ইসলামের পুনর্জাগরণের পথিকৃৎ

১৬ জানুয়ারি ২০১২ তারিখে মাননীয় এমামুয্যামান পরলোকগমন করেন। হেযবুত তওহীদের শত শত সদস্য তাঁর জানাজায় অংশগ্রহণ করেন।

রিয়াদুল হাসান:

হেযবুত তওহীদের প্রতিষ্ঠাতা এমামুয্যামান জনাব মোহাম্মদ বায়াজীদ খান পন্নী উপমহাদেশের অন্যতম সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান। এই বংশের ইতিহাস বহু আধ্যাত্মিক সাধক, শাসক ও যোদ্ধার অক্ষয় কীর্তিতে মহীয়ান। সুলতানী যুগের শেষ দিকে এই পরিবার গৌড়ের রাজ-সিংহাসন অলঙ্কৃত করে। সুলতান তাজ খান কররানি, সুলতান সোলায়মান খান কররানি, সুলতান বায়াজীদ খান কররানি, সুলতান দাউদ খান কররানি তাদের সুশাসন ও কীর্তির দ্বারা আজও অমর হয়ে আছেন।
সুলতান দাউদ খান কররানি মুঘল আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বীরবিক্রমে লড়াই করেন এবং ১৫৭৬ সনে ঐতিহাসিক রাজমহলের যুদ্ধে বাংলার স্বাধীনতা রক্ষার জন্য নিজের শির উপহার দেন। কররানি রাজবংশের দুর্ধর্ষ সেনাপতি কালাপাহাড়ের বীরত্বের কথা আজও কিংবদন্তীর মতো মানুষের মুখে মুখে ফেরে। ঈসা খাঁ, প্রতাপাদিত্যসহ বারো ভুইয়ারা সকলেই ছিলেন কররানি সুলতানদের অধীন জমিদার, সেনানায়ক বা তাদের সন্তান।

মুঘল বাদশাহ জাহাঙ্গীরের শাসনামলে পন্নী পরিবার বৃহত্তর ময়মনসিংহ, গাজিপুর ও বগুড়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চল নিয়ে গঠিত আতিয়া পরগণার সুবেদার বা শাসক নিযুক্ত হন। সুলতান বায়াজীদ খান কররানির পুত্র সাঈদ খান পন্নী ১৬০৯ সনে বিখ্যাত আতিয়া মসজিদ নির্মাণ করেন। পন্নী জমিদারগণ মুঘল ও ব্রিটিশ যুগে প্রজাদরদী হিসাবে মানুষের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা পেয়েছেন। এমামুয্যামানের প্রপিতামহ হাফেজ মাহমুদ আলী খান পন্নী ছিলেন বাংলার মুসলিম জাগরণের অন্যতম পথিকৃৎ।

তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র আটিয়ার চাঁদখ্যাত দানবীর ওয়াজেদ আলী খান পন্নী ওরফে চান মিয়া সাহেব ছিলেন করটিয়ার জমিদারদের মধ্যে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ ব্যক্তিত্ব। তিনি বাংলার আলিগড় খ্যাত করটিয়া সা’দত কলেজ, এইচ এম ইনস্টিটিউশন, রোকেয়া মাদ্রাসাসহ বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। তাঁরই ছোট ভাই মাননীয় এমামুয্যামানের দাদাজান মোহাম্মদ হায়দার আলী খান পন্নী ছিলেন একাধারে একজন ন্যায়পরায়ণ জমিদার, প্রখ্যাত সুফি সাধক ও দুর্ধর্ষ শিকারী। তাঁর বোন রওশন আখতার বেগমের সঙ্গে পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হন নিখিল ভারত মুসলিম লীগের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ঢাকার নওয়াব স্যার সলিমুল্লাহ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লাহ মুসলিম হল, আজিমপুরের ইসলামিয়া এতিমখানা, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাঁর স্মৃতি ও অবদান জড়িয়ে আছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী ছিলেন মহামান্য এমামুয্যামান জনাব মোহাম্মদ বায়াজীদ খান পন্নীর মায়ের নানা। তিনি অবিভক্ত বাংলার প্রথম মুসলমান মন্ত্রী হিসাবে শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের “নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবন”-টি তাঁরই স্মৃতি বহন করছে। নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া ও কবি বেগম সুফিয়া কামালও পন্নী পরিবারের সঙ্গে নিবীড় আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ ছিলেন।

এই ঐতিহ্যবাহী পন্নী পরিবারের সন্তান মাননীয় এমামুয্যামানও ছিলেন আধ্যাত্মিক ও মানবিক চরিত্রে বলিয়ান, বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী এক মহান পুরুষ। তাঁর জন্ম ১৫ শাবান ১৩৪৩ হিজরী মোতাবেক ১৯২৫ সনের ১১ মার্চ। শিক্ষাজীবন শুরু হয় রোকেয়া দাখিল মাদ্রাসায়। তারপর এইচ. এম. ইনস্টিটিউশন থেকে ১৯৪২ সনে মেট্রিকুলেশন পাশ করেন। সা’দাত কলেজে কিছুদিন পড়ার পর বগুড়ার আজিজুল হক কলেজে ভর্তি হন। এমামুয্যামানের খালু মোহাম্মদ আলী বগুড়া, যিনি পরে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হন, তাঁর বাড়ি নওয়াব প্যালেসে থেকে তিনি প্রথম বর্ষের পাঠ সমাপ্ত করেন। দ্বিতীয় বর্ষে তিনি কলকাতার ইসলামিয়া কলেজে ভর্তি হন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও তখন একই কলেজের ছাত্র হিসাবে একই হোস্টেলে থেকে পড়াশুনা করতেন।

এখানে শিক্ষালাভের সময় তিনি ব্রিটিশ বিরোধী সংগ্রামে সম্পৃক্ত হন। সেই সুবাদে তিনি এই সংগ্রামের কিংবদন্তিতুল্য নেতৃবৃন্দের সাহচর্য লাভ করেন যাঁদের মধ্যে মহাত্মা গান্ধী, কায়েদে আযম মোহম্মদ আলী জিন্নাহ্, অরবিন্দু ঘোষ, শহীদ হোসেন সোহরাওয়ার্দি, মওলানা আবুল আলা মওদুদী অন্যতম। তিনি যোগ দিয়েছিলেন আল্লামা এনায়েত উল্লাহ মাশরেকীর ‘তেহরিক-ই-খাকসার’ আন্দোলনে। মাত্র ২২ বছর বয়সে দুঃসাহসী কর্মকাণ্ড ও সহজাত নেতৃত্বের গুণে পূর্ব বাংলার কমান্ডার ও ‘সালার-এ-খাস হিন্দ’ মনোনীত হন।

শিকারের নেশা তাঁর রক্তে মিশে ছিল। মাত্র ১৪ বছর বয়সে তিনি কুমির শিকার করেন, প্রথম চিতাবাঘ শিকার করেন মাত্র ১৭ বছর বয়সে। দেশের বিভিন্ন জঙ্গলে শিকারের লোমহর্ষক অভিজ্ঞতা নিয়ে পরে তিনি ‘বাঘ-বন-বন্দুক’ নামক একটি বই লেখেন। শহীদ বুদ্ধিজীবী মুনির চৌধুরীর সুপারিশে বইটি দশম শ্রেণির পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল।

১৯৫১ সনে তিনি পূর্ব পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত প্রথম রায়ফেল শ্যুটিং প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অধিকার করেন। রায়ফেল শ্যুটার হিসাবে ১৯৫৬ সনে অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে অনুষ্ঠিত বিশ্ব অলিম্পিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের জন্য নির্বাচিত হন। এছাড়াও তিনি একজন নিয়মিত ফুটবলার ও মোটর সাইকেল স্ট্যান্ট ছিলেন।

দেশবিভাগের অল্পদিন পর তিনি “ব্যাচেলর অফ হোমিওপ্যাথিক মেডিসিন (MB Home)” ডিগ্রি অর্জন করেন এবং মানুষকে চিকিৎসাসেবা প্রদান শুরু করেন। ১৯৬৩ সনে মা ও শিশুদের সুচিকিৎসার জন্য তিনি করটিয়ায় হায়দার আলী রেডক্রস ম্যাটার্নিটি এ্যান্ড চাইল্ড ওয়েলফেয়ার হসপিটাল প্রতিষ্ঠা করেন। ঢাকার মিরপুরে অবস্থিত সরকারি হোমিও মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার পেছনেও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপ্রধান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামসহ অনেক বরেণ্য ব্যক্তি তাঁর রোগীদের অন্তর্ভুক্ত। বঙ্গবন্ধু ১৯৭৪ সনে কবি নজরুলের চিকিৎসার জন্য বাংলাদেশের ছয়জন শীর্ষ চিকিৎসককে নিয়ে একটি বোর্ড গঠন করেছিলেন যার অন্যতম সদস্য ছিলেন এমামুয্যামান। ১৯৯৮ সনে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের সুষ্ঠু বিকাশের জন্য তিনি প্রতিষ্ঠা করেন সা’দত আলী খান পন্নী ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন।

মাননীয় এমামুয্যামানের ঘনিষ্ঠ আত্মীয় স্বজনদের মধ্যে তাঁর চাচাতো ভাই জনাব খুররম খান পন্নী পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের চীপ হুইপ এবং একজন রাষ্ট্রদূত ছিলেন। আরেক চাচাতো ভাই হুমায়ন খান পন্নী পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত ও পরবর্তীতে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পীকার ছিলেন। খুররম খান পন্নীর পুত্র দ্বিতীয় ওয়াজেদ আলী খান পন্নী বাংলাদেশ সরকারের উপমন্ত্রী ছিলেন। এমামুয্যামানের মায়ের মামা সৈয়দ হাসান আলী চৌধুরী ছিলেন পূর্ব পাকিস্তানের শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রী।

১৯৬৩ সনে মাননীয় এমামুয্যামান টাঙ্গাইল-বাসাইল নির্বাচনী আসন থেকে পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক আইন পরিষদ উপনির্বাচনে স্বতন্ত্র পদপ্রার্থী হিসাবে দাঁড়ান এবং আওয়ামী লীগ, মুসলিম লীগের প্রার্থীগণসহ বিপক্ষীয় মোট ছয়জন প্রার্থীকে বিপুল ব্যবধানে পরাজিত করে এম.পি. নির্বাচিত হন।
মাননীয় এমামুয্যামান ধ্রুপদি সঙ্গীতের একজন বিশেষজ্ঞ ছিলেন। নিজেও উপমহাদেশের প্রখ্যাত সংগীতজ্ঞ ওস্তাদ মোহাম্মদ হোসেন খসরুর কাছে রাগসঙ্গীতের তালিম নিয়েছিলেন। কবি নজরুলের কীর্তি সংরক্ষণ ও প্রচারের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত নজরুল একাডেমীর তিনি ছিলেন একজন প্রতিষ্ঠাকালীন এবং আজীবন সদস্য।

ছোটবেলায় মুসলিম জাতির ইতিহাস আর বর্তমানের মধ্যে তিনি বিরাট পার্থক্য লক্ষ করে রীতিমত সংশয়ে পড়ে যান যে এরাই কি সেই জাতি যারা শিক্ষায়, জ্ঞানে বিজ্ঞানে, সামরিক শক্তিতে, ধনবলে ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিমান, জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রতিটি অঙ্গনে যারা ছিল সকলের অগ্রণী? কীসের পরশে এই জাতি ১৪০০ বছর পূর্বে একটি মহান উম্মাহয় পরিণত হয়েছিল, আর কীসের অভাবে আজকে তাদের এই চরম দুর্দশা?

মহান আল্লাহর অশেষ রহমতে তিনি ধীরে ধীরে এ সকল প্রশ্নের উত্তর লাভ করলেন। ১৯৯৫ সনে তিনি হেযবুত তওহীদ আন্দোলনের সূচনা করেন। সত্য প্রচার করতে গিয়ে তিনি বহু নির্যাতন সহ্য করেন, একাধিকবার কারাবরণ করেন এবং নিজের সকল সম্পদ আল্লাহর রাস্তায় বিলিয়ে দেন। ১৬ জানুয়ারী ২০১২ তারিখে এ মহান ব্যক্তিত্ব পরলোকগমন করেন।

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ