জাতীয় প্রেসক্লাবে দৈনিক বজ্রশক্তি'র উদ্যোগে গোলটেবিল বৈঠক

১৯ নভেম্বর ২০১৫, ইরাক, আফগানিস্তান, লিবিয়া, সিরিয়ার মতো বাংলাদেশকেও অস্থিতিশীল করার জন্য দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র চলছে। সরকারের একার পক্ষে এই ষড়যন্ত্র রুখে দেওয়া সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন সর্বস্তরের মানুষের সচেতনতা ও সহযোগিতা। এই আলোচ্য বিষয়কে সামনে রেখে দৈনিক বজ্রশক্তির উদ্যোগে জাতীয় প্রেসক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে গত বৃহস্পতিবার ‘সন্ত্রাস দমনে জনসম্পৃক্ততার বিকল্প নেই’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। দৈনিক বজ্রশক্তির দ্বিতীয় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে অনলাইন ওয়েবপোর্টাল বাংলাদেশেরপত্র.কম ও জাতীয় টেলিভিশন (জেটিভি) অনলাইন এর সহযোগিতায় এ গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানের সঞ্চালনা করেন সাপ্তাহিক ‘সত্যের পথে অপরাজিতা’ এর সম্পাদক রুফায়দাহ পন্নী। স্বাগত বক্তব্যের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানটি শুরু করেন দৈনিক বজ্রশক্তির সম্পাদক এস. এম. সামসুল হুদা।

অনুষ্ঠানে ভিডিও

 

সংবাদপত্র হচ্ছে সমাজের একটি দর্পণ। এই দর্পণে যেমন সমাজের রূপ দেখা যায়, তেমনি সমাজ গঠনে রয়েছে এর বিশেষ ভূমিকা। বর্তমানে দেশকে অস্থিতিশীল করে বাংলাদেশে সিরিয়া, পাকিস্তানের মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি করার জন্য আন্তর্জাতিক মহলে একটি ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে। এই ষড়যন্ত্র রুখতে হলে ষোল কোটি বাঙালিকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে বলে অনুষ্ঠানে বক্তারা মন্তব্য করেন। বক্তারা বলেন, বস্তুবাদী, ভোগবাদী জীবনব্যবস্থার প্রভাবে মানুষ আজ এতটাই স্বার্থপর ও আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে যে, নিজের লাভ-ক্ষতি ছাড়া কিছুই ভাবার সময় তার নেই। ফলে চোখের সামনে কোনো অপরাধ হতে দেখলেও মনে করে এর প্রতিবাদ করা তার দায়িত্ব নয়, এ দায়িত্ব শুধুই আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। কিন্তু সত্য হলো- সমগ্র জাতি যদি অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার না হয়, ন্যায়ের পক্ষে না দাঁড়ায়, সমাজে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করাকে নিজেদের দায়িত্ব কর্তব্য বলে মনে না করে তাহলে শুধু আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একার পক্ষে শত চেষ্টা করেও সমাজকে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রদান করা সম্ভব নয়। এজন্য মানুষের মানসিক পরিবর্তন সাধন করতেই হবে। এটাকেই বলে প্রকৃত জাতীয় উন্নয়ন, জাতীয় চরিত্র নির্মাণ। অনুষ্ঠানে দেশের সুশীল সমাজ, সাংবাদিক, অধ্যাপক, প্রকৌশলী, ডাক্তার, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব, শ্রমিক, কৃষকসহ সমাজের সকল স্তরের প্রতিনিধিগণ আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন।

অনুষ্ঠানে বিশেষ আলোচক হিসাবে উপস্থিত ছিলেন সমাজ ও সংস্কৃতি কর্মী অধ্যাপক কাজী নুসরাত সুলতানা; বিশিষ্ট সাংবাদিক শ্রী কল্যাণ সাহা; দৈনিক বজ্রশক্তির সাহিত্য সম্পাদক ও বাংলাদেশেরপত্র.কম এর নির্বাহী সম্পাদক রিয়াদুল হাসান, স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকার ফোরামের সমন্বয়কারী মাহবুব নেওয়াজ চৌধুরী, জাপাটেক করপরেশন লিমিটেডের চেয়ারম্যান কাজী কামরুজ্জামান ও দৈনিক বজ্রশক্তির উপদেষ্টা উম্মুততিজান মাখদুমা পন্নী। এ ছাড়াও বিশেষ অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন হেযবুত তওহীদের এমাম হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম। তিনি তাঁর বক্তব্যে বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি তুলে ধরে বলেন, বিশ্বব্যাপী জঙ্গিবাদের যে উত্থান ঘটছে তার সাথে বাংলাদেশও সম্পৃক্ত। বাংলাদেশকে নিয়েও ষড়যন্ত্র চলছে এ দেশে জঙ্গিবাদের বিস্তার ঘটানোর জন্য। তিনি বলেন, বিশ্বব্যাপী এই জঙ্গিবাদের উদ্গাতা হলো পশ্চিমা পরাশক্তিধর দেশগুলো। তারা তাদের নিজেদের স্বার্থের যুদ্ধে মুসলমানদের ধর্মবিশ্বাসকে, ধর্মীয় আবেগকে ব্যবহার করেছে, তাদেরকে বুঝিয়েছে এটা ইসলামের জন্য যুদ্ধ, এটা জেহাদ। আফগানিস্তানে রাশিয়ার বিরুদ্ধে মার্কিনিদের যুদ্ধে তারা সারা পৃথিবীর ধর্মপ্রাণ মুসলমানদেরকে উদ্বুদ্ধ করেছে সেখানে গিয়ে যুদ্ধ করবার জন্য। আর এ কাজে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বড় বড় ধর্মব্যবসায়ী আলেমকে তারা ভাড়া করেছে। কিন্তু এই যুদ্ধে ইসলামের কোনো লাভ হয়নি, মুসলমানদের কোনো লাভ হয়নি। এভাবে মুসলমানদের ধর্মবিশ্বাসকে হাইজ্যাক করে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করে জঙ্গিবাদের জন্ম দেওয়া হয়েছে।
তিনি প্রচলিত মাদ্রাসা শিক্ষা ও সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থার ত্র“টি তুলে ধরে বলেন, এই শিক্ষাব্যবস্থা ষড়যন্ত্রমূলকভাবে আমাদের উপর চাপিয়ে দিয়েছে ব্রিটিশ শাসকরা। এ শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে আমাদের চরিত্র, দেশপ্রেম, সঠিক ইসলামি চেতনা, প্রকৃত ধর্ম, এবাদত, মানুষের কল্যাণে জীবন উৎসর্গ করা- এগুলি কিছুই শিক্ষা দেওয়া হয়না। একদিকে মাদ্রাসা থেকে আরবি ভাষা ও তর্কবাহাসের মাসলা-মাসায়েল শিক্ষা করে বের হচ্ছে একটা ধর্মব্যবসায়ী শ্রেণি অপর দিকে সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থা থেকে বের হচ্ছে ধর্ম সম্পর্কে অজ্ঞ, আত্মকেন্দ্রিক, স্বার্থপর, দুর্নীতিপ্রবণ একটা শ্রেণি। এখন উভয় প্রকারের শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে ভাবতে হবে।
এখন দেশকে যদি শান্তিপূর্ণ করতে হয়, যদি সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ দূর করতে হয়, সমাজকে যদি শান্তিপূর্ণ, নিরাপদ করতে হয় তবে শুধু শক্তিপ্রয়োগ, কঠিন আইন প্রয়োগ করলেই হবে না বলে মত প্রকাশ করেন তিনি। “সঠিক আদর্শ, সঠিক শিক্ষার মাধ্যমে জাতির আপামর জনতার মানসিক পরিবর্তন ঘটাতে হবে।”
বিশেষ আলোচক হিসাবে বাংলাদেশেরপত্র.কমের নির্বাহী সম্পাদক রিয়াদুল হাসান বলেন, বর্তমানে বিশ্ব সন্ত্রাসবাদের ঝুঁকিতে আছে বাংলাদেশ। একটি ঘূর্ণিঝড় যেমন বহুদেশের উপর দিয়ে বয়ে যায়, তা কোনো সীমারেখা বা সরকারের পরোয়া করে না, তেমনি জঙ্গিবাদ প্রতিটি মুসলিম দেশেই একটা ঝড়ের সৃষ্টি করছে। এটা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সংকট নয়, বৈশ্বিক সংকট যার প্রভাব বাংলাদেশেও পড়েছে। সবাই তা অনুধাবন করছেন কিন্তু এই ঝড় ফেরানোর জন্য তাদের হাতে একটাই উপায়, তা হলো শক্তি দিয়ে দমন করা। কিছু সন্ত্রাসী ধরা পড়ছে কিছু ধরা পড়ছে না, কিন্তু জঙ্গিবাদ বিস্তার লাভ করছে। এখনও সময় আছে সরকার ও জনগণকে বুঝতে হবে যে ধর্মীয় আবেগ শক্তি প্রয়োগে আরো বৃদ্ধি পায়। তার প্রমাণ সন্ত্রাস বিরোধী যুদ্ধের পর আই.এস.-এর উত্থান। বাংলাদেশেও বহু জঙ্গি ধরার পরও, ফাঁসি দেওয়ার পরও ব্লগার হত্যা, পুলিশ, আর্মি-পুলিশ, বিদেশি নাগরিক হত্যা ইত্যাদি দিন দিন বাড়ছে যা আমাদের দেশকে আন্তর্জাতিক চাপে ফেলে দিয়েছে। আই.এস-এর অস্তিত্ব আছে এটা স্বীকার করার জন্য চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে যা প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং বলছেন। সুতরাং দেশবাসীর জন্য অশনি সংকেত। এ থেকে রক্ষা পেতে হলে সবাইকেই সচেতন হতে হবে, ঐক্যবদ্ধ হবে। মনে রাখতে হবে ইরাকে কেবল যুদ্ধরত সেনাসদস্যরাই মারা যায় নি, সেখানে ১০ লক্ষ বেসামরিক লোক মৃত্যুবরণ করেছে। তাই জনগণকে নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে ভাবতে হবে।
সাংবাদিক নেতা কল্যাণ সাহা তার বক্তব্যে বলেন, সন্ত্রাস কোনো সুস্থ মানুষের কাম্য নয়, এর বিরুদ্ধে সকলকে সোচ্চার হতে হবে। যদিও মধ্যপ্রাচ্যের তুলনায় আমাদের দেশ এখনো অনেক ভালো আছে কিন্তু আশঙ্কামুক্ত নয়। সঙ্কট ঘনীভূত হচ্ছে। আমাদের দেশের সরকার সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে বেশ তৎপর। এখন প্রয়োজন জনগণকে সচেতন করা ও সন্ত্রাসবিরোধী কর্মকাণ্ডে জনগণকে সম্পৃক্ত করা।
দৈনিক বজ্রশক্তির উপদেষ্টা উম্মুততিজান মাখদুমা পন্নী বলেন এই জনসম্পৃক্ততায় নারীদেরকেও সম্পৃক্ত করতে হবে। আমাদের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকই নারী, কাজেই ধর্মের দোহায় দিয়ে তাদেরকে ঘরে বন্দী করে রেখে কোনো কাজেই কাক্সিক্ষত সফলতা সম্ভব নয়।
উপস্থিত অতিথিদের মধ্য থেকে ফ্লোর চেয়ে আবু তাহের বলেন, আজ এক শ্রেণির ধর্মব্যবসায়ী সাধারণ মানুষকে মধুর চাকে ঢিল ছুড়তে বলে নিজেরা মধু সংগ্রহ করেন কিন্তু ঢিল ছুড়ার জন্য ঐ ধর্মপ্রাণ সাধারণ মানুষগুলো ঠিকই মৌমাছির কামড় খান। কিন্তু ধর্ম কখনোই স্বার্থ সিদ্ধির হাতিয়ার হতে পারে না। আমাদেরকে এখন সকল প্রকার অন্যায়ের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে আদম (আ.) এর ধর্ম তথা মানুষের কল্যাণের ধর্মের উপর।
স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকার ফোরামের সমন্বয়কারী মাহবুব নেওয়াজ চৌধুরী উক্ত গোলটেবিল বৈঠককে শ্রেষ্ঠ বৈঠক বলে অভিহিত করে বলেন, এটি অত্যন্ত সময়োপযোগী একটি আলোচনা এবং মুগ্ধতা প্রকাশ করেন অনুষ্ঠানের শৃঙ্খলা দেখে। তিনি বলেন, প্রতিটা অনুষ্ঠানে সময় যাবার সাথে সাথে মানুষ কমতে থাকে কিন্তু আজ হরাতালের একটি দিন হওয়া সত্ত্বেও এই অনুষ্ঠানে সময় গড়ানোর সাথে সাথে লোকসমাগম বেড়ে চলেছে।
বক্তারা দেশবাসীর প্রতি ঐক্যবদ্ধ হবার আহ্বান করে বলেন, স্বার্থপরের সমাজ নাই, নামাজ নাই, জান্নাত নাই। বর্তমানে আমাদের দেশে যে ষড়যন্ত্র চলছে, দেশ যে সঙ্কটে পতিত হয়েছে তা থেকে দেশকে বাঁচানো আমাদের ঈমানী দায়িত্ব ও সামাজিক কর্তব্য।
অনুষ্ঠানের এক পর্যায়ে মূল বিষয়বস্তুর উপর নির্মিত একটি সংক্ষিপ্ত প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়। অনুষ্ঠানে ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার গণমাধ্যমকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ