে আল্লাহ শব্দ ব্যবহার করেছেন “বালাগুল মুবিন” যার অর্থ সুস্পষ্টভাবে পৌঁছানো। সুতরাং আল্লাহর পক্ষ থেকে কোনো কিছুর সংবাদ পরিষ্কারভাবে পৌঁছে দেওয়াই ছিল নবী-রসুলদের একমাত্র কাজ, কে সেটা গ্রহণ করবে আর কে প্রত্যাখ্যান করবে সেটা তাদের বিবেচ্য বিষয় নয়, সেটা আল্লাহর এখতিয়ারভুক্ত।

ইসলামের বালাগ কাদের প্রতি:

মক্কার ১৩ বছরের জীবনে রসুলাল্লাহ ও তাঁর সঙ্গীরা কাফের মুশরিকদেরকে সালাহ, সওম ইত্যাদি কোনো আমলের দিকে আহ্বান করেন নি, তাঁরা আহ্বান করেছেন কেবল কলেমার দিকে, তওহীদের দিকে। অনেকে মনে করেন মক্কার সেই কাফেরদের আল্লাহর প্রতি এবং আল্লাহর একত্বের প্রতি ঈমান ছিল না। এ ধারণাটি সঠিক নয়। সেই মুশরিকরাও আল্লাহর একত্বে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করত, কিন্তু তারা আল্লাহর হুকুম, বিধান মানতো না অর্থাৎ তারা আল্লাহর আনুগত্য করত না। তখনকার আরবরা বিশ্বাস করত যে তারা আল্লাহর নবী ইব্রাহিমের (আ.) উম্মাহ। তারা আল্লাহকে সৃষ্টিকর্তা বলে, পালনকারী বলে বিশ্বাস করত, নামাজ পড়ত, কাবা শরীফকে আল্লাহর ঘর বলে বিশ্বাস করত, ঐ কাবাকে কেন্দ্র করে বাৎসরিক হজ্ব করত, কোরবানি করত, রোজা রাখত, আল্লাহর নামে কসম করত, এমনকি খাৎনাও করত। শুধু তাই নয়, প্রয়োজনীয় দলিল, বিয়ে শাদীর কাবিন ইত্যাদি সমস্ত কিছু লেখার আগে আমরা যেমন ‘বিসমিল্লাহ’ লেখি তেমনি তারাও আল্লাহর নাম লিখত। আরবের মুশরিকরা যে আমাদের মতোই আল্লাহয় বিশ্বাসী ছিল এ কথার সাক্ষ্য দিচ্ছেন স্বয়ং আল্লাহ। কোর’আনে তিনি তাঁর রসুলকে বলছেন- তুমি যদি তাদের জিজ্ঞাসা করো, আসমান ও যমীন কে সৃষ্টি করেছেন? তবে তারা অবশ্যই জবাব দেবে- সেই সর্বশক্তিমান, মহাজ্ঞানী (আল্লাহ) (সুরা যুখরুফ- ৯)। অন্যত্র বলেছেন- তুমি যদি তাদের প্রশ্ন করো আসমান ও যমীন কে সৃষ্টি করেছেন এবং কে সূর্য ও চন্দ্রকে তাদের (কর্তব্য কাজে) নিয়োজিত ও নিয়ন্ত্রণ করছেন, তবে তারা নিশ্চয়ই জবাব দেবে- আল্লাহ (সুরা আনকাবুত- ৬১)।
এমন আরও অনেকগুলি আয়াত এবং ইতিহাস থেকে দেখা যায় সেই মুশরিকদের আল্লাহর অস্তিত্ব ও একত্বের ওপর ঈমান ছিল। তারা মূর্তিপূজা করত ঠিকই কিন্তু ওগুলোকে তারা স্রষ্টা বলে মানতো না। তারা বিশ্বাস করত যে ঐ দেব-দেবীকে মানলে, ওগুলোর পূজা করলে তাদের জন্য ঐ দেব-দেবীরা আল্লাহর কাছেই সুপারিশ করবে (সুরা ইউনুস- ১৮, সুরা যুমার ৩)। এত ঈমান সত্ত্বেও তারা কাফের ছিল কারণ তারা তাদের ব্যক্তিগত, সামাজিক ও সামষ্টিক জীবন নিজেদের মনগড়া নিয়ম-কানুন দিয়ে পরিচালনা করত। যেহেতু তারা আল্লাহর প্রদত্ত হুকুম মানতো না, তাই তাদের ঐ ঈমান ছিল অর্থহীন, নিষ্ফল এবং স্বভাবতই আল্লাহর হুকুম না মানার পরিণতিতে তাদের সমাজ অন্যায়, অত্যাচার, অবিচার, নিরাপত্তাহীনতা, সংঘর্ষ ও রক্তপাতে পরিপূর্ণ ছিল। ঠিক আজকেও আল্লাহর প্রতি আমাদের পূর্ণ বিশ্বাস থাকলেও আল্লাহর হুকুম, আইন, বিধান অমান্য করার ফলে আমাদের সমসাময়িক পৃথিবীও চরম অন্যায় ও অশান্তিতে পরিপূর্ণ হয়ে আছে।
একইভাবে বর্তমানে ‘মুসলিম’ বলে পরিচিত জনসংখ্যাটি তদানীন্তন আরবের মানুষের মতোই আল্লাহকে মনে প্রাণে বিশ্বাস করে, তাকে স্রষ্টা বলে, জীবন-মরণের প্রভু বলে মানে, কিন্তু আরবের ঐ মুশরিকদের মতই তাঁর দেয়া দীন, জীবন-বিধান মোতাবেক সমষ্টিগত, জাতীয় জীবন পরিচালনা করে না। আরবের মুশরিকরা দেব-দেবীর পুরোহিতদের দেয়া বিধান অনুযায়ী তাদের জাতীয় জীবন পরিচালনা করত, বর্তমানের মুসলিম দুনিয়া নতুন দেব-দেবী গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্ম-নিরপেক্ষতা, রাজতন্ত্র, একনায়কতন্ত্রের পুরোহিত পাশ্চাত্যদের তৈরি করা জীবন-বিধান অনুযায়ী তাদের জাতীয় জীবন পরিচালনা করছে। তফাৎ শুধু এইটুকু যে আরবদের হাবল, লা’ত, মানাতের মূর্তিগুলি ছিল কাঠ এবং পাথর দিয়ে তৈরি, বর্তমানের মূর্তিগুলি কাঠ পাথরের নয়, তন্ত্রের মূর্তি। বরং এই তন্ত্রের মূর্তিগুলোর পূজা ঐ কাঠ পাথরের মূর্তিপূজার চেয়েও বড় র্শেক ও কুফর। তাহলে বিশ্বনবী যাদের মধ্যে আবির্ভুত হয়েছিলেন আরবের সেই আল্লাহয় বিশ্বাসী অথচ মুশরিক কাফেরদের সঙ্গে বর্তমানের আল্লাহয় বিশ্বাসী এই ‘মুসলিম’ জনসংখ্যার তফাৎ কোথায়? এজন্যই আল্লাহর রসুল মক্কার ঐ আল্লাহ-বিশ্বাসী কাফের মুশরিকদেরকে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব অর্থাৎ তওহীদের বালাগ দিয়েছিলেন, আর বর্তমানের এই মুসলিম নামধারী জাতিটিকেও এখন তওহীদের বালাগ তথা কলেমার বালাগ দিতে হবে।
তওহীদের বালাগ চিরন্তন:

আল্লাহ শেষ রসুলকে (সা.) বলছেন, ‘আপনার পূর্বে আমি যে রসুলই প্রেরণ করেছি, তাকে এ আদেশই প্রেরণ করেছি যে, আমি ব্যতীত অন্য কোনো ইলাহ (সার্বভৌমত্বের মালিক বা হুকুমদাতা) নেই (সুরা আম্বিয়া ২৫)। অর্থাৎ সকল নবী ও রসুলগণের বালাগ ছিল ‘লা- ইলাহা ইল্লাল্লাহ’র প্রতি অর্থাৎ তওহীদের প্রতি। আল্লাহ ছাড়া জগতের সকল বিধানদাতা, হুকুমদাতা, সার্বভৌম অস্তিত্বকে অস্বীকার করাই হচ্ছে তওহীদ, এটাই এই দীনের ভিত্তি। সংক্ষেপে এর মর্মার্থ হচ্ছে আমি জীবনের প্রতিটি বিষয়ে যেখানেই আল্লাহ ও তাঁর রসুলের কোনো বক্তব্য আছে সেটা ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, আইন-কানুন, দ-বিধি যে বিভাগেই হোক না কেন, সেই ব্যাপারে আমি আর কারও নির্দেশ মানি না। যে বিষয়ে আল্লাহ অথবা তাঁর রসুলের কোনো বক্তব্য নেই সে বিষয়ে আমরা স্বাধীনভাবে যে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারি। বর্তমান দুনিয়ার কোথাও এই তওহীদ নেই, সর্বত্র আল্লাহকে কেবল উপাস্য বা মা’বুদ হিসাবে মানা হচ্ছে, কিন্তু ইলাহ বা সার্বভৌমত্বের আসনে আল্লাহ নেই। মানুষ নিজেই এখন নিজের জীবনব্যবস্থা তৈরি করে সেই মোতাবেক জীবন চালাচ্ছে, মানুষ নিজেই এখন ইলাহ অর্থাৎ বিধাতার আসনে আসীন। আজ মানুষের তৈরি জীবন-ব্যবস্থাগুলিকেই (দীন) মানবজীবনের সকল সমস্যার যুগোপযোগী সমাধান হিসাবে মনে করা হচ্ছে যদিও সেগুলির সবই মানুষকে শান্তি দিতে চরমভাবে ব্যর্থ। বর্তমান দুনিয়ার সীমাহীন মারামারি, কাটাকাটি, রক্তপাত, অনাচারই এই ব্যবস্থাগুলির ব্যর্থতার যথেষ্ট প্রমাণ।
সূর্য যখন উদিত হয় কোনোকিছু দিয়েই তার আলোকে আড়াল করে রাখা যায় না, তেমনি আল্লাহর প্রকৃত ইসলাম, সত্যদীনকেও ঢেকে রাখা যাবে না, এর আলো উদ্ভাসিত হবেই হবে। সত্যসন্ধানী মানুষেরা এখন আল্লাহর দয়ায় একটু একটু করে বুঝতে পারছেন যে তওহীদের এই বালাগ আল্লাহর রসুলের সেই সত্যদীনের বালাগ যা মানবজাতিকে অন্যায়-অশান্তি থেকে মুক্ত করে শান্তির জীবন উপহার দেবে।
কলেমার বাণীকে কেবল যেকেরের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে আল্লাহকে একমাত্র ইলাহ হিসাবে মেনে নিয়ে মানবজাতির মধ্য থেকে সর্বপ্রকার অন্যায়-অশান্তি, অবিচার লুপ্ত করে পৃথিবীকে একটি শান্তিময় জান্নাতের বাগানে পরিণত করার সময় এখনই।

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ