মানব ইতিহাসের যুগসন্ধিক্ষণে আবির্ভুত হলেন নব-সভ্যতার তুর্যবাদক

ঐতিহ্যবাহী পন্নী জমিদার পরিবারের সন্তান জনাব মোহাম্মদ বায়াজীদ খান পন্নী। ইতিহাসের পাঠকমাত্রই তাঁর পরিবারের স্বর্ণোজ্জ্বল ইতিহাস জানেন। সুলতানী যুগে এবং মোগল আমলে এ পরিবারের পূর্বপুরুষগণ ছিলেন অত্র এলাকার শাসক। এমন কি তারা দীর্ঘকাল বৃহত্তর বাংলার (তদানীন্তন গৌড়) স্বাধীন সুলতান ছিলেন। বাংলাদেশের ইতিহাস, শিক্ষা, সংস্কৃতির সঙ্গে এই পরিবারের কীর্তি এক সূত্রে গাঁথা। প্রাচ্যের আলীগড় বলে খ্যাত সা’দাত কলেজের’ প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন ওয়াজেদ আলী খান পন্নী। এমন কি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রধান উদ্যোক্তা এবং অর্থদাতা নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী ছিলেন এমামুয্যামানের মায়ের নানা। এ পরিবারেরই একজন সন্তান জনাব মোহাম্মদ বায়াজীদ খান পন্নী, যাঁর নিজেরও রয়েছে কর্মময় ও বর্ণাঢ্য জীবন-ইতিহাস। তিনি ছিলেন সত্যের মূর্ত প্রতীক যিনি তাঁর সমগ্র জীবন সত্য সন্ধান এবং সত্যের জন্য লড়াই করে গেছেন। তাঁর ঘটনাবহুল ৮৬ বছরের জীবনে একবারের জন্যও আইনভঙ্গের কোন রেকর্ড নেই, নৈতিক স্খলনের কোন নজির নেই। আধ্যাত্মিক ও মানবিক চরিত্রে বলীয়ান এ মহামানব সারাজীবনে একটিও মিথ্যা শব্দ উচ্চারণ করেন নাই।
মাননীয় এমামুয্যামান করটিয়া, টাঙ্গাইলের ঐতিহ্যবাহী পন্নী পরিবারে ১৯২৫ সনের ১১ মার্চ জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৪২ সনে তিনি মেট্রিকুলেশন পাশ করেন। এরপর সা’দাত কলেজে কিছুদিন অতিবাহিত করার পর দ্বিতীয় বর্ষে তিনি কলকাতার ইসলামিয়া কলেজে ভর্তি হন। সেখান থেকে তিনি উচ্চ মাধ্যমিক সমাপ্ত করেন। কলকাতায় তাঁর শিক্ষালাভের সময় পুরো ভারত উপমহাদেশ ছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা সংগ্রামে উত্তাল আর কলকাতা ছিল এই বিপ্লবের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। আন্দোলনের এই চরম মুহূর্তে তরুণ এমামুয্যামান ব্রিটিশ বিরোধী সংগ্রামে পুরোপুরি জড়িয়ে পড়েন। সেই সুবাদে তিনি এই সংগ্রামের কিংবদন্তীতুল্য নেতৃবৃন্দের সাহচর্য লাভ করেন যাঁদের মধ্যে মহাত্মা গান্ধী, কায়েদে আযম মোহম্মদ আলী জিন্নাহ্, অরবিন্দু ঘোস, শহীদ হোসেন সোহরাওয়ার্দী, মাওলানা সাইয়্যেদ আবুল আলা মওদুদী অন্যতম। তিনি ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃত আল্লামা এনায়েত উল্লাহ খান আল মাশরেকীর প্রতিষ্ঠিত ‘তেহরীক এ খাকসার’ আন্দোলনে যোগ দেন যে আন্দোলনটি এর অনন্য শৃঙ্খলা ও বৈশিষ্ট্যের কারণে ভারতবর্ষব্যাপী বিস্তার লাভ করেছিল এবং ব্রিটিশ শাসনের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল। এমামুয্যামান খুব দ্রুত তাঁর চেয়ে বয়ো:জ্যেষ্ঠ ও পুরাতন নেতাদের ছাড়িয়ে পূর্ববাংলার কমান্ডারের দায়িত্বপদ লাভ করেন। অল্পদিনের মধ্যেই তিনি দুঃসাহসী কর্মকাণ্ড ও সহজাত নেতৃত্বের গুণে সমগ্র ভারতবর্ষ থেকে বিশেষ কাজের (Special Assignment) জন্য বাছাইকৃত ৯৬ জন ‘সালার-এ-খাস হিন্দ’ (বিশেষ কমান্ডার, ভারত) এর অন্যতম হিসাবে মনোনীত হন। তখন এমামুয্যামানের বয়স ছিল মাত্র ২২ বছর। দেশ বিভাগের অল্পদিন পর তিনি বাংলাদেশে (তদানীন্তন পূর্বপাকিস্তান) নিজ গ্রামে প্রত্যাবর্তন করেন।

ছোট বেলা থেকেই তাঁর ছিল শিকারের শখ। শিকারের লোমহর্ষক সব অভিজ্ঞতা নিয়ে তাঁর লেখা ‘বাঘ-বন-বন্দুক’ (১৯৬৪) নামক বইটি খ্যাতনামা সাহিত্যিক ও সমালোচকদের দ্বারা প্রশংসিত হয়। ক্রীড়াঙ্গনেও তিনি ছিলেন একজন অগ্রপথিক। ১৯৫৬ সনে অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে অনুষ্ঠিত বিশ্ব অলিম্পিক চ্যাম্পিয়নশিপে অংশগ্রহণের জন্য পাকিস্তান দলের অন্যতম রায়ফেল শুটার হিসাবে নির্বাচিত হন।

১৯৬৩ সনে এমামুয্যামান তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান আইন পরিষদের সদস্য অর্থাৎ এম.পি. নির্বাচিত হন। তাঁর প্রতিদ্ব›দ্বী হিসাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়া বিপক্ষীয় মোট ছয়জন প্রার্থীই এত কম ভোট পান যে সকলের জামানত বাজেয়াপ্ত হয়ে যায়। একজন সত্যভাষী সাংসদ হিসাবে তিনি ইয়াহিয়া সরকারের বহু অন্যায়ের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ ভ‚মিকা রেখেছেন। পরবর্তীতে তিনি নিজেকে রাজনীতি থেকে পুরোপুরি গুটিয়ে নেন কারণ দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনৈতিক অঙ্গনের নৈতিকতা বিবর্জিত পরিবেশে তিনি নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারছিলেন না। পেশাগত জীবনে তিনি ছিলেন একজন প্রখ্যাত চিকিৎসক। বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপ্রধান আবু সাঈদ চৌধুরী, সাবেক প্রধানমন্ত্রী আতাউর রহমান খান, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামসহ অনেক বরেণ্য ব্যক্তি তাঁর রোগীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তিনি ছিলেন বাংলাদেশ নজরুল একাডেমির একজন প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। তিনি ভারতীয় উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের একজন বিশেষজ্ঞ ছিলেন। ১৯৬৩ সনে তিনি করটিয়ায় হায়দার আলী রেডক্রস ম্যাটার্নিটি এ্যান্ড চাইল্ড ওয়েলফেয়ার হসপিটাল প্রতিষ্ঠা করেন যার দ্বারা এখনও উক্ত এলাকার বহু মানুষ উপকৃত হচ্ছেন। পরবর্তীতে তিনি সা’দাত ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন নামে প্রতিবন্ধী শিশুদের উন্নয়নের জন্য একটি দাতব্য সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন।

ছোটবেলায় যখন তিনি মুসলিম জাতির পূর্ব ইতিহাসগুলি পাঠ করেন তখনই তাঁর মনে একটি প্রশ্ন সৃষ্টি হয়। তিনি মুসলিম জাতির অতীতের সাথে বর্তমান অবস্থার এই বিরাট পার্থক্য দেখে তিনি ভাবতে থাকেন যে কিসের পরশে এই জাতি ১৪০০ বছর পূর্বে শিক্ষায়, জ্ঞানে-বিজ্ঞানে, সামরিক শক্তিতে, ধনবলে পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিমান, জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রতিটি অঙ্গনে অগ্রণী জাতিতে পরিণত হয়েছিল, আর কীসের অভাবে আজকে তারা দুনিয়ার সবচেয়ে হতদরিদ্র ও অশিক্ষা-কুশিক্ষায় জর্জরিত, সব জাতির দ্বারা লাঞ্ছিত এবং অপমানিত? মহান আল্লাহ ধীরে ধীরে তাঁকে এই প্রশ্নের জবাব দান করলেন। ষাটের দশকে এসে তাঁর কাছে বিষয়টি দিনের আলোর মতো পরিষ্কার হয়ে ধরা দিল। মানবজাতির সামনে এই মহাসত্য তুলে ধরার জন্য বই লিখেন এবং ১৯৯৫ সনে হেযবুত তওহীদ আন্দোলনের সূচনা করেন। ১৬ জানুয়ারী ২০১২ ঈসায়ী এই মহামানব প্রত্যক্ষ দুনিয়া থেকে পর্দাগ্রহণ করেন।

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ