এক নজরে রসুলাল্লাহ (সা.)’র সংগ্রামী জীবন

রাকীব আল হাসান
রসুলাল্লাহর আগমনের পূর্বে আরবের সামাজিক অবস্থা:
আইয়্যামে জাহেলিয়াত, অন্ধকার যুগ, মূর্খতার যুগ। অন্যায়, অবিচার, অনাচার বাসা বেঁধেছিল সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। চুরি, ডাকাতি, রাহাজানি, ব্যভিচার, হত্যা, ধর্ষণ, যুদ্ধ, রক্তপাত, অনৈক্য, হানাহানি, নারীর অবমূল্যায়ন, নারীনির্যাতন, নির্লজ্জতা, দাসপ্রথা, দারিদ্র্য, অন্ধত্ব, কূপমণ্ডূকতা, ধর্মব্যবসা, কুসংস্কার, ধর্মের নামে অসার ক্রিয়াকলাপ, মূর্তিপূজা, নারীশিশুকে জীবন্ত কবর দেওয়াসহ সকল প্রকার অন্যায় চ‚ড়ান্ত রূপ ধারণ করেছিল।
রসুলাল্লাহর জন্ম ও নবুয়্যতলাভের পূর্বের জীবন:
অন্ধকারাচ্ছন্ন সেই সমাজে জন্ম নিলেন মানবতার মুক্তির দূত, মানবজাতির মুকুটমণি মোহাম্মদুর রসুলাল্লাহ (সা.)। জন্মের আগেই হারালেন পিতাকে। মাত্র ৬ বছর বয়সে মা-ও ছেড়ে গেলেন তাঁকে। ৮ বছর বয়সে তাঁকে আরও নিঃস্ব করে চলে গেলেন তাঁর দাদা আব্দুল মুত্তালিব। এমনই প্রিয়জন হারানোর দুঃখ-কষ্ট নিয়ে বেড়ে উঠলেন রসুলাল্লাহ। কিন্তু কখনোই তিনি নিজের দুঃখকে অনুভব করেননি বরং সমাজের অন্য মানুষের দুঃখকে হৃদয়ে ধারণ করেছেন। কীভাবে সমাজের মানুষের দুঃখ, দুর্দশা দূর করা যায়, কীভাবে সমাজ থেকে যাবতীয় অন্যায়, অবিচার দূর করে ন্যায়, সুবিচার প্রতিষ্ঠা করা যায় সেটা নিয়ে তিনি চিন্তা করতেন। সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার জন্য নবুয়্যতের আগেও তিনি বেশকিছু পদক্ষেপ নিয়েছেন যার মধ্যে হিলফুল ফুজুল বা শান্তিসংঘ প্রতিষ্ঠা অন্যতম। অনেক চেষ্টা-প্রচেষ্টার পরেও যখন সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা আসছিল না তখন তিনি খুবই চিন্তিত হন। হেরা পাহাড়ের নির্জন গুহায় বসে তিনি মানুষের দুঃখ-দুর্দশা দূর করবার উপায় সম্পর্কে গভীরভাবে চিন্তা করতে থাকেন, ধ্যানমগ্ন হন এবং আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করতে থাকেন।
নবুয়্যত লাভ:
মহান আল্লাহ তাঁর হৃদয়ের ক্লেশ দূর করলেন, দুশ্চিন্তার রেখা মুছে দিলেন, সমাজে শান্তি, ন্যায়, সুবিচার প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া বলে দিলেন। তিনি নবুয়্যত প্রাপ্ত হলেন, হেদায়াত প্রাপ্ত হলেন, সঠিক রাস্তা খুঁজে পেলেন। প্রথমেই যে বাণী তিনি প্রাপ্ত হলেন তা হলো- ‘ইকরা’ অর্থাৎ ‘পড়ো’। পড়ো মানে জানো। এই একটি শব্দ দিয়ে মহান আল্লাহ প্রকারান্তরে বুঝিয়ে দিলেন- এ সমাজের মানুষ কিছু জানে না, তারা অজ্ঞ, মূর্খ, জাহেল। তাদের এই অজ্ঞতা, মূর্খতা, কূপমণ্ডূকতা, কুসংস্ককার, জাহেলিয়াত ঘোচাতে হবে। ধর্মের নামে তাদের অনর্থক, অহেতুক কর্মকাণ্ড থেকে ফিরিয়ে সত্য ও ন্যায় তথা দীনুল হকের উপর আনতে হবে। জাহেলিয়াতের অন্ধকার দূর করার জন্য যে আদর্শের মশাল মহান আল্লাহ রসুলাল্লাহর হাতে তুলে দিলেন সেটিই হলো দীনের ভিত্তি, কলেমা- ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ – মোহাম্মাদুর রসুলাল্লাহ’ অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া কোনো হুকুমদাতা নেই, মোহাম্মদ (সা.) আল্লাহর রসুল।
মক্কী জীবন:
নবুয়্যত প্রাপ্তির পর শুরু হলো গোপনে তওহীদের বালাগ। আম্মা খাদিজা, আবুবকর সিদ্দিক, আলী ইবনে আবু তালিব, উসমান ইবনে আফ্ফান, যায়েদ (রা.) প্রমুখ সাহাবাগণ ইসলাম গ্রহণ করেন, এ ছাড়াও ইসলাম গ্রহণ করেন যুবাইর বিন আওয়াম, আব্দুর রহমান বিন আউফ, সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস ও তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহ (রা.)। নবুয়্যতের ৪র্থ বছরে হুকুম এল প্রকাশ্যে বালাগের। রসুলাল্লাহ (সা.) সাফা পাহাড়ে দাঁড়িয়ে সকল গোত্রের লোকদেরকে ডেকে তওহীদের আহ্বান করলেন। তিনি বললেন- “ইয়া আয়্যুহান নাস, কুল লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, তুফলিহুন” অর্থাৎ “হে মানবসকল, তোমরা বল, আল্লাহ ছাড়া কোনো হুকুমদাতা নেই, তাহলে তোমরা সফলকাম হবে।” এই ঘোষণার পর তাঁর আপন চাচা আবু লাহাব বলে উঠল- “তাব্বালাকা ইয়া মোহাম্মদ” অর্থাৎ “হে মোহাম্মদ, তুমি ধ্বংস হও।” এভাবেই শুরু হলো বিরোধিতা। নেমে এলো প্রচণ্ড অত্যাচার, নির্যাতন। কিন্তু শত অত্যাচার-নির্যাতন সত্তে¡ও তওহীদের বালাগ, সত্যের প্রতি আহ্বান অব্যাহত থেকেছে।
তৎকালীন মক্কার মানুষগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করত মূলত দুইটা শ্রেণি। এক হলো- কাবাঘরের রক্ষণাবেক্ষণকারী ধর্মব্যবসায়ী আবু জেহেল, উৎবা, শাইবারা। কোরায়েশদের মূল আয়ের উৎস ছিল কাবাকেন্দ্রিক ধর্মব্যবসা ও হজ্ব। এ কারণে কাবার মোতয়াল্লি, পুরোহিত শ্রেণির গুরুত্ব, প্রভাব ও কর্তৃত্ব ঐ সমাজের মানুষের কাছে ছিল প্রশ্নাতীত। আর দ্বিতীয় শ্রেণিটি হলো- সমাজ ও ব্যবসা পরিচালনাকারী আবু সুফিয়ানরা। সবচেয়ে ঘোরতর বিরোধিতায় অবতীর্ণ হয় ধর্মব্যবসায়ী শ্রেণিটি কারণ তারা জানত সত্য প্রতিষ্ঠিত হলে তাদের ধর্মবাণিজ্য বন্ধ হয়ে যাবে। এই ধর্মব্যবসায়ী ও সমাজনেতারা একত্রিত হয়ে রসুলাল্লাহ (সা.) এর নামে ধর্মদ্রোহী, জাদুকর, গণক, স্বধর্মত্যাগী ইত্যাদি মিথ্যা অপপ্রচার চালিয়ে সকল শ্রেণির মানুষকে রসুলাল্লাহ (সা.) ও তাঁর আসহাবগণের বিরুদ্ধে বিষিয়ে তুলল। শুরু হলো অবর্ণনীয় নির্যাতন। একদিকে কুরাইশ নেতারা আবু তালিবের সাথে দেন-দরবার করতে থাকে রসুলাল্লাহ (সা.) এর সংগ্রামকে বন্ধ করে দেবার জন্য অন্যদিকে নিজ নিজ গোত্রের দুর্বল সাহাবাগণের উপর কঠিন অত্যাচার করতে থাকে। ধর্ম যখন বিকৃত হয়ে যায় তা সমাজের কর্তৃত্বশীল শ্রেণির শোষণের হাতিয়ারে পরিণত হয়। এ কথাটি চিরকাল সত্য ছিল, আজও আছে।
নব্যুয়তের পঞ্চম বছর কঠিন নির্যাতনের এক পর্যায়ে শতাধিক সাহাবা আবিসিনিয়ায় হিজরত করেন। কৃষ্ণাঙ্গ বাদশা নাজ্জাশি তাদেরকে নিরাপত্তা প্রদান করেন। এদিকে কাফের-মোশরেকদের ষড়যন্ত্র অব্যাহত থাকে। নবুয়্যতের ষষ্ঠ বছর হামজা (রা.) ও উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) ইসলাম গ্রহণ করলে মুসলমানদের শক্তি বৃদ্ধি পায়। সংগ্রামের গতি বেড়ে যায়। শত্রুদের বিরোধিতাও চরম আকার ধারণ করে। রসুলাল্লাহকে হত্যার ষড়যন্ত্র করে আবু জেহেল, আল্লাহ সে ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে দেন। কোনোভাবেই যখন রসুলাল্লাহ (সা.) এর সত্য প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে থামিয়ে দেওয়া যাচ্ছে না তখন আবু জেহেলরা আবু তালিবের মাধ্যমে রসুলাল্লাহকে একটি প্রস্তাব দেন। তারা বলে- তুমি কী চাও? যদি চাও আমরা তোমাকে মক্কার বাদাশাহী দেব, যদি চাও আরবের সবচেয়ে সুন্দরী নারীকে তোমার সঙ্গে বিয়ে দেব, কত ধন-সম্পদ চাও দেব কিন্তু বিনিময়ে তোমাকে এই আদর্শ প্রচার বন্ধ করতে হবে। উত্তরে রসুলাল্লাহ (সা.) বলেন, “যদি তোমরা আমার এক হাতে সূর্য ও এক হাতে চন্দ্রও তুলে দাও তবু আমি মোহাম্মদ (সা.) এই সত্য প্রচার থেকে এতটুকুও পিছপা হব না। হয় আমার বিজয় হবে না হয় এই রাস্তায় আমি শহীদ হয়ে যাব।”
নবুয়্যতের সপ্তম বছর মুসলমানদের জন্য ছিল সবচেয়ে কঠিন সময়গুলোর একটি। কাফের-মোশরেকরা কোনোভাবেই যখন মুসলমানদের অগ্রযাত্রাকে দমিয়ে রাখতে পারছিল না তখন তারা সকল গোত্র মিলে এক কঠিন সিদ্ধান্ত নেয়। তারা রসুলাল্লাহর গোত্র বনু হাশিম ও বনু আব্দুল মুত্তালিবকে বয়কটের ঘোষণা দেয় এবং শি’আবে আবু তালেব নামক গিরি উপত্যকায় মুসলমানদের বন্দী করে রাখে (বর্তমানে জেলে আটক করে রাখার মতো)। সব গোত্রের নেতাদের সাক্ষর সংবলিত ঘোষণাপত্রটি ঝুলিয়ে রাখা হয় ক্বাবা শরীফে। গিরিপথে মুসলমানরা অমানবিক ভোগান্তির শিকার হতে থাকে। প্রচণ্ড রকম খাদ্যাভাব দেখা দেয়। গাছের লতা-পাতা খেয়ে বেঁচে থাকতে হয়। অনেক শিশু এ সময় না খেয়ে মারা যায় পিতা-মাতার কোলের উপর, অনেক বৃদ্ধও মারা যায়। কেবল হজ্বের মৌসুমে এ অবরুদ্ধ দশা থেকে মুক্তি পেত মুসলমানরা। এ সময় কেউ কারো সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হত না। এই সুযোগে অবরুদ্ধ মুসলমানগণ নিজেদের আহার্য ও পানীয় দ্রব্যাদি যতদূর পারা যায় সঞ্চয় করে নিতেন। রসুলাল্লাহও (সা.) হজ্বের মৌসুমকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতেন। এ সময় তিনি নিরলস পরিশ্রম করে কুরাইশদের অপপ্রচারকে উপেক্ষা করে মক্কায় আগত হজ্ব কাফেলাগুলোতে যথাসাধ্য ইসলামের দাওয়াত দিতেন। এই অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্টের মধ্যেও মুসলমানদের সংগ্রাম, তওহীদের ডাক পৌঁছানোর কাজ (বালাগ) অব্যাহত থাকে।
এই বন্দিদশা চলে তিন বছর। এরপর নবুয়্যতের দশম বছরে আল্লাহর অনুগ্রহে মুসলমানরা বন্দিদশা থেকে মুক্তিলাভ করেন। এ বছরই রসুলাল্লাহর সবচেয়ে আপনজন, সংগ্রামী জীবনের সার্বক্ষণিক সঙ্গী ও জীবনসাথী আম্মা খাদিজা (রা.) ইন্তেকাল করেন। অনেক ঐতিহাসিক মত দিয়েছেন যে, তিনি এই তিন বছরের খাদ্যাভাবের ফলে তিনি মারাত্মক অপুষ্টিতে আক্রান্ত হন যার পরিণতিতেই তিনি ইন্তেকাল করেন। তাঁর মৃত্যুতে রসুলাল্লাহ (সা.) অত্যন্ত ব্যথিত হন। একই বছর তাঁর চাচা আবু তালিবও ইন্তেকাল করেন যিনি রসুলাল্লাহর শৈশব থেকে এ পর্যন্ত পিতার অভাব পূরণ করেছিলেন এবং কাফেরদের যাবতীয় নির্যাতন ও নিপীড়ন থেকে রসুলাল্লাহকে বাঁচানোর জন্য সব সময় মাথার উপরে বটবৃক্ষের ছায়াদান করেছেন। একের পর এক স্বজন হারানোর মর্মভেদী বেদনাতেও তিনি ভেঙে পড়েননি, আল্লাহর উপর ভরসা রেখেছেন এবং সংগ্রাম চালিয়ে গেছেন। মহান আল্লাহ তাঁকে মেরাজে নিয়ে যান এবং বহু অজানা বিষয়ে জ্ঞানদান করেন, মুসলমানদের জন্য পাঁচ ওয়াক্ত সালাহ ফরজ হয় মেরাজের মাধ্যমে। এ বছরই তিনি মক্কার বাইরে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দিতে থাকেন। অনেক আশা নিয়ে তিনি তায়েফ গমন করেন। কিন্তু তায়েফবাসী তাঁর সাথে যে আচরণ করে তা ইসলামের ইতিহাসে এক বেদনাদায়ক অধ্যায়। রসুলাল্লাহ (সা.) তবু তাদেরকে ক্ষমা করে দেন।
হজের মৌসুমে তিনি বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা হজযাত্রীদের তাবুতে তাবুতে গিয়ে তিনি তওহীদের বালাগ দিতে থাকেন। নবুয়্যতের একাদশ বছরে মদিনার খাজরাজ গোত্রের ৬ জন লোক রসুলাল্লাহ (সা.) এর উপর ঈমান আনেন। এরপর ইসলামের ইতিহাসে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়। মদিনাতে ইসলামের আলো ছড়িয়ে পড়ে দ্রুত গতিতে। এরই মধ্যে মক্কার আশেপাশে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ ইসলাম গ্রহণ করেন।
মদিনাতে ব্যাপকভাবে ইসলাম প্রচারের পর নবুয়্যতের দ্বাদশ বছর মক্কার নিকটবর্তী আকাবা নামক স্থানে ১২ জন ব্যক্তি রসুলাল্লাহর হাতে বায়াত নেন এবং পরবর্ত বছর আকাবা নামক স্থানে মদিনার নেতৃস্থানীয় ১২ জনসহ ৭৫ জন নারী পুরুষ বায়াত গ্রহণ করেন যা আকাবার দ্বিতীয় বায়াত নামে খ্যাত। কাফের-মোশরেকরা এ কথা জানার পর মুসলমানদের শত্রুতায় মরিয়া হয়ে ওঠে। তারা নতুনভাবে বিভিন্ন ষড়যন্ত্র শুরু করে। নবুয়্যতের চতুর্দশ বছরে যখন মক্কার কাফের-মোশরেকরা একজোট হয়ে রসুলাল্লাহ (সা.) কে হত্যা করার ষড়যন্ত্র করে তখন আল্লাহর হুকুমে তিনি নিজ বাসভূমি, নিজ জন্মস্থান পরিত্যাগ করে মদিনাতে হেজরত করেন। শুরু হয় নতুন এক জীবন।
মাদানী জীবন:
মহান আল্লাহ তাঁর রসুলকে হেদায়াহ (সঠিক পথনির্দেশনা) ও সত্যদীন দিয়ে প্রেরণ করেছেন যেন তিনি এই হেদায়াহ ও সত্যদীনকে অন্যান্য সমস্ত দীনের উপর বিজয়ী করেন (তওবা- ৩৩, সফ- ৯, ফাতাহ- ২৮)। এই আয়াতগুলো থেকে রসুলাল্লাহ (সা.) এর আগমনের উদ্দেশ্য, তাঁর সারা জীবনের সমস্ত সংগ্রামের উদ্দেশ্য, সকল কর্মকাণ্ডের উদ্দেশ্য পরিষ্কার হয়ে গেল। সমস্ত পৃথিবীতে হেদায়াহ ও সত্যদীন প্রতিষ্ঠা করা- এটা কোনো ব্যক্তির একার কাজ নয়, ব্যক্তির পক্ষে এটা সম্ভবও নয়। এজন্য প্রয়োজন একটি জাতি গঠনের। সেই জাতি গঠনের উপযুক্ত পরিবেশ ও সুযোগ তৈরি হলো এই মদিনাতে এসে। মদিনার আপামর জনগণ তাঁকে নেতা হিসাবে গ্রহণ করল। তিনি হলেন মদিনার জনসাধারণের নেতা, রাষ্ট্রনায়ক, বিচারপতি, সেনাপতি এবং সর্বোপরি আল্লাহর রসুল।
প্রথমেই তিনি গুরুত্বপূর্ণ কিছু কার্য সমাধা করলেন। মদিনার সকল ধর্ম-বর্ণ- গোত্রের মানুষদের ঐক্যের ভিত্তিতে মদিনা সনদ প্রণয়ন করলেন, রাষ্ট্রের যাবতীয় কার্যাদি পরিচালনার জন্য কার্যালয় হিসাবে মসজিদে নববী নির্মাণ করলেন। শুরু হলো নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত জামাতের সালাহ। অবস্থার প্রেক্ষিতে শুরু হলো শরিয়তের বিধি-বিধান নাজিল ও কার্যকর হওয়া। আযানের প্রচলন শুরু হলো, সপ্তাহে একদিন (শুক্রবার) খুতবা ও জুম’আর সালাহ শুরু হলো। মহান আল্লাহর ইচ্ছায় রসুলাল্লাহ (সা.) আনসার ও মুহাজিরদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব স্থাপন করলেন। এ পর্যায়ে রসুলাল্লাহ (সা.) বিশ্ববিজয়ী এক মহান জাতি গঠনে মনোযোগী হন।
ঐক্য, শৃঙ্খলা, আনুগত্য, হেজরত ও জেহাদ- এই পাঁচদফা ভিত্তিক এক মহান জাতি গঠন করলের রসুলাল্লাহ (সা.)। হেজরতের দ্বিতীয় বিছরেই তিনি তাঁর কিছু সেনাকে সাথে নিয়ে কিছু সফল অভিযান পরিচালনা করলেন। এ বছরই মহান আল্লাহ কিতাল ফরজ ঘোষণা করেন। বদরের যুদ্ধ সংঘটিত হল। ১৩ সাহাবার শাহাদাতের বিনিময়ে মুসলমানগণ বিরাট বিজয় অর্জন করে। এ বছরই মুসলমানদের কেবলা পরিবর্তন হয় এবং রোজা, ঈদুল ফিতর এর সাদকা ও যাকাত ফরজ হয়, ঈদের নামাজের নির্দেশনা আসে।
এর পরের ইতিহাস শুধু যুদ্ধ জয়ের ইতিহাস, কঠিন সংগ্রামের ইতিহাস, কাফের-মোশরেকদের পরাজয়ের ইতিহাস, পৃথিবীর বুকে ইসলাম ছড়িয়ে পড়ার ইতিহাস। মাদানি জীবনের মাত্র দশ বছরে রসুলাল্লাহ (সা.) প্রায় ১০৭ টি ছোট বড় যুদ্ধের অভিযান পরিচালনা করেন। সেগুলোর মধ্যে স্বয়ং ২৭টি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। এভাবেই সমগ্র আরব উপদ্বীপে ইসলামের আলো ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে তিনি এমন একটি সমাজ নির্মাণ করেছেন যে সমাজে একজন যুবতী সুন্দরী নারী সমস্ত গায়ে স্বর্ণালংকার পরিহিত অবস্থায় শত শত মাইল পথ একাকী হেঁটে গেলেও তার মনে আল্লাহর ভয় ও বন্য জন্তুর ভয় ছাড়া কোনো ভয় কাজ করত না। অর্থাৎ তিনি সমাজ থেকে যাবতীয় অন্যায়, অবিচার, নিরাপত্তাহীনতা, দারিদ্র, ক্ষুধা, কূপমণ্ডূকতা, কুসংস্কার, যুদ্ধ, রক্তপাত, অনৈক্য, হানাহানি, ব্যভিচার এক কথায় যাবতীয় অশান্তি দূর করে ন্যায়পূর্ণ এক সমাজ প্রতিষ্ঠা করলেন।
বিদায় হজের ভাষণে তিনি সকলের উদ্দেশে বার বার যে সাবধানবাণী উচ্চারণ করলেন তা হলো- জাতির ঐক্য যেন কোনোভাবেই বিনষ্ট না হয়। তিনি বললেন, মুসলমান নামক এই জাতি একটি দেহের ন্যায়। একটি অঙ্গ আঘাত পেলে যেমন সমস্ত দেহ কষ্ট অনুভব করে ঠিক তেমনি একজন মুসলমান, একজন মো’মেন যদি কষ্টে থাকে তাহলে সমস্ত উম্মাহ কষ্ট অনুভব করবে। তিনি রেখে গেলেন এক আল্লাহর হুকুম (তওহীদ), এক রসুলের আদর্শ, এক কোর’আন, এক জাতি (উম্মতে মোহাম্মদী)। একটি দেহকে দুই টুকরো করলে যেমন সেটি আর জীবিত থাকে না, তেমনি এই উম্মাহ যদি বিভক্ত হয় তাহলে যে উদ্দেশ্যে এর সৃষ্টি সেই উদ্দেশ্য অর্জন কোনোদিনও সম্ভব হবে না, কারণ উম্মাহ প্রাণ হারিয়ে মুখ থুবড়ে পড়বে। জাতির কাঁধে দায়িত্ব দিয়ে গেলেন সমগ্র পৃথিবীতে এই হেদায়াহ ও সত্যদীন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে যাবতীয় অন্যায়, অবিচার, যুলুম, নির্যাতন, রক্তপাত, অনৈক্য, হানাহানি সব দূর করে ন্যায়, সুবিচার ও শান্তি প্রতিষ্ঠা করার। ৬৩ বছর বয়সে তিনি মহান আল্লাহর সান্নিধ্যে চলে গেলেন।
রসুলাল্লাহর জীবনের উদ্দেশ্য:
মহানবী (সা.) এর জীবন-ইতিহাস পাঠ করলে পরিষ্কারভাবে বোঝা যায় তাঁর জীবনের একমাত্র লক্ষ্য ছিল সমগ্র পৃথিবীতে আল্লাহর দেওয়া হেদায়াহ ও সত্যদীনকে প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সমাজ থেকে যাবতীয় অন্যায়, অবিচার, অশান্তি দূর করে ন্যায়, সুবিচার ও শান্তি প্রতিষ্ঠা করা। তিনি তাঁর জীবদ্দশায় সমগ্র আরব উপদ্বীপে এটি করে গেছেন। অন্যান্য কাজগুলো ছিল আনুষঙ্গিক।
রসুলাল্লাহর এন্তেকালের পর মুসলমানদের অবস্থা:
রসুলাল্লাহর এন্তেকালের পর বাকি পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব পড়ল তাঁর হাতে গড়া উম্মতের উপর। ৬০/৭০ বছর পর্যন্ত তারা একদেহ একপ্রাণ হয়ে লড়াই চালিয়ে গেল। ফলে অর্ধেক পৃথিবীতে অনাবিল শান্তি প্রতিষ্ঠিত হলো। তারপর ঘটল এক মহা দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা। জাতি তার লক্ষ্য ভুলে গিয়ে সত্য প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম ত্যাগ করল এবং নেতৃস্থানীয়রা সীমাহীন ভোগ বিলাসিতায় নিমজ্জিত হলো। শান্তি প্রতিষ্ঠার জেহাদ সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনে রূপ নিল। এই সময় থেকে তারা আর উম্মতে মোহাম্মদী রইল না। স্রােতহীন নদীতে যেমন শ্যাওলা ও ময়লা জমে ওঠে তেমনি জাতির মধ্যে জন্ম নিল অতি বিশ্লেষণকারী আলেম সমাজ যারা দীনের প্রতিটি বিষয় নিয়ে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করে দীনকে জটিল বানিয়ে ফেলল। সাধারণ মানুষের বোধগম্যতার বাইরে চলে যাওয়ার ফলে সহজ সরল সেরাতুল মোস্তাকীম ইসলাম একটি বিশেষ ধর্মব্যবসায়ী গোষ্ঠীর কুক্ষিগত হয়ে গেল। ওদিকে জাতির মধ্যে প্রবেশ করল বিকৃত সুফিবাদ যা জাতির বহির্মুখী প্রেরণাকে ঘুরিয়ে অন্তর্মুখী করে দিল। ফলে তারা সমাজের সকল কিছু থেকে মুখ ফিরিয়ে খানকা, দরবারে প্রবেশ করল। জাতির মধ্য থেকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রামের চেতনাই লুপ্ত হয়ে গেল। জাল হাদিস চালু করে দেওয়া হলো, আত্মার বিরুদ্ধে জেহাদই জেহাদে আকবর। সত্যদীন প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম ত্যাগের শাস্তি হিসাবে আল্লাহ মুসলিমদেরকে মার দিয়ে প্রথমে মঙ্গোল এবং পরে পাশ্চাত্যের জাতিগুলোর গোলাম বানিয়ে দিলেন। এসময় থেকে তারা আর মো’মেন মুসলিম উম্মতে মোহাম্মদী কিছুই রইল না। সেই দাসত্ব এখনো চলছে।
এখন বিরাট আনন্দের সংবাদ হচ্ছে, মহান আল্লাহ আবার এই দীনের প্রকৃত আকিদা, রূপরেখা এ যামানার এমাম জনাব মোহাম্মদ বায়াজীদ খান পন্নীকে দান করেছেন। তিনি পুনরায় হেযবুত তওহীদ গঠন করে মানবজাতিকে তওহীদের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান করেছেন। আল্লাহর মেহেরবানিতে আবার আমরা নতুন করে প্রকৃত উম্মতে মোহাম্মদী হওয়ার মহাসুযোগ লাভ করেছি। আলহামদুলিল্লাহ।

[লেখক: রাকীব আল হাসান, সহকারী সাহিত্য সম্পাদক, হেযবুত তওহীদ]

লেখাটি শেয়ার করুন আপনার প্রিয়জনের সাথে

Email
Facebook
Twitter
Skype
WhatsApp
জনপ্রিয় পোস্টসমূহ