সভ্য জাতি বিনির্মাণে সংস্কৃতি

রিয়াদুল হাসান

বর্তমানে আমরা একটি কঠিন সময় অতিবাহিত করছি। পুরো বিশ্ব আজ দাজ্জালীয় ‘সভ্যতা’র করতলগত। এখানে ন্যায়-অন্যায় বলে কিছু নেই। এখানে শক্তি ও অর্থই সব। অর্থই এখানে সম্মানিত হওয়ার একমাত্র মানদ-। মানুষের মধ্যকার মনুষ্যত্ব আজ ধ্বংসপ্রায়। প্রশ্ন হলো- এই যুগসন্ধিক্ষণে এসে আমাদের করণীয় কী? আমাদের একমাত্র করণীয় হচ্ছে এই দাজ্জালীয় ‘সভ্যতা’কে ভেঙ্গে একটি নতুন সভ্যতার নির্মাণ করা। একটি পুরাতন জরাজীর্ণ অট্টালিকাকে ভেঙ্গে সেই জায়গায় নতুন একটি অট্টালিকা নির্মাণ চাট্টিখানি কথা নয়।
প্রচলিত বিকৃত ইসলামের ধারক-বাহক-প্রচারক ও ধর্মব্যবসায়ীরা নারীদের ঘরে বন্দী করে রাখতে চায়, তারা সুস্থ বিনোদন ও মননে অস্বীকৃতি জানায়, তারা গান-বাজনাকে হারাম বলে ঘোষণা করে। এদের ফলে ধর্মের কোনো বাস্তবমুখী, জীবনমুখী চর্চা আমাদের সমাজে নেই; আছে কেবল সংকীর্ণতা, আত্মকেন্দ্রিক পরকালমুখিতা, সহিংসতা, সাম্প্রদায়িকতা, জঙ্গিবাদ। জাতির ঐক্য নষ্ট করা যে কুফর তা তারা শেখান না, ষোল কোটি মানুষ প্রায় সকলেই ধর্মবিশ্বাসী হলেও সর্বত্র চলে অনৈক্যের শিক্ষা, অপরের বিষোদগার ও ষড়যন্ত্র করে জয়ী হওয়ার প্রচেষ্টা।
বর্তমানে যারা ইসলামের ধারক-বাহক সেজে বসে আছেন তারা গান-বাজনা, চিত্রাঙ্কন, ভাস্কর্য ইত্যাদির নাম নিলেই ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ জপতে থাকেন, ভাবটা এমন যেন এগুলো বিশাল পাপের বিষয়। ছোটবেলায় আমরা শুনতাম গান শোনা যাবে না, চলচ্চিত্র দেখা যাবে না। কিন্তু এ ধারণা সঠিক নয়। এ ধারণা এসেছে দাজ্জালীয় বস্তুবাদী সভ্যতা থেকে। দাজ্জালীয় সভ্যতার সংস্পর্শে এসে যখন গান, সিনেমা, নাটক ইত্যাদিতে অশ্লীলতার প্রসার হয় তখন এ ধরনের ধারণা জন্মে। অশ্লীলতা থেকে মুক্তি লাভের চেষ্টা না করে আমাদের আলেম সমাজ সাংস্কৃতিক চর্চাকেই হারাম ঘোষণা করে দিলেন। মাথা ব্যথা দেখে মাথা কেটে ফেলা যে যুক্তিসংগত নয় তা সুস্থ মস্তিস্কের যে কোনো মানুষই স্বীকার করবেন।
প্রতিটি জাতির মধ্যে বিভিন্ন সংস্কৃতি সৃষ্টির পেছনে ধর্মের অবদানই মুখ্য। এটা উপলব্ধি না করে তারা একচেটিয়াভাবে চিত্রাঙ্কন, সিনেমা, নাটক, সঙ্গীত, ভাস্কর্যনির্মাণ ইত্যাদির চর্চাকে না-জায়েজ বলে ফতোয়া দিয়ে মানবজাতির প্রগতির পথ, সাংস্কৃতিক বিবর্তনের স্বাভাবিক গতিকে রুদ্ধ করতে চান। অথচ প্রকৃতপক্ষে যে কোনো সুকুমার বৃত্তি যা মানুষের ইতিবাচক মানসিক বিকাশ সাধন করে, মানুষকে আনন্দিত করে, তাকে সৃষ্টিশীল হতে, মানবতার কল্যাণে আত্মনিয়োগ করতে উদ্বুদ্ধ করে তা কোনো ধর্মেই নিষিদ্ধ নয়। ধর্মের চিরন্তন ও মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে শান্তি। ইতিহাসের দিকে যদি আমরা তাকাই তবে বেশি দূর যেতে হবে না, ‘৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের সময়ও রচিত গানগুলো এখনো আমাদের বিপ্লবের চেতনায় উদ্দীপ্ত করে। এই সংকটময় সময়ে গান হবে বিপ্লবী, সংগীত হবে সমাজকে পরিবর্তনের অন্যতম হাতিয়ার, চিত্রকলায় থাকবে মুক্তির বার্তা, ভাস্কর্যয় ফুটে উঠবে আমাদের আদর্শের প্রতিচ্ছবি। কিন্তু যারা মনে করেন ইসলাম সংস্কৃতি চর্চাকে হারাম করেছেন তাদের এ ধারণা পরিবর্তন করতে হবে। ইসলামের ব্যাপারে যদি আমরা কোন মতামত পেশ করি তবে তা অবশ্যই আল্লাহ ও তাঁর রসুলের (সা.) বিধান অনুযায়ী হতে হবে। কিন্তু কোর’আন, হাদিসের কোথাও গান-বাজনা ও অন্যান্য সাংস্কৃতিক উপাদানগুলোকে হারাম বলে ঘোষণা করা হয়নি, উল্টো সুস্থ বিনোদন ও গান-বাজনাকে সমর্থন দেয়া হয়েছে।
পবিত্র কোর’আনে আল্লাহ বলেন, “তোমাদের জন্য যা হারাম করা হয়েছে তার বিস্তারিত বিবরণ দেয়া হয়েছে (সুরা আল আনআম ১১৯)।” আল্লাহ পবিত্র কোর’আনের কোথাও গান-বাজনার ব্যাপারে কোন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেননি। পবিত্র কোর’আনে অন্যত্র তিনি বলেন, “আল্লাহ অবশ্যই মশা ও সেরূপ বস্তু দ্বারা উপমা পেশ করতেও লজ্জাবোধ করেন না (সুরা বাকারা ২৬)।” এই আয়াতের পর এ কথা স্পষ্ট হয়ে যায় যে আল্লাহ যদি সত্যিই গান-বাজনা ও অন্যান্য সাংস্কৃতিক উপাদানগুলোকে হারাম করতে চাইতেন তবে তিনি তা কোর’আনে স্পষ্ট জানিয়ে দিতেন। এবার আমরা দেখবো রসুলের জীবনে রসুল এগুলোকে হারাম বলে ঘোষণা করেছেন কিনা। কারণ আল্লাহ অনেক বিষয়ই রসুলের মাধ্যমে আমাদের সামনে উপস্থাপন করেছেন।
রসুলাল্লাহ (স.) এর জীবন থেকে যদি আমরা দেখি তবে স্পষ্ট দেখবো তিনি সুস্থ বিনোদন, আনন্দ উৎসব ও গান-বাজনা ইত্যাদি বর্জন করেন নি। রসুলাল্লাহর জীবনীকে যদি এক নজরে দেখি তবে স্পষ্ট দেখব তাঁর সমগ্র জীবনটাই সংগ্রামী। মাত্র ২৩ বছরে তাঁকে ৭৮ টি যুদ্ধ করতে হয়েছে যেখানে অনেকগুলোতেই তিনি নিজে প্রত্যক্ষ নেতৃত্ব প্রদান করেছেন। এমন একজন বিপ্লবীর জীবনে ঘরে বসে থেকে গান শোনা সম্ভব হয় নি। তবুও তিনি গান শুনেছেন।
হাদিসে রয়েছে, “রসুল (স.) একদিন মদিনার গলিপথ দিয়ে যাচ্ছিলেন। কয়েকটি বালিকা দফ বাজিয়ে গান গেয়ে বলছিলো, আমরা বনু নাজ্জারের বালিকার দল, কত খোশনসীব! মুহাম্মদ (স.) আমাদের প্রতিবেশী। তখন আল্লাহর রসুল বলেন, আল্লাহ অবগত আছেন, আমি তো তোমাদের ভালোবাসি (সুনানে ইবনে মাজাহ)।” অন্যত্র দেখা যায়, আবু বোরায়দা (রা.) থেকে বর্ণিত, “একদিন রসুলাল্লাহ যুদ্ধ থেকে ফেরার পর একজন কালো বর্ণের তরুণী তাঁর কাছে হাজির হলেন এবং বললেন, হে আল্লাহর রসুল, আমি মানত করেছিলাম যে, আল্লাহ যদি আপনাকে সহিহ সালামতে যুদ্ধের ময়দান থেকে ফিরিয়ে আনেন তবে আমি আপনার সামনে দফ বাজাবো ও গান গাইবো। আল্লাহর রসুল জবাব দিলেন, তুমি যদি মানত করে থাকো তবে তা পূর্ণ করো। অতঃপর তরুণীটি গান গাইতে শুরু করলো। (তিরমিযি শরীফ, দ্বিতীয় খ-)।” এভাবে আল্লাহর রসুলের জীবনে গান শোনার ঘটনা অনেকবার ঘটেছে। আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেছেন, “একদিন আবু বকর (রা.) তাঁর (রসুলাল্লাহর) নিকট এলেন। এ সময়ে তাঁর (রসুলাল্লাহর) নিকট দুটি মেয়ে দফ বাজাচ্ছিল। নবী (স.) তাঁর চাদর আবৃত অবস্থায় ছিলেন। তখন আবু বকর (রা.) মেয়ে দুটিকে ধমক দিলেন। তখন আল্লাহর রসুল মূখম-ল থেকে কাপড় সরিয়ে বললেন, হে আবু বকর, তাদের বাঁধা দিও না, এটা তাদের ঈদের দিন (সহিহ বোখারী)।”
এরপরও কি বলার সুযোগ থাকে ইসলাম সুস্থ সংস্কৃতি চর্চায় বাধা দেয়?

লেখাটি শেয়ার করুন আপনার প্রিয়জনের সাথে

Email
Facebook
Twitter
Skype
WhatsApp
জনপ্রিয় পোস্টসমূহ