নিবন্ধ ও সম্পাদকীয়

খৃষ্টোৎসব

31 Jan, 2016 Super Admin 326 ভিউ
খৃষ্টোৎসব
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

তাই তোমার আনন্দ আমার পর, তুমি তাই এসেছ নীচে।
আমায় নইলে, ত্রিভুবনেশ্বর তোমার প্রেম হত যে মিছে।

দুইয়ের মধ্যে একের যে প্রকাশ তাই হল যথার্থ সৃষ্টির প্রকাশ। নানা বিরোধে যেখানে এক বিরাজমান সেখানেই মিলন, সেখানেই এককে যথার্থ ভাবে উপলব্ধি করা যায়। আমাদের দেশের শাস্ত্রে তাই, এক ছাড়া দুইকে মানতে চায় নি। কারণ, দুইয়ের মধ্যে একের যে ভেদ তার অবকাশকে পূর্ণ করে দেখলেই এককে যথার্থভাবে পাওয়া যায়। এইটিই হচ্ছে সৃষ্টির লীলা। উপরের সঙ্গে নীচের যে মিলন, বিশ্বকর্মার কর্মের সঙ্গে ক্ষুদ্র আমাদের কর্মের যে মিলন, বিশ্বে নিরন্তর তারই লীলা চলছে। তার দ্বারা সব পূর্ণ হয়ে রয়েছে।
যাঁরা বিচ্ছেদের মধ্যে সত্যের এই অখণ্ড রূপকে এনে দেন তাঁরা জীবনে নিয়ত আনন্দবার্তা বহন করে এনেছেন। ইতিহাসে এই-সকল মহাপুরুষ বলেছেন যে, কোনোখানে ফাঁক নেই, প্রেমের ক্রিয়া নিত্য চলেছে। মানুষের মনের দ্বার উদ্ঘাটিত যদি নাও হয় তবু এই প্রক্রিয়ার বিরাম নেই। তার অস্ফুট চিত্তকমলের উপর আলোকপাত হয়েছে, তাকে উদ্বোধিত করবার প্রয়াসের বিশ্রাম নেই। মানুষ জানুক বা নাই জানুক, সমস্ত আকাশ ব্যাপ্ত করে সেই অস্ফুট কুঁড়িটির বিকাশের জন্যে আলোকের মধ্যেও প্রেমের প্রতীক্ষা আছে।
তেমনিভাবে এক মহাপুরুষ বিশেষ করে তাঁর জীবন দিয়ে এই কথা বলেছিলেন যে, লোকলোকান্তরে যিনি তাঁর অভ্রচুম্বিত আলোকমালার প্রাসাদ সৃষ্টি করেছেন সেই বিচিত্র বিশ্বের অধিপতিই আমার পিতা, আমার কোনো ভয় নেই। এই বিরাট আকাশের তলে যাঁর প্রতাপে পৃথিবী ঘূর্ণ্যমান হচ্ছে তাঁর শক্তির অন্ত নেই, তা অতিপ্রচণ্ড তার তুলনায় আমরা মানুষ কত নগণ্য সামান্য জীব। কিন্তু আমাদের ভয় নেই; এই-সকলের অন্তর্যামী-নিয়ন্তা আমারই পরম আত্মীয়, আমারই পিতা। বিশ্বের মূলে এই পরম সম্বন্ধ যা শূন্যকে পূর্ণতা দান করছে, মৃত্যুশোকের উপর আনন্দধারা প্রবাহিত করছে, সেই মধুর সম্বন্ধটি আজ আমাদের অনুভব করতে হবে। আমাদের পরম পিতা যিনি তিনি বলছেন যে, ভয় নেই, সূর্যচন্দ্রের মধ্যে আমার অখণ্ড রাজত্ব, আমার অমোঘ নিয়ম অলঙ্ঘ্য, কিন্তু তুমি যে আমারই, তোমাকে আমার চাই। যুগে যুগে এই মাভৈঃ বাণী যাঁরা পৃথিবীতে আনয়ন করেন তাঁরা আমাদের প্রণম্য।
এমনি করেই একজন মানবসন্তান একদিন বলেছিলেন যে, আমরা সকলে বিশ্বপিতার সন্তান, আমাদের অন্তরে যে প্রেমের পিপাসা আছে তা তাঁকে স্পর্শ করেছে। এ কথা হতেই পারে না যে, আমাদের বেদনা-আকাক্সক্ষার কোনো লক্ষ্য নেই, কারণ তিনি সত্যই আমাদের পরমসখা হয়ে তাঁর সাড়া দিয়ে থাকেন। তাই সাহস করে মানুষ তাঁকে আনন্দদায়িনী মা, মানবাত্মার কল্যাণবিধায়ক পিতারূপে জেনেছে। মানুষ যেখানে বিশ্বকে কেবল বাহিরের নিয়মযন্ত্রের অধীন বলে জানছে সেখানে সে কেবলই আপনাকে দুর্বল অশক্ত করছে, কিন্তু যেখানে সে প্রেমের বলে সমস্ত বিশ্বলোকে আত্মীয়তার অধিকার বিস্তার করেছে সেখানেই সে যথার্থ ভাবে আপনার স্বরূপকে উপলব্ধি করেছে।
এই বার্তা ঘোষণা করতে এক দিন মহাত্মা যিশু লোকালয়ের দ্বারে এসে উপস্থিত হয়েছিলেন। তিনি তো অস্ত্রে শস্ত্রে সজ্জিত হয়ে যোদ্ধৃবেশে আসেন নি, তিনি তো বাহুবলের পরিচয় দেন নি তিনি ছিন্ন চীর পরে পথে পথে ঘুরেছিলেন। তিনি সম্পদবান্ ও প্রতাপশালীদের কাছ থেকে আঘাত অপমান প্রাপ্ত হয়েছিলেন। তিনি যে বার্তা নিয়ে এসেছিলেন তার বদলে বাইরের কোনো মজুরি পান নি, কিন্তু তিনি পিতার আশীর্বাদ বহন করেছিলেন। তিনি নিষ্কিঞ্চন হয়ে দ্বারে দ্বারে এই বার্তা বহন করে এনেছিলেন যে, ধনের উপর আশ্রয় করলে চলবে না, পরম আশ্রয় যিনি তিনি বিশ্বকে পূর্ণ করে রয়েছেন। তিনি দেশ কাল পূর্ণ করে বিরাজমান। তিনি পরম-আনন্দঃ পরমাগতিঃ এই কথা উপলব্ধি করবার জন্য যে ত্যাগের দরকার যারা তা শেখে নি তারা মৃত্যুর ভয়ে, ক্ষতির ভয়ে, প্রাণকে বুকে করে নিয়ে ফিরেছে অন্তরের ভয় লোভ মোহের দ্বারা শ্রদ্ধাহীনতা প্রকাশ করেছে। এই মহাপুরুষ তাই আপনার জীবনে ত্যাগের দ্বারা মৃত্যুর দ্বারে উপস্থিত হয়ে মানুষের কাছে এই বাণী এনে দিয়েছিলেন। তাই তিনি মানবাত্মার পরম পথকে উন্মুক্ত করবার জন্য এক দিন দরিদ্র বেশে পথে বার হয়েছিলেন। যে-সব সরল প্রকৃতির মানুষ তাঁর অনুগমন করেছিল তারা স¤পূর্ণরূপে তাঁর বাণীর মর্ম বুঝতে পারে নি। তারা কিসের স্পর্শ পেয়েছিল জানি নে, কিন্তু ভক্তিভরে তাদের মাথা অবনত হয়ে গিয়েছিল। তাদের মাথা নিচুই ছিল কারণ তাদের পরিচয় নাম ধাম কেউ জানত না, তারা সামান্য ধীবর ছিল। তারা যিশুর বাণীর প্রেরণা অনুভব করেছিল, একটি অব্যক্ত মধুর রসে তাদের অন্তর আপ্ল“ত হয়েছিল। এমনি করে যাদের কিছু নেই তারা পেয়ে গেল। কিন্তু যারা গর্বিত তারা এই পরম বার্তাকে প্রত্যাখ্যান করেছিল।
এই মহাত্মার বাণী যে তাঁর ধর্মাবলম্বীরাই গ্রহণ করেছিল তা নয়। তারা বারে বারে ইতিহাসে তাঁর বাণীর অবমাননা করেছে, রক্তের চিহ্নের দ্বারা ধরাতল রঞ্জিত করে দিয়েছে তারা যিশুকে এক বার নয়, বার-বার ক্রুশেতে বিদ্ধ করেছে। সেই খৃষ্টান নাস্তিকদের অবিশ্বাস থেকে যিশুকে বিচ্ছিন্ন করে তাঁকে আপন শ্রদ্ধার দ্বারা দেখলেই যথার্থ ভাবে সম্মান করা হবে। খৃষ্টের আত্মা তাই আজ চেয়ে আছে। বড়ো বড়ো গির্জায় তাঁর বাণী প্রচারিত হবে বলে তিনি পথে পথে ফেরেন নি, কিন্তু যার অন্তরে ভক্তিরস বিশুষ্ক হয়ে যায় নি তারই কাছে তিনি তাঁর সমস্ত প্রত্যাশা নিয়ে একদিন উপনীত হয়েছিলেন। তিনি সেদিনকার কালের সব চেয়ে অখ্যাত দরিদ্র অভাজনদরে সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে বিশ্বের অধিপতিকে বলেছিলেন যে পিতা নোহসি তুমি আমাদের পিতা।
মানুষ জীবন ও মৃত্যুকে বিচ্ছিন্ন করে দেখে, এই দুয়ের মধ্যে সে একের মিল দেখে না। যেমন তার দেহে পিঠের দিকে চোখ নেই বলে কেবল সামনেরই অঙ্গকে মেনে নেওয়া বিষম ভুল, তেমনি জীবন ও মৃত্যুর মধ্যে আপাত-অনৈক্যকেই সত্য বলে জানলে জীবনকে খণ্ডিত করে দেখা হয়। এই মিথ্যা মায়া থেকে যাঁরা মুক্তিলাভ করে অমৃতকে সর্বত্র দেখেছেন তাঁদের আমরা প্রণাম করি। তাঁরা মৃত্যুর দ্বারা অমৃতকে লাভ করেছেন, এই মর্তলোকেই অমরাবতী সৃজন করেছেন। অমর ধামের তেমন এক যাত্রী একদিন পৃথিবীতে অমর লোকের বাণী নিয়ে উপস্থিত হয়েছিলেন, সেই কথা স্মরণ করে আমরাও যেন মৃত্যুর তমোরাশির উপর অমৃত আলোর স¤পাত দেখতে পাই। রাত্রিতে সূর্য অস্তমিত হলে মূঢ় যে সে ভাবে যে, আলো বুঝি নির্বাপিত হল, সৃষ্টি লোপ পেল। এমন সময় সে অন্তরীক্ষে চেয়ে দেখে যে সূর্য অপসারিত হলে লোকলোকান্তরের জ্যোর্তিধাম উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছে মহারাজার এক দরবার ছেড়ে আর-এক দরবারে আলোর সংগীত ধ্বনিত হচ্ছে। সেই সংগীতে আমাদেরও নিমন্ত্রণ বেজে উঠেছে। মহা আলোকের মিলনে যেন আমরা পূর্ণ করে দেখি। জীবন ও মৃত্যুর মাঝখানকার এই অখণ্ড যোগসূত্র যেন আমরা না হারাই। যে মহাপুরুষ তাঁর জীবনের মধ্যেই অমৃতলোকের পরিচয় দিয়েছিলেন, তাঁর মৃত্যুর দ্বারা অমৃতরূপ পরিস্ফুট হয়ে উঠেছিল, আজ তাঁর মৃত্যুর অন্তর্নিহিত সেই পরম সত্যটিকে যেন আমরা স্পষ্ট আকারে দেখতে পাই।

মন্তব্য সমূহ (0)

বর্তমানে কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!

আপনার মতামত দিন

জনপ্রিয় ট্যাগ
#মামলার অব্যাহতি #গোলটেবিল বৈঠক #হাইকোর্টের রায় #অপপ্রচার #muchleka #কোরবানি কখন কবুল হবে? #হেযবà§�ত তওহীদ #ইসলামি ইতিহাস #উগ্রবাদ #গুজব #নারী #পর্দা #প্রকৃত ইসলাম #প্রকৃত ইসলামের নারী #হেযবুত তওহীদ #হেযবুত তওহীদের নারী #ইসলাম #নোয়াখালীত #বকধার্মিকতা #মন্তব্য কলাম #মন্তব্য কলাম বাড়ছে বকধার্মিকতা #কারা সেই জান্নাতি ফেরকা? #জান্নাতি #জান্নাতি ফেরকা #মুস্তাফিজ শিহাব #চলমান সঙ্কট #মুখলেছুর রহমান সুমন #রাজনৈতিক ইসলাম #ধর্ম নিয়ে ঘৃণার রাজনীতি #রামমন্দির ও থার্ড টেম্পল #ইসলামের অপব্যাখ্যা #জাতি ভেঙে খানখান #দীন নিয়ে বাড়াবাড়ি #দীন নিয়ে বাড়াবাড়ির #ধর্ম #পরিণাম জাতি ভেঙে খানখান #ফেরেশতা #মানুষ সৃষ্টির #মো’জেজা: কী কেন কীভাবে? #পহেলা বৈশাখ #সংস্কৃতির #সাংস্কৃতিক অঙ্গন #আমল #ঈমান #আদিবা ইসলাম #এমামুযযামান #রিয়াদুল হাসান #লা’নত নাকি পরীক্ষা #লানত #কাঁটাতারে ব্যর্থ #বিশ্বভ্রাতৃত্বের #মুসলিম #রোড টু ফিলিস্তিন #নামাজ #নামাজ কেন পড়ছেন? #মোহাম্মদ আসাদ আলী #ধর্মজীবিকা #ধর্মবিশ্বাসী #শিক্ষাব্যবস্থা #অশান্তি সৃষ্টির কারণ #এম আর হাসান #চরিত্রহীন নেতৃত্ব #বস্তুবাদী সভ্যতা #বাস্তব সমস্যা #মহানবীর (সা.) #দেশকে রক্ষা #বিশ্ব মুসলমান #মদিনার #রাকীব আল হাসান #মাননীয় এমাম #হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম #ইসলামের ইতিহাস #মো’মেনদের #দাজ্জাল #দাজ্জালকে চিনতে হবে #ধর্মব্যবসা #উম্মতে মোহাম্মাদি #তওহীদ #মো’জেজা: #মুসলিমরা আজ সংকটের সম্মুখীন #খলিফা #দীন প্রতিষ্ঠা #দীনের মূল ভিত্তি #লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ #সেরাতুল মোস্তাকিম #২৯ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী #civilized’ #deterrent #islam world #world #জীবনব্যবস্থা #প্রশ্ন উত্তর #প্রশ্নোত্তর #হেযবুত তওহীদের #hezbuttawheed #hossain mohammad salim #Resolving the Global Crisis #Students #ঐক্য ##MarathonHT #Marathon #lifestyle #ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে ঐক্যের আহ্বান #workplace #religious extremists #democratic system #economic system #politics #Allah #Aqeedah of islam #God #Haj #Jihad #Kital #Prophet Muhammad #terrorism #কোরবানি #ত্যাগ #বজ্রশক্তি #সম্পাদক এসএম সামসুল হুদা #সাক্ষাৎকার #হেযবুত তওহীদের বিজয় #রসুলুল্লাহর সুন্নাহ #দাসপ্রথার #জঙ্গিবাদ #আইয়্যামে জাহেলিয়াত #জেহাদ #দোয়া #সঠিক জীবন ব্যবস্থা #জ্ঞান #বাণী #ইমাম মাহদী #কবিতা #রাজনীতি #মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থা #আশুরা #শহীদ #প্রকৃত ইসলামের মসজিদ #মসজিদে নারী #দাউদ খান পন্নী #ঔপনিবেশিক যুগ #সংগীত #স্বাধীনতা #খোলাফায়ে রাশেদীন #যোদ্ধাসুফি #স্বর্ণযুগের মোল্লাতন্ত্র #মানুষ সৃষ্টি #প্রকৃত ইসলামের বিয়ে #বাংলার সুলতানী যুগ #গণমাধ্যম #মহামান্য এমামুযযামানের জীবনবৃত্তান্ত #ইসলাম অর্থ #শান্তি #পাকিস্তান #দৈনিক বজ্রশক্তি #খেলাধুলা #আইনের উৎস #নির্বাচন #সংস্কৃতি #জ্ঞান-বিজ্ঞান #মহানবীর লড়াই #হজ #সাম্যবাদ ও ইসলাম #বাংলাদেশ #কোর’আন #শিক্ষা #নবুয়তপূর্ব জীবন #ইসলামবিদ্বেষী #ইতিহাস ও ইসলাম #চরমোনাই #ওমর (রা.) #তারেক বিন যিয়াদ #কর্মফল #পুঁজিবাদ #মার্কস #হারাম #সুফিবাদ #বাঙালি #মানবজীবন #মুসলিমদের ইতিহাস #প্রশ্ন #রাগ #আকিদা #কমিউনিজম #জান্নাত-জাহান্নাম #মণীষীদের জীবনী #মধ্যযুগীয় বর্বরতা #স্বর্ণযুগ #গণজোয়ার #গণপ্রতিরোধ #তওহীদী জনতা #কর্মজীবন #ইসলাম আবির্ভাব #ইসলামের বিস্তৃতি #অর্থনীতি #রিজিক #বিস্ময়কর আন্দোলন #নারী স্বাধীনতা #মোনাফেক #সাম্প্রদায়িকতা #তাকওয়া #৫ দফা কর্মসূচি