রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধ: শেষ হবে কীভাবে?

আরশাদ মাহমুদ:
১৯৭৯ সালে রাশিয়া ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নভুক্ত দেশ। সোভিয়েত ইউনিয়ন তখন বিশ্বের সুপার পাওয়ার, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যার টেক্কা! সোভিয়েতের কাছেও প্রচুর পারমাণবিক বোমা, আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের কাছেও পারমাণবিক বোমা। কেউ কাউকে আক্রমণ করতে পারে না তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ লেগে যাওয়ার ভয়ে, কিন্তু সরাসরি আক্রমণ না করলে কী হবে, উভয়পক্ষই চাইত যে কোনো উপায়ে প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রকে ধ্বংস করে বিশ্বে একক সুপার পাওয়ার হয়ে উঠতে। কীভাবে লাঠি না ভেঙে সাপ মারা সম্ভব, তাই নিয়ে জল্পনা-কল্পনা চলতে থাকত উভয় দেশের সামরিক অঙ্গণে।

এমনই পরিস্থিতিতে গত শতাব্দীর আশির দশকে বিশ্ব রাজনীতির রঙ্গমঞ্চ হয়ে উঠেছিল আফগানিস্তান! আফগানিস্তান দেশটি রাশিয়ার প্রতিবেশী এবং ভূরাজনৈতিকভাবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ দেশ। সোভিয়েত ইউনিয়ন চাইত আফগানিস্তানে কমিউনিস্ট সরকার ক্ষমতায় থাকুক। এতে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভূরাজনৈতিক সুবিধা পাবে। সঙ্গত কারণেই যুক্তরাষ্ট্রের চাওয়া ছিল বিপরীত। দেশটি চাইত আফগানিস্তানে আর যাই হোক কমিউনিস্ট সরকার যেন কায়েম হতে না পারে। এখনকার ইউক্রেনের মতোই ছিল ব্যাপারটা। রাশিয়া চাইছে ইউক্রেনে রুশ-মদদপুষ্ট সরকার ক্ষমতায় বসাতে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র চাইছে ইউক্রেনে রুশবিরোধী জেলেনস্কি সরকারকে ক্ষমতায় রাখতে। ক্ষমতার এই টানাটানির এক পর্যায়ে রাশিয়া যেমন ইউক্রেনে সেনা পাঠিয়েছে, একইভাবে ১৯৭৯ সালের ডিসেম্বরে সোভিয়েত ইউনিয়ন সেনা পাঠিয়েছিল আফগানিস্তানে।
সোভিয়েত ইউনিয়ন যখন সেনা পাঠায়, সামরিক কর্মকর্তারা ভেবেছিল তাদের সেনারা আফগানিস্তানে থাকবে মাত্র ছয় মাস। তারা ঘুনাক্ষরেও ভাবেনি- ছয় মাস নয়, এমনকি ছয় বছরেও ওই যুদ্ধের শেষ হবে না। বস্তুত তারা সেদিন দশ বছরের এমন একটি যুদ্ধের জন্ম দিয়েছিল যা সোভিয়েত ইউনিয়নকেই ভেঙে টুকরা টুকরা করে ফেলেছিল।

পুতিনের ইউক্রেন আক্রমণের ঘটনায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যেমন শুরুতেই তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করা থেকে বিরত থাকে, ১৯৭৯ সালেও তেমনটাই ঘটেছিল। শুরুতেই প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের শিবিরে চলছিল সামরিক ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ, জেনারেল, গোয়েন্দা কর্মকর্তা ও সরকারের দফায় দফায় বৈঠক। বৈঠকে উঠে আসছিল একের পর এক প্রস্তাবনা। কী করা যেতে পারে? আফগানিস্তানের মত গুরুত্বপূর্ণ ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ সোভিয়েতের হাতে চলে গেলে মুশকিল, আবার সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে সরাসরি কোনো সামরিক পদক্ষেপ নিলে কুরুক্ষেত্র বেধে যাবে। সময়টা স্নায়ুযুদ্ধের- তা আগেই বলে এসেছি। কাজেই মার্কিন সেনাকে সোভিয়েত সেনার মুখোমুখী দাঁড় করানো যাবে না- এই নীতি ঠিক রেখে যা কিছু করা যায় আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রকে তা করতে হবে।

সিআইএ’র ধূর্ত অফিসাররা যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সমন্বয় কমিটির কাছে আফগানিস্তানে গুপ্ত অভিযান পরিচালনার বেশ কয়েকটি পথ তুলে ধরলেন। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মতামত রাখলেন মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি ওয়াল্টার স্লোকাম্বে। তিনি প্রস্তাব রাখলেন “সোভিয়েত ইউনিয়নকে আফগানিস্তানের মাটিতে আটকে ফেলতে হবে।” সম্ভবত ওয়াল্টার স্লোকাম্বের ওই প্রস্তাবটিই যুক্তরাষ্ট্রের নীতি নির্ধারকরা গ্রহণ করেছিলেন, যা পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহে স্পষ্ট বোঝা যায়।

আসলে আফগানিস্তানের মুসলিমপ্রধান জনগোষ্ঠীর কাছে সোভিয়েত ইউনিয়নের ও কমিউনিজমের গ্রহণযোগ্যতা ছিল না। তা সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতারাও বুঝতেন। তারা চেয়েছিলেন সামরিক শক্তি খাটিয়েই আফগানিস্তানে কমিউনিস্ট সরকার টিকিয়ে রাখতে। হয়ত ভেবেছিলেন- বিশাল সামরিক শক্তিসম্ভারের বিপরীতে নিরীহ গোবেচারা আফগানরা কি আর টিকে থাকতে পারবে! ঠিকই বশ্যতা মেনে নিতে বাধ্য হবে। কিন্তু ইতিহাস সে পথে গেল না।

আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানে শুরু করল প্রক্সিযুদ্ধ। আফগানদের ধর্মীয় চেতনা ব্যবহার করার জন্য সৌদি আরব, পাকিস্তান, মিসর ইত্যাদি দেশের সহায়তায় আফগানিস্তানে “মুজাহিদ বাহিনী” গড়ে তোলা হলো, যাদের অস্ত্রপাতি সরবরাহের দায়িত্ব নিল আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের সিআইএ, প্রশিক্ষণের দায়িত্ব নিল পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই, আর অর্থ সরবরাহের দায়িত্ব পড়ল মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ আরব রাষ্ট্রগুলোর উপর। মুসলিম বিশ্বে জেহাদের জোশ উঠিয়ে দিলেন আরব প্রভাবাধীন ধর্মীয় নেতারা। শুরু হলো আফগানিস্তানের জেহাদ। একদিকে বিশ্বের সুপার পাওয়ার সোভিয়েত সেনাদের অত্যাধুনিক অস্ত্রপাতি, ট্যাংক, যুদ্ধবিমান, আরেকদিকে হাজার হাজার আফগান মুজাহেদিনের জেহাদী জোশ। এই মুজাহেদিনরা আমেরিকার স্বার্থে রক্ত দিলেও পরবর্তীতে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের চরম শত্রু হয়ে উঠেছিল ও “জঙ্গি” তকমা পেয়েছিল, তবে তার আগেই তাদের ঈমানী চেতনা ব্যবহার করে কাজের কাজটি আমেরিকা ঠিকই উসুল করে নিয়েছিল। দীর্ঘ দশ বছর আফগান মোজাহেদিনদের ব্যবহার করে সোভিয়েত সেনাদের ব্যস্ত রাখা হয়েছিল আফগানিস্তানের মাটিতে। এত দীর্ঘ সময়ের যুদ্ধের ব্যয় মেটাতে না পেরে এবং যুদ্ধে বিজয়ী হতে না পারার আনুষঙ্গিক ক্ষয়ক্ষতি সামলাতে না পেরে সোভিয়েত ইউনিয়নের সেনারা আফগানিস্তান থেকে কেবল পশ্চাৎপসরণই করল না, কিছুদিন না যেতেই ভেঙেই পড়ল সোভিয়েত ইউনিয়ন। আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনা সফল হলো, যদিও তার জন্য চরম মূল্য দিতে হয়েছে আফগানিস্তানের জনগণকে ও মুসলিম জাতিকে। আজও সেই মাসুল দিতে হচ্ছে ‘জঙ্গিবাদ’ ইস্যুতে।

প্রশ্ন হচ্ছে, সোভিয়েত নেতারা যে ভুলটা করেছিলেন সেই একই ভুল কি এবার পুতিন করলেন ইউক্রেনে আক্রমণ চালিয়ে? ইউক্রেন কি হয়ে উঠবে রাশিয়ার দ্বিতীয় আফগানিস্তান?

আফগানিস্তানের জনগণ যেমন রুশ শাসনকে পছন্দ করত না, তেমনি ইউক্রেনের জনগণও রুশ আধিপত্য মানতে চায় না। সোভিয়েত নেতারা যেমন আফগানিস্তানে সেনা পাঠিয়েছিল, পুতিনও সেভাবেই সেনা পাঠিয়েছেন ইউক্রেনে। আফগান যুদ্ধ যেমন সহজে শুরু হলেও সহজে শেষ করা যায়নি, পুতিনও কিন্তু পারছেন না ইউক্রেন অভিযান শেষ করতে। বরং শুরুতে যতটা কঠিন মনে হয়েছিল, এখন মনে হচ্ছে তারচেয়েও কঠিন পরিস্থিতিতে পড়েছেন পুতিন সেনারা। কেননা যুক্তরাষ্ট্রসহ পুরো ন্যাটো জোট অস্ত্র, অর্থ ও গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করছে ইউক্রেনকে। গুঞ্জন রয়েছে, ন্যাটোর পক্ষ থেকে শুধু অত্যাধুনিক অস্ত্রই নয়, অস্ত্র চালাবার দক্ষ সৈন্যও পাঠানো হচ্ছে ইউক্রেনে। এভাবে শীতল যুদ্ধের দিনগুলোতে আফগানিস্তানের জমি ও মুসলিমদের ধর্মানুভূতিকে ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্র যেমন সোভিয়েতের সঙ্গে ছায়াযুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিল, ইউক্রেনেও একইভাবে আরেকটি ছায়াযুদ্ধের সূচনা হয়েছে সেই দুটো পরাশক্তিধর রাষ্ট্রের মধ্যেই।

এদিকে রাশিয়ার উপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তো ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে শুরুতেই। সামরিক বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন- দিনদিন পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে যাবে এবং আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে অস্ত্র সরবরাহ অব্যাহত রেখেছে, তাতে সহিংসতা আরও বাড়তে থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাহলে পুতিনও কি সেই গর্তেই পা দিলেন, যে গর্তে পা দিয়ে সর্বনাশ ডেকে এনেছিলেন সোভিয়েত নেতারা? এখন পুতিন সামনে এগোতে চাইলে আরও জোরালো অভিযান চালাতে হবে, ব্যয় হবে আরও লক্ষ লক্ষ কোটি টাকা। এতবড় ধাক্কা সামাল দেওয়ার মতো অর্থনীতি কি পুতিনের আছে? হয়ত আছে বা হয়ত নেই। তবে যাই হোক, পুতিন পিছিয়ে আসতেও পারবেন না। তার পিছিয়ে আসাটাই পরাজয় হয়ে দেখা দিবে এবং তাকে ভালোভাবেই পেয়ে বসবে পশ্চিমা জোট।

তবে এখানে কথা আছে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন আর রাশিয়ার পতন সমান কথা নয়। সোভিয়েত ইউনিয়ন ছিল একটি জোট। তা ভেঙে গেছে, সেই সঙ্গে ভেঙে গেছে কমিউনিজমের স্বপ্ন। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো ধ্বংস হয়ে যায়নি। দেশগুলো পেয়েছে স্বাধীনতা। কিন্তু রাশিয়ার ক্ষেত্রে ব্যাপারটা হবে ভিন্ন। রাশিয়া যদি সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে ভেঙে পড়ে, তাহলে জনগণ স্বাধীনতা পাবে না, বরং স্বাধীনতা হারাবে। আর তীব্র আর্থিক দুর্দশা তৈরি হবে সারা দেশে। সুপার পাওয়ার হিসেবে নতুনভাবে আত্মপ্রকাশ করার যে অভিলাস রাশিয়ার ছিল, তা মাটির সঙ্গে মিশে যাবে। সমস্যা হলো- রাশিয়ার স্বপ্ন যদি কোনোদিন মাটির সঙ্গে মিশে যাওয়ার মতো অবস্থা হয়, তাহলে নেতারা কী করবেন তার আগাম হুমকি দিয়ে রাখা হয়েছে। আর তা নিয়েই যত ভয়। প্রেসিডেন্ট পুতিন ও তার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ বারবার বলেছেন সঙ্কটে পড়লে পরমাণু বোমা হামলার হবে।

রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরো খোলাখুলিভাবে বলেছেন, পশ্চিমারা ইউক্রেনের কাছে অস্ত্রের চালান পাঠালে রাশিয়া সেখানে হামলা করার অধিকার রাখে। এই সংঘাত তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধে রূপ নিতে পারে বলেও তিনি সতর্ক করে দিয়েছেন। কেউ বলছেন- এই হুমকি কেবলই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে দেওয়া হচ্ছে, বাস্তবে কখনই তা ঘটবে না। আবার কেউ বলছেন- ঘটতেও পারে। রাশিয়া যে ইউক্রেন আক্রমণ করবে, এত স্থূল যুদ্ধ শুরু করবে, সেটাও তো অচিন্তনীয় ছিল। তাই বলে কি ঘটেনি?

এ যেন উভয়সঙ্কটে পড়েছে পশ্চিমা জোট। রাশিয়া জিতলেও ভয়, হারলেও ভয়। রাশিয়া জিতলে আমেরিকা য্ক্তুরাষ্ট্রের একক আধিপত্যে টান পড়বে। রাশিয়া-চীন নতুন অক্ষশক্তি গড়ে উঠবে। আবার রাশিয়া হারলে বা অস্তিত্ব সঙ্কটে পড়লে পরমাণু বোমা হামলা করতেও দ্বিধা করবে না। যার পরিণতি হবে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ। এক্ষেত্রে আবার সঙ্কট শুধু পশ্চিমা জোটের না। সঙ্কট হয়ে দাঁড়াচ্ছে পুরো মানবজাতিরই।

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ