প্রশ্ন-উত্তর Archives | Page 6 of 10 | হেযবুত তওহীদ

প্রশ্ন-উত্তর

এটাও এক প্রকার ধর্মব্যবসা আর আমাদের অবস্থান সর্বপ্রকার ধর্মব্যবসার বিরুদ্ধে। এ ধরণের ধর্মব্যবসা শুধু আটিয়ায় নয়, সারা পৃথিবীতে রয়েছে। পারিবারিক প্রভাব খাটিয়ে বা অন্য কোনো উপায়ে একটি নির্দিষ্ট মাজারের ধর্মব্যবসা বন্ধ করা আমাদের কাজের নীতি নয়, আমরা জনসচেতনতা সৃষ্টি করে যাচ্ছি, মানুষ যখন বুঝতে পারবে যে, তাদের ধর্মানুভূতিকে পুঁজি করে বিভিন্ন শ্রেণির ধর্মব্যবসায়ীরা তাদেরকে ধোঁকা দিচ্ছে, তাদের অর্থ সম্পদ হাতিয়ে নিচ্ছে, আখেরাতকেও ধ্বংস করে দিচ্ছে তখন জনগণই এসব ধাপ্পাবাজির বিরুদ্ধে দাঁড়াবে, এদের পেছন থেকে সরে যাবে। মানুষকে না বুঝিয়ে কোনো নির্দিষ্ট মাজার বা ধর্মব্যবসার প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অবস্থান নিলে ধর্মব্যবসায়ীরা উস্কানি দিয়ে স্থানীয় জনতার সেন্টিমেন্টকে জাগিয়ে তুলবে, দাঙ্গা সৃষ্টি করবে। আর বহু রাজনীতিক দল গোষ্ঠীতো বসেই আছেন ইস্যুর অপেক্ষায়।

আমন্ত্রণ জানানোর সময় আমরা কে কোন ধর্মের লোক তা বিবেচনা করি নি। আমরা সব ধর্মের মানুষকে নিয়েই কাজ করি। আমরাই শত শত অনুষ্ঠানে সনাতন, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, উপজাতি নৃগোষ্ঠীর প্রধান ব্যক্তিদেরকে নিয়ে এক টেবিলে বসেছি, প্রত্যেকে নিজেদের একান্ত কথাগুলো শেয়ার করেছি। তারা সকলেই একবাক্যে আমাদের উদ্যোগকে সমর্থন দিয়েছেন। আজকের এ বৈঠকেও অনেক সনাতনধর্মী আছেন।

একই কথা। আপনি বাংলায় বা ইংরেজিতে যা বলছেন সেটাই আরবি করলে দাঁড়াচ্ছে আমীর। এ পদবি যে কোনো সংগঠনেই থাকতে পারে। আপনি মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধবাদীদের দলের কথা বললেন। ’৭১ সনে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে আমরা যুদ্ধ করেছি। তাদের সেনাবাহিনীর পদবিগুলো ছিল জেনারেল, মেজর, ক্যাপ্টেন, ব্রিগেডিয়ার ইত্যাদি, আমাদের সেনাবাহিনীর পদগুলোও কি তা-ই ছিল না? আজও আমাদের দেশের সেনাবাহিনী এ পদবিগুলোই ব্যবহার করছে। ওটা নিয়ে তো কথা উঠছে না। কেন উঠছে না? কারণ এগুলো পারিভাষিক শব্দ, যে কোনো দেশের সেনাবাহিনী এ পদবিগুলো ব্যবহার করতে পারে। পাকিস্তান আর্মি পদবিটি ব্যবহার করে বলে অন্য কোনো দেশের আর্মি সেটা ব্যবহার করতে পারবে না এটা ভাবা ঠিক নয়। আমীর শব্দটি ইসলামের পরিভাষা, শব্দটি কোর’আনে আছে, খলিফাদেরকেও আমীরুল মো’মেনীন বলা হতো। মধ্যপ্রাচ্যে অনেক দেশ আছে আমিরাত, সেগুলোতে রাষ্ট্রনায়কের পদবি আমীর। মনে হয় সুচতুরভাবে ইসলামের যে কোনো কিছুর প্রতিই একটা অ্যালার্জি সৃষ্টি করা হয়েছে আমাদের সমাজে।

এই প্রশ্নটা আমাদেরকে প্রায়ই করে থাকেন এবং করাটা খুব স্বাভাবিক। যদিও যারা গণতন্ত্রের নামে রাজনীতি করছেন, মানুষের জীবনযাত্রাকে বারবার বিপর্যস্ত করছেন, সহিংসতার জন্ম দিচ্ছেন, রাজনৈতিক অধিকারের নামে ভাংচুর, জালাও-পোড়াও, হরতাল, অবরোধ করছেন, তারা যে প্রতিনিয়ত রাষ্ট্রের কোটি-কোটি টাকার ক্ষতি করছেন, চুরি করছেন এ ব্যাপারে কিন্তু তেমন অতি উচ্চ-বাচ্য দেখি না। কিন্তু এই প্রশ্নটা আমাদেরকে প্রায়ই করেন যে, এত টাকা আপনারা পান কোথায়? অর্থের উৎস কি আপনাদের? এত টাকা কোত্থেকে আসে? যেহেতু অনেকগুলো ইসলামী সংগঠন আছে আমাদের দেশে যারা মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের থেকে অর্থ পেয়ে থাকেন তাই আমাদের ক্ষেত্রেও এ প্রশ্নটি তোলা আমরা অযৌক্তিক মনে করি না। যার অর্থের উৎস গোপন এবং অবৈধ তার প্রতি কেউ নৈতিক আস্থা রাখবে না এটা স্বাভাবিক কথা।

আমাদের কথা হলো, আমরা আমাদের এমামুয্যামান থেকে যেটা শিখেছি তা হচ্ছে যে, মানুষের জীবন এবং সম্পদ অন্য মানুষের কল্যাণে ব্যয় করার মধ্যেই রয়েছে মো’মেনের জীবনের এবং মানুষের জীবনের ইহকাল এবং পরকালের সফলতা। আমি যদি আমার জীবন-সম্পদ মানুষের কল্যাণে ব্যয় না করি, আমি কাফের হয়ে যাবো, মো’মেন হতে পারবো না। মাননীয় এমামুয্যামানের মাধ্যমে উদ্বুদ্ধ হয়ে অন্য মানুষের কল্যাণে, আল্লাহর সত্যদীন প্রতিষ্ঠার জন্য যারা ‘হেযবুত তওহীদ’ আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন তারা প্রায় সবাই সমাজের খেটে খাওয়া শ্রেণির দরিদ্র সাধারণ মানুষ, যাদের তিনবেলা অন্ন সংস্থান করাই কষ্ট হয়ে যায়। তথাপিও তারা তাদের উপার্জনের একটি বড় অংশ আন্দোলনের কাজে ব্যয় করে থাকেন এবং বিবিধ ফান্ডে জমা দেন। অতীতে যারাও বা কিছুটা অবস্থাস¤পন্ন ছিলেন বা ভালো চাকরি করতেন তাদের অধিকাংশই নিজেদের জমি-জমা, সম্পদ এমনকি ঘরবাড়ি পর্যন্ত বিক্রি করে দিয়ে মানবতার কল্যাণে সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন, তারাও এখন হকারি করে চলেন, রিক্সা চালান, কায়িক শ্রমের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন এবং সেখান থেকেই আন্দোলনের ব্যয়ভার বহনে সহযোগিতা করেন। আমাদের এমামুয্যামানও তাঁর সমস্ত কিছু এ আন্দোলনের জন্য দান করে গেছেন। তারপর যখন কোনো সভা হয়, সেমিনার হয় বা কোনো বই ছাপানো দরকার হয়, হ্যান্ডবিল প্রয়োজন হয় তখন তারা উদ্যোগ নিয়ে টাকা তুলে তার ব্যয় নির্বাহ করছেন।

আর্থিকভাবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি আমরা মামলায়। আমাদের লক্ষ লক্ষ টাকা ক্ষতি হয়েছে মামলার পেছনে। ধর্মব্যবসায়ী ও মিথ্যাশ্রয়ী গণমাধ্যমের অপপ্রচারের কারণে আমাদের বিরুদ্ধে প্রায় পাঁচশ মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে, শুধু গ্রেফতার করে হয়রানি করা হয়েছে হাজার বারেরও বেশি। মাসের পর মাস আমাদের নির্দোষ কর্মীরা জেল খেটেছেন। তাদের পরিবারগুলো বার বার জীবিকা হারিয়ে কী অবর্ণনীয় কষ্ট ও দুর্ভোগের শিকার হয়েছেন এটা কাছ থেকে কেউ না দেখলে বিশ্বাস করবে না। তো এই মামলার ব্যয় নির্বাহের জন্য আমাদেরকে অকল্পনীয় পরিশ্রম করতে হয়েছে। অনেকে গায়ে খেটে, রিক্সা-ভ্যান চালিয়ে, মুড়ি বিক্রি করে, হকারি করে অর্থ সংগ্রহ করেছেন। তারপর জামিন হওয়ার পরও বছরের পর বছর হাজিরা দিয়ে যেতে হয়েছে, এক জেলা থেকে আর এক জেলায়, এক স্থান থেকে আরেক স্থানে গিয়ে কী কষ্টই না তারা স্বীকার করেছেন তা বলে শেষ করা যাবে না।

অর্থাৎ এক কথায় বলতে গেলে আমরা নিজেরাই নিজেদের কষ্টার্জিত অর্থ দিয়েই মানবতার কল্যাণে কাজ করে যাচ্ছি। এখন আমাদের এই উত্তরে যদি কেউ সন্তুষ্ট না হন তাহলে আমরা বলব, আপনি আমাদের সঙ্গে একটু থাকুন এবং স্বচক্ষে দেখুন; আমরা যা খাই সেটাই আপনারা খাবেন। দেখুন, আমরা আসলে কিভাবে আন্দোলনের কার্যক্রম পরিচালনা করি। বিদেশ থেকে অথবা কোনো বিশেষ মহল থেকে অর্থ আসে কিনা ইত্যাদি প্রশ্ন আল্লাহর রহম হেযবুত তওহীদের বেলায় চলে না। কারণ, হেযবুত তওহীদ পরিচালনার নীতি হিসেবে এমামুয্যামান শুরুতেই নিয়েছিলেন যে আমরা বাহিরের কারও কাছ থেকে কোনরূপ অর্থ গ্রহণ করব না। এ পর্যন্তআল্লাহর রহমে আমরা বাহিরের কারও কাছ থেকে এক পয়সাও নেই নি। তার অর্থ এই নয় মানবতার কাজ আমাদের সঙ্গে একত্রিত হয়ে অন্য অর্থসম্পন্ন লোকেরা করতে পারবেন না। অবশ্যই পারবেন। কিন্তু আমরা আমাদের কাজের বিনিময়ে কোনো অর্থ নিব না। আয় রোজগারের ক্ষেত্রে আন্দোলনের নীতি হল কর্মক্ষম আমাদের কেউ বেকার থাকতে পারবে না, তাদেরকে কোন না কোন কর্ম করতে হবে। এজন্য এখানে অবৈধ অর্থের আগমন অসম্ভব এনশা’আল্লাহ।

পন্নী পরিবারের শাসনকার্যে সম্পৃক্ত থাকার ইতিহাস শত শত বছরের। তারা একাধারে যেমন ধার্মিক ছিলেন আবার খুব প্রজাহিতৈষী ছিলেন। এটা আমাদের কথা নয়, যারা তাদেরকে চেনেন তারা জানেন, আপনারা ইতিহাস পড়ে দেখতে পারেন, স্থানীয় জনগণকে জিজ্ঞেস করেও দেখতে পারেন। আমি মওলানা ভাসানীর একটি উক্তি বলছি। ১৯৫৪ সালে যখন জমিদার প্রথা বিলুপ্ত করা হয় তখন তিনি বলেছিলেন, সব জমিদারেরা যদি পন্নী জমিদারদের মতো হতো তবে এ প্রথা বিলুপ্ত করার জন্য বিল প্রস্তাব করার দরকার হতো না। তবে আমি দৃঢ়তার সঙ্গে বলতে পারি মাননীয় এমামুয্যামান কর্তৃক কোনো অত্যাচার, অবিচার করার প্রশ্ন আসে না, বরং তিনি মানুষের কল্যাণে তাঁর জীবন অতিবাহিত করেছেন।

আসলে নাম কোন ভাষায় রাখা হলো সেটার চেয়ে নামের অর্থই অধিক গুরুত্বপূর্ণ বলে আমাদের মনে হয়। আমরা এখানে যারা আছি আমাদের সবার নাম কি আমাদের মাতৃভাষায়? না। আমাদের দেশের প্রধান রাজনীতিক দলগুলো যেমন আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি এগুলো একটাও তো বাংলা ভাষায় নয়, উর্দু-বাংলা-ইংরেজি মেশানো। হিযব শব্দের অর্থ দল, ইংরেজিতে লীগ বা পার্টি বলতে পারেন, তওহীদ অর্থ একত্ববাদ বা ওয়াহদানিয়াত। বাংলায় একেশ্বরবাদ বা এক আল্লাহর সার্বভৌমত্বের দল বলতে পারেন। সুতরাং নাম যে ভাষায়ই রাখা হোক তাতে আপত্তির কিছু দেখছি না। সেই সঙ্গে এটাও বলে রাখা ভালো, আরবি ভাষাকে শ্রদ্ধা করলেও আমাদের কাছে প্রয়োগের দিক থেকে আমাদের মাতৃভাষার গুরুত্ব সর্বাধিক। বাংলায় আমরা মনের ভাব বিনিময় করি, যে কোনো সত্য আদর্শ প্রচারের ক্ষেত্রেও মাতৃভাষার বিকল্প নেই। স্বয়ং আল্লাহ পবিত্র কোর’আনে মাতৃভাষার প্রতি গুরুত্ব আরোপ করেছেন। শেষ নবী যেহেতু আরবে এসেছেন, তাই আরবিতেই তিনি কথা বলেছেন, কোর’আনও আরবিতেই অবতীর্ণ হয়েছে। আল্লাহ বলেছেন, ‘আমি সব নব-রসুলকেই তাঁদের স্বজাতির ভাষাভাষী করেই প্রেরণ করেছি যাতে তাদেরকে পরিষ্কারভাবে বোঝাতে পারেন (সুরা এব্রাহীম ৪)। সুতরাং আখেরি নবী অন্য দেশে আসলে অন্য ভাষাতেই কেতাব আসত।

হ্যাঁ, আমাকে প্রশ্ন করলে কিন্তু আপনাকে উত্তর শুনতে হবে। আমরা অতীতে দেখেছি- প্রশ্নকর্তা প্রশ্ন করে বাইরে চলে যান। তার উদ্দেশ্য হলো যে কোনো প্রকারে তিনি একটি বিতর্ক বা হট্টগোল সৃষ্টি করে দিতে চান। কিন্তু আমরা হেযবুত তওহীদ। আমরা সব কথা বলার জন্য এসেছি। আল্লাহ দয়া করে সকল কথার জবাব দেওয়ার ক্ষমতা আমাদের দিয়েছেন। সুতরাং মনোযোগ দিয়ে সকল উত্তর শুনবেন, তাহলে অনুমান করে নেওয়ার প্রয়োজন পড়বে না।

প্রথমত, লতিফ সিদ্দিকীর যে প্রসঙ্গটা এসেছে সে সম্পর্কে বলতে গেলে প্রথমেই বলতে হয়- লতিফ সিদ্দিকী সম্পর্কে মিডিয়াতে যতটুকু এসেছে আমরা শুধুমাত্র ততটুকুই জেনেছি। এ বিষয়ে আমরা মিডিয়ার একপাক্ষিক কথাই শুনেছি। তার সাথে কথা বললে আমরা স্পষ্ট হতে পারতাম যে, তিনি কোন প্রেক্ষিতে কী বোঝাতে ওই কথাগুলো বলেছেন। যেহেতু উভয়পক্ষের কথা আমরা শুনি নি, তাই তার সম্পর্কে এখনো আমরা কোনো সুনির্দিষ্ট মন্তব্য করতে পারছি না। এটুকু বলতে পারি, ধর্ম, আল্লাহ ও রসুলের প্রতি যার শ্রদ্ধাবোধ থাকবে সে এমন মন্তব্য সজ্ঞানে করতে পারে না।

দ্বিতীয়ত, যারা মু’মিন, যারা আল্লাহ ও রসুলকে ভালোবাসে, তারাও ভুল করতে পারে। আল্লাহ বলেছেন, সত্তর হাজার বার গুনাহ করলেও যদি বান্দা ক্ষমা চায়, আল্লাহ ক্ষমা করতে পারেন। কাজেই ভুল করে ফেললে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়ার মধ্যে বান্দার জন্য দোষের কিছু নেই, লজ্জার কিছু নেই। প্রকৃত মু’মিন যদি মুখ ফসকে কোনো কথা বলে ফেলে, ভুল করে ফেলে তাহলে অকপট হৃদয়ে ক্ষমা চাইলে আল্লাহ ক্ষমা করে দিবেন, সে আল্লাহর সঙ্গে ঔদ্ধত্ব করবে না। কিন্তু লতিফ সিদ্দিকী সাহেব এখন পর্যন্ত ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন বলে মিডিয়াতে আসে নি।

তৃতীয়ত, আমাদের দেশে ধর্ম সম্পর্কে কারো বিদ্বেষপূর্ণ মন্তব্যকে নিয়ে রাজনীতি করা হয়, ধর্ম ব্যবসায়ীরা একে ইস্যু হিসাবে নিয়ে দেশে অস্থিরতা সৃষ্টির প্রয়াস পান। কিন্তু আমরা মনে করি, ইসলাম ও ইসলামের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে এমন বিরূপ মন্তব্য ১৪০০ বছরে অনেক হয়েছে, রসুলের সামনেও হয়েছে। কিন্তু এজন্য প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে দাঙ্গা হাঙ্গামা সৃষ্টি করার কোনো নজির রসুলাল্লাহর জীবনে নেই। বরং উপযুক্ত যুক্তি, প্রমাণ দিয়ে এর জবাব দেওয়া যুক্তিসঙ্গত। দেশে অরাজকতা সৃষ্টি করা কোনো সমাধান নয়, দেশে একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা আছে, আইন আছে। সুতরাং ওই ব্যক্তিকে আইনের হাতে সোপর্দ করা যেতে পারে, তারপর আইন মোতাবেক যা হয় হবে। কিন্তু এগুলোকে ইস্যু বানিয়ে মানুষের অধিকার ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি করা, আতঙ্ক সৃষ্টি করা, রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করা, ভাঙচুর করা এগুলো কখনোই ইসলামসম্মত নয়। যাই হোক, তিনি এখনও জেলখানায় আছেন, বিচারাধীন আছেন, কাজেই এ ব্যাপারে আমরা এই মুহূর্তে কোনো মন্তব্য করতে পারছি না।

বর্তমানে পশ্চিমা বিশ্ব তাদের শক্তিবলে সারা পৃথিবীতে একটি সভ্যতা বা Civilization প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে, যে সভ্যতাটা স্রষ্টাহীন, আত্মাহীন, ঈশ্বরহীন একটা বস্তুবাদী সভ্যতা। এতে ধর্মের কোনো জায়গা নেই, ভূমিকা নেই, ধর্মকে করা হয়েছে ব্যক্তিজীবনের ঐচ্ছিক বিষয় যা কোনোভাবেই সামাজিক কাঠামোর উপর প্রভাব বিস্তারের অধিকার রাখে না। এই সভ্যতার মিডিয়া, শিক্ষাব্যবস্থা, সংস্কৃতির মাধ্যমে অবিশ্রান্ত প্রচারণার ফলে মানুষের জীবন হয়েছে চূড়ান্ত ভোগবাদী, অপরের সুখের জন্য নিজে ত্যাগস্বীকার করা, নিঃস্বার্থভাবে অন্যের উপকারের জন্য কিছু বলার মতো লোকও সমাজ থেকে হারিয়ে গেছে। আর মানবজাতির কল্যাণে জীবনকে অতিবাহিত করবে এমন কথা কল্পনাতেও আনা যায় না। নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়াতে কেউ আর রাজি নয়। যা কিছু করবে সব নিজের স্বার্থে। এর পরিণামে মানুষ কারো উপর অন্যায় দেখলে তার প্রতিবাদ করে না, ফলে ব্যক্তি থেকে রাষ্ট্রের প্রতিটি পর্যায়ে অন্যায়কারীরা নির্বিঘ্ন। একমাত্র আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ এড়াতে পারলেই আর কারো কোনো পরোয়া কেউ করে না। মানুষের মনে স্রষ্টার প্রতি জবাবদিহিতা বা পরকালের ভয় বিলীন হয়ে যাওয়ায় সমস্ত অপরাধ লাগামহীনভাবে বাড়ছে, মিথ্যা, প্রতারণা, ব্যভিচার যুগের বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। পুরো দুনিয়াটা হয়ে গেছে অশান্তির নরককুণ্ড। এই সভ্যতাটাকে সৃষ্টি করেছে পশ্চিমারা। বিশ্বটা যখন তাদের অধীনে চলে গেল তখন তাদের থেকে এই জীবনদর্শন সব জায়গায় ঢুকেছে। আমরা এটার জন্যই পশ্চিমা সভ্যতার বিরুদ্ধে কথা বলি, পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে নয়। মানুষের নিরাপত্তার সমস্ত দায়-দায়িত্ব আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর উপর চাপিয়ে দেওয়া, যেন এজন্য নাগরিকদের বিধিবদ্ধ কোনো ভূমিকা নেই। এটা অযৌক্তিক। ভারতে কিন্তু কখনো এমন জীবন দর্শন ছিল না। ভারতে হাজার হাজার বছর গেছে শাস্ত্রের বিধানে, এখানে ধর্মীয় মূল্যবোধ, নীতিবোধ মানুষের রক্তে, অস্থিমজ্জায় মিশে ছিল। সেখানে পরিবার, গ্রাম, সমাজ ইত্যাদি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানরূপে কাজ করত। এগুলো মানুষের আচরণ ও শিক্ষাকে নিয়ন্ত্রণ করত। সে ব্যবস্থাকেও ধ্বংস করে দিয়েছে এই পশ্চিমা জীবনব্যবস্থার বিষাক্ত দর্শন। সনাতন ধর্মাবলম্বীরা আগে শাস্ত্র থেকে জ্ঞান লাভ করে ব্যক্তিজীবনে এতই সৎ ছিলেন দুধে পানি মেশানোর কথা কল্পনাও করত না, অথচ আজ সব খাদ্যেই বিষ, সবকিছুতেই ভেজাল, এ বিষয়ে সনাতন-মুসলিমের কোনো পার্থক্য নেই। মানুষ সবাই সবাইকে বিশ্বাস করত, চিন্তাও করত না মানুষ মিথ্যা কথা বলতে পারে, কিন্তু ব্রিটিশরা মামলা মকদ্দমার সিস্টেম চালু করে সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে মিথ্যাবাদী হতে বাধ্য করেছে। সনাতন কি মুসলিম, মানুষের ওয়াদা ছিল পাহাড়ের মত অনড়, সেখানে পশ্চিমাদের শেখানো রাজনীতির দ্বারা মানুষের ওয়াদা মূল্যহীন হয়ে গেছে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের ব্যাপারে কথা বলি না কেন প্রশ্ন করা হয়, আগে বলুন- ৪৭ সালের আগে কি ভারত আলাদা ছিল? কারা একে আলাদা করল? যারা হাজার হাজার বছর ধরে একই ভূখণ্ডে, একই জলবায়ুতে লালিত হয়েছে, আজ তারা একে অপরের শত্রু, পাকিস্তান বাংলাদেশ শত্রু, ভারত পাকিস্তান শত্রু। একে অপরকে শোষণ-শাসন করার চেষ্টা করছে, সীমান্তে হানাহানি করছে। এরা কবে থেকে পরস্পরের শত্রু হলো সে ইতিহাস দেখবেন না? আজ এই মানুষগুলি সম্পূর্ণ শত্রু ভাবাপন্ন হয়ে গেছে কারণ তারা নিজস্ব সভ্যতাকে পরিত্যাগ করে পশ্চিমাদের স্বার্থপর সভ্যতাকে গ্রহণ করে নিয়েছে; ফলে ব্যক্তিজীবনে তারা অসৎ হয়েছে, জাতীয় জীবনে হয়েছে দাঙ্গাপ্রিয়।

ভারতকে বিশ্বের সর্ববৃহৎ গণতান্ত্রিক ও সেক্যুলার রাষ্ট্র বলা হয়ে থাকে। কিন্তু বিজেপির কাছে ১২৮ বছরের ঐতিহ্যবাহী কংগ্রেস যেভাবে পরাজিত হলো তাতে আমরা এটুকু বলতে পারি যে, বর্তমানে ধর্মীয় অনুভূতিই সেখানে রাজনীতির মূল চালিকাশক্তি বা ফ্যাক্টর। গোটা উপমহাদেশের জনগোষ্ঠীই, সনাতন কি মুসলিম, তারা অধিকাংশই ধর্মবিশ্বাসী। তাদের এ বিশ্বাসকে কাজে লাগিয়ে ফায়দা হাসিল করে রাজনীতিকরা ও ধর্মব্যবসায়ীরা। আমরা মনে করি, আমাদের দেশেও ধর্মকে নিয়ে একটা পরিস্থিতি সৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে। কাজেই এখন জরুরি হয়ে পড়েছে মানুষকে ধর্মের প্রকৃত শিক্ষা দেওয়ার, যাতে ধর্মবিশ্বাস দেশ ও জাতির অকল্যাণে নয় কল্যাণে ব্যবহৃত হয়।