কামরুল হাসান

বাংলায় ইসলামের ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, প্রথমে মুসলিমরা এতদঞ্চলের সার্বভৗম ক্ষমতার অধিকারী হয়, তারপর সুফি-দরবেশদের আগমন ঘটে। সুফি-সাধকদের আধ্যাত্মিক ক্ষমতা ও কেরামতি দেখে বহু মানুষ ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে ইসলাম গ্রহণ করে। ইতিহাসবিদদের মধ্যে সুফিবাদকে অতি মূল্যায়ন করতে গিয়ে এখানকার মুসলিম শাসনের গুরুত্বকে ছোট করে দেখানোর একটি প্রবণতা লক্ষ করা যায় এবং তার প্রভাবে অনেকে মনে করেন- এখানকার মানুষের ইসলাম ধর্ম গ্রহণের সবটুকু কৃতিত্বই সুফিদের প্রাপ্য। কিন্তু এ ধারণা সর্বাংশে সত্য নয়। প্রকৃতপক্ষে অত্র এলাকায় ইসলামের বীজ বপন করে মুসলিম শাসকরা, আর সেই বীজকে চারায় রূপান্তরিত হবার জন্য উপযুক্ত আলো-বাতাস সরবরাহ করেন সুফি-সাধকরা। বাংলায় ইসলামের প্রচার ও প্রসারে মুসলিম মুজাহিদরা সর্বাত্মক সংগ্রাম করার মাধ্যমে যে অবদান রেখেছেন, সুফি-দরবেশদের অবদানের চেয়ে তা কোনো অংশে কম নয়। কিন্তু মুজাহিদদের সেই সংগ্রামকে ছাপিয়ে সুফি-দরবেশদের অবদানকে বড় ও প্রধান করে দেখানোর অন্যতম কারণ হচ্ছে ইসলামের সংগ্রামী দিকটিকে আড়াল করে রাখা এবং প্রমাণের চেষ্টা করা যে, ইসলাম হচ্ছে নামাজ, রোজা, যেকের-আজগার, দোয়া-কালাম, আধ্যাত্মিক সাধনা ইত্যাদি ব্যক্তিগত উপসনাকেন্দ্রিক ধর্ম, সমাজ ও রাষ্ট্রের সাথে ইসলামের সম্পর্ক নেই। অর্থাৎ মুসলিমদের উচিত কেবল ব্যক্তিগত এবাদত-আমল নিয়ে পড়ে থাকা, সমাজের কোথাও অশান্তি আছে কিনা, অন্যায়-অবিচার হচ্ছে কিনা, দমন-পীড়ন চলছে কিনা- এসব নিয়ে মাথা ঘামানো মুসলিমদের দায়িত্ব নয়। এ প্রবণতা প্রথম শুরু হয় ব্রিটিশ শাসনামলে মুসলিমদেরকে পদানত করে রাখার জন্য। তারপর তা সংক্রমিত হয় উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে। এ বিষয়ে বিস্তারিত লিখতে গেলে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা লেখা যায়। আমার আলোচনার প্রসঙ্গ সেটা নয়। মূল আলোচনায় যাবার আগে এটুকু জেনে রাখলেই চলবে যে, বাংলায় ব্যাপকভাবে ইসলামের আগমন ঘটেছিল মুসলিম মুজাহিদদের সংগ্রামের ফলে এবং ইসলামের প্রসার ঘটেছিল মুসলিম শাসক ও ওলি-আউলিয়াদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায়।
ওলি-আউলিয়াদের সম্পর্কে অনেকেরই ধারণা সীমিত, যাদের ধারণা আছে তারা আবার মিথ্যা ইতিহাসের শিকার হয়ে থাকেন। ওলি-আউলিয়ার নাম শুনলেই আমাদের চোখের সামনে যেমন ধ্যানগ্রস্ত বুজুর্গের ছবি ভেসে ওঠে বাস্তবতা কিন্তু তেমন নয়। তাদের জীবনেও রয়েছে সংগ্রামী সোনালি অধ্যায়। দুই জালাল, শেখ জালালুদ্দিন তাবরিজী (মৃত্যু ১২২৬ অথবা ১২৪৪) ও শেখ শাহ জালাল (মৃত্যু ১৩৪৭) ছিলেন বাংলার শ্রেষ্ঠ দুই সুফি সাধক। ১২০৫ সালে হিন্দু রাজা লক্ষণসেনকে পরাজিত করে বখতিয়ার খিলজীর বাংলা বিজয়ের পর শেখ জালালুদ্দিন তাবরিজী বাংলায় আসেন। তিনি পান্দুয়ার (মালদহ, পশ্চিম বাংলা) নিকট দেবতলায় স্থায়িভাবে বসতি গাড়েন। তার সমকালীন ঘটনাপ্রবাহ তেমন জানা না গেলেও ঐতিহাসিকরা কতিপয় ঘটনার সূত্র ধরে ধারণা করেন, তার সাথে প্রত্যক্ষ যুদ্ধ বা যুদ্ধসংশ্লিষ্ট সহিংসতার ঘটনা ঘটে এবং হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী একটি বড় সংখ্যার জনগোষ্ঠী ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে।
বাংলার আরেক শ্রেষ্ঠ সুফি সাধক আবাস গেড়েছিলেন সিলেটে। বাংলাদেশী মুসলিমদের কাছে তিনি আজও অতুলনীয় সম্মানের অধিকারী হয়ে আছেন। বাংলাদেশের সিলেটে শাহজালাল (র.)- এর স্থায়িভাবে বসবাস শুরু করার ঠিক পূর্বে সিলেটের শাসনকর্তা ছিলেন গৌরগোবিন্দ নামে এক হিন্দু রাজা। শাহজালাল বাংলায় আসার পূর্বে গৌড়ের সুলতান শামসুদ্দিন ফিরোজ শাহ দুইবার গৌরগোবিন্দকে আক্রমণ করেন। উভয় আক্রমণের নেতৃত্বে ছিলেন সুলতান শামসুদ্দিন ফিরোজ শাহের ভাতিজা সিকান্দর খান গাজী। দুবারেই মুসলিমরা পরাজিত হয়। এরপর সুলতানের প্রধান সেনাপতি নাসিরুদ্দিনের পরিচালনায় গৌর গোবিন্দের বিরুদ্ধে তৃতীয় আক্রমণ চালানো হয়। এ জিহাদ অভিযানে অংশ নিতে বিখ্যাত সুফি সাধক নিজামুদ্দিন আউলিয়া তার বিশিষ্ট শিষ্য শাহজালালকে ৩৬০ জন অনুসারীসহ প্রেরণ করেন। শাহজালাল (র.) ভক্তদের নিয়ে বাংলায় পৌঁছে মুসলিম বাহিনীতে যোগ দেন। প্রচণ্ড যুদ্ধের পর রাজা গৌর গোবিন্দ পরাজিত হয়। কথিত আছে সেই যুদ্ধে মুসলিমদের বিজয়ের সবটুকু কৃতিত্বই ছিল শাহজালাল (র.) ও তার ভক্তদের প্রাপ্য। সিলেটে শাহজালাল (র.) এর মাজারে এই সুফি সাধক ও বীর মুজাহিদের তলোয়ার এখনও সংরক্ষিত আছে।
অপর এক দৃষ্টান্ত অনুসারে, বাংলায় ইসলামের প্রসারে সুফি সাধক নূর কুতুব-ই-আলম কেন্দ্রীয় ভূমিকা রেখেছিলেন বলে জানা যায়। ১৪১৪ সালে বিদ্রোহী হিন্দু যুবরাজ গণেশ মুসলিম শাসককে হটিয়ে দিয়ে বাংলার ক্ষমতা দখল করেন। এ বিদ্রোহের ফলে বাংলার সুফিরা প্রচণ্ড অসন্তুষ্ট হন এবং তারা তার শাসন মেনে নিতে অস্বীকার করে বাংলার বাইরের মুসলিম শাসকদের কাছে সাহায্যের আবেদন করেন। তাদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে ইব্রাহিম শাহ সারকি বাংলা আক্রমণ করে গণেশকে পরাজিত করেন। তৎকালীনবাংলার নেতৃস্থানীয় সুফি সাধক নূর কুতুব-ই-আলম সাময়িক শান্তি স্থাপনের মধ্যস্থতাকারী রূপে এগিয়ে আসেন। তিনি গণেশকে সিংহাসন ত্যাগে বাধ্য করে গণেশের বার বছরের মুসলিম পুত্র জালালুদ্দিন মোহাম্মদকে সিংহাসনে বসান।
একইভাবে ইসলামের সত্য ও ন্যায়ের আলো সর্বত্র ছড়িয়ে দেয়ার অভিপ্রায়ে দক্ষিণ বাংলায় সংগ্রাম করেন খান জাহান আলী (র.), উত্তর বাংলায় সুলতান মাহমুদ মাহী সওয়ার (র.), পশ্চিম বাংলায় শাহ শফী উদ্দিন (র.), শাহ সুলায়মান (র.), সৈয়দ চন্দন শহীদসহ অনেক বিপ্লবী মুজাহিদ। তাদের জীবনী পড়লে দেখা যায় যে, সত্য প্রতিষ্ঠার সংগ্রামেই তাদের জীবনের বেশির ভাগ সময় কেটেছে। সিলেটের শাহ জালালের (র.) মতো অনেকের হাতের তলোয়ার আজও রক্ষিত আছে। তারা যে আধ্যাত্মিক সাধকও ছিলেন না তা আমি বলছি না, তাদের আধ্যাত্মিক সাধনাও অবশ্যই ছিল। কারণ তাদের জীবন প্রকৃত মুসলিম ও উম্মতে মোহাম্মদীর মতোই ভারসাম্যযুক্ত ছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তাদের জীবনের সশস্ত্র সংগ্রামের ভাগটুকু ছেটে ফেলে তাদের কেরামতির ভাগটাকেই শুধু প্রধান নয় একমাত্র ভাগ বলে প্রচার করা হয়েছে।
ইসলামকে সুফি-সাধকের ধর্ম ও বাংলাদেশকে সুফি-সাধকদের দেশ বলে ইসলামকে মসজিদ-মাদ্রাসা-খানকা-দরগার চৌহদ্দির ভেতরে আটকে রাখার যে প্রচেষ্টা চলে ইতিহাস তাকে সমর্থন করে না। সুফি সাধকরা যেটা করেছেন সে বিবেচনা থেকে বলতে গেলে বলতে হবে- ইসলাম মিথ্যার বিরুদ্ধে লড়াই করার ধর্ম, সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের ধর্ম, সংঘর্ষের ধর্ম। সংঘর্ষকে এড়িয়ে চলার বাসনায় মিথ্যাকে মেনে নেওয়ার নাম ইসলাম নয়। এমনকি ব্যক্তিগতভাবে আধ্যাত্মিক চর্চা করে কেরামতির ক্ষমতা অর্জন করাও ইসলামের চূড়ান্ত লক্ষ্য নয়। ইসলামের উদ্দেশ্য মানবজীবনে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা যার জন্য সংঘর্ষ ও লড়াইয়ের প্রয়োজন। বাংলার সুফি-সাধকরা একদা সত্য প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম করেছেন বলেই এতদঞ্চলের মানুষ ইসলামের দেখা পেয়েছে। তারা যদি ঘরে বসে থেকে ভারসাম্যহীনভাবে ধ্যান করেই জীবন পার করতেন তাহলে আমাদের ইতিহাস অন্য রকম হতো। সুতরাং কেউ যদি বলে ‘শাহ জালালের বাংলাদেশ’ কেউ যদি বলে ‘সুফি সাধকের বাংলাদেশ’ তা এই অর্থই প্রকাশ করে যে, বাংলাদেশ মিথ্যা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের দেশ, বাংলাদেশ সংগ্রামের দেশ, বাংলাদেশ প্রতিবাদের দেশ। অন্যায়, অবিচার, অশান্তি দেখে মুখ বুঁজে ও হাত গুটিয়ে বসে থাকার দেশ বাংলাদেশ নয়। সুফি-সাধকরা অন্যায়-অশান্তি দেখেও হাত গুটিয়ে বসে থাকার শিক্ষা দেন নি।
লেখক: হেযবুত তওহীদের ভোলা জেলা আমীর।