ঐক্য ছাড়া ইসলাম হয় না

মোহাম্মদ আসাদ আলী:
আল্লাহর দেওয়া জীবনব্যবস্থার বিপরীতে মানুষ আজ পর্যন্ত যত তন্ত্র-মন্ত্র, বাদ-মতবাদ নিজেরা তৈরি করেছে, সবগুলোই অনিবার্যভাবে মানুষে মানুষে ভেদাভেদ ও হিংসা-বিদ্বেষকে উস্কে দিয়েছে। অন্যদিকে ইসলামের আগমন হয়েছে মানুষে মানুষে অন্যায় ভেদাভেদ মুছে ফেলে সমগ্র মানবজাতিকে তওহীদের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ করা ও ঐক্যবদ্ধ রাখা। কাজেই ইসলামের যত শিক্ষা, আমল, আদেশ, নিষেধ রয়েছে, সবগুলোই ঐক্যমুখী। ইসলামে ঐক্যের গুরুত্ব এত বেশি যে, বলা যায় ঐক্য ছাড়া আদতে ইসলামই হতে পারে না। যেখানে ঐক্য নেই সেখানে ইসলাম থাকতে পারে না, আবার যেখানে ইসলাম থাকবে সেখানে ঐক্য সৃষ্টি হবেই হবে। আসুন, এই প্রবন্ধে আমরা পবিত্র কোর’আনের আলোকে জানার চেষ্টা করি মো’মেনদের মধ্যে ঐক্য রক্ষার্থে আল্লাহ কী কী ব্যবস্থা রেখেছেন।

১. বস্তুত ঐক্যবদ্ধ হওয়া ছাড়া মো’মেন হওয়াই অসম্ভব। ইসলামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হলো তওহীদ (এই অঙ্গীকার করা যে, জীবনের সর্বাঙ্গনে আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে হুকুমদাতা, বিধানদাতা বলে মানবো না)। একদল মানুষ যখন তওহীদের ভিত্তিতে সমাজ গড়ার জন্য ঐক্যবদ্ধ হন, তখন তাদেরকে বলা হয় মো’মেন।

২. তওহীদ গ্রহণের পর মো’মেনের প্রধান দায়িত্ব হয়ে দাঁড়ায় তওহীদভিত্তিক দ্বীনকে সমাজে প্রতিষ্ঠা করা। আর তা করতে গেলেই দেখা যায়, আল্লাহ মো’মেনদেরকে দ্বীন প্রতিষ্ঠার যে কর্মসূচি দান করেছেন তার পাঁচটি দফার প্রথম দফাই হলো ঐক্য। হাদিসের ভাষ্যমতে- কোনো ব্যক্তি যদি তওহীদভিত্তিক ঐক্যবন্ধনী থেকে এক বিঘত দূরে সরে যায় তাহলে তার গলদেশ থেকে ইসলামের রজ্জু খুলে যাবে। সে নামাজ পড়লেও, রোজা রাখলেও, নিজেকে মুসলিম বলে দাবি করলেও জাহান্নামের জ্বালানি পাথর হবে (আল হারিস আল আশয়ারী (রাঃ) থেকে আহমদ, তিরমিযি, বাব উল এমারাত, মেশকাত)। তাহলে দেখা যাচ্ছে তওহীদ গ্রহণ ও তওহীদ প্রতিষ্ঠা- দু’টোরই মূল শর্ত ঐক্য।

৩. ঐক্যবদ্ধ হতে হবে সেটা বোঝা গেল, এখন কথা হলো সেই ঐক্য কেমন হবে? আল্লাহ পবিত্র কোর’আনে তা বলে দিয়েছেন। মো’মেনদেরকে বলেছেন সীসা গলানো প্রাচীরের মতো ঐক্যবদ্ধ থাকতে। (সফ: ৪) সীসা গলানো প্রাচীরে একটা সুঁই ঢোকানোর মতোও ছিদ্র থাকে না। আল্লাহ মো’মেনদেরকে আরও বলেছেন আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরতে ও পরস্পর বিচ্ছিন্ন না হতে। (ইমরান: ১০৩) তাছাড়া অতীতের জাতিগুলোর অনৈক্য-সংঘাত ও তার পরিণতির উদাহরণ দিয়ে আল্লাহ সতর্ক করেছেন, ওইসব জাতির মতো দলে-উপদলে বিভক্ত হওয়া যাবে না। (ইমরান: ১০৫)

৪. শুধু ঐক্যবদ্ধ হয়েই নিশ্চিন্তে থাকা যায় না, প্রয়োজন ঐক্য বিনষ্টের কারণগুলো চিহ্নিত করে নির্মূল করা। তাই ঐক্য নষ্ট হতে পারে যেসব কারণে তা নিয়েও ইসলামে রয়েছে ব্যাপক সতর্কতা। ঐক্য নষ্ট হবার কারণ প্রধানত দুইটি। একটি হলো গীবত, আরেকটি হলো মতভেদ। গীবতের ব্যাপারে আল্লাহ কোর’আনে কী ভয়াবহ কথা বলেছেন তা সবারই জানা। আল্লাহ মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়ার সঙ্গে তুলনা করেছেন গীবত বা পরনিন্দাকে (হুজরাত: ১২)। আর মতভেদ সৃষ্টি হতে পারে যেসব কারণে, তার কোনো স্থানই আল্লাহ এই দ্বীনে রাখেননি। সাধারণত মতভেদ হবার আশঙ্কা থাকে কখন? কোনো বিষয় নিয়ে অতিরিক্ত বিশ্লেষণ, চুলচেরা বিশ্লেষণ ইত্যাদি করলে। মৌলিক বা প্রধান বিষয়কে যথেষ্ট মনে না করে সেটার খুঁটিনাটি ও অপ্রধান অংশ নিয়ে সূক্ষ্ম বিচার-বিশ্লেষণ আরম্ভ করলে। এক কথায়, যতটুকু করতে বলা হয়েছে ততটুকুতে সীমাবদ্ধ না থেকে বাড়াবাড়িতে লিপ্ত হলে। তাই আল্লাহ দ্বীন নিয়ে বাড়াবাড়িকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছেন (নিসা: ১৭১, মায়েদা ৭৭)। আর মতভেদ করে যারা দ্বীনকে কঠিন করে তোলে ও জাতিকে খণ্ড-বিখণ্ড করে, তাদের প্রাপ্য পরকালে বুঝিয়ে দেওয়া হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। (আনআম: ১৫৯)

৫. ঐক্য রক্ষার ব্যাপারে সতর্ক থাকার পরও বাস্তব জীবনে রাজনীতি, অর্থনীতি, বিচারিক, সামাজিক ইত্যাদি বিষয়ে জনগণের মধ্যে মতবিরোধ সৃষ্টি হতে পারে। সেক্ষেত্রে কী করণীয় তার নীতিমালাও আল্লাহ জানিয়ে দিয়েছেন। সেটা হলো- কোনো বিষয়ে যদি মতভেদ সৃষ্টি হয়েই যায়, সেটাকে বাড়তে না দিয়ে আল্লাহ ও রসুলের কাছে সোপর্দ করে দিতে হবে। (নিসা: ৫৯) বর্তমানে রসুলাল্লাহ সরাসরি আমাদের মাঝে উপস্থিত নেই, তার মানে জাতির যিনি ইমাম থাকবেন বা কর্তৃপক্ষ থাকবেন, তার বরাবর সোপর্দ করে দিতে হবে এবং তারপর ব্যাপারটা আল্লাহর উপর ছেড়ে দিতে হবে। বিষয়টিকে দলাদলি-কোন্দলের পর্যায়ে নেওয়া যাবে না।

৬. আল্লাহর রসুল এমন একজন রিপুজয়ী মহামানব ছিলেন যাকে দয়া, করুণা ও উদারতার মূর্ত প্রতীক বললে অত্যুক্তি হয় না। কিন্তু এই রিপুজয়ী মহামানবকেও আমরা ইতিহাসে দেখতে পাই কখনও কখনও রেগে অগ্নিশর্মা হয়ে যেতে। খেয়াল করলে দেখা যায় যেসব কারণে জাতির মধ্যে ঐক্য নষ্ট হবার আশঙ্কা থাকে, শুধু তেমন কোনো ঘটনা দেখলেই আল্লাহর রসুল রেগে লাল হয়ে যেতেন। যেমন, হাদিসে পাওয়া যায় কুরআনের আয়াতের অর্থ নিয়ে দু’জন সাহাবীকে তর্ক-বিতর্ক করতে দেখে রসুল (সা.) রেগে লাল হয়ে গিয়েছিলেন, এছাড়া একজন সাহাবী খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে অতিরিক্ত প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করায় রসুল (সা.) রেগে লাল হয়ে গিয়েছিলেন। এই সুন্নাহ পুরো জাতি অনুসরণ করলে, অর্থাৎ কাউকে ঐক্য ভঙ্গের কাজ করতে দেখলেই তাৎক্ষণিক বাকি সবাই বাধা দিলে ঐক্য ভঙ্গের আশঙ্কাই থাকবে না।

৭. কেবল মুখে মুখে ঐক্যের উপদেশ দিলেই তো সমাজে সীসা গলানো প্রাচীরের মতো ঐক্য তৈরি হয়ে যাবে না। ঐক্যের চেতনা মানুষের মনে, মগজে, চিন্তায়, এমনকি অবচেতন মনেও গেঁথে দিতে হবে, কায়েম করতে হবে। সেটার উপায় কী? সেই উপায়ও আল্লাহ বলে দিয়েছেন, কারণ আল্লাহ হলেন সোবাহান, পরিপূর্ণ, নিখুঁত, নির্ভুল। তিনি ঐক্যের নির্দেশ দিবেন কিন্তু ঐক্য সৃষ্টির উপায় বলবেন না তা হতে পারে না। উপায় হিসেবে আল্লাহ নির্ধারণ করেছেন পাঁচ ওয়াক্ত সালাত, যার প্রধান কাজ হলো মো’মেনদের চরিত্রে, চিন্তায় ও অবচেতন মনে ঐক্য, শৃঙ্খলা ও আনুগত্যের গুণাবলি কায়েম করা, প্রতিষ্ঠা করা। দিনে পাঁচবার মসজিদে একত্রিত হয়ে (ঐক্যবদ্ধ হয়ে), নিজেদের মধ্যেকার সমস্ত বিভেদ-মনোমালিন্য ভুলে, একজন নেতার পেছনে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে সালাহ কায়েম করার মাধ্যমে মো’মেনদের চরিত্রে ঐক্যের চেতনা দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। ফলে সর্বদা তাদের মনে গেঁথে থাকে একটি অমোঘ সত্য- আমি একা নই, বিচ্ছিন্ন নই, নেতৃত্বহীন নই, উদ্দেশ্যহীন নই, আমার জাতি আছে, সঙ্গী-সাথী আছে, নেতা আছে, নেতার আনুগত্য করার দায়বদ্ধতা আছে।

মোদ্দাকথা, মানুষের তৈরি ব্যবস্থায় ঐক্য সৃষ্টি করা যতটা কষ্টসাধ্য কাজ, আল্লাহর দেওয়া ব্যবস্থায় তেমনই কঠিন কাজ হলো অনৈক্য সৃষ্টি করা। কারণ, আল্লাহর দেওয়ার ব্যবস্থার ধাপে ধাপে, স্তরে স্তরে রয়েছে ঐক্যের উপাদান। আল্লাহর দেওয়া ব্যবস্থার কাঠামোটাই এমন, যেখানে সবার উপরে থাকে তওহীদ তথা আল্লাহর সার্বভৌমত্ব, যা পুরো জাতিকে ঐক্যসূত্রে গেঁথে রাখে। তারপরে থাকেন একজন ইমাম, যিনি হন অবিসংবাদিত, তারপর থাকেন ইমাম কর্তৃক নিযুক্ত আমিরগণ। কোনো বিষয়ে ইমামের সিদ্ধান্ত হয়ে গেলে, মুহূর্তেই সেই সিদ্ধান্ত আমিরগণের মাধ্যমে পুরো জাতির কাছে পৌঁছে যায়, আর সঙ্গে সঙ্গে পুরো জাতি ঝাঁপিয়ে পড়ে সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য। মানি না, মানব না- এই স্লোগানের সুযোগ, প্রয়োজন বা ইচ্ছা কোনোটাই জনগণের থাকে না। কোনো পদের জন্য, অর্থের জন্য, ক্ষমতার জন্য, খ্যাতির জন্য কেউ জাতিকে বিভক্ত করার চেষ্টা করলে, জাতির ঐক্যে ভাঙন ধরানোর চেষ্টা করলে, জনগণই তাকে “মুনাফিক” হিসেবে চিহ্নিত করে ফেলে। এই ব্যবস্থার চেয়ে উত্তম ব্যবস্থা আর কী হতে পারে?

[লেখক: সদস্য, সাহিত্য বিভাগ, হেযবুত তওহীদ। যোগাযোগ: ০১৬৭০১৭৪৬৪৩, ০১৭১১০০৫০২৫, ০১৭১১৫৭১৫৮১]

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ