আল্লাহর রসুল (স.) নারীদেরকে অবলা হয়ে থাকার শিক্ষা দিয়ে যান নি বলে মন্তব্য করেছেন হেযবুত তওহীদের এমাম হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম। তিনি বলেন, আল্লাহর রসুল নারীদেরকে গৃহকোণে আবদ্ধ করে রাখেন নি, বরং তাদেরকে শালীন পোশাক পরিয়ে গৃহ থেকে বের করে এনেছেন। তিনি তাদেরকে সামাজিত ও জাতীয় প্রতিটি কাজে অংশগ্রহণের সুযোগ করে দিয়েছেন। গত ২৪ মে ২০১৮ তারিখ রাজধানীর শাহজাহানপুর রেলওয়ে সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় হলরুমে আয়োজিত এক ইফতার মাহফিলে মুখ্য আলোচক হিসেবে বক্তব্য দানকালে তিনি একথা বলেন।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন- হেযবুত তওহীদের সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ অনলাইন টেলিভিশন এসোসিয়েশনের সভাপতি ও জেটিভি অনলাইনের চেয়ারম্যান মো. মশিউর রহমান, হেযবুত তওহীদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শফিকুল আলম উখবাহ, যুগ্ম সাধারণ ও ঢাকা মহানগরীর সভাপতি মো. আলী হোসেন, হেযবুত তওহীদের সাহিত্য সম্পাদক রিয়াদুল হাসান, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ হেযবুত তওহীদের সভাপতি শরীফুল ইসলাম, হেযবুত তওহীদের মতিঝিল থানা সভাপতি আব্দুস সালাম, বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক মো. ইসকান্দার খান, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের ১১নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর হামিদুল হক শামীম। এ সময় বিদ্যালয়ের সকল শিক্ষকবৃন্দ ও স্থানীয় সুধীজনেরা উপস্থিত ছিলেন। এছাড়াও এলাকার সহস্রাধিক সাধরণ ধর্মপ্রাণ মানুষ ও স্থানীয় হেযবুত তওহীদের সদস্যরা এতে অংশগ্রহণ করেন।


মুখ্য আলোচক তার বক্তব্যে বলেন, ‘আল্লাহর রসুলের সারা জীবনের সংগ্রামের ফল কী হয়েছিল তা ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ আছে। সে সময় এমন নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল যে, স্বর্ণালঙ্কার পরিহিতা একা একজন সুন্দরী যুবতী মেয়ে মানুষ রাতের অন্ধকারে সানা থেকে হাদরামাউত পর্যন্ত দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে পারত, তার মনে কোনো ভয় জাগ্রত হত না। আদালতে মাসের পর মাস অপরাধ সংক্রান্ত কোনো মামলা আসত না। অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা এই পর্যন্ত পৌঁছে যে, উটের পিঠে খাদ্য বোঝাই করে মানুষ পথে পথে ঘুরত, গ্রহণ করার মতন কাউকে পেত না।’ তিনি বলেন, ‘একই বৃক্ষে তো দুই রকম ফল ধরার কথা না। আল্লাহর রসুলের সময় যে ইসলাম ছিল, আজকেও যদি সেই ইসলামই থাকত তাহলে আজ সারা পৃথিবী অন্যায়, অবিচার, যুদ্ধ, রক্তপাতে পরিপূর্ণ কেন?’
সমালোচনাকারীদের জবাবে তিনি বলেন, ‘ফেসবুকে আমাকে গালাগালি করা হয়, কারণ আমার আলোচনা অনুষ্ঠান, জনসভা, সেমিনার ইত্যাদিতে মেয়েদের অংশগ্রহণ থাকে। আমি তাদেরকে বলতে চাই, আপনারা আমার সমালোচনা করার আগে ইতিহাস খুলে দেখুন। নবীজীর জীবনীর উপর রচিত সিরাতগ্রন্থগুলো পড়ে দেখুন। আপনারা কে কী বলেন সেটা দিয়ে তো বৈধ-অবৈধ নির্ধারিত হবে না, আল্লাহ কী বলেছেন, আল্লাহর রসুল কী করেছেন সেটাই হবে বৈধ-অবৈধের মানদণ্ড।’
হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম প্রশ্ন রাখেন, ‘আপনারা আমাকে বলেন তো, আল্লাহর রসুল কখনও নারীদেরকে পর্দার আড়ালে রেখেছেন? গৃহবন্দী করে রেখেছেন? আমি একটা হাদিসও পাই না যেখানে আল্লাহর রসুল বলেছেন, ‘পর্দার আড়ালের মা ও বোনেরা।’ তিনি মেয়েদেরকে পর্দার আড়ালে অবলা বানিয়ে রাখেন নাই। নারীরা রসুলের সামনাসামনি বসে সমস্ত আলোচনা শুনতেন। মসজিদে একসাথে সালাহ কায়েম করতেন। অনেক ব্যক্তিগত বিষয়েও রসুলাল্লাহকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে প্রশ্ন করতেন। যেই নারীদের কোনো মর্যাদা ছিল না, সম্মান ছিল না, আল্লাহর রসুল সেই নারীদেরকে আরবের দুর্ধর্ষ ঘোড়ায় উঠিয়ে যুদ্ধের ময়দানে নিয়ে গেলেন। নারীদের মেধা, যোগ্যতা ও প্রতিভার স্বীকৃতি মিলল। কিন্তু আজকের চিত্র ঠিক বিপরীত। নারীদেরকে পর্দার আাড়লে নির্বাসন দেওয়া হয়েছে। নারী আলোচনা অনুষ্ঠানে যেতে পারবে না, মসজিদে যেতে পারবে না, ঈদগাহে যেতে পারবে না- এটাই বাড়াবাড়ি। এইভাবে বাড়াবাড়ি করতে করতেই সহজ-সরল ইসলামকে জটিল দুর্বোধ্য বানানো হয়েছে। নামাজ নিয়ে বাড়াবাড়ি, রোজা নিয়ে বাড়াবাড়ি, পোশাক নিয়ে বাড়াবাড়ি, খাবার নিয়ে বাড়াবাড়ি, বাড়াবাড়ির শেষ নাই।’


তিনি আরও বলেন, ‘রসুলাল্লাহ ডান কাতে শুয়েছেন আমরা ডান কাতে শুই, তিনি পাগড়ি পরেছেন আমরা পাগড়ি পরি, তিনি আরবে জন্ম নিয়ে আরবের পোশাক পরেছেন, আমরা আরবের পোশাক পরি, তিনি আরবের খেজুর খেয়েছেন আমরা আরবের খেজুর খাই, তিনি মেসওয়াক করেছেন আমরাও মেসওয়াক করি- এইসব করে আমরা ভেবে নিই আমরা পাক্কা উম্মতে মোহাম্মদী হয়ে গেছি। কিন্তু না, আমরা উম্মতে মোহাম্মদী নই। কারণ আমরা রসুলাল্লাহর সুন্নাহ শান্তি প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম ছেড়ে দিয়েছি বহু শতাব্দী আগেই। বর্তমানে আমরা মারামারি, হানাহানিতে লিপ্ত, বিশৃঙ্খল একটা জনসংখ্যামাত্র। আমাদের মধ্যে থাকতে পারেন বড় বড় মুফতি, মুহাদ্দিস, আল্লামা, পীর, দরবেশ, কিন্তু আমাদেরকে দিয়ে সেই মহাদায়িত্ব পূর্ণ হবে না যেই দায়িত্ব আল্লাহর রসুল তাঁর উম্মাহর উপর অর্পণ করে গেছেন।’
প্রকৃত উম্মতে মোহাম্মদীরা কারো গোলামী করতে পারে না মন্তব্য করে তিনি আরও বলেন, ‘আমি সিলেট গিয়ে শুনি সেখানকার একজন পীর হেযবুত তওহীদের বিরুদ্ধে উঠেপড়ে লেগেছেন। আমাকে বলা হলো- কোনো একদিন নাকি সেই পীর ফুঁ দিয়ে পানির গ্লাস ভেঙে ফেলেছেন, তারপর থেকেই ওই এলাকায় তার পসার হয়েছে। আমি তাদেরকে যেই কথাটা বলেছিলাম সেটা আপনাদেরকেও বলি। আমি আমার নবীজীর জীবনীতে এবং তাঁর সাহাবীদের জীবনীতেও ফুঁ দিয়ে গ্লাস ভাঙার কোনো ঘটনা দেখি না। আমি ইতিহাসে দেখি- খালেদ বিন ওয়ালিদ একদিনে নয়খানা তলোয়ার ভেঙেছেন। আমি ইতিহাস দেখি- ওহুদের যুদ্ধে শত্রুর আঘাতে আমার রসুলের মাথায় যখন লোহার একটা অংশ ঢুকে গেল, আবু উবায়দা (রা.) সেই লোহাকে দাঁত দিয়ে তুলতে গিয়ে দুইটি দাঁত ভেঙে ফেলেছেন। আমরা তলোয়ার ভাঙা, দাঁত ভাঙার ওই ইতিহাস দেখি, গ্লাস ভাঙার ইতিহাস দেখি না। তোমরা গ্লাস ভাঙতেই পারবা, শত্রুর জঙ্গি বিমান ঠেকাতে পারবা না, দেশ বাঁচাতে পারবা না। কারণ তোমরা বিরাট বিরাট পীর দরবেশ হয়েছো, আলেম আল্লামা হয়েছো, মাওলানা মুফাসসির হয়েছো, কিন্তু উম্মতে মোহাম্মদী হতে পারো নাই। তাই এতকিছু সত্তে¡ও তোমাদের পরিণতি- শত্রুর কাছে শোচনীয় পরাজয় ও গোলামী।’ সবশেষে বিশেষ মোনাজাত ও উপস্থিতদের মধ্যে ইফতার সামগ্রী বিতরণের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠান সমাপ্ত হয়।