মুস্তাফিজ শিহাব

বর্তমান বিশ্বের দিকে তাকালে আমরা স্পষ্ট দেখতে পারি যে বর্তমানে ধর্ম নাম্বার ওয়ান ইস্যু। বিশ্ব রাজনীতি ও সামজিক প্রেক্ষাপট উভয় দিক থেকে ধর্মকে ব্যবহার করা হচ্ছে। আমরা হেযবুত তওহীদ আন্দোলন দীর্ঘদিন থেকে এ কথাটিই বলে আসছি।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কথাই চিন্তা করি। সেখানে ধর্ম নিরপেক্ষতাবাদী গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত কিন্তু সেখানেও ধর্ম দিয়ে ফায়দা হাসিল করা হচ্ছে। এই কিছুদিন আগেই ডোনাল্ড ট্রাম্প, ইসলামের বিরুদ্ধে কথা বলে, জনগণকে উসকে দিয়ে, ক্ষমতায় আসলেন। ক্ষমতায় আসার জন্য ব্যবহার করা হলো ধর্মকে। আসুন তাকাই ইউরোপের দিকে। ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি, বেলজিয়াম, স্পেন ইত্যাদি দেশগুলোতে ধর্মের, বিশেষ করে ইসলামের, বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রোপাগান্ডা চালানো হচ্ছে। সেখানে তারা খ্রিষ্টান নীতিকে কাজে লাগাচ্ছে। জনমনে ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে ভয় সৃষ্টি করছে। অনেকেই বলছেন আগামী নির্বাচনে ফ্রান্স ও জার্মানীসহ আরো কয়েকটি দেশে ধর্মভিত্তিক দলগুলি ক্ষমতায় আসতে পারে।
পার্শ্ববর্তী ভারতের দিকে তাকালেও বিষয়টি আরো স্পষ্ট হয়। একশ বছরের পুরাতন ধর্ম নিরপেক্ষবাদী ‘কংগ্রেস’কে তুলার মতো উড়িয়ে দিয়ে ক্ষমতায় আসলো ধর্মভিত্তিক দল ‘ভারতীয় জনতা পাটি’। এখানেও ধর্মকে ব্যবহার করেই রাজনীতি করা হচ্ছে। পাশ্ববর্তী দেশ মিয়ানমারের দিকে তাকাই, সেখানে তারা দাবি করলো মিয়ানমারে শুধু বৌদ্ধরাই থাকতে পারবে। সেখানে অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের বিশেষ করে মুসলমানদের কোনো জায়গা নেই। সে কারণে দশ লক্ষ মুসলমানকে জোর করে বের করে দেয়া হলো। মধ্যপ্রাচ্যে শিয়া ও সুন্নিদের দ্বন্দ্ব আজ তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে এসে ঠেকেছে। ধর্মকে মূল কারণ হিসেবে নিয়ে, ধর্মকে ইস্যু করে পুরো বিশ্বে ভয়ানক তা-ব চলছে, চলছে ভয়ংকর মর্মান্তিক যুদ্ধ। উদাহরণস্বরূপ আমরা আফগান যুদ্ধের কথাই ধরতে পারি।
কমিউনিস্ট রাশিয়ার ইতিহাস দেখুন। যে রাশিয়ান কমিউনিস্টরা ধর্মকে নির্বাসিত করেছিল সেই তারাই এখন পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ মসজিদ, একসাথে দশ হাজার লোক নামাজ পড়তে পারবেন, নির্মাণ করছে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন নিজে ঐ মসজিদ উদ্বোধন করেছেন। এর কারণ কী? এর কারণ একটিই রাজনৈতিক স্বার্থ। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলো আকৃষ্ট হবে এবং হয়েছেও। সৌদি বাদশাহ বিশাল বহর নিয়ে রাশিয়া সফরে গিয়েছেন, অস্ত্র কিনেছে এবং অস্ত্রচুক্তিও করেছে। স্বাধীনতার পর থেকে ধর্মকে কেন্দ্র করে আমাদের দেশে অনেক কিছু হয়েছে যা সম্পর্কে আপনারা জানেন। সরকারগুলিকে উৎখাত করার জন্য ধর্মকেই এক নাম্বার ইস্যু হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। সরকারকে নাস্তিক, ধর্মদ্রোহী ফতোয়া দিয়ে জনমনে উস্কানি সৃষ্টি আমাদের দেশে নতুন কিছু নয়।
ধর্মকে কেন্দ্র করে. ধর্মকে উসিলা করে রাজনীতির পাশাপাশি জঙ্গিবাদী কর্মকা-ও করা হচ্ছে। যারা জঙ্গীবাদের দিকে পা বাড়চ্ছে তাদেরকে ধর্মীয় অপব্যাখ্যার মাধ্যমেই সে পথে নেয়া হচ্ছে। কোর’আন, হাদিসের অপব্যাখ্যার মাধ্যমে তাদের দিয়ে জেহাদের নাম করে সন্ত্রাসী কর্মকা- করানো হচ্ছে। এই জঙ্গিবাদী কর্মকা-ের জন্য দোষ হচ্ছে ধর্মের, দোষ হচ্ছে ইসলামের। বলা হচ্ছে ইসলাম ধর্ম খারাপ, ইসলাম ধর্ম সন্ত্রাস শিখায়, মুসলমান জঙ্গী, সন্ত্রাসী, অসভ্য, কূপম-ুক। ধর্মকে আজ সবাই নিশানা করেছে, ব্যবহার করছে হাতিয়ার হিসাবে।
তাহলে এখন কী করবেন? ধর্মকে বাদ দিয়ে দিবেন? পারবেন না। মানুষের মনে ধর্ম বিশ্বাসের দাপট অনেক। ইতিহাস থেকে পর্যালোচনা করলে দেখি যুগে যুগে ধর্মের নিয়ম-কানুন, অনুশাসনের মাধ্যমে রাষ্ট্রকে পরিচালিত করা হয়েছে। কিন্তু খ্রিষ্টান ধর্মের ভারসাম্যহীনতার ফলে সমাজে ও রাষ্ট্রে গোলযোগ শুরু হয়। ঈসা (আ.) প্রেরিত হয়েছিলেন ধর্মের আত্মিক দিক নিয়ে যা শুধু মাত্র বনী-ইসরাইলের জন্য কারণ মুসার শরীয়তের আত্মিক দিকটিকে তৎকালীন ধর্মব্যবসায়ী শ্রেণী বিকৃত করে ফেলেছিলো। ঈসা (আ.) তাঁর আনীত বানীকে ইহুদিদের বাইরে প্রচার করার ব্যাপারে বার বার নিষেধ করেছিলেন কিন্তু তিনি চলে যাবার পর পল নামক এক ব্যক্তি তাঁর অনুসারী হিসবে নিজেকে দাবি করে এবং সে ঈসা (আ.) এর অবাধ্য হয়ে তাঁর বানীকে ইউরোপে নিয়ে যায় এবং প্রচার করতে থাকে। এরই ধারাবাহিকতায় প্রায় ৩০০ বছর পর স¤্রাট কন্সট্যান্টাইনের আমলে খ্রিষ্ট ধর্মকে রাষ্ট্রীয় ধর্ম হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়। কিন্তু ঈসা (আ.) এর আনীত ব্যবস্থায় শুধু ব্যক্তিগত আত্মিক উন্নতীর বিষয়গুলি ছিল, সেখানে কোন অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও দ-বিধি ছিল না এর ফলে জনগণের মধ্যে এক ধরনের ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি হয়। ধর্মকে রাষ্ট্রীয়ভাবে গ্রহণ করা ফলে ধর্মগুরুদের প্রভাব জনগণের উপর তীব্রভাবে পড়ে। এরই প্রেক্ষিতে পরবর্তীতে ধর্মগুরু অর্থাৎ পোপদের সাথে শাসকদের বিতর্কের সৃষ্টি হয় যার রেষ ধরে ইউরোপে অনেক বছর পর্যন্ত গৃহযুদ্ধ চলতে থাকে। একদিকে শাসকের শাসন অন্যদিকে ধর্মগুরুদের ধর্মের আদলে সৃষ্ট ভীতি উভয়ের ফলে জনগণ অতিষ্ঠ হয়ে যায় এবং তারা এই অবস্থা থেকে বের হবার পথ খুঁজতে থাকে। ফলস্বরূপ ধর্মকে বাদ দেয়ার চিন্তা আসলেও তা কার্যত সম্ভব হয় না এবং ধর্মকে শুধু ব্যক্তিগত জীবনে সীমাবদ্ধ করা হয়। জাতীয় জীবনকে পরিচালিত করার জন্য সৃষ্টি করা হয় আইন-কানুন, দ-বিধি যাতে ধর্মের কোন প্রভাব থাকবে না। জন্ম হয় ধর্ম নিরপেক্ষতার।
এরাই পরবর্তীতে গোটা দুনিয়ায় তাদের এই মতাদর্শ প্রচার করে। এরা যেখানে যেখানে যায় সেখানেই তারা এই ধর্মনিরপেক্ষতাকে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে। ভারতবর্ষে যখন ব্রিটিশরা নিজেদের পতাকা গাড়তে সমর্থ হলো তখন তারা এখানেও একই কাজ করলো। ধর্মকে তারা ব্যক্তিজীবনে নির্বসিত করলো। “তোমরা যত খুশি নামাজ পড়ো, যত খুশি পুজা, উপাসনা করো, যত খুশি মসজিদ, মন্দির, গির্জা, প্যাগোডায় যাও কোন আপত্তি নেই শুধু রাষ্ট্রীয়জীবনে আমাদের হুকুম মেনে নিতে হবে। আমাদের তৈরি তন্ত্র-মন্ত্র দিয়ে দেশ চালাতে হবে।”- এই ছিল ব্রিটিশদের তথা দাজ্জালীয় সভ্যতার অনুসারীদের কথা। এরই ধারাবাহিকতায় মানুষ যাতে কোনভাবেই ধর্মের দিকে পুনরায় যেতে না পারে, ধর্মকে মানুষের মন ও মগজ থেকে চিরতরে বিতারিত করার জন্য তারা ব্যাপক আকারে প্রপাগান্ডা শুরু করল। তারা নবী রসুল ও অবতারদের কথাকে মিথ্যে গাল-গল্প বলে প্রমাণের চেষ্টা শুরু করল। তারা মানুষের সামনে ধর্মকে আফিম হিসেবে তুলে ধরল। এছাড়াও তারা নবী রসুলদের মধ্যযুগের চতুর প্রকৃতির লোক হিসেবে আখ্যা দিল যারা মানুষকে পরিচালিত করার জন্য, তাদের ভয় প্রদর্শনের জন্য আল্লাহ, ঈশ্বর, ভগবান ইত্যাদি কাল্পনিক চরিত্র সৃষ্টি করেছেন। তাদের মতে পরকাল বলে কিছু নেই, জান্নাত-জাহান্নাম বলে কিছু নেই; ইহকালই সব।
কিন্তু তাদের এ সকল চেষ্টাই বৃথা। মানুষের মন ও মগজ থেকে চিরতরে ধর্মকে নির্বসিত করা কখনই সম্ভব ছিলো না এবং সম্ভব নয়ও। কারণ মানুষের মধ্যে আল্লাহর রূহ বিদ্যমান (সুরা হিজর ২৯)। আল্লাহ মানুষকে অন্য সকল সৃষ্টির মতো ‘কুন’ শব্দ দিয়ে সৃষ্টি করেন নি। তিনি আদমকে তথা মানুষকে সৃষ্টি করেছেন নিজ হাতে। এ মানুষকে সৃষ্টি করার পিছনে আল্লাহর উদ্দেশ্য রয়েছে। এই মানুষ আল্লাহ খলিফা, আল্লাহর প্রতিনিধি। মানুষের অসাধারণ চিন্তাশক্তি রয়েছে, রয়েছে সুন্দরত অবয়ব। মানুষের হৃদয় রয়েছে, সে উপলব্ধি করে। নিরবে, নিভৃতে বিপদে পড়লে মানুষ সেই মহান ¯্রষ্টা সেই মহান প্রভু কে স্মরণ করে। তাই ধর্মকে বাদও দেয়া যাবে না অবজ্ঞাও করা যাবে না। ধর্মীয় অনুভূতি সবার মাঝেই বিদ্যমান। এর ফলেই যখনই তারা কোন অবজ্ঞার দৃষ্টান্ত দেখে বা তাদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগে তখন তারা আগ্নেয়গিরির অগ্নুতপাতের মতো ফেটে পড়ে। ধর্মব্যবসায়ী গোষ্ঠী তাদের ঈমানকে হাইজ্যাক করে জাতি বিনাশী কর্মকা-ে লিপ্ত করে। তখন সরকারকে বাধ্য হয়ে দমন নীতি ব্যবহার করতে হয়। সরকার আবার সেই ধর্মব্যবসায়ীদের দ্বারাই জনগণকে নিয়ন্ত্রিত করতে চান, তাদের দিয়ে ওয়াজ, মাহফিল করানোর ব্যবস্থা করেন কিন্তু জনগণ সেটা নিবে না কারণ জনগণ এখন তাদের রূপ চিনতে শুরু করেছে।
তাহলে বর্তমান এই ধর্ম সংকট থেকে মুক্তির উপায় কী? আমরা হেযবুত তওহীদ আপনাদের সামনে মুক্তির উপায় তুলে ধরছি। পূর্বেও বলে এসেছি ধর্মবিশ্বাসকে অবজ্ঞা করার কোনো রাস্তা নেই। তাহলে মানুষের ধর্মবিশ্বাসকে, ঈমানী চেতনাকে জাতির কল্যাণে, মানবতার কল্যাণে কাজে লাগতে হবে। আল্লাহ যে ধর্ম শেষ রসুলের মাধ্যমে প্রেরণ করেছেন সেই প্রকৃত ধর্ম মানুষের সামনে তুলে ধরতে হবে। বর্তমানে আমারা যে ধর্মগুলি দেখছি সেগুলো বহুপূর্বেই বিকৃত হয়ে গিয়েছে। বর্তমানে যে ইসলাম রয়েছে সে ইসলাম আল্লাহ রসুলের প্রকৃত ইসলাম নয়। এ ইসলামের অনুসারীরা আজ হাজার হাজার ভাগে বিভক্ত। এদের একেকজনের একেক আদর্শ। এদের একদল গান শুনাকে হারাম মনে করে, আরেকদল ছবি তোলাকে হারাম মনে করে, নারীদের অংশগ্রহণকে বাঁকা চোখে দেখে। কিন্তু আল্লাহ এগুলোর কোনটিকেই হারাম করেননি, হারাম করেছেন অশ্লীলতাকে। নারীদের ব্যাপারে এদের দৃষ্টিভঙ্গি সংকীর্ণ। ইসলামের ব্যাপারে পরিস্কার আকিদা না থাকার ফলে এদের দিয়ে রাষ্ট্র চলবে না। সেই প্রকৃত ইসলাম আজ কোথাও নেই যে ইসলাম মানুষের সুকুমার বৃত্তিকে স্বীকৃতি দেয়, যে ইসলাম মানুষের শিল্প সাহিত্যের স্বীকৃতি দেয়, যে ইসলামকে যুক্তিবোধকে উদ্বুদ্ধ করে, নারী ও পুরুষের সকলকাজে সমানভবে অংশগ্রহণকে স্বীকৃতি দেয়, উৎসাহিত করে, যে ইসলাম মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে, মানুষের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ সৃষ্টি করে। আল্লাহ তাঁর অশেষ কৃপায় আমাদের সামনে সেই ইসলামের প্রকৃত রূপ তুলে ধরেছেন। আমরা সেই প্রকৃত রূপ আপনাদের সামনে তুলে ধরছি।
অনেকেই হয়তো আমাদের সম্পর্কে জানেন না, অনেকেই হয়তো বলতে পারেন আমরা আল্লামা, মুফতি বা শায়েখ নই, গতানুগতিক ধারায় যারা ইসলামের কথা বলে তারা মাদ্রাসা শিক্ষিত কিন্তু আমরা মাদ্রাসা শিক্ষিত নই। কিন্তু তাদের উদ্দেশ্যে বলবো আপনারা অপেক্ষা করুন। একটি আন্দোলনকে বুঝার জন্য দীর্ঘ ২৩ বছর যথেষ্ঠ। আমরা মানুষকে মানবতার কল্যাণে কাজ করার জন্য উদ্বুদ্ধ করছি, আমরা মানুষের সামনে সঠিক ইসলাম নিয়ে দাঁড়িয়েছি এবং আমরাই পারবো বর্তমানের সংকট থেকে জাতিকে উদ্ধার করতে। ধর্ম ও রাষ্ট্রের মধ্যে চলমান যে অবিশ্বাস, দ্ব্ন্দ্ব, সংঘাত ইত্যাদি দূর করে জনগণ কিভাবে দেশ ও জাতির কল্যাণে নিজেদের জীবন ও সম্পদ উৎসর্গ করার জন্য প্রস্তুত হবে সেই আদর্শ আমাদের কাছে রয়েছে। আমরা সেই আদর্শই আপনাদের সামনে তুলে ধরছি। যাচাই করুন এবং সিদ্ধান্ত নিন। সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় এখনই।

(লেখক- কলামিস্ট, facebook/ glasnikmira13)