করোনাকালের ঈদ যেন ত্যাগের দীক্ষা দেয়

হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম, এমাম, হেযবুত তওহীদ

আজ মুসলিম বিশ্বে যথাযথ ধর্মীয় মর্যাদা ও ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে পালিত হচ্ছে মুসলমানদের দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎসব ঈদ উল আজহা। এ উপলক্ষে দেশ ও দেশের বাইরে অবস্থানরত সকল শান্তিকামী মানুষকে হেযবুত তওহীদ আন্দোলনের পক্ষ থেকে জানাচ্ছি প্রাণঢালা শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন, ঈদ মোবারক।

হাসি-কান্না, আনন্দ ও বেদনা এ দুইয়ের সমন্বয়ে মানুষের জীবন। তাই একদিকে যখন বৈশ্বিক মহামারী করোনার করাল থাবায় আমাদের জীবনযাত্রা পর্যদুস্ত, ঠিক অপরদিকে আমরা চেষ্টা করছি ঈদের আনন্দটুকু সমাজের সকল স্তরের মানুষদের সাথে ভাগ করে নিতে। যেখানে বর্তমানের সংকটময় সময়ে প্রতিটি মানুষের জীবনযাত্রায় কিছু না কিছু পরিবর্তন এসেছে, লকডাউনের কঠোরতায় ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে ব্যবসা বাণিজ্য, নানা ধরনের উদ্বেগ উৎকন্ঠা মনের ঘরে দানা বেঁধেছে, সে সময়েও আমরা ঈদের আনন্দকে পুঁজি করে যাপিত জীবনের সংকট-সমস্যা থেকে সাময়িক ছুটি নিয়ে আগামির সংকটকে মোকাবেলার করার শক্তি সঞ্চয় করছি। মানুষের জীবনের এ যেন এক চিরন্তন নীতি। মানুষ সকল দুঃখের মাঝেও হাসিকে উপভোগ করে, একটু আনন্দ পাওয়ার মাধ্যমে কিছুক্ষণের জন্য হলেও কষ্টকে ভুলে থাকতে চায়। একেই বোধহয় বলে জীবনের বয়ে চলা, তাই তো জীবন যেন এক বহতা নদী।

করোনাসংকট শুধুমাত্র অর্থনীতিক বিপর্যয় ডেকে আনেনি, পাশাপাশি এ সংকটে অনেকেই তাদের প্রিয়জনকে হারিয়েছেন। গত বছরই হয়তো যে আপনজনের সাথে একসাথে বসে দুপুরের খাবার খেয়েছেন এ বছর ঈদের দিনে তার চেয়ারটা ফাঁকা পড়ে আছে। অন্যদিকে অনেক ধর্মপ্রাণ মুসলমান বিগত বছরগুলিতে ছুটে গিয়েছিলেন পবিত্র কা’বায়, সেখানে আল্লাহর ঘর তাওয়াফের মাধ্যমে উৎসবের আনন্দকে কয়েকগুণে বৃদ্ধি করেছিলেন। পবিত্র নগরীতে পালন করেছিলেন ঈদ উল আজহা। কিন্তু এ বছর যারা হজে যেতে মনস্থির করেছিলেন তারাও হজে যাবার অনুমতি না পেয়ে মনোকষ্ট নিয়ে ঘরে বসেই উৎসব পালন করছেন। এছাড়াও দেশে অবস্থানের ফলে অনেকেই করোনা মহামারীকালে বিভিন্ন সেবামূলক কাজে নিজেদের আত্মনিয়োগ করেছেন ও বিভিন্ন স্থানে বিশেষ ভূমিকা পালন করছেন।

ঈদ উল আজহার প্রসঙ্গ এলেই মুসলিম জাতির পিতা ইবরাহিম (আ.) এর সেই ত্যাগ ও গৌরবময় ঘটনা স্মৃতির পাতায় ভেসে উঠে। তাঁর সেই কোরবানিকে স্মরণ করে, তাঁর প্রতি সম্মান ও মর্যাদা প্রদর্শন ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য বিশ্বব্যাপী মুসলমানরা কোরবানির এ অনুষ্ঠান চালু করে।

আমি বিশেষভাবে ধন্যবাদ দেব দৈনিক বজ্রশক্তি পত্রিকার প্রকাশক, সম্পাদকমণ্ডলী, প্রেস ও পরিবহনসহ বজ্রশক্তি পরিবারের সকলকে, কারণ এ ঈদের দিনেও, মহামারীর মত দুর্যোগের মধ্যে পরিশ্রম ও অধ্যাবসায়ের সমন্বয়ে তারা পত্রিকায় লিখছেন, ছাপাচ্ছেন ও প্রকাশ করছেন। ধন্যবাদ জানাবো হেযবুত তওহীদের হাজার হাজার নিবেদিতপ্রাণ সদস্য-সদস্যাকে যারা এই প্রচণ্ড গরমের দিনে ঘামে ভিজে, বৃষ্টিতে ভিজে, ঈদের আনন্দকে কোরবানি করে পত্রিকা নিয়ে রাস্তায় রাস্তায়, বাড়ি বাড়ি গিয়ে মানুষের কাছে একটি মহান আদর্শের আহ্বান পৌঁছে দিচ্ছেন।  আমি দোয়া করছি আল্লাহ সুবহানাহু তা’আলা তাদের সবাইকে এ পরিশ্রমের উত্তম প্রতিদান দান করুন। প্রকৃতপক্ষে এ পত্রিকায় মাধ্যমে আমরা একটি বার্তা গোটা মানবজাতির সমানে তুলে ধরতে চাই।

আমরা মানুষ। কিন্তু এর থেকেও বড় পরিচয় আমরা পৃথিবীতে আল্লাহর খলিফা (সুরা বাকারা ৩০), আল্লাহর প্রতিনিধি আর সে জন্য আমরাই সৃষ্টির সেরা জীব। কাজেই পৃথিবীতে আমাদের বিশেষ কর্তব্য রয়েছে। সেই বিশেষ কর্তব্য ও মুখ্য এবাদত হচ্ছে বিশ্বব্যাপী আল্লাহর প্রতিনিধিত্ব করা। আমরা যেন খেলাফতের এ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে পারি সে জন্য মহান আল্লাহ যুগে যুগে প্রত্যেক জাতির মধ্যে নবী রসুল প্রেরণ করেছেন (সুরা আন নাহল ৩৬)। এরই ধারাবাহিকতায় তিনি সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ রসুল মুহাম্মদ মোস্তফা (স.)-কে প্রেরণ করলেন হেদায়াহ ও সত্যদীন দিয়ে (সুরা সফ ৯, ফাতাহ ২৮, তওবাহ ৩৩) যেন তিনি সে দীন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সমস্ত মানবজাতির মধ্য থেকে অন্যায়, অত্যাচার, অবিচার, জুলুম- এক কথায় সকল অশান্তি নির্মূল করে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারেন।

তিনি তাঁর দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করলেন। তিনি অক্লান্ত পরিশ্রম, কঠোর অধ্যবসায় ও নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রামের মাধ্যমে আরবের আইয়্যামে জাহেলিয়াতের অন্ধকার দূর করে একটি ন্যায় ও শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠন করলেন। ঐক্যহীন, পারস্পারিক দাঙ্গায় লিপ্ত, অশিক্ষা-কুশিক্ষা চর্চাকারী, পশ্চাৎপদ ও অন্ধকারে নিমজ্জিত এক জাতিকে তিনি এমন এক জাতিতে পরিণত করলেন যারা ইস্পাত কঠিন ঐক্যবদ্ধ, অকুতোভয়, সুসভ্য, যুক্তিশীল, বিজ্ঞানমনস্ক ও সুশৃঙ্খল। তাহলে প্রশ্ন আসা কি স্বাভাবিক নয় যে, এ আমূল পরিবর্তন কীভাবে সম্ভব হয়েছিল? এ আমূল পরিবর্তন সম্ভব হওয়ার মূল কারণই ছিল আল্লাহর হুকুমের আনুগত্য। এক আল্লাহকে ইলাহ বা হুকুমদাতা হিসেবে মেনে নেয়ার ফলে সকলেই তাঁর হুকুমের আনুগত্য শুরু করল আর ফলস্বরূপ শত্রু ভাইয়ে পরিণত হলো, অভাব ও দারিদ্র বিমোচন হলো এবং সর্বত্র সমৃদ্ধি, প্রগতি ও শৃঙ্খলা পরিদৃষ্ট হলো।

আজকের এ পবিত্র দিনে তাই পুনরায় ইব্রাহিম (আ.) এর সে ঘটনার মূল শিক্ষা আমি স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। তিনি যেরূপ নেক নিয়তে, পরিশুদ্ধ হৃদয়ে শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের প্রাণপ্রিয় পুত্রকে আল্লাহর নামে উৎসর্গ করেছিলেন, ঠিক তেমনি, আমাদেরকেও এখন একইভাবে নিজেদের জীবন, সম্পদ ও জ্ঞানকে মানুষের মুক্তির জন্য, শান্তির জন্য মানবতার কল্যাণে উৎসর্গ করতে হবে। এটিই হবে আমাদের প্রকৃত কোরবানি। আমাদের সৃষ্টির ইতিহাস ভুলে গেলে চলবে না, ভুললে চলবে না আমরা একই বাবা মা আদম (আ.) ও হাওয়ার সন্তান। আমাদের ধর্ম-বর্ণ-দেশ আলাদা হতে পারে কিন্তু আদিতে আমরা সকলেই এক জাতি, এক পরিবারের সদস্য। কাজেই আমি আশা করব, কোরবানির এ প্রকৃত শিক্ষা আমরা সকলেই উপলব্ধি করব এবং আমাদের বাস্তব জীবনে এর প্রতিফল ঘটানোর চেষ্টা করব।

বৈশ্বিক মহমারী কোভিড-১৯ এর মোকাবেলা করতে গিয়ে আমরা বহু ত্যাগ স্বীকার করেছি। বহু মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছে, ব্যবসার পুঁজি হারিয়েছেন, বহু প্রতিষ্ঠান কর্মচারীদের বেতন দিতে না পেরে কর্মচারী ছাটাই করেছে, আবার অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। আজ প্রতিনিয়ত বহু সংকট, ভয়, আতঙ্ক, দুর্ভাবনা ও দুশ্চিন্তা মানুষকে চিন্তাক্লিষ্ট করে রেখেছে। প্রত্যেকে সচেতন বাবা-মা সন্তানদের লেখাপড়া ও ভরণপোষণ নিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। যদিও সরকার আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে বিষয়গুলোকে সামলানোর। কিন্তু সরকারের একার পক্ষে এত বড় একটি সংকট মোকাবেলা সম্ভব নয়। তাই আমাদের সকলকেই ঐক্যবদ্ধভাবে সংকট মোকাবেলায় এগিয়ে আসতে হবে। আমাদের সকলের বিন্দু বিন্দু ভূমিকা এ সিন্ধুসম সংকট মোকাবেলার অস্ত্র হিসেবে পরিগণিত হবে, ইনশা’আল্লাহ।

পরিশেষে, আজকের এ দিনে আমি মহান রব্বুল আলামিনের দরবারে কায়মনোবাক্যে দোয়া করছি, তিনি যেন আমাদের এক সুখী, শান্তিময়, ঐক্যবদ্ধ এক বিশ্ব গড়ার তওফিক দান করেন। আমরা সকলে যেন দেশ ও জাতি তথা মানবতার কল্যাণে, দেশপ্রেম ও ঈমানী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে আত্মনিয়োগ করতে পারি। আমরা যেন কোনোভাবেই সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের মত ভয়ংকর ব্যাধিতে আক্রান্ত না হই, জর্জরিত না হই এবং হুজুগ ও গুজবের জোয়ারে ভেসে না যাই। আমাদের মধ্যে যেন স্বার্থচিন্তার ঊর্ধ্বে উঠে অপরের জন্য দেশ ও জাতির জন্য কিছু করার হিম্মত তৈরি হয়। মহান আল্লাহ আমাদের প্রকৃত ধর্মের অনুসারী হিসেবে কবুল করুন, আমাদের প্রকৃত ধার্মিক মানুষ হিসেবে গড়ে তুলুন, ধর্মের প্রকৃত আদর্শ ধারণ করার সক্ষমতা প্রদান করুন, মুত্তাকি, মো’মেন, যুক্তিশীল, বিজ্ঞানমনস্ক, পরিশ্রমী করুন এবং সুস্থ থাকার তওফিক দান করুন। আল্লাহুম্মা আমিন।

লেখাটি শেয়ার করুন আপনার প্রিয়জনের সাথে

Share on email
Email
Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on skype
Skype
Share on whatsapp
WhatsApp
জনপ্রিয় পোস্টসমূহ