মগ্র মানবজাতি যখন স্বার্থের পেছনে দৌড়াচ্ছে দিন-রাত, বস্তুবাদী মতাদর্শে প্রভাবিত হয়ে করে বেড়াচ্ছে নিজ নিজ স্বার্থের অনুসন্ধান, তখন কিছু মানুষ বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে নিঃস্বার্থভাবে নিজেদের জীবন-সম্পদ মানুষের কল্যাণে উৎসর্গ করে যাচ্ছেন। চাকরি-বাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্য, ক্ষেত-ক্ষামার সব পেছনে ফেলে মানবতার কল্যাণে, নিরন্তর স্বার্থের সংঘাতে অবধারিত পরিণতি থেকে মানবজাতিকে রক্ষা করার জন্য সত্য, ন্যায়, মানবতার পক্ষে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান নিয়ে মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। তাদেরই একজন ছিলেন দৈনিক বজ্রশক্তির যশোরের সাবেক ব্যুরো প্রধান আরিফুল ইসলাম। তবে যে সুন্দর, শান্তিপূর্ণ ও বাসযোগ্য পৃথিবীর স্বপ্ন তিনি দেখতেন, তা বাস্তবায়িত হওয়ার আগেই প্রত্যক্ষ দুনিয়া থেকে তিনি বিদায় নেন। গত বছরের ২৭ ডিসেম্বর এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় ইন্তেকাল করেন মানবতার কল্যাণে উৎসর্গীকৃত এই মহাপ্রাণ। তাঁর প্রয়াণের এক বছর পূর্তি উপলক্ষে গত ২৭ ডিসেম্বর ২০১৬ তারিখে বাদ-মাগরেব এক স্মরণসভা অনুষ্ঠিত হয়। যশোরের শার্শায় অবস্থিত বেড়ী নারায়ণপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত এ স্মরণসভা, দোয়া ও আলোচনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন হেযবুত তওহীদের এমাম হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন আরিফুল ইসলামের ভাই বেড়ী নারায়ণপুর এলাকার কৃতী সন্তান মো. নুরুল ইসলাম বিশ্বাস। যশোর জেলা হেযবুত তওহীদের উদ্যোগে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গসহ সর্বস্তরের মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে।
গতকাল বিকেল থেকেই দূর-দূরান্ত থেকে দলে দলে সভাস্থলে সাধারণ মানুষ আসতে থাকে। অনুষ্ঠান শুরু হলে হাজারো মানুষের ঢলে সভাস্থল কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। পবিত্র কোর’আন থেকে তেলাওয়াতের মাধ্যমে অনুষ্ঠান শুরু হয় বাদ মাগরেব। অনুষ্ঠানে বক্তরা বলেন, বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল রাষ্ট্রে পরিণত করার জন্য নানামুখী ষড়যন্ত্র চলছে। জঙ্গিবাদকে ইস্যু করে মধ্যপ্রাচ্যে একটির পর একটি দেশ যেভাবে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে, বাংলাদেশকে নিয়েও সেই নোংরা খেলা শুরু হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তারা। তারা বলেন, এই ষড়যন্ত্র কেবল এই দেশের বিরুদ্ধেই নয়, ইসলামের বিরুদ্ধেও। ইসলাম ধর্ম, মহান আল্লাহ ও তাঁর রসুলকে প্রশ্নবিদ্ধ ও কালিমালিপ্ত করা জঙ্গিবাদের বিশ্বায়নের অন্যতম উদ্দেশ্য। দেশের তরুণ, যুুবকেরাও সেই ষড়যন্ত্রের ফাঁদে পা দিয়েছে। তাদের ঈমানকে বিপথে পরিচালিত করা হচ্ছে। তারা বলেন, তরুণ ও যুব সমাজের সামনে ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা তুলে ধরা গেলে তাদেরকে জঙ্গিবাদের দিকে আকৃষ্ট করা সম্ভব হবে না। স্থানীয় জনসাধারণ হেযবুত তওহীদের সাথে একাত্মতা পোষণ করে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে সংগ্রাম চালিয়ে যাবার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন।
প্রধান বক্তার বক্তব্যে হেযবুত তওহীদের এমাম বলেন, “বর্তমানে জঙ্গিবাদ সারা পৃথিবীর মতো বাংলাদেশের জন্যও একটি বড় সঙ্কট। এই জঙ্গিবাদকে নির্মূল করতে হলে সাধারণ মানুষকে ইসলামের প্রকৃত আকীদা শিক্ষা দিতে হবে। আজকে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়া প্রতিটি মো’মেনের জন্য অবশ্য কর্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেহেতু জঙ্গিবাদ একটি আদর্শিক বিষয়, মতবাদগত সন্ত্রাস, তাই একে মোকাবেলা করার জন্য শুধুমাত্র শক্তিপ্রয়োগ যথেষ্ট নয়। একে নির্মূল করার জন্য শক্তি প্রয়োগের পাশাপাশি প্রয়োজন একটি সঠিক আদর্শ যা দিয়ে বাস্তবিক অর্থেই জঙ্গিবাদকে ভ্রান্ত ও অসার মতবাদ হিসেবে প্রমাণ করা সম্ভব। আর সেই আদর্শটি প্রস্তাব করছে হেযবুত তওহীদ।” এটা জাতির অস্তিত্বের প্রশ্ন বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, “আমরা যদি এই মুহূর্তে ঐক্যবদ্ধ হতে না পারি, তবে আমাদেরকেও শীঘ্রই ইরাক-সিরিয়ার ভাগ্য বরণ করতে হতে পারে।” তিনি বলেন, “এই সংকটকালে হেযবুত তওহীদ সম্পূর্ণ নিঃস্বার্থভাবে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার কাজ করে যাচ্ছে।”
তিনি রসুলাল্লাহর জীবনী ও কোর’আন-হাদিসের উদ্ধৃতি দিয়ে প্রমাণ করে দেন যে, জঙ্গিদের ইসলাম আর আল্লাহ-রসুলের ইসলাম এক নয়। তিনি বলেন, মানুষের সামনে যদি এই যুক্তি-প্রমাণগুলো তুলে ধরা যায় ও ব্যাপকভাবে প্রচার করা যায় তবে সাধারণ মানুষের ঈমানকে হাইজ্যাক করে আর তাদেরকে জঙ্গিবাদী কর্মকা-ে লিপ্ত করা যাবে না। যারা ইতোমধ্যেই জঙ্গিবাদের সাথে যুক্ত হয়ে পড়েছে তাদের অনেকেও ভুল বুঝতে পেরে ঐ পথ পরিত্যাগ করবে।
ইসলামের প্রকৃত ইকীদা, ঈমান, আমল সম্পর্কে প্রধান বক্তা অতন্ত জ্ঞানগর্ভ আলোচনা রাখেন। বর্তমান সমাজে ইসলামের যে বিকৃতি চলছে সে বিষয়েও তিনি আলোচনা করেন, প্রচলিত মাদ্রাসা শিক্ষা ও সাধারণ শিক্ষার ইতিহাস তুলে ধরে আলোচনা করেন।
তিনি মরহুমের কথা স্বরণ করে বলেন, “আরিফুল ইসলাম এমন একজন মানুষ ছিলেন যিনি তার জীবন ও সম্পদ মানুষের কল্যাণে উৎসর্গ করে গেছেন। মানুষের কাছে ইসলামের প্রকৃত আকীদা পৌঁছে দেওয়ার কাজেই কেটেছে তার জীবনের শেষ সময়গুলো। তিনি নিজের স্বার্থে কোনো কাজ করেন নি, মানুষ যেন ভালো থাকে, দেশ যেন জঙ্গিবাদমুক্ত হয়, সমাজে যেন সত্য, ন্যায় ও শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয় এ লক্ষ্যেই তিনি কাজ করে গেছেন।” আলোচনা শেষে মুনাজাতের মাধ্যমে অনুষ্ঠান সমাপ্ত হয়।