কী দিল এই বস্তুবাদী সভ্যতা? (২য় পর্ব)

১০৯৫ সালে পোপ দ্বিতীয় আরবান যাজকতন্ত্রের হারানো মর্যাদা ও শক্তিকে পুনরুদ্ধার করার জন্য ফ্রান্সের ক্লারমন্ট চত্তরে ধর্মযুদ্ধ বা ক্রুসেডের ডাক দেন। তার ভাষণ ইউরোপের খ্রিষ্টানদের মধ্যে মুসলিদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ও জিঘাংসা সৃষ্টি করে। ইতালিয় চিত্রশিল্পী ফ্রান্সিসকো হেইজ ১৮৩৫ সনে ছবিটি আঁকেন।

রিয়াদুল হাসান:
সমাজবিজ্ঞানী স্যামুয়েল পি. হান্টিংটন পাশ্চাত্যের ইতিহাসের মধ্যযুগে আধ্যাত্মিক ও জাগতিক কর্তৃত্বের স্বরূপ তুলে ধরেন এভাবে, “ঈশ্বর ও সম্রাট, গির্জা ও রাজ্য, আধ্যাত্মিক ও জাগতিক কর্তৃত্ব পশ্চিমা সংস্কৃতিতে দ্বৈতভাবে বহুকাল যাবৎ প্রচলিত ছিল। ইসলামে আল্লাহই সম্রাট, চীন ও জাপানে সম্রাটই ঈশ্বর আর অর্থডক্স খ্রিষ্টান ধর্মে ঈশ্বর হলেন সম্রাটের জুনিয়র পার্টনার। ধর্মশালা ও রাষ্ট্রের মধ্যে বারবার সংঘর্ষ ও বিচ্ছিন্নতা পশ্চিমা সভ্যতার প্রতীকরূপে চিহ্নিত।” [দ্য ক্ল্যাশ অব সিভিলাইজেশন অ্যান্ড দ্য রিমেকিং অব দ্য ওয়ার্ল্ড অর্ডার- স্যামুয়েল পি. হান্টিংটন]

খ্রিষ্টধর্মের মধ্যে ছিল বহু মতবাদ, আর প্রতিটি মতবাদের ছিল পৃথক পৃথক চার্চ। ক্যাথলিক যাজকরা ক্রমেই প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের সাথে গভীরভাবে জড়িয়ে যান এবং ক্ষমতার অপব্যবহার করতে শুরু করেন। জার্মান সম্রাটগণ চার্চকে রাজনৈতিক ক্ষমতার একটি শক্তিশালী কেন্দ্রে পরিণত করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তারা লর্ডদের উপরে বিশপদেরকে বহাল করেছিলেন। কিন্তু যতই দিন যায়, চার্চ আরো বেশি ক্ষমতার জন্য দাবি তুলতে থাকে। পোপগণ নিজেদেরকে সম্রাটের চেয়ে উঁচু মর্যাদায় নিয়ে যেতে প্রবৃত্ত হন। একাদশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে পোপ সপ্তম গ্রেগরি নাটকীয়ভাবে খ্রিষ্টান দুনিয়ার নেতৃত্বে চলে আসেন। চার্চের ক্ষমতাকে সুসংহত করে তিনি ক্রমে সম্রাটের প্রতিপক্ষে পরিণত হন। পোপ সপ্তম গ্রেগরির মতে, ‘পোপ সরাসরি ঈশ্বরের কাছ থেকে ক্ষমতা লাভ করেন। পোপ পৃথিবীতে ঈশ্বরের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেন। এ কারণে পোপ পৃথিবীতে কারও অধীন হতে পারেন না। ঈশ্বর ছাড়া অন্য কারও কাছে পোপের কাজের জবাবদিহিতা উচিত হতে পারে না। সপ্তম গ্রেগরি দাবী করেন যে, পোপ ঈশ্বরের অধীন আর ঐশ্বরিক ক্ষমতাবলেই পৃথিবীর সকল মানুষ পোপের অধীন। ১০৭৫ সালে তিনি তাঁর নতুন বিধান সম্বলিত গ্রন্থ ‘ডিক্টেটাস পাপা’ প্রকাশ করেন। জনগণের শিক্ষার দায়িত্ব গ্রহণ করেন ধর্মযাজকরা। গির্জার চাপে ক্রমে রাজারা দুর্বল হয়ে পড়েন এবং ভূস্বামী বা জমির মালিকরা সর্বেসর্বা হয়ে ওঠে। বর্বর আক্রমণ, কুসংস্কারাচ্ছন্নতা, শিক্ষা-দীক্ষার অভাব, ব্যবসা-বাণিজ্য ও সভ্যতা সংস্কৃতির অবনতি ছিল মধ্যযুগের বৈশিষ্ট্য।

একদিকে রাজা, একদিকে জমিদার, আরেকদিকে চার্চ- এই ত্রিমুখী নিষ্পেষণে পিষ্ট মানবাত্মা মুক্তির জন্য ত্রাহিসুরে চিৎকার করতে থাকে। অথচ প্রাচ্যে মুসলিম শাসনের তখন স্বর্ণযুগ। জ্ঞানবিজ্ঞান, ধন-সম্পদ সবদিকে মুসলিমরা সেরা জাতি। পোপ তাঁর হারানো মর্যাদা ও শক্তিকে পুনরুদ্ধার করার জন্য ধর্মযুদ্ধ বা ক্রুসেডের ডাক দেন। দুইশ বছর ধরে চলে ধর্মের নামে এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ যাকে ইউরোপের রাজারা নিজেদের রাজ্যবিস্তারে ব্যবহার করেন। ক্রুসেডে যোগদান ছিল সকল যুদ্ধক্ষম পুরুষের জন্য বাধ্যতামূলক। পোপ দ্বিতীয় আরবানের পক্ষ থেকে বলা হয়, যিশু তাদেরকে কবর থেকে ডাকছেন যেরুজালেম উদ্ধার করার জন্য। পাদ্রীরা সমগ্র ইউরোপে ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টি করে। ছড়িয়ে দেয় একটি শ্লোগান- এটাই আল্লাহর মর্জি (Deus uvlt-  ‘God wills it’)। উত্তেজিত জনগণকে সর্বস্ব বিক্রি করে, আরো নিঃস্ব হয়ে যুদ্ধের ব্যয়ভার মেটাতে হয়। ইউরোপে তাদের জীবন হয়ে যায় নরকতুল্য। কিন্তু দুইশ বছরের এই যুদ্ধের দ্বারা পোপ ক্ষমতার সর্বোচ্চ শিখরে আরোহণ করলেও তার প্রতি মানুষের নিঃশর্ত আনুগত্য আর ফিরিয়ে আনা গেল না।

এমন দুর্বিষহ পরিস্থিতির অবসান ঘটাতেই ধর্মের বিরুদ্ধে নবজাগরণ বা রেনেসাঁর দ্বার উন্মোচিত হয়। সমাজবিপ্লব হয়। মানুষকে এই অন্ধত্বের অচলায়তন ভাঙার জন্য শিল্পীরা হাতে নেন রংতুলি, ভাস্কররা হাতে নেন হাতুড়ি ছেনি, নাট্যকাররা প্রতিষ্ঠা করেন থিয়েটার, লিখনি হাতে তুলে নেন লেখকরা। ডিভাইন কমেডি লিখলেন মহাকবি দান্তে (১২৬৫-১৩২১)। ছবি আঁকলেন ইতালির চিত্রকর গিয়োট্টে দ্য বাইন্ডন (১২৬৭-১৩৩৭), সান্দ্রো বত্তিচেল্লি (১৪৪৫-১৫১০), লিওনার্দো দা ভিঞ্চি (১৪৫২-১৫১৯), রাফায়েল (১৪৮৩-১৫২০)। ভাস্কর্য গড়লেন দোনাতেল্লো (১৩৮৬-১৪৬৬), মাইকেল এঞ্জেলো (১৪৭৫-১৫৬৪) প্রমুখ। নাটক লিখলেন উইলিয়াম শেক্সপিয়র (১৫৬৪-১৬১৬), ক্রিস্টোফার মার্লো (১৫৬৪-১৫৯৩), বেন জনসন (১৫৭২-১৬৩৭)।

জানা কথা বাইবেল দিয়ে রাষ্ট্র চলবে না, সেখানে ওই আলোচনা নেই। মুসলিম রাজারা তো নারী, সুরা নিয়ে ভোগবিলাসে মত্ত। ইউরোপে আল্লাহর দীন প্রতিষ্ঠার কোনো স্বপ্নও তারা দেখেন না। সুতরাং নতুন জীবনব্যবস্থা রচনায় মনোনিবেশ করেন রাজনৈতিক দার্শনিকরা। মানুষের মন থেকে ধর্মের নামে প্রচলিত কুসংস্কার, অন্ধত্ব, ধর্মভীতি দূর করার এক মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ে নামেন রেনেসাঁর অগ্রনায়করা। তারা ধর্মকেই মিথ্যা-অসার বলে নানাভাবে প্রকাশ করতে লাগলেন। গির্জা ও রাজার সহাবস্থান যখন অসম্ভব হয়ে উঠল তখন ধর্মের সংশ্রব ছাড়া রাষ্ট্রপরিচালনার নীতি প্রণয়ন করা হল। ধর্মকে যেহেতু একেবারে নির্মূল করে ফেলা সম্ভব নয়, এটা মানুষের বিশ্বাসের বস্তু, তাই ধর্মনিরপেক্ষ আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার উন্মেষ ঘটল। আধুনিক রাজনীতি, কূটনীতির জনক এবং আধুনিক জাতিরাষ্ট্রের পথ প্রদর্শক ইতলিতে জন্মগ্রহণকারী নিকোলো মেকিয়াভেলি (১৪৬৯-১৫২৭) যাঁকে রেনেসাঁর সন্তান বলেও আখ্যায়িত করা হয়। তিনি রাজনৈতিক বিষয়াদিকে ধর্মনিরপেক্ষ বা ইহজাগতিক চেতনার দ্বারা পরিচালিত করার মানসে তাকে মধ্যযুগীয় ধর্মীয় ও নৈতিকতার বেড়াজাল থেকে মুক্ত করার প্রচেষ্টা চালিয়ে যান। তবে তিনি জনগণের জন্য ধর্ম ও নৈতিকতাকে অস্বীকার করেন নি। তাঁর মতে ধর্ম কেবল পারলৌকিক ব্যাপার। তা মানুষকে বাস্তববাদী কর্ম থেকে দূরে সরিয়ে রাখে। ধর্ম নয়, রাষ্ট্রের অস্তিত্বই বড়। নৈতিকতার ধারণা সকলের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য নয়, নৈতিকতা আপেক্ষিক। তাছাড়া শাসক প্রয়োজনে ধর্মকে হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করতে পারবেন এমন কথাও তিনি বলেছেন। তাঁর যুগান্তকারী পুস্তক ‘দ্য প্রিন্স’ এ তিনি রাষ্ট্রচিন্তার মূল বিষয়গুলো বিবৃত করেন। ম্যাকিয়াভেলী তাঁর শাসককে ভালোবাসা, প্রেম-প্রীতি, দয়া-দাক্ষিণ্য সবকিছু জলাঞ্জলি দিয়ে প্রতারণা, কপটতা ও নিষ্ঠুরতার পথকে গ্রহণ করতে বলেছেন। এটিকেই মূলত ম্যাকিয়াভেলিবাদ বলে।

স্থানীয় সাহিত্যেও এর প্রতিফলন ঘটল। বোকাচ্চিওর ‘ডেকামেরন’ ও চসারের ‘ক্যান্টারবেরি টেল্স’ পোপের দুর্নীতির বিরুদ্ধে বিশেষ দলিলরূপে পরিচিত। ইংল্যান্ডের ওয়াইক্লিফিট আন্দোলন ও জার্মানির বোহেমিয়ার হাসাইট আন্দোলন একাধারে ছিল গণআন্দোলন ও চার্চের বিরুদ্ধে পরিচালিত আন্দোলন।

ইউরোপীয় রাজা ও সমাজ নেতাদের সামনে দু’টো পথ খোলা রইল- হয় এই ধর্ম বা জীবন-ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ ত্যাগ করতে হবে, আর নইলে এটাকে নির্বাসন দিতে হবে মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের সংকীর্ণ পরিধির সীমাবদ্ধতার মধ্যে, যেখান থেকে এটা রাষ্ট্রীয়, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে কোন প্রভাব বিস্তার না করতে পারে। যেহেতু ধর্মকে মানুষের সার্বিক জীবন থেকে বিদায় দেয়া অর্থাৎ সমস্ত ইউরোপের মানুষকে নাস্তিক বানিয়ে দেয়া সম্ভব নয়, তাই শেষ পর্যন্ত ইউরোপীয় রাষ্ট্র ও সমাজ নেতারা দ্বিতীয় পথটাকে গ্রহণ করলেন।

বিভিন্ন দেশের জাতীয় সরকারগুলো পোপের অধীনতা থেকে নিজেকে মুক্ত করতে সচেষ্ট হয়ে উঠল। এরই ধারাবাহিকতায় ইংল্যান্ডে চতুর্দশ শতাব্দিতেই পোপের ক্ষমতার বিরুদ্ধে রাজা অষ্টম হেনরির (২৮ জুন ১৪৯১ – ২৮ জানুয়ারী ১৫৪৭)

Reformation Parliament কয়েকটি আইন পাস করে। তার আমলেই মানব ইতিহাসের এই মহাগুরুত্বপূর্ণ ঘটনাটি ঘটে। প্রথমে ‘অ্যাক্ট ফর দ্য সাবমিশন অফ দ্য ক্লারজি’র দ্বারা যাজকদের রাজার অধীনে আনা হয় (১৫৩৩)। ‘অ্যাক্ট অফ অ্যাপিল’ প্রণয়নের দ্বারা ইংল্যান্ডের সমস্ত চার্চগুলির ওপর পোপের ক্ষমতা রদ করেন (১৫৩৩)। এরপরেই ‘অ্যাক্ট অফ সুপ্রিমেসি’র দ্বারা রাজাকে চার্চের সর্বময় কর্তা হিসেবে স্বীকৃতি জানানো হয় (১৫৩৪)। অষ্টম হেনরির রাজত্বকে ইংরেজ ইতিহাসের “সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে (The Tudors: A Very Short Introduction – John Gyu)।

ইতিহাসের এই বাঁকটি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ তার একটু ব্যাখ্যা দেওয়ার প্রয়োজন আছে। গুরুত্বপূর্ণ এই কারণে যে, মানবজাতির ইতিহাস যতটুকু জানা যায় তাতে এর পূর্বে স্রষ্টার বিধান বা ধর্মের অনুশাসন দ্বারাই সকল রাষ্ট্র পরিচালিত হয়েছে (সীমিত কালখণ্ডে ব্যতিক্রম গ্রিসের ক্লাসিকাল যুগ)। যদিও সব সময় ধর্মের শিক্ষা অবিকৃত ছিল না, তবু ধর্মের নাম দিয়েই সেই বিধানগুলো জাতীয় রাষ্ট্রীয় জীবনে চালাতে হয়েছে। রাজা যত ক্ষমতাবানই হোন, তাকে ধর্মজ্ঞানী পুরোহিত শ্রেণিকে পৃষ্ঠপোষণ করতে হয়েছে, তাদের মনতুষ্টি করেই রাজ্য চালাতে হয়েছে। মানুষ কখনও নিজের হাতে আইন-কানুন, অর্থনীতি, দণ্ডবিধি, রাজনীতি, পররাষ্ট্রনীতি সংবলিত জীবনবিধান রচনার ভার তুলে নেয় নি। এই প্রথম ইহলৌকিক জীবনের পরিচালনার সমগ্র দায়িত্ব মানুষ নিজে গ্রহণ করে স্রষ্টাকে কেবল পরকালের অধিকর্তা হিসাবে, উপাস্য হিসাবে সাব্যস্ত করল। জাগতিক জীবনের কাঠামোতে ধর্মের কোনো কর্তৃত্ব রাখা হল না। নৈতিকতার কোনো সার্বজনীন মানদণ্ড রাখা হল না। এই প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে ধর্মকে মানুষের সার্বিক জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করে ব্যক্তিগত জীবনে নির্বাসিত করা হলো, দাজ্জালের জন্ম হলো।

[লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট; ইমেইল: mdriayulhsn@gmail.com; ফোন: ০১৬৭০১৭৪৬৪৩, ০১৭১১৫৭১৫৮১]

লেখাটি শেয়ার করুন আপনার প্রিয়জনের সাথে

Email
Facebook
Twitter
Skype
WhatsApp
জনপ্রিয় পোস্টসমূহ