মানবসমাজে ধর্ম-অধর্ম ও শান্তি-অশান্তির চিরন্তন দ্বন্দ্ব

মোহাম্মদ আসাদ আলী

দিন দিন মানুষ নামের প্রাণীটি যেন অন্য রূপ ধারণ করছে। অন্য রূপ মানে অন্য চরিত্র, অন্য স্বভাব, অন্য বৈশিষ্ট্য। মানুষ কাকে বলে, কী করলে মানুষ হওয়া যায়, শুধু মানুষের ঘরে জন্মগ্রহণ করলেই মানুষ হওয়া যায় কিনা- প্রশ্নগুলো এখন কোটি টাকার প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। উত্তরও রয়েছে, তবে বিবিধ। মানুষ শব্দটি এসেছে মনুষ্য থেকে, ডিকশনারিতে ব্যাখ্যা করা হয়েছে এমন- “যার মধ্যে মনুষ্যত্ব আছে সে-ই মানুষ। মনুষ্যত্ব হলো মানুষের চিরাচরিত বা শাশ্বত স্বভাব বা গুণ।” যেমন দয়া-মায়া, ভালোবাসা, পরোপকারিতা, সহানুভূতি, সম্প্রীতি, ঐক্য ইত্যাদি। যুগে যুগে মানবজাতি তাদের বাস্তব জীবনে এই গুণগুলোর যথাসাধ্য প্রয়োগ ঘটিয়েছে। মানুষ হিসেবে নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠা করেছে। তবে সবাই নয়। ভালো-মন্দ, কৃতজ্ঞ-কৃতঘ্ন, পরোপকারী-স্বার্থবাদী দুই ধরনের মানুষেরই পদচারণা ঘটেছে এই নিখিল বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডে। তারা সকলেই মানবতা-মনুষ্যত্বকে প্রতিষ্ঠা করে নিজেদেরকে মানুষ প্রমাণ করতে সক্ষম হয় নি। যাদের কর্মকাণ্ডে মনুষ্যত্বের চিরন্তন-সনাতন প্রতিফলন ঘটে নি তারা মনুষ্যত্বহীন, তথা ধর্মহীন। আর ধর্মহীন মানবসন্তানকে কখনই মানুষ বলা যায় না, মানুষ নামের মর্যাদা তার শোভা পায় না। যারা কাজে-কর্মে মনুষ্যত্বের পরিচয় প্রদান করতে পারে কেবল তারাই মানুষ নামে পরিচিত হবার যোগ্য। তাদের সম্মান অতি উচ্চ। স্বয়ং স্রষ্টার গুণ প্রকাশিত হয় তাদের মধ্য দিয়ে। জগতে তারা নন্দিত হন ধার্মিক বা ধর্মপরায়ণ বলে। তাদের উপস্থিতি পৃথিবীকে আলোকোজ্জ্বল করে। ধর্মানুরাগীদের সঠিক মার্গ প্রদর্শন করে ও অধার্মিকদের দণ্ড প্রদান করে তারা মানবজাতিকে রক্ষা করেন। অর্থাৎ মানুষ ও অমানুষ বলতে যথাক্রমে ধার্মিক ও অধার্মিককে বোঝায়। যে ব্যক্তি মনুষ্যত্ব বা মানবতাকে নিজের মধ্যে ধারণ করে সেই প্রকৃত ধার্মিক, অন্যদিকে যে ব্যক্তির মাঝে মানবতা নেই সে অধার্মিক। একইভাবে যে ব্যক্তি ধর্মের পথে চলে সে-ই মানুষ, আর যে অধর্মের পথে চলে সে অমানুষ।
এই ধর্ম ও অধর্মের দ্বন্দ্বই মানবজাতির প্রকৃত অতীত। বর্তমানও তাই। ভবিষ্যতেও এরই পুনরাবৃত্তি ঘটবে। এরই অংশ হিসেবে কালচক্রে এমন সময় এসেছে যখন সমাজ পুরোপুরিই ধর্মাবৃত হয়ে গেছে। অধর্ম পুরোপুরি নাশ হয়েছে। সমাজ শান্তি-সমৃদ্ধি-সৌহার্দ্য, মানবতায় পরিপূর্ণ হয়ে গেছে। স্বর্গের মতো অবারিত সুখ-শান্তির দ্বার খুলে গেছে, যে ইতিহাসগুলো আজকাল রূপকথার মতো শোনায়। আবার এমনও হয়েছে যে, সমাজে অধর্মের মাত্রা এতটাই বৃদ্ধি পেয়েছে যার কারণে ধর্মকে থাকতে হয়েছে কোণঠাসা হয়ে।

এখানে একটি কথা বুঝে নেওয়া প্রয়োজন। অধর্মের মাত্রা বৃদ্ধি পায় কীভাবে? সাধারণভাবে মনে হতে পারে- ধার্মিক লোক কমে যাওয়া, সকলে ধর্মকর্ম পরিত্যাগ করে অধর্মের পথে ধাবিত হওয়া। কিন্তু আসলে তা নয়। ইতিহাস এটাই বলছে যে, ধার্মিক সকল সমাজে, সকল জাতিতেই ছিল, কিন্তু তথাপি অন্যায়-অবিচার, অশান্তি, অধর্ম বেড়ে যাবার কারণ হলো ঐ ধার্মিকরা ধর্ম মনে করে যা করেছে তা আসলে প্রকৃত ধর্ম নয়। তারা প্রকৃত ধর্ম থেকে দূরে সরে গিয়ে বিকৃত ধর্ম পালনে নিয়োজিত হয়েছে। কিন্তু বিকৃত ধর্ম যখন শান্তি আনয়নে ব্যর্থ হয়েছে তখনই ঘটেছে যত অশুভ, অকল্যাণকর কর্মকাণ্ড, ভোগ করতে হয়েছে অনিবার্য পরিণতি।

ইহুদিদের নবী রাজা দাউদ বা কিং ডেভিড (আ.) এর সময় যে শান্তির রাজ্য স্থাপিত হয়েছিল তা ছিল সত্যধর্মের অনুসরণের ফল। হিন্দুশাস্ত্রে রামরাজত্বের যে বর্ণনা পাওয়া যায় তাও ছিল ঐ সত্যধর্মের অনুসরণের ফল। আবার মুসলিমদের স্বর্ণযুগখ্যাত ইসলামের প্রাথমিক যুগে অর্ধপৃথিবীব্যাপী যে অকল্পনীয় শান্তি-সমৃদ্ধি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তাও ছিল সত্যধর্মের বিধান অনুযায়ী চলার ফল, মনুষ্যত্বকে প্রতিষ্ঠা করার পুরস্কার। কিন্তু ইউরোপের মধ্যযুগের যে বর্বরতা মানবজাতির ইতিহাসে আজও কলংক হয়ে আছে সেটা ধর্মের ফল ছিল না, শতাব্দীর পর শতাব্দীব্যাপী মুসলিম সমাজে যে বিভেদ, হানাহানি, দ্বন্দ্ব-সংঘাত, অন্ধত্ব, পশ্চাদপদতা ইত্যাদি গ্রাস করে আছে সেটাও ধর্মের ফল নয়। এগুলো বিকৃত ধর্মের পরিণতি। যখন ধার্মিকরা অধর্মকেই ধর্মকর্ম সাব্যস্ত করে ধর্মীয় মর্যাদায় সেগুলো পালন করে চলে তখনই জন্ম হয় এমন অশান্তির।

কথায় আছে- “বৃক্ষ তোমার নাম কী? ফলেই পরিচয়।” সুতরাং কোনো সমাজে প্রকৃত ধর্ম আছে কিনা তা যাচাই করার প্রথম ও প্রধান উপায় হলো সে সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠিত আছে কিনা তা দেখা। ধর্মের ফল শান্তি, অধর্মের ফল অশান্তি। এ কারণে শেষ নবীর আনীত সত্যদীনের নাম ‘ইসলাম’ বা শান্তি, অর্থাৎ যা প্রয়োগ করলে, প্রতিষ্ঠা করলে, অবশ্যই শান্তি আসতে বাধ্য। যুগে যুগে যতো নবী-রসুল-অবতার এসেছেন, যত দীন, শাস্ত্র বা জীবনব্যবস্থা এসেছে তার সবগুলোই ছিল ইসলাম। কারণ- স্রষ্টা প্রদত্ত সকল জীবনব্যবস্থারই ফলাফল হচ্ছে শান্তি। তাই আল কোর’আনে আল্লাহ বলছেন- আমার কাছে একমাত্র গ্রহণযোগ্য দ্বীন (জীবনব্যবস্থা) হলো ইসলাম।

আজ সমস্ত পৃথিব্যাপী অশান্তির আগুন দাউ দাউ করে জ্বলছে। চারদিকে অন্যায়-অবিচার, যুদ্ধ-রক্তপাত, হিংসা-বিদ্বেষ, হানাহানি-মারামারি, শোষণ, বঞ্চনা আর সন্ত্রাসের অভয়ারণ্য। কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম বা জাতি নয়, সকল ধর্মের অনুসারীই এই আতঙ্কপুরীতে মৃতপ্রায় হয়ে বেঁচে আছে। অর্থাৎ প্রচলিত কোনো ধর্মই মানুষকে শান্তি দিতে পারছে না। এর কারণ এই সব জাতিগুলোই তাদের নবী-রসুল-অবতারগণের আনীত সত্যধর্ম থেকে, প্রকৃত শিক্ষা থেকে বহু দূরে সরে গেছে। তারা কার্যত কেউই প্রকৃত ধর্মের অনুসারী নেই।

এখানে একটা বিষয় বুঝে নেওয়ার আছে- আল্লাহ ১৪০০ বছর আগে সারা বিশ্বের মানুষের জন্য বিশ্বনবী মুহাম্মদ (সা.) কে কেন পাঠিয়েছিলেন? এই জন্য পাঠিয়েছিলেন যে, সারা পৃথিবীর ধর্মীয় সম্প্রদায়গুলো তাদের দ্বীনকে বিকৃত করে ফেলেছিল এবং তার পরিণতিতে অশান্তির মধ্যে নিমজ্জিত ছিল। তাই আল্লাহ সকল সম্প্রদায়ের জন্য, সকল মানুষের জন্য, নবী করে পাঠালেন বিশ্বনবী মুহাম্মদ (সা.)কে এবং জীবনবিধান হিসেবে পাঠালেন আল কুরআন। কুরআন কিন্তু পূর্বের নবী-রসুলদেরকে ও পূর্বের কিতাবগুলোকে খারিজ করে দেয়নি, বরং সেগুলোর সত্যায়ন করেছে, আবার এটাও বলেছে পূর্বের নবী-রসুল মহামানবদের শিক্ষা ও তাদের আনিত কিতাবগুলোকে তাদের অনুসারীরা বিকৃত করে ফেলেছে, ফলে ওটা দিয়ে আর শান্তি আসবে না। সুতরাং শান্তির জন্য, পরকালীন মুক্তির জন্য, আল্লাহ সর্বশেষ যে নবী ও জীবনবিধান দিয়েছেন সেটাতে ঈমান এনে তা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। তবেই আসবে কাঙ্ক্ষিত শান্তি। পরবর্তীতে সত্যিই সেই শান্তির সোনালী যুগ মানুষ দেখেছে অর্ধ-পৃথিবীব্যাপী। যেখানেই ইসলামের শেষ সংস্করণ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে সেখানেই নজিরবিহীন ন্যায়, শান্তি ও সুবিচার কায়েম হয়েছে। আর তা দেখে দলে দলে মানুষ শেষ নবী ও শেষ কিতাবের উপর ঈমান এনেছে।

দুঃখজনক বিষয় হলো, গত ১৪০০ বছরের কালপরিক্রমায় আমরা মুসলিম নামধারী জনগোষ্ঠীও পূর্বের জাতিসমূহের মতো দ্বীনের আসল লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ভুলে গিয়ে, দ্বীন নিয়ে বাড়াবাড়ি করে, ছোটখাটো বিষয় নিয়ে অহেতুক তর্ক বিতর্ক করে ও দ্বীনকে খণ্ড-বিখণ্ড করে এমন একটা অবস্থা তৈরি করেছি যেটাকে আর আল্লাহ-রসুলের প্রকৃত ইসলাম বলা যায় না। ফলে পূর্বের জাতিগুলোর যে পরিণতি হয়েছিল, আমাদেরও সেই একই পরিণতি হয়েছে। ওরাও অশান্তির আগুনে জ্বলছে, আমরাও অশান্তির আগুনে জ্বলছি। পৃথিবীতে এখন লক্ষ লক্ষ মসজিদ আছে, মন্দির আছে, গীর্জা আছে, প্যাগোডা আছে, ধর্মকর্মের কোনো অভাব নাই, কিন্তু কোথাও শান্তি নাই, ঐক্য নাই, মানবতা নাই, মানবাধিকার নাই।

অথচ মানুষ নামাজ রোজা, পূজা-পার্বন ইত্যাদি করে আসমান জমিন ভরিয়ে ফেলছে আর ভাবছে- ‘আমরা বুঝি খুব ধর্মকর্ম করছি, স্রষ্টা আমাদের প্রতি অতি প্রসন্ন রয়েছেন, স্বর্গ হতে ফেরেশতারা পুষ্পবৃষ্টি বর্ষণ করছেন।’ কিন্তু বাস্তবে সারা পৃথিবীতে কোথাও জাতীয় জীবনে আল্লাহর হুকুম বিধান চলে না। সকল ধর্মের মানুষ আল্লাহর হুকুম বিধানকে বাদ দিয়ে মানবরচিত হুকুম বিধান মেনে নিয়ে বসে আছে। তার পরিণতিও ভোগ করছে। এই পার্থিব নরক থেকে পরিত্রাণ পাবার উপায় একটিই- পুরো মানবজাতি যার যার অনুসৃত ধর্মমতের, আদর্শের, বিশ্বাসের ও দৃষ্টিভঙ্গির যাবতীয় বিকৃতিকে পরিহার করে আল্লাহর দেয়া দ্বীনের শেষ সংস্করণকে (কুরআন) গ্রহণ করে নেওয়া।

একটি ধারণা ব্যাপকভাবে প্রচলিত আছে যে, ‘পৃথিবীতে এতগুলো সম্প্রদায়ের মধ্যে মাত্র একটি সম্প্রদায় সঠিক পথে আছে, বাকি সবাই ভুল পথে আছে, সুতরাং একটা সম্প্রদায়ের সকল সদস্য জান্নাতে যাবে, অন্য সম্প্রদায়গুলোর সবাই জাহান্নামে যাবে।’ এ ধারণা প্রচলিত থাকায় হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, মুসলিম বলে পরিচিত সকল সম্প্রদায়ই মনে করছে- একমাত্র তাদের ধর্মকর্মই সঠিক আছে, বাকি সবাই ভুল। অথচ ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, প্রায় প্রত্যেকটা সম্প্রদায়ই শুরুতে আল্লাহর প্রেরিত সত্যদ্বীনের ধারক ছিল, কিন্তু কালের পরিক্রমায় দ্বীনকে বিকৃত করতে করতে সকলেই সেই সহজ-সরল পথ থেকে বের হয়ে গেছে। তাছাড়া অতীতের ধর্মগ্রন্থগুলো যদিও স্রষ্টার প্রেরিত ছিল, কিন্তু বর্তমান যুগে সেগুলোর কার্যকারিতা হারিয়েছে। ওই ধর্মগ্রন্থের বিধান দিয়ে আর বর্তমান যুগের জাতীয়/রাষ্ট্রীয় জীবন পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে না। সেজন্যই আল্লাহ শেষ কিতাব কোর’আন পাঠিয়েছিলেন। দুঃখের বিষয় হলো- সেই কোর’আনকে অন্যান্য ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষ এখনও জীবনবিধান হিসেবে গ্রহণ করেননি এবং আমরা মুসলমানরাও কোর’আনের বিধানে আমাদের রাষ্ট্র চালাই না, অর্থনীতি চালাই না, আদালত চালাই না। মানবরচিত আইন বিধানে রাষ্ট্র চালাই। অর্থাৎ সত্যিকার অর্থে কোনো ধর্মীয় সম্প্রদায়ই এখন আল্লাহকে পূর্ণাঙ্গ হুকুমদাতা বিধানদাতা (ইলাহ) হিসেবে মানছে না, আল্লাহর দেয়া দ্বীনের অনুসরণ করছে না। অর্থাৎ ধর্ম হারিয়ে ফেলেছে সকলেই।

এখন সকল ধর্মের, সকল সম্প্রদায়ের, সকল মানুষকে শেষ নবী মুহাম্মদ (সা.) এর প্রতি ঈমান এনে ও তাঁর আনিত জীবনবিধানকে (দ্বীন) জীবনের সকল অঙ্গনে গ্রহণ করে নিয়ে পুনরায় আমাদেরকে মো’মেন হতে হবে। তবেই আমরা হতে পারব ধার্মিক, হতে পারব মানুষ। তখন সকল সম্প্রদায়ের, ধর্মের, বর্ণের, ভাষার ও ভৌগোলিক পরিবেশের মানুষ শান্তিপূর্ণ সমাজ পাবে। কেবল তখনই প্রতিষ্ঠিত হবে খ্রিস্টানদের কাঙ্ক্ষিত সেই কিংডম অব হ্যাভেন, হিন্দুদের কাঙ্ক্ষিত রামরাজত্ব, এবং মুসলিমদের কাঙ্ক্ষিত স্বর্ণযুগের শান্তি। শান্তি-অশান্তি, সত্য-মিথ্যা, ধর্ম-অধর্মের চিরন্তন দ্বন্দ্বে তখন জয় হবে সত্যের, জয় হবে ধর্মের, জয় হবে শান্তির।