বিশেষ ক্রোড়পত্র; গুজবের পরিণাম

গুজবের পরিণামে ঝরে গেল তরতাজা দু’টো প্রাণ

নোয়াখালীর সোনাইমুড়ি উপজেলার পোরকরা গ্রাম। হেযবুত তওহীদের এমাম হোসাইন মোহাম্মদ সেলিমের গ্রামের বাড়ি এখানেই।

২০১৬ সালের ১৪ মার্চ এ বাড়িতে সশস্ত্র হামলা চালিয়ে হেযবুত তওহীদের দুই সদস্য সোলায়মান খোকন ও ইব্রাহীম রুবেলকে নৃশংসভাবে খুন করে ধর্মব্যবসায়ী একটি শ্রেণি। কী হয়েছিল সেদিন, কী গুজব ছড়িয়ে পবিত্র ধর্ম ইসলামের নামে জঘন্যতম এ হামলার পট রচনা হয়েছিল, কারা এর নেতৃত্ব দিয়েছিল, কারাই বা এ ঘটনা থেকে ফায়দা লুটেছিল – তা জানতে আমাদের পেছনে ফিরে যেতে হবে। চলুন দেখা যাক…

সেদিন যা ঘটেছিল...

বাংলাদেশের ইতিহাসে এ পর্যন্ত ধর্মের নামে গুজব ছড়িয়ে যতগুলো সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে তার সবগুলোকে নির্মমতা, পৈশাচিকতা, নৃশংসতা ও ভয়াবহতার দিক থেকে ছাড়িয়ে গেছে ১৪ মার্চ ২০১৬ তে নোয়াখালীর সোনাইমুড়িতে হেযবুত তওহীদের এমাম হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম-এর বাড়িতে হামলার ঘটনাটি। সেখানে হেযবুত তওহীদের সদস্যরা স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে বাড়ির প্রাঙ্গণে একটি মসজিদ নির্মাণ করছিলেন। তখন গ্রামের আশপাশের মসজিদের মাইক থেকে গুজব রটিয়ে দেওয়া হয় যে, হেযবুত তওহীদের সদস্যরা খ্রিষ্টান; তারা গ্রামে একটি গির্জা নির্মাণ করছে; তারা নাকি কয়েকজন আলেমকে জোর করে খ্রিষ্টান বানিয়ে ফেলছে; কয়েকজনকে মেরে মাটির নিচে পুঁতে ফেলেছে ইত্যাদি। সুতরাং এখন হেযবুত তওহীদের সদস্যদেরকে হত্যা করে ফেলতে হবে। তারা বলতে লাগলো, খ্রিষ্টান মারো গির্জা ভাঙো। আশেপাশের কওমী মাদ্রাসাগুলো থেকে অপ্রাপ্তবয়স্ক ছাত্রদেরকে এনে মিছিল করানো হলো। শিক্ষকদেরকেও আনা হলো সহিংসতায় ইন্ধন যোগানোর জন্য। ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর ক্যাডাররা এতে সশস্ত্র অবস্থায় যোগ দিল।

সকাল থেকেই নির্মাণাধীন মসজিদটি ভাঙার জন্য তারা মিছিল নিয়ে দলে দলে আসতে লাগলো। চারিদিক থেকে শুরু করলো মসজিদ নির্মাণে স্বেচ্ছাশ্রম দিতে আসা নির্মাণশ্রমিকদেরকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ। তাদের হাতে লাঠিসোটা, কিরিচ, গরু জবাই করার ছুরি, লোহার রড ইত্যাদি। ইতোমধ্যেই হেযবুত তওহীদের সদস্যরা অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন। তবে যারা বাইরে ছিলেন তারা তখনও টেলিফোনে চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন প্রশাসনের কাছে পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরতে।

চারিদিক থেকে যখন পাথরবৃষ্টি শুরু হলো এবং মসজিদের ইটগুলো ভেঙে হেযবুত তওহীদের সদস্যদের দিকে নিক্ষেপ করতে লাগল, নিরস্ত্র নির্মাণশ্রমিকেরা আত্মরক্ষার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করতে থাকেন কিন্তু পঙ্গপালের ন্যায় ধেয়ে আসা উন্মত্ত আক্রমণকারীদের বিরুদ্ধে তাদের কিছুই করতে পারছিলেন না। হামলাকারীরা ইট পাটকেল ছুঁড়তে থাকে বৃষ্টির মতো। একে একে হেযবুত তওহীদের সদস্যরা আহত হতে থাকে। মাথা ফেটে, শরীরের বিভিন্ন স্থানে ধারালো অস্ত্রের আঘাত লেগে রক্তের বন্যা বয়ে যেতে থাকে। তখনও প্রশাসনের কোনো হস্তক্ষেপ নেই। তারা বিষয়টার কোন গুরুত্বই দিচ্ছিলো না। আক্রমণকারীরা আগুন ধরিয়ে একে একে বসতবাড়িগুলো সম্পূর্ণ ধ্বংস করার উৎসবে মেতে ওঠে। মসজিদ নির্মাণ করতে আসা দুইজন সদস্যকে হাতের নাগালে পেয়ে নির্মমভাবে রড, লাঠিসোটা দিয়ে প্রহার করে। তারপর টেনেহিঁচড়ে একটি পুকুর পাড়ে ঝোঁপের পাশে নিয়ে তাদের হাত পায়ের রগগুলো কেটে ফেলে, চোখ উপড়ে নেয়। তারপর গরু জবাইয়ের ছুরি দিয়ে নির্মমভাবে জবাই করে হত্যা করে। লাশ বিকৃত করার পর তা পেট্রোল ঢেলে আগুনে পুড়িয়ে দেয়। পুলিশ তখনও নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে চলেছে। 

তখনও এই হত্যাযজ্ঞে যোগ দেওয়ার জন্য তারা পাগলের মতো যে যেভাবে পারছে সন্ত্রাসীদেরকে আহ্বান করতে থাকে। ঢাকা-নোয়াখালী সড়কের বাস থামিয়ে বাসের যাত্রীদেরকে পর্যন্ত মিথ্যা কথা বলে হামলায় অংশগ্রহণের জন্য উত্তেজিত করতে থাকে। ফেসবুকে তারা পোড়ানো লাশের ছবি পোস্ট করে উল্লাস প্রকাশ করতে থাকে। বলতে থাকে, দু’জন খ্রিষ্টানকে আমরা হত্যা করেছি। বিভিন্ন জায়গা থেকে হামলায় অংশ নিতে আসার জন্য আহ্বান তখনও চলছে।  টিভি চ্যানেলগুলোতে এই নারকীয় পৈশাচিক ঘটনা লাইভ সম্প্রচারিত হতে থাকে। দু’জন সদস্যকে হত্যার পর যখন অবরুদ্ধ আরো ১১৪ জন সদস্যকে পুড়িয়ে হত্যার তোড়জোড় চলছে তখন পুলিশ সুপারের নেতৃত্বে বিশেষ পুলিশ বাহিনী ঘটনাস্থলে এসে উপস্থিত হয়।

ততক্ষণে হেযবুত তওহীদের এমামের বাড়িটিতেও লুটপাট করে আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। কয়েকটি মোটর সাইকেল, একশ মন গোলার ধান, আসবাবপত্র, গবাদী পশুসহ বহু সম্পদ জ্বলে পুড়ে ছারখার হয়ে গেছে। ঊর্ধ্বতন প্রশাসনের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার পদক্ষেপ শুরু হলে এবার তারা গাছ কেটে সড়কে অবরোধ দেয়, থানায় হামলা চালায়। প্রশাসন-সরকার তখন উপলব্ধি করতে শুরু করেন যে, হামলাকারীদের উদ্দেশ্য অনেক বড়। তারা দেশে একটি বড় ধরনের অরাজকতা সৃষ্টি করতে চাচ্ছে যার ইস্যু হিসাবে হেযবুত তওহীদকে ব্যবহার করছে মাত্র। এবার তারা বিষয়টির গুরুত্ব বুঝতে শুরু করে। ততক্ষণে কয়েকজন পুলিশসহ আরো বহু লোক আহত-নিহত হয়ে গিয়েছে।

যাইহোক, অবশেষে সম্মিলিতভাবে বিজিবি, দাঙ্গা পুলিশ, র‌্যাব ইত্যাদি বাহিনীর সদস্যরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। ততক্ষণে আমাদের দুইটি বাড়ি ভস্মীভূত হয়ে গেছে, মসজিদ নির্মাণে স্বেচ্ছাশ্রমে অংশ নেওয়া দুইজন সদস্য প্রাণ হারিয়েছে, বহু আহত হয়েছে, পঙ্গু হয়েছেন, কারো হাত নেই, কারো পা নেই, কারো সমস্ত শরীর রক্তাক্ত-জখম। এই অবস্থায় ১১৪ জন আহত, মৃতপ্রায় বৃদ্ধ, নারী-পুরুষ-শিশুদের প্রশাসন নিরাপত্তার নামে থানায় নিয়ে যায়। তারপর তাদের বিরুদ্ধেই মিথ্যা মামলা দিয়ে পরদিন জেলা কারাগারে তারা প্রেরণ করে। এক গ্লাস পানি পর্যন্ত তাদেরকে খেতে দেওয়া হয়নি।

আমার আহ্বান

হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম, এমাম, হেযবুত তওহীদ

আমার বাড়ি নোয়াখালী জেলার সোনাইমুড়ি থানাধীন পোরকরা গ্রামে। আমাদের বাড়িতে এবং আশেপাশের কয়েকটি বাড়িতে বহু বার হামলা চালানো হয়েছে। বড় ধরনের হামলা চালানো হয়েছে চারবার। এই হামলাগুলো কারা চালিয়েছে, কেন চালিয়েছে, তাদের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা কী ছিল ইত্যাদি জানার অধিকার আমার দেশের মানুষের রয়েছে।

আপনাদের মনে প্রশ্ন আসতে পারে,“বার বার এই জায়গায় হামলা করা হয় কেন?” এর প্রথম জবাব হচ্ছে, এই বাড়ি হেযবুত তওহীদের এমামের বাড়ি। হেযবুত তওহীদের এমাম ধর্মব্যবসা, সাম্প্রদায়িকতা, গুজব, হুজুগ, ধর্মোন্মাদনা ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে ইসলামের প্রকৃত আদর্শ তুলে ধরে সবচেয়ে সোচ্চার অবস্থানে আছেন। স্বভাবতই তারা দলীয় প্রধানের বাড়ি হিসাবে এই স্থানটিকেই  হেযবুত তওহীদকে একেবারে বিলুপ্ত বা শেষ করার জন্য লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে।

দ্বিতীয়ত, স্থানীয় বিরোধী ও পারিবারিক পূর্বশত্রুদেরকে পেছন থেকে উসকে দিচ্ছে হেযবুত তওহীদের আদর্শিক প্রতিপক্ষ কিছু ইসলামিক নামধারী রাজনৈতিক দল। তারা হ্যান্ডবিল রচনা করে, সন্ত্রাসী ক্যাডার সরবরাহ করে, মুফতি ও বক্তা ভাড়া করে অপপ্রচার চালিয়ে ঘটনাগুলোর নেতৃত্ব দিচ্ছে।

তৃতীয়ত, কিছু চিহ্নিত ধর্মব্যবসায়ীর জঘন্য অপপ্রচারে প্রভাবিত হয়ে গ্রামের চিহ্নিত কয়েকটি পরিবারের সন্ত্রাসী প্রকৃতির সদস্যসহ ধর্মব্যবসায়ীদের কিছু অন্ধ অনুসারী আমাদেরকে হামলাগুলো করে থাকে, এবং তা বারবার করে থাকে।

হেযবুত তওহীদ সম্পর্কে যারা এখনও নেতিবাচক ধারণা পোষণ করছেন তাদেরকে বলব, আল্লাহ আপনাদেরকে চোখ দিয়েছেন, কান দিয়েছেন, জ্ঞান-বুদ্ধি দিয়েছেন। চিলে কান নেওয়ার মতো কানকথায়, গুজবে কান না দিয়ে আপনারা আসুন – দেখুন। বিশটি বছর ধরে তারা অপপ্রচার করেছে যে, আমরা নাকি খ্রিষ্টান। যে মসজিদটিকে তারা গির্জা আখ্যা দিয়ে গুড়িয়ে দিয়েছিল, তাদের এ গুজবকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে দুই জন শহীদের রক্তের বিনিময়ে এখন সেখানে তিনতলা মসজিদ প্রতিষ্ঠিত। সেখানে আজান দিয়ে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ হচ্ছে, জুমার নামাজ হচ্ছে, ঈদের জামাত হচ্ছে। সেখানে প্রায় প্রতি জুমায় এক হাজারের বেশি মুসল্লি একসঙ্গে নামাজ পড়েন। নিচতলায় শিশু কিশোরদের কোর’আন শিক্ষা ও গুরুত্বপূর্ণ মাসলা-মাসায়েল শিক্ষা দেওয়ার জন্য মক্তব পরিচালনা করা হচ্ছে। বয়স্কদের জন্য রয়েছে সান্ধ্যকালীন শিক্ষা কার্যক্রম।  আমার অনুরোধ থাকবে, আপনারা নিজেরা এসে বা প্রতিনিধি পাঠিয়ে নিজেদের চোখেই দেখুন – আমরা কী করি বা করছি। নিজ কানে শুনুন – আমরা কী বলি। ইনশা’আল্লাহ প্রমাণিত হয়েছে এবং হবে যে, যারা আমাদের বিরুদ্ধে এতদিন নানা কথা ছড়িয়েছে তারা মিথ্যাবাদী। তারা এসব করেছিল আমাদের জায়গা সম্পত্তি দখল করার জন্য।

কিন্তু আল্লাহর রহমে আমরা তাদের অন্যায়ের কাছে হেরে যাই নি। আমরা আবারও চেষ্টা করছি নিজেদের যতটুকু সহায় সম্পত্তি, শিক্ষা ও সামর্থ্য আছে সেটুকুর সর্বোচ্চ ব্যবহারের মাধ্যমে আমাদের গ্রামকে একটি উন্নত আদর্শ গ্রামে পরিণত করার জন্য। আমাদের এসব কর্মকা-ের পেছনে গ্রামের উন্নয়ন, প্রগতি, সমৃদ্ধি আনয়ন ছাড়া আর কোনো অভিসন্ধি নেই। এ কথা ইনশা’আল্লাহ সময় হলেই প্রমাণ হবে।

“খ্রিষ্টান মারো গির্জা ভাঙো” এই স্লোগান দিতে দিতে মিছিল নিয়ে জড়ো হয় ধর্মব্যবসায়ী ও তাদের দাঙ্গাবাজ ধর্মান্ধ অনুসারীরা। (১৪ মার্চ ২০১৬ খ্রি.)

এভাবেই হাতে রড-কিরিচ নিয়ে প্রকাশ্যে হামলা চালায় সন্ত্রাসীরা। এগুলো দিয়েই জবাই করা হয় হেযবুত তওহীদের দুই সদস্যকে। (১৪ মার্চ ২০১৬ খ্রি.)

শেষবারের হামলায় বাড়ির সকল সদস্যকে আহত রক্তাক্ত করে ঘরের সমস্ত আসবাবপত্র লুটপাট করার পর পুলিশের সামনেই পেট্রোল দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়া হয় হেযবুত তওহীদের এমামের বাড়িটি। (১৪ মার্চ ২০১৬ খ্রি.)

হেযবুত তওহীদ সদস্য কামাল হোসেনের বাড়িটি লুটপাট করে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করা হয়। অবশেষে আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। ধর্মব্যবসায়ীদের এই বর্বরতা যেন একাত্তরের পাক হানাদার বাহিনীর হামলাকেও হার মানিয়েছে। (১৪ মার্চ ২০১৬ খ্রি.)

মামলা ও প্রশাসনিক হয়রানি

আহত অবস্থায় দুই মাস অকারণ হাজতবাসের পর নির্দোষ হেযবুত তওহীদ সদস্যরা আদালতের সিদ্ধান্তে মুক্তিলাভ করেন। অথচ তাদেরকে নিরাপত্তা দেওয়ার নাম করে থানায় নেওয়া হয়েছিল। মামলায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল অজ্ঞাতনামা বহুসংখ্যক আসামিকে যাদেরকে গ্রেফতার করে মামলায় অন্তর্ভুক্ত করার কথা। কিন্তু পরবর্তী আড়াই বছরে এ মামলার কোনো অগ্রগতি হয় নি। চিহ্নিত আসামিরাও প্রকাশ্যে বুক ফুলিয়ে, হাটে বাজারে ঘুরে বেড়াত আর হুমকি দিত এই বলে যে, দুইজনকে জবাই করেছি, আরো যারা আছে সবাইকে জবাই করব। কেউ আমাদের কিচ্ছু করতে পারবি না। অবশেষে ২০১৮ সালের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের কয়েকদিন আগে তড়িঘড়ি করে একটা চার্জশিট দেয়া হয়। সেই চার্জশিট ছিল সুস্পষ্টভাবে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলের কর্মীদেরকে হয়রানি করার জন্য প্রণিত। প্রকৃত আসামিদের অনেককেই কেবল সরকার দলীয় তকমা থাকায় চার্জশিটভুক্ত করা হয় নি। যাদেরকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে তারা আদালতে তাদের অন্তর্ভুক্তিকে রাজনৈতিক হয়রানিমূলক উদ্দেশ্যে করা হয়েছে বলায় সহজেই জামিনে মুক্তি পায়। এটা অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, হেযবুত তওহীদের দুটি নির্দোষ নিরপরাধ সদস্যের লাশ নিয়েও অপরাজনীতি করা হয়েছে। বহু প্রকৃত অপরাধীকে ছবি, স্বাক্ষী, সুস্পষ্ট প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও পরিচয় না জানার কারণে সেই সময় চার্জশিটে অন্তর্ভুক্ত করা যায়নি। সেই অপরাধীদের পরিচয় এখন বিভিন্ন সূত্রে প্রকাশিত হচ্ছে। আইনজ্ঞ ও অভিজ্ঞ মহলের অভিমত, এক্ষেত্রে ন্যায় বিচারের স্বার্থে সম্পূরক চার্জশিট দেয়ার বিধান রয়েছে।

আল্লাহর রহমে হেযবুত তওহীদের সদস্যরা ধর্মব্যবসায়ীদের অন্যায়ের কাছে হেরে যান নি। আজকে সেই জায়গায় হেযবুত তওহীদের সদস্যরা আবার মসজিদ গড়ে তুলেছেন। সেখানে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ হচ্ছে, প্রতি জুমায় এক হাজারের বেশি মুসল্লি এখানে সমবেত হয়ে জুমার নামাজ আদায় করছেন। গ্রামের মানুষ এখন তাদের ভুল বুঝতে পারছে যে হেযবুত তওহীদ খ্রিষ্টান নয়, মুসলিম। আর তারা গির্জা নয়, মসজিদই নির্মাণ করছিলো। কিন্তু ধর্মব্যবসায়ী একটি গোষ্ঠী তাদেরকে গুজবে মাতাল করে তুলেছিল। এই কি ইসলামের শিক্ষা? এই ঘটনার বিরুদ্ধে সেদিন কোনো মিডিয়া, কোনো সুশীল সমাজ দাঁড়ায় নি। তারা একে উপেক্ষা করেছেন। ভাবখানা এমন যে, হেযবুত তওহীদের লোকদের মেরেছে ধর্মীয় মতবিরোধের কারণে। কিন্তু এটা ধর্মীয় মতবিরোধের বিষয় ছিল না, এটা ছিল ধর্মব্যবসায়ীদের দ্বারা বছরের পর বছর ধরে মিথ্যা গুজব রটনার পরিণতি।

কেন এই হামলা...?

অতি সংক্ষেপে বলতে গেলে এই হামলার কারণ হলো, হেযবুত তওহীদ ইসলাম সম্পর্কে কিছু গোপন করা তথ্য জাতির সামনে প্রকাশ করে দিয়েছে। তার একটি হচ্ছে, ধর্মের কাজ করে মানুষের কাছ থেকে কোনোরূপ বিনিময় গ্রহণ করা ইসলামে নিষিদ্ধ। আমাদের সমাজে একটি প্রতিষ্ঠিত ধর্মব্যবসায়ী গোষ্ঠী আরবীয় লেবাস সুরত ও আরবী ভাষা ব্যবহার করে মানুষের কাছ থেকে স্বার্থ আদায় করছে। নিজেদের স্বার্থহানির ভয়ে তারা চায় না এমন কোনো সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হোক, যে সমাজে ধর্মকে ব্যবহার করে ব্যবসা করা, স্বার্থ হাসিল করা, সন্ত্রাস সৃষ্টি ও অপরাজনীতি করা সম্ভব হবে না। তাদের একটাই চাওয়া- মানবজাতি, সমাজ, রাষ্ট্র, পৃথিবীর যে পরিস্থিতিই হোক, তাদের ধর্মভিত্তিক জীবনজীবিকা যেন টিকে থাকে, এটায় যেন কোনো আঁচড় না লাগে। এই ধর্মব্যবসা টিকিয়ে রাখার জন্য তারা মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে ফেরকাবাজি, দ্বন্দ্ব টিকিয়ে রাখতে চায়। কিন্তু চিরন্তন সত্য হলো- ধর্মের মধ্যে যখন কোনো গোষ্ঠীর স্বার্থ জড়িয়ে যায়, বিনিময় জড়িয়ে যায় তখন সেই ধর্ম স্বকীয়তা হারায় এবং বিকৃত হয়ে যায়। বহু হারাম জিনিসকে হালাল বানানো হয়, বহু বৈধ জিনিসকে অবৈধ করা হয়। বহু ছোটখাটো বিষয়কে নিয়ে বাড়াবাড়ি করে ধর্মকে কঠিন বানিয়ে ফেলা হয়, তখন দীনের মূল উদ্দেশ্য হারিয়ে যায়। আজকে ইসলামের বেলায় সেটাই হয়েছে। আল্লাহর সরাসরি আদেশ-নিষেধ অর্থাৎ ফরজ মান্য করা হচ্ছে না, অথচ সুন্নত নফল মুস্তাহাব ইত্যাদি নিয়ে বাড়াবাড়ি, তর্ক বিতর্ক বাহাসের শেষ নেই। এসব বাহাস বিতর্ক করে জনগণকে হাজার হাজার ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে।

সাধারণ মানুষ, যাদের ইসলাম সম্পর্কে সম্যক ধারণা বা আকিদা নেই কিন্তু ধর্মীয় অনুভূতিপ্রবণ, তাদের এই ধর্মানুভূতিকে কাজে লাগিয়ে জীবিকা নির্বাহ করে যাচ্ছে একটি ধর্মব্যবসায়ী গোষ্ঠী। তারা ধর্মকে ব্যবহার করে বিভিন্ন ধরনের স্বার্থ হাসিল করে, ওয়াজ করে, কোর’আন খতম করে, মুর্দা দাফন করে, মিলাদ পড়িয়ে ইত্যাদি নানারূপ ধর্মীয় আনুষ্ঠানিক কাজ করে দিয়ে মানুষের কাছ থেকে অর্থ গ্রহণ করে। কিন্তু দীনের কোনো পার্থিব বিনিময় চলে না। আল্লাহ বলছেন রক্ত, শুয়োর, মৃত জন্তু খাওয়া হারাম, তারপর বলছেন নিরুপায় হলে তাও খেতে পারো (সুরা বাকারা ১৭৩)। কিন্তু দীনের বিনিময় নেয়া একেবারে হারাম যার কোনো ক্ষমা নেই। সুরা বাকারার ১৭৪ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলছেন,

“আল্লাহ যে কেতাব অবতীর্ণ করেছেন যারা তা গোপন করে এবং বিনিময়ে তুচ্ছ মূল্য গ্রহণ করে তারা-(১) নিজেদের পেটে আগুন ছাড়া কিছুই পুরে না,(২) কেয়ামতের দিন আল্লাহ তাদের সঙ্গে কথা বলবেন না,(৩) আল্লাহ তাদের পবিত্রও করবেন না, (৪) তারা ক্ষমার পরিবর্তে শাস্তি ক্রয় করেছে, (৫) তারা হেদায়াতের পরিবর্তে পথভ্রষ্টতা বা গোমরাহী ক্রয় করেছে, (৬) তারা দীন সম্পর্কে ঘোরতর মতভেদে লিপ্ত আছে,(৭) আগুন সহ্য করতে তারা কতই না ধৈর্যশীল”। আর সুরা ইয়াসিনের ২১ নম্বর আয়াতে তিনি এও বলেছেন, “তোমরা তাদের অনুসরণ করো যারা তোমাদের কাছে বিনিময় আশা করে না এবং যারা সঠিক পথে আছে।”

২০০০ সনে এই সত্য কথাগুলো যখন হেযবুত তওহীদের এমাম তাঁর নিজ এলাকার সাধারণ মানুষের কাছে বলতে শুরু করলেন তখনই তাঁর প্রধান বিরোধী হয়ে দাঁড়ালো স্থানীয় সেই ধর্মব্যবসায়ী গোষ্ঠীটি। তারা দেখল যে, এই সত্যগুলো যদি মানুষ জেনে যায় তাহলে তো তাদের সকল ধর্মব্যবসা, আয় রোজগার বন্ধ হয়ে যাবে। তাদের আরেকটি অংশ যারা ইসলামের নাম করে ধান্ধাবাজির রাজনীতি করে, যাবতীয় সন্ত্রাসী কর্মকা-কে জেহাদ বলে চালিয়ে বেড়ায় তারাও সক্রিয় হয়ে উঠল হেযবুত তওহীদের বিরোধিতায়। তারা দেখল যে হেযবুত তওহীদের বক্তব্য যদি মানুষ জানে তাহলে ইসলামের নামে চালু করে রাখা অনৈসলামিক কার্যক্রম তারা আর চালিয়ে যেতে পারবে না। এই দুটো ধর্মব্যবসায়ী গোষ্ঠী একজোট হয়ে হেযবুত তওহীদের প্রচারকাজ বিঘিœত করার জন্য নানা বানোয়াট, মিথ্যা কথা প্রচার (চৎড়ঢ়ধমধহফধ) করতে শুরু করল। তারা বলতে লাগল, হেযবুত তওহীদের সদস্যরা নাকি টাকার জন্য উরুতে সিল দিয়ে খ্রিষ্টান হয়ে গেছে; তারা নাকি মুর্দাকে কালো কাপড় দিয়ে মাটি দেয়; বসিয়ে কবর দেয়; পূর্ব দিকে ফিরে নামাজ পড়ে; তারা পর্দার বিধান মানে না, কোর’আন মানে না ইত্যাদি (নাউযুবিল্লাহ)। এসব মিথ্যাগুলো বলার জন্য তারা ব্যবহার করলো মসজিদ, মাদ্রাসা, ওয়াজ মাহফিল ইত্যাদি ধর্মীয় পরিম-ল। তারা আমাদের সমাজে ‘আলেম’, ‘মওলানা’, ‘মুফতি’ হিসাবে সম্মান ও শ্রদ্ধার পাত্র। তারা যখন কোনো কথা বলে তখন সেটাকে মানুষ অন্ধভাবে সত্য বলে মেনে নেয়। হেযবুত তওহীদের ক্ষেত্রেও সেটাই ঘটল। মানুষ কোনোরূপ যাচাই বাছাই ছাড়াই তাদেরকে ‘খ্রিষ্টান’ বলে বিশ্বাস করে নিল, হেযবুত তওহীদের এমামের বাড়িকে ‘খ্রিষ্টান বাড়ি’ বলে অভিহিত করতে লাগল। এটা কেবল অপপ্রচারের মধ্যে সীমিত রইল না, পরবর্তীতে তা বারবার সহিংস হামলায় রূপ নিল। ২০১৬ সনের হামলাটি ছিল ঐ বাড়িতে হওয়া চতুর্থ হামলার ঘটনা। এর আগের হামলাটি হয়েছিল ২০০৯ সনে। তখন হেযবুত তওহীদের সদস্যদের আটটি বাড়ি লুটপাট করে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল।

ধ্বংসের বদলে নির্মাণ

পোরকরা গ্রামটি কুমিল্লা ও নোয়াখালী দুই জেলার সন্ধিস্থলে হওয়ায় সবসময়ই এখানে রাজনৈতিক অস্থিরতা বিরাজ করে। সন্ত্রাসের রাজনীতি ও মাদকসহ নানাপ্রকার অপরাধমূলক কাজে এই গ্রামের তরুণ ও যুবসমাজ জড়িয়ে পড়েছে। নেই কর্মসংস্থানের সুযোগ। কোনো উন্নত স্কুল, কলেজ গড়ে না ওঠায় এ এলাকার অধিকাংশ মানুষ ধর্মান্ধতা ও কুসংস্কারে আচ্ছন্ন। এমতাবস্থায় হেযবুত তওহীদের এমামের পরিবার ও আন্দোলনের সদস্যরা সর্বাত্মক চেষ্টা করে যাচ্ছেন নিজেদের সম্পদ, শিক্ষা ও সামর্থ্যরে সবটুকু ব্যবহারের মাধ্যমে সোনাইমুড়ির পোরকরা গ্রামটিকে একটি উন্নত আদর্শ গ্রামে পরিণত করার জন্য। সন্ত্রাসীরা তাদের পুকুর ও ঘেরের চাষের মাছ লুট করে নিয়েছিল, তারপর বিষ ঢেলে বাকি মাছ মেরে ফেলেছিল। সেই সব পুকুরে ও গ্রামের পতিত জলমহালগুলোকে যথাযথ বিধি মেনে লিজ নিয়ে আবারও মাছের চাষের উপযোগী করা হয়েছে। অল্প জায়গায় অধিক মৎস্য উৎপাদনের জন্য বায়োফ্লোক পদ্ধতিতে মাছ চাষ করা হচ্ছে। সন্ত্রাসীরা গোলার ধান আগুনে পুড়িয়ে ছারখার করে দিয়েছিল, হেযবুত তওহীদ সদস্যরা পুনরায় সকল জমিতে ধান ও শাক-সবজির আবাদ করছেন। সন্ত্রাসীরা ফলজ বৃক্ষ কেটে ফেলেছিল, হেযবুত তওহীদ সদস্যরা আবার বৃক্ষ রোপণ করছেন। অপসংস্কৃতি ও মাদকের কালোথাবা থেকে গ্রামের তরুণ সমাজকে ফিরিয়ে আনতে এবং বেকারত্ব থেকে মুক্তি দিতে তাদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্যোগ নিয়েছেন। এর অংশ হিসেবে পোশাক তৈরির কারখানা ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রকল্প প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। সন্ত্রাসীরা গবাদি পশুগুলোকে লুট করে নিয়েছিল। আজ হেযবুত তওহীদ সদস্যরা অর্গানিক পদ্ধতিতে গরু মোটাতাজাকরণ খামার প্রতিষ্ঠা করেছেন যা বছরজুড়ে, বিশেষ করে কোরবানির ঈদগুলোতে সুস্থ-সবল পশু সরবরাহের জন্য এলাকার মানুষের কাছে খ্যাতি কুড়িয়েছে। আগামী প্রজন্মকে আধুনিক ও নৈতিক উভয় প্রকার শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলার লক্ষ্য নিয়ে তারা প্রতিষ্ঠা করেছেন একটি উচ্চ বিদ্যালয়। তারা প্রমাণ দিচ্ছেন যে, হেযবুত তওহীদ আন্দোলন ধ্বংসের পরিবর্তে নির্মাণ, শত্রুতার পরিবর্তে বন্ধুত্ব, অশিক্ষার পরিবর্তে সুশিক্ষা, বেকারত্বের পরিবর্তে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বিশ্বাসী।

সেখানে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে ক্ষুদ্র পোশাক শিল্পকারখানা যা এলাকার বেকরত্ব দূরীকরণে বিশেষ ভূমিকা রাখছে।

জুমার খোতবা দিচ্ছেন হেযবুত তওহীদের এমাম হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম। সেই মসজিদে বর্তমানে ৫ ওয়াক্ত নামাজসহ জুমার নামাজ কায়েম করছেন স্থানীয় মুসল্লিরা।

নির্মাণের শুরুতেই যেই মসজিদকে গুড়িয়ে দিতে চেয়েছিল ধর্মব্যবসায়ীরা সেখানেই আজ স্বগর্বে দাঁড়িয়ে আছে শহীদী জামে মসজিদের চারতলা ভবন।

১৪ মার্চ ২০১৬ তারিখে হেযবুত তওহীদের এমামের বাড়িঘর ধ্বংস, লুটপাট, মসজিদ ধুলিস্মাৎ ও দুই সদস্যকে হত্যার প্রতিবাদে ঘটনার পরদিন ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে সংবাদ সম্মেলন করে হেযবুত তওহীদ। এরপর আরও শত শত সংবাদ সম্মেলন করে বিষয়টি জাতীয় পর্যায়ের সংশ্লিষ্ট সকলের গোচরে আনা হলেও ন্যায়বিচার পায়নি ক্ষতিগ্রস্ত সদস্যগণ।

মাছের প্রকল্পগুলোতে উৎপাদন করা হচ্ছে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ।

খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রকল্প।

সম্পূর্ণ অর্গানিক পদ্ধতিতে পরিচালিত গরু মোটাতাজাকরণ খামার।

আগামী প্রজন্মকে আধুনিক ও নৈতিক শিক্ষায় আলোকিত করার স্বপ্ন নিয়ে গড়ে উঠছে চাষীরহাট নুরুল হক উচ্চ বিদ্যালয়।

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ