ব্রিটিশ কেরানি-তৈরির শিক্ষা নয়, ভারসাম্যপূর্ণ জীবনগঠনকারী শিক্ষাব্যবস্থা চাই
নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী উপজেলার চাষীরহাট ইউনিয়ন। মাত্র কয়েক বছর আগেও এখানে শিক্ষার আলো পৌঁছাতো না। আজ সেই গ্রামেই দাঁড়িয়ে আছে একটি মডেল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান – চাষীরহাট নুরুল হক উচ্চ বিদ্যালয়। ১১ ডিসেম্বর ২০২৫, বৃহস্পতিবার সকালে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত অভিভাবক সমাবেশ যেন এক মিলনমেলায় রূপ নেয়। কয়েকশত অভিভাবক, শিক্ষার্থী ও এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তির উপস্থিতিতে পুরো এলাকা উৎসবমুখর হয়ে ওঠে।

ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থাই আজকের অবক্ষয়ের মূল কারণ
সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও প্রধান পৃষ্ঠপোষক হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম। তিনি তাঁর দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্যে বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার গভীর সংকট তুলে ধরেন। তিনি বলেন,
“একটি জাতিকে উন্নত করতে হলে প্রতিটি নাগরিককে সঠিক ও উন্নত শিক্ষায় শিক্ষিত করতে হবে। কিন্তু আজ দেখা যাচ্ছে, যে যত বড় ডিগ্রি নিচ্ছে, সে যেন তত বড় দুর্নীতিবাজ হয়ে উঠছে। এর মূল কারণ ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থা। ব্রিটিশরা এদেশে তাদের প্রয়োজনে ‘কেরানি’ তৈরির জন্য যে শিক্ষাপদ্ধতি চাপিয়ে দিয়েছিল, সেই পদ্ধতিই আজও চলছে। একইভাবে তারা তাদের অনুগত আলেম তৈরির জন্য যে মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থা চালু করেছিল, তারও মৌলিক কোনো পরিবর্তন হয়নি।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা এমন একটি ভারসাম্যপূর্ণ একমুখী শিক্ষাব্যবস্থা চাই, যেখানে একদিকে শিক্ষার্থীরা ইসলামি ও নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত হবে, অন্যদিকে জ্ঞান-বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, ভাষা ও কারিগরি শিক্ষায়ও পারদর্শী হবে।”
প্রবাসী তরুণদের অদক্ষতা দূর করার প্রতিশ্রুতি
সোনাইমুড়ী-চাষীরহাট এলাকা থেকে প্রতি বছর হাজারো তরুণ বিদেশে পাড়ি জমান। কিন্তু কারিগরি শিক্ষার অভাবে তারা স্বল্প বেতনে কায়িক শ্রম বিক্রি করতে বাধ্য হন। এই অবস্থার অবসান ঘটাতে হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম এলাকায় কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের দৃঢ় প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন।
প্রতিষ্ঠাতার আবেগঘন স্মৃতিচারণ
বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান নুরুল হক আবেগভরা কণ্ঠে বলেন, “একসময় এই এলাকায় কোনো মাধ্যমিক বিদ্যালয় ছিল না। অভিভাবকদের সন্তানদের গাড়িতে করে সোনাইমুড়ী বা বিপুলাশার স্কুলে পাঠাতে হতো। আমার নিজের সন্তানদের লেখাপড়া শেষ, তাদের জন্য এই স্কুলের দরকার নেই। আমি এই বিদ্যালয় করেছি শুধু আমার এলাকার সন্তানদের জন্য। আজ দেখে আমার স্বপ্ন পূরণ হয়েছে।”

প্রধান শিক্ষকের অর্জন ও পরিকল্পনা
প্রধান শিক্ষক রাশিদুল হাসান জানান, গ্রামের মধ্যে হলেও এখানে পড়ান দেশের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী স্নাতক শিক্ষকরা। শিক্ষার্থীদের মেধা ও প্রয়োজন অনুযায়ী ‘হোম কেয়ার’, ‘স্পেশাল কেয়ার’ ও ‘নাইট কেয়ার’ চালু করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের আদলে গবেষণা বিভাগও চালু আছে।
পুরস্কার বিতরণ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান
অনুষ্ঠানের শেষাংশে বার্ষিক পরীক্ষায় প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান অধিকারী কৃতি শিক্ষার্থীদের পুরস্কৃত করা হয়। এরপর শিক্ষার্থীরা দেশাত্মবোধক গান, নাটিকা, অভিনয় ও কৌতুক পরিবেশন করে সবাইকে মুগ্ধ করেন।
একটি প্রত্যন্ত গ্রামের স্কুল আজ কেবল পাঠদানেই নয়, সারী সৃজনশীলতা, সংস্কৃতি ও খেলাধুলায়ও সাফল্যের স্বাক্ষর রাখছে। অভিভাবক সমাবেশে উপস্থিত সকলে একবাক্যে স্বীকার করলেন – চাষীরহাট নুরুল হক উচ্চ বিদ্যালয় শুধু একটি স্কুল নয়, এটি এই অঞ্চলের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়ার কারখানা।
এই সমাবেশের মূল বার্তা স্পষ্ট: ব্রিটিশ কেরানি-তৈরির শিক্ষা নয়, আমরা চাই ইসলামি মূল্যবোধসম্পন্ন, নৈতিকতাসম্পন্ন এবং প্রযুক্তিগতভাবে দক্ষ এক নতুন প্রজন্ম – যারা দেশের জন্য গর্ব, বিশ্বের জন্য সম্পদ হবে।