হেযবুত তওহীদ একদিকে যেমন আল্লাহর উপর পূর্ণ বিশ্বাস ও আস্থা নিয়ে প্রকৃত সবরের সঙ্গে যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবেলা করে টিকে আছে, অপরদিকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের সকল উদ্ভাবন ও অগ্রগতিকে কাজে লাগিয়ে যুগপৎ শান্তিময় ও মানব ইতিহাসে সর্বোন্নত একটি পৃথিবী গড়ার শপথ নিয়ে এগিয়ে চলছে। যখন জানুয়ারি মাসেই কোভিড-১৯ ভাইরাসের সংক্রমণ বিস্তার লাভ করছিল তখন থেকেই হেযবুত তওহীদের মাননীয় এমাম জনাব হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম এ বিষয়ে জরুরি ভিত্তিতে সভা ডাকেন এবং এ বিষয়ে কী কী প্রস্তুতি নেওয়া উচিত তার জন্য প্রস্তাবনা আহ্বান করেন। তিনি টেলিভিশনে, পত্রিকায়, অনলাইনে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে থাকেন এবং এটি যে বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়বে ও লক্ষ লক্ষ এমন কি কোটি কোটি মানুষকে আক্রান্ত করবে এমন পূর্বাভাস দেন।

তিনি পরিস্থিতিকে নিয়তির হাতে ছেড়ে না দিয়ে এর বিরুদ্ধে লড়াই করার সিদ্ধান্ত নেন। প্রথমেই তিনি একটি সাধারণ নির্দেশনাপত্র লিখে প্রত্যেক সদস্য-সদস্যার জন্য তা অবশ্য পালনীয় বলে ঘোষণা করেন। সেখানে তিনি করোনা সম্পর্কে ঐ সময় পর্যন্ত পাওয়া সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্যের আলোকে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের পন্থা জানিয়ে দেন। এরপর যখন বাংলাদেশেও কেউ কেউ আক্রান্ত হওয়ার খবর প্রকাশ পেতে থাকল তিনি দ্রুত আন্দোলনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়কে স্বাস্থ্য বিভাগের সমন্বয় কেন্দ্র হিসাবে ঘোষণা দিলেন এবং হেযবুত তওহীদের যে সদস্যগণ চিকিৎসা পেশার সঙ্গে যুক্ত তাদেরকে নিয়ে কেন্দ্রীয় টিম থেকে শুরু করে জেলা পর্যায় পর্যন্ত মেডিক্যাল সার্ভিস টিম গঠন করলেন। আন্দোলনের অন্যান্য সকল কাজকে সীমিত করে এই বিষয়ে গুরুত্ব প্রদান করতে বলা হয়।

মাননীয় এমামুযযামানের প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান সেলিম’স ক্লিনিক থেকে প্রতিষেধক ওষুধের ব্যবস্থাপত্র তৈরি করে তা পুরো হেযবুত তওহীদের সকল সদস্য-সদস্যাকে সেবন করানো হয়। প্রতিষেধক গ্রহণের বিষয়ে দৈনিক বজ্রশক্তি পত্রিকায় বিশেষ বিজ্ঞাপন প্রকাশ করা হয়। এরই মধ্যে সরকার হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসাকে করোনার ক্ষেত্রে প্রয়োগের অনুমতি প্রদান করে। আন্দোলনের জেলা কার্যালয়গুলোকে অস্থায়ী মেডিক্যাল ক্যাম্পে রূপন্তরিত করা হয়। সেখানে গ্লোভস, সেনিটাইজার, থার্মোমিটার, ওষুধসহ চিকিৎসকদের জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদির ব্যবস্থা করা হয়। পিপিই (Personal protective equipment)-র দুষ্প্রাপ্যতা বিচার করে আমরা নিজেরাই নিজেদের ব্যবহারের জন্য বিশেষজ্ঞদের প্রদত্ত শর্তসমূহ যথাসাধ্য পূরণ করে পিপিই তৈরি করি। প্রত্যেকটা শাখার প্রত্যেক সদস্য, সদস্যা, শিশুদের বায়োডাটা ও মেডিক্যাল রিপোর্ট সংগ্রহ করে তাদের স্বাস্থ্যের সর্বশেষ অবস্থার হালনাগাদ তথ্য আমাদের স্বাস্থ্য বিভাগের ডাটাবেজে হালনাগাদ করা হয়। পুরো জনগোষ্ঠীকে স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়ানোর জন্য সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ প্রদান করা হয়। মার্চ মাসের প্রারম্ভেই আমরা করমর্দন এড়ানো, সামাজিক দূরত্ব রক্ষা, ঠাণ্ডা কাশি হলে তাকে বাড়িতে থাকার নির্দেশনা প্রদান করি।

যখন গণমাধ্যমে বার বার লক ডাউনের প্রশ্ন উঠতে থাকলো, তখন আমরা প্রথম আমাদের কেন্দ্রীয় অফিসকে লক ডাউন করি। অন্যান্য সদস্যদের যারা গ্রামের বাড়িতে অধিক নিরাপদ তাদেরকে গ্রামে চলে যাওয়ার পরামর্শ প্রদান করি। খাওয়া দাওয়ার ক্ষেত্রে মিতাচারী হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়, কারণ সামনে একটি অর্থনৈতিক সংকট আসবে। এরপর তালিকা মোতাবেক যে পরিবারগুলো দরিদ্র, যাদের খাবার কেনার সামর্থ্য নেই তাদেরকে খাবার সরবরাহ করা হয়। পাশাপাশি জীবাণুমুক্ত থাকার জন্য ডেটল, ডিটারজেন্ট, সাবান ইত্যাদি প্রদান করা হয়। পাশাপাশি প্রতিটি কার্যালয়ের থেকে সরকারের নিয়োজিত আঞ্চলিক যিনি স্বাস্থ্য কর্মকর্তা তার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষার নির্দেশ প্রদান করি। আমাদের মসজিদগুলোতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে খুব বেশি লোক জমায়েত না করতে। প্রত্যেকে তার বাড়িতে যে সদস্যগণ আছেন তাদের নিয়ে জামাতে সালাহ করতে বলা হয়েছে। তারা নিয়মিত আল্লাহর বিশেষ সাহায্য বা সুলতানান নাসিরাহ চেয়ে বিশেষ সালাহ কায়েম করবে, রোগাক্রান্ত না হওয়ার জন্য রসুলাল্লাহর বর্ণিত দোয়া করবে। খুব জরুরি প্রয়োজন না হলে যেমন চিকিৎসা ও খাদ্যদ্রব্য সংগ্রহ ছাড়া ঘর থেকে বের হবে না।

হেযবুত তওহীদ কখনোই ধর্মীয় অন্ধত্ব, গুজব, সূত্র-প্রমাণবিহীন কিছু বিশ্বাস করে না। এই শিক্ষা আমরা পেয়েছি আমাদের আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা জনাব মোহাম্মদ বায়াজীদ খান পন্নীর নিকট থেকে। তিনি নিজে ছিলেন একজন অনন্যসাধারণ চিকিৎসক। পাকিস্তান আমল থেকেই তিনি এদেশে হোমিওপ্যাথির একজন পথিকৃৎ হিসাবে সর্বমহলে পরিচিত। পঞ্চাশের দশকের শেষপ্রান্তে বাংলাদেশের বহু এলাকায় কলেরা মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়েছিল। এমামুয্যামান সে সময় গ্রামে গ্রামে গিয়ে কলেরা রোগীদেরকে ওষুধ, ইঞ্জেকশন দিয়েছেন। তাদের জন্য ত্রাণের ব্যবস্থা করেছেন। এ বিষয়ে তিনি নিজ এলাকাবাসীর উদ্দেশে বিলিকৃত একটি লিফলেটে কিছু কথা উল্লেখ করেছিলেন। ১৯৬৩ সনে তিনি লিখেছিলেন, “কলিকাতায় ইসলামিয়া কলেজে ছাত্রজীবন থেকেই আমার রাজনীতি ও সমাজ সেবা শুরু হয় সে আজ ২০/২২ বছর আগের কথা। সমাজ সেবার কোন সুযোগ আমি ছেড়ে দেই নি। তাই আমাকে জন সাধারণ সব দুঃখ দুর্দশায় তাদের পাশে পেয়েছে। গত সর্বগ্রাসী বন্যার সময় আমি ঢাকার বাড়ি বাড়ি ঘুরে ভিক্ষা করেছি কাপড় চোপড় ভিক্ষা করে এনে ক্ষতিগ্রস্থ মানুষের মধ্যে বিতরণ করেছি।

বন্যার পর যখন মহামারী আশংকা দেখা দিল তখন আমেরিকানদের কাছ থেকে ওষুধপত্র চেয়ে নিয়ে এসে গ্রামে গ্রামে, বাড়িতে বাড়িতে ঘুরে ঘুরে কলেরা টাইফয়েডের ইনজেকশন দিয়েছি। আমার নিজের হাতে ইনজেকশনের সংখ্যা তিন হাজারের বেশি এবং একদিনে প্রায় সাড়ে তিনশত। গত দুঃখজনক সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময় দিনরাত আপ্রাণ চেষ্টা করেছি যাতে মানুষ পশুত্বকে দমন করে মানুষের মর্যাদা পায়।” মাননীয় এমামুযযামান আমাদের অবিরাম অনুপ্রেরণার উৎস। আমরা মনে করি, রোগব্যাধি মো’মেনদের জন্য ধৈর্য্যরে ও তাওয়াক্কলের পরীক্ষা যেমন তেমনি এটা মানবজাতির অপকর্মের পরিণতিও বটে। আল্লাহ বলেছেন, মানুষের কৃতকর্মের জন্য জলে-স্থলে বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়ে, যার ফলে তাদের কোনো কোনো কর্মের শাস্তি আস্বাদন করানো হয়, যেন তারা ফিরে আসে (কোর’আন, সুরা রূম ৩০:৪১)।

আমরা মনে করি, এ সংকট থেকে পরিত্রাণের জন্য আল্লাহর হুকুম যথাযথভাবে অনুসরণ করা, রসুলাল্লাহর ঘোষিত পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করার পাশাপাশি বর্তমানে চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের দিক-নির্দেশনা মান্য করা উচিত। আমাদের যদি আল্লাহর উপর পূর্ণ তাওয়াক্কল থাকে তাহলে সেটা আমাদের অবশ্যই মানসিকভাবে শক্তিশালী করবে, আর যে কোনো সংকটকালে মানসিক শক্তির প্রয়োজনীয়তা একদম মৌলিক।তাওয়াক্কুল ও দোয়া করতে হবে অবশ্যই নিজেদের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টার পর। প্রচেষ্টাহীন দোয়া বা তাওয়াক্কুলের শিক্ষা ইসলাম দেয় না। আমরা রসুলাল্লাহর জীবনে পাই, এক ব্যক্তি বলল, হে আল্লাহর রসুল! আমি কি উট বেঁধে রেখে আল্লাহর উপর ভরসা করব, না বন্ধনমুক্ত রেখে? তিনি বললেন, উট বেঁধে নাও, অতঃপর আল্লাহর উপর ভরসা কর (আনাস রা. হতে তিরমিযি-২৫১৭)।

রসুলাল্লাহ একদিন আল্লাহর উপর নির্ভরশীলতা ও রেজেক সম্পর্কে একটি হৃদয়স্পর্শী খোতবা প্রদান করেন। সমবেত সাহাবীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, এতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই যে, কোনো মো’মেনের সত্ত্বাকে দুনিয়ায় বেকার এবং অনর্থক সৃষ্টি করা হয় নি। বরং তার জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত কর্ম ও কর্তব্যের সঙ্গে সংযুক্ত। কর্ম ও প্রচেষ্টার জন্য তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে। অল্পে সন্তুষ্টি এবং আল্লাহর প্রতি নির্ভরশীলতার অর্থ এ নয় যে, হাত পা গুটিয়ে বসে থাকা এবং নিজের বোঝা অন্যের উপর চাপিয়ে দেয়া। নিশ্চয়ই আল্লাহর উপর ভরসা করা আমাদের প্রধান কর্তব্য। কিন্তু রেযেক হাসিল করার জন্য প্রয়োজনীয় প্রচেষ্টা নিতান্তই জরুরি বিষয় (সিরাত বিশ্বকোষ, ১৪ শ খণ্ড, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ)।

সুতরাং আল্লাহর উপর তাওয়াক্কলের পাশাপাশি প্রয়োজন পারস্পরিক সহযোগিতা, সহমর্মিতা, ভ্রাতৃত্ব যা আমাদের একতার শক্তিকে বাড়িয়ে তুলবে, প্রয়োজন বিধিসম্মত স্বল্পাহার ও শরীরচর্চা যা আমাদের রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতা দেবে। এ সবকিছুর সমন্বয়ে গঠিত একটি জাতি যে কোনো বৈশ্বিক সংকট মোকাবেলা করতে সক্ষম হবে। মনে রাখতে হবে, মানুষ একটি অভিযোজনশীল প্রাণী। বহু বড় বড় প্রাণী বিলুপ্ত হয়ে গেলেও মানুষ আজও তার টিকে থাকার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। মানুষ আল্লাহর হুকুম অমান্য করে এতটাই দুরাচারী হয়ে উঠেছে যে আজকে তার নিজের হাতিয়ার, নিজের কর্মফল দ্বারা ডেকে আনা বিপর্যয়ই তার অস্তিত্বের হুমকি, তার বড় শত্রু।

আমরা হেযবুত তওহীদ পুরো পরিস্থিতিকে গুরুত্বসহকারে নিয়েছি এবং এর দিকে সার্বক্ষণিক নজর রাখছি। হেযবুত তওহীদের মধ্যে যেন কোনো গুজব, অকারণ ভীতি বা আতঙ্কের প্রচার না হয় সেটা আমরা দেখছি। মাননীয় এমাম ইতোমধ্যেই ফেসবুকে বেশ কয়েকটি লাইভ করেছেন এবং এ সংক্রান্ত দিক নির্দেশনা সোশ্যাল মিডিয়াতে প্রদান করছেন। নিয়মিত টেলি কনফারেন্স ও ভিডিও কনফারেন্সে কথা বলছেন সারাদেশের আমিরদের সঙ্গে, প্রস্তুতি ও স্বাস্থ্য পরিস্থিতি সম্পর্কে সংবাদ নিচ্ছেন। সবাই যেন সবার খোঁজ রাখেন সে বিষয়ে তিনি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। কারণ রসুলাল্লাহ বলেছেন, “মো’মেন জাতির সঙ্গে একজন মো’মেনের সম্পর্ক ঠিক তেমন, যেমন সম্পর্ক দেহের সঙ্গে মাথার। মো’মেনদের দুঃখ-কষ্ট ঠিক সেভাবেই সে অনুভব করে, যেমন মাথা দেহের ব্যথা অনুভব করে। (মুসনাদে আহমাদ)। তিনি আরো বলেছেন, “মো’মেনগণ যেন একটি প্রাচীর, যার একটি ইট আরেকটিকে শক্তি যোগায় (সহীহ বুখারী, হাদীস ২৪৪৬)”।

রসুলাল্লাহর এই অমর বাণী হেযবুত তওহীদের শক্তি।

#EmamHT #CoronaCautionHT