মোহাম্মদ আসাদ আলিঃ

ছোটবেলা এই কবিতাটি পাঠ্যপুস্তকে থাকার সুবাদে বহুবার পড়েছি। অনেক সময় দলবেধে কয়েকজন মিলে পড়তাম; কিন্তু কবি কেন এই কবিতা লিখেছেন তার কিছ্ইু তখন বুঝি নি। আজ এই পরিণত বয়সে আন্দাজ কোরতে পারছি বিদ্রোহী কবি নজরুল এ কবিতায় কী বুঝাতে চেয়েছেন। আমার কাছে এই কবিতা নতুনভাবে ধরা দিয়েছে। আমার অনুভূতি পাঠকের সঙ্গে ভাগাভাগি করার জন্য পেশ কোরলাম, জানি না ক’জন আমার সঙ্গে একমত হবেন।
এখানে ‘সকাল বেলা’ বোলতে কবি দিনবদলের কথা, নতুন সভ্যতার কথা বোলেছেন। যেখানে অন্ধকার, গোলামি, হানাহানি, অভাব, দরিদ্র, অন্যায়, অবিচার থাকবে না। আর অন্ধকার দিনের অবসান ঘোটিয়ে শুভ সকাল অর্থাৎ নয়া সভ্যতার শুরুতেই জেগে উঠবেন কবি এবং জাতিকে গোলামির জিঞ্জির থেকে মুক্ত কোরবেন। সকাল বেলায় পাখি যেমন নতুন দিনের আগমনী বার্তা ঘোষণা করে, মানুষকে ঘুম থেকে জাগায় তেমনি কবিও একটি আলোকময় নতুন সভ্যতার ঘোষক হোতে চান। তাই তিনি জাগতে চান দিন শুরু হওয়া অর্থাৎ ‘সুয্যি মামা’ জাগার আগেই।
মা এখানে পুরাতন জরাজীর্ণ সমাজের প্রতীক। একটি নতুন সভ্যতার জন্ম দিতে যখন কিছু মানুষ রাজপথে নেমে আসে, বিপ্লবের স্বপ্ন দেখে, তখন প্রাচীনপন্থীরা তাদের বহুযুগের সংস্কারকেই আঁকড়ে ধরে রাখতে চায়। তারা ধমক দিয়ে বলে, “হয় নি সকাল ঘুমোও এখন”। এইভাবে তারা নতুনদেরকে ঘরে আটকে রাখতে চায়। তাদের প্রতি কবি বোলছেন, মা, তুমি আলসে হোতে পার, অত্যাচারকে মুখ বুজে সইতে পার, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ না কোরতে পারো, কিন্তু তা বোলে কি সমাজ পরিবর্তন হবে না? নতুন সভ্যতার আগমন ঘটবে না? নতুন দিনের সূর্য উঠবেই উঠবে। কেউ তাকে ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না। তোমার ছেলে উঠুক না উঠুক, জাগুক না জাগুক, অন্যরা জাগবেই। তাদের ঘুম ভাঙবেই।
শেষ চার চরণে কবি অভিমানের সুরে বোলেছেন, আমাকে তো জাগতেই হবে। আমরা না জাগলে কিভাবে সকাল হবে? অন্ধকার গোলামি, জুলুম, অত্যাচার এর অবসান ঘটিয়ে মুক্তির, সত্যের, ন্যায়ের প্রভাত আমাকেই তো আনতে হবে। তোমার মত মায়েরা যদি তাদের সন্তানদের আদর কোরে ঘুম পাড়িয়ে রাখে তবে জাতির কখনও মুক্তি আসবে না। জাতির জীবন থেকে রাতের নিকষ অন্ধকার দূর হবে না। অন্যায়, অবিচার, অশান্তির কালো মেঘ দূরীভূত হোয়ে ন্যায় ও শান্তির আলোকময় সভ্যতা শুরু হবে না। কাজেই মাগো তোমরা আর তোমাদের সন্তানদের ঘুম পাড়িয়ে রেখো না। তাদের জাগাও, তাদের জাগতে দাও। তাদের কানে ঘুম পাড়ানী গান নয়, বিপ্লবের মন্ত্র গাও। অন্ধকার দূর হবেই হবে। মুক্তির নতুন প্রভাত আসবেই আসবে।