মুস্তাফিজ শিহাব

খুব বেশিদিন আগের কথা না। তখন আমি মিরপুর থাকতাম। আমার বাসার পাশেই একজন ভদ্রলোক থাকতেন। এলাকায় তার খুব নাম-যশ ছিল। তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী মানুষ। পড়াশুনা করেছিলেন ইঞ্জিনিয়ারিং-এ। এর সুবাদে খুব নামী-দামী একটি প্রতিষ্ঠানে চাকুরি করতেন। আমার তখন অভ্যাস ছিল সকালে উঠে একটু হাটাহাটি করার। তো আমি খুব ভোরে উঠে যখন প্রাত ভ্রমণে বের হতাম তখন দেখতাম সেই ভদ্রলোক অফিসে যাচ্ছেন। তিনি ছিলেন বিবাহিত তাই আমি তাকে আঙ্কেল বলে সম্বোধন করতাম। তিনি নিয়মিত একটি মোটর-সাইকেলে যাতায়াত করতেন। আবার বিকেলে যখন আমি খেলাধুলা শেষ করে বাসায় ফিরে আসতাম তখন দেখতাম তিনি ক্লান্ত পরিশ্রান্ত হয়ে ফিরছেন। এরপর তাকে আমি আর বাসার বাইরে খুব একটা দেখতাম না। তিনিও এর পরের সময়টি বাসায় থাকতে পছন্দ করতেন। খুব জরুরি না হলে বের হতেন না। এমনকি এলাকায় কোনো গোলমাল হলেও তিনি সে ব্যাপারে কোন কিছু বলতেন না। এগুলো এড়িয়ে চলতেন। এভাবেই তার দিন কেটে যেত। আমার মনে মাঝে মধ্যে প্রশ্ন জাগত, এটাই কী একজন মানুষের জীবন?

একটি পশুর জীবনের দিকে যদি আমরা দৃষ্টিপাত করি তবে আমরা এ দৃশ্যই দেখি। একটি পশু জন্ম নেয়। জন্মের পর পরই তাকে শেখানো হয় কীভাবে শিকার করতে হয়। পশু জগতে শিকারের গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি কারণ সেখানে টিকে থাকতে হলে শিকারে দক্ষতা অর্জন অনিবার্য। এরপর দেখা যায় পশু বড় হয়, পশু পরিণত বয়সে বংশ বৃদ্ধি করে ও একসময়ে পশুটি মারা যায়। মাটির সাথে মিশে যায়। তাহলে পশু ও আমার চেনা সেই ভদ্রলোকের জীবনের মধ্যে তফাৎ কী দাঁড়ালো?

আল্লাহ পবিত্র কোর’আনের সুরা বাকারায় মানুষের সৃষ্টির কালে আল্লাহর সাথে মালায়েকদের যে কথোপকথন হয় সে বিবরণ তুলে ধরেছেন। সেখানে আল্লাহ যখন মালায়েকদেরকে বললেন তিনি পৃথিবীতে তাঁর খলিফা প্রেরণ করবেন তখন মালায়েকরা বলেছিল যে এ সৃষ্টি ফ্যাসাদ ও সাফাকুদ্দিমা অর্থাৎ অন্যায়-অশান্তি ও রক্তপাত করবে। কিন্তু আল্লাহ তাদের কথা সত্ত্বেও আদম (আ) কে তৈরি করলেন। এরপর তিনি তাঁকে বিজ্ঞানের শিক্ষা দিলেন ও মালায়েকদের সামনে যখন তিনি প্রমাণ করলেন যে আদম (আ) তাদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। তখন তিনি মালায়েকদের বললেন তাঁকে সেজদাহ করার জন্য। সবাই করলো কিন্তু ইবলিস করলো না। ইবলিস অহংকার করলো ও এর জন্য সে আল্লাহর নৈকট্য থেকে বিতাড়িত হল। এই কারণে ইবলিস আল্লাহকে চ্যালেঞ্জ করল যে সে আদম (আ.) ও তাঁর বংশধরদের অর্থাৎ আমাদেরকে সহজ সরল পথ থেকে বিচ্যুতি করবে। সেই থেকে চলে আসছে মানুষ ও ইবলিসের দ্বন্দ। আমাদের মূল কাজই হল আল্লাহকে এ চ্যালেঞ্জে জয়যুক্ত করা।

আজকে গোটা মানবজাতি সেই ফাসাদ ও সাফাকুদ্দিমায় পতিত, অন্যায় অশান্তি রক্তপাতে নিমজ্জিত হয়ে ইবলিসকে বিজয়ী করে রেখেছে। বর্তমান সিস্টেমের চাপে পড়ে মানুষ তার প্রকৃত লক্ষ্য উদ্দেশ্য ভুলে গিয়েছে। তারা সকলেই পাশ্চাত্য বস্তুতান্ত্রিকতায় আকৃষ্ট হয়ে পড়ে একটি যান্ত্রিক জীবনে প্রবেশ করেছে। তারা এখন চাইলেও কিছু করতে পারছে না। তাদের মেধা-চিন্তা-চেতনা এখন আর মানবতার কল্যাণে ব্যায় হচ্ছে না। তাদের সামনে যাই হোক না কেন, সমাজের ভালো বা মন্দ তারা সেদিকে ভ্রুক্ষেপ করে না। তারা অনেকটা উটপাখির মতো বালিতে মাথা গুঁজে নিজেদের জীবন ধারণ করে।
এই লোকগুলোই জীবন থাকা সত্ত্বেও মৃত কারণ তারা তাদের এ জীবনে কাজে লাগাচ্ছে না। আল্লাহর মানুষকে যে কাজের জন্য তৈরি করেছে সে কাজটি তারা করছে না। তারা ভুলে গিয়েছে যে তারা পশু নয়, মানুষ। তাদের মধ্যে আল্লাহর রূহ রয়েছে।
তবে তাদের মধ্যেই অনেক লোক রয়েছে যারা তাদের মধ্যকার মেধা, শ্রম, প্রজ্ঞাকে মানবতার কল্যাণে লাগাতে চায় কিন্তু তারা বর্তমানের এই ব্যবস্থার জন্য পারছে না। ধরুন একটি হাঙর মাছের বাচ্চা, যে স্বপ্ন দেখে সে একদিন তার ধারালো দাঁতের প্রয়োগে পুরো সমুদ্রের রাজত্ব করবে তবে সেটা স্বাভাবিক। কিন্তু সে সেই স্বপ্ন দেখছে একটি অ্যাকুরিয়ামের মধ্যে থেকে। সেই চাইলেও তাঁর স্বপ্ন পূরণ করতে পারবে না কারণ সিস্টেম তাকে স্বপ্ন পূরণ করার কোন সুযোগ দিবে না। যদি সে তার স্বপ্ন পূরণ করতেই চায় তবে তাকে অ্যাকুরিয়াম নামক জীবন ব্যবস্থা থেকে বের হয়ে সাগরে যেতে হবে।

তাই আপনাদের কাছে আমার অনুরোধ আসুন ঐক্যবদ্ধভাবে এ জীবনব্যবস্থাকে পরিত্যাগ করি। আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে চেষ্টা করলেই এই জীবনব্যবস্থাকে আমরা পরিত্যাগ করতে পারব। এ সভ্যতা পঁচে গেছে। মানবজাতিকে ধ্বংসের দোরগোড়ায় এনে দাঁড় করিয়েছে। এখন যদি একে পরিত্যাগ করে নতুন জীবনব্যবস্থাকে ধারণ না করা হয় তবে তা হবে মস্ত বড় বোকামী। তাই এখন আমাদের একমত হতে হবে যে নতুন একটি সভ্যতার নির্মাণ প্রয়োজন। তাই আসুন ঐক্যবদ্ধ হই। আসুন আল্লাহ প্রেরিত ন্যায় ও সাম্যের জীবনব্যবস্থাকে গ্রহণ করি। অন্যথায় আমাদের মধ্যকার মনুষ্যত্বকে আমরা প্রকাশ করেতে ব্যর্থ হবো। আমরা যে কারণে এ পৃথিবীতে এসেছি সেই কাজে ব্যর্থ হবো। এখনই সময় এ স্বার্থপর আত্মকেন্দ্রিক জীবনব্যবস্থাকে ছুঁড়ে ফেলে দেয়ার। আমাদের ধমনীতে রক্ত তো বইবে, আমাদের হৃদপিণ্ড প্রতিনিয়ত আন্দোলিত হবে কিন্তু আমরা প্রত্যেইকেই এক একটি জীবন্ত লাশে পরিণত হবো।

লেখক: সহকারী সাহিত্য সম্পাদক, দৈনিক বজ্রশক্তি।