“জাতির মুক্তির সনদ একমাত্র আল্লাহর বিধান”

৬ ডিসেম্বর ২০২৫, শনিবার। টাঙ্গাইল জেলা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তন কানায় কানায় পূর্ণ। হাজার হাজার নারী-পুরুষ একটি মাত্র লক্ষ্য নিয়ে এসেছেন- শুনতে চান জাতির বর্তমান সংকটের মূল কারণ ও তার একমাত্র সমাধান। মঞ্চে উপবিষ্ট হেযবুত তওহীদের এমাম হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম, তাঁর কণ্ঠে ধ্বনিত হলো সেই কথা, যা আজ মুসলিম জাতির প্রতিটি ঘরে ঘরে পৌঁছানো জরুরি হয়ে পড়েছে।

“লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” – কেবল বাক্য নয়, জীবনের চুক্তিপত্র

মাননীয় এমাম বলেন, “‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ কেবল একটি বাক্য নয়। এটি আল্লাহর সঙ্গে বান্দার একটি চুক্তি বা কন্ট্রাক্ট। এর সরল অর্থ: আমি আল্লাহ ছাড়া আর কারো হুকুম, বিধান বা আইন মানব না। এই একটি অঙ্গীকারের বিনিময়ে আল্লাহ আমাদের সব গুনাহ মাফ করে দেন। কিন্তু আজ আমরা ব্যক্তিগত জীবনে কিছুটা আল্লাহর আদেশ মানলেও, জাতীয় ও রাষ্ট্রীয় জীবনে মানছি ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক যুগের রেখে যাওয়া আইন-কানুন। মুখে কালেমা পড়ি, কিন্তু বাস্তবে তা কার্যকর করি না।”

এ কথার মধ্যে লুকিয়ে আছে আজকের মুসলিম জাতির সবচেয়ে বড় সংকটের নির্ণায়ক। আমরা নামা, রোজা, হজ করি, কিন্তু ঈমানের মূল স্তম্ভ – আল্লাহর সার্বভৌমত্বকে রাষ্ট্র ও সমাজে কায়েম করার দায়িত্ব – সেটি থেকে আমরা পালিয়ে বেড়াচ্ছি।

মুসলিম জাতির লাঞ্ছনা-নিপীড়নের মূল কারণ

এমাম সাহেব বিশ্বের বর্তমান চিত্র তুলে ধরে বলেন, “আজ মুসলিম জাতি কেন লাঞ্ছিত, কেন নিপীড়িত, কেন দারিদ্র্য-অভাবে ডুবে আছে? উত্তর একটাই – আমরা আল্লাহর খিলাফত ও প্রকৃত ঈমান ত্যাগ করেছি। রাসূল (সা.) ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, এমন এক সময় আসবে যখন এসলামের শুধু নাম থাকবে, কুরআনের শুধু অক্ষর থাকবে। আজ আমরা ঠিক সেই যুগে বাস করছি। মসজিদগুলো চাকচিক্যময়, কিন্তু সেখানে হেদায়াত নেই। হেদায়াত মানে আল্লাহ ছাড়া আর কারো আনুগত্য না করা।”

মানবরচিত ব্যবস্থার চূড়ান্ত ব্যর্থতা

স্বাধারণ মানুষের দৈনন্দিন কষ্টের চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, “ব্রিটিশরা চলে গেছে প্রায় ৮০ বছর হলো। তবু আমরা প্রকৃত স্বাধীনতা পাইনি। রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষানীতি, আইন-আদালত – সবই চলছে তাদের রেখে যাওয়া সিস্টেমে। সুদভিত্তিক অর্থনীতির জালে জাতি আজ ২১ লক্ষ কোটি টাকার ঋণে জড়িয়ে পড়েছে। গণতন্ত্রের নামে ভোটের মূলা দেখিয়ে বারবার প্রতারিত হচ্ছি। প্রশাসন, আদালত, পুলিশ – কোথাও শান্তি নেই। মানুষের তৈরি এই ব্যবস্থা পুরোপুরি ব্যর্থ।”

একমাত্র সমাধান: আল্লাহর দীন কায়েম

তিনি স্পষ্ট করে বলেন, “শান্তি চাইলে শুধু আকাঙ্ক্ষা করলেই হবে না। শান্তির বীজ রোপণ করতে হবে। ইসলামই শান্তি। আর এই শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য আল্লাহ যে জীবনব্যবস্থা দিয়েছেন, সেটিকে রাষ্ট্র ও সমাজে কায়েম করতে হবে। আল্লাহ বলেছেন ‘আকিমুদ্দীন’ – দীন কায়েম করো। নবী (সা.) ও সাহাবীগণ শুধু নামাজ-রোজা করেই ক্ষান্ত হননি; তাঁরা সংগ্রাম করে দীন কায়েম করেছিলেন বলেই তৎকালীন আরবে শান্তি নেমে এসেছিল। আজ আমরা সেই সংগ্রাম ভুলে গেছি।”

আলেম সমাজের প্রতি আহ্বান

এমাম সাহেব আলেম-ওলামা ও বিভিন্ন দল-মতের প্রতি হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলেন, “আপনারদের জ্ঞান আছে, মানুষ আপনাদের সম্মান করে। ছোটখাটো মাসয়ালা-মাসায়েল নিয়ে নিজেদের মধ্যে তর্ক করে শক্তি নষ্ট করবেন না। অন্তত আল্লাহর বিধান প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে ঐক্যবদ্ধ হোন। যে যে দলেরই হোন, যে মাযহাবেরই হোন – আল্লাহর দীন কায়েমের এই মহান কাজে এক হয়ে দাঁড়ান।”

জাতির জন্য প্রস্তাবিত গণভোট

সমাধানের রূপরেখা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, “দেশে বহু ইস্যুতে গণভোট হয়েছে, কিন্তু কোনোটিই মূল সমস্যার সমাধান দেয়নি। এবার একটি প্রশ্নে গণভোট হোক: ‘আমরা আল্লাহর বিধান চাই, নাকি মানুষের তৈরি বিধান চাই?’ ৯০% মুসলমানের এই দেশে এটি আমাদের গণতান্ত্রিক অধিকার।”

সম্মেলনের শপথ ও প্রতিটি

বক্তব্য শেষে হাজারো কর্মী-সমর্থক মুষ্টিবদ্ধ হাত তুলে শপথ নেন: “আমরা মানুষের তৈরি বিধান মানব না, মানুষের দাসত্ব আর করব না; আমরা একমাত্র আল্লাহর বিধান মানব এবং তাঁরই দাসত্ব করব।”

স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো হল: “অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থান, দিতে পারে ইসলাম” “জান্নাতের ঠিকানা, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ”

মোনাজাতের মোনাজাতে চোখের পানি ফেলে হাজারো মানুষ এক নতুন প্রত্যয় নিয়ে বাড়ি ফিরলেন – আল্লাহর জমিনে আল্লাহর বিধান কায়েম করার দৃঢ় সংকল্প নিয়ে।

এই সম্মেলন কেবল একটি অনুষ্ঠান নয়; এটি একটি জাতির বিবেককে নাড়া দেওয়ার আহ্বান। যে আহ্বান বলছে: যতক্ষণ আমরা আল্লাহর বিধানকে রাষ্ট্র ও সমাজে কায়েম না করব, ততক্ষণ না আছে শান্তি, না আছে মুক্তি।

জাতির মুক্তির সনদ একটিই – আল্লাহর বিধান। এখন সময় এসেছে সেই সনদ কার্যকর করার।