প্রশ্ন-উত্তর Archives | Page 4 of 10 | হেযবুত তওহীদ

প্রশ্ন-উত্তর

এই প্রশ্নটি আমাদেরকে প্রায়ই করা হয়। আমরা অনেককে জিজ্ঞাসা করেছি যে “শরীরে ইসলাম নাই” বলতে আপনি কি বুঝাতে চেয়েছেন? তারা বলেছেন, ‘আপনাদের দাড়ি নাই, টুপি নাই, পাগড়ি নাই, গায়ে জোব্বা নাই। আগে নিজেদের শরীরে ইসলাম কায়েম করতে হবে, তারপরে দুনিয়াতে কায়েম করার প্রশ্ন’। এ প্রশ্নের জবাবে প্রথমেই আমি বলব, ইসলাম আসলে কি এবং কেন, তা আগে আমাদের বুঝতে হবে। এটা পরিষ্কার হলে আমরা বুঝতে পারব আসলে দাড়ি, টুপি, পাগড়ির সাথে এসলামের সম্পর্ক কতটুকু।
ইসলাম শব্দটি এসেছে ‘সালাম’ থেকে যার অর্থ শান্তি। শান্তি ও ইসলাম সমার্থক। সমস্ত রকম অন্যায়, অত্যাচার, জুলুম, মারামারি, রক্তপাত থেকে মানবজাতির মুক্তির জন্য আল্লাহ আদম থেকে শুরু করে শেষ রসুল পর্যন্ত সকল নবী-রসুল-অবতারদের মাধ্যমে যে জীবন-ব্যবস্থা পাঠিয়েছেন তার নাম আল্লাহ রেখেছেন ইসলাম। সকল সত্যই ইসলামের অন্তর্ভুক্ত। সত্য হচ্ছে শান্তির উৎস, মিথ্যা যাবতীয় অশান্তির উৎস। আল্লাহর দেওয়া এই সত্যময় জীবন-ব্যবস্থা, দীনুল হক যদি মানুষ পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, বিচার-ব্যবস্থায় অর্থাৎ তার সমগ্রিক জীবনে চর্চা করে তাহেেল তারা শান্তিতে থাকবে। এই শান্তির নামই ইসলাম। ১৪০০ বছর আগে এই শান্তি এসেছিল অর্ধেক দুনিয়াতে।
এই হল ইসলাম শব্দের শাব্দিক ও প্রায়োগিক অর্থ। এই ধারণা মোতাবেক এসলামের সাথে দাড়ি, টুপি, পাগড়ি, জুব্বার সম্পর্ক কোথায়? ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন-ব্যবস্থা অর্থাৎ রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি, বিচারব্যবস্থা ইত্যাদি সব কিছুই ইসলাম নামক জীবন-ব্যবস্থার এক একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সুতরাং যারা আমাদের শরীরে ইসলাম নাই এই প্রশ্ন করেন তাদের কাছে আমার প্রশ্ন একটি দেশের সব মানুষ যদি দাড়ি রাখে, টুপি পরে, জোব্বা গায়ে দেয় কিন্তু তাদের সামষ্টিক জীবনের ঐ বিষয়গুলো যদি এসলামের না হয় তাহলে কি সেই দেশে শান্তি এসে যাবে? আসবে না। কারণ ইসলাম আসার আগেও আরবের মানুষগুলো আরবীয় পোশাকগুলো পরত, তাদেরও দাড়ি ছিল। আসলে এই শেষ দীনে কোন নির্দিষ্ট পোষাক হতে পারে না, কারণ এটা এসেছে সমস্ত পৃথিবীর মানুষের জন্য। পৃথিবীর মানুষ প্রচ- গরমের দেশে, প্রচ- শীতের দেশে, নাতিশীতোষ্ণ দেশে, অর্থাৎ সর্বরকম আবহাওয়ায় বাস করে, এদের সবার জন্য এক রকম পোষাক নির্দেশ করা অসম্ভব। তা করলে এ দীন সমস্ত মানব জাতির জন্য প্রযোজ্য হতে পারত না, সীমিত হয়ে যেতো। তাই আল্লাহ ও তার রসুল (দ.) তা করেনও নি। বিশ্বনবীর (দ.) সময়ে তার নিজের এবং সাহাবাদের পোষাক-পরিচ্ছদ ও তখনকার আরবের মোশরেক ও কাফেরদের পরিচ্ছদ একই ছিল। বর্তমানেও আরবে মুসলিম আরব, খ্রিষ্টান আরব ও ইহুদি আরবদের একই পোষাক-পরিচ্ছদ। দেখলে বলা যাবে না কে মুসলিম, কে খ্রিষ্টান আর কে ইহুদি। এসলামে পোশাকের ব্যাপারে আল্লাহ এমন বিশ্বজনীন একটি নীতি দিয়েছেন যা পৃথিবীর যে কোন প্রান্তের মানুষের জন্যই অনুসরণযোগ্য, সেটা হচ্ছে তিনি পুরুষদের জন্য সতর নির্দ্ধারণ করেছেন নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত (এ নিয়েও মতভেদ আছে)। আল্লাহ বা রসুল কেউই বলে দেন নি যে দেহের এই স্থান কী পোশাক দিয়ে আবৃত করতে হবে।
টুপি ইহুদী, শিখ বা অন্যান্য ধর্মের ধর্মগুরুরাও পরেন, তাদেরও দাড়ি আছে, তারাও জুব্বা পরেন, তাদের অনেকেই পাগড়ি পরেন। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দাড়ি, টুপি, জোব্বা সবই ছিল। আল্লাহর অস্তিত্বে সম্পূর্ণ অবিশ্বাসী হিসাবে পরিচিত অনেকেরই দাড়ি ছিল যেমন কার্ল মার্কস, চার্লস ডারউইন, আব্রাহাম লিঙ্কন প্রমুখ। হয়ত বলতে পারেন তাদের টুপি, জুব্বা, পাগড়ি, দাড়ি মুসলিমদের মত না। হ্যাঁ, তা হয়ত ঠিক, কিন্তু টুপির আকার-আকৃতি ও রং নিয়ে, জুব্বার আকার-আকৃতি নিয়ে, পাগড়ির রং, দাড়ির পরিমাণ ইত্যাদি নিয়ে আলেম ওলামাদের মধ্যে বিস্তর মতভেদ রয়েছে। ছোটখাটো বিষয় নিয়ে মতবিরোধে গিয়ে মূল উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত হয়ে যাওয়া একপ্রকার মুর্খতা বলেই আমরা মনে করি। গত কয়েক শতাব্দী ধরে এ জাতির দুর্ভাগ্যজনক পরাজয়ের কারণ এগুলিই। অথচ এটা ইতিহাস যে রসুলের সাহাবিদের অনেকেরই গায়ে জোব্বা তো দূরের কথা ঠিকমত লজ্জাস্থান ঢাকার মত কাপড় সংস্থান করতেও কষ্ট হতো।
কোন সন্দেহ নেই, বিশ্বনবী (দ.) তার অনুসারীদের একটা নির্দিষ্ট দৈর্ঘ্যের দাড়ি রাখতে বলেছেন। কেন বলেছেন? এই জন্য বলেছেন যে, তিনি যে জাতিটি, উম্মাহ সৃষ্টি করলেন তা যেমন পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ জাতি তেমনি বাইরে থেকে দেখতেও যেন এই উম্মাহর মানুষগুলি সুন্দর হয়। আদিকাল থেকে দাড়ি মানুষের পৌরুষ ও সৌন্দর্যের প্রতীক হয়ে আছে। সিংহের যেমন কেশর, ময়ূরের যেমন লেজ, হাতির যেমন দাঁত, হরিণের যেমন শিং, তেমনি দাড়ি মানুষের প্রাকৃতিক পৌরুষ সৌন্দর্য। এই সৌন্দর্য নষ্ট না করার উদ্দেশ্যেই দাড়ি রাখার নির্দেশ।
দাড়ি, টুপি, পাগড়ি, জোব্বা ইত্যাদিকে আমরা অপ্রয়োজনীয় বিষয় বলছি না বা কোন রকম অসম্মানও করছি না। আমরা শুধু বলছি এই দীনের প্রকৃত উদ্দেশ্য আজ যেমন উল্টো হয়ে গিয়েছে তেমনি এর বাহ্যিক দিকটিও বিকৃত দীনের আলেমরা অপরিসীম অজ্ঞতায় উল্টে ফেলেছেন। দাড়ি রাখা, বাহ্যিক পোষাক-পরিচ্ছদ ইত্যাদি এই দীনের বুনিয়াদী কোন ব্যাপার নয় অর্থাৎ ফরদ নয়, সুন্নত। তাও রসুলের একেবারে ব্যক্তিগত সুন্নত যে ব্যাপারে রসুলাল্লাহ তাঁর একটি অন্তীম অসিয়তে বলেছেন, হে মানবজাতি! আগুনকে প্রজ্জলিত করা হয়েছে এবং অশান্তি অন্ধকার রাত্রির মতো ধেয়ে আসছে। আল্লাহর শপথ, আমি আমার থেকে কোনো কাজ তোমাদের উপর অর্পণ করি নি, আমি শুধু সেটাই বৈধ করেছি যেটা কোরা’আন বৈধ করেছেন, আর শুধু সেটাই নিষেধ করেছি যেটা কোর’আন নিষেধ করেছে। রসুলাল্লাহর প্রথম জীবনীগ্রন্থ সেরাত ইবনে ইসহাকে এ কথাটি আছে। সুতরাং দাড়ি-টুপি (লেবাস) যদি এই দীনের কোন ফরদ বা বুনিয়াদী বিষয় হতো, তবে কোর’আনে একবার হলেও এ বিষয়ে নির্দেশ দেওয়া হতো। আল্লাহর রসুল এটা সুস্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছেন যে- আল্লাহ তোমাদের বাহ্যিক অবস্থা, পোশাক, চেহারা বা সম্পদ কোন কিছুর দিকেই দৃষ্টিপাত করেন না, তিনি দেখেন তোমাদের হৃদয় এবং তোমাদের কাজ। [আবু হুরায়রা (রা.) থেকে মুসলিম]।
তাই ‘দাড়ি এসলামের চিহ্ন’, ‘দাড়ি না রাখলে এসলামের কথা বলা যাবে না’ এ ধারণা সঠিক নয়। সেজন্য হেযবুত তওহীদে কেউ যদি দাড়ি রাখতে চায় আমরা এটুকুই বলি, যদি দাড়ি রাখেন তবে, রসুল যেভাবে দাড়ি রাখতে বলেছেন সেভাবে রাখুন যেন সুন্দর, পরিপাটি (ঝসধৎঃ) দেখায়। রসুলাল্লাহর যে কোনো সুন্নাহই কল্যাণকর, তাই ব্যক্তিগত জীবনেও রসুলাল্লাহর যা কিছু অনুসরণ করা হবে তাতে মানুষ কল্যাণ পাবে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে আগে কোনটা? আজ সারা পৃথিবীতে কোথাও আল্লাহকে বিধানদাতা হিসাবে মানা হচ্ছে না। মুসলিম নামের এই জনসংখ্যাও পাশ্চাত্যের বস্তুবাদী সভ্যতাকে বিধাতার আসনে বসিয়ে রেখেছে। এ কারণে আল্লাহর দৃষ্টিতে তারা কাফের-মোশরেক হয়ে আছে। আল্লাহর রসুল বলেছেন, এমন সময় আসবে যখন মানুষ তাহাজ্জুদ পড়বে কিন্তু ঘুম কামাই করা হবে, সওম রাখবে কিন্তু না খেয়ে থাকা হবে (হাদিস)। রসুলাল্লাহ বর্ণিত সেই সময়টি এখন। যেখানে তাহাজ্জুদ, সওমের মত একনিষ্ঠ আমলও বৃথা যাবে, সেখানে দাড়ি, টুপি, পাগড়ি, জোব্বার মত আমল গৃহীত হওয়ার তো প্রশ্নই আসে না।

আসলে বর্তমানে মানুষের মনে ইসলাম সম্পর্কে ধারণা হচ্ছে, ইসলাম মানেই দাড়ি, টুপি, মসজিদ, মাদ্রাসা, আলেম ওলামা, সুর করে কোর’আন তেলাওয়াত, আযান দেয়া, হজ্জ করা ইত্যাদি। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ইসলাম শব্দের অর্থ হলো শান্তি অর্থাৎ ন্যায়বিচার, ঐক্য, সাম্য, ভ্রাতৃত্ব, শৃংখলা, আনুগত্য, কোথাও অভাব নেই, অনটন নেই, দুঃখ নেই, যন্ত্রণা নেই এমন একটা পরিস্থিতির নাম ইসলাম। এই ১৬ কোটি বাঙালি কি মসজিদ মাদ্রাসায় বসবাস করে? না, তারা প্রেসক্লাবে থাকে, উপাসনালয়ে থাকে, সিনেমা হলে থাকে, সংসদে থাকে, ঘরে থাকে, তারা হাটে থাকে, বাজারে থাকে, রাস্তাঘাটে থাকে, অনেক আপত্তিকর জায়গায়ও তারা সর্বত্র থাকে। মানুষ যেখানে আছে সেখানেই সত্য পৌঁছানো আমাদের কর্তব্য। ইসলামের মানে বুঝতে হবে। ইসলাম মানে দাড়ি, টুপি, পাগড়ি পায়জামা নয়। ইসলামকে এখানে বন্দী করা হয়েছে।
আমরা মসজিদ মাদ্রাসায় কাজ করছি না, এটা সম্পূর্ণ সত্য নয়। বেশ কিছু মাদ্রাসায় আমরা প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনী অনুষ্ঠান ইতোমধ্যে করেছি। পত্রিকা তো যাচ্ছেই। কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে এড়িয়ে কাজ করা আমাদের নীতি নয়। আমরা আমাদের কর্মকা-ে সর্বশ্রেণির মানুষের সম্পৃক্ততা আশা করি। কিন্তু মসজিদ মাদ্রাসায় যারা থাকেন তাদের অধিকাংশই ধর্মব্যবসায়ী এবং আমরা ধর্মব্যবসায়ীদের মুখোশ উন্মোচন করে দিচ্ছি। এ কারণে ধর্মব্যবসায়ীরা আমাদের কাজে সহযোগিতা করা দূরে থাক, গত ২০ বছর ধরে ঘোর বিরোধিতা করে আসছে। এখনও তারা আমাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা কথা বলে মানুষকে ক্ষেপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছে। তথাপিও আমরা আশাবাদী যে সত্যনিষ্ঠ আলেমদের সহযোগিতা পেলে মাদ্রাসার ছাত্রদের সঙ্গে ব্যাপক আকারে কাজ করার ক্ষেত্র প্রস্তুত হবে।

আমাদের এমামুয্যামান সরকারকে বেশ কয়েকবার ভিন্ন ভিন্ন বিষয়ে পত্র মারফত প্রস্তাবনা দিয়েছেন। ১৮ মে ২০০৮ এ তিনি প্রথম চিঠিটি দেন হেযবুত তওহীদের কার্যক্রমের বিষয়ে সরকারকে কোনো সুস্পষ্ট নীতি অর্থাৎ ঈড়হংরংঃধহপব ঢ়ড়ষরপু গ্রহণ করে একটি সমঝোতায় উপনীত হওয়ার প্রস্তাব করেন। তখন দেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছিল। পরে যখন নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এলো, তিনি আবারও সেই প্রস্তাবনা নতুন সরকারকে প্রেরণ করেন। জঙ্গিবাদ নির্মূলে বাংলাদেশ সরকারকে সহায়তা করার প্রস্তাব দিয়ে এমামুয্যামান চিঠি প্রেরণ করেন ২২ এপ্রিল ২০০৯ তারিখে। তিনি সে প্রস্তাবনায় বলেছিলেন শক্তি প্রয়োগে জঙ্গি দমন সম্ভব নয়। সেটার সত্যতা প্রমাণিত হয়েছে। আজ পর্যন্ত দমন হয়নি বরং বৃদ্ধি পেয়েছে। তবু ভুল পথেই এখনো চেষ্টা চালানো হচ্ছে। অপচয় হচ্ছে সরকারের বিপুল অর্থ ও সময়।

হ্যাঁ। সৃষ্টি বা ক্রিয়েচার হিসাবে পৃথিবীর সমস্ত গরু যেমন এক জাতি, তেমনি পৃথিবীর সমস্ত মানুষ এক জাতি। এই হিসাবে আপনার কথা ঠিক আছে। কিন্তু গরুরা গরুদের বিরুদ্ধে লড়াই করছে না, একের অধিকারে অন্যে হস্তক্ষেপ করছে না। মানুষ সেটা করছে তাই কার্যত তারা এক জাতি নেই, তারা হাজার হাজার দলে বিভক্ত হয়ে গেছে। এদের সবাইকে একতাবদ্ধ না করা গেলে রক্তপাত, হানাহানি বন্ধ হবে না- এটাই আমরা বলতে চাই। আমরা পৃথিবীর সমস্ত মানবজাতিকে বলছি যে, তোমরা এক জাতি আরেক জাতিকে হামলা করো না, ধ্বংস করো না, খনিজ সম্পদ লুটে নিও না, পানি আটকে রেখে কষ্ট দিও না, সেও তোমার ভাই, সেও মানুষ। আল্লাহ সৃষ্টি আলো, বাতাস, পানিতে তোমার যেমন অধিকার তেমনি তারও অধিকার। তুমি যে আল্লাহর সৃষ্টি, সেও ওই আল্লাহরই সৃষ্টি। তোমরা উভয়ই আদম-হাওয়ার সন্তান। ভাই-ভাই লড়াই করলে পিতা-মাতা যেমন খুশি থাকতে পারে না তেমনি তোমাদের ভ্রাতৃঘাতী লড়াই দেখে তোমাদের আদি পিতা-মাতা কষ্ট পাচ্ছেন। তোমরা এক জাতি। এই যে ধারণা- আমরা সকলের মধ্যে এই ধারণা সৃষ্টি করতে চাই যে, ধারণাগতভাবে, অনুভূতির দিক থেকে সকল মানুষই এক জাতি।
তখন মানুষ চিন্তা করবে যে, তাদের বর্ডার তারা রাখবে কিনা, দুই ভাইয়ের বাড়ির মাঝে কোনো বেড়া থাকবে কি থাকবে না, সেটা সময়ই বলবে। এখানে তো বর্ডার তুলে ফেলার বা সরকার সরিয়ে ফেলার কোনো প্রশ্ন আসছে না। আমরা তো আসল কাজটিই করতে পারছি না। আমরা চাই একজাতির ধারণা সৃষ্টি করতে। বর্তমানে আমেরিকানরা চিন্তা করছেন ইরাকিরা মরলে মরুক, আমেরিকানরা বেঁচে থাকলেই হলো, আবার ভারতীয়রা হয়তো ভাবছেন, পাকিস্তানিরা মরলে মরুক, আমরা বাঁচলেই যথেষ্ট। আমরা এই ভাবনাটাকে অস্বীকার করে, আমরা ভাবতে চাই, তারাও আমার ভাই। আমার ভাই মরুক এটা আমি চাই না। এই ধারণাটা সবার মধ্যে আসলে মনের মধ্যে যে বর্ডার সেটা লুপ্ত হয়ে যাবে, তখন কাঁটাতারের বর্ডার কোনো সমস্যা সৃষ্টি করতে পারবে বলে মনে করি না। তখন একদেশের সীমানায় নদীতে বাধ দিয়ে ভাটির দেশকে মরুকরণ করা হবে না। সেটা হচ্ছে আন্তর্জাতিক প্রসঙ্গ। আমাদের নিজেদের দেশের মধ্যে তো কোনো বর্ডার নেই। তাহলে আগে আমরা এই ষোল কোটি এক হই না কেন? আমাদের মধ্যেও তো এই ভ্রাতৃত্বের ধারণা নেই। আমরা ভাবি অমুকে আওয়ামী লীগ, অমুকে বিএনপি, অমুকে হিন্দু, অমুকে চাকমা। আগে তাদের মধ্যে ধারণা সৃষ্টি হতে হবে যে, আমরা ভাই ভাই। আজ হিন্দুর ঘরে মুসলিম খায় না, প্রতিবেশী বাঙালির ঘরে আগুন দেয় চাকমা, চাকমাকে আক্রমণ করে বাঙালি। আগে এই দেওয়াল ভাঙতে হবে। তাদের বুঝতে হবে, স্রষ্টার কোনো জাত নেই, তাই মানুষেরও কোনো জাত নেই। সবাই একজাতি, কেউ উপজাতি নয়, কেউ সংখ্যালঘু নয়। এক মানুষের ঘরে আরেক মানুষ খেলে কারো জাত যাবে না। এই ধারণাই তো হয় নি এখনও, এটা আমরা সৃষ্টি করতে চাই। এই শিক্ষাটা ব্যাপকভাবে প্রসার করে আমরা ধারণাগতভাবে (ঈড়হপবঢ়ঃঁধষষু) মানবজাতিকে একজাতি করতে চাই।

এটি দুঃখজনক বিষয় যে আমাদের দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ কি ইসলামের চেতনার পক্ষে হয়েছে না বিপক্ষে হয়েছে– এ প্রশ্নের সমাধান আজও হয় নি। অধিকাংশ আলেম মনে করেন ইসলামের চেতনার বিরুদ্ধে হয়েছে, অন্যরা মনে করেন এর সঙ্গে ইসলামের কোনো স¤পর্ক নেই। এ প্রশ্নটি নিয়ে ৪৪ বছর পরও রাজনীতি ও ধর্মব্যবসা দুটোই চলমান আছে। আমরা যতই একাত্তরের চেতনা নিয়ে আবেগ প্রদর্শন করি না কেন, ধর্মের প্রশ্নে এসে সেই আবেগ, জাতীয় ঐক্য দেশপ্রেম দ্বিধাবিভক্ত ও পরাজিত হতে বাধ্য। তাই এ প্রশ্নের সমাধান হওয়াটা জরুরি।
উত্তরবঙ্গের জনৈক পুলিশ সুপার হেযবুত তওহীদের একজন সদস্যকে প্রশ্ন করেছিলেন, আপনারা একাত্তর সাল (মুক্তিযুদ্ধ) স্বীকার করেন কিনা? আবার এক জায়গায় জিজ্ঞাসা করা হয়, একাত্তর সালে বাংলাদেশের কয়জন মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল বলে মনে করেন? মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এমন আরও অনেক প্রশ্নের মুখোমুখী হতে হয়েছে আমাদের। একদিকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, অন্যদিকে স্বাধীনতাবিরোধী চেতনা নাম দিয়ে যে বিতর্ক ও বিভক্তি বছরের পর বছর জিইয়ে আছে, তা কারা কী উদ্দেশ্যে জিইয়ে রেখেছে সেটাই এক দুর্বোধ্য বিষয়।
এক শ্রেণির বুদ্ধিজীবী আছেন যারা অবিশ্রান্ত প্রচারণা চালিয়ে একটি মতবাদ প্রায় প্রতিষ্ঠা করে ফেলেছেন যে, ‘একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল ধর্মের বিরুদ্ধে, বিশেষত ইসলামের বিরুদ্ধে। অতঃপর নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ইসলামপন্থীরা পরাজিত হয় আর ধর্মবিরোধীদের উত্থান ঘটে।’ যারা এই প্রচারণায় প্রভাবিত তারা যখন হেযবুত তওহীদকে ধর্মের কথা বলতে শোনেন, ইসলামের কথা বলতে শোনেন, তাদের মনে স্বাভাবিকভাবেই সন্দেহের উদ্রেক হয় যে, হেযবুত তওহীদ মুক্তিযুদ্ধকে স্বীকার করে কিনা। তাদের জ্ঞাতার্থে বলছি ’৭১ এর যুদ্ধ ইসলামের বিরুদ্ধে হয় নি, ধর্মের বিরুদ্ধে হয় নি, যুদ্ধ হয়েছিল পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকদের অন্যায়, অবিচার, যুলুম, বঞ্চনা, শোষণ ও বৈষম্যমূলক নীতির বিরুদ্ধে। এখনও অনেক মুক্তিযোদ্ধা জীবিত আছেন, তারা কেউই বলেন না যে, তারা ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধে গিয়েছিলেন। আসলে লক্ষ লক্ষ বাঙালি যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল ন্যায়, শান্তি ও সাম্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে, নিজেদের অধিকার আদায় করতে। পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকরা ধর্মকে অপরাজনীতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতো, ধর্মের নাম করে অধর্ম করতো, বাঙালিরা লড়েছে সেই অধর্মের বিরুদ্ধে। সুতরাং ন্যায়, শান্তি ও সাম্য প্রতিষ্ঠার লড়াইকে হেযবুত তওহীদ অস্বীকার করতে পারে না, কেননা হেযবুত তওহীদের সদস্যরা পৃথিবীতে ন্যায় ও সত্য প্রতিষ্ঠার জন্যই সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে।
ইসলামের আলোকে স্বাধীনতা যুদ্ধ সম্পর্কে বিবেচনা করতে গেলে প্রথমেই আমাদেরকে দেখতে হবে এ যুদ্ধের প্রেক্ষাপটটা কী। ইতিহাস যদি আমরা ভুলে যাই তাহলে বর্তমানকে উপলব্ধি করতে পারব না, আমার ভবিষ্যৎ গন্তব্যও বিভ্রান্তিময় হবে।
এ উপমহাদেশ দু’শ বছর ব্রিটিশদের অধীনে ছিল। পুরো ভারতবর্ষকে শোষণ করতে করতে তারা সমৃদ্ধ হয়েছে, আর আমাদেরকে নিঃস্ব ভিখারি বানিয়েছে। তারা এখানে হিন্দু-মুসলিম শত্র“তা ও দাঙ্গা সৃষ্টি করেছে। এভাবে আমাদের জাতীয় রাজনীতিতে দুটি মেরু সৃষ্টি করেছিল সেই ব্রিটিশরাই যারা নিজেদেরকে ধর্মনিরপেক্ষতার অবতার মনে করে। তারাই বানিয়েছিল কংগ্রেস আর মুসলিম লীগ। এভাবে উপমহাদেশে তারা সাম্প্রদায়িকতাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে। ধর্মের ভিত্তিতেই তারা ভারতবর্ষের মানচিত্রে দেশবিভাগ ঘটিয়েছে- হিন্দুস্তান ও পাকিস্তান। এ ছিল এক সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্র যার ফলে এই উপমহাদেশে আজও বিরাজ করছে রাষ্ট্রীয় ও ধর্মীয় শত্র“তার সম্পর্ক।
দেশবিভাগের সময় পাকিস্তানের নেতারা দাবি করলেন যে, পাকিস্তান হবে ইসলামী রাষ্ট্র, নাম দিল ওংষধসরপ জবঢ়ঁনষরপ ড়ভ চধশরংঃধহ, কিন্তু বাস্তবে তারা কী করলেন? তারা আল্লাহর সাথে, ঈমানদার মানুষের সাথে ও মানবতার সাথে গাদ্দারি করে ভোগ-বিলাসে গা ভাসিয়ে দিলেন পূর্বতন ভাইসরয়দের মতোই। পূর্ব পাকিস্তানকে উপনিবেশ বানিয়ে ব্রিটিশদের মতই শোষণ করতে লাগলেন। এ দেশের মানুষকে তারা মানুষই মনে করলেন না, এদের ভাষাকেও তারা পরিবর্তন করে দিতে চাইলেন। এভাবে চব্বিশটি বছর বঞ্চনার শিকার হয়েছে পূর্ব পাকিস্তানের নাগরিকগণ, যাদের অধিকাংশই পাকিস্তানীদের মতই মুসলিম বলে পরিচয় দেয়। এই বঞ্চিত মানুষগুলোর মনে ক্ষোভ থাকাটা অস্বাভাবিক ছিল না। অত্যাচারিত মানুষ ঐক্যবদ্ধ হলে সেখানে শক্তির বিস্ফোরণ হয় এটাই স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক। কাজেই পাকিস্তানি শাসকদের ধর্মের নামে প্রতারণা, সামরিক শাসন, অবিচার, অত্যাচারের চূড়ান্ত পরিণতিই একাত্তরের যুদ্ধ। যুদ্ধ ছাড়া পূর্ব পাকিস্তানের কোনো উপায় ছিল না। রাজনৈতিকভাবে বহু সমাধানের চেষ্টা করেও পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকদের পক্ষে থেকে কোনো ইতিবাচক মনোভাব দেখা যায় নি। বঙ্গবন্ধু ’৭০ এর নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছিলেন, কিন্তু সেই বিজয়কে অস্বীকার করা হয়েছিল। উপরন্তু ২৫ মার্চ রাতে অতর্কিত হামলা করে নির্মমভাগে কথিত ‘মুসলিম’ ভাইদের উপর গণহত্যা চালিয়েছিল পাকিস্তানী সেনাবাহিনী। সুতরাং আত্মরক্ষার প্রশ্নেও যুদ্ধ সর্ববিধানে বৈধতা পায়। আর অন্যায়ের প্রতিবাদ না করে পড়ে পড়ে মার খাওয়াকে কখনোই ইসলাম সমর্থন করে না।
তাছাড়া পূর্ব পাকিস্তান আর পশ্চিম পাকিস্তান – হাজার মাইল দূরত্বে অবস্থিত এই দুটি ভূখ- কোনোভাবেই একসাথে চলতে পারত না। ভাষা, পোশাক, আচার-আচরণ, দৃষ্টিভঙ্গি সব দিক থেকে পশ্চিম পাকিস্তান ও পূর্ব পাকিস্তান ছিল পৃথক। একটি মাত্র ঐক্যসূত্র হতে পারত ধর্ম। কিন্তু প্রকৃত ইসলাম তো হারিয়েই গেছে ১৩০০ বছর পূর্বেই। তথাপি যে ইসলামের ধুয়া তুলে তারা সাতচল্লিশে ভাগ হলো সেই চেতনাকেই কবর দিয়ে, একমাত্র ঐক্যসূত্রকে ছিঁড়ে ফেলে ব্রিটিশদের মতো ঔপনিবেশিক শাসননীতি চালিয়ে পাকিস্তান কী করে এই দেশকে নিজেদের আয়ত্ব রাখতে পারত? অধিকন্তু দেশটি যখন পাকিস্তানের বৈরী দেশ ভারতের পেটের ভেতরে, তখন এই বিচ্ছিন্নতা ৭১ সালে হোক আর তার পরেই হোক, সেটা হতোই। এটা বুঝেই তারা যতটুকু পেরেছে এদেশটিকে ধ্বংস করেছে, এদেশের মানুষের বিরুদ্ধে তাদের প্রতিহিংসা চরিতার্থ করেছে।
এই বাস্তবতাকে যারা অস্বীকার করবে তারা বোকার স্বর্গে বাস করে। মনে রাখতে হবে যারা অন্যায় করে, অন্যের অধিকার কেড়ে নেয়, যুলুম করে তারা কখনও মুসলিম হতে পারে না। তারা যতই নামাজ পড়–ক, রোজা রাখুক, হজ্ব করুক, কোনো মুসলিম তাদেরকে ভাই বলে গণ্য করতে পারে না। তাদের একটাই পরিচয় তারা ইসলামের শত্র“, আল্লাহর শত্র“, লেবাস-সুরত তাদের যেমনই হোক। তাছাড়া পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকরা এ দেশের মুসলিমদেরকেও যে ভাই মনে করতো না তার প্রমাণ তারা নির্বিচারে গণহত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ ইত্যাদির মাধ্যমে দিয়েছে। ভাই কখনও ভাইয়ের বুকে গুলি চালাতে পারে না। এমন পরিস্থিতিতেও যারা ধর্মের অজুহাতে মুক্তিযুদ্ধকে, স্বাধীনতাকে অস্বীকার করে তারা ধর্মান্ধ ছাড়া কিছু নয়। আবার যারা একাত্তরকে অবলম্বন করে ধর্মবিদ্বেষী চেতনার বিস্তার ঘটাচ্ছে নিঃসন্দেহে তারাও দেশবাসীর সাথে প্রতারণা করছে। আমরা এই ধর্মান্ধতা ও ধর্মবিদ্বেষ উভয়কেই পরিত্যাজ্য মনে করি।
একইভাবে যারা মুক্তিযুদ্ধে নিহতের সংখ্যা নিয়ে আমাদের মতামত জানতে চান তাদেরকে বুঝতে হবে যুদ্ধে তিরিশ লক্ষ নিহত হোক কিংবা তিনজন নিহত হোক, অন্যায়ভাবে একজন মানুষ হত্যা করাও ভয়াবহ অপরাধ। আল্লাহর দৃষ্টিতে একজন মানুষকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা সমস্ত মানবজাতিকে হত্যা করার সমান। অন্যায় অন্যায়ই, তিরিশ লক্ষ মানুষকে হত্যা করেছে বলে অন্যায়কারী হবে, একজন মানুষকে হত্যা করলে অন্যায়কারীর লাঞ্ছনা থেকে মুক্তি পাবে তেমনটা মনে করার কারণ নেই। সুতরাং মৃতের সংখ্যা নিয়ে অহেতুক বিতর্কে যেতে আমরা রাজি নই।
এখন আমাদের কথা হলো- আমাদের স্বাধীনতাকামী নেতৃবৃন্দ বহু কষ্ট করে, বহু ত্যাগ তিতীক্ষার বিনিময়ে দেশকে শত্র“মুক্ত করেছিলেন। কিন্তু কেন করেছিলেন সেটাই এখন মুখ্য বিষয়। তারা চেয়েছিলেন একটি শোষণমুক্ত, বৈষম্যহীন, বঞ্চনাহীন একটি শান্তিময় জীবন এ জাতিকে উপহার দিতে, সেটা আমরা কতটুকু বাস্তবায়ন করতে পারলাম। নাকি আজও আমরা সেই আগের মতোই কেঁদে চলেছি, নাকি অবস্থা আগের চেয়েও খারাপ? এ প্রশ্নের মধ্যে আমাদের স্বাধীনতার সফলতা-ব্যর্থতার জবাব রয়েছে।
সত্য হচ্ছে স্বাধীনতার যুদ্ধ যে স্বপ্ন নিয়ে সেটার বাস্তবায়ন আমরা ৪৪ বছরেও দেখতে পাচ্ছি না। সেটা বাস্তবায়ন করাই আমাদের কাজ, শুধু স্বাধীনতার চেতনা নিয়ে গলাবাজি, রাজনীতি আর ব্যবসা করে দিনপার করলে চলবে না। জাতি আজ বহুধাবিভক্ত, ক্ষয়িষ্ণু, শক্তিহীন, ভঙ্গুর। তাদেরকে কেউ ঐক্যবদ্ধ রাখতে পারে নি বিগত ৪৪ বছরে। ফলে উন্নয়ন অগ্রগতি মুখ থুবড়ে পড়েছে। এক পা এগোলে আমরা দশ পা পিছিয়েছি, আগে গরিবের টাকা শোষণ করত পাকিস্তানী বুর্জোয়ারা, আর এখন করছে দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিবিদেরা, আমলা ও পুঁজিবাদী বুর্জোয়ারা। সুতরাং অন্যায়, অবিচার, শোষণের অবসান এখনো হয় নি। ’৭১ সলে সেই বুর্জোয় শোষকদের বিরুদ্ধে বঞ্চিত জনতাকে ঐক্যবদ্ধ করলেন বঙ্গবন্ধু। এখন বর্তমানের এই বঞ্চিত, নিপীড়িত জনতাকে ধান্ধাবাজ রাজনীতিক ও ধর্মব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে, সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে কে ঐক্যবদ্ধ করবে? সেই কাজটিই করে যাচ্ছে হেযবুত তওহীদ।
এখন একটাই কাজ, জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে। কীসে কীসে অতীতে ঐক্যভঙ্গ করেছে সেগুলোর খতিয়ান নিয়ে তা পরিহার করতে হবে। আমরা দেখেছি এ জাতি সবচেয়ে বেশি বিভক্ত হয়েছে বহুদলীয় গণতন্ত্রের নামে অপরাজনীতিক কর্মকা-ের দ্বারা, রাজনীতিক দলগুলোর ক্ষমতার লড়াই আজও এ জাতিকে পিষে যাচ্ছে। এগুলো দূর করতে প্রয়োজন জাতির ঐক্যবদ্ধ হওয়া। আমরা বিশ্বাস করি, একাত্তর ছিল বাঙালির জন্য আশীর্বাদ ও শিক্ষা, কারণ একাত্তর আমাদেরকে ঐক্যবদ্ধ করেছিল। সেই ইতিহাস থেকে প্রেরণা নিয়ে আমরা যদি একাত্তরের আশীর্বাদকে কাজে লাগাতে না পারি তাহলে মুক্তিযুদ্ধ অপূর্ণাঙ্গ ও ব্যর্থ হয়ে যাবে। এখন আমাদের দেশকে আসন্ন সঙ্কট থেকে মুক্ত করতে হলে ঐক্যবদ্ধ জাতিসত্ত্বা গঠন করতে হবে। এমতাবস্থায়, ১৬ কোটি বাঙালির ঐক্যবদ্ধ হওয়া ছাড়া উপায় নেই। তেমন ঐক্যবদ্ধ, সুশৃঙ্খল ও ন্যায়নিষ্ঠ জাতিসত্ত্বা গড়ে তোলার লক্ষ্যেই কাজ করছে হেযবুত তওহীদ। আমাদের অবস্থান মুক্তিযুদ্ধকে স্বীকার করা না করা কিংবা স্বাধীনতার পক্ষ-বিপক্ষ বিতর্কের অনেক ঊর্ধ্বে।

ধর্মব্যবসায়ী মোল্লারা বাস্তবেই মেয়েদেরকে ঘরের চার দেওয়ালের মধ্য বন্দী করে রাখতে চায়, হেযবুত তওহীদের বেলায় এ কথাটি বহুবার বহুভাবে প্রমাণিত হয়েছে। মোল্লারা যখন ফতোয়া দেয়, তাদের কথাগুলি মানুষ আল্লাহ-রসুলের কথা বলেই বিশ্বাস করে। শিক্ষিত শ্রেণির এ এক অন্ধত্ব। তারা যাচাই করে না যে সেগুলি ইসলামের ইতিহাসের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ কি না। এটা বিবেচনা না করেই মানুষ ইসলামকে বর্বর, পশ্চাৎমুখী বলে অপবাদ দেওয়া হয়। অথচ পর্দা প্রথার নামে যে জগদ্দল পাথর মোল্লারা মেয়েদের উপরে চাপিয়ে রেখেছে সেটা এসলাম সম্মত নয়। আমাদের নারী কর্মীরা যখন সত্য প্রচারে বা পত্রিকা বিক্রি করতে বের হয়, তাদেরকে অনেকেই প্রশ্ন করে, ‘তোমরা ঘর থেকে বের হলে কেন? মেয়েদেরকে রাস্তায় বের করে দিয়ে হেযবুত তওহীদ তো এসলামটা ধ্বংস করে দিচ্ছে।’ আবার কেউ বলে, ‘রাস্তার মধ্যে এসলামের কথা বলে, এটা আবার কোন এসলাম? হকারি করে মেয়েরা, পত্রিকা বিক্রি করে মেয়েরা, এটা তো কোন দিন দেখি নি।’ অনেকে সময় তারা সন্দেহ করে পুলিশে খবর দেয়। পুলিশ অফিসারও একই মন্তব্য করেন, ‘মেয়ে মানুষ পত্রিকা বিক্রি করে এমন কখনও দেখি নি।’
এইসব অদ্ভুত ও যুক্তিহীন প্রশ্নের একটাই অর্থ দাঁড়ায়- মেয়েরা ইটভাটায় দিনমজুরের কাজ থেকে শুরু করে দেশ পরিচালনা পর্যন্ত সবই কোরতে পারবে, কিন্তু এসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে তারা ঘর থেকেও বের হতে পারবে না। জাতির এই মানসিক পক্ষাঘাত কবে ঘুঁচবে? এসলামের প্রকৃত ইতিহাস সম্পর্কে অজ্ঞতাই এ প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। আল্লাহর রসুলের সময় মেয়েরা রসুলের সঙ্গে যুদ্ধে পর্যন্ত গেছেন। তারা সামাজিক সকল কর্মকা-ে ভূমিকা রেখেছেন, মসজিদে পুরুষদের সঙ্গেই সালাতে অংশ নিয়েছেন, পরামর্শ সভায় পরামর্শ দিয়েছেন, হাসপাতালের অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেছেন, বাজার নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব পালন করেছেন। রসুলের সময় সবকাজে মেয়েদের অংশগ্রহণ ছিল অবারিত। অথচ আজ মেয়েদের কেবলই ঘরের কাজে আটকে রাখতে চায় ধর্মব্যবসায়ীরা। জাতির অর্ধেক শক্তিকে এভাবে অপচয় করে তারা জাতির ধ্বংস ডেকে এনেছেন এটা বোঝার শক্তিও তাদের নেই। আমাদের মেয়েরা পত্রিকা বিক্রি করেন এটা তাদের পেশা নয়, সংগ্রাম। এটি নারীমুক্তির একটি সোপান।

আমাদের কথা হল মানুষকে আল্লাহ কণ্ঠ দিয়েছেন বলার স্বাধীনতা দিয়েছেন। মানুষ কথা বলবে। মানুষকে আল্লাহ লেখার স্বাধীনতা দিয়েছেন। মানুষ লিখবে। মানুষকে চিন্তার স্বাধীনতা দিয়েছেন, তাই মানুষ যে কোনো বিষয়ে চিন্তা করবে। এসব স্বাধীনতা আল্লাহ প্রদত্ত স্বাধীনতা, এতে কারোর হস্তক্ষেপ করার অধিকার নেই। বাক-স্বাধীনতার সংজ্ঞায় রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বলে থাকেন,  সমগ্র জাতির মতের বিরুদ্ধেও যদি আমার কিছু বলার থাকে সেটা আমি নির্ভয়ে বলতে পারব, এজন্য আমার কোনো ক্ষতির আশঙ্কা থাকবে না। এই বাক-স্বাধীনতায় আমরা বিশ্বাস করি, এবং একমাত্র সত্য ইসলাম এই স্বাধীনতা দিতে পারে। আর কেউ দিতে পারবে না, যদিও সবাই দাবি করে থাকে। যাই হোক, এই স্বাধীনতার মানে কিন্তু এটা নয় যে, আমি মিথ্যা কথা বলব। মিথ্যা কথা বলার অধিকার অবশ্যই বাক-স্বাধীনতা নয়। আপনি যদি কারো প্রতি অপবাদ আরোপ করেন এবং সেটা যদি প্রমাণিত হয়, তবে অবশ্যই আপনাকে জবাবদিহিতার সম্মুখীন হতে হবে। এখন আমরা প্রায়ই দেখি, মিডিয়ায় তিলকে তাল বানানো হয়, মানুষের কথাকে টুইস্ট করে বা অফ দ্যা রেকর্ড কথা প্রকাশ করা হয়, গোপনীয় বিষয় খুঁজে বের করা হয়, এভাবে মানুষের সারাজীবনের অর্জিত মান-সম্মান ধূলায় মিশে যায়। এটাও স্বাধীনতা নয়। এভাবে অন্যের মানহানি করা, জাতির মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করা, এসবের অনুমতি কোনো জীবনবব্যস্থাই দেয় না। হ্যাঁ, কেউ যদি ইসলামের বিরুদ্ধে যুক্তিসঙ্গত, সত্য ইতিহাসভিত্তিক, তথ্যবহুল কিছু লিখেন সেটার স্বাধীনতা অবশ্যই থাকবে, কেউ তার কলমকে বন্ধ করতে পারবে না। কিন্তু কেউ যদি কোনো ধর্মের নবী-রসুল বা অবতারকে নিয়ে অমর্যাদাসূচক মিথ্যাচার করে, যা সমাজের সাম্প্রদায়িক সহাবস্থানের জন্য প্রতিকূল পরিস্থিতি সৃষ্টি করবে সেটা নিশ্চয়ই বাক-স্বাধীনতা নয়, সেটা তথ্য-সন্ত্রাস। স্বাধীনতা তো সেটাই যেটা অন্যের স্বাধীনতাকেও সমুন্নত রাখে।

অন্যান্য ধর্ম বলতে কী বুঝাচ্ছেন আসলে? আমি তো অন্যান্য ধর্মকেও আমার ধর্ম বলছি। অন্যান্য ধর্ম বলে যে বিভক্তি সৃষ্টি করা হয় তা অসত্য ও অন্যায়। আমি বলছি ঈসা (আ.) আমার নবী, তাঁর অনুসারীরা আমার ভাই। মুসা (আ.) আমারও রাসুল, আমি তাঁকে শ্রদ্ধা করি, তাঁর নিদের্শাবলীকেও সত্য বলে শিরোধার্য মনে করি। মুসা (আ.) এর উম্মাহ বলে দাবিদার ইহুদিরা আমার বাবা আদম-হাওয়ারই সন্তান। মহাভারতে যারা এসেছেন কৃষ্ণ, মনু, যুধিষ্ঠির তাঁরাও একই স্রষ্টার পক্ষ থেকে আসছেন, তাঁদের স্রষ্টা তো আলাদা স্রষ্টা নয়। তাঁদের কেতাবগুলো আমার আল্লাহরই পক্ষ থেকে অবতীর্ণ, তাই ওগুলো আমারও ধর্মগ্রন্থ। সনাতন ধর্ম মানে হল চিরন্তন শাশ্বত ধর্ম, ইসলামের একটি নাম দীনুল কাইয়্যেমা, তার মানেও চিরন্তন শাশ্বত জীবনবিধান। ধর্ম তো একটাই, আপনারা অন্য ধর্ম বলেন কেন? আমরা কোনো ধর্মের অনুসারীদের প্রতি তাচ্ছিল্য, বিদ্বেষ পোষণ করি না, আমাদের সংগ্রাম অন্যায়ের বিরুদ্ধে, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে – সেটা যে ধর্মের লোকই করুক, যে রাজনীতিক মতবাদের লোকই করুক। ইসলামের আকীদা মোতাবেক সকল নবী-রসুল ও তাঁদের আনীত কেতাবগুলোর উপর ঈমান আনা অবশ্য কর্তব্য বা ফরদ। একজন নবীকে শ্রদ্ধা করলাম আরেকজনকে অস্বীকার করলাম বা অশ্রদ্ধা করলাম তবে তো আমি মো’মেনই হতে পারব না। ইসলাম অর্থই শান্তি, ইসলাম প্রতিষ্ঠা করা মানে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা। জোর করে লেবাস চাপিয়ে দেওয়া নয়, একটি নির্দিষ্ট আইন-বিধান একটি জাতির ইচ্ছার বিরুদ্ধে চাপিয়ে দেওয়া নয়। প্রত্যেক মানুষ যার যার বিশ্বাস নিয়ে সম্মানের সঙ্গে বসবাস করবে। কেউ কাউকে আক্রমণ করবে না, কেউ কারো অধিকার বিনষ্ট করবে না, কোনো মানুষ অপর কোনো মানুষের থেকে ক্ষতির আশঙ্কা করবে না। মেজরিটি, মাইনরিটি কথাগুলো ইসলামে নেই কারণ এসব কথা ভাইয়ের বেলায় খাটে না। আমার ভাইয়ের সম্পদ আর ইজ্জত রক্ষা করা আমার দায়িত্ব।

হেযবুত তওহীদ অরাজনীতিক সংস্কারমূলক সামাজিক আন্দোলন। বর্তমানে ডানপন্থী-বামপন্থী, ধর্মনিরপেক্ষ ইত্যাদি বিভিন্ন ফরমেটের দল আছে, সেগুলোর গঠনতন্ত্র, কর্মসূচি ইত্যাদির সঙ্গে তুলনা করা হলে হেযবুত তওহীদ ইসলামিক দল নয় আবার ধর্মনিরপেক্ষ দলও নয়। হেযবুত তওহীদের বক্তব্য, দর্শন, কর্মসূচি, কর্মপদ্ধতি সবই এর নিজস্ব।

আপনাদের আগে বুঝতে হবে ইসলামটা কি জিনিস? আমাদের অনেকের কাছেই ইসলাম মানে দাড়ি, টুপি, পায়জামা, মিলাদ, মিসওয়াক, ঢিলাকুলুক, মসজিদ, মাদ্রাসা, সুর করে কোর’আন তেলাওয়াত করা, মসজিদে মসজিদে আজান দেওয়া, দলে দলে মক্কায় যাওয়া এগুলোই ইসলাম। আসলে তা না। মানবতা ও ইসলাম একই সূত্রে গাঁথা। ইসলাম অর্থ শান্তি, শান্তি প্রতিষ্ঠা মানেই মানবতা প্রতিষ্ঠা। ইসলামের দাবি হচ্ছে সমাজে এমন একটা পরিস্থিতি থাকবে যে মানুষ দরজা খুলে ঘুমাবে। আতঙ্ক নেই, ভয় নেই, কাল কী খাবে তা নিয়ে দুশ্চিন্তা নেই এমন একটা শান্তিপূর্ণ পরিস্থিতির নাম হলো ইসলাম। আজকে ধর্মব্যবসায়ীরা এটা বিকৃত করে ইসলামটাকে ঐ গুটিকয় ব্যক্তিগত আমল, রুচি-অভিরুচি, পোশাক-পরিচ্ছদ ও আচার-আচরণের মধ্যে বন্দী করে রেখেছে। সেজন্যই আজ এই প্রশ্ন উঠছে যে, আমরা কি মানবতা চাই না ইসলাম চাই। আসলে ধর্ম আর মানবতা একই কথা। ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হওয়া মানেই মানবতা প্রতিষ্ঠিত হওয়া। যেই মানবতার প্রতিষ্ঠা চায়, সে-ই ইসলাম চায়, সে হিসাবে পৃথিবীর সমস্ত পৃথিবীর মানুষ ইসলাম চায়, গুটিকয় দাঙ্গাবাজ শয়তান বাদে। হ্যাঁ, বলতে পারেন, মানবতাবাদী বহু আন্দোলন পৃথিবীতে আছে যারা ধর্মকে বাদ দিয়েই প্রচেষ্টা চালাচ্ছে, সেবামূলক কাজ করছে। তারা মিটিং, সিম্পোজিয়াম করছে, মানববন্ধন করছি কিন্তু তারা আজ পর্যন্ত কোথাও মানবতা প্রতিষ্ঠা করতে পারে নাই। এটা প্রমাণিত হয়ে গেছে। আজকাল তো ধর্মব্যবসার মত মানবতার ব্যবসাও হয়, এটা সরকারি-বেসরকারি-আন্তর্জাতিক সব ক্ষেত্রেই হয়। তাদের এ ব্যর্থতার কারণ তারা নৌকা ছিদ্র করে দিয়ে পানি সেচছেন। এটা কোনো কাজের কথা না। এটা ইতিহাস যে, মানুষ যখন স্রষ্টার দেওয়া বিধান, মূল্যবোধ, ন্যায়-নীতি মান্য করেছে সেখানেই মানবতা বিকশিত হয়েছে। তাকে পুলিশের ভয় দেখিয়ে ভালো মানুষ বানাতে হয় নি, সে সব সময় স্রষ্টার উপস্থিতি ও স্রষ্টার দৃষ্টির গ-ির মধ্যে আছে বলে বিশ্বাস করার কারণে যেখানে সে একা সেখানেও সেও নীতিভ্রষ্ট হয় নি, সে ভেবেছে আমি যদি এখন অন্যায় করি তাহলে আমাকে একদিন এর জন্য জবাবদিহি করতে হবে। মানুষ অন্য মানুষকে শ্রদ্ধা করতে শিখেছে। অপরের অধিকার সম্পর্কে সচেতন ছিল। সে উপলব্ধি করেছে যে আমি যেমন মানুষ সেও মানুষ। এই পৃথিবীর সকল উপাদানের উপরে আমার যেমন অধিকার রয়েছে মাটির উপরে অন্যদেরও অধিকার রয়েছে। কাজেই আমি অন্যের অধিকার হরণ করতে পারি না। এই হলো মানবতাবাদী। আর এই চিন্তাকে মানুষ তখনই ধারণ করতে পারবে যখন তার মধ্যে স্রষ্টার ভয় থাকবে অর্থাৎ ধর্মগুণ থাকবে। এছাড়া ব্যক্তিগতভাবে বিক্ষিপ্ত-বিচ্ছিন্ন দু একজনকে মানবতাবাদী করা গেলেও জাতিগতভাবে অসম্ভব। আজ বিশ্বে সবচেয়ে বেশি মানবতাবাদী র্যালি, কর্মসূচি, শ্লোগান হয় আমেরিকায়, কিন্তু পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে মানবতাবিরোধী কাজ তারাই করছে। তারা নিজেরা যুদ্ধ করছে, অন্যদের মধ্যে যুদ্ধ বাধিয়ে দিয়ে উভয়পক্ষের কাছে অস্ত্র বিক্রি করছে। বিগত কয়েক শতাব্দীতে এই পশ্চিমা সভ্যতা যা করেছে, পৃথিবীর হাজার হাজার বছরের ইতিহাসে এরকম মানবতার লঙ্ঘন আর হয় নাই। কিন্তু রাষ্ট্রীয় জীবনে ধর্মীয় মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠিত হলেই মানবতার প্রকৃত রূপ মানবজাতি দেখতে পেয়েছে। এই ইসলাম যখন প্রকৃত ইসলাম ছিল- অর্থাৎ বিশ্বনবীর (দ.) কাছ থেকে যারা সরাসরি শিক্ষা-গ্রহণ করেছিলেন, তাদের অন্যতম, দ্বিতীয় খলিফা ওমরের (রা.) সময় একবার দুর্ভিক্ষ হয়েছিল। যতদিন দুর্ভিক্ষ ছিল ততদিন দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষ যেমন অর্দ্ধাহারে অনাহারে থাকে তিনিও তেমনি থাকতেন। ওমর (রা.) প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, যতদিন না জনসাধারণ এমন অবস্থায় পৌঁছবে যে তারা ভালো করে খাবার পরও উদ্বৃত্ত থাকবে ততদিন তিনি গোশত-মাখন এমনকি দুধ পর্যন্ত খাবেন না এবং খানও নি। তিনি বলতেন “আমি যদি ঠিকমত খাই তবে আমি কী করে বুঝব আমার জাতি কী কষ্ট সহ্য করছে?” এই অর্ধাহারে অনাহারে থেকে খলিফা ওমরের (রা.) মুখ রক্তশূন্য ও চুপসে গিয়েছিল। এই ঘটনা ও ওমরের (রা.) ঐ কথা গুলো ঐতিহাসিক সত্য, যারা বিস্তারিত জানতে চান, স্যার উইলিয়াম ম্যুর এর অহহধষং ড়ভ ঊধৎষু ঈধষরঢ়যধঃব বইটি পড়ে নেবেন। এই বছর চুরির জন্য হাত কাটার বিধান পর্যন্ত উমর (রা.) স্থগিত করেছিলেন। এর চেয়ে মানবিক আর কী হতে পারে?

আন্দোলন অসত্যের বিরুদ্ধে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে, ধর্মব্যবসার বিরুদ্ধে, জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে, পশ্চিমা বস্তুবাদী ‘সভ্যতা’ দাজ্জালের অপশক্তির বিরুদ্ধে, সর্বপ্রকার অনৈক্যের বিরুদ্ধে, বিশৃঙ্খলার বিরুদ্ধে, অজ্ঞানতার বিরুদ্ধে, কূপম-ূকতার বিরুদ্ধে, ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে, ধর্মের নামে অযৌক্তিক বিশ্বাস, কথা ও আচরণের বিরুদ্ধে, এক কথায় সকল অধর্মের বিরুদ্ধে। আমাদের আন্দোলন সত্যের পক্ষে, ন্যায়ের পক্ষে, ঐক্যের পক্ষে, শান্তির পক্ষে।

ধর্মের প্রচলিত ধ্যান-ধারণার বাইরে কিছু দেখলেই, কিংবা সকল ধর্মের অনুসারীদের মধ্যে ঐক্যসৃষ্টির কোনো উদ্যোগ দেখলেই অনেক প-িতমন্য ব্যক্তি দীনে এলাহীর প্রসঙ্গ টেনে আনেন। তাদের উদ্দেশ্য থাকে যারা দীনে এলাহী সম্পর্কে জানেন না তাদেরকে বিভ্রান্ত করা। আমরা মনে করি, আমাদের বক্তব্য এবং দীনে এলাহী সম্পর্কে না জানার কারণেই এমন প্রশ্ন ওঠে। প্রকৃত ইসলাম আর দীনে এলাহী কি এক জিনিস? আল্লাহর রসুলও সকল আহলে কেতাবকে বলেছেন, এসো আমরা এমন একটি বিষয়ের উপর মিলিত হই যে বিষয়ে তোমাদের ও আমাদের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই, সেটা হচ্ছে আমরা একমাত্র প্রতিপালক আল্লাহর এবাদত করব (সুরা ইমরান ৬৪)। সুতরাং সকল ধর্মের অনুসারীদের ঐক্য আল্লাহরই অভিপ্রায়। বিগত তেরশ বছর ধরে ইসলাম বিকৃত হতে হতে আজকে সম্পূর্ণ বিকৃত হয়ে গেছে। আল্লাহর দয়ায় আমরা আবার সেই সত্য এসলাম লাভ করেছি। সব ধর্মের মানুষের জন্যই শেষ রসুল এসেছিলেন, তিনি যেমন সব ধর্মের মানুষের কাছে গিয়েছেন আমরাও সব ধর্মের মানুষের কাছেই যাচ্ছি। সমগ্র মানবজাতিকে এক মহজাতিতে পরিণত করে তাদের শান্তিময় সহাবস্থান নিশ্চিন্ত করাই আমাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য। আমাদের এই ধারণার সঙ্গে দীনের এলাহীর দূরতমও কোনো সাদৃশ্য নেই।
কারণ দীনে এলাহী ছিল সম্রাট আকবরের একটি রাজনৈতিক কূটকৌশলমাত্র। প্রাচীনকাল থেকে ভারতে ডজন এর উপর ধর্মীয় জাতিগোষ্ঠীর বসবাস ছিল। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল রাজস্থানের রাজপুতনারা। ক্ষমতা হ্রাস পাওয়ায় তারা সম্রাট আকবরের বিরূদ্ধে চরম সাম্প্রদায়িক অসন্তোষের আগুন জ্বালিয়ে দেয়। সাম্প্রদায়িকতার এ বিষবাষ্প থেকে ভবিষ্যতে মোঘল সাম্রাজ্যকে রক্ষা করার পথ খুঁজতে থাকেন আকবর। তিনি রাজপুত কন্যা যোধাবাঈসহ বিভিন্ন রাজপরিবারের মেয়েদেরকে বিয়ে করে তাদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক স¤পর্ক স্থাপন করেন, অনেকের সঙ্গে সন্ধিচুক্তি করেন। কিন্তু তার গৃহীত এসকল পদক্ষেপগুলোকে স্থায়ী রূপ দেওয়ার জন্য প্রয়োজন ছিল একটি স্থায়ী মোঘল ধর্মীয় নীতি। এটাই হলো দীনে এলাহি। বিরাট ভূ-ভারতের বিভিন্ন দূরবর্তী রাজ্যের শক্তিমান হিন্দু রাজাদের পক্ষে রাখার জন্য তিনি সনাতন ধর্মের প্রচলিত পূজা-পদ্ধতিগুলো নিজ ধর্মে গ্রহণ করেন এবং একটি একটি করে ইসলামের সকল বিধি-বিধানকে বাদ দেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তিনি বিরাট সুযোগ-সুবিধার লোভ দেখিয়েও হিন্দু-মুসলিম থেকে মাত্র ১৯ জন অনুসারী সংগ্রহ করতে পেরেছিলেন, যারা কিনা তার মৃত্যুর পরই যার যার ফিরে যায়। মুসলিমরা (যদিও প্রকৃত মুসলিম নয়, কার্যত কাফের মোশরেক) এ ধর্মটি মেনে নিতে পারে নি কারণ এর প্রধান উপাদানই ছিল সূর্যের উপাসনা করা। বাদশাহ প-িতদের কাছ থেকে সূর্যকে বশীভূত করার মন্ত্র শিখেছিলেন যা তিনি মাঝরাত্রে ও ভোরে পাঠ করতেন। এ ধর্মে আগুন, পানি, গাছ, গাভী ও নক্ষত্র পূজাও করা হত। দীনে এলাহীর কলেমা ছিল লা ইলাহা ইল্লালাহু আকবারু খলিলুল্লাহ। এ ধর্মে বাদশাহকেও সেজদা করতে হত। সূদ ও জুয়া ছিল বৈধ। খাস দরবারে জুয়া খেলার জন্য একটি ঘর নির্মাণ করা হয় এবং জুয়াড়ীদেরকে রাজকোষ থেকে সুদি কর্জ দেয়া হত। মদ্যপান করাও হালাল সাব্যস্ত করা হয়। বাদশাহ স্বয়ং দরবারের নিকট একটি শরাবখানা খুলে দেন। নববর্ষের অনুষ্ঠানে আলেম, কাজী ও মুফতিগণকেও শরাব পানে বাধ্য করা হত। শহরের বাহিরে বিভিন্ন জায়গায় পতিতাদের বসতি স্থাপন করে ব্যাভিচারকে আইনসিদ্ধ করা হয়। বার বৎসরের পূর্বে বালকদের খৎনা করা নিষিদ্ধ করা হয়। এই ধর্মাবলম্বী কোন লোকের মৃত্যু হলে তার গলায় কাচা গম ও পাকা ইট বেঁধে তাকে পানিতে নিক্ষেপ করা হতো। যেখানে পানি পাওয়া যেত না, সেখানে মৃতদেহ জ্বালিয়ে দেওয়া হতো অথবা পূর্ব দিকে মাথা ও কাবার দিকে পা দিয়ে দাফন করা হতো। গরু, উট, ভেড়া প্রভৃতি জন্তুর গোশত হারাম বলে ঘোষিত হয়েছিল, ঈদুল আযহার সময়ও এগুলো কোরবানি করা যেতন না। পক্ষান্তরে বাঘ ভাল্লুকের গোশত হালালের মর্যাদা লাভ করে। এমন আরো অনেক আছে যা বিস্তারিত লেখার জায়গা এটা নয়। মোট কথা সর্বক্ষেত্রে ইসলামের বিরোধিতা করাই ছিল দিন-ই-ইলাহির মূল উদ্দেশ্য, এর পেছনে মূল প্রেরণা ছিল রাজনীতি। সম্রাট আকবরের ছেলে জাহাঙ্গীর পিতার নীতিতেই রাষ্ট্র চালাতেন, ফলে তাকে মুসলিমদের বিদ্রোহে পড়তে হয় এবং তিনি সম্মুখযুদ্ধে পরাজিতও হন, তার সেনাবাহিনীও তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে বসে। অনন্যোপায় জাহাঙ্গীর দীনে এলাহি ত্যাগ করার শর্তে দিল্লির সিংহাসন ফিরে পান। এহেন দীনে এলাহীর সঙ্গে হেযবুত তওহীদের বক্তব্যের প্রসঙ্গ কোথায় মেলে সেটাই আমাদের বোধগম্য নয়। হেযবুত তওহীদ ১৩০০ বছরের বিকৃতির আড়ালে হারিয়ে যাওয়া ইসলামের বহু সত্যকে পুনর্জীবন দিয়েছে এবং রসুলাল্লাহর প্রকৃত উম্মতে মোহাম্মদী হওয়ার জন্য আপ্রাণ সাধনা করছে, সমগ্র দুনিয়াতে আল্লাহর সত্যদীন প্রতিষ্ঠা করার জন্য নিজেদের জীবন-সম্পদ বিলিয়ে দিয়ে সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। তাই যারা কথায় কথায় দীনে এলাহীর কথা বলেন আসলে তারা এ বিষয়ে কতটুকু জানেন সেটাই প্রশ্ন। আমাদের মতে আগে তাদের দীনে এলাহীটা পড়া উচিত, হেযবুত তওহীদের লেখাগুলোও পড়া উচিত, তারপর নিজের বিবেকের কাছে প্রশ্ন করলে আপনিই উত্তর পেয়ে যাবেন।

যিনি কোনো মহৎ কাজ করেন তিনিই মহান ব্যক্তি, তিনিই মহামানব। মহামানব হতে হলে ইমাম মাহদী হতে হবে এমন কোনো কথা নেই। রসুলাল্লাহর বিদায়ের পর এই উম্মাহ যে খলিফাদেরকে কেন্দ্র করে ঐক্যবদ্ধ ছিল তারাও সে যামানার নেতাই ছিলেন। এমন কথা কোথাও থাকলে আমাদেরকে দেখান যে, এমাম মাহদী ছাড়া আর কেউ যামানার এমাম দাবী করতে পারবেন না, আমরা উপকৃত হব।
আর মহামানব শব্দটি তো অনেকের বেলাতেই আপনারা ব্যবহার করেন। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর জীবনের লেখা শেষ গানটিতে এই পূর্বদেশ, প্রাচ্যভূমি থেকেই একজন মহামানবের আগমনের আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন। বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি দৈনিক ইত্তেফাকের শিরোনাম ছিল রবীন্দ্রনাথের ঐ গান- ‘ওই মহামানব আসে, দিকে দিকে রোমাঞ্চ জাগে।’ মহাÍা গান্ধী, নেলসন ম্যান্ডেলাকেও মহামানব বলা হয়, বাস্তবেও তারা মহামানবই ছিলেন। কারণ আমরা মনে করি যারাই মানুষের কল্যাণে জীবনকে উৎসর্গ করে দেন তারা অবশ্যই মহামানব। রানা প্লাজায় আটকে পড়া গার্মেন্টসকর্মী শাহীনা কে উদ্ধার করতে গিয়ে জীবন দেন ইজাজ, এভাবে আরো অনেকেই জীবনকে বিপন্ন করে অন্যের জীবন বাঁচিয়েছেন। তাদেরকে সাধারণ মানুষ হিসাবে আখ্যায়িত করা হয়, কিন্তু আমরা বলি তারা সাধারণ নন, তারা অসাধারণ। তারা মহামানব। মাননীয় এমামুয্যামান তাঁর জীবনের উপার্জিত সমস্ত সম্পদ, তাঁর পৈত্রিক সম্পদ মানবতার কল্যাণে নিঃশেষ করে দিয়েছেন। তিনি শেষ মুহূর্তেও বলে গেছেন, ‘সংগ্রাম চলবে।’ যারা তাঁকে মহামানব বলতে কার্পণ্য করছেন, আমরা সবিনয়ে বলছি, তাঁরা এমামুয্যামানকে সঠিকভাবে জানলে অবশ্যই আমাদের সঙ্গে একমত হতেন। আমরা জানি, তাই আমরা বলছি। তাঁর সংস্পর্শে গিয়ে কিছু সংখ্যক মানুষ নিজেদের আত্মকেন্দ্রিকতা থেকে মুক্ত করে মানুষের কল্যাণে জীবন-সম্পদ উৎসর্গ করে দিয়েছেন এবং একটি সুন্দর পৃথিবী গড়ার লক্ষ্যে দিনরাত সংগ্রাম করে যাচ্ছেন। যাঁর মাধ্যমে মানুষ এই কঠিন সময়েও মানুষের কল্যাণের জন্য নিজের সব সাধ-আহ্লাদ, জীবন-জীবিকা বিসর্জন দিয়ে পথে নামতে পারে তিনি মহামানব না হলে মহামানব কাকে বলে আমাদের জানা নেই। যা-ই হোক এমামুয্যামানকে মহামানব বলে আমরা সঠিক করছি না বাড়াবাড়ি করছি সেটা এনশা’আল্লাহ ভবিষ্যত সময়ই বলে দেবে।

আসলে আপনাদের অনেকের প্রশ্ন একেবারে বিপরীতমুখী। এক সাংবাদিক বললেন আমরা পশ্চিমাদের বিরোধিতা কেন করছি, কেন ভারতের বিরুদ্ধে কিছু বলি না। আরেক সাংবাদিক সরাসরি বললেন আমরা পশ্চিমাদের পক্ষ হয়ে ইসলামের সুনাম ক্ষুণœ করছি। একেবারে পরস্পর বিপরীত প্রশ্ন্। আসলে আমরা কোনটা করছি শুনুন। আমরা না পশ্চিমাদের পক্ষে বলছি, না আমরা আরবীয় ইসলামের কথা বলছি। আসলে আমরা মুসলমান জনগোষ্ঠীর ঈমানকে সঠিক পথে প্রবাহিত করার চেষ্টা করছি। তাদের ঈমান আমরা কী নষ্ট করব, তাদের ঈমান তো বহু আগেই নষ্ট করে দিয়েছে এই জাতির ধর্মব্যবসায়ী, আলেম-মোল্লা শ্রেণি আর পশ্চিমা ষড়যন্ত্রমূলক দ্বিমুখী শিক্ষাব্যবস্থা। ধর্মব্যবসায়ীরা তাদের ঈমানকে ছিনতাই করে নিয়ে নিজেরা টাকা কামাচ্ছে, কেউ রাজনীতির মাঠে ছক্কা মারতে চাইছে, কেউ জঙ্গি বানিয়ে আত্মঘাতি হতে উদ্বুদ্ধ করছে। সেখান থেকে ধর্মপ্রাণ মানুষের ঈমানকে উদ্ধার করতে চাইছি আমরা। এবং সেটাকে সঠিক পথে ব্যবহার করতে চাইছি যেন সে দুনিয়াতেও লাভবান হয়, আখেরাতেও লাভবান হয়। এই যে বলা হয়ে ধর্মপ্রাণ মানুষের ঈমান। আমরা এ কথার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করি। আগে বলুন ধর্মপ্রাণ কী? ধর্ম যাদের প্রাণের মধ্যে তারাই ধর্মপ্রাণ। আজ মুসলমান জনগোষ্ঠীর কাছে ধর্ম বলতে নামাজ, রোজা, পূজা, ঈদ, মিলাদ, ওয়াজ, ধ্যান, যিকির-আজকার ইত্যাদি। ধর্ম কি এগুলো? না। মানুষের প্রকৃত ধর্ম হচ্ছে মানবতা, মনুষ্যত্ব। এটি যার নেই সে ধার্মিক নয়, নামাজ রোযা যতই করুক না কেন। প্রতিটি ধর্মের এ উদ্দেশ্য, মানুষের দুঃখ দুর্দশা, অন্যায়-অবিচার, শ্রেণি-বৈষম্য দূর করে একটি শান্তিময় সমাজ নির্মাণের পথনির্দেশ দান করা। মানবতা বাদ দিয়ে ধর্ম নেই, এটাই ধর্মের আত্মা, এই আত্মাকে বাদ দিলে ধর্ম মৃত। আজ আমরা পৃথিবীতে যে ধর্মগুলো দেখছি সব মৃত, উপাসনা সর্বস্ব। এ কথা আমরা সকল ধর্মগ্রন্থ থেকে প্রমাণ করেছি। মানুষ যখন ধর্মের আত্মার সন্ধান অর্থাৎ মানবতাবোধ ফিরে পাবে তখন সে আর অন্যের বিপদ দেখে চোখ বুঁজে থাকবে না, সে ধর্ম দ্বারা তাড়িত হয়ে ছুটে যাবে- ঠিক যেভাবে এখন সে ধর্মীয় অনুভূতি দ্বারা তাড়িত হয়ে মসজিদে-মন্দিরে ছুটে যায়, মক্কা-মদিনায় ছুটে যায়। সে অন্যায়ের প্রতিবাদ করবে। সে বুঝতে পারবে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোই আসল এবাদত। আমরা ধর্মের এই সঠিক রূপ আবার তুলে ধরছি। অথচ আমাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয় আমরা মানুষের ঈমান নষ্ট করছি।
কেন আসছে এই অভিযোগ? কারণ আমাদের কথাগুলো ধর্ম সম্পর্কে প্রতিষ্ঠিত ভুল ধারণাগুলোকে চুরমার করে দেয়। এটাকেই বলা হচ্ছে- ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়া। এটা তো সবযুগেই হয়েছে। সকল নবী-রসুলই তাঁর সমসাময়িক বিকৃত ধর্মের ধারক বাহকদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দিয়েছেন এবং তাদের দ্বারা নির্যাতিত হয়েছেন, বাধাগ্রস্ত হয়েছেন। ঈমান নষ্ট করে দেওয়ার অভিযোগ স্বয়ং আমাদের নবী মোহাম্মদ (দ.) এর বিরুদ্ধেও উঠেছিল। আল্লাহর অশেষ শোকর, এ অভিযোগটি আমাদের বিরুদ্ধেও করা হয়। এ বিষয়ে আমাদের কথা হচ্ছে, বাংলাদেশের সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কিছু করা হলে তার সমালোচনা হবে এটা যেমন স্বাভাবিক, তেমনি স্রষ্টার দেওয়া সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কিছু বললে বা আচার-আচরণ করলে, সেটারও সমালোচনা করা স্বাভাবিক এবং করা কর্তব্য। আমরা সেটাই করছি। আমরা শত শত বিষয়ে প্রমাণ দিচ্ছি যে ধর্মব্যবসায়ীরা যা বলছেন ও করছেন তা আল্লাহর সংবিধান তথা কোর’আন হাদিসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তারাই ঈমানদার মানুষকে দিয়ে অবৈধ করা করাচ্ছে, তাদেরকে জাহান্নামের দিকে চালিত করছে। তাদের কাজের ফলে মানুষ ধর্মের থেকেই মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে, আল্লাহ-রসুলকে গালাগালি করছে। সুতরাং আমরা ধর্মের অবমাননা করছি না, অবমাননা থেকে ধর্মকে রক্ষা করতে চাইছি। ধর্মবিশ্বাস বা ঈমানকে জাতীয় উন্নতি ও অগ্রগতিতে কাজে লাগাতে চাইছি।
প্রশ্ন: আজ আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আছে বলে তাদের সাথে কাজ করছেন। আগামী দিন আওয়ামী লীগ ক্ষমতা থেকে নামলে তাদের বিরুদ্ধে যে যাবেন না তার নিশ্চয়তা কি?
উত্তর: দেখুন আমাদের কথা হলো আমরা এই ষোলো কোটি মানুষকে যে ধর্মব্যবসার বিরুদ্ধে যে ঐক্যবদ্ধ করতে চাই এ কাজটা আমাদের একার পক্ষে সম্ভব নয়। এটা একটা জাতির কাজ, জাতিগত কাজ। জাতির কর্ণধার হিসাবে আমরা সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গকে আমাদের মিটিংগুলোতে আমন্ত্রণ জানিয়েছি, যেন তারা এই কাজের গুরুত্ব বুঝে সেটাকে বাস্তবায়ন করতে উদ্যোগী হন। এক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ না হয়ে যে কোনো সরকার থাকলেও এটাই করতাম। আমরা তাদেরকে আমন্ত্রণ জানিয়ে, চিঠি দিয়ে, আলোচনা করে সর্ব উপায়ে বোঝাতে চেয়েছি যে, দেশের ষোলো কোটি মানুষ যদি দাঙ্গা হাঙ্গামার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়, তারা যদি সর্বপ্রকার সহিংসতার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোকে ধর্মীয় দায়িত্ব বলে মনে করে তাহলে ধর্মব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম আর থাকবে না, ধর্মের অপব্যবহার বন্ধ হবে, মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে বাস করতে পারবে, আইন শৃঙ্খলা উদ্ধার হবে, মানুষের উন্নতি অগ্রগতি হবে। এতে সরকারের জনপ্রিয়তাও উদ্ধার হবে, সরকারেরই এখানে সম্মান বাড়বে। আবার সরকারি দল হিসাবে আওয়ামী লীগকেও বলছি যে, আপনারা ৬৫ বছরের পুরানো একটি ঐতিহ্যবাহী রাজনীতিক দল। ১৯৭১ সালের মত একটা যুদ্ধ পরিচালনা করার অভিজ্ঞতা আপনাদের রয়েছে। ৭০ সালের নির্বাচনে দেশের আপামর জনসাধারণ আপনাদেরকে একটা শান্তিপূর্ণ দেশ গঠনের জন্য সমর্থন দিয়েছিল। পাকিস্তানি শাসকদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপনারা আন্দোলন করেছেন, যুদ্ধ করেছেন। এখনও আপনারা ক্ষমতায় আছেন। কাজেই জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার দায়িত্ব ও কর্তব্য কিন্তু আপনাদের উপর বর্তায়। আপনাদেরকেও কিন্তু প্রচুর নাস্তিক্যবাদের অপবাদ দেওয়া হয়েছিল, যেজন্য আপানাদের জনপ্রিয়তা ব্যাপকভাবে বিনষ্ট হয়েছে। কাজেই আপনারা যদি ধর্মের প্রকৃত শিক্ষাটা মানুষের সামনে তুলে ধরতে পারেন তখন আপনারা সবদিক দিয়েই লাভবান হবেন, জাতিও লাভবান হবে। এর বিনিময়ে আমরা আওয়ামী লীগের থেকে একটি পয়সাও আসা করি না, দিলেও নেব না। কোনো রাজনীতিক স্বার্থও আমাদের নেই, তাদের ক্ষমতার অংশীদার হওয়ারও শখ আমাদের নেই। এই দেশের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা আছে, সেই দায়বদ্ধতা থেকে আমরা দেশ ও জাতির কল্যাণে এগিয়ে এসেছি, কারণ দেশের সঙ্কট সমাধান করার উপায় আমাদের কাছে আছে। আমাদের এ অনুভূতিটা অনেক আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী ভালো দৃষ্টিতে দেখেছেন এবং আমাদের কাজে সহযোগিতা করেছেন। এখন যুগটাই এমন যে, কেউ যে নিঃস্বার্থভাবে মানুষের ভালোর জন্য কোনো কাজ করবে সে কল্পনাই কেউ করতে পারে না। করতে গেলে তাকে সন্দেহ করা হয় যে নিশ্চয়ই কোনো না কোনো মতলব আছে। আমরাও এমনই সন্দেহের শিকার। আমাদের অনুষ্ঠানে আসার আগে প্রধান ও বিশেষ অতিথিদের মনে সন্দেহ ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। সন্দেহ করলে তো কতকিছুই ভাবা যায়। এমনিভাবেই সন্দেহ করা হচ্ছে যে, আজ আমরা আওয়ামী লীগ সরাকারের সঙ্গে আছি, কাল তারা তারা ক্ষমতায় না থাকলে তাদের বিরুদ্ধে চলে যাব। এটা বলতে পারতেন যদি আওয়ামী লীগের সঙ্গে আমাদের কোনো স্বার্থের সম্পর্ক থাকত। সেটা যখন নেই, তখন আমরা এটুকু বলতে পারি, আমরা যে সত্য নিয়ে দাঁড়িয়েছি যারা এর সাহায্যকারী হয়েছে এবং সাহায্যকারী থাকবে তাদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক কেবল এ জগতেই নয়, পরজগতেও বজায় থাকবে এনশা’আল্লাহ। এখানে দল কোনো ফ্যাক্টর নয়, আদর্শটা ফ্যাক্টর।
আমরা গত কুড়ি বছর ধরে কাজ করে যাচ্ছি। এই কুড়ি বছরে সরকার কিন্তু পরিবর্তন হয়েছে কয়েকটা। তত্ত্বাবধায়ক সরকারও এসেছে, সামরিক সরকারও এসেছে, দুইদলও ক্ষমতায় ক্ষমতায় এসেছে, আমরা সকলের সঙ্গেই কাজ করেছি। জঙ্গিবাদ মোকাবেলার ক্ষেত্রে সরকারকে সহযোগিতা করার প্রস্তাবনা যখন এমামুয্যামান দিয়েছিলেন তখন ২০০৮ সন। তখন কি আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ছিল? ছিল না। আরেকটা কথা হলো, বিভিন্ন মহল থেকে সরকারকে আমাদের বিষয়ে ভুল বুঝানো হয়, যার জন্য আমাদের কাজ বাধাগ্রস্ত হয়। এজন্য যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক আমরা তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে থাকতে চাই যেন কেউ তাদেরকে ভুল বুঝিয়ে আমাদের কাজকে বাধাগ্রস্ত না করতে পারে।

আমাদের প্রথম কথা হল এই যে অন্য ধর্মের নবী রাসুল অবতার বা ধর্মগ্রন্থগুলিকে নিয়ে যারা ব্যঙ্গচিত্র আঁকে বা চলচ্চিত্র বানায়, এই কাজগুলো যারা করে আমরা মনে করি তারা আসলে সুস্থ মানুষ না। তারা সমাজের শত্র“ মানবতার শত্র“। যে কারও বাবা-মাকে নিয়ে অশোভন উক্তি করলে মানুষ তাতে ক্ষুব্ধ হবে এটা যেমন যুক্তিযুক্ত তেমনি প্রাণাধিক প্রিয় নবীকে নিয়ে কটূক্তি করলেও যারা তাঁর অনুসারী তাদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হবে, এটাও যুক্তিযুক্ত। তবুও যারা এটা করে তারা মূলত একটি দাঙ্গাময় পরিস্থিতি সৃষ্টির হীন উদ্দেশ্যে কাজটি করে। পরে যখন কেউ সহিংসতা ঘটিয়ে ফেলে তখন পুরো মুসলিম জাতির উপর সন্ত্রাসের লেবেল এঁটে দেওয়া হয়। একটি ঘটনা যখন ঘটে তখন সেটা চলে যায় রাজনৈতিক ধান্ধাবাজদের নিয়ন্ত্রণে, তারা এর থেকে ফায়দা লোটার চেষ্টা করে। আমাদের কথা হচ্ছে, ভিন্ন ধর্মের কোনো বিষয় নিয়ে কারো বক্তব্য থাকলে সেটাকে যৌক্তিক তথ্য উপাত্ত ইতিহাস দিয়ে তুলে ধরার সব পথ খোলা আছে। কিন্তু তা না করে এভাবে কটাক্ষ করা হয় শুধুমাত্র একটি ইস্যু সৃষ্টির জন্য। শার্লি হেবদো পত্রিকাটি ছিল পেছনের সারির একটি অখ্যাত সাপ্তাহিক, সেটার নাম এখন বিশ্বের সবাই জানে, ৬০ লক্ষ কপি ছাপা হয়। এটাই হল ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক স্বার্থে ধর্মের অপব্যবহার। আমরা এসব কাজের তীব্র প্রতিবাদ ও নিন্দা জানাই।
পক্ষান্তরে যারা রসুলাল্লাহকে অপমান করলেই ফুঁসে উঠে হামলা চালিয়ে বসেন তাদেরকে আমরা রসুলাল্লাহর জীবনাদর্শ স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। রসুলাল্লাহর আড়ালে নয় একেবারে সামনে গালাগালি করা হয়েছে শত শতবার, তাঁর গায়ে থুথু ছেটানো হয়েছে, তাঁর পিঠে উটের নাড়ি-ভুঁড়ি চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, তাঁকে মুরতাদ, কাফের, পাগল, জাদুকর, মিথ্যাবাদী ইত্যাদি বলে অপবাদ প্রচার করা হয়েছে। আল্লাহর রসুল কি পারতেন না তাঁর আসহাবদেরকে নির্দেশ দিয়ে রাতের অন্ধকারে আবু জেহেল, আবু সুফিয়ানের বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দিতে, বা তাদেরকে চোরাগোপ্তা হামলা চালিয়ে হত্যা করে ফেলতে? অবশ্যই পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেন নি, তিনি দীর্ঘ ১৩ বছর অত্যাচারিত, নির্যাতিত হয়েও যুক্তি দিয়ে মানুষকে বুঝিয়ে গেছেন যে, আল্লাহর হুকুম ছাড়া আর কারও হুকুমে শান্তি আসবে না। এক সময় সত্যিই তাঁর আহ্বান মানুষ মেনে নিল, একদিন যারা তাঁর বিরোধিতা করেছে তারাই নবীর ডান হাত বাঁ হাতে পরিণত হলো। জোর করে রাষ্ট্রশক্তি দখল করার মধ্যে কোনো কৃতিত্ব নেই, সেখানে শান্তি আসে না। বার বার বিদ্রোহ হয়। কিন্তু মন জয় করার মধ্যে কৃতিত্ব আছে। রসুলাল্লাহ সেটা করেছিলেন, এজন্য আজও তাঁর জন্য মানুষ জীবন দিতে প্রস্তুত, আর ঐ আবু জেহেলদের বংশ নির্বংশ হয়ে গেছে। এই সত্যটি এসব জঙ্গিবাদীদেরকে বুঝতে হবে যে তারা রসুলাল্লাহর প্রতি ভালোবাসা প্রদর্শন করতে গিয়ে যা করছেন তাতে না ইসলামের কোনো উপকার হচ্ছে, না উম্মাহর কোনো উপকার হচ্ছে। উল্টো বিক্ষোভ দেখাতে গিয়ে দেশে দেশে মুসলমানরা নিজেদের বাসে ট্রেনে আগুন দিয়ে নিজেদের স¤পদই ধ্বংস করে ফেলছে, নিজের পায়ে কুড়াল মারা আর কাকে বলে? এর চেয়ে বড় মূর্খতা আর কী হতে পারে। সুতরাং এটা সঠিক পন্থা নয়। আগে তাদের নিজেদেরকে সত্যের পক্ষে, হকের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ হওয়া উচিত। তারপর প্রতিপক্ষের এ মন্তব্যগুলিকে যুক্তি দিয়ে ন্যায়সঙ্গতভাবে প্রতিহত করা, মিথ্যা অভিযোগ খ-ন করা। সাম্প্রদায়িক উস্কানি দেওয়া যেহেতু প্রচলিত আইনেও বৈধ নয়, যারা এমন কাজ করবে তাদের বিরুদ্ধে আইনের আশ্রয়ও নেয়া যেতে পারে।
এই মুসলমানরা যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী বিক্ষোভ করে মুসলিম দেশে আগ্রাসন চালানোর প্রতিবাদে। কিন্তু তারা নিজেরাই যে নিজেদেরকে ধ্বংস করছে গত ১৩০০ বছর ধরে, এর সমাধান কে করবে? সিরিয়াতে কে কাকে মারছে, ইরাকে কে কাকে মারছে? সেখানে তো মুসলমান মুসলামনের বুকে গুলি চালাচ্ছে। সেখানে তো পাশ্চাত্য আগ্রাসন বর্তমানে নেই। গত দুই বছরে সিরিয়াতে মারা গেল ২ লক্ষ ২০ হাজার মুসলমান। এই শিয়া বনাম সুন্নি দাঙ্গায় ইরাকে, আফগানিস্তানে, পাকিস্তানে কত কোটি মানুষ মারা গেছে আজ পর্যন্ত তার ইয়ত্তা নেই। এই সন্ত্রাসবাদীদের প্রতি কথা হচ্ছে, আগে দয়া করে ১৬০ কোটি মুসলিম জাতির মধ্যে প্রাণ সঞ্চার করুন, শিয়া-সুন্নি, হানাফি-হাম্বলী নিয়ে হানাহানি বন্ধ করুন, সবাইকে নিয়ে একটি ই¯পাতকঠিন ঐক্যবদ্ধ জাতি গড়ে তুলুন, দেখবেন এসব কার্টুন আঁকা এমনিতেই বন্ধ হয়ে যাবে। এই জাতিটি ১৪০০ বছর আগে যখন একটি অখ- জাতি ছিল তখন কি কেউ রসুলাল্লাহর বিরুদ্ধে কটূক্তি করার সাহস পেত? এটা হচ্ছে কবিগুরুর ভাষায়, নির্বিষ সর্পের ব্যর্থ ফনা আস্ফালন।
অনেকে অভিযোগ করেন, আমরা হেযবুত তওহীদ কেন কোনো প্রতিবাদ, বিক্ষোভ করি না? করি না, কারণ আমাদের দৃষ্টি এগুলো অন্তঃসারশূন্য ও অর্থহীন। ১০০ বছর আগেও রসুলাল্লাহর নামে বহু অপপ্রচার করা হয়েছে, তখনো অনেক বিক্ষোভ হয়েছে। এখনো হয়। এসব করে কি অপপ্রচার কমেছে? না। বরং আরো বেড়েছে। তাই এ পথে আরো হাজার বছর চেষ্টা চালিয়ে লাভ হবে না, উল্টো ক্ষতি হবে। আমরা মনে করি, সত্যটা তুলে ধরা, সত্যের পক্ষে মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করাই আমাদের মুখ্য কর্তব্য। আর যারা ধর্মব্যবসা করেন তাদের তো রসুলাল্লাহর পবিত্র নামই মুখে আনা উচিত নয়। যে কাজ আল্লাহ হারাম করেছেন তারা সেটাকেই ধর্ম বানিয়ে নিয়েছেন। তারা যখন রসুলাল্লাহকে অবমাননা করার প্রতিবাদ করে সেটাকে বক ধার্মিকতা আর নিজেদের জাহির করার চেষ্টা ছাড়া আর কিছুই আমরা মনে করি না।