যদি প্রকৃত উম্মতে মোহাম্মদী এ যুগে আসতেন

রিয়াদুল হাসান:

কল্পনা করা যাক যে ছোট্ট জাতিটি বিশ্বনবীর (সা.) সঙ্গে থেকে তাঁকে আল্লাহর দেয়া দায়িত্ব পালন করতে জানমাল দিয়ে সাহায্য করল তাঁর সঙ্গে থেকে তাঁর কাছ থেকে সরাসরি এই দীন শিক্ষা করল, ঐ দীনের প্রাণ কোথায়, দেহ কোথায়, উদ্দেশ্য কী, সেই উদ্দেশ্য অর্জন করার প্রক্রিয়া কী এসব বুঝল এবং হৃদয়ঙ্গম করল এবং তাঁর (সা.) পৃথিবী থেকে চলে যাবার পর তাদের নেতার আনা জীবন ব্যবস্থা পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠার জন্য তাদের সব কিছু ছেড়ে বের হয়ে পড়ল ও তদানীন্তন দুনিয়ার দুইটি মহাশক্তিকে এক এক করে নয়, একই সঙ্গে পরাজিত করে আটলান্টিকের উপকূল থেকে চীন সীমান্ত পর্যন্ত এই দীন প্রতিষ্ঠা করে মানুষের জীবনে নিরাপত্তা, ন্যায় ও সুবিচার প্রতিষ্ঠা করল, এক মহা সভ্যতার জন্ম দিল- এই জাতিটাকে যদি কোনো মন্ত্র বলে আজকের পৃথিবীতে কিছুক্ষণের জন্য ফিরিয়ে আনা যায় তবে কী হবে? ঠিক কি হবে তা সম্পূর্ণ করে কেউ বলতে পারবে না, তবে কয়েকটি জিনিস যে হবে তা অনুমান করা যায়।
প্রথমত: তারা বিস্ময় বিস্ফোরিত চোখে বর্তমান পৃথিবীটাকে দেখবেন এবং আমাদের যখন তাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়া হবে তাদের উত্তরসূরী বলে তখন আমরা বর্তমান দুনিয়াটা তাদের ঘুরিয়ে দেখাব। আমাদের কোটি কোটি টাকার জাঁকজমকপূর্ণ মসজিদগুলো দেখে তারা চোখ বড় বড় করে বলবেন, সোবহান আল্লাহ, আমাদের খেজুর পাতার ছাদ আর মাটির মেঝের মসজিদগুলোর চেয়ে তোমাদের মসজিদগুলি কত সুন্দর, কত শান-শওকতওয়ালা, রাজপ্রাসাদকেও হার মানায়। তারা প্রশ্ন করবেন, তোমরা এখন পৃথিবীতে সংখ্যায় কত? আমরা বুক ফুলিয়ে জবাব দেব তা প্রায় একশ’ ষাট কোটির মতো। তারা বিস্মিত হয়ে বলবেন, মাশা’আল্লাহ, কিন্তু আমরা চার পাঁচ লাখ হয়ে ৬০/৭০ বছরের মধ্যে অর্ধেক পৃথিবীতে আল্লাহর দেয়া দীন প্রতিষ্ঠা করেছিলাম আর চৌদ্দশ’ বছর হয়ে গেল তোমরা একশ’ ষাট কোটি হয়েও তার চেয়ে বেশি এগুতে পার নি দেখছি। আমরা তাদের সামনে গত বারশ’ বছরে যে সব জ্ঞানগর্ভ ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের বই কেতাব লিখেছি তা রাখতে আরম্ভ করব। ক্রমে ক্রমে তা পর্বতের চেয়ে উঁচু হয়ে যাবে। শেষে ঐ চার পাঁচ লাখ মানুষ ঢাকা পড়ার উপক্রম হলে তারা ভয়ে চেঁচিয়ে উঠবেন, থাম থাম। এগুলো কিসের বই? আমরা আবারও বুক ফুলিয়ে জবাব দেব, এক কথায় এর জবাব দেয়া সম্ভব নয়। একটা পাহাড় সমান কেতাবের স্তূপ দেখিয়ে বোলব- এগুলো হচ্ছে ফেকাহ। তারা বিস্মিত হয়ে বলবেন ফেকাহ? এ এত বিরাট হলো কি করে? ফেকাহকে আমরা কেমন করে কত পরিশ্রম করে এত বিরাট করেছি তা তাদের ভাল করে বুঝিয়ে দেবার পর তারা প্রশ্ন করবেন, ঐ স্তূপগুলো কি? আমরা বুঝিয়ে দেব ওগুলো হাদিসের কেতাব। তারা আবার বিস্মিত হয়ে বলবেন, মাশা’আল্লাহ! এতো হাদিস তোমরা সংগ্রহ করেছ। আমাদের তো হাদিসের কোনো বইই ছিল না। ঐগুলি কি? আমরা তাদের অজ্ঞতা দেখে করুণা করে তাদের বুঝিয়ে দেব, ঐ বইয়ের পর্বত হচ্ছে কোর’আনের তফসীরের, ঐ পর্বত হচ্ছে দীনিয়াতের, ঐ পাহাড় উসুলে ফেকাহর, ঐ পাহাড় উসুলে হাদিসের, ঐ পর্বত মসলা মাসায়েলের, ঐ পর্বত তাসাওয়াফের, ঐ পাহাড় কিয়াসের, ঐ পর্বত ইজমার, এই পাহাড়… এই পর্যন্ত বলতেই তারা ভয় পেয়ে বলবেন, ব্যস! আর দরকার নেই। আমরা এগুলোর কোনোটা সম্বন্ধে জীবনেও শুনি নাই। আমাদের মাত্র একটা বইই ছিল কোর’আন, তাও মাত্র কয়েকটি কপি। আর আমাদের মধ্যে পড়তে পারতেন মাত্র কয়েকজন, তারা পড়তেন আমরা শুনতাম আর তা কাজে পরিণত কোরতাম। যাই হোক, তোমরা আমাদের বেশ ভালো করে বুঝিয়ে দিলে যে, ফেকাহ কী জিনিস, কোর’আনের আইনের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ।  এতো ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ আমরা করিনি। কারণ এতো ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করা আল্লাহর রসুল (সা.) নিষেধ করে দিয়েছেন, বলেছেন এ কোর’আন মুবিন, পরিষ্কার, সকলের সহজবোধ্য।  রসুলাল্লাহও (সা.) কোর’আনের ব্যাখ্যা নিয়ে মতান্তরকে একেবারে কুফর বলে সতর্ক করে দিয়েছেন। যাই হোক, এত বিশ্লেষণ, ব্যাখ্যা আর পাণ্ডিত্যের পর তোমাদের জীবনে তাহলে কোর’আনের আইন আমাদের জীবনের চেয়ে আরও ভালো প্রভাব প্রতিফলন নিশ্চয়ই হয়েছে? তোমরা আমাদের চেয়ে আরও ভালো মুসলিম হতে পেরেছো। কিন্তু তাহলে এ দেড় হাজার বছর পরেও কেন তোমরা সমস্ত পৃথিবীতে আল্লাহর দীন প্রতিষ্ঠা করতে পার নি? ও ভালো কথা! এ পৃথিবীর দিকে চেয়ে দেখছি তোমরা নিকৃষ্টতম জাতি, অন্যান্য জাতির ঘৃণা ও অবজ্ঞার পাত্র। ওদের ধার, ঋণ, আর খয়রাতের উপর তোমরা বেঁচে আছো। সারা পৃথিবীজুড়ে তোমরা অন্যান্য সকল ধর্মের অনুসারীদের দ্বারা মার খাচ্ছ। এত কিছু আছে তোমাদের, তাহোলে তোমরা এত মার খাচ্ছো কেন? বসনিয়া হারজেগোভেনায়, সুদান, ফিলিপাইন, ইথিওপিয়া, ইরাক, আফগানিস্তান, পাকিস্তানে মার খাচ্ছ খ্রিস্টানদের হাতে; পশ্চিম এশিয়া, ফিলিস্তিনে, সিরিয়াতে মার খাচ্ছ ইহুদিদের হাতে; মায়ানমার, থাইল্যান্ড, কমপুচিয়া, চীনে, ভিয়েতনামে মার খাচ্ছ বৌদ্ধদের হাতে; সমস্ত ভারত ও কাশ্মিরে মার খাচ্ছ হিন্দুদের হাতে। সকল ধর্মের মানুষ তোমাদের কুকুরের মতো পেটাচ্ছে,
পাখির মতো গুলি করে মারছে, ধারালো অস্ত্র দিয়ে, ট্যাংক দিয়ে পিষে মারছে, তোমাদের বাড়ি ঘর জ্বালিয়ে দিচ্ছে, তোমাদের মেয়েদের ধোরে নিয়ে ধর্ষণের পর হত্যা করা হচ্ছে, বেশ্যালয়ে বিক্রি করা হচ্ছে। শুধু যে পৃথিবীর বড় বড় জাতিগুলোই এরকম করছে তাই নয়, ভারতের আসামের গাছ পাথরের উপাসক একটি পাহাড়ী উপজাতিও তোমাদেরকে গুলি করে, তীর মেরে, কুপিয়ে হত্যা করছে, বাড়ি ঘর জ্বালিয়ে দিয়ে উচ্ছেদ করছে। সমস্ত পৃথিবীজুড়ে তোমরা এরকম লা’নতের পাত্র হলে কেন? আল্লাহ তোমাদেরকে হেফাজত করছেন না কেন? আল্লাহ বলেছেন আমরা যদি তাকে একমাত্র প্রভু স্বীকার করে তাঁর আদেশ নিষেধকে, তাঁর দীনকে পৃথিবীর মানুষের জীবনে প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম করি তবে তিনি আমাদের পৃথিবীতে সবার উপর আধিপত্য দেবেন, আমাদের শ্রেষ্ঠ জাতি করে রাখবেন (কোর’আন সুরা আন-নূর-৫৫)। আমরা সরাসরি তাই করেছিলাম, কোনো ব্যাখ্যায় যাইনি। কারণ তাঁর দেখানো পথ সেরাতুল মোস্তাকীম- সহজ, সরল। তাঁর প্রতিশ্রুতি যে সত্য তাতো আমরা দেখলামই। আমাদের তিনি শ্রেষ্ঠ জাতিতেই পরিণত করেছিলেন।  কিন্তু আমরা একটা কথা বুঝতে পারছি না তোমরা এত উন্নতি করে এত ভালো মুসলিম হলে কিন্তু পৃথিবীতে তোমাদের এ অবস্থা কেন?
এইবার আমাদের ফুলানো বুকগুলি চুপসে যাবে। মুখগুলি কাচুমাচু হয়ে যাবে।  আমতা আমতা করে বোলব, যদিও কোর’আনের হাদিসের আইন শরিয়াহ নিয়েই আমরা এতো সব ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করেছি, এ বিশ্লেষণের উপর ভিত্তি করে বিরাট শাস্ত্র গড়ে তুলেছি, ওটা করে আমাদের মধ্যে বহু মাযহাব ও ফেরকা সৃষ্টি হয়েছে এবং তাদের মধ্যে মারামারিও হচ্ছে।  কিন্তু সত্যি বলতে কি, ও আইন, শরিয়াহ আমরা জাতীয় জীবন থেকে বাদ দিয়েছি, জাতীয় জীবনে আমরা এখন পাশ্চাত্যের আইন, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, বিচার ও দণ্ডবিধি গ্রহণ ও প্রতিষ্ঠা করেছি। আপনারা কিছু মনে করবেন না, জাতীয় জীবনে আল্লাহর আইন ইত্যাদি চালু করলে পাশ্চাত্যের সভ্য জাতিরা হাসবে, আমাদের অসভ্য ভাববে। কিন্তু তাই বলে আমাদের খারাপ মুসলিম ভাববেন না, আমরা খুব নামাজী, আমাদের মসজিদে জায়গা পাওয়া যায় না, আমাদের মধ্যে বহুলোক নিয়মিত তাহাজ্জুদ পড়েন, আমরা রমজানের রোজা রাখি, হজ্ব করি এবং অনেকেই যাকাত দেই। শুধু তাই নয়, আমাদের মধ্যে বড় বড় পীর ফকীর আছেন, তারা তাসাওয়াফের কঠিন রেয়াযত করেন এবং আমাদের কোটি কোটি লোক তাদের মুরীদ আছেন।  শুধু তাই নয়, আমরা লক্ষ লক্ষ লোকের বিশ্ব এজতেমা করি। জাতীয় জীবন থেকে আল্লাহ রসুলের আইন-কানুন বাদ দিলেও ব্যক্তি জীবনে আমরা তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পালন করি।  আমাদের বক্তব্য শোনার পর তারা বলবেন, এইবার আসল কথা বুঝলাম।  আমরা তো তোমাদের অসংখ্য বই পত্তর, আলিশান মসজিদ, তোমাদের বিরাট বিরাট মাহফিল এজতেমা দেখে ভেবেছিলাম মুসলিম জাতি আমাদের সময়ের চেয়ে কতো প্রগতি করেছে, আমাদের তো তোমাদের সামনে নিজেদের মুসলিম বলতে লজ্জাই কোরছিল।  কিন্তু এখন বুঝলাম তোমরা আর আমরা এক জাতি, এক উম্মাহই নই। যে আল্লাহর আইন, জীবনব্যবস্থা পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠা করে পৃথিবীতে অন্যায়, অশান্তি, অবিচার, রক্তপাত বন্ধ করতে, এবলিসের চ্যালেঞ্জে আল্লাহকে জয়ী করতে আল্লাহর রসুল (সা.) ও আমরা স্বর্বস্ব ত্যাগ করে সংগ্রাম করেছিলাম, আল্লাহর সেই আইনকেই, সেই জাতীয় জীবন ব্যবস্থাকেই তোমরা বর্জন করে ইহুদি-খ্রিস্টানদের তৈরি আইন ও জীবন ব্যবস্থা তসলিম করে নিয়েছো। তোমরা তো মোশরেক- আল্লাহর অংশীবাদী। জানিনা, কোন্ মন্ত্রবলে আমাদের তোমরা ক্ষণকালের জন্য তোমাদের এই যুগে নিয়ে এসেছো।  কিন্তু নিঃসন্দেহে একথা বলতে পারি যে, আমাদের সঙ্গে যদি আমাদের প্রাণপ্রিয় নেতা বিশ্বনবীকে (সা.) আনতে পারতে তবে তিনি এখনই আমাদের আদেশ দিতেন তোমাদের বিরুদ্ধে জেহাদ করতে। ব্যক্তিগতভাবে আল্লাহ বিশ্বাসীতো আরবের মোশরেকরাও ছিল, খ্রিস্টান আর ইহুদিরাও ছিল তোমাদের মতো।  জেহাদ করেছিলাম তো জাতীয় জীবনে আল্লাহর দীন প্রতিষ্ঠার জন্য।  চোল্লাম, আল্লাহ তোমাদের মাফ কোরুন একথাও বলতে পারছি না।  কারণ আল্লাহ প্রতিজ্ঞাবদ্ধ যে, তিনি ইচ্ছা হলে সমস্ত রকম গুনাহ মাফ করবেন কিন্তু শেরক ক্ষমা করবেন না (কোর’আন সুরা আন-নিসা-৪৮)।  তোমরা বজ্র আটুনি ফস্কা গেরো দিচ্ছো আল্লাহ তোমাদের পথ প্রদর্শন কোরুন, হেদায়েত কোরুন।

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ