কুষ্টিয়ায় জনসভা: যা বললেন হেযবুত তওহীদের এমাম

দেশের চলমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতি ও রাজনৈতিক অরাজকতা নিরসনে মানবরচিত ব্যবস্থা পরিহার করে আল্লাহর দেওয়া সত্যদীন প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়েছেন হেযবুত তওহীদের সর্বোচ্চ নেতা এমাম হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম। তিনি বলেন, প্রচলিত ব্যবস্থা মানুষকে শান্তি দিতে ব্যর্থ হয়েছে। তাই চলমান এই দুঃসহ পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেতে মানুষ আল্লাহর দেওয়া জীবনব্যবস্থা চায় কি না, সেই প্রশ্নে গণভোটের আয়োজন করতে হবে। এসময় দীন প্রতিষ্ঠায় জাতীয় ঐক্যের আহ্বানও জানান তিনি।

শুক্রবার (২৮ নভেম্বর) কুষ্টিয়ায় আয়োজিত ‘দীন প্রতিষ্ঠায় জাতীয় ঐক্যের আহ্বান’ শীর্ষক এক বিশাল সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই দাবি জানান। দীর্ঘ বক্তব্যে তিনি মুসলিম উম্মাহর পতনের কারণ, বাংলাদেশের বর্তমান সংকট, বিভিন্ন পেশাজীবীদের করণীয় এবং সমাধানের রূপরেখা তুলে ধরেন।

বক্তব্যের শুরুতে হেযবুত তওহীদের এমাম কুষ্টিয়ার সন্তান ও আন্দোলনের প্রথম শহীদ, শহীদ রাবেয়াকে গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেন। তিনি বলেন, “ধর্মব্যবসায়ী ও উগ্রবাদী গোষ্ঠীর সন্ত্রাসী হামলায় শহীদ হওয়া এই মহীয়সী নারীর আত্মত্যাগ আমাদের চলার পথের অনুপ্রেরণা।” এরপর তিনি আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা এমামুয্যামান জনাব মোহাম্মদ বায়াজীদ খান পন্নীর স্মৃতিচারণ করেন। বলেন, “আমাদের এমামুয্যামান আজীবন এই সত্যটি বলে গেছেন যে, মুসলমান জাতি একসময় জ্ঞান-বিজ্ঞান, সামরিক শক্তি, শিক্ষা ও সভ্যতায় বিশ্বসেরা ছিল। কিন্তু আজ আমাদের সেই গৌরবময় অতীত হারিয়ে গেছে।”

মুসলিম বিশ্বের সম্পদ ও বর্তমান দুর্দশা:
মুসলিম বিশ্বের বর্তমান দুর্দশার চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, “বর্তমানে দুনিয়ায় ৩১% মানুষ মুসলমান এবং বিশ্বের ৭০% তেল ও গ্যাস সম্পদের মালিকানা আমাদের পায়ের নিচে। আমাদের রয়েছে প্রায় দেড় কোটি সদস্যের বিশাল সামরিক বাহিনী, সোয়া তিন কোটি বর্গমাইল আয়তন এবং ৫৭টি মুসলিম রাষ্ট্র। অথচ আমাদের চোখের সামনে মিয়ানমার ২৪ লাখ রোহিঙ্গাকে পাঠিয়ে দিয়েছে, আর মুসলিম বিশ্ব আর জাতিসংঘ নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে। আজ বাংলাদেশকে নিয়েও গভীর জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে। আধিপত্যবাদের নীলনকশায় আমরা শঙ্কিত যে, আমাদের অবস্থা আবার মিয়ানমার বা ফিলিস্তিনের মতো হয় কি না।”

অনৈক্য ও বিকৃত ইসলামই পতনের কারণ:
এই অধপতনের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, “আমাদের এমন করুণ দশা হওয়ার কথা ছিল না। আমরা সংখ্যায় যত বেশিই হই, যত মাদ্রাসা বা আলেম থাকুক না কেন, আমরা আজ যা ‘প্র্যাকটিস’ করছি তা প্রকৃত ইসলাম নয় -এটাই আমাদের পতনের এক নম্বর কারণ। আমাদের এক কোরআন, এক নবী, এক কিতাব, এক কাবা, এক জাতি এবং এক নেতা থাকার কথা ছিল। কিন্তু আমরা আজ হাজার হাজার ফেরকা ও দলে বিভক্ত। আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছিলেন- ‘তোমরা বিচ্ছিন্ন হইও না’, অথচ আমরা টুকরো টুকরো হয়ে শক্তিহীন হয়ে পড়েছি। অন্যদিকে ‘ইউনাইটেড স্টেটস অব আমেরিকা’র মতো পশ্চিমারা আজ ঐক্যবদ্ধ হয়ে সামরিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তিবলে আমাদের পরাজিত করেছে।”

ঔপনিবেশিক প্রভাব ও ঈমানি বিচ্যুতি:
ব্রিটিশ শাসনের কুফল ও ঈমান হারানোর প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “ব্রিটিশরা আমাদের ৩০০ বছর শাসন করেছে এবং পরাজিত করার পর তাদের রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষানীতি ও বিচারব্যবস্থা আমাদের ওপর চাপিয়ে দিয়েছে। আমরাও ঈমান হারিয়ে তাদের দেওয়া হানাহানির রাজনীতি, শোষক সুদভিত্তিক অর্থনীতি, বিভাজনের শিক্ষানীতি এবং মানবরচিত বিচারব্যবস্থা মেনে নিয়েছি। অথচ আল্লাহর সাথে আমাদের ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’র প্রতিশ্রুতি ছিল যে, আমরা তাঁর হুকুম ছাড়া আর কারো হুকুম মানব না। আজ আমরা সেই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে ঈমান থেকে বিচ্যুত হয়েছি। আল্লাহ কোরআনে স্পষ্ট বলেছেন- ‘যারা আল্লাহর নাজিলকৃত বিধান দিয়ে বিচার ফয়সালা করে না, তারা কাফের, জালেম ও ফাসেক’।”

দেশের অভ্যন্তরীণ সংকট ও ঋণের বোঝা:
দেশের অভ্যন্তরীণ সংকট নিয়ে তিনি বলেন, “স্বাধীনতার ৫৪ বছর পেরিয়ে গেলেও এবং বহু সরকার বদল হলেও মানুষ শান্তি পায়নি। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর মানুষ শান্তির আশা করেছিল, কিন্তু গত ১৪ মাসে শান্তি আসার কোনো লক্ষণ নেই; বরং দিন দিন অন্যায় ও অপরাধ বেড়েই চলেছে। আজ স্বাধীনতার পর দেশে দেড় কোটি মামলা হয়েছে, ৪৬ লাখ মামলা বর্তমানে আদালতে বিচারাধীন। জাতি আজ ২১ লক্ষ কোটি টাকার ঋণে জর্জরিত; সদ্যোজাত শিশুটির মাথায়ও সোয়া লক্ষ টাকার ঋণের বোঝা। খেলাপি ঋণের পরিমাণ সাড়ে ছয় লক্ষ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে এবং দেশের ৩ কোটি ৬০ লাখ মানুষ দারিদ্রসীমার নিচে বাস করছে।”

মানবরচিত ব্যবস্থার ব্যর্থতা:
তিনি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, “রাশিয়া বা চীনে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব করেও ‘স্বর্গ’ আনা সম্ভব হয়নি। আমার কথা হলো—যত আন্দোলন, বিপ্লব, নির্বাচন বা গণভোটই করেন না কেন, লাভ নেই। মানুষের তৈরি এই ‘সিস্টেম’ বহাল রেখে খুন, গুম, অর্থপাচার, দুর্নীতি, ধর্ষণ বা কোনো অন্যায়ই বন্ধ করতে পারবেন না। এই সিস্টেমে শান্তির গ্যারান্টি দেওয়া মানেই হলো মিথ্যাচার ও প্রতারণা। গণতন্ত্রের নামে যুগ যুগ ধরে সাধারণ মানুষের সাথে ধাপ্পাবাজি চলছে। ভোটের সময় যারা আপনার পা ধরে, কোলাকুলি করে; নির্বাচনের পর ৫ বছরের জন্য তারা আর আপনাকে চিনে না।”

দীন প্রতিষ্ঠার অপরিহার্যতা: ধর্মীয় ও বাস্তবিক কারণ:
দীন প্রতিষ্ঠার অপরিহার্যতা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি দুটি প্রধান কারণ উল্লেখ করেন। প্রথমত, তিনি বলেন, “এটি আমাদের ধর্মীয় দায়িত্ব ও ঈমানের প্রশ্ন। যারা আল্লাহর ওপর বিশ্বাস স্থাপন করেছেন, তাদের সিদ্ধান্ত নিতেই হবে যে আমরা আল্লাহর বিধান ছাড়া অন্য কারো বিধান মানব না। নামাজ, রোজা, হজ ও যাকাতের মতোই রাষ্ট্র পরিচালনা ও বিচার-ফয়সালা আল্লাহর হুকুম অনুযায়ী করা ফরজ। আমরা যদি আল্লাহর হুকুমের আংশিক মানি আর আংশিক না মানি, তবে তা হবে শিরক, যার পরিণাম জাহান্নাম।”

দ্বিতীয় কারণ হিসেবে তিনি বলেন, “এটি বর্তমান সময়ের অপরিহার্য দাবি। প্রচলিত ব্যবস্থাটি আজ চূড়ান্তভাবে ব্যর্থ। আমাদের যথেষ্ট অভিজ্ঞতা হয়েছে যে, এই স্বার্থকেন্দ্রিক রাজনীতি ও ‘সিস্টেম’ বহাল থাকলে স্বৈরাচারী আচরণ ও দুর্নীতি বন্ধ হবে না। বর্তমান ব্যবস্থার মাধ্যমে জাতিকে অরাজকতা থেকে মুক্ত করার আর কোনো পথ নেই। কিন্তু আমরা গ্যারান্টি দিচ্ছি, আল্লাহ প্রদত্ত জীবনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করলে এই অরাজকতা বন্ধ হবে এবং মানুষ প্রকৃত শান্তি খুঁজে পাবে।”

আলেম সমাজ ও পীর-মাশায়েখদের প্রতি:
বক্তব্যের এক পর্যায়ে তিনি সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের প্রতি বিশেষ আহ্বান জানান। আলেম সমাজ ও পীর-মাশায়েখদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “আলেম-উলামারা অনর্থক বিষয় নিয়ে শ্রম ও মেধা নষ্ট না করে মসজিদের মিম্বর ও ওয়াজ মাহফিল থেকে ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের আল্লাহর হুকুমের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ ও অনুপ্রাণিত করুন -এটা এখন আপনাদের ওপর ফরজ। পীর সাহেবদের বলছি, খানকায় বসে শুধু আত্মার ঘষামাজা করে আপনারা নিজেদের বা মুরিদদের রক্ষা করতে পারবেন না, জাতিকে তো নয়ই। শত শত মাজারে হামলা হয়েছে, কবর থেকে লাশ তোলা হয়েছে, কিন্তু আপনারা কিছুই করতে পারেননি।”

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সেনাবাহিনীর প্রতি:
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সেনাবাহিনীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “আজ পাতি নেতারাও এসপি সাহেবের টেবিলে থাপ্পড় দিয়ে কথা বলেন। সরকার বদল হলেই আপনারা ‘দালাল’ হিসেবে আখ্যায়িত হন। আমার প্রস্তাব হলো- চলমান রাজনৈতিক ব্যবস্থা পরিবর্তন করে আল্লাহর দীন কায়েম হলে আপনাদের আর কারো দালালি করতে হবে না। তখন আপনারা হবেন জাতির সম্মানিত রক্ষক। ব্রিটিশদের দেওয়া ব্যবস্থা আপনাদের চেইন অব কমান্ড ভেঙে দিয়েছে। তওহীদভিত্তিক রাষ্ট্রে আপনাদের চেইন অব কমান্ড হবে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ। তখন আপনারা ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করুন বা সীমান্ত পাহারা দিন, সবই আপনাদের এবাদত বলে গণ্য হবে। সাহাবিদের মতো আপনাদের অস্ত্র ধারণ হবে গৌরবের।”

বিচারকদের প্রতি আহ্বান:
বিচারকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “আপনারা হয়তো ভাবছেন দীন প্রতিষ্ঠা হলে ব্রিটিশ আইন রদ হবে আর আপনারা বেকার হয়ে পড়বেন। না, জ্ঞান কখনো বেকার হয় না। বিচারকের কলম হলো আল্লাহর কলম, ন্যায়ের কলম। আমি আপিল করতে চাই -এতদিন তো ব্রিটিশ আইন প্র্যাকটিস করে তার ফল দেখলেন। আর নিরীক্ষার দরকার নেই। আদালতে বসে আল্লাহর বিধান দ্বারা বিচার করুন। একজন বিচারক যদি আল্লাহর আইনে বিচার করেন, তবে সেটা হবে প্রকৃত ন্যায়বিচার এবং একেকটা রায় আপনাদের জান্নাতের পথে নিয়ে যাবে।”

আল্লাহর বিধান প্রতিষ্ঠায় গণভোটের প্রস্তাব:
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে তিনি গণভোটের জোরালো দাবি তুলে ধরে বলেন, “আজ জুলাই সনদ বা নানা ইস্যুতে গণভোটের দাবি উঠছে। আমি একটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দিচ্ছি- গণভোট যদি হতেই হয়, তবে তা হোক ‘আল্লাহর বিধান চাই নাকি মানুষের তৈরি বিধান চাই’ -এই প্রশ্নে। সর্বপ্রথম এই ইস্যুতেই গণভোট হওয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশের ৯০ ভাগ মানুষ মুসলিম। আল্লাহর দেওয়া সেই ব্যবস্থার মাধ্যমেই মহানবী (স.) ও সাহাবীরা সমাজে শান্তি কায়েম করেছিলেন। তাই মানুষের তৈরি ব্যর্থ তন্ত্রমন্ত্র বাদ দিয়ে আল্লাহর দেওয়া জীবনব্যবস্থা বেছে নেওয়ার সুযোগ মানুষের সামনে উন্মুক্ত করে দিতে হবে। এটাই মুক্তির একমাত্র গ্যারান্টি। আমার বিশ্বাস, এদেশের সকল মুসলমান আল্লাহর বিধানকেই ভালোবাসেন এবং তা গ্রহণ করবেন।”

পরিশেষে তিনি বলেন, “বর্তমান অরাজকতা থেকে মুক্তি পেতে এবং পরকালীন মুক্তির লক্ষ্যে আমাদেরকে মানবরচিত ব্যবস্থা ত্যাগ করে সত্যদীনের পতাকাতলে সমবেত হতে হবে। এই লক্ষ্যেই আমাদের আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা এমামুয্যামান জনাব মোহাম্মদ বায়াজীদ খান পন্নী ১৯৯৫ সাল থেকে জাতিকে তওহীদের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে আসছেন। রসুলাল্লাহ (সা.)-এর শেষ জীবনের নির্দেশ অনুযায়ী আমরা পাঁচটি কর্মসূচির ওপর ভিত্তি করে এই সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছি।”

এমাম হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম যখন প্রচলিত ব্যবস্থার অসারতা তুলে ধরে সত্যদীন প্রতিষ্ঠার উদাত্ত আহ্বান জানান, তখন উপস্থিত হাজারো জনতা মুহুর্মুহু করতালি ও তওহীদের দীপ্ত স্লোগানে তাঁর বক্তব্যের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানান এবং আল্লাহর বিধান প্রতিষ্ঠায় নিজেদের জীবন ও সম্পদ উৎসর্গ করার দীপ্ত অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।