২৫ ফেব্রুয়ারি উত্তরা ১৪ নম্বর সেক্টর আহালিয়া খেলার মাঠে বিশাল পরিসরে আয়োজিত হচ্ছিল হেযবুত তওহীদের ২৫ বছর পূর্তি এবং কেন্দ্রীয় সম্মেলন অনুষ্ঠান। প্রায় একমাস ধরেই হেযবুত তওহীদের সদস্যরা বিপুল আনন্দ উৎসাহ নিয়ে প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন রজতজয়ন্তী উদ্যাপনের জন্য। ২৫ ফেব্রুয়ারি ভোরের মধ্যে আয়োজন মোটামুটি সম্পন্ন। দেশের বিভিন্ন থানা জেলা থেকে বাস ভাড়া করে হাজার হাজার মানুষ আসছেন রাজধানীর দিকে। দূরবর্তী জেলাগুলো থেকে আগের দিনই রওয়ানা হয়ে গেছেন তারা। অনুষ্ঠান শুরু হবে সকাল ১০টায়। এর আগেই তারা যার যার নির্ধারিত আসন গ্রহণ করবেন।

এ আয়োজন চোখে পড়ে স্থানীয় ধর্মব্যবসায়ীদের। সঙ্গে সঙ্গে যেন ইবলিসের ইঙ্গিতে তারা তৎপর হয়ে ওঠে। আশপাশের মসজিদ মাদ্রাসা থেকে শত শত মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষকদের এনে জড়ো করে রাস্তা অবরোধ করে ফেলে। তাদের একটাই দাবি, এই অনুষ্ঠান তারা হতে দেবে না। তারা এলাকাবাসীর মধ্যে মাইকিং করে প্রচার করতে থাকে যেন তারাও এসে ‘ঈমান রক্ষার দাবিতে’ তাদের সঙ্গে যোগ দেয়। কথিত মুফতি মওলানাদের হুঙ্কারে আর উস্কানিতে এলাকার পরিবেশ হয়ে ওঠে থমথমে।

প্রশাসন ব্যস্ত হয়ে পড়ে ধর্মব্যবসায়ীদের ‘ম্যানেজ’ করতে। আর হেযবুত তওহীদের কর্তৃপক্ষকেও প্রশাসনিক কর্মকর্তারা পরিস্থিতি বিবেচনা করার জন্য অনুরোধ করেন। এই কর্তৃপক্ষের যাবতীয় শর্তাবলী মেনে রজতজয়ন্তী পালনের অনুমতি লাভ করেছিল হেযবুত তওহীদ। এখন ধর্মব্যবসায়ীদের হুঙ্কারের বিপরীতে তাদের অসহায়ত্ব প্রকট হয়ে ওঠে।

হেযবুত তওহীদের এমাম হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম সহিংসতা ও উভয়পক্ষের প্রাণহানী এড়ানোর জন্য অনুষ্ঠান স্থগিত করেন। তিনি গণমাধ্যমে বলেন, “আমি যখন দেখলাম মাদ্রাসার সাধারণ এতিম ছাত্রদেরকে লেলিয়ে দেওয়া হয়েছে, সেই ছাত্ররা কিছুই জানে না আমাদের আদর্শ সম্পর্কে। তাদেরকে এটুকুই বলা হয়েছে যে আমরা ইসলামের বাতিল ফেরকা। সুতরাং আমাদের বিরুদ্ধে জেহাদ করা ফরজ। এ করতে গিয়ে তাদের কেউ যদি মারা যায় তাহলে সরাসরি জান্নাতে চলে যাবে। অথচ আমরা আল্লাহ-রসুলের প্রকৃত ইসলাম নিয়ে দাঁড়িয়েছি, কলেমা তওহীদের দিকে মানুষকে ডাকছি। এমন যখন অবস্থা তখন যদি একটা সংঘর্ষ হয় তাহলে এই মাদ্রাসার ছাত্রদের সঙ্গে হেযবুত তওহীদের সংঘর্ষ নিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রচার করা হবে যে, মুসলমানদের মধ্যে দুটো গ্রুপ একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে। আমরাও চাই না দাড়িটুপিওয়ালা মানুষগুলোর উপরে হাত তুলতে, কারণ সেটা নিয়ে ফায়দা লোটা হবে, লাশের রাজনীতি করা হবে। এমন নিকৃষ্ট কাজ ধর্মব্যবসায়ীরা করে থাকে, কিন্তু আমি সেটা করতে পারি না।”

কিন্তু এরই মধ্যে এ বিরাট আয়োজন উপলক্ষে কয়েক কোটি টাকা ব্যয় করে ফেলেছে হেযবুত তওহীদ। ত্রিশ হাজার মেহমানের রান্নাও হয়েছে সম্পন্ন। সাউন্ড সিস্টেম, পয়োঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা, অনলাইন ক্যামেরা প্যানেল, ২০ হাজার চেয়ার ইতোমধ্যেই বসানো হয়েছে। সবকিছু আবার গুটিয়ে নেওয়া হলেও এসবের ভাড়াবাবদ লক্ষ লক্ষ টাকা ঠিকই পরিশোধ করতে হলো হেযবুত তওহীদকে। কুষ্টিয়া থেকে রাতে রওনা করা একটি এসি বাসের উপর আক্রমণ করে ভেঙে ফেরা হলো উইন্ডশিল্ড। সেজন্য প্রায় অর্ধ লক্ষ টাকা জরিমানাও গুনতে হলো হেযবুত তওহীদকেই। হেযবুত তওহীদের যে সদস্যরা এতদিন ধরে অমানুষিক পরিশ্রম করে যাচ্ছিলেন এ আয়োজনকে সফল করার জন্য তারা এই ঘটনায় যেন বাকরুদ্ধ হয়ে পড়লেন, তাদের চোখের পানিতে সিক্ত হলো উত্তরার মাটি।

যুগে যুগে এভাবেই ধর্মান্ধ প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী প্রগতির পথকে রুদ্ধ করতে চেষ্টা করেছে কিন্তু পরিবর্তন ঠেকাতে পারেনি তারা। ইউরোপে রেনেসাঁ ঘটিয়ে চার্চের শাসনের পতন হয়েছে, পতন হয়েছে রাজতন্ত্রেরও। ইসলামের কাঁধে এখন ভর করে আছে যে মোল্লাতন্ত্র, অচিরেই সাধারণ মানুষ জাগবে। পতন হবে এই মোল্লাতন্ত্রের। মানুষের যুক্তিবোধকে জাগানোর জন্য, সকল প্রকার অন্ধত্ব থেকে মুক্ত একটি নতুন সভ্যতা নির্মাণের জন্যই হেযবুত তওহীদের আগমন হয়েছে ধরাপৃষ্ঠে।