আমরা উদ্বাস্তু শিবিরের লাঞ্ছনাময় জীবন চাই না

কামরুল আহমেদ
সাম্রাজ্যবাদী পরাশক্তিগুলো অস্ত্রের বাজার সৃষ্টির জন্য একের পর এক মুসলিমপ্রধান দেশগুলোতে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। তারা একে একে ইরাক, সিরিয়া, আফগানিস্তান, লিবিয়া, ফিলিস্তিনসহ বহু দেশ এভাবে ধ্বংসস্তুপে পরিণত করেছে। এই মুহূর্তে পৃথিবীর সাড়ে ছয় কোটি মানুষ উদ্বাস্তু যাদের প্রায় সবাই মুসলমান। আমাদের পার্শ¦বর্তী দেশ মিয়ানমারে কী ভয়ানক পৈশাচিক হত্যাকাণ্ড ঘটানো হচ্ছে, কীভাবে নির্বিচারে জ্বালাও-পোড়াও, নির্যাতন, ধর্ষণ চলছে, তা আমরা দেখছি।
আজকে মুসলিমপ্রধান সকল ভূখণ্ডের প্রতিই সাম্রাজ্যবাদীদের দৃষ্টি পড়েছে। আমাদের প্রিয় মাতৃভূমিও বাংলাদেশেও প্রায় পনের কোটি মুসলমানের বাস। কিন্তু তারা এই সংকটের ভয়াবহতা সম্পর্কে মোটেই সচেতন নয়। যে সংকটে একের পর এক দেশ ধ্বংস হয়ে গেল সেই সংকট আসার আগেই আমাদের গোটা জাতিকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে যেন কোনোভাবেই সাম্রাজ্যবাদীরা ও ধর্মব্যবসায়ীরা এখানে জঙ্গিবাদের বিস্তার ঘটাতে না পারে। কিন্তু এই ঐক্যের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে স্বার্থ আর হানাহানির রাজনীতি, ধর্মের নামে চলা অপরাজনীতি, সাম্প্রদায়িক ও ফেরকাগত বিভাজন। কিন্তু আজ পরিস্থিতি এমন অবস্থানে এসে দাঁড়িয়েছে যে, ভূখণ্ড, ধর্ম ও ঈমানকে নিরাপদ রাখতে আমাদের এখনই আমাদের সবাইকে এসকল অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে। মনে রাখতে হবে, একটি ঐক্যবদ্ধ, সুশৃঙ্খল, লক্ষ্যের প্রতি অবিচল জাতিকে কখনোই পদানত করা কিংবা উদ্বাস্তু শিবিরের লাঞ্ছনাময় জীবনের দিকে ঠেলে দেওয়া কারো পক্ষেই সম্ভব হয় না। রসুল (সা.) যখন মদিনায় আসলেন তখন শত্রুরা মদিনাকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার উদ্দেশ্যে একের পর এক হামলা চালিয়েছে। তখন মো’মেনদের পাশাপাশি মদিনায় বসবাসরত ইহুদি, পৌত্তলিকসহ প্রতিটি ধর্ম-বর্ণ ও গোত্রের মানুষকে নিয়ে মদিনা রক্ষার জন্য একটি চুক্তি করেন, ইতিহাসে যা ‘মদিনা সনদ’ নামে পরিচিত। অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা রক্ষা ও বহিঃশত্রুর হাত থেকে মদিনাকে রক্ষার প্রয়োজনে তিনি বিশ্বাসী-অবিশ্বাসী প্রতিটি মানব সন্তানকে সেদিন ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন। ভূখণ্ডকে রক্ষা করতে তারা পেটে পাথর বেঁধেছিলেন, না খেয়ে ছিলেন, জীবন ও সম্পদের বাজি রেখেছিলেন। ফলে তাদের চাইতে বহুগুণ শক্তিশালী ও অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত সম্মিলিত শত্রুবাহিনীকে তারা আল্লাহর সাহায্যে রুখে দিয়েছিলেন। এ কাজটির মাধ্যমেই তারা হয়েছিলেন মো’মেন। একটি জাতির প্রত্যেক সদস্য যখন নিজের জীবন ও সম্পদ জাতির জন্য, মানবতার জন্য উৎসর্গ করে মো’মেন হয় তখন ওই কোটি কোটি ব্যক্তির পুঞ্জীভূত জীবন ও সম্পদের দ্বারা একটি বিরাট শক্তিতে পরিণত হয়। আল্লাহ পবিত্র কোর’আনে প্রদত্ত মো’মেনের সংজ্ঞাতে বলেছেন, মো’মেন শুধু তারাই যারা আল্লাহ ও তাঁর রসুলের প্রতি ঈমান আনে, অতঃপর তার উপর সুদৃঢ় থাকে এবং নিজেদের জীবন ও সম্পদ দিয়ে আল্লাহর রাস্তায় সংগ্রাম করে যায় (সুরা হুজরাত ১৫)। অর্থাৎ নিজেদের জীবন ও সম্পদ উৎসর্গ করে সংগ্রাম করার মধ্য দিয়েই মো’মেন হতে হবে। এ মো’মেনের জন্যই নামাজ-রোজা-হজ্ব-যাকাতসহ ইসলামের অন্যান্য সব আমল।
এ দেশের আলো বাতাস গায়ে মেখে আমরা বড় হয়েছি, এই ভূমির ফল-ফসলে আমরা পুষ্ট হয়েছি। এ মাটিতে আমাদের নতুন প্রজন্ম তাদের স্বপ্নের বীজ বোনে। এই মাটিতেই মিশে আছে আমাদের পূর্বপুরুষদের অস্থিমজ্জা। আমাদের এ দেশেও যদি অন্য বহু মুসলিম ভূখণ্ডের মতো ভয়ানক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়, এখানেও যদি যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে আমরা লাখে লাখে মরবো, আমাদের মা-বোন ধর্ষিত হবে, যারা বেঁচে থাকবে তাদের আশ্রয় হবে উদ্বাস্তু শিবিরে। এই অনিশ্চয়তার জীবন যদি আমরা না চাই, তাহলে অবশ্যই আমাদেরকে স্বার্থপর ও আত্মকেন্দ্রিকতা ভুলে এখনই ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।
প্রশ্ন হচ্ছে ঐক্যবদ্ধ হবো কীসের ভিত্তিতে? নবী করিম (সা.) তৎকালীন পৃথিবীর সবচাইতে পশ্চাৎপদ, ঐক্যহীন, ভীরু, কাপুরুষ, স্বার্থপর, পারস্পরিক দাঙ্গা ও হানাহানিতে লিপ্ত আরব জাতিকে কীভাবে ঐক্যবদ্ধ করলেন এবং কীভাবে তাদের সমাজটাকে পাল্টে দিলেন সেটা আমাদের জন্য দৃষ্টান্ত হতে পারে। সেটা তিনি করেছিলেন একটি নির্ভুল আদর্শ দিয়ে যে আদর্শের স্পর্শ পেয়ে সেই জাতি হয়ে গেল প্রগতিশীল, ঐক্যবদ্ধ, দুঃসাহসী, সুশৃঙ্খল, এক নেতার প্রতি অনুগত, মানবতার কল্যাণকামী, নিঃস্বার্থ। কিন্তু সেই প্রকৃত ইসলাম দীর্ঘ ১৩শ’ বছরের কালপরিক্রমায় বিকৃত হতে হতে আজকে বিকৃতির চ‚ড়ান্ত পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে। সেই উম্মতে মোহাম্মদী জাতি আর নেই, সেই লক্ষ্যও আর নেই, তারা দীনের ভিত্তি তওহীদ থেকে বিচ্যুত হয়েছে বহু আগেই। তওহীদের মূল দাবি হচ্ছে আল্লাহর হুকুম ছাড়া কারো হুকুম না মানা অর্থাৎ যাবতীয় অন্যায়ের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়া। এ তওহীদের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ হলে তারা হবে মো’মেন। এই মো’মেনদের সঙ্গেই আল্লাহ ওয়াদা করেছেন যে তিনি তাদেরকে শ্রেষ্ঠত্ব দিবেন, রক্ষা করবেন, দুনিয়ার জীবনে শান্তি ও নিরাপত্তা এবং পরকালে জান্নাত দিবেন। এই মহাসাফল্যের দিকেই আহ্বান করে যাচ্ছে হেযবুত তওহীদ।

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ