প্রশ্ন-উত্তর Archives | Page 5 of 10 | হেযবুত তওহীদ

প্রশ্ন-উত্তর

প্রকৃতপক্ষে কথাটি হিন্দু ধর্ম নয়, সনাতন ধর্ম। হিন্দু ধর্ম বলে কোনো কথা বেদ, পুরাণ, গীতা, উপনিষদ কোথাও নেই। তবু বোঝার সুবিধার্থে বলা যাবে না, এমন নয়, কিন্তু সনাতন শব্দের যে তাৎপর্য তা হিন্দু শব্দে নেই। যাই হোক, এই যে অভিযোগটি আমাদের বিরুদ্ধে করা হয় এটা সত্য নয়। প্রতিষ্ঠিত কোনো মিথ্যার বিরুদ্ধে একটি যুক্তি প্রমাণসহ একটি সত্য উপস্থাপন করলে সেটাকে কি বিভ্রান্তি ছড়ানো বলা যায়? আমরা মনে করি, অভিযোগ করতে হলে আগে আমাদের উপস্থাপিত যুক্তি-প্রমাণগুলোকে ভুল প্রমাণ করতে হবে।
এই যে সত্যটা আমরা বলছি, এর একটি বড় উদ্দেশ্য আছে। এ উপমহাদেশে হিন্দু ও মুসলমান দু’টি প্রধান জাতি। বিগত কয়েক শতাব্দী ধরে এ দুই জাতির সংঘাতে কী না হয়েছে উপমহাদেশে! কত লক্ষ লক্ষ প্রাণ গেছে! তাদের হৃদয়ের গভীরে পরস্পরের প্রতি সীমাহীন শত্র“তা ও ঘৃণা রয়েছে যার বহিঃপ্রকাশ বিভিন্নভাবে ঘটে থাকে। দু এক বছর পর পরই রক্তক্ষয়ী দাঙ্গা হয়, ভারতে বা বাংলাদেশে, বিদ্বেষমূলক বক্তব্য সারাবছরই শোনা যায়। এই ঘৃণাকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে সৃষ্টি করা হয়, ব্যবহার করা হয়। এটা সৃষ্টি করে ধর্মব্যবসায়ীরা, একে রাজনীতিক ইস্যুতে পরিণত করে ব্রিটিশদের থেকে শিক্ষাপ্রাপ্ত ধান্দাবাজ রাজনীতিবিদরা। একটি ধর্মের লোকের ভোট পাওয়ার আশায় তারা বিভিন্ন কলাকৌশল অবলম্বন করে। ফলে হিন্দু মুসলমানের মধ্যে শত্র“তা থেকেই যায়। তারা একে অন্যের ঘরে খায় না, একে অন্যের স্পর্শ এড়িয়ে চলে। ধর্মের নামে এ সব আচার ধর্মের শিক্ষা নয়, এটা মনুষ্যত্বের অপমান। আমরা এদের গালাগালিকে গলাগলিতে রূপান্তরিত করতে চাই। এটা করতে চাই সত্যের ভিত্তিতে, তাদের ধর্মেরই ভিত্তিতে। এই যে অবতারের প্রসঙ্গ- এটা আসলে একটি গবেষণার বিষয় যা আমাদের আগেও ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ থেকে শুরু করে অনেক বড় বড় গবেষক, মনীষী বলে গেছেন। তাঁরা প্রমাণ করেছেন যে ভারতবর্ষে প্রচলিত ধর্মগ্রন্থগুলোর সঙ্গে কোর’আনের অনেক কথা মিলে যায়। কোর’আনে আল্লাহ বলেছেন, এমন কোনো জনপদ নেই যেখানে আমি নবী-রসুল পাঠাই নি। সে হিসাবে ভারতবর্ষ হাজার হাজার বছরের সভ্যতার লীলাক্ষেত্র, এইখানে নবী-রসুল কোথায়, তাদের গ্রন্থগুলি কোথায়, তাদের সেই শিক্ষা কোথায়? সনাতন ধর্মের গ্রন্থগুলোই হচ্ছে সেগুলো, এবং যাদের মাধ্যমে এ গ্রন্থগুলো আমরা পেয়েছি তারা আল্লাহরই নবী-রসুল বা অবতার। যেহেতু এটি একটি গবেষণার বিষয় আমরা কাউকে এটা মেনে নিতে জোর করছি না। তবে আমরা মানি, কারণ ইসলামের শিক্ষা মতে শুধু শেষ নবীর উপর ঈমান আনলে হবে না, সকল নবীর উপর ঈমান আনতে হবে। এটা বাধ্যতামূলক। কাজেই ভারতবর্ষের অবতারগণ যদি নবী হয়ে থকেন তাঁদেরকে (আ.) বলা আমাদের ঈমানের অঙ্গ। মুসা (আ.) কে আমরা ইহুদি ধর্মাবলম্বী মনে করি না, ঈসা (আ.)-কেও খ্রিষ্টান মনে করি না, ইসলামের নবীই মনে করি। এক লক্ষ চব্বিশ হাজার মতান্তরে দুই লক্ষ চব্বিশ হাজার নবীর মধ্যে মাত্র ২৫ জনের নাম কোর’আনে হাদিসে পাওয়া যায়, কিন্তু যে বিরাট সংখ্যক নবী-রসুল এর বাইরে রয়ে গেলেন, তাদেরকে যদি আমরা আল্লাহর নবী হিসাবে চিনতে পাই, তবু কি তাদেরকে অসম্মান, অমর্যাদা করব, গালাগালি করব? এর পরিণতি কি ভালো হবে? ইহুদিরা ঈসা (আ.)-সেই দু হাজার বছর ধরে মেরির অবৈধ সন্তান বলে গালি গালাজ করে আসছে। নাউযুবিল্লাহ। এ নিয়ে ইউরোপে ইহুদিদের উপর ১৯৪৫ পর্যন্ত কী গণহত্যা চালিয়েছে খ্রিষ্টানরা তা আপনারা দেখেছেন। ভারতে ব্রাহ্মণ্যবাদীরা বৌদ্ধদের উপর সীমাহীন নির্যাতন নিপীড়ন চালিয়েছে, অথচ গৌতম বুদ্ধ (আ.) সনাতন ধর্মেরই একজন অবতার যা সনাতন ধর্মেই স্বীকৃত। শেষ নবী মোহাম্মদ (দ.) কে নবী হিসাবে স্বীকৃতি না দিয়ে কার্টুন সিনেমা বানিয়ে কতবার অকারণ দাঙ্গার জন্ম দেওয়া হয়েছে আপনারা জানেন। সিন্ধু শব্দ থেকেই হিন্দু শব্দটি এসেছে, অথচ পাকিস্তানে আজ শতকরা দুইভাগও হিন্দু নেই। ব্রিটিশ আমলে এই দাঙ্গার সূত্র ধরেই ’৪৭ সালে হিন্দু-মুসলিমদের জন্য আলাদা দেশ সৃষ্টি করা হয়েছিল, এখানেও ছিল সেই ডিভাইড অ্যান্ড রুলের কারিগরি। হিন্দু-মুসলিম শত্র“তার বীজ তাদের বিশ্বাসের অনেক গভীরে, আমরা একে সমূলে উপড়ে ফেলতে চাই। আমরা মুসলমানদেরকে বলছি, তোমরা সনাতন ধর্মের অবতারদের যে গালাগালি করো, অথচ তারা আল্লাহর নবী-রসুল ছিলেন। আবার সনাতন ধর্মের ভাইদের বলছি তোমরা নিজেদের ধর্মের অবতারদের মূর্তি বানিয়ে পূজা করো, অথচ মোহাম্মদ (দ.) ও স্রষ্টারই অবতার বা নবী। কীভাবে- তার প্রমাণ আমরা দিয়েছি। তাকে তোমরা অশ্রদ্ধা করো, এটা ঠিক নয়। অন্যের যেটুকু সত্য সেটুকু অবশ্যই সত্য বলে স্বীকৃতি পেতে পারে, সেটা না দিলে ঘৃণা-বিদ্বেষের অবসান কোনো দিনও হবে না। এ ঘৃণা তো ধর্মের অপব্যাখ্যা, মিথ্যা ইতিহাসের থেকে সৃষ্টি হয়েছে, একে লাঠিপেটা করে দূর করা যাবে না। দূর করতে হবে ধর্মের অপ্রকাশিত সত্যকে প্রকাশ করার মাধ্যমে, গোপন করা ইতিহাসকে উন্মোচন করার মাধ্যমে। আমরা বলছি, সনাতন ধর্ম আলাদা কোনো ধর্ম নয়, ইসলামেরই একটি সংস্করণ। সনাতন যা কোর’আনে বর্ণিত দীনুল কাইয়্যেমা তা। হিন্দু-মুসলিম একই পিতা-মাতার সন্তান, হিন্দুরা বলছে আদম ও হব্যবতী, মুসলিমরা বলছে আদম ও হাওয়া। তাহলে এই যে বিভেদ, এটা কত বড় মূর্খতা! আমরা বিশ্বাস করি প্রকৃত সত্য জানলে এই বিভেদ চিরস্থায়ীভাবে দূর হবে এনশা’আল্লাহ। যারা আমাদের এ বিষয়ে বিরোধিতা করছেন তারা হয় আমাদের ভুল বুঝছেন অথবা তারা চান এই সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ যে টিকে থাকে।

ব্যাপারটা কিন্তু তা নয়। আমি রাস্তায় নেমে গাড়ি ভাংচুর করলাম, একটা বিক্ষোভ মিছিল করলাম, হরতাল ডাক দিলাম তখন আমাকে ‘প্রকাশ্য সংগঠন’ বলবে এটা কিন্তু যৌক্তিক নয়। ইতিহাসের বহু সামাজিক আন্দোলন আছে আপনারা জানেন যে সহিংস পন্থায় না গিয়েও, আমাদের মতোই সমাজ সচেতনতামূলক কাজ করেও জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন এবং বিরাট সংখ্যক মানুষের ভালোবাসা তারা পেয়েছেন। কাজেই আমাদেরকে যারা গোপন বলে তারা ইচ্ছাকৃতভাবে বলে পরিকল্পিতভাবে বলে। আমাদের সরকারের কাছে আমাদেরকে প্রভাবিত করার জন্য যেন আমাদেরকে হয়রানি করা হয় এবং জনগণকে আমাদের সম্পর্কে সন্দেহ সৃষ্টি করার উদ্দেশ্যে এগুলো করা হয়। আমাদের সমস্ত কর্মকা- প্রকাশ্য। আমাদের কার্যালয় প্রকাশ্য আমাদের টেলিফোন নম্বর প্রকাশ্য, আমাদের প্রত্যেকের বাসভবন ঠিকানা জানা আছে। আমাদের বই বিক্রি হচ্ছে রাজধানীর মধ্যে। কাজেই আমাদের সম্পর্কে গোপন বলা হয় পরিকল্পিতভাবে। তারা দৃষ্টিহীন। যারা জাজ্¡ল্য দিবাকরকে দেখে যারা বলে সূর্য নেই তাদেরকে বলব শুধু অন্ধ বধির। তারা প্রজ্জ্বল সূর্যকে দেখে বলে অন্ধকার। তাদের আমি অন্ধ ছাড়া আর কিছু বলতে পারি না। স্পষ্ট হেযবুত তওহীদকে যদি তারা যদি গোপন বলে তাহলে তারা অন্ধ। তারা হেযবুত তওহীদকে দেখবে না। কারণ তারা একচোখ কানা; দাজ্জাল।

এই প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়। অত্যন্ত আশ্চর্যজনক বিষয়, যারা গণতন্ত্রের কথা বলেন, গণতান্ত্রিক অধিকারের কথা বলেন, যারা সাংবিধানিক অধিকার, মানবাধিকার, ধর্মীয় স্বাধীনতা, মতামত প্রকাশের অধিকারের কথা বলেন, সভা-সমাবেশে বিরাট বিরাট বুলি আওড়ান তারাই যদি এসমস্ত নীতিমালা পরিপন্থী কাজ করে তখন সেটা কী মেনে নেওয়া যায়? হেযবুত তওহীদ কর্তৃক আয়োজিত সভা সেমিনারগুলো রাজনীতিক আলোচনামুক্ত। আপনারা জানেন আমাদের আলোচ্য বিষয়গুলো কী কী। আমাদের বিষয়গুলো হলো, ‘এক জাতি এক দেশ ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ’, ‘ধর্মব্যবসা, ধর্ম নিয়ে অপরাজনীতি, জঙ্গিবাদের ইতিবৃত্ত’, ‘সকল ধর্মের মর্মকথা সবার ঊর্ধ্বে মানবতা’ ইত্যাদি। এই বিষয়গুলো নিয়ে মনোভাব বিনিময়ের জন্যই আমরা আমন্ত্রণ জানাই সর্বশ্রেণীর মানুষদেরকে, সাহিত্যিক, শিল্পি, সাংবাদিক, অধ্যাপক, ডাক্তার, আইনজ্ঞ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আমরা কাউকে বাদ রাখি নি। একটি শক্তিশালী জাতি গঠনে এরা অন্যদের চেয়ে বেশি ভূমিকা রাখতে পারেন। আমরা কৃষক শ্রমিক মেহনতি জনতা সবাইকে আমরা দাওয়াত দিই। কারণ তারাই এ সমাজের বাসিন্দা, তাদের সুখ শান্তির জন্যই সবকিছু। সমাজের মানুষগুলোকে যদি শান্তিপূর্ণভাবে ঐক্যবদ্ধভাবে থাকতে হয় তাহলে যে সমস্ত ফ্যাক্টরগুলো ঐক্যের সঙ্গে সংগতিশীল নয়, যে সমস্ত বিকৃতিগুলো প্রকৃত ইসলামের সঙ্গে সঙ্গতিশীল নয়, সে সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি করা আমাদের কর্তব্য। সরকার কথায় কথায় বলেন, সর্বস্তরের জনগণকে জাতির কল্যাণে এগিয়ে আসার আহ্বান করছি। এখন আমরা যখন এগেিয় গেলাম, তখন বলা হলো, ওদের প্রোগ্রামে যাবেন না। আমরা যদি কোনো অন্যায় কথা বলে থাকি, আমাদেরকে সেটা দেখিয়ে দিন, আমরা শুধরে নেব। আমাদের সেই মানসিকতা আছে। কিন্তু তাও করছেন না। আসলে আমাদের এ সমস্ত সেমিনারগুলিতে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা অংশগ্রহণ করলে সেটা জাতির জন্য কল্যাণকর হবে, জাতির সমৃদ্ধির পথ রচিত হবে, আর একটি বড় গোষ্ঠী আছে যারা এটা চায় না। তারা সমাজে দুর্নীতি, অন্যায়, অশান্তি, মারামারি, কোন্দল টিকিয়ে রাখতে চায় ব্যক্তিস্বার্থে বা গোষ্ঠীস্বার্থে। ধর্মব্যবসা সমাজের জন্য ক্যান্সারস্বরূপ। যারা একে টিকিয়ে রাখতে চায় তারা কি সমাজের শুভাকাক্সক্ষী? আমরা এই সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানাই। এটাই কি মুক্তচিন্তা, উদার নৈতিকতার পরিচয় নাকি কূপম-ূকতা ও ক্ষুদ্রতার পরিচয়? অমুকের মিটিং-এ যাবেন না, অমুকের পেপার পড়বেন না এ কথা বলতে পারে অসভ্য বর্বর ইউরোপীয় মধ্যযুগীয় সমাজের বাসিন্দারা, অবাধ তথ্যপ্রযুক্তির সভ্য জগতে কোনো শিক্ষিত শ্রেণি এ জাতীয় কথা কীভাবে বলে? হেযবুত তওহীদ যদি নিষিদ্ধ হতো তাহলে এক কথা ছিল। হেযবুত তওহীদ নিষিদ্ধ নয়, জঙ্গি নয়। হেযবুত তওহীদের সেমিনারে এসে কোনও গণ্যমান্য ব্যক্তি কথা বললে তিনি হেযবুত তওহীদ হয়ে যান না, দূষিত হয়ে যান না। আমরা গোলটেবিল বৈঠক করছি, মুক্ত আলোচনা করছি। তিনি যদি আমাদের কথার সঙ্গে একমত না হন, তবে তিনি প্রকাশ্যে আমাদের বিরুদ্ধে বক্তব্য দিন, আমরা সে সুযোগ অবশ্যই তাকে দেব। সমাজের দায়িত্বশীল অবস্থানে যারা আছেন তারা যদি আমাদের অনুষ্ঠানে না-ই আসেন তবে আমরা যা বলছি তা সত্য বলছি না মিথ্যা বলছি তা তারা কীভাবে জানবেন? আমাদের বক্তব্য যদি সমাজের জন্য ক্ষতিকর হয়, কথা যদি মিথ্যা হয় তার প্রতিবাদ করার অধিকার ও কর্তব্য দুটোই তার আছে। তিনি সেই অধিকার থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন। আর যদি কথা সত্য হয়, তবে তাকে সত্যবিমুখ করা হলো যা একটি ক্রাইম।
দ্বার বন্ধ করে দিয়ে ভ্রমরটারে রুখি,
সত্য বলে আমি তবে কোথা দিয়ে ঢুকি?
দ্বার বন্ধ করে অজ্ঞতার অন্ধকারের মধ্যে বসে থাকাই কি আপনার শিক্ষা? সত্য-মিথ্যা যাচাই করবেন না? আমাদের কথা হচ্ছে সত্যের প্রবেশের পথটি খোলা রাখুন। মানুষের কল্যাণ হবে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের এই আচরণে আমার মক্কার সেই ঘটনা মনে পড়ে যায়। আল্লাহর রসুল যখন মানুষকে সত্যের দিকে ডাকতে লাগলেন তখন ক্বাবার পুরোহিতরা প্রচার করতে লাগল যে, কেউ তার কাছে যাবে না, তার কথা শুনবে না। শুনলেই সর্বনাশ হয়ে যাবে। কিন্তু এ করে কি সত্যের উত্থান রোধ করা গেছে? যায় নি। এতদিন ধর্মব্যবসায়ীরা আমাদের বিরুদ্ধে এমন বহু অপপ্রচার চালিয়েছে যে ওদের বই পড়বে না, মিটিং-এ যাবে না। গেলে খ্রিষ্টান হয়ে যাবে, কাফের হয়ে যাবে। এখন তথাকথিত উচ্চশিক্ষিত শ্রেণিরও একটি অংশ একই কাজ আরম্ভ করেছেন। যারাই আমাদের মিটিং-এ আসেন তাদেরকে হাজারো প্রশ্ন করা হয়, কেন গেলেন, তারা বিতর্কিত ওখানে যাবেন না, গেলে অসুবিধা আছে। এসব কথা বলে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করা হয়। তাদেরকে জানিয়ে দিচ্ছি যে, তারা এমন এক সত্যের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন, যে সত্যকে রুখবার সাধ্য পৃথিবীতে কারো নেই। যে কেউ চেষ্টা করে দেখতে পারেন।

আসলে বাংলাদেশে হিজবুত তাহরীর নামে হঠাৎ করে একটা দলের উদ্ভব হয়েছে কয়েক বছর আগে। তাদেরকে বাংলাদেশ সরকার নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। কাকতালীয়ভাবে তাদের নামের সাথে হেযবুত তওহীদের নামের আংশিক মিল আছে। এমন মিল তো আওয়ামী লীগের সঙ্গে মুসলিম লীগেরও আছে, তাতে কি মুসলিম লীগের কর্মকা- আওয়ামী লীগের উপর বর্তেছে? বর্তায় নি। আপনার নাম আব্দুর রহমান, আরেকজন আছেন জঙ্গি শায়খ আব্দুর রহমান। এখন একই নাম হওয়ার জন্য আপনাকে যদি হয়রানি করা হয় সেটা কি উচিত হবে, আর এজন্য কি আপনি আপনার পিতৃদত্ত নাম পরিবর্তন করে ফেলবেন? ফেলবেন না। কুড়ি বছর আগে হেযবুত তওহীদ নামটি রাখা হয়েছিল, তখন তাহরীর এদেশে ছিলই না। তথাপি এই আংশিক মিলের কারণে আমাদেরকে অহেতুক সন্দেহ এবং হয়রানির স্বীকার হতে হচ্ছে, আমাদের ব্যাপারে ভুল ধারণা করা হচ্ছে। কিন্তু এটা যৌক্তিক নয়। আমরা গত কুড়ি বছরে সন্দেহ করার মতো কোনো কাজ করি নি, করবও না এনশা’আল্লাহ। আমাদের কোনো গোপন কর্মকা- নেই, এটা আমাদের নীতি। কারণ গোপনীয়তাই সন্দেহের জন্ম দেয়। যারা কোনো বে-আইনি কাজ করে না, বে-আইনি কথা বলে না, বিনা তথ্যে তাদেরকে সন্দেহ করার কোনো কারণ নেই। তারপরও সন্দেহবাতিক একটি মানসিক ব্যাধি। এটা যদি কারো থাকে তবে তিনি আমরা তার সন্দেহ দূর করতে পারব না, তিনি মনোরোগ বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হতে পারেন।

অমর্ত্য সেন বই লিখেছেন- তর্কপ্রিয় ভারতীয়। মানুষ তর্ক ভালোবাসে। অপ্রিয় লোকের ভালো কিছুই তার চোখে পড়ে না। পৃথিবীর কোন বিষয়টা নিয়ে বিতর্ক হয় নি? সবচেয়ে বেশি বিতর্ক হয়েছে আল্লাহকে নিয়ে, তারপর নবী-রসুল ও অন্যান্য মহামানবদের নিয়ে। গত ৪৪ বছর ধরে জাতির জনক আর স্বাধীনতার ঘোষক নিয়ে এদেশের জাতীয় পর্যায়ে বিতর্ক চলছে। আমাদের বানান নিয়েও বহু বিতর্ক হচ্ছে। হ্যাঁ, আমরা একটি নির্দিষ্ট বানানরীতি অনুসরণ করি। এর ব্যাখ্যা আমরা পত্রিকায় নিয়মিত প্রকাশ করেছি, হ্যান্ডবিল বিতরণ করে জানিয়েছি, বইয়ের সঙ্গে যোগ করে দিয়েছি, আপনারা সেখানে ভুল থাকলে আমাদের দেখান, আমরা শুধরে নেব। আজ পর্যন্ত কেউ ভুল দেখাতে পারে নি। আল্লাহর রহমে আমরা ভুল লিখছি না। এক্ষেত্রে বলা প্রয়োজন, ধরুণ টিভিতে বিজ্ঞাপন দিল- একজন মুমূর্ষু রোগীর জন্য রক্তের প্রয়োজন। আপনার সঙ্গে রক্তের গ্র“প মিলল। কিন্তু আপনি রক্ত দিতে গেলেন না, অজুহাত দেখালেন বিজ্ঞাপনে মুমূর্ষু বানানটি ভুল লেখা হয়েছিল। এটা কি উচিত হবে? আমরা বলছি, আপনারা বানান না দেখে আমাদের বক্তব্য দেখুন, মুমূর্ষু জাতি বাঁচবে। তা না করে বানান নিয়ে বিতর্ককে আমরা যৌক্তিক মনে করি না।

কারণ বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আমরা কাজ করছি এখানে ৯০% মুসলমান আর এখানে রাজনীতির প্রধান ট্রাম্পকার্ড ইসলাম ধর্ম। পাশের দেশ ভারতে হিন্দু ইস্যু প্রধান, যেটা কাজে লাগিয়ে আজ বিজেপি ক্ষমতায়। আমাদের দেশেও ধর্মকে রাজনীতিক স্বার্থে কাজে লাগানো হয়। তাছাড়া সারা বিশ্বে গত একযুগে ইসলামি জঙ্গিবাদটিই প্রায় বিশ্বযুদ্ধ ঘটিয়ে দিয়েছে, বিশ্ববাসীর জন্য থ্রেট হয়ে দাঁড়িয়েছে, অন্যান্যগুলো অতটা না। আর পশ্চিমা সভ্যতা বিগত কয়েকদশক থেকে কিন্তু ইসলামকেই টার্গেট করেছে যা আপনারা ভালো করেই জানেন। প্রফেসর হান্টিংটন যাকে বলেছেন ক্ল্যাশ অব সিভিলাইজেশন। তথাপি সকল ধর্মের উগ্রপন্থার বিরুদ্ধেই আমরা “সকল ধর্মের মর্মকথা-সবার ঊর্ধ্বে মানবতা” শীর্ষক ডকুমেন্টারিতে কথা বলেছি।

আমরা মনে করি বর্তমানে যে ইসলাম চলছে এটা ইসলামই না। যারা এই রাজনীতি করছেন তারা এই বিকৃতটাকেই প্রতিষ্ঠা করতে চাইছেন। তারা যদি সেটা কায়েম করতে পারেন তবে তা প্রকৃত ইসলাম হবে না, হবে তালেবানি রাষ্ট্র বা একটা জগাখিচুড়ি। মূল কথা সেটা তারা কোনোদিনও জাতিকে শান্তি দিতে পারবে না। আর রাজনীতির বিষয়ে কথা হচ্ছে, আল্লাহ রসুল কি এই সিস্টেমে রাজনীতি করেছেন? তিনি কি মার্কা নিয়ে মিছিল করেছেন? নির্দিষ্ট সময়ের জন্য অন্য দলের নেতৃত্বে মন্ত্রিত্ব করেছেন? করেন নি। তিনি ও তাঁর সাহাবিরা আগে সত্যটা আগে মানুষের সামনে বুঝিয়েছেন, তওহীদের বালাগ করেছেন। তারপরে মানুষ যখন সত্যটা গ্রহণ করে নিয়েছে তারপর ধীরৈ ধীরে তারা এ পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিয়েছেন, যেভাবে প্রাকৃতিক নিয়মে ষড়ঋতুর পরিবর্তন হয়, তেমনি প্রাকৃতিকভাবে ধীরে ধীরে জঘন্যতম আরব জাতি মানবজাতির মধ্যে শ্রেষ্ঠ জাতিতে পরিণত হয়েছিল।

কোর’আনের শাসন চাওয়া ও না চাওয়ার বিষয়টি বর্তমান যুগের সবচেয়ে আলোচিত, বিতর্কিত ও স্পর্শকাতর বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন এসলামের কথা বললেই শুরুতেই চলে আসে কোর’আনী শাসনের কথা। তাই হেযবুত তওহীদ যখন প্রকৃত এসলামের রূপরেখা মানুষের সামনে তুলে ধরছে তখন এ প্রশ্নটির উত্থাপন খুবই প্রাসঙ্গিক ও যুক্তিসংগত। কোর’আন চাই কি চাই না এ প্রশ্নের জবাব এক কথায় দেওয়া সম্ভব নয় কারণ বিষয়টি নিয়ে আমদের চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গি আর বর্তমান প্রচলিত ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ ভিন্ন। এক কথায় এর উত্তর দিলে তা অপূর্ণাঙ্গ থেকে যাবে এবং শ্রোতা ভুল বার্তা পাবেন।
প্রথমে আমাদেরকে কতগুলো বিষয় সম্পর্কে সঠিক ধারণা মাথায় রাখতে হবে। আমাদেরকে বুঝতে হবে কোর’আন কী? আজকে গ্রন্থাকারে যে কেতাবটি আমরা দেখতে পাচ্ছি তা হচ্ছে বিভিন্ন বিধি বিধান সম্বলিত একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, যা হঠাৎ করে আল্লাহর রসুল পান নি, এটি ২৩ বছরে একটি সমাজব্যবস্থায় বিভিন্ন সঙ্কট, বিভিন্ন সমস্যা, বিভিন্ন প্রশ্নের আলোকে নাযেল হওয়া আল্লাহর বিধি বিধানের সমষ্টি। এই কোর’আন হুট করে নাযিল হয় নি, রসুলাল্লাহও হুট করে এটি প্রতিষ্ঠা করে শরিয়াহগুলো প্রতিষ্ঠা করে ফেলেন নি। আমাদের দেশের সংবিধান আজকে যে অবস্থায় এসেছে সেটা কি একদিনে এসেছে? বহু ঘটনার প্রেক্ষিতে, জাতির প্রয়োজনে সংবিধানে নতুন নতুন বিধান সংযুক্ত হয়েছে। কোর’আনটাও এভাবেই ধীরে ধীরে পূর্ণ হয়েছে এবং ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
এই ইসলামি সভ্যতার ভিত্তি হলো আল্লাহর সার্বভৌমত্বের ধারণা- লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, একে বলা হয় তওহীদ। আজকে আমাদের সমাজ ব্যবস্থার অধিকাংশ লোকেরাই তওহীদ কী জানে না। কলেমা তো শুধু মুখস্থ বললেই হবে না, যিকির করলেই হবে না। এর মানে কী, তাৎপর্য্য কী, দাবি কী জানতে হবে। এটি আসলে আল্লাহর সঙ্গে বান্দার একটি চুক্তি যে চুক্তির উপর মানবজাতির পার্থিব জীবনের শান্তি-অশান্তি এবং পারলৌকিক জীবনের জান্নাত-জাহান্নাম নির্ভর করছে। কীভাবে? সর্বপ্রথম মানুষকে বুঝতে হবে যে, স্রষ্টার বিধান সর্বোত্তম, তাঁর চেয়ে বেশি কেউ জানে না যে কীসে মানবজাতি শান্তিতে থাকবে। এটা যুক্তি-বুদ্ধি দিয়ে বোঝার পর তাদেরকে একটি সিদ্ধান্তে আসতে হবে যে, তাহলে আমরা আল্লাহর বিধান যে বিষয়ে আছে সে বিষয়ে নিজেরা বিধান তৈরি করব না, আল্লাহরটাই মানব। আল্লাহরটা মানার মানসিকতা আসলে তখন মানুষ দেখবে যে আল্লাহ কী বিধান দিচ্ছেন। আজ কলেমার মানে করা হয়, একমাত্র আল্লাহকেই সেজদা করতে হবে, ডাকতে হবে, তাঁরই জন্য নামাজ-রোযা করতে হবে ইত্যাদি। কলেমার এই ভুল ব্যাখ্যা মাদ্রাসা শিক্ষার মাধ্যমে এ জাতির মনে মগজে গেড়ে গেছে। এই বিকৃত ইসলামে যার গুরুত্ব এক নম্বর সেটাকে একশত নম্বরে রাখা হয়েছে আর যেটার গুরুত্ব একশত নম্বর সেটাকে বানানো হয়েছে এক নম্বর। মানবদেহে নখের গুরুত্ব আর হৃৎপি-ের গুরুত্ব কি সমান? ইসলামের উদ্দেশ্য শান্তি, কিন্তু দাড়ির সঙ্গে সমাজের শান্তি-নিরাপত্তার কী কোনো সম্পর্ক আছে? অথচ অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে ইসলাম প্রতিষ্ঠা মানেই আগে দাড়ি প্রতিষ্ঠ, টুপি প্রতিষ্ঠা, জোব্বা আর বোরখা প্রতিষ্ঠা। ইসলাম প্রতিষ্ঠা মানেই চোর-ডাকাত ধরে হাত পা কেটে দেওয়া। জেহাদ মানেই যেন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে, ভিন্ন সম্প্রদায়ে উপাসনালয়ে, সিনেমা হলে, আদালতে চোরাগোপ্তা বোমা মারা। ইসলাম সম্পর্কে যে সমাজে এমন কু-ধারণা, সেখানে কোর’আনের শাসন আরোপ করলেও শান্তি আসবে না। প্রতিটি কাজের একটি ধারাবাহিকতা আছে, এ ধারাবাহিকতাও একটি প্রাকৃতিক নিয়ম। এই নিয়ম না মেনে যদি গায়ের জোরে একটি দ-বিধি, জীবনব্যবস্থা কোনো জাতির উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে সমাজে অসন্তোষ আরো বাড়বে। কারণ এ সমাজে ধর্মব্যবসায়ীদের দীর্ঘ অপপ্রচারের ফলে এসলামের প্রকৃত ধারণাটাই বিকৃত হয়ে রয়েছে। পক্ষান্তরে পাশ্চাত্য বস্তুবাদী সভ্যতার দ্বারা তাদের মন-মগজ আমূল বিবর্তিত ও প্রভাবিত। ফলে এ সমাজের মানুষগুলো ন্যায় অন্যায়ের মানদ- জানে না, জানলেও পরোয়া করে না, সত্য-মিথ্যার পার্থক্য কি, ধর্ম কি, মানবজাতির প্রকৃত এবাদত কি তা বোঝে না, তারা লেবাসকেই মনে করে ধর্ম। আমি শুধু স্বল্পশিক্ষিত শ্রেণির কথা বলছি না, গোটা জনগোষ্ঠী যারা ইসলামপ্রিয় এবং ইসলামবিদ্বেষী সবাই ধর্ম বলতে এসব আনুষ্ঠানিকতা, লেবাস, বোরকা, অভ্যাস অনভ্যাস এবং কোর’আনের কয়েকটি আইন-কানুনকেই বোঝেন। ধর্মব্যবসায়ীদের অর্থ দেওয়াকেই মুসল্লিরা সওয়াবের কাজ মনে করে। ধর্মব্যবসা অর্থাৎ নামাজ পড়ানো থেকে শুরু করে ধর্মের যে কোনো কাজ করে টাকা নেওয়া যে আল্লাহ হারাম করেছেন এটা সাধারণ ধর্মবিশ্বাসী মানুষ জানেনই না। সুতরাং ইসলাম প্রতিষ্ঠা বলতেই তারা বোঝেন যে ইসলামটা মোল্লাদের হাতে আছে সেটাই ক্ষমতাসীন হওয়া অর্থাৎ থিয়োক্রেসি বা মোল্লাতন্ত্র কায়েম হওয়া। এটাকে কোনোভাবেই শিক্ষিত, যুক্তিশীল, সভ্য মানুষ মেনে নিতে পারে না, এটাকে ইসলাম প্রতিষ্ঠাও বলা যায় না।
আজ তারা এবাদত বলতে বোঝে মসজিদ আর খানকায় গিয়ে পড়ে থাকা, যিকির করা। এটা করে কি দেশে শান্তি আসবে না এসেছে কোনো কালে? আগে ধর্মবিশ্বাসীদেরকে বোঝাতে হবে যে এবাদত হচ্ছে এমন একটি সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করা যে সমাজে মানুষ নিরাপদে থাকবে, পিকেটারের ইট খেয়ে হাসপাতালে যেতে হবে না, সকলের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত হবে, আদালতে ন্যায়বিচার পাওয়া যাবে, কোনো নারী ধর্ষিত হবে না, কষ্টের উপার্জন ঘুষখোর বা ছিনতাইকারীর পকেটে যাবে না, বেকারত্বের গ্লানি নিয়ে কেউ আত্মহত্যা করবে না, কেউ যেন ক্ষুধায় কষ্ট পাবে না, কেউ বিনা চিকিৎসায় ধুঁকে ধুঁকে মরবে না। এমন সমাজ তৈরি করার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করাই জেহাদ, এটাই বড় এবাদত।
বর্তমানে সমগ্র মুসলিম বিশ্বেই পশ্চিমা বস্তুবাদী জীবনব্যবস্থাকে জাতীয় জীবনব্যবস্থা হিসাবে গ্রহণ করে তা পালন করে চলছে। আমরা মনে করি, এটা এমন একটি সিস্টেম যা ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকরা আমাদেরকে চিরস্থায়ীভাবে দাসে পরিণত করার জন্য চাপিয়ে দিয়ে গেছে। সুতরাং এ সমাজের মানুষকে হুট করে কোর’আনের শাসনের কথা বলা অবান্তর ও অযৌক্তিক হবে। এজন্য আল্লাহর রসুলও তা বলেন নি। আপনি যদি রসুলের আদর্শ বাস্তবায়ন করতে চান, ইসলাম প্রতিষ্ঠা করতে চান, শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে চান তবে রসুলাল্লাহ যেভাবে শুরু করেছিলেন আপনাকেও সেভাবেই শুরু করতে হবে, রসুলের পদাঙ্ক অনুসরণ করতে হবে। কারণ তিনি হচ্ছেন উত্তম আদর্শ, উসওয়াতুল হাসানা। তিনি দাড়ি রেখেছেন বিধায় আপনিও ঐভাবে দাড়ি রাখবেন এই জন্য নয়, দাড়ি সব মানুষেরই হয়। তাই একটি নির্দিষ্ট স্টাইলের দাড়ি রাখানোর, নির্দিষ্ট পোশাক পরানোর জন্য আল্লাহ নবী পাঠিয়েছেন এমন ধারণা মূর্খতা ছাড়া কিছুই নয়। তিনি দাড়ি রাখার আদর্শ নিয়ে আসেন নি, তিনি এসেছেন মানবজীবন থেকে সকল অন্যায় দূর করে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করতে। পবিত্র কোর’আনে অন্তত তিনটি স্থানে আল্লাহ মহানবীর আগমনের উদ্দেশ্য এবং কাজ কী তা পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করেছেন, “আল্লাহ সঠিক দিক নির্দেশনা ও সত্য জীবনব্যবস্থাসহ তাঁর রসুল প্রেরণ করেছেন এই জন্য যে রসুল যেন একে অন্যান্য সকল জীবনব্যবস্থার উপর বিজয়ী হিসাবে প্রতিষ্ঠা করেন (সুরা তওবা ৩৩, সুরা ফাতাহ ২৮, সুরা সফ ৯)। এই কাজটি করতে গিয়ে তিনি প্রথমে কী করলেন? প্রথমে তিনি আল্লাহর সার্বভৌমত্বের দিকে আহ্বান জানালেন। মক্কার লোকেদের কলেমা বোঝালেন, তওহীদ বোঝালেন। মক্কার লোকেরা আল্লাহর সার্বভৌমত্বের পক্ষে ছিল না। তিনি প্রথমে তাদের আল্লাহর বিধান কেন মানতে হবে তা বোঝালেন, ঐক্য বোঝালেন, একক নেতৃত্বের অধীনে ঐক্যবদ্ধ জাতি গঠনের প্রয়োজনীয়তা বোঝালেন। তখন তারা ধীরে ধীরে কলেমা বুঝতে পারল তখন রসুলাল্লাহকে তাদের নেতা হিসাবে মেনে নেওয়ার মানসিকতা সৃষ্টি হলো। বিচ্ছিন্ন একটি জনগোষ্ঠী ঐক্যবদ্ধ হতে শুরু করল তাঁকে কেন্দ্র করে। মক্কায় যে তের বছর ছিলেন এ দীর্ঘ সময়ে সেখানে তাঁর অনেক আনুগত্যশীল অনুসারী তৈরি হয়েছিলেন, তিনি কিন্তু ইচ্ছা করলে একটি সহিংস অভ্যুত্থান ঘটিয়ে তাঁর প্রধান বিরোধীদেরকে হত্যা করে তাঁর আদর্শকে মক্কাবাসীদের উপর চাপিয়ে দিতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেন নি, কারণ অধিকাংশ লোকের মনের বিরুদ্ধে গিয়ে শাসনক্ষমতা নিলেও নিরাপদ সমাজ গঠন করা যায় না। একবার মক্কার শাসন ক্ষমতা তাঁকে দেওয়ার প্রস্তাবও তাকে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি সেটাও প্রত্যাখ্যান করেন। কারণ তিনি দেখেছেন তিনি যে ধারণাটি প্রতিষ্ঠা করতে চান তখনও জনগণ সেটা বোঝে নি, তারা তাদের পূর্ববর্তী জীবনবিধান বা ধারণা নিয়েই থাকতে চেয়েছে। তাই রসুল অপেক্ষা করেছেন তাঁর আদর্শটা জনগণের কাছে গৃহীত হওয়ার জন্য। এভাবে অপেক্ষা করে ১৩ বছর শুধু তওহীদের আহ্বান করে গেছেন। মক্কাবাসীকে এ কথাই বুঝিয়েছেন যে তোমরা সমস্ত ন্যায় অন্যায়ের মাপকাঠি হিসাবে আল্লাহকে মেনে নাও। এটাই সমস্ত জীবনের মঙ্গল। কিন্তু গুটিকয় লোক বাদে সবাই প্রত্যাখ্যান করল। এরই মধ্যে মদিনাবাসীদের মধ্যে একটি বড় অংশ তাঁর এই বক্তব্যের সঙ্গে একমত হলো এবং তাঁকে নিজেদের পরিবারের মতো করে আশ্রয় দিতে সম্মত হলো। তিনি মদিনায় চলে গেলেন, কারণ সত্য প্রতিষ্ঠাই তাঁর মিশন। যারা সত্য গ্রহণে আগ্রহী তাদের কাছেই তিনি যাবেন। তখন মদিনাকেন্দ্রীক একটি ঐক্যবদ্ধ সমাজব্যবস্থা কায়েম হলো। সেই ঐক্যবদ্ধ সমাজ নেতা হিসাবে রসুলাল্লাহকে মেনে নিলেন, তারা তাদের যাবতীয় সমস্যার সিদ্ধান্তদাতা হিসাবে রসুলকে মেনে নিলেন। সেখানে বসবাসকারী সকল ধর্মের অনুসারীদেরকে নিয়ে তিনি একটি ঐক্য ও নিরাপত্তাচুক্তি করলেন। যখন একটি জাতি রসুলাল্লাহকে কেন্দ্র করে ঐক্যবদ্ধ হলো তারপর থেকে তাদের যাবতীয় সমস্যার পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ একটার পর একটা বিধান নাজেল করতে থাকেন। এ বিধানগুলোর সমষ্টিই হচ্ছে আজকের কোর’আন। এখন আমাদের এ দেশের অবস্থার প্রেক্ষাপটে আপনি যদি শ্লোগান তোলেন যে আল্লাহর আইন চাই, শরীয়াহ আইন বাস্তবায়ন কমিটি করেন তাহলে এসব কথা হবে লোকভুলানো কথা, প্রতারণামূলক রাজনৈতিক শ্লোগান। কারণ আমাদের দেশের জনগণ ধর্ম-অধর্মের পার্থক্য বোঝে না, তারা বিকৃত ইসলামকেই ধর্ম বলে মানে। সেই ধর্ম এখনো ধর্মব্যবসায়ীদের কুক্ষিগত এবং জনগণ তাদেরকেই সমীহ করে চলে। ধর্মব্যবসা যে ইসলামে নিষিদ্ধ, ধর্মব্যবসায়ী আলেমরা যে আসমানের নিচে নিকৃষ্টতম জীব তা তারা জানেই না, তাই ধর্মব্যবসায়ীদেরকে তারা টাকা দিয়ে পালন করে। ঐক্যের বিরুদ্ধে কথা বলা যে কুফর সেটাও তারা জানে না, তাই তারা এখনো নিজেদেরকে শিয়া, সুন্নি, হানাফি বলে বিশ্বাস করে, নিজেদের মধ্যে ফেরকা মাজহাবের দেওয়ালকে লালন করে। এমনকি পশ্চিমাদের বস্তুবাদী জীবনব্যবস্থাই সর্বোৎকৃষ্ট বলে তারা মনে করে, পশ্চিমাদেরকেই প্রভু মনে করে, তাদের তৈরি ভিন্ন ভিন্ন মতবাদের উপর ভিত্তি করা শত শত রাজনীতিক দলে বিভক্ত হয়ে নিত্য দাঙ্গা-ফাসাদ, হানাহানি, মারামারিতে লিপ্ত। অর্থাৎ চূড়ান্ত অনৈক্য বিরাজিত। সেখানে এখনই এ জাতির সামনে ‘কোর’আনের শাসন চান কি চান না’, না বলে আমাদের প্রথম কর্তব্য হচ্ছে সমাজের মানুষগুলোকে সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ করা, সত্য-মিথ্যার পার্থক্য বোঝানো, ঐক্যের সুবিধা, অনৈক্যের অসুবিধাগুলো বুঝানো। তাদেরকে সর্ব উপায়ে বোঝানো যে, কোন কাজ করলে সেটা আল্লাহর এবাদত হবে, কোন কাজ আল্লাহর কাছে প্রিয়। জাহেলিয়াতের অন্ধকার থেকে বের করে মানুষগুলোকে সত্যের পক্ষে, ন্যায়ের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ করে তাদের মধ্যে একটি জাতীয় ঐক্যবোধের চেতনা জাগ্রত করাই হবে আমাদের প্রথম কাজ। তারপর সমস্ত জাতি যখন এই কথার উপর ঐক্যবদ্ধ হবে যে, আমরা ষোল কোটি মানুষ সত্যের পক্ষে, ন্যায়ের পক্ষে, হকের পক্ষে থাকব তখন তারা সিদ্ধান্ত নেবে যে, তাদের যাবতীয় সমস্যার সমাধান হবে কীসের ভিত্তিতে হবে।
সশস্ত্র বিপ্লব ঘটিয়ে যারা রাতারাতি একটি সংবিধান প্রতিষ্ঠা করে ফেলতে চান তাদের ভুলটাও তুলে ধরতে হবে যেন কেউ সেই পথে পা না বাড়ায়। মনে রাখতে হবে, ইসলাম কেবল কয়েকটি বিধানের সমষ্টি নয়, এটি একটি সভ্যতা বা সিভিলাইজেশন যার স্থায়িত্ব হতে পারে হাজার হাজার বছর। একটি সভ্যতার সঙ্গে একটি জাতির পরিচয়, সংস্কৃতি, জীবনযাপন, পেশা, সামগ্রিক জীবন, শিল্প, সাহিত্য, গান, স্থাপত্য, চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, পোশাক আশাক সবকিছু জড়িত থাকে। সুতরাং একটি বই থেকে কয়েকটি আইন চালু করে দিলেই কি সেটাকে সভ্যতা বলা যাবে? যাবে না। সর্বশ্রেণির মানুষের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কখনো একটি সভ্যতা গড়ে ওঠে না। এ কারণেই তালেবানরা রাজ্যজয় করতে পারলেও মানুষের মনজয় করতে পারে নি। যেটা রাতারাতি প্রতিষ্ঠা হয় সেটা রাতারাতি উৎখাতও হয়। রাতারাতি বিপ্লবের দ্বারা সমাজতন্ত্র বা গণতন্ত্রও প্রতিষ্ঠিত হয় নি, বহু ঘাত প্রতিঘাত সইতে হয়েছে, বিশ্বময় এই মতবাদগুলোর ইতিবাচক নেতিবাচক দিকগুলো নিয়ে আলোচনা সমালোচনা হয়েছে, হাজার হাজার বই লেখা হয়েছে, গণমাধ্যমে ঝড় তোলা হয়েছে। এভাবে এই আদর্শগুলো মানুষের মনে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে, তারপর চলেছে পরীক্ষা নীরিক্ষা, সংস্কারসাধন। আদর্শ প্রতিষ্ঠার এটিই স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক রীতি। যারা সহিংসতার মধ্যে দিয়ে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন তারা কোথাও সফল হন নি, জনগণ তাদের প্রত্যাখ্যান করেছে, এমন কি সমাজতন্ত্রের পথিকৃৎগণও তাদেরকে সমর্থন দেন নি।
আল্লাহ চান মানুষজাতি যেখানেই থাকুক ঐক্যবদ্ধ থাকুক। কারণ তিনি মানুষকে সামাজিক জীব হিসাবে সৃষ্টি করেছেন। তাদের সেই সমাজে জুলুম না থাকুক, অবাধ বাক স্বাধীনতা থাকুক, অন্যায়, অবিচার, দুর্নীতি না থাকুক, শাসকের জবাবদিহিতা থাকুক এটাই আল্লাহ চান। আমরাও এটা চাই। আমরা মানুষকে এগুলোর পক্ষে ঐক্যবদ্ধ করতে চাই- কারণ ঐক্যবদ্ধ না হলে এই চাওয়া কখনোই পূর্ণ হবে না। এক কথায় মানুষ ন্যায়ের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হয় তাহলেই সমাজের মধ্যে যদি শান্তি, ন্যায়, সুবিচার প্রতিষ্ঠিত হবে। মানুষের এই ঐক্যের মাধ্যমে ইসলামের অধিকাংশ বিধান আপনিই প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। বাদ থাকে শুধু দ-বিধি বা পিনাল কোড। সেটা জনগণই ঠিক করে নেবে যে তারা এই পিনাল কোড চায় কি চায় না। যদি তারা কোর’আনের পিনাল কোড না চায় সেটা তাদের উপর চাপিয়ে দেওয়া ইসলামের নীতি বিরুদ্ধ। এমনকি আমরা এও বলছি না যে কেবল কোর’আনই স্রষ্টার দেওয়া জীবনব্যবস্থা। যারা সনাতন ধর্মাবলম্বী তারা হয়তো কোর’আনের বদলে বেদের বিধানকে উত্তম মনে করবেন, ইহুদিরা চাইবে তওরাতের বিধান। অসুবিধা নেই, ওগুলো সবই স্রষ্টারই বিধান। ওগুলো দিয়েও শান্তি এসেছে। মদিনায় ইহুদিরা কোর’আনের বিধানের বদলে তওরাতের বিধান দিয়ে নিজেদের বিশ্বাসঘাতকতার দ- কামনা করেছিল, কারণ সেটাকেই তারা সুবিচার বলে বিশ্বাস করত। রসুলাল্লাহ সেটা মোতাবেকই তাদের বিচার করেছিলেন। এখনো কোনো অপরাধী যদি ব্রিটিশ পিনাল কোড মোতাবেক নিজের দ- চায়, তার উপর জোর করে কোর’আনের কানুন চাপিয়ে দেওয়াকে আমরা যুক্তিযুক্ত মনে করি না। রাষ্ট্রগঠনের আধুনিক সংজ্ঞায় জনগণের ইচ্ছার অভিব্যক্তিই হচ্ছে রাষ্ট্র। জনগণ কী চায় সেটাই মুখ্য। জনগণ যদি বলে আমরা তিনশত বছর ব্রিটিশ রুল দেখেছি। এটা আমাদেরকে শান্তি দিতে পারে নাই, তাহলে তারা সেটা আর মানবে না। আর যদি বলে আমরা এই অশান্তির মধ্যেই থাকতে চাই। তাহলে ধর্ম সেটাকে উৎপাটন করে জোর করে কোর’আনের বিধান চাপিয়ে দেবে না। কারণ জোর করা ধর্মের কাজ নয়, সেটা অধর্মের কাজ।
তবে আমরা দ্ব্যার্থহীনভাবে বলছি যে, পশ্চিমা সভ্যতার যে জীবনব্যবস্থা মানুষকে শান্তি দিচ্ছে না, দিতে পারবে না। কারণ এগুলো মানুষের মস্তিষ্কপ্রসূত বিধান আর স্বল্পজ্ঞানী মানুষ যে এক মিনিট পরে কী হবে তাও জানে না, সে কখনোই মানবজাতির শান্তির জন্য নিখুঁত একটি জীবনবিধান রচনা করতে পারে না। এগুলো প্রতারণামূলক ব্যবস্থা, এরা মানবাধিকারের কথা বলে, বাকস্বাধীনতার কথা বলে, রাষ্ট্রের কাজে মানুষের ইচ্ছার প্রতিফলনের কথা বলে, সুবিচারের কথা বলে, সাম্যবাদের কথা বলে কিন্তু কিছুই দিতে পারে না। কিন্তু স্রষ্টার বিধানে এগুলো দেওয়া অতীতেও সম্ভব হয়েছিল, এখনও সম্ভব। এই বিশ্বাসটা আগে মানুষের মনে আমরা সৃষ্টি করতে চাই, তাহলে মানুষের সামনে কোনটা সত্য আর কোনটা প্রতারণা তা সুস্পষ্ট হয়ে যাবে। তখন মানুষই তার পথ বেছে নেবে। তবে আমরা মনে করি, আল্লাহর দেওয়া বিধানের চেয়ে সত্য, ন্যায়নিষ্ঠ, সুবিচারপূর্ণ কোনো বিধান হতে পারে না, তথাপি সেটা জোর করে চাপিয়ে দেওয়া আল্লাহর নীতি পরিপন্থী।
প্রশ্ন: যখন জনগণ আপনাদেরকে মেনে নিবে তখন কি আপনারা বর্তমানের দলগুলিকে রাজনীতিক অধিকার দিবেন?
উত্তর: একটি জাতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে জাতীয় ঐক্য। একটি জাতিকে ন্যায়ের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ করা খুবই কষ্টসাধ্য কাজ। এটা যখন একবার করা যাবে তারপর কোনো অজুহাতে সেখানে আবার অনৈক্য সৃষ্টির সুযোগ আপনি কেন দেবেন? আপনি কি জাতির মঙ্গল চান না? আমরা জাতিকে ঐক্যের গুরুত্ব বোঝাব, যুগে যুগে যত ধর্মগ্রন্থ এসেছে সব জায়গায় আছে ঐক্যবদ্ধ থাকার হুকুম, ঐক্য ভঙ্গকে সবচেয়ে বড় অপরাধ বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। এতকিছুর পরও জাতি যদি অনৈক্যের পথে পা বাড়ায় সেটা তাদের জন্য দুর্ভাগ্যজনক পরিণতি। কোনো মতবাদের নামেই হোক আর ধর্মের নামেই হোক যা কিছুই জাতির ঐক্যকে বিনষ্ট করবে সেটাকে আমরা অন্যায় বলে বলে মনে করি। একটি উদাহরণ দেই। ইসলামে পরনিন্দা নিষিদ্ধ, সমালোচনা করতে চাইলে যার দোষ তার সামনে করতে হবে। বর্তমানের রাজনীতিক দলগুলোর কাজই হচ্ছে অন্যকে অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করা। আমরা বলব, যা বলবেন সামনে বলুন, আড়ালে যা বলবেন কেবল ভালোটা বলবেন। একটা খারাপ কথাও আড়ালে বলতে পারবে না। মিথ্যা বলার তো প্রশ্নই আসে না। কোনো রাজনীতিক দল যদি এই নীতি মেনে রাজনীতি করতে চায় আমাদের আপত্তি নেই।

ইসলামি রাষ্ট্র বিষয়টা নিয়ে এখন মানুষের যে কনসেপ্ট, ধারণা আছে আমাদের ধারণাটা কিন্তু সম্পূর্ণ ভিন্ন। যেমন ধরুন প্রথমত ইসলাম বলতে মানুষ বুঝে দাড়ি টুপি নামাজ রোজা সুর করে কোর’আন তেলাওয়াত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ এগুলো মানুষ মনে করে ইসলাম। আর ইসলামি শাসন বলতে এখন মানুষ বুঝে তালেবানি শাসন মোল্লা ওমরের শাসন, সৌদি আরবের শাসন- এগুলোকে মানুষ মনে করে ইসলামি শাসন। আর ইসলামি দল বলতে এখন দু রকমের দল বোঝান হয় যারা ইসলামের নামে রাজনীতি করে, যারা ইসলামের নামে জঙ্গিবাদ করে। কাজেই ইসলাম বলতে এখন মানুষের মনে যে কনসেপ্টটা, ধারণাটা আসে এখন আসে সেটা নিয়ে আমাদের ব্যাখ্যা ও বিশ্বাস একটু ভিন্ন। প্রচলিত যে ইসলামি রাষ্ট্র, এমন রাষ্ট্র আমরা চাই না। আমাদের ধারণা মোতাবেক ইসলাম কি? ইসলাম হলো শান্তি। এটা এমন একটি সিস্টেম যা প্রয়োগ করার ফলে ন্যায় সুবিচার শান্তি আসবে সেই ১৪০০ বছর আগে যেটা হয়েছিল। মানুষ যেন দরজা খুলে ঘুমাতে পারে, মানুষ যেন নির্ভয়ে নিশ্চিন্তে পথ চলতে পারে। তাদের সকল মানবাধিকার রক্ষিত হবে, তাদের অবাধে কথা বলার স্বাধীনতা থাকবে। এমন একটা শান্তিপূর্ণ অবস্থার নামই হলো ইসলাম। আমরা সেই ইসলাম চাই, আশা করি শুধু আমরা না কেবল পৃথিবীর তাবত মানুষও এই শান্তিপূর্ণ জীবন চায়। শান্তি চায় মানেই ইসলাম চায়। জাতিসংঘ তৈরি হয়েছে এই ইসলামের জন্য অর্থাৎ শান্তির জন্য। আমরা দেশ স্বাধীন করেছি ইসলামের জন্য, মানে শান্তির জন্য। কাজেই ইসলাম প্রিয় মানুষ কিন্তু পৃথিবীতে সিংহভাগ, দাঙ্গাপ্রিয় লোক অল্প। ঐ অর্থে আমরা ইসলাম চাই, মানে শান্তি চাই। ইসলামে জোর করার কোনো জায়গা নেই। কিন্তু দেখা যাচ্ছে যে মধ্যপ্রাচ্যের অনেক জায়গায় মাথা থেকে পা পর্যন্ত নির্দিষ্ট আকারের বোরখায় আবৃত না করলে বেত্রাঘাত করা হতো, আরবে এখনো নির্দিষ্ট ড্রেসকোড বাধ্যতামূলক। পুলিশ বাহিনী রাখা হয়েছে, কেউ নামাযে না গেলে পিটানো হয়, জোর করে নামাজে দাঁড় করে দেওয়া হয়। এটাতো ইসলাম না। এমন ইসলাম সৃষ্টি করা হয়েছে পরবর্তীতে। এসব জোর জবরদস্তির কারণেই তো মানুষের মন থেকে ইসলাম উঠে গেছে। ইসলাম বলতে তারা এখন জবরদস্তিই মনে করে, আফগানিস্তান মনে করে। কিন্তু প্রকৃত ইসলাম হলো উদারনৈতিক ব্যবস্থা। কিন্তু আমরা এখন বলিষ্ঠভাবে বলতে চাই, বেত দিয়ে পিটিয়ে নামাজে নেওয়া, মেয়েদেরকে বোরখা পরতে বাধ্য করা, জোর করে দাড়ি রাখাতে হবে, দাড়ি না রাখলে সেনাবাহিনীতে জায়গা হবে না, ফুটবল ক্রিকেট খেলা যাবে না, গান গাওয়া, ছবি আঁকা যাবে না এসব ধ্যানধারণা ইসলাম সমর্থন করে না। কিন্তু এগুলোকেই ইসলাম বলে চালিয়ে দেওয়া হয়েছে। এ বিকৃত ইসলামের বিরুদ্ধেই আমাদের সংগ্রাম। আমরা এখন মানবজাতিকে বিশেষ করে বাংলাদেশের মানুষকে সত্যমিথ্যার পার্থক্য বুঝাচ্ছি, ন্যায়-অন্যায়ের পার্থক্য বুঝাচ্ছি। এখন যদি আপনি বলেন ইসলামি রাষ্ট্র চান কি না, আমার কথা হলো যে রাষ্ট্র শান্তিপূর্ণ হবে মানুষের সমস্ত অধিকার সে লাভ করবে এটাই ইসলামি রাষ্ট্র। এই রাষ্ট্র কেবল আমরা না, সবাই চায়। আর যদি বলেন মোল্লাতান্ত্রিক রাষ্ট্র চান কিনা, এক বাক্যে বলব আমরা তা চাই না।

যেহেতু হেযবুত তওহীদ একটি অরাজনীতিক সংস্কারমূলক আন্দোলন, তাই মাননীয় এমামুয্যামান এ আন্দোলন গঠন করার পর থেকে আজ পর্যন্ত সর্বশ্রেণির হাজার হাজার লোক এ আন্দোলনে সম্পৃক্ত হয়েছেন। অনেকে কেবল সমর্থন দিয়েছেন, অনেকে এ সত্য প্রচারে নিজেদেরকে নিয়োজিত করেছেন। কিন্তু কিছুদিন কাজ করার পর তাদের সিংহভাগই আবার নিষ্ক্রিয় হয়ে যান। এই নিষ্ক্রিয়তার পেছনে বড় কারণ হচ্ছে, হেযবুত তওহীদের কাজ স্বতঃস্ফূর্তভাবে মানবতার কল্যাণে নিজেকে নিঃস্বার্থভাবে নিয়োজিত করে করতে হয়। এটা ইসলামের নীতি যে, ইসলামের কাজ করে, এবাদত করে এর কোনো পার্থিব বিনিময় গ্রহণ করা যাবে না। নিজের অর্থ-সম্পদ ব্যয় করে, সময় দিয়ে কাজ করতে হয়। এই চ্যালেঞ্জ যারা নিতে পারেন তারাই হেযবুত তওহীদে সক্রিয়ভাবে টিকে থাকেন। এভাবে বহু এসেছে, বহু চলে গেছে। অতি সম্প্রতি আমরা দেখতে পাচ্ছি যখন আমরা ধর্মব্যবসা, জঙ্গিবাদ, অপরাজনীতির বিরুদ্ধে বাঙালি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার আহ্বান নিয়ে মাঠে নেমেছি, পত্রিকা আর ডকুমেন্টারি ফিল্ম নিয়ে কাজ করছি, আমাদের বক্তব্য যখন সাধারণ মানুষ সরাসরি জানতে পারছে তখন এ দেশের লক্ষ লক্ষ মানুষ দু হাত তুলে আমাদের কর্মকা-কে সমর্থন জানিয়েছেন। যদি জনসমর্থনের কথা বলেন এই লক্ষ লক্ষ জনতাও আমাদের অন্তর্ভুক্ত। যারা সত্যের পক্ষে দাঁড়ায়, তারাও সত্যের অংশীদার। তবে সক্রিয় সদস্য যারা সার্বক্ষণিকভাবে আন্দোলনের কাজ করছে, এমন কয়েকশত লোক আমাদের আছে। এর বেশি হবে না।

বাংলাদেশে গত কুড়ি বছর থেকে সংবিধান মেনেই আমরা কাজ করছি এবং আমরাই বলতে পারি যদি কেউ এদেশে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে সংবিধানের নিয়মগুলো রক্ষা করে চলে তবে সেটা এই হেযবুত তওহীদ। কারণ গত কুড়ি বছর ধরে সংবিধান পরিপন্থী কোনো কাজ করেছি বলে কোনো নজির কেউ দেখাতে পারবে না। বরং সংবিধানপ্রদত্ত যে নাগরিক অধিকার, মৌলিক অধিকার তা আমাদের বেলায় অন্যদের দ্বারা বার বার লংঘিত হয়েছে। আমাদের কথা বলতে দেয়া হয় নাই, আমাদের মিটিং করতে দেয়া হয় নাই, আমাদের অন্যায়ভাবে আটক করা হয়েছে, আমাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ আরোপ করে মর্যাদাহানি করা হয়েছে, অনর্থক সন্দেহ করে প্রশাসনিক ও সামাজিক হয়রানি করা হয়েছে, ৪৬০ এরও অধিক বার মিথ্যা অভিযোগে জেলে দেয়া হয়েছে যে মিথ্যা আদালতে আর প্রশাসনের তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে, আমাদের বাড়ি-ঘরে হামলা করা হয়েছে, আমাদের লেখা সম্পূর্ণ বৈধ হ্যান্ডবিল ও বই প্রচার করতে দেওয়া হয় নি। এগুলো গত কুড়ি বছরে হাজার হাজার বার হয়েছে, যার ডকুমেন্ট আমরা সংরক্ষণ করেছি, কেউ দেখতে চাইলে দেখবেন। অথচ আমাদের বইপত্র ও সিডি সব প্রকাশনা সামগ্রীই সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নিয়মকানুন অনুসরণ করেই ছাপানো হয়। আমরা দৃঢ়ভাবে বলতে চাই, সংবিধানের নীতি পরিপন্থী কাজ আমাদের সঙ্গে করা হয়েছে, কিন্তু আমরা করি নাই। আজ পর্যন্ত একবারের জন্যও আমরা আইন ভঙ্গ করি নাই, আইনকে নিজের হাতে তুলে নেই নাই।
আমাদেরকে প্রশ্ন করা হয়, আমরা সংবিধান মানি কি না? আরেকটু পরিষ্কার করে বলতে গেলে সংবিধানের মূলনীতিগুলো অর্থাৎ গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, জাতীয়তাবাদ এগুলো আমরা স্বীকার করি কিনা?
এ বিষয়ে আমাদের পরিষ্কার বক্তব্য হলো, প্রথমত আমরা গণতন্ত্র মানি কি না। আসলে এক কথায় এর উত্তর হয় না। কারণ কেতাবে যাই লেখা থাক বাস্তবে গণতন্ত্রের যে করাল রূপ আমরা দেখতে পাচ্ছি দুনিয়াময় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নামে দেশ ধ্বংস করে দেওয়া হয়, লক্ষ লক্ষ মানুষ হত্যা করা হয়, গণতন্ত্রের নামে অন্যের অধিকার হরণ করা হয়, কথায় কথায় হরতাল ডাকা হয়, নাস্তানাবুদ করা হয়. সহিংস কর্মাকা- চালানো হয়, কারখানায় লক আউট করা হয়, এভাবে গণতন্ত্রের নামে সমস্ত অপকর্মগুলো যে চলে। যেখানে ন্যায়-অন্যায়ের কোনো মাপকাঠি নেই, জনতার নামে সব চালিয়ে দেওয়া হয় আমরা এ গণতন্ত্র মানি না। শুধু তা-ই না, আমরা মনে করি, কোনো সভ্য মানুষ এই জাতীয় গণতন্ত্র মানতে পারে না এবং এ জাতীয় গণতন্ত্র দিয়ে কোনো দেশ সুখী, সমৃদ্ধ ও উন্নতি করতে পারে না। যে গণতন্ত্রের কারণে গত ৪৪ বছরে জাতিটি একদিনের জন্যও স্বস্তি পায় নি, যার দ্বারা জাতির মধ্যে অনৈক্য সৃষ্টি হয়, ভাইয়ে ভাইয়ে দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়, হানাহানি হয়, একটা জাতি টুকরো টুকরো হয়ে যায়, নিজের দলের লোকেরা পদের জন্য নিজেদের হত্যা করে, আমরা এমন সর্বনাশা গণতন্ত্রকে ঘৃণা করি, প্রত্যাখ্যান করি। এ জাতীয় গণতন্ত্র দিয়ে পুরো দেশ, জাতিকে ধ্বংস করে দেয়া হচ্ছে, এটা হচ্ছে পশ্চিমাদের চাপিয়ে যাওয়া ষড়যন্ত্রমূলক ডিভাইড অ্যান্ড রুল নীতি। আশা করি এ সহিংসতা জাতিবিনাশী গণতন্ত্রের কথা আমাদের সংবিধানে লেখা নেই। সেখানে যে গণতন্ত্রের কথা লেখা আছে তা হলো, ভিন্ন মতের প্রতি সহনশীলতা, অন্যের অধিকারের প্রতি সম্মান প্রদর্শন, সকলের বাক স্বাধীনতা, গবেষণার স্বাধীনতা, চিন্তার স্বাধীনতা, অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থানের নিশ্চয়তা, অবাধে মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা, স্বতঃস্ফূর্ত জনসমর্থন দিয়ে সরকার গঠনের স্বাধীনতা, সরকারকে পরিচালনার ক্ষেত্রে একজন নাগরিক হিসাবে আমার মতামত প্রদানের স্বাধীনতা ইত্যাদি। এই যদি গণতন্ত্র হয়ে থাকে তবে আমি এই সব নীতেকে স্যালুট করি, আমি এই সকল অধিকার চাই, এর জন্য লড়াই করি। আল্লাহর রসুলের প্রকৃত ইসলামও মানুষের এ অধিকারগুলোর নিশ্চয়তা দেয় এবং তা প্রাপ্তির সঠিক পথ দেখায়।
এরপরে ধর্মনিরপেক্ষতা। সংবিধানে বর্ণিত ধর্মনিরপেক্ষতার মানে যে যে ধর্মের অনুসারীই হোক না কেন, যার যার ধর্ম সে সম্মানের সঙ্গে পালন করবে, তার বিশ্বাসে কেউ আঘাত করবে না, তার উপাসনালয়ে কেউ হামলা করবে না, অর্থাৎ ধর্ম পালনে স্বাধীনতা, ধর্মীয় আনন্দ-অনুষ্ঠান করার স্বাধীনতা। এটা ধর্মনিরপেক্ষতা যদি হয়ে থাকে তবে এই ধর্মনিরপেক্ষতাকে আমরা সম্মান করি, এর জন্যই আমরা লড়াই করছি। ইসলাম যখন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তখন সব ধর্মের লোকেরাই সেই ভূখ-ে সম্মানের সঙ্গে বসবাস করেছিল। আমরা প্রকৃত ইসলামের যুগ বলতে রসুলাল্লাহর পর থেকে ৬০/৭০ বছর পর্যন্ত সময়কালকে বুঝি। এর পরে ইসলাম শাসক ও ধর্মব্যবসায়ীদের দ্বারা বিকৃত হয়ে গিয়েছিল। সেটার উদ্দেশ্য হয়ে গিয়েছিল ভোগবিলাস ও সাম্রাজ্যবাদ। তারপর থেকে ইসলামের নামে যা কিছু করা হয়েছে তার সঙ্গে আল্লাহ-রসুলের কোনো সম্পর্ক ছিল না, এর জন্য উম্মতে মোহাম্মদীকে দোষারোপ করা অযৌক্তিক।
পাশ্চাত্য ধর্মনিরপেক্ষতার জন্ম কীভাবে সেটাও স্মরণে রাখা প্রয়োজন। বাইবেলে রাষ্ট্রীয় জীবনব্যবস্থা নেই, তাই রাষ্ট্রীয় জীবনে শান্তির পথনির্দেশ করতে খ্রিষ্টধর্ম ব্যর্থ হয়। এজন্য ইউরোপে ধর্মকে ব্যক্তিগত জীবনে সীমাবদ্ধ রেখে মানুষের তৈরি বিধান দিয়েই রাষ্ট্র চালানোর সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এরপর ইউরোপ রাষ্ট্রযন্ত্র দ্বারা একটা বস্তুবাদী সভ্যতার জন্ম দিয়ে ক্রমান্বয়ে শিক্ষা ব্যবস্থা, মিডিয়ার মাধ্যমে অপ-প্রচার চালিয়ে সেই বক্তি জীবনের ক্ষুদ্র গ-ি থেকেও ধর্মকে উৎখাত করে দিতে চেষ্টা করে। ধর্মনিরপেক্ষতার নাম নিয়ে প্রকারান্তরে ধর্মহীনতার চর্চা শুরু হয়, এটাকে যদি ধর্মনিরপেক্ষতা বলেন তবে সেই ধর্মনিরপেক্ষতার নামে সেই ধর্মহীনতা আমরা মানি না। কারণ এতে ধর্মনিরপেক্ষতা ধর্মনিরপেক্ষতা যিগির তুলে আল্লাহর দেওয়া বিধানের প্রাকৃতিক ও মহাসত্য বিষয়গুলোকেও ব্যক্তি জীবনের ক্ষুদ্র গ-ির মধ্যে আবদ্ধ করে জীবনকে অপ্রাকৃতিক করে তোলা হয়। মানুষের ঈমানকে বনসাই বানিয়ে রাখার এ প্রচেষ্টার ফলেই মানুষ ক্ষুব্ধ হয় আর ধর্ম ব্যবসায়ীরা তাকে ভিন্নখানে প্রবাহিত করে ধর্মকে ধ্বংসাত্মক কাজে লাগায়। ধর্মকে জাতীয় জীবনে প্রতিষ্ঠার প্রেরণা থেকেই জন্ম নিয়েছে ধর্মভিত্তিক অপরাজনীতি ও জঙ্গিবাদ। এগুলোর দ্বারা মানুষ ইহজীবনও হারিয়েছে, পরকালও হারিয়েছে। ধর্মের বিরুদ্ধাচারণ বা ধর্মপ্রাণ মানুষের চিন্তা চেতনাকে হেয় করার ফলে মানবতা, জাতি, রাষ্ট্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মানুষ নৈতিকতা হারিয়ে অপরাধী হয়েছে। কাজেই ধর্মনিরপেক্ষতা যদি ধর্মহীনতা হয়, তবে আমরা এই ধর্মনিরপেক্ষতার পক্ষে নই। আমাদের সংবিধানে যে ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলা হয়েছে অর্থাৎ যার যার ধর্ম প্রালন ও প্রচারের অধিকার নিশ্চিত করা, আমরা দৃঢ়ভাবেই এর সমর্থন করি।
এরপরে জাতীয়তাবাদ। এমামুয্যামান বলেছেন, জাতি খুব গুরুত্বপূর্ণ। ব্যক্তি জাতির এককমাত্র, কিন্তু জাতির বাইরে ব্যক্তির কোনো মূল্য নেই। ইসলাম অর্থ শান্তি, আর শান্তি একটি সমষ্টিক বিষয়। এককভাবে একজনের জীবনকে শান্তিময় করা সম্ভব নয়, যদি আরেকজন অশান্তি সৃষ্টি করে। ইসলামের সবকিছুই হলো জাতি ভিত্তিক। আমি প্রথমে বলব মানবজাতি এক জাতি। বাবা আদম (আ.), মা হাওয়ার সন্তান সবাই আমরা একজাতি মানবজাতি। সে হিসাবে আমরা বাংলাদেশের ষোল কোটি মানুষও একজাতি। অন্যদিকে আমরা বাঙালি জাতি। কিন্তু নামে একজাতি হলেই হবে না, প্রত্যেকের অনুভূতি, জাত্যবোধ, চিন্তা চেতনা এক হতে হবে। আমরা একে অন্যের সমস্যাগুলো ভাগাভাগি করে নেব, প্রত্যেকের বিপদে এগিয়ে যাব। একজন বিপদগ্রস্তকে দেখে পাশ দিয়ে হেঁটে চলে যাব না, তাকে রক্ষার চেষ্টা করব। এটা হচ্ছে জাতীয়তাবাদ। তা না করে কেবল রাজনীতির মঞ্চে গলার রগ ফুলিয়ে আমি বাঙালি, আমি মুসলমান ইত্যাদি বলে চিৎকার করে লাভ নেই। আমাদেরকে বুঝতে হবে যে, আমরা ষোল কোটি যদি সত্যিই এক জাতিভুক্ত হয়ে থাকি তাহলে আমাদের মধ্যে কোনো বিভক্তি থাকবে না। আমাদের ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে যদি সমাজের স্বার্থকে স্থান না দেই, তবে আমাদের দিয়ে কোনোদিন জাতিগঠন হবে না। জাতীয় উন্নতির স্বার্থে আমরা সর্বদা একমত থাকব, আমরা ঐক্যবদ্ধ থাকব সমস্ত ধর্মব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে, অন্যায়, অবিচারের বিরুদ্ধে। এই অর্থে আমরা জাতীয়তাবাদের পক্ষে। পাশ্চাত্য জাতিগুলিও তাদের ভৌগোলিক জাতীয়তায় বিশ্বাসী, এবং ঐ ভৌগোলিক রাষ্ট্রের স্বার্থকে তাদের অধিকাংশ মানুষ তাদের ব্যক্তিগত স্বার্থের উপর স্থান দেয়। আমার লাভ হবে কিন্তু রাষ্ট্রের ক্ষতি হবে এমন কাজ তাদের অধিকাংশ লোকেই করবে না। তাদের বিদ্যালয়, স্কুল-কলেজে, ছোট বেলা থেকেই কতকগুলি বুনিয়াদী শিক্ষা এমনভাবে তাদের চরিত্রের মধ্যে গেঁথে দেওয়া হয় যে, তা থেকে কিছু সংখ্যক অপরাধী চরিত্রের লোক ছাড়া কেউ মুক্ত হতে পারে না। ফলে দেখা যায় যে ওসব দেশের মদখোর, মাতাল, ব্যভিচারীকে দিয়েও তার দেশের, জাতির ক্ষতি হবে এমন কাজ করানো যায় না, খাওয়ার জিনিসে ভেজাল দেওয়ানো যায় না, মানুষের ক্ষতি হতে পারে এমন জিনিষ বিক্রি করানো যায় না ইত্যাদি। কিন্তু আমাদের দেশে জাতীয়তাবাদের শ্লোগান আছে কিন্তু সেই শ্লোগান দিয়ে জাতির সম্পদই ধ্বংস করা হচ্ছে। ষোল কোটি বাঙালিকে নিয়ে একটি শক্তিশালী জাতি সত্তা গড়ার কাজ আমরা করে যাচ্ছি। গত ৪৪ বছরে এই কাজ কেউ করে নাই, সবাই ভাঙ্গার চেষ্টা করেছে। একে অপরের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করাকেই রাজনীতি মনে করা হচ্ছে। এটা কি জাতীয়তাবাদ হলো? প্রতিটি ধর্ম সম্প্রদায়ের মধ্যে দেয়াল দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে, রাজনীতিক মতবাদ চাপিয়ে দিয়ে রাজনীতিক দল সৃষ্টি করে হানাহানির ইতিহাস দেখেছি আমরা গত ৪৪ বছরে। আমাদের সংবিধানে শক্তিশালী জাতিসত্তার যে ধারণা আছে আমরা মনে করি সেটা পূরণ করতে পারছে হেযবুত তওহীদ। আমরা বিগত ২০ বছরে বহু নির্যাতিত হয়েছি, কিন্তু শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে যাচ্ছি। ভাঙচুরের রাজনীতিতে আমরা বিশ্বাস করি না, ওপথে কোনোদিন মানুষের শান্তি আসতে পারে না।
তবে সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদী ধারণায় আমরা বিশ্বাসী নই, কারণ এটাও এক প্রকার অন্ধ অমানবিকতার জন্ম দেয়। আমি বাঙালি জাতি নিয়ে খুব সুখ সমৃদ্ধির মধ্যে আছি, অথচ পার্শ্ববর্তী দেশে একটি জনগোষ্ঠী না খেয়ে মরছে আমি তার দিকে চেয়ে দেখব না এটা ঠিক নয়। আমাদের দেশেই ভিন্ন জাতিসত্তার মানুষ বর্তমানে চরম দুর্ভোগের মধ্যে বাস করছে, প্রতিনিয়ত সেখানে মানবতা পদদলিত হচ্ছে সেটা আমারও কষ্টের কারণ হতে হবে। এটা যদি না হয় তবে তা মানুষের বৈশিষ্ট্য হলো না, কাল আমাকেও হয়তো বিপদে পড়তে হবে, তখন আমার পাশেও কেউ দাঁড়াবে না। কাজেই ন্যায়-নীতিভিত্তিক, শক্তিশালী জাতিসত্তা গঠনে আমরা অগ্রগামী থাকতে চাই।

এই বিষয়টি সম্পর্কে আলোচনা করতে গেলে সকলকে আগে ইসলামের একটি মূলনীতি জানতে হবে। আল্লাহর রসুল বলেছেন, যে ব্যক্তি তার যামানার এমামের বায়াত না নিয়ে মারা গেল সে জাহেলিয়াতের মৃত্যু বরণ করল (বোখারি)। আপনারা আরো জানেন যে প্রচলিত অর্থে ধর্ম বলতে যা বোঝায়, অর্থাৎ কিছু বিশ্বাস আর উপাসনা, ইসলাম এমন ধর্ম নয়। এটি প্রকৃতপক্ষে একটি সামষ্টিক জীবনব্যবস্থা, যেভাবে গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ইত্যাদিও একেকটি জীবনব্যবস্থা। আর উম্মতে মোহাম্মদী একটি জাতিসত্তা। আল্লাহ তাঁর শেষ নবীর উপর যে জীবনব্যবস্থাটি দান করেছেন সেটি তিনি কোনো গোত্রের জন্য দেন নি, দিয়েছেন সমগ্র মানবজাতির জন্য। তিনি চান মানবজাতি ঐক্যবদ্ধ হোক, তারা এক জাতিভুক্ত হয়ে এক পরিবারের মত বসবাস করুক। মানবজাতিকে তার কাক্সিক্ষত শান্তির সন্ধান দিতে আল্লাহর রসুল উম্মতে মোহাম্মদী জাতিটিকে সৃষ্টি করেছিলেন। উম্মতে মোহাম্মদীর কাজই হচ্ছে আল্লাহর অভিপ্রায় মোতাবেক সমগ্র মানবজাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে একটি মহাজাতি তৈরি করা। ইসলামের কনসেপ্ট হচ্ছে, পুরো মানবজাতি একটা জাতি হবে, তারা ন্যায়ের পক্ষে অন্যায়, অবিচার, অসত্য ও আসুরিক শক্তির বিরুদ্ধে থাকবে। তাদের নেতা থাকবে একজন। যে কোনো ঐক্য রক্ষা করতে হলে একজন নেতা থাকতে হয়- এটা প্রাকৃতিক নিয়ম। সেভাবেই এ জাতিটা তৈরি হয়েছিল। রসুলাল্লাহর এন্তেকালের পর আবু বকর (রা.) হয়েছিলেন সেই জাতির নেতা বা এমাম। আবু বকর (রা.) চলে যাওয়ার পর ওমর (রা.), ওমর (রা.) চলে যাওয়ার পরে ওসমান (রা.)। তারপর থেকেই ইসলামের ইতিহাসে কয়েকটি দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা ঘটলো, একটি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী জাতির ভিতরে ঐক্য নষ্ট করে দিল, ক্রমান্বয়ে সিয়া সুন্নি ফেরকা সৃষ্টি হলো। এ জাতির মধ্যে কখনো এই দুঃখজনক বিভক্তি সৃষ্টি হওয়া উচিত ছিল না। যাই হোক জাতিটা ভাঙতে ভাঙতে আজকে যে অবস্থায় এসেছে যে মুসলিম এখন আর কোনো জাতিসত্তা নয়। যাঁকে কেন্দ্র করে আমরা ঐক্যবদ্ধ থাকব এমন কোনো নেতাও এ জাতির নেই, যে নেতা আমাদের জাতীয় ব্যক্তিগত অর্থনৈতিক, সামাজিক, আধ্যাত্মিক সবকিছু ব্যবহারে নেতৃত্ব দেবেন এমন কেউ নেই। অথচ এটা ছাড়া জাতির অস্তিত্ব টেকে না। আপনারা আরো জানেন যে সুরা বনী ইসরাইলের ৭১ নং আয়াতে আল্লাহ তা’আলা বলেছেন যে, ‘সেই দিন প্রত্যেক জাতিকে তাদের ইমামের অর্থাৎ নেতার সাথে ডাকা হবে।’ আল্লাহ এই শৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছেন, তিনি সে মোতাবেকই হাশরের দিনে প্রত্যেক জাতিকে তাদের নেতার নেতৃত্বে আহ্বান করবেন। কথা হলো, এই যুগে আমরা যারা হেযবুত তওহীদে এসেছি, আমাদেরকে কোন এমামের নেতৃত্বে ডাকা হবে, আমাদের এমাম কে? আমরা যাঁর মাধ্যমে সত্য পেয়েছি, যিনি আমাদেরকে ইহ ও পারলোকিক জীবনে শান্তিলাভের সঠিক পথ দেখিয়েছেন, অর্থাৎ আমাদের এমামুয্যামান, আমরা চাই আল্লাহ আমাদেরকে তাঁর সঙ্গে ডাকুন, আমরা তাঁকে আমাদের এ যামানার এমাম, ঞযব খবধফবৎ ড়ভ ঃযব ঞরসব- এ সময়ের নেতা হিসাবে মেনে নিয়েছি।
আমরা জানি শেষ যামানায় এমাম মাহদী (আ.) এর আসার কথা। আল্লাহ রসুল বলেছেন যে একজন মানুষ আসবেন তাঁর নাম অন্য থাকবে, কিন্তু তাঁর উপাধি হবে হেদায়াত প্রাপ্তদের নেতা বা এমাম মাহদী। কাজেই ইসলামে যেহেতু এ ধারণাটা আছে, সেটা আমরা অস্বীকার করছি না। তিনি যখন আসবেন, তখন তাঁকে যারা অনুসরণ করবেন তারা পথ পাবেন। কিন্তু এই সময়ে আমরা যারা আছি তারা কি নেতৃত্বহীন অবস্থায় থাকব? না। আল্লাহ আমাদেরকে এ যুগের নেতা দান করেছেন, তিনি হচ্ছেন এমামুয্যামান। মাহদী (আ.) নিয়ে অনেকে স্বয়ং এমামুয্যামানকেও প্রশ্ন করেছেন, কিন্তু তিনি সব সময় বলতেন, খবরদার, আমাকে তোমারা মাহদী (আ.) বলবে না। আমি একজন অতি গোনাহগার মানুষ, আমি রসুলাল্লাহর একজন সাধারণ উম্মত। তবে আমি তোমাদের সামনে যে ইসলাম উপস্থাপন করেছি, সেটা সত্য ইসলাম।’ এজন্য আমরা কোথাও এমামুযযামানকে এমাম মাহদী লিখি নাই এবং বলিও না।
কবি নজরুল বলেছিলেন,
হয়ত আমাতে আসিছে কল্কি, তোমাতে মেহেদী ঈসা,
কে জানে কাহার অন্ত ও আদি, কে পায় কাহার দিশা?
কার মধ্যে মাহদী বা ঈসা বিরাজ করছেন সেটাতো বলা যায় না, সে জন্য সত্যসন্ধানীরা অনুসন্ধান বা পরীক্ষা নিরীক্ষা চালাতে পারেন। তবে আমরা মনে করি তাঁরা কবে আসবেন সে আশায় নিশ্চেষ্ট হয়ে বসে থাকাকে ইসলাম সমর্থন করে না। পৃথবীতে চলমান সঙ্কট থেকে মানুষকে উদ্ধারের জন্য সব সময় প্রচেষ্টা থাকা উচিত। কবে এমাম মাহদী (আ.) আসবেন আর এলান করবেন, তখন দলে দলে মানুষ তার দলে যোগদান করে পৃথিবীকে পরিবর্তন করে ফেলবেন, সে সময় কবে আসবে তা আমরা জানি না। আমাদের কাছে মাননীয় এমামুয্যামান যে পন্থা তুলে ধরেছেন তা মহাসত্য, তা দিয়ে মানবজাতির সঙ্কট নিরসন করা সম্ভব হবে। তাই আমরা সে চেষ্টায় আত্মনিয়োগ করেছি।

দু’টি কারণ। (এক) একটি সমাজের শান্তি নির্ভর করে ঐ সমাজটি যে সিস্টেম দিয়ে পরিচালিত হয় সেই সিস্টেম বা জীবনব্যবস্থার উপর। জীবনব্যবস্থা ত্র“টিযুক্ত হলে শান্তি আসবে না, ত্র“টিহীন হলে শান্তি আসবে। বর্তমানে সারা পৃথিবীতে পাশ্চাত্য সভ্যতার তৈরি বস্তুবাদী জীবনব্যবস্থা চালু আছে। এ জীবনব্যবস্থাগুলো মানুষের তৈরি বিধায় অবশ্যই ত্র“টিযুক্ত, তাই এর ফলও অশান্তি। আপনি বিষ খেয়ে সুস্থ থাকার আশা করবেন এটা কি যৌক্তিক?

(দুই) ধর্ম বর্তমানে মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের উপাসনা, আচার-অনুষ্ঠানের একটি বিষয়। এর সঙ্গে পার্থিব জীবনের কোনো যৌক্তিক সম্বন্ধ নেই। এর পুরো বিষয়টাই আখেরাতকেন্দ্রিক। তাই সমাজের শান্তি অশান্তিতে ধর্মের কোনো যোগাযোগ নেই। উপরন্তু প্রতিটি ধর্মই আজ ধর্মব্যবসায়ীদের কুক্ষিগত। তারা সেগুলো দিয়ে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করে চলেছে এবং যে যেভাবে পারছে মনগড়া ব্যাখ্যা করছে, বিকৃত করছে। এসব বিকৃত ধর্ম দিয়ে কীভাবে শান্তি আসবে। ফর্মুলা ভুল হলে কী কখনো অংক মেলে?

হেযবুত তওহীদের জীবনের সবচেয়ে বড় ঘটনা ঘটে ২০০৮ সনের ২ ফেব্র“য়ারি। আল্লাহ হেযবুত তওহীদকে সত্যায়ন করার জন্য বিরাট এক মো’জেজা বা অলৌকিক ঘটনা সংঘটন করেন। মোবাইল ফোন যোগে মাননীয় এমামুয্যামান যাত্রবাড়িতে একটি বাড়ির ছাদে উপস্থিত সদস্যদের উদ্দেশে দশ মিনিট নয় সেকেন্ডের একটি বক্তব্য দিয়েছিলেন। এই সময়ের মধ্যে আল্লাহ সেখানে ন্যূনতম নয়টি অলৌকিক ঘটনা সংঘটন করেন। ৩১৮ জন মানুষ সেগুলোর প্রত্যক্ষদর্শী। বিস্তারিতভাবে সেগুলো এখানে বলার সময় হবে না। এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রমাণসহ একটি বই আমরা প্রকাশ করেছি যার নাম “আল্লাহর মো’জেজা: হেযবুত তওহীদের বিজয়-ঘোষণা”। এ দিন আল্লাহ জানিয়ে দেন যে হেযবুত তওহীদ দিয়েই সমগ্র পৃথিবীতে আল্লাহর চিরন্তন, সত্য জীবনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবে, বিশ্বময় শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে।

দাজ্জাল সম্পর্কে হাদিসে যে অতিকায় দানবের কথা বলা আছে সেটা বর্তমানের পাশ্চাত্য সভ্যতার রূপক বর্ণনা, মাননীয় এমামুয্যামান তাঁর দাজ্জাল বইতে এটা প্রমাণ করেছেন। তাঁর যুক্তিগুলো কেউ খ-াতে পারেন নি, পারবেও না। সংক্ষেপে মূল কথা হচ্ছে, ইউরোপের মধ্যযুগে যখন চার্চ ও রাজতন্ত্রের দ্বন্দ্ব চরমে উঠেছিল, ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছিল, তখন রাজা অষ্টম হেনরি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে চার্চের ক্ষমতাকে খর্ব করেন এবং রাজাকে চার্চের প্রধান বলে ঘোষণা করেন। সেই থেকে জাতীয় জীবনে ধর্মের আর কোনো গুরুত্ব রইল না, ধর্ম ব্যক্তিগত বিষয়ে পরিণত হলো। এর পূর্বে মানুষের ইতিহাস যতদূর জানা যায়, ধর্মের দ্বারাই রাষ্ট্র পরিচালিত হয়েছে, সেই ধর্ম সঠিক হোক আর বিকৃতই হোক। ১৫৩৭ এর পরের রেনেসাঁ যুগের দার্শনিক, সাহিত্যিক ও রাষ্ট্রনীতির কারণে ধর্মহীন একটি জীবনব্যবস্থা সৃষ্টি হলো যাকে কেতাবি ভাষায় ধর্মনিরপেক্ষতা বলা হচ্ছে। পরবর্তীতে ঔপনিবেশিক যুগে প্রায় সমগ্র বিশ্বে এটি চালু করা হয়। এর কু-প্রভাবে মানুষের জীবনের উদ্দেশ্য হয়ে গেল যে কোনো উপায়েই হোক অধিক উপার্জন, ভোগবিলাস, বস্তুগত স্বার্থোদ্ধার। একেই বলা হচ্ছে জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন। অথচ মানুষ দেহসর্বস্ব নয়, তার আত্মাও আছে। তার আত্মিক পরিশুদ্ধির ও চারিত্রিক উৎকর্ষের জন্য ধর্মীয় শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু ধর্মহীন জীবন ব্যবস্থার প্রভাবে ব্যক্তিজীবন থেকেও ধর্ম লুপ্ত হয়ে মানবসমাজে চরম নৈতিক অবক্ষয় সৃষ্টি হলো। সর্বত্র বিরাজমান স্রষ্টার ভয়ে ধর্মবিশ্বাসী মানুষ অপরাধ করে না, কিন্তু স্রষ্টাহীন জীবনব্যবস্থায় পুলিশের চোখ ফাঁকি দিতে পারলেই অপরাধ সংঘটন করে। এভাবে সর্বপ্রকার অপরাধ মাত্রা ছাড়িয়ে গেল। এই যে একদিকে প্রযুক্তির উন্নয়ন, অপরদিকে মনুষ্যত্বের চরম অধঃপতন পৃথিবীতে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি অবশ্যই মানবজাতির জন্য আশীর্বাদ ও স্রষ্টার নেয়ামত, কিন্তু আজ এগুলো যতটা না মানুষের কল্যাণে ব্যবহৃত হচ্ছে তার বহুগুণ ব্যবহৃত হচ্ছে মানবতার বিরুদ্ধে। সংবাদপত্রগুলো দুঃসংবাদে ভরা, রাজনীতি আর মিথ্যা সমার্থক হয়ে দাঁড়িয়েছে, নিকৃষ্ট চরিত্রের মানুষ সম্মানিত হচ্ছে। ধর্মকে জাতীয় জীবন থেকে নির্বাসন দেওয়ার পরিণামেই এই ভয়ঙ্কর বস্তুবাদী সভ্যতার জন্ম হয়েছে। তাই একে আল্লাহর রসুল দানবের সঙ্গে তুলনা করেছেন। ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষা মানুষের কোনো উপকারে আসছে কিনা জানতে চেয়েছিলেন। আমাদের কথা হচ্ছে, ধর্মনিরপেক্ষতা যদি ধর্মহীনতায় পর্যবসিত হয় তাহলে তা মানবজাতিকে আত্মিকভাবে ভারসাম্যহীন করবে, মানুষ জ্ঞান বিজ্ঞানে উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে আত্মাহীন পশুতে পরিণত হবে- যার প্রমাণ বর্তমান সময়। আর জ্ঞান-বিজ্ঞান প্রযুক্তির উন্নয়নের জন্য ধর্মকে বিসর্জন করার প্রয়োজন নেই, ধর্মকে বাদ দিলে জ্ঞান বিজ্ঞানের ব্যবহার হয় মানুষের ক্ষতিসাধনে। এটা ভুলে গেলে চলবে না যে, ইসলামের সোনালি যুগে অর্থাৎ ১২৫৮ সনে আব্বাসীয় খেলাফতের পতন পর্যন্ত বিজ্ঞানের প্রতিটি শাখায় মুসলিমরাই ছিল শিক্ষকের আসনে। ঐ সময়ে ইউরোপে চলছিল মধ্যযুগীয় বর্বর যুগ। আজকের আধুনিক বিজ্ঞানে ইউরোপীয়দের একচেটিয়া আধিপত্য যার ভিত্তি রচনা করে গেছেন মুসলিম বিজ্ঞানীরাই। এটা ইতিহাস যদিও আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় সেগুলো চাপা দেওয়া হয়েছে।