সমস্ত বিভেদের ইতি টেনে বাঁচার জন্য মুসলিম জাতিকে ঐক্যবদ্ধ হবার ডাক দিলেন হেযবুত তওহীদের এমাম হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম। গত ১১ জানুয়ারি ২০২০ তারিখ রাজশাহী জেলা শিশু একাডেমি মিলনায়তনে আয়োজিত একটি পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ আহ্বান জানান। এছাড়াও ধর্মকে ব্যবহার করে কেউ যেন কোনো প্রকার পার্থিব স্বার্থ হাসিল করতে না পারে এবং সমাজের ক্ষতি করতে না পারে সেজন্য চিন্তাশীল মানুষদেরকে সচেতন থাকার অনুরোধ জানান তিনি।
ধর্মব্যবসার স্বরুপ উন্মোচনকারী ‘ধর্মব্যবসার ফাঁদে’ বইটির সর্বোচ্চ বিক্রয়োত্তর পুরস্কার বিতরণী ও আলোচনা অনুষ্ঠানের এই আয়োজনটি করে দৈনিক বজ্রশক্তি। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন দৈনিক বজ্রশক্তির উপদেষ্টা, দৈনিক দেশেরপত্রের সম্পাদক ও হেযবুত তওহীদের নারী বিষয়ক সম্পাদক রুফায়দাহ পন্নী; দৈনিক বজ্রশক্তির নির্বাহী সম্পাদক ও হেযবুত তওহীদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. শফিকুল আলম উখবাহ; হেযবুত তওহীদের সাংগঠনিক সম্পাদক মনিরুজ্জামান ও আশেক মাহমুদ; দৈনিক বজ্রশক্তির সহকারী সাহিত্য সম্পাদক ও হেযবুত তওহীদের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ সম্পাদক রাকীব আল হাসান প্রমুখ। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন রাজশাহী জেলা হেযবুত তওহীদের সভাপতি মো. মোতালিব খান।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম মুসলিম জাতির দুর্দশার চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘মুসলিম বিশ্ব আজ ভয়াবহ সঙ্কটে নিমজ্জিত। একটির পর একটি মুসলিমপ্রধান দেশ ধ্বংস করে ফেলা হচ্ছে। সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের শিকার হয়ে ধ্বংসের প্রহর গুনছে বহু দেশ। অথচ আমরা কিছুই করতে পারছি না। একটি দেশকেও রক্ষা করতে পারছি না, একটি মা-বোনের ইজ্জতও রক্ষা করতে পারছি না। এই অবস্থা কেন হলো?’
তিনি সাম্প্রতিক ঘটনা তুলে ধরে বলেন, ‘ইরানের একজন চৌকশ সেনা অফিসারকে হামলা করে হত্যা করল যুক্তরাষ্ট্র। এই ঘটনার পর আমরা দেখতে পেলাম সমস্ত ইরানের শিয়া মুসলিমরা কান্নাকাটি করছেন, তাদের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা পর্যন্ত কেঁদে বুক ভাসাচ্ছেন, অথচ বাকি পৃথিবীর কোটি কোটি সুন্নি মুসলিমদের কোনো প্রতিবাদ নেই, দুশ্চিন্তা নেই, এমনকি কেউ দুঃখ প্রকাশ পর্যন্ত করছেন না। যেন তারা খুশিই হয়েছেন। এর কারণ যাদেরকে মারা হয়েছে তারা শিয়া মুসলিম, তাই সুন্নিরা নীরব। একইভাবে সাদ্দাম হোসেনের ইরাককে যখন অন্যায়ভাবে আক্রমণ করা হলো, লক্ষ লক্ষ সুন্নি মুসলিমকে হত্যা করা হলো, তখন শিয়া মুসলিমরা চুপ ছিলেন। যখন ইয়েমেনে সৌদি আরবের বোমা হামলায় হাজার হাজার মুসলিমের প্রাণ চলে যাচ্ছে, বাকি পৃথিবীর মুসলিমরা চুপ থাকছেন এই ভেবে যে, সেখানে মারা হচ্ছে শিয়া মুসলিমদেরকে। এই যে মুসলিমদেরকেই বিভিন্ন ফেরকা ও গোষ্ঠীর ট্যাগ দিয়ে হত্যা করা হচ্ছে আর বাকি পৃথিবীর মুসলিমরা নীরব থাকছেন, এটা কি সাম্প্রদায়িকতা নয়? এটা কি ইসলামে নিষিদ্ধ নয়?’
মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে হেযবুত তওহীদের এমাম বলেন, ‘একাত্তরে যখন আমাদের উপর পাকিস্তানি সেনারা ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞ চালালো, তখন বাকি পৃথিবীর মুসলিম দেশগুলো কি অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলেছিল? না। বরং তারা পক্ষ নিয়েছিল পশ্চিম পাকিস্তানের। অথচ দুই দল মুসলিম নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হলে আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দেওয়ার। তারপরও যদি একদল অপরদলের উপর আক্রমণ করে, তাহলে আল্লাহর নির্দেশ হচ্ছে আক্রমণকারী দলের বিরুদ্ধে সবাইকে যুদ্ধ করতে হবে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের সময় আমরা ঠিক উল্টোটি দেখলাম। প্রায় সমগ্র মুসলিম বিশ্ব আক্রমণকারীদেরই পক্ষ নিল। আর আমাদেরকে ট্যাগ দেওয়া হলো- অবিশ্বাসী, কাফের, বাঙালি মুসলমান, হিন্দু প্রভাবিত মুসলমান ইত্যাদি। এভাবেই মুসলিমরা নিজেদেরকে বিভিন্ন গোষ্ঠী, পরিচয়, ফেরকা, দল, তরিকা ও মতাদর্শে নিজেদেরকে বিভাজিত করে রেখেছে, আর অপশক্তিগুলো তাদেরকে একের পর এক ধ্বংস করে যাচ্ছে। চোখের সামনে নিজেদেরকে ধ্বংস হতে দেখেও মুসলিমরা ঐক্যবদ্ধভাবে তার প্রতিরোধ করতে পারছে না। এই জাতিবিনাশী বিভাজন থেকে মুক্ত হতে না পারলে শেষ পর্যন্ত কেউই বাঁচবে না।’
এছাড়া বিশেষ অতিথির বক্তব্যে রুফায়দাহ পন্নী মুসলিম জাতির নারীদের দুর্দশার চিত্র তুলে ধরে পরিত্রাণের উপায় নিয়ে আলোচনা করেন। ধর্মব্যবসায়ীরা কোনো ধ্বংসাত্মক ফতোয়াবাজি চালিয়ে যেন মুসলিম নারীদের মুক্তির পথে অন্তরায় সৃষ্টি করতে না পারে সেজন্য সবাইকে সচেতন থাকার অনুরোধ জানান তিনি।
আলোচনা পর্ব শেষে পুরস্কার বিতরণী পর্বে ‘ধর্মব্যবসার ফাঁদে’ বই বিক্রিতে রাজশাহী বিভাগে শীর্ষ দশজনকে পুরস্কার প্রদান করা হয়। তালিকায় প্রথম স্থান লাভ করেন রাজশাহী জেলার মহিলা বিষয়ক সম্পাদক নাঈমা খাতুন ও দ্বিতীয় স্থান লাভ করেন আফসানা আক্তার। এক পর্যায়ে বাংলাদেশ অনলাইন টেলিভিশন এসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হোসাইন মোহাম্মদ সেলিমকে সম্মাননা স্মারক প্রদান করা হয়।
অনুষ্ঠানের সঞ্চালনায় ছিলেন সবুর খান ও সুলতানা রাজিয়া।

See Photos
See Video