আমাদের সওম (রোজা) কবুল হচ্ছে তো?

মোহাম্মদ আসাদ আলী
সওমের (রোজার) উদ্দেশ্য হচ্ছে মো’মেনদের জীবনের লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় চারিত্রিক বৈশিষ্ট সৃষ্টি করা। বস্তুত মানুষের নফস ভোগবাদী, সে চায় দুনিয়ার সম্পদ ভোগ করতে। আর মানবতার কল্যাণে কাজ করা, সত্যদীন প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করা হচ্ছে ত্যাগের বিষয়, যা ভোগের ঠিক উল্টো। এটা করতে নিজেদের জান ও মালকে উৎসর্গ করতে হয়। ত্যাগ করার জন্য চারিত্রিক শক্তি, মানসিক বৈশিষ্ট্য অর্জন করতে হবে।
মো’মেন সারা বছর খাবে পরিমিতভাবে যেভাবে আল্লাহর রসুল দেখিয়ে দিয়ে গেছেন এবং সে অপচয় করবে না, পশুর মতো উদরপূর্তি করবে না। সেখানে একটি নিয়ন্ত্রণ থাকবে। কিন্তু বছরে এক মাস দিনের বেলা নির্দিষ্ট সময়ে সে খাবে না, জৈবিক চাহিদা পূর্ণ করবে না অর্থাৎ নিজের ইন্দ্রিয়কে, আত্মাকে এই ক্ষেত্রে সে নিয়ন্ত্রণ করবে। আল্লাহর হুকুম মানার ক্ষেত্রে সে সজাগ হবে। এটা করতে গিয়ে আল্লাহর হুকুম মানার জন্য তার যে শারীরিক কষ্ট, মানসিক কষ্ট সহ্য করার মানসিকতা তৈরি হবে এটা তার জাতীয়, সামষ্টিক ও সামাজিক জীবনে প্রতিফলিত হবে। আল্লাহর হুকুম মানার ক্ষেত্রে কষ্টদায়ক হলেও সে ভোগবাদী হবে না, পিশাচে পরিণত হবে না, সে নিয়ন্ত্রিত হবে, ত্যাগী হবে। সে আল্লাহর হুকুম অমান্যকারী হবে না, মান্যকারী হবে। তার ত্যাগের প্রভাবটা পড়বে তার সমাজে। ফলে এমন একটি সমাজ গড়ে উঠবে যেখানে সবাই একে অপরের জন্য ত্যাগ স্বীকার করতে উৎসাহী, নিজে না খেয়ে অন্যকে খাওয়াতে আগ্রহী হবে। তাদের মধ্যে বিরাজ করবে সহযোগিতা, সহমর্মিতা। অর্থাৎ বোঝা যাচ্ছে সওমের মূল উদ্দেশ্যটাই হলো আত্মসংযম, আত্মনিয়ন্ত্রণ। আমরা যদি সালাহকে (নামাজ) সামষ্টিক (Collective) প্রশিক্ষণ মনে করি তাহলে সওম অনেকটা ব্যক্তিগত (Individual) প্রশিক্ষণ।
এখন প্রশ্ন হলো, আমাদের সমাজে অধিকাংশ মুসলিমই সওম রাখছেন। কিন্তু সওমের যে শিক্ষা তা আমাদের সমাজে কতটুকু প্রতিফলিত হলো। আমরা যদি পৃথিবীতে শুধু মুসলমানদেরকে হিসাবের মধ্যে ধরি যারা আল্লাহ রাসুলকে বিশ্বাস করেন, কেতাব বিশ্বাস করেন, হাশর বিশ্বাস করেন এমন মুসলমান ১৫০ কোটির কম হবে না। আমরা দেখি রোজা যখন আসে মুসলিম বিশ্বে খুব হুলুস্থ’ল পড়ে যায়। ব্যাপক প্রস্তুতি চলতে থাকে ঘরে ঘরে। রেডিও টেলিভিশনে অনুষ্ঠান প্রচারিত হতে থাকে। ইসলামী চিন্তাবিদরা বড় বড় আর্টিকেল লিখতে থাকেন। বিভিন্ন ধরনের কলাম লেখা শুরু হয়। সওমের গুরুত্ব, মাহাত্ম্য, ইফতারের গুরুত্ব, সেহেরির গুরুত্ব। আবার কেউ কেউ সওয়াবের জন্য রাত জেগে সেহেরির জন্য মানুষকে জাগিয়ে থাকেন। কিন্তু আমাদের সওমটা সঠিক হচ্ছে কিনা, সেটা আল্লাহর দরবারে কবুল হচ্ছে কি হচ্ছে না এই ব্যাপারে আমাদেরকে অবশ্যই ভাবতে হবে।
নবী (সা.) বলেছেন, এমন একটা সময় আসবে যখন রোজাদারদের রোজা থেকে ক্ষুধা ও পিপাসা ব্যতীত আর কিছু অর্জিত হবে না। আর অনেক মানুষ রাত জেগে নামাজ আদায় করবে, কিন্তু তাদের রাত জাগাই সার হবে (ইবনে মাজাহ, আহমাদ, তাবারানী, দারিমি, মেশকাত)।
ইসলামের প্রকৃত আকিদা বুঝতে হলে এই হাদিসটির প্রকৃত অর্থ বোঝা অতি প্রয়োজন। কেন রোজাদারদের রোজা হবে শুধু না খেয়ে ক্ষুধার্ত হয়ে থাকা অর্থাৎ রোজা হবে না এবং কেন রাত্রে তাহাজ্জুদ নামায পড়লেও সেটা শুধু ঘুম নষ্ট করা হবে, তাহাজ্জুদ হবে না। এই হাদিসে মহানবী (সা.) কাদের বোঝাচ্ছেন? হাজারো রকমের এবাদতের মধ্য থেকে মাত্র দু’টি তিনি বেছে নিয়েছেন। একটি রোজা অন্যটি তাহাজ্জুদ। এর একটা ফরদ-বাধ্যতামূলক, অন্যটি নফল- নিজের ইচ্ছাধীন। বিশ্বনবী (সা.) পাঁচটি বাধ্যতামূলক ফরয এবাদত থেকে একটি এবং শত শত নফল এবাদত থেকে একটি বেছে নেয়ার উদ্দেশ্য হলো এই – মনস্তত্তের দিক দিয়ে আল্লাহ রসুল ও দীনের উপর পরিপূর্ণ ঈমান ছাড়া কারো পক্ষে এক মাস রোজা রাখা বা নিয়মিত তাহাজ্জুদ পড়া সম্ভব নয়। এমনকি মোকাম্মেল ঈমান আছে এমন লক্ষ লক্ষ মানুষ আছে যারা তাহাজ্জুদ পড়েন না। অর্থাৎ রসুলাল্লাহ বোঝাচ্ছেন তাদের, যাদের পরিপূর্ণ দৃঢ় ঈমান আছে আল্লাহ-রসুল-কোর’আন ও ইসলামের উপর। এই হাদিসে তিনি মোনাফেক বা লোক দেখিয়ে করা যায় অর্থাৎ রিয়াকারীদের বোঝান নি। কারণ যে সব এবাদত লোক দেখিয়ে করা যায় অর্থাৎ মসজিদে যেয়ে নামায-হজ্ব-যাকাত ইত্যাদি একটিও উল্লেখ করেন নি। মোনাফেক রিয়াকারী বোঝালে তিনি অবশ্যই এগুলি উল্লেখ করতেন যেগুলি লোক দেখিয়ে করা যায়। তিনি ঠিক সেই দু’টি এবাদত উল্লেখ করলেন যে দুটি মোনাফেক ও রিয়াকারীর পক্ষে অসম্ভব, যে দু’টি লোকজন দেখিয়ে করাই যায় না, যে দুটি পরিপূর্ণ ঈমান নিয়েও সবাই করতে পারে না। সুতরাং নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, তিনি ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন যে এমন সময় আসবে যখন আমার উম্মতের মানুষ পরিপূর্ণ ঈমানের অধিকারী হয়ে নামাজ-রোজা-হজ্ব-যাকাত-তাহাজ্জুদ ইত্যাদি সর্ববিধ এবাদত করবে কিন্তু কোন কিছুই হবে না, কোন এবাদত গৃহীত-কবুল হবে না। যদি দীর্ঘ এক মাসের কঠিন রোজা এবং মাসের পর মাস বছরের পর বছর শীত-গ্রীষ্মের গভীর রাত্রে শয্যা ত্যাগ করা তাহাজ্জুদ নিষ্ফল হয়, তবে অন্যান্য সব এবাদত অবশ্যই বৃথা।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে যারা শুধু পরিপূর্ণ বিশ্বাসী অর্থাৎ মোকাম্মল ঈমানদারই নয়, রোজাদার ও তাহাজ্জুদী, তাদের এবাদত নিষ্ফল কেন? তাছাড়া তাদের এবাদতই যদি বৃথা হয় তবে অন্যান্য সাধারণ মুসলিমদের এবাদতের কি দশা? মহানবীর (সা.) ঐ ভবিষ্যদ্বাণীর একমাত্র সম্ভাব্য উত্তর হচ্ছে এই যে, তিনি যাদের কথা বলছেন তারা গত কয়েক শতাব্দী ও আজকের দুনিয়ার মুসলিম নামধারী জাতি। কেননা আল্লাহ ও তাঁর রসুল (সা.) এই জাতির সম্মুখে যে উদ্দেশ্য স্থাপন করে দিয়েছিলেন আকিদার বিকৃতিতে জাতি তা বদলিয়ে অন্য উদ্দেশ্য স্থাপন করে নিয়েছে। আজকে আমরা কষ্ট করে রোজা রাখছি, রোজার জন্য এত কিছু করছি কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে আমরা আমাদের পারিবারিক, সামাজিক ও জাতীয় জীবনে সত্য-মিথ্যা, ন্যায়-অন্যায়ের পার্থক্য নিরূপণ করি না, আল্লাহকে একমাত্র হুকুমদাতা হিসেবে মানি না, আল্লাহ যা আদেশ করেছেন তা মানি না, আল্লাহ যা নিষেধ করেছেন তা শুনি না। অর্থাৎ আমরা আল্লাহর হুকুম থেকে বিচ্যুত, তওহীদ থেকে বহিষ্কৃত। আর যারা তওহীদ থেকে বিচ্যুত তাদের সওম যে উপবাসের বেশি কিছু হবে না তা সাধারণ জ্ঞানেই বোঝা যায়।

 

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ