প্রশ্ন-উত্তর Archives | Page 3 of 10 | হেযবুত তওহীদ

প্রশ্ন-উত্তর

প্রথমেই একটি বিষয় জেনে রাখা প্রয়োজন যে, ইসলাম হলো একটি সত্য জীবনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা ও প্রয়োগের ফলে আর্থ-সামাজিকভাবে দৃশ্যমান শান্তিময় অবস্থা। যেই দ্বীন বা জীবনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা ও প্রয়োগের ফলে শান্তি আসবে সেটাই ইসলাম, আর যেটা অশান্তি সৃষ্টি করবে তা ইসলাম নয় অর্থাৎ আল্লাহর মনোনীত নয়। আল্লাহ তাঁর দীন মানবজাতির প্রতি নাযেল করেছেন একটি মাত্র কারণে, আর তা হলো- মানবজাতি যেন অন্যায় অবিচার থেকে বেঁচে একটি শান্তিপূর্ণ, প্রগতিশীল সমাজে জীবনযাপন করতে পারে। তাই এই দীনের প্রতিটি আদেশ মানুষের সুখের জন্য এবং প্রতিটি নিষেধ মানুষকে ক্ষতি থেকে, অশান্তি থেকে রক্ষা করার জন্য। এমন কোন আদেশ বা নিষেধ ইসলামে থাকা সম্ভব নয় যেটার সঙ্গে মানুষের ভালো মন্দের কোন সম্পর্ক নেই। যে জিনিস বা যে কাজ মানুষের জন্য অপকারী তা-ই আল্লাহ নিষেধ করেছেন। এই আলোকে আমাদের জানা দরকার, ভাস্কর্য নির্মাণ বা চিত্রাঙ্কন আমাদের জন্য ক্ষতিকর কিনা। এখানে আমাদেরকে একটি বিষয় আরও পরিষ্কার হতে হবে যে, প্রতিমা আর ভাস্কর্য কিন্তু এক নয়। প্রতিমাকে পূজা করা হয়, তার কাছে প্রার্থনা করা হয়। এছাড়া প্রতিমাকে ভাগ্যবিধাতা, রিজিকদাতা, শক্তিদাতা এমনকি এলাহ বা হুকুমদাতার আসনেও বসানো হয়, যা স্পষ্ট শেরক। প্রতিমা নির্মাণের ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, অতীতে যে সমাজেই মূর্তিকে বিধাতার আসনে বসানো হয়েছে সে সমাজ পরিচালিত হয়েছে মূর্তিগুলোর পুরোহিতদের সিন্ধান্ত বা ফতোয়া দ্বারা। পুরোহিতদের প্রতিটি সিদ্ধান্ত ধর্মের বিধান বলে স্বীকৃত হয়েছে। বিভিন্ন পুরোহিত বিভিন্ন বিধান, আইন-কানুন, দ-বিধি রচনা করেছে এবং প্রয়োগ করেছে, যাকে কেন্দ্র করে বিবিধ অন্যায়, অবিচার, অশান্তির জন্ম হয়েছে। এ কারণে প্রতিমাপূজা ইসলামে নিষিদ্ধ। অপরদিকে ভাস্কর্য একটি প্রাচীনতম শিল্পকলা। একটি জাতির ইতিহাস-ঐতিহ্য, শিল্পকলা, রুচিবোধের নিদর্শন হিসেবে এটি ব্যবহৃত হয়, যার কোনো ক্ষতিকর প্রভাব নেই। বরং এই ভাস্কর্য শিল্পের দরুন হাজার হাজার বছর পূর্বের বিভিন্ন সভ্যতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া আজ সহজ হচ্ছে। সুতরাং ইসলামে ভাস্কর্য নিষিদ্ধ হবার কোনো কারণ নেই। এক কথায়- মানবতার জন্য ক্ষতিকর হওয়ায় কাঠ-পাথরের প্রতিমা ইসলামে নিষিদ্ধ, কিন্তু ক্ষতিকর না হওয়ায় কাঠ-পাথরের ভাস্কর্য নিষিদ্ধ নয়। কোনটা নিষিদ্ধ কোনটা বৈধ তার মানদ- হচ্ছে মানবতার কল্যাণ অথবা অকল্যাণ।
এখানে একটি বিষয় বলে রাখা দরকার- ইসলামে প্রতিমা নির্মাণ ও ব্যবহার নিষিদ্ধ বটে, তবে তার মানে এই নয় যে, ইসলাম শক্তির জোরে প্রতিমাধ্বংসকে জায়েজ করছে। এমন ধারণা করা ভুল হবে। ইসলামের নীতি হলো ধর্মবিশ্বাসের উপর জোর-জবরদস্তি করা চলবে না। ব্যক্তিগতভাবে মুশরিকরা প্রতিমাপূজা করতে পারে তাতে কারও বাধা দেবার অধিকার নেই। প্রশ্ন করতে পারেন- তাহলে রসুলাল্লাহ ক্বাবাঘরের মূর্তি ভেঙেছিলেন কেন? রসুলাল্লাহ মক্কা বিজয়ের দিন কাবাঘরে অবস্থিত মূর্তি ভেঙেছিলেন। এর কারণ প্রথমত, সেগুলি ছিলো লাত, মানাত, উজ্জা, হোবল ইত্যাদির মূর্তি। আরবের গোত্রগুলি পরিচালিত হতো এই মূর্তিগুলির পুরোহিতদের সিদ্ধান্ত বা ফতোয়া দ্বারা। পুরোহিতদের প্রতিটি সিদ্ধান্ত ধর্মের বিধান বলে স্বীকৃত হতো। এই মূর্তিগুলিকে কেন্দ্র করে তাদের নিজস্ব আইন কনুন, দ-বিধি ইত্যাদি প্রয়োগ করত। অর্থাৎ এক কথায় ঐ মূর্তিগুলিকে তারা বিধাতার আসনে এবং সমাজ পরিচালক বা এলাহের আসনে বসিয়েছিল, যাকে কেন্দ্র করে বিবিধ অন্যায়, অবিচার, অশান্তির জন্ম হতো। কাজেই মহানবী (দ.) এ সমস্ত গুঁড়িয়ে দিয়েছেন। দ্বিতীয়ত, ক্বাবাঘর হচ্ছে পৃথিবীর বুকে আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণার জন্য পবিত্রতম স্থান, যা আল্লাহ নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। এমন স্থানে সত্য বিরোধীদের কোনো অবৈধ কার্যক্রম চলতে পারে না। কাজেই এই গৃহের মর্যাদা ও পবিত্রতা রক্ষাও মূর্তিধ্বংসের অন্যতম কারণ ছিল। কিন্তু আমরা যদি তার পরের ইতিহাস দেখি অর্থাৎ সাহাবায়ে কেরাম যখন সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে আল্লাহর সত্যদীন প্রতিষ্ঠার জন্য দুনিয়ার বুকে বেরিয়ে পড়েছেন তখন যে সমস্ত এলাকা বিজীত হয়েছিল, ঐ সমস্ত স্থানে অন্যধর্মের লোকদের উপাস্য মূর্তি, ধর্ম উপাসনালয় ধ্বংস করেছেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায় না। বরং কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনায় যদি বিধর্মীদের কোন মূর্তির অঙ্গহানীও হয়ে থাকে, সাহাবীরা সেগুলিও মেরামত করে দিয়েছেন। ঐ সমস্ত এলাকার মূর্তিগুলি আর জাতীয় পর্যায়ে বিধাতার আসনে অধিষ্ঠিত ছিলো না কাজেই ঐগুলি ভাঙ্গার প্রয়োজন পড়ে নি। অর্থাৎ ইসলামের নীতি হলো জাতীয়ভাবে চলবে আল্লাহর হুকুম ব্যক্তিগতভাবে যে যার বিশ্বাস স্থাপন করুক তাতে কোনো আপত্তি নেই। ব্যক্তিগত ধর্মবিশ্বাস পরিবর্তনে কোনরূপ জোরাজুরি চলবে না। এক কথায় ইসলামের নীতি হলো- রাষ্ট্র চলবে সত্য ও ন্যায়ের ভিত্তিতে, কিন্তু ব্যক্তিকে তার ইচ্ছার উপর (ধর্মবিশ্বাসের ব্যাপারে) ছেড়ে দিতে হবে। সুতরাং বর্তমানে যারা ইসলামের ধুয়া তুলে ভিন্নধর্মাবলম্বীদের মূর্তি ধ্বংস করছে, এমনকি চূড়ান্ত অজ্ঞতা ও মূর্খতার পরিচয় দিয়ে বহু মূল্যবান ঐতিহাসিক ভাস্কর্য গুড়িয়ে দিচ্ছে তারা সম্পূর্ণ ইসলামপরিপন্থী কাজ করছে সন্দেহ নেই। এর জন্য তাদেরকে আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে।

আমাদের সমাজে শিল্প ও সংস্কৃতির পথেও সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ধর্মের অপব্যাখ্যা। আমাদের সমাজে যারা সাংস্কৃতিক কর্মকা-ে অংশগ্রহণ করছেন তাদের অনেকের মধ্যেই একটা দ্বিধা ও অপরাধবোধ আজীবন কাজ করে। কেননা তারা মনে করেন যে, তারা খুব গোনাহের কাজ করছেন। ফলে প্রতিভার পূর্ণ বিকাশ হচ্ছে না।
আবার অনেক সংস্কৃতিমনা মানুষ ধর্মের নামে চলা কূপম-ূকতাকে মেনে নিতে না পেরে ধর্ম বিদ্বেষী হয়ে গেছেন। তারা দেখছেন ধর্মান্ধরা কীভাবে বোমা মেরে সুপ্রাচীন নান্দনিক ভাস্কর্যগুলো গুড়িয়ে দিচ্ছে, সঙ্গীতানুষ্ঠানে, সিনেমা হলে বোমা হামলা করছে। এসব দেখে ধর্মবিদ্বেষীরা ধর্মকেই গালাগালি করছেন ব্লগে, পত্রিকায়, চলচ্চিত্রে, যা ধর্মপ্রাণ মানুষকে আহত করছে, ধর্মব্যবসায়ীরাও পেয়ে যাচ্ছে দাঙ্গা সৃষ্টি করার সুযোগ। তারা খোদ চলচ্চিত্র, ব্লগ ও শিল্পমাধ্যমকেই প্রতিপক্ষে পরিণত করছে।
এ বিষয়ে হেযবুত তওহীদের বক্তব্য হচ্ছে, বিজ্ঞান, সংস্কৃতি বা শিল্প যে কোনো কিছুরই ভালো-মন্দ নির্ভর করে তার ব্যবহারের উপর। শিল্পের নামে অশ্লীলতা, মিথ্যা ও অন্যায়ের প্রসার শুধু ধর্মে নয় বিশ্বের সমস্ত আইনেও নিষিদ্ধ হওয়ার দাবি রাখে, কিন্তু সুস্থধারার শিল্পচর্চা নিষিদ্ধ হওয়ার কোনো কারণ নেই।
আল্লাহর রসুল কি সঙ্গীত, শিল্প-সাহিত্যের প্রতি বিরূপ ছিলেন? না, ইতিহাসের এই ব্যস্ততম মহামানব যাঁর নবী জীবনের প্রায় প্রতিটি মুহূর্ত কেটেছে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রামে, তাঁর পক্ষে শিল্পচর্চায় মেতে থাকা সম্ভব ছিল না। তথাপি এত ব্যস্ততার মধ্যেও তিনি গান শুনেছেন। আরবের বিভিন্ন ঐতিহাসিক দিবসে, বিবাহে, যুদ্ধে সর্বত্র গানের চর্চা ছিল, রসুলাল্লাহ সেগুলোকে উৎসাহিত করেছেন। মিনার এক উৎসবের দিন আবু বকর (রা.) আম্মা আয়েশার (রা.) ঘরে এসে দেখেন দু’টি মেয়ে দফ বা তাম্বুরা সহযোগে গান গাইছে। নবীগৃহে গান-বাজনা দেখে আবু বকর (রা.) কন্যা আয়েশাকে তিরস্কার করতে আরম্ভ করলেন। তখন মহানবী বললেন, ‘আবু বকর! ওদেরকে বিরক্ত করো না, আজ ওদের উৎসবের দিন (বোখারি, মুসলিম)। এমন কি আল্লাহর রসুল নিজে একজন আনসার সাহাবির বিয়ের আসরে গায়ক রাখার হুকুম দিয়েছেন, কেননা আনসারেরা ছিলেন গোত্রীয়ভাবে সঙ্গীতপ্রিয়। অথচ বর্তমানে কেবল হামদ-নাত জাতীয় সঙ্গীত গাওয়াকেই আলেমগণ বৈধ বলে মনে করে থাকেন। তাদের কাছে স্বাধীনতা দিবস, একুশে ফেব্র“য়ারি বা পহেলা বৈশাখের গান দূরে থাক, কোনো ধর্মীয় অনুষ্ঠানের সঙ্গে জাতীয় সঙ্গীতও সঙ্গতিপূর্ণ নয়।
কোন ধর্মই শিল্পকলাকে নাজায়েজ করতে পারে না। কেননা স্বয়ং স্রষ্টাই সুর ও নৃত্যকলা সৃষ্টি করেছেন। প্রজাপতির ডানায় তিনি এঁকেছেন মনোমুগ্ধকর আল্পনা। শেষ প্রেরিত গ্রন্থ আল কোর’আনকে আল্লাহ পাঠিয়েছেন ছন্দবদ্ধ করে। কেবল কোর’আন নয়, যবুর, গীতা, পুরান, ত্রিপিটক ইত্যাদি ধর্মগ্রন্থও আল্লাহ পাঠিয়েছেন কাব্যময় কোরে। গীতা শব্দের অর্থই তো গান। অনেক আলেম মনে করেন, ইসলামী গান করা বৈধ হলেও সেটা বাদ্য বাজিয়ে গাওয়া যাবে না। কিন্তু ইমাম আবু হামিদ আল-গাজ্জালী তাঁর ‘এহইয়াও উলুমদ্দিন’ নামক গ্রন্থে লিখেছেন, “কোকিলের সুর শোনা যেমন হারাম নয়, তেমনি মানুষের ইচ্ছা মোতাবেক কণ্ঠ নিঃসৃত সুর শ্রবণ করাও হারাম নয়। প্রাণহীন যন্ত্রের সুর এবং প্রাণীর স্বর পৃথক নয়। মানুষের কণ্ঠ নিঃসৃত সুর, বিভিন্ন তারযন্ত্রের ওপর আঘাত বা ঘর্ষণজনিত আওয়াজ, দফ, তবলা বা অন্যান্য বাদ্যযন্ত্রের আওয়াজও হারাম নয়”।
আমাদের কথা হচ্ছে, একজন লেখকের কলমের কালী যদি শহীদের রক্তের চেয়ে পবিত্র হতে পারে তবে একজন গায়কের গান যদি মানুষকে মানবকল্যাণে আত্মদান করতে উদ্বুদ্ধ করে, তখন সে গান কেন এবাদত বলে গণ্য হবে না? তাই আল্লাহ যাদেরকে শিল্পপ্রতিভা দান করেছেন তাদেরকে এর হক আদায় করতে হলে এই গুণকে স্বার্থহাসিলের জন্য ব্যবহার না করে মানবতার কল্যাণে ব্যবহার করতে হবে।

আমাদের দেশের অনেক আলেম ও মুফতির দৃষ্টিতে চৈত্র সংক্রান্তি, পহেলা বৈশাখ, নবান্ন উৎসব ইত্যাদি উদ্যাপন করা প্রকৃতপক্ষে হিন্দুয়ানী সংস্কৃতি, শেরক ও বেদাত। তাদের জ্ঞানের প্রতি যথাযথ সম্মান রেখেই বলছি, এ বিষয়ে আমাদের কিঞ্চিৎ দ্বিমত রয়েছে। দু’টি দিক থেকে বিষয়টি উপস্থাপনের চেষ্টা করছি, (ক) ইসলামের আকীদা, (খ) শরিয়াহ।
ইসলাম এমন একটি জীবনব্যবস্থা যা সমগ্র মানবজাতির উপযোগী করে আল্লাহ রচনা করেছেন। এতে যে বিধানগুলো স্থান পেয়েছে সেগুলো কোনোটাই কোনো ভৌগোলিক সীমারেখা দ্বারা সীমাবদ্ধ নয়। প্রতিটি জনপদের মানুষের একটি নিজস্ব সংস্কৃতি থাকে যা তাদের ভৌগোলিক ও আর্থ-সামাজিক অবস্থার সঙ্গে সঙ্গতিশীল, যা গড়ে ওঠে হাজার হাজার বছরের ক্রমবিবর্তনের মাধ্যমে। ইসলাম কোনো বিশেষ অঞ্চলের সংস্কৃতিকে অন্য অঞ্চলের উপর চাপিয়ে দেয় নি, তেমনি কোনো আঞ্চলিক সংস্কৃতিকে নিষিদ্ধও করে নি। ইসলাম নিষিদ্ধ করেছে কেবল অশ্লীলতা, অন্যায় ও আল্লাহর নাফরমানিকে। সে বিচারে আমাদের দেশে আবহমান কাল থেকে চলে আসা নবান্ন উৎসব, চৈত্র সংক্রান্তি বা পহেলা বৈশাখ ইত্যাদি কোনো উৎসবই শরিয়ত পরিপন্থী হতে পারে না। তবে উৎসবের নামে যদি অশ্লীলতা, অপচয় ও অন্যায়ের বিস্তার ঘটানো হয়, সেটা অবশ্যই নিষিদ্ধ। কেননা তার দ্বারা মানবসমাজে অশান্তি সাধিত হবে এবং যা কিছুই অশান্তির কারণ তা-ই যে কোনো জীবনব্যবস্থায় নিষিদ্ধ হওয়ার দাবি রাখে। একজন বাংলাদেশি নেতা বাংলায় কথা বলবেন, বাঙালি পোষাক পরবেন এটাই স্বাভাবিক। তেমনি আল্লাহর শেষ রসুল আরবে এসেছেন, তাঁর আসহাবগণও আরবের মানুষ হিসাবে স্বভাবতই আরবীয় সংস্কৃতির পোষাক, ভাষা, আচার-আচরণ, রুচি-অভিরুচি, খাদ্যাভ্যাস অনুসরণ করতেন। কিন্তু এর সঙ্গে ইসলামের কোনো সম্পর্ক নেই। অথচ আমাদের সমাজে ইসলামী সংস্কৃতির নামে আরবীয় সংস্কৃতি চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। যেমন: ইসলামের অধিকাংশ আলেমদের সিদ্ধান্তমতে পুরুষের ছতর হলো নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত ঢাকতে হবে। এখন কেউ যদি ধুতি পরিধান করে তাহলেও কিন্তু তার ছতর আবৃত হয়। কিন্তু ধুতি পরাকে কি আলেমরা ইসলামী সংস্কৃতি বলে মেনে নেবেন? না। তারা চান মানুষকে তেমন জোব্বা পরাতে যেটা আরবের লোকেরা পরে থাকেন।
বাংলার নিজস্ব সংস্কৃতি বলতে কৃষি সংস্কৃতিই বোঝায়। বাংলার কৃষক ধর্মে হিন্দু বা মুসলিম যেটাই হোক, তার জীবনের আনন্দ, বেদনা, উৎসব, আশা-নিরাশার সঙ্গে ফসল ও ফসলী বছরের নিবিড় বন্ধন থাকবে এ কথা সাধারণ জ্ঞানেই বোঝা যায়। তাই চৈত্রসংক্রান্তি, পহেলা বৈশাখ, নবান্ন উৎসব ইত্যাদি কৃষিনির্ভর বাঙালির জীবনমানের মানদ-।
আসুন দেখা যাক এই উৎসবগুলো কি ইসলামের দৃষ্টিতে বৈধ না অবৈধ? শরিয়তের মানদ- হচ্ছে, আল্লাহ নির্দিষ্টভাবে যে বিষয় বা বস্তুগুলোকে হারাম করেছেন তার বাইরে সবই হালাল বা বৈধ। এছাড়া কোনো বিষয় (যেমন একটি উৎসব) হালাল না হারাম তা নির্ভর করে তার উদ্দেশ্য ও ফলাফলের উপর। কোনো কাজের উদ্দেশ্য বা পরিণতি যদি মানুষের অনিষ্টের কারণ হয় তাহলে সেটা কখনোই ইসলাম সমর্থন করে না। আর যদি তার উদ্দেশ্য হয় মানুষের কল্যাণ তাহলে একে হারাম ফতোয়া দেওয়ার কোনো কারণ থাকতে পারে না। আমরা পবিত্র কোর’আনে কৃষি-সংস্কৃতির দিবস উদ্যাপন প্রসঙ্গে আল্লাহর নীতিমালা জানতে পারি। আল্লাহ বলছেন, তিনিই লতা ও বৃক্ষ-উদ্যানসমূহ সৃষ্টি করেছেন এবং খেজুর বৃক্ষ, বিভিন্ন স্বাদ বিশিষ্ট খাদ্যশস্য, জলপাই ও ডালিম জাতীয় ফলও সৃষ্ট করেছেন। এইগুলো একে অন্যের সদৃশ এবং সাদৃশ্যহীন। যখন তা ফলবান হয় তখন তার ফল আহার করবে আর ফসল তোলার দিনে (ইয়াওমুল হাসাদ) এগুলোর হক প্রদান করবে এবং অপচয় করবে না। নিশ্চয়ই তিনি অপচয়কারীদেরকে পছন্দ করেন না (সুরা আন’আম, আয়াত- ১৪১)।
এ আয়াতে তিনটি শব্দ লক্ষণীয়, (ক) ফসল তোলার দিন, (খ) হক আদায় করা, (গ) অপচয় না করা। কোর’আনের প্রসিদ্ধ ইংরেজি অনুবাদগুলোতে (যেমন আল্লামা ইউসুফ আলী, মারমাডিউক পিকথল) ফসল তোলার দিনের অনুবাদ করা হয়েছে ঐধৎাবংঃ ফধু. আয়াতটিতে আমরা কয়েকটি বিষয় পাচ্ছি:
১. ফল বা ফসল তোলার দিন এর হক আদায় করতে হবে। সেই হক হচ্ছে- এর একটি নির্দিষ্ট অংশ হিসাব করে গরিব মানুষকে বিলিয়ে দিতে হবে। ফসলের এই বাধ্যতামূলক যাকাতকে বলা হয় ওশর।
২. যেদিন নতুন ফসল কৃষকের ঘরে উঠবে সেদিন স্বভাবতই কৃষকের আনন্দ হবে। যে কোনো আনন্দই পূর্ণতা পায় অপরের মধ্যে তা সঞ্চারিত করার মাধ্যমে। নতুন ফসল তোলার আনন্দের ভাগিদার যেন গরিবরাও হতে পারে সেজন্য তাদের অধিকার প্রদান করে তাদের মুখেও হাসি এনে দিতে হবে। কিন্তু আল্লাহ সাবধান করে দিলেন এই আনন্দের আতিশয্যে যেন কেউ অপচয় না করে।
আমাদের দেশে ফসল কাটার দিনে আনন্দ করা হয়, বিভিন্ন ফসলের জন্য বিভিন্ন পার্বণ পালন করা হয়। এ আয়াতের প্রেক্ষিতে দেখা গেল এই দিবসগুলোতে উল্লিখিত কাজগুলো করা ফরদ। কেবল ইসলামের শেষ সংস্করণ নয়, মুসা (আ.) এর উপর যে শরিয়ত নাজেল হয়েছিল সেখানেও আল্লাহ বলেন, “তুমি ফসল কাটার উৎসব অর্থাৎ ক্ষেতে যা কিছু বুনেছ তার প্রথম ফসলের উৎসব পালন করবে। বছর শেষে ক্ষেত থেকে ফসল সংগ্রহ করার সময় ফলসঞ্চয় উৎসব পালন করবে” (তওরাত: এক্সোডাস ২৩:১৬)। সুতরাং আল্লাহর হুকুম মোতাবেকই বিভিন্ন জনপদে বিভিন্ন আঞ্চলিক উৎসব প্রচলিত হয়েছে।
কিন্তু বর্তমানে যেভাবে দিবসগুলো পালিত হচ্ছে সেটাও সঠিক নয়। ক্রিসমাস, ঈদ, পূজা ইত্যাদি ধর্মীয় উৎসব হলেও বাস্তবে এগুলোর আসল উদ্দেশ্য ধর্মানুরাগ নয়, গরিবের মুখে হাসি ফোটানোও নয়। এগুলোর নিরেট উদ্দেশ্য বাণিজ্যিক স্বার্থ। পহেলা বৈশাখও তাই। এদিন একটি ৫০০ টাকার ইলিশের দাম হয়ে যায় ১০,০০০ টাকা, যা সেই দরিদ্র কৃষকের ধরাছোঁয়ার সম্পূর্ণ বাইরে থাকে। অপরপক্ষে যারা সারা বছর বার্গার, পিজা খায় তারা এই একদিন মাটির বাসনে পান্তা-ইলিশ খাওয়ার জন্য হা-পিত্তেশ করেন; যেন একদিনের মাতৃভক্তি, দিন শেষ ভক্তি শেষ। ব্যবসায়ী শ্রেণি ও মিডিয়ার প্রচারণায় ভুলে আমাদের তারুণ্যও উন্মাদনা আর অপচয়ে মত্ত হয়ে যাচ্ছে। বহিঃর্বিশ্বেও এমনই হচ্ছে। অস্ট্রেলিয়ার শিনচিলা শহরে প্রতিবছর উদযাপিত তরমুজ উৎসবে হাজার হাজার তরমুজের রস দিয়ে পিচ্ছিল পথ তৈরি করে তাতে স্কি করা হয়। বিভিন্ন দেশে আঙ্গুর, টমাটো ইত্যাদি নিয়েও অপচয়ের মহোৎসব হয়। কিন্তু আল্লাহ বলেছেন, “খাও, পান কর, কিন্তু অপচয় করো না।… হে রসুল! আপনি বলে দিন, কে হারাম করেছে সাজসজ্জা গ্রহণ করাকে–যা আল্লাহ তার বান্দাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন?” (সুরা আরাফ ৩১-৩২)। অর্থাৎ আনন্দ ফুর্তি, সাজগোজ করতে আল্লাহ নিষেধ করেন নি। এই মুহূর্তে পৃথিবীতে প্রায় এক বিলিয়ন মানুষ আছে যারা দুর্ভিক্ষপীড়িত, আমাদের দেশেও অধিকাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে অবস্থান করছে। এই মানুষগুলোর হক আছে আল্লাহ প্রদত্ত সকল ফল ও ফসলে, এই নবান্নে, পহেলা বৈশাখে, চৈত্রসংক্রান্তির পার্বণে। তাদের সেই হক আদায় করা হলেই এই উৎসব হবে পবিত্র দিন। উৎসব আর ঈদ আসলে একই কথা। উৎসবের নামে আজ অর্থের যে নিদারুণ অপচয় হচ্ছে, বাণিজ্যিক স্বার্থ হাসিল করা হচ্ছে তা না করে যদি আল্লাহর হুকুম মোতাবেক গরিব-দুখী মানুষকে তাদের অধিকার প্রদান করা হতো, তাহলে এ আনন্দ পূর্ণতা পেত, আর এই উৎসবগুলো এবাদতে পরিণত হতো।

এ প্রসঙ্গে বিস্তারিত বলা আগে দু’টি পূর্বসিদ্ধান্ত আমাদেরকে জানতে হবে –
(১) পারিবারিক জীবনের বিধান রাষ্ট্রে চলে না, উভয় অঙ্গনে আলাদা বিধান লাগবে।
(২) আল্লাহ বিধানের ভারসাম্য এর অপূর্ব বৈশিষ্ট্য। এই ভারসাম্য নষ্ট হলে ধর্ম অধর্মে পরিণত হয়।
মানবসমাজের ক্রমবিকাশের বিভিন্ন পর্যায়ে এবলিস প্ররোচনা দিয়ে এই দীনের ভারসাম্য বিনষ্ট করেছে। ফলে মানুষ ভুলে গেছে কার কি কর্তব্য ও স্রষ্টা নির্ধারিত দায়িত্ব। দায়িত্ব সুনির্দিষ্ট না থাকলে অশান্তি ও বিশৃঙ্খলা হতে বাধ্য, যেমন একটি ফুটবল টিমে মাঠের কে কোথায় খেলবে তা ঠিক করা থাকে। অন্যায় অবিচারে মানবজাতি ডুবে গেলে আল্লাহ কোন নবী রসুল পাঠিয়ে সেই ভারসাম্যকে ফিরিয়ে এনেছেন। বর্তমানের ইহুদি-খ্রিস্টান বস্তুবাদী সভ্যতা (দাজ্জাল) মানুষের জীবন থেকে সর্বপ্রকার নৈতিকতার শিক্ষাকে বিলুপ্ত করে দিয়েছে এবং স্রষ্টা ও আখেরাতের ধারণাকে উচ্ছেদ করে দিয়েছে। সেই সঙ্গে সমাজে নারী ও পুরুষের কার কী অবস্থান, কার কী দায়িত্ব ও কর্তব্য তা মানুষ একেবারেই ভুলে গেছে। সকল ধর্ম বিকৃত হয়ে যাওয়ার কারণে এ বিষয়ে স্রষ্টার দেওয়া মানদ-ও দুনিয়া থেকে হারিয়ে গেছে। প্রচলিত বিকৃত ইসলামে নারী পুরুষের সঠিক অবস্থান নিয়ে বিস্তর মতভেদ আছে। তবে সকল আলেমই “সুরা নেসার ৩৪ নং আয়াত”কে ভিত্তি হিসাবে উপস্থাপন করেন।
“আর রেজালু কাওয়্যামুনা আলান্নেসায়ী” – এ আয়াতটিকে ইসলামের বিরুদ্ধে অপপ্রচারের অন্যতম হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করা হয়। এ আয়াতটির অনুবাদ করা হয়, “পুরুষেরা নারীদের উপর কর্তৃত্বশীল এ জন্য যে, তারা তাদের অর্থ ব্যয় করে। সে মতে নেককার স্ত্রীলোকগণ হয় অনুগতা এবং আল্লাহ যা হেফাযতযোগ্য করে দিয়েছেন লোকচক্ষুর অন্তরালেও তার হেফাযত করে।” (সুরা নিসা: ৩৪)
দেখুন, আমরা একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষকে যে কাজের দায়িত্ব দেই, একজন শিশুকে তা দেই না। কারণ তাদের শারীরিক ও মানসিক অক্ষমতা ও সক্ষমতার তারতম্য। তারা উভয়েই একই পরিবারে থাকে কিন্তু উভয়ের কাজের ক্ষেত্র আলাদা। ঐ ফুটবল টিমের মত, সবাই মাঠেই আছে কিন্তু সবার দায়িত্ব আলাদা। পরিবার হচ্ছে মানবসমাজের ক্ষুদ্রতম সংগঠন। এই আয়াতে ইসলামে নারী ও পুরুষের সমন্বয়ে গঠিত পরিবারে কার কী অবস্থান, অধিকার ও কর্তব্য সে সম্পর্কে একটি মূলনীতি ঘোষিত হয়েছে। এই আয়াতে আল্লাহ পুরুষের ক্ষেত্রে বিশেষণ ব্যবহার করেছেন ‘কাওয়্যামুনা’। শাসক, কর্তৃত্বের অধিকারী, আদেশদাতা, ক্ষমতাশালী, নেতৃত্বের অধিকারী, অঁঃযড়ৎরঃু চড়বিৎ ইত্যাদি বোঝাতে আরবিতে আমীর, সাইয়্যেদ, এমাম, সুলতান, হাকীম, মালিক ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার করা হয়। আল্লাহ কোন যুক্তিতে এবং কোন ক্ষেত্রে পুরুষকে নারীর উপরে কর্তৃত্বশীল করেছেন তা এই ‘কাউয়ামুনা’ শব্দের মধ্যেই নিহিত রোয়েছে। কাউয়ামুনা শব্দের অর্থ হচ্ছে সুঠাম ও সুডৌল দেহবিশিষ্ট, মানুষের গঠন কাঠামো, ঠেক্না, পরিচালক, ব্যবস্থাপক, তত্ত্বাবধায়ক, অভিভাবক, শাসক, নেতা (আরবি-বাংলা অভিধান ২য় খ-, পৃ ৫৩১- ই.ফা.বা.)। সুতরাং এই আয়াতের মর্মার্থ হচ্ছে, পুরুষ শারীরিক দিক থেকে নারীর চেয়ে শক্তিশালী, তার পেশী, বাহু, হাড়ের গঠন, মেরুদ- এক কথায় তার দেহকাঠামো নারীর তুলনায় অধিক পরিশ্রমের উপযোগী, আল্লাহই তাকে রুক্ষ পরিবেশে কাজ করে উপার্জন করার সামর্থ্য বেশি দান করেছেন, তাই পুরুষের দায়িত্ব হলো সে পুরুষ শক্তি সামর্থ্য প্রয়োগ করে, কঠোর পরিশ্রম করে রোজগার করবে, মাথার ঘাম পায়ে ফেলে ভূমি কর্ষণ করে ফসল ফলিয়ে, শিল্পকারখানায় কাজ করে উপার্জন করবে এবং পরিবারের ভরণপোষণ করবে। এই শারীরিক বৈশিষ্ট্যের কারণেই পুরুষকে আল্লাহ নারীর তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব দিয়েছেন, নারীর অভিভাবক করেছেন। এটা মানব সমাজে বিশেষ করে পরিবারে পুরুষের বুনিয়াদি দায়িত্ব। অপরদিকে নারীদেরকে আল্লাহ সন্তান ধারণের উপযোগী শরীর দান করেছেন, সন্তানবাৎসল্য ও সেবাপরায়নতা দান করেছেন। তাই প্রকৃতিগতভাবেই তাদের মূল কাজ হচ্ছে সন্তানধারণ করা, তাদের লালন-পালন করা, রান্না-বান্না করা এক কথায় গৃহকর্ম করা। সংসদ বাঙ্গালা অভিধানে স্বামী শব্দের অর্থ দেওয়া হয়েছে পতি, ভর্তা, প্রভু, মনিব, অধিপতি, মালিক। আল্লাহর একটি সিফত হচ্ছে রাব্বুল আলামীন বা বিশ্বজগতের প্রতিপালক। আল্লাহ যেমন কোন প্রাণী সৃষ্টি করার আগেই তার রেজেকের বন্দোবস্ত করে রাখেন, কেবল আহার্য নয় জীবনোপকরণ হিসাবে তার যখন যা দরকার তাই তিনি নিরন্তর সরবরাহ করে যান। বিশ্বজগতে প্রতিপালক হিসাবে আল্লাহর যে ভূমিকা, একটি পরিবারে আল্লাহরই প্রতিভূ (খলিফা) হিসাবে পুরুষেরও অনেকটা সেই ভূমিকা, কিন্তু ক্ষুদ্র পরিসরে।
সালাহ বা নামাজ হচ্ছে উম্মতে মোহাম্মদী জাতিটির মডেল। এখানে প্রথম সারিতে পুরুষ এবং দ্বিতীয় সারিতে নারী। বাস্তব জীবনেও এই মডেলের রূপায়ণ ঘটা ইসলামের কাম্য। উপার্জন করা পুরুষের কাজ, তাই বলা যায় জীবিকার যুদ্ধক্ষেত্রে মেয়েরা দ্বিতীয় সারির সৈনিক। কখনও কখনও যদি অবস্থার প্রয়োজনে নারীকে প্রথম সারিতে গিয়ে জীবিকার লড়াইতে অবতীর্ণ হতে হয় সেটার সুযোগ আল্লাহ রেখেছেন। শোয়াইব (আ.) বৃদ্ধ হয়ে যাওয়ায় এবং তাঁর পুত্র সন্তান না থাকায় তাঁর দুই তরুণী কন্যা তাঁদের পশুপালের দেখাশোনা করতেন (সুরা কাসাস ২৩)। এছাড়া ইসলামের বিধান হলো স্বামীর উপার্জনের উপর স্ত্রীর অধিকার রয়েছে কিন্তু স্ত্রীর উপার্জনের উপর স্বামীর কোন অধিকার নেই। এখানেও নারীর উপার্জন করার অধিকারকে সম্পূর্ণরূপে স্বীকার করে নেওয়া হলো। রসুলাল্লাহর অনেক নারী আসহাব পরিবারে পুরুষ সদস্য না থাকায় বা পুরুষ সদস্যরা জেহাদে অধিক ব্যস্ত থাকায় নিজেরাই কৃষিকাজ করে, কুটির শিল্পের মাধ্যমে উপার্জন করতেন, অনেকে ব্যবসাও করতেন। রসুলাল্লাহর আহ্বানে সর্বপ্রথম যিনি ইসলাম গ্রহণ করলেন তিনি একজন নারী, আম্মা খাদিজা (রা.)। তিনি তাঁর সকল সম্পদ আল্লাহর রাস্তায়, মানবতার কল্যাণে বিলিয়ে দিয়েছিলেন। সর্বোচ্চ ত্যাগের পরিচয় তিনি দিয়ে গেছেন। আবার ইসলামের জন্য সর্বপ্রথম যিনি জীবন দিলেন, শহীদ হলেন তিনি একজন নারী, সুমাইয়া (রা.)।
এবার আসা যাক সত্যিকার যুদ্ধের ক্ষেত্রে। যুদ্ধক্ষেত্রেও প্রথম সারিতে (ঋৎড়হঃ খরহব) থেকে সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নেওয়ার দায়িত্ব পুরুষদের। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থাতেও সকল সামরিক বাহিনীতে এটাই হয়ে থাকে। এখানেও কারণ পুরুষের শারীরিক বৈশিষ্ট্য, শক্তি, সামর্থ্য, কষ্টসহিষ্ণুতা ইত্যাদি। সেখানে নারীর স্বাভাবিক অবস্থান দ্বিতীয় সারিতে। তাদের কাজের মধ্যে প্রধান কাজ হচ্ছে রসদ সরবরাহ। যুদ্ধের বেলাতে রসদ সরবরাহকে যুদ্ধের অর্ধেক বলে ধরা হয়। সৈনিকদের খাদ্য, পানি, যুদ্ধাস্ত্র, যুদ্ধের আনুষঙ্গিক উপাদান সরবরাহ, আহতদেরকে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে নিরাপদ স্থানে সোরিয়ে নেওয়া ও চিকিৎসা সেবা দেওয়া, নিহতদেরকে দাফন করা ইত্যাদি সবই দ্বিতীয় সারির কাজ। রসুলাল্লাহর সময় নারীরা প্রায় সকল যুদ্ধেই প্রথমে এই দ্বিতীয় সারির দায়িত্ব পালন করেছেন। তারা আহতদের চিকিৎসা দিয়েছেন, নিহতদের দাফনে সহায়তা করেছেন। যুদ্ধক্ষেত্রে আহত সৈন্যদেরকে পানি পান করিয়েছেন। তাছাড়া মসজিদে নববীর এক পাশে যুদ্ধাহতদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছিল, যার প্রধান ছিলেন একজন নারী রুফায়দাহ (রা.)। যোদ্ধাদেরকে যদি রসদ ও এই সেবাগুলি দিয়ে সাহায্য না করা হয় তবে তারা কখনোই যুদ্ধ করতে পারবে না।
তবে যুদ্ধে এমন এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় যখন মেয়েদেরকেও অস্ত্র হাতে নিতে হয়। ওহুদের যুদ্ধে যখন মুসলিম বাহিনী বিরাট বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়, বহু সাহাবি শহীদ হয়ে যান, স্বয়ং রসুলাল্লাহ মারাত্মকভাবে আহত হন, কাফেররা প্রচার করে দেয় যে, রসুলাল্লাহও শহীদ হয়ে গেছেন এমনই বিপজ্জনক মুহূর্তে মেয়েরা আর দ্বিতীয় সারিতে থাকলেন না, তারা অস্ত্র হাতে নিয়ে রসুলাল্লাহকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য কাফের সৈন্যদের বিরুদ্ধে বিপুল বিক্রমে ঝাঁপিয়ে পড়েন। ওহুদ যুদ্ধে নারী সাহাবি উম্মে আম্মারার (রা.) অবিশ্বাস্য বীরত্ব সম্পর্কে রসুলাল্লাহ বলেছিলেন, ‘ওহুদের দিন ডানে-বামে যেদিকেই নজর দিয়েছি, উম্মে আম্মারাকেই লড়াই করতে দেখেছি।’
এর অনেক পরে ইয়ারমুকের যুদ্ধে বীর যোদ্ধা দেরার বিন আজওয়ার যখন শত্র“র হাতে আটকা পড়েন তখন তারই বোন খাওলা ঘোড়ায় চড়ে এমন লড়াই শুরু করে ভাইকে উদ্ধার করেন যে স্বয়ং খালিদ (রা.) বিস্ময়প্রকাশ করেন। অর্থাৎ রসুলাল্লাহর সময়ে নারীরা ঠিকই প্রয়োজনবোধ প্রথম সারির ভূমিকাও পালন করেছেন, মাসলা মাসায়েলের জটিল জাল বিস্তার করে কোনো কাজেই তাদের অংশগ্রহণে বাধা সৃষ্টি করা হয় নি, আজ যেমনটা করা হচ্ছে। নারীর নেতৃত্ব প্রদানের যোগ্যতাকে ইসলাম মোটেও অস্বীকার করে না। উটের যুদ্ধে নেতৃত্ব দেন উম্মুল মো’মেনীন আয়েশা (রা.), বহু সাহাবি তাঁর অধীনে থেকে যুদ্ধ করেছেন। যুদ্ধটির বিভিন্ন দিক নিয়ে ঐতিহাসিকরা সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করেছেন, সমালোচনা করেছেন কিন্তু “ইসলামে নারী নেতৃত্ব হারাম” বলে তখন তাঁর পক্ষে বিপক্ষে যুদ্ধরত কোন সাহাবি ফতোয়া দিয়েছেন বলে ইতিহাসে পাওয়া যায় না।
আল্লাহর বিধানমতে কেবল একটি মাত্র পদ নারীকে দেওয়া বৈধ নয়, সেটি হলো- সমস্ত পৃথিবীময় উম্মতে মোহাম্মদী নামক যে মহাজাতি সৃষ্টি হবে সে জাতির এমামের পদ। আল্লাহ স্রষ্টা হিসাবে জানেন যে নারীর শারীরিক গঠন যেমন পুরুষের তুলনায় কোমল, তার হৃদয়ও পুরুষের তুলনায় কোমল, আবেগপ্রবণ ও সংবেদনশীল। সহজেই তার চিত্তচাঞ্চল্য ঘটে, তার স্থৈর্য্য, দূরদর্শীতা পুরুষের চেয়ে কম, তাকে প্রভাবিত করা সহজতর। এবলিস নারীকেই প্রথম আল্লাহর হুকুম থেকে বিচলিত করেছিল। এ কারণেই আল্লাহর অগণ্য নবী-রসুলের মধ্যে একজনও নারী নেই। পারস্যের সঙ্গে রোমের যুদ্ধের সময় রসুলাল্লাহ একটি পূর্বাভাষে বলেছিলেন, নারীর হাতে যে জাতি তার শাসনভার অর্পণ করেছে যে কখনো সফল হতে পারে না (তিরমিজি)। তবে স্বীয় যোগ্যতাবলে উম্মতে মোহাম্মদীর এমামের পদ ছাড়া অন্যান্য যে কোন পর্যায়ের আমীর বা নেতা সে হতে পারবে। এমন কি একজন নারী কোন এলাকার রাজনৈতিক প্রশাসকও (এড়াবৎহড়ৎ) হতে পারেন। শুধু নারী হওয়া ইসলামের দৃষ্টিতে নেতৃত্বলাভের যোগ্যতা অযোগ্যতার মাপকাঠি নয়।
পুরুষ যেহেতু পরিবারের সবাইকে ভরন-পোষণ করাচ্ছে, লালন-পালন করছে কাজেই তার কথা পরিবারের অন্যান্য সদস্যকে শুনতে হবে, এটা একটি পারিবারিক শৃঙ্খলা। কিন্তু পারিবারিক জীবনের শৃঙ্খলা সম্পর্কিত এই আয়াতটিকে সামষ্টিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনের সর্বত্র প্রয়োগ করার চেষ্টা করছেন একশ্রেণির আলেম। তাদের এই অপচেষ্টার ফলে নারী সমাজের মধ্যে নেতৃত্বের গুণাবলী বিকশিত হচ্ছে না, তারা তাদের যোগ্যতার প্রমাণও দেওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। আজকের বিকৃত ইসলামের কূপম-ূক ধর্মজীবী আলেম-মোল্লারা এটা বুঝতে সক্ষম নন যে, একটি পরিবার পরিচালনার শৃঙ্খলা দিয়ে রাষ্ট্র চলতে পারে না, বা জীবনের অন্যান্য অঙ্গনগুলি চলতে পারে না। তাই জীবনের অন্যান্য অঙ্গনে যার নেতৃত্ব দেওয়ার যোগ্যতা বেশি সে পুরুষই হোক আর নারীই হোক, তাকেই নেতা মনোনীত করা যাবে।

 অসম্ভব, আমরা অস্বীকার করছি না তো। কোর’আনে যুদ্ধ আছে, আল্লাহর রসুলের অর্ধেক জীবন গেছে যুদ্ধ করে। সেটা কোন যুদ্ধ? কোন পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ রসুল যুদ্ধ করেছন সেটা বুঝতে হবে। সেটা আমরা আমাদের জেহাদ, কেতাল সন্ত্রাস বইতে পরিষ্কার তুলে ধরেছি। তবু সংক্ষেপে বলছি, আল্লাহ বিশ্বনবীকে (দ.) পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন এই জন্য যে তিনি যেন পৃথিবীতে প্রচলিত সব রকম (পূর্ববর্তী বিকৃত ধর্ম ও মানুষের তৈরি জীবনব্যবস্থা) দীন অর্থাৎ জীবন-ব্যবস্থাগুলি অকেজো, নিষ্ক্রিয়, বিলুপ্ত করে দিয়ে এই শেষ ইসলামকে সমগ্র পৃথিবীময় প্রতিষ্ঠা করে মানবজীবন থেকে সর্বরকম অন্যায়, অবিচার, যুদ্ধ, রক্তপাত, ক্ষুধা, দারিদ্র্য ইত্যাদি দূর করে ন্যায়, সুবিচার অর্থাৎ শান্তি প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে। অর্থাৎ আল্লাহ শেষনবীকে (দ.) তার জীবনের সমস্ত কর্মকান্ডে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। যে কেউ মহানবীর (দ.) জীবনী পড়লেই দেখতে পাবেন তাঁর সমস্তটা পবিত্র জীবন ঐ একটি কাজে ব্যয় হয়েছে, আল্লাহর নির্দিষ্ট করে দেয়া লক্ষ্য মানবজীবনে শান্তি প্রতিষ্ঠার জেহাদে। জেহাদ শব্দের অর্থ হলো কোনো লক্ষ্য অর্জনের জন্য পূর্ণভাবে চেষ্টা করা (ঝঃৎঁমমষব) সর্বতোভাবে, অক্লান্তভাবে চেষ্টা করা। আর অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করা হলো কেতাল, অর্থাৎ সশস্ত্র সংগ্রাম। তাহলে কেতাল, সশস্ত্র সংগ্রাম হলো জেহাদের একটা অংশ। সামগ্রিকভাবে এই জীবন-ব্যবস্থাকে সমস্ত পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠা করার প্রয়াস, সংগ্রামে সব রকমের চেষ্টাই অন্তর্ভুক্ত। প্রথমে যুক্তি দিয়ে, বুঝিয়ে, লিখে, হাতে-কলমে দেখিয়ে এবং কোনো কিছুতেই কাজ না হলে সশস্ত্র সংগ্রাম অর্থাৎ কেতালের মাধ্যমে। এখানে একটি কথা অতি অবশ্যই মনে রাখতে হবে, ব্যক্তি বা দলগত পর্যায়ে কেতাল নেই। কেতাল বা সশস্ত্র যুদ্ধ হচ্ছে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে। একটা জাতি যদি তওহীদের উপর একতাবদ্ধ হয়ে রাষ্ট্র গঠন করে তখন ঐ রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, শৃঙ্খলা বিধান ইত্যাদির প্রয়োজনে যুদ্ধ। মানুষ তার অভ্যস্ত বিশ্বাসে এত যুক্তিহীন যে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ফেতনা ফাসাদ দূর করে শান্তি আনয়নের জন্য শেষ পর্যন্ত হাতে অস্ত্র নিতে হয়েছে। বিশ্বনবীকেও (দ.), তাঁর আসহাবদেরও ঐ একই কাজ করতে হয়েছে। তাই কিছুদিনের মধ্যেই জেহাদ (প্রচেষ্টা) ও কেতাল (সশস্ত্র যুদ্ধ) একার্থবোধক হয়ে গিয়েছিল। মহানবীর সমগ্র নব্যুয়তি জীবন ২৩ বছরের মধ্যে মক্কার ১৩ বছর তিনি শুধু আল্লাহর সার্বভৌমত্বের দিকে মানুষকে ডাক দিয়েছেন। এই সময় তিনি অস্ত্র হাতে নেন নি, সংঘাত-সংঘর্ষ করেন নি। এমনকি তাঁকে চরম নির্যাতন করা হয়েছিল। তবুও তিনি প্রত্যাঘাত করেন নি। তারপর মদিনার মানুষ যখন তাঁর তওহীদের ডাক গ্রহণ করল, তখন তিনি হেজরত করে সেখানে যেয়ে রাষ্ট্র গঠন করলেন। যেই রাষ্ট্র গঠন করলেন তখনই নীতি বদলে গেল। কারণ কোনো রাষ্ট্র কোনোদিন ব্যক্তি বা দলের নীতিতে টিকে থাকতে পারে না। তখন তাঁর প্রয়োজন হবে অস্ত্রের, সৈনিকের, যুদ্ধের প্রশিক্ষণের। আল্লাহর রসুলও তাই করলেনÑ হাতে অস্ত্র নিলেন এবং তখন থেকে তাঁর পবিত্র জীবনের বাকিটার সমস্তটাই কাটল যুদ্ধ করে। অর্থাৎ তওহীদ ভিত্তিক এই সত্যদীন প্রচার ও প্রতিষ্ঠায় ব্যক্তি গোষ্ঠী বা দলগতভাবে কোনো কেতাল অর্থাৎ সশস্ত্র যুদ্ধ নেই, আছে শুধু তওহীদের, আল্লাহর সার্বভৌমত্বের আহ্বান, বালাগ দেয়া। ঠিক তেমনি রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে আছে সশস্ত্র যুদ্ধ। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে অস্ত্র, যুদ্ধ ইত্যাদি যদি আইন সম্মত না হয় তবে পৃথিবীর সব দেশের সামরিক বাহিনীই বে-আইনী, সন্ত্রাসী। কোর’আন ও হাদীসে যে জেহাদ ও কেতালের কথা আছে তা রাষ্ট্রগত।
তাই কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী বা দল যদি দীন প্রতিষ্ঠার জন্য অস্ত্র হাতে নেয় তবে সেটা হবে মারাত্মক ভুল। তাদের কাজ হবে মানুষকে যুক্তি দিয়ে কোর’আন-হাদিস দেখিয়ে, বই লিখে, বক্তৃতা করে অর্থাৎ সর্বপ্রকারে মানুষকে এ কথা বোঝানো যে পৃথিবীতে অন্যায়, অবিচার, নির্যাতন, শোষণ, ক্রন্দন, রক্তপাত, যুদ্ধহীন একটি সমাজে নিরাপত্তা ও ন্যায় বিচারের মধ্যে অর্থাৎ নিরঙ্কুশ শান্তিতে বাস করতে হলে একমাত্র পথ যিনি আমাদের সৃষ্টি করেছেন তাঁর দেয়া জীবন বিধান মোতাবেক আমাদের জীবন পরিচালনা করা। সাধারণ জ্ঞানেই বোঝা যায় যে, যিনি যে জিনিস তৈরি করেছেন তাঁর চেয়ে আর কে বেশি জানবে যে জিনিসটি কীভাবে চালালে সেটা ঠিকমত, ভালোভাবে চলবে। আল্লাহ সুরা মুলকের ১৪ নং আয়াতে বলেছেন যে সৃষ্টি করেছে তার চেয়ে বেশি জান? (তুমি সৃষ্ট হয়ে?) এ যুক্তির কোনো জবাব আছে? কিন্তু আমরা মো’মেন মুসলিম হবার দাবিদার হয়েও দাজ্জালের (ইহুদি খ্রিষ্টান বস্তুবাদী সভ্যতা) নির্দেশে আল্লাহর দেয়া দীন, জীবন-ব্যবস্থা থেকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত অংশটুকু ছাড়া সমষ্টিগত (যেটাই প্রধান) অংশটুকু বাদ দিয়ে সেখানে নিজেরা বিধান, আইন-কানুন, নিয়মনীতি নির্ধারণ করে সেই মোতাবেক আমাদের সমষ্টিগত জীবন পরিচালিত করছি। ফল কি হয়েছে? শিক্ষা দীক্ষায়, বিজ্ঞানে, প্রযুক্তিতে মানব ইতিহাসের চূড়ান্ত স্থানে উপস্থিত হয়েও আজ পৃথিবী অশান্তি, অন্যায়, অত্যাচার, অবিচার আর মানুষে মানুষে সংঘর্ষ ও রক্তপাতে অস্থির। তাহলে প্রমাণ হয়ে যাচ্ছে যে মানুষ তার জীবন পরিচালনার জন্য যে ব্যবস্থা তৈরি করে নিয়েছে তা তাকে শান্তি ও নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। কাজেই মানুষকেই বোঝাতে হবে যে এ পথ ত্যাগ করে মানুষের সার্বভৌমত্বকে ত্যাগ করে আল্লাহর রসুল যা শিখিয়েছেন সেই আল্লাহর সার্বভৌমত্বে ফিরে যেতে হবে, সেই সার্বভৌমত্বকে গ্রহণ করে তাঁর দেয়া দীন, জীবন-ব্যবস্থাকে গ্রহণ করে আমাদের জীবনে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এই কাজ কি জোর করে করাবার কাজ? এটাতো সাধারণ জ্ঞানেই বোঝা যায় যে জোর করে, শক্তি প্রয়োগ করে মানুষকে কোনো কিছু বিশ্বাস করানো অসম্ভব।

পন্নী পরিবারের দুটি ভাগ। তাঁদের বংশের অনেকেই ওলি আল্লাহ ছিলেন, আধ্যাত্মিক সাধক ছিলেন। আবার অনেকে উপমহাদেশের পরিচিত রাজনীতিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন। ভারতের বিখ্যাত সুফি সাধক সৈয়দ খাজা মোহাম্মদ হোসাইনী গেসুদারাজ বন্দে নেওয়াজ (র.) (১৩২১-১৪২২), টাঙ্গাইলের হযরত মুঈন খান পন্নী (র.) ছিলেন এমামুয্যামানের পূর্বপুরুষ। উপমহাদেশের বিখ্যাত সাধক হায়দার আলী খান পন্নী (রহ.) ছিলেন এমামুযযামানের দাদাজান। তাঁরা চিরকালই মানুষের কল্যাণে কাজ করেছেন। প্রখ্যাত দানবীর ওয়াজেদ আলী খান পন্নী ওরফে চান মিয়া ছিলেন এমামুয্যামানের দাদার বড় ভাই। পন্নী পরিবার অনেক বড়। একটা বড় পরিবারে বিভিন্ন মতের বিভিন্ন চরিত্রের মানুষ থাকে। এখানে অনেকেই আছেন যাদের মধ্যে কে বিএনপি করেন, কে আওয়ামী লীগ করেন, কে বিদেশে গিয়ে কী করছেন এগুলো তো এমামুয্যামানের উপর বর্তানোর কোনো মানে হয় না। এটা ইতিহাস যে, তৎকালীন আরবের কোরাইশ বংশে আল্লাহর রসুল এসেছেন। মক্কার সবচাইতে সম্ভ্রান্ত পরিবার কোরাইশ আপনারা জানেন। তারা কাবা নিয়ন্ত্রণ করতেন। সেই কোরাইশ বংশের আবু লাহাব, আবু জাহেল, ওতবা, শায়েবা এমন এমন জঘন্য কাজ করেছেন যে তারা ঐতিহাসিকভাবে ঘৃণিত হচ্ছেন। তারা কাবাকে অপবিত্র করেছেন। তাদের কেউ কেউ রসুলাল্লাহর আপন চাচা। কিন্তু তাদের দুষ্কর্ম কি আল্লাহর রসুলের উপর বর্তাবে? রসুলাল্লাহ ছিলেন মক্কার সেই কোরাইশদের থেকে আলাদা। সেই কোরাইশরা আল্লাহ রসুলকে বলতো আল-আমিন, আস-সাদেক, সত্যবাদী। তিনি কখনও মিথ্যা বলতে পারেন না, ওয়াদা নষ্ট করেন না, কারও হক নষ্ট করেন না, তিনি ন্যায় নীতিবান। মানুষের কল্যাণের চিন্তাই তিনি সবসময় করেন। আমাদের এমামুয্যামানও তাঁর পরিবারের মধ্যে সত্যবাদী, আল্লাহর পছন্দনীয় চরিত্রবান ও সাহায্যপ্রাপ্ত ছিলেন। উপমহাদেশের প্রখ্যাত পন্নী পরিবারের শাসনকার্য পরিচালনা, আধ্যাত্মিক ও রাজনীতিক কর্মকা-ের ইতিহাস হাজার বছরের। এমন একটি সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান এমামুয্যামান বংশের অন্য অনেকের থেকে একেবারেই ভিন্ন প্রকৃতির ছিলেন, এ কথা তাঁর পরিবার ও পরিচিতমহলের সকলেই জানেন।

যারা ধর্মের বিনিময় নেয় তারা সবাই। ধর্মের নামে কোনো বিনিময় চলে না। এটা একেবারে সুত্রের মতো মনে রাখতে হবে। আল্লাহ বলছেন শুয়োর খাওয়া হারাম, মৃত জন্তু খাওয়া হারাম, তারপর বলছেন নিরুপায় হলে তাও খেতে পারো। কিন্তু ধর্মের বিনিময় নেয়া একেবারে নিষেধ। এটা কোনোভাবে ক্ষমা করবেন না আল্লাহ এবং তাদেরকে পবিত্রও করবেন না আল্লাহ। সুরা বাকারার ১৭৪ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলছেন, “আল্লাহ যে কেতাব অবতীর্ণ করেছেন যারা তা গোপন করে এবং বিনিময়ে তুচ্ছ মূল্য গ্রহণ করে তারা (১) নিজেদের পেটে আগুন ছাড়া কিছুই পুরে না, (২) কেয়ামতের দিন আল্লাহ তাদের সঙ্গে কথা বলবেন না, (৩) আল্লাহ তাদের পবিত্রও করবেন না, (৪) তারা ক্ষমার পরিবর্তে শাস্তি ক্রয় করেছে, (৫) তারা হেদায়াতের পরিবর্তে পথভ্রষ্টতা বা গোমরাহী ক্রয় করেছে, (৬) তারা দীন সম্পর্কে ঘোরতর মতভেদে লিপ্ত আছে (৭) আগুন সহ্য করতে তারা কতই না ধৈর্যশীল”। সুতরাং ধর্মকে স্বার্থহাসিলের উপায় বানানোর ব্যাপারে ইসলামে কোনো শিথিলতা নেই। কারণ এটা করলে ধর্মই বিকৃত হয়ে যাবে, মানুষ আর সঠিক পথ পাবে না, মুক্তির পথ পাবে না। ভুল পথে চলতে বাধ্য হবে, সে দুনিয়াও হারাবে আখেরাতও হারাবে। তাই ধর্মের কাজ হবে সম্পূর্ণ নিঃস্বার্থভাবে। এ ধর্মের কাজ করে একেবারে শুরুতে নামাজ পড়িয়ে, ওয়াজ করিয়ে, মুর্দা দাফন করিয়ে, এখান থেকে শুরু করে একেবারে রাজনীতি পর্যন্ত যে অঙ্গনেই হোক ধর্মের কাজ করে পার্থিব স্বার্থ হাসিল করবে সেই ধর্মব্যবসায়ী। ধর্মব্যবসায়ী বলতে কাদের বোঝাচ্ছেন?
উত্তর: যারা ধর্মের বিনিময় নেয় তারা সবাই। ধর্মের নামে কোনো বিনিময় চলে না। এটা একেবারে সুত্রের মতো মনে রাখতে হবে। আল্লাহ বলছেন শুয়োর খাওয়া হারাম, মৃত জন্তু খাওয়া হারাম, তারপর বলছেন নিরুপায় হলে তাও খেতে পারো। কিন্তু ধর্মের বিনিময় নেয়া একেবারে নিষেধ। এটা কোনোভাবে ক্ষমা করবেন না আল্লাহ এবং তাদেরকে পবিত্রও করবেন না আল্লাহ। সুরা বাকারার ১৭৪ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলছেন, “আল্লাহ যে কেতাব অবতীর্ণ করেছেন যারা তা গোপন করে এবং বিনিময়ে তুচ্ছ মূল্য গ্রহণ করে তারা (১) নিজেদের পেটে আগুন ছাড়া কিছুই পুরে না, (২) কেয়ামতের দিন আল্লাহ তাদের সঙ্গে কথা বলবেন না, (৩) আল্লাহ তাদের পবিত্রও করবেন না, (৪) তারা ক্ষমার পরিবর্তে শাস্তি ক্রয় করেছে, (৫) তারা হেদায়াতের পরিবর্তে পথভ্রষ্টতা বা গোমরাহী ক্রয় করেছে, (৬) তারা দীন সম্পর্কে ঘোরতর মতভেদে লিপ্ত আছে (৭) আগুন সহ্য করতে তারা কতই না ধৈর্যশীল”। সুতরাং ধর্মকে স্বার্থহাসিলের উপায় বানানোর ব্যাপারে ইসলামে কোনো শিথিলতা নেই। কারণ এটা করলে ধর্মই বিকৃত হয়ে যাবে, মানুষ আর সঠিক পথ পাবে না, মুক্তির পথ পাবে না। ভুল পথে চলতে বাধ্য হবে, সে দুনিয়াও হারাবে আখেরাতও হারাবে। তাই ধর্মের কাজ হবে সম্পূর্ণ নিঃস্বার্থভাবে। এ ধর্মের কাজ করে একেবারে শুরুতে নামাজ পড়িয়ে, ওয়াজ করিয়ে, মুর্দা দাফন করিয়ে, এখান থেকে শুরু করে একেবারে রাজনীতি পর্যন্ত যে অঙ্গনেই হোক ধর্মের কাজ করে পার্থিব স্বার্থ হাসিল করবে সেই ধর্মব্যবসায়ী।

প্রশ্নই আসে না। এমামুযযামান বলতেন আমি আল্লাহর এক গুনাহগার বান্দা, আল্লাহ রসুলের গুনাহগার উম্মত। তিনি আল্লাহ রসুলকে যেভাবে সম্মান করতেন, শ্রদ্ধা করতেন আমাদের চর্মচক্ষুতে কখনও দেখি নি কেউ আল্লাহ রসুলকে এভাবে সম্মান করে। আমরা দেখেছি এমামুযযামান কখনও পশ্চিম দিকে ফিরিয়ে জুতা রাখতেন না, কখনও তিনি পশ্চিম দিকে পিঠ দিয়ে বসতেন না। রসুলের সম্মানে তিনি শ্রদ্ধায় বিগলিত হয়ে যেতেন। তাঁর নবী হওয়ার বা নবী দাবি করার প্রশ্নই আসে না, মানুষ যেন আমাদের কথা না শোনে, আমরা যেন সর্বত্র হয়রানির শিকার হই এজন্য এরকম কথাবার্তা ধর্মব্যবসায়ীরা অপপ্রচার চালিয়েছে। তাঁর ‘এ ইসলাম ইসলামই নয় বই’-তে তিনি হাজার হাজার বার শেষ নবী, আখেরি নবী রসুল (দ.) বলেছেন। আমাদের সব লেখায় আমরা মোহাম্মদ (দ.) কে আখেরি নবী, শেষ নবী বলেছি সুতরাং এমামুয্যামানের নবী দাবি করার অভিযোগ অবান্তর। আমরা বিশ্বাস করি তিনি ইসলাম সম্পর্কে যে বক্তব্য উপস্থাপন করেছেন সেগুলো শতভাগ সত্য। তাঁর একটি বক্তব্যকেও আজ পর্যন্ত কেউ মিথ্যা প্রমাণ করতে পারে নি। তাই তাঁকে আমরা এই যুগের নেতা বলে বিশ্বাস করি।

আমরা উম্মতে মোহাম্মদী। আমরা মনে করি বিভিন্ন তরিকা, মাজহাব, ফেরকার নামে দুঃখজনক বিভাজন সৃষ্টি করে জাতিটাকে ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। কিন্তু এক আল্লাহ, এক রসুল, এক কোর’আন, এক জাতি হওয়ারই কথা ছিল। সমস্ত পৃথিবীতে ন্যায় সত্য প্রতিষ্ঠা করার জন্য আল্লাহর রসুল যে জাতিটি গঠন করলেন সে জাতিটাকে তিনি সংগ্রামের দিকে পরিচালিত করে আল্লাহর কাছে চলে গেলেন। তারপর স্ত্রী, পুত্র পরিজন, সহায়, সম্পত্তি সব কিছু কোরবান করে দিয়ে সেই উম্মতে মোহাম্মদীর সদস্যরা দুনিয়ার বুকে ছড়িয়ে পড়লেন। তারা অর্ধ পৃথিবীতে ন্যায়, সুবিচার প্রতিষ্ঠা করলেন। একটা পর্যায়ে এসে এ উম্মতে মোহাম্মদী তাদের উদ্দেশ্য ভুলে গেল। এরপর তারা নিজেদের মধ্যে মতভেদ করে শিয়া-সুন্নি, শাফেয়ী-হাম্বলি হলো, নকশাবন্দিয়া, মুজাদ্দেদিয়া ইত্যাদি হলো। তারা আর উম্মতে মোহাম্মদী রইলেন না, এক জাতি রইলেন না। আল্লাহ তাদেরকে লানত দিলেন। ফলে তারা এখন সমস্ত দুনিয়ায় অন্য জাতিগুলোর গোলাম। তারা আজকে আল্লাহর গজবের বস্তু। কাজেই আমরা হেযবুত তওহীদ কোনো নির্দিষ্ট তরিকাপন্থি না। আমরা প্রকৃত উম্মতে মোহাম্মদী হবার চেষ্টা করছি, কারণ উম্মতে মোহাম্মদীর জন্যই জান্নাত সুনিশ্চিত, আল্লাহর রসুল তাদেরকেই শাফায়াত করবেন।

আমাদেরকে অনেকে অভিযোগ করে থাকেন যে, আপনারা সরকারের সাথে কাজ করছেন কেন? আবার অনেকে কথাটা অন্যভাবে বলেন যে, সরকারের দালালী অথবা লেজুড়বৃত্তি করছেন কেন? আসলে এই প্রসঙ্গে কথা বলতে গেলে কয়েকটা ধাপে কথাগুলি বলতে হবে নয়তো সামগ্রিক বিষয়টা পরিষ্কার হবে না।
প্রথমত, আওয়ামী লীগের সঙ্গে কাজ করছি বলতে যা বোঝানো হচ্ছে বিষয়টা তেমন নয়, আমরা আসলে সরকারের সঙ্গে কাজ করছি। আমরা যে বিশেষ করে এই সরকারের সঙ্গেই কাজ করছি বা করতে চাই তাও নয়, বিগত বিশ বছরে যে কয়টি সরকার পেয়েছি সবগুলো সরকারের সঙ্গে বা সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গেই কাজ করেছি। কারণ এমামুয্যামান আন্দোলনের জন্য এই নীতিটি স্থির করে দিয়ে গেছেন যে, সব সময় সরকারের সংস্পর্শে থেকে, সরকারকে জানিয়ে, সরকারের কর্মকর্তাদেরকে পরিষ্কার ধারণা দিয়ে কাজ করতে হবে। কারণ আমরা ইসলাম নিয়ে কাজ করি, ভুল বোঝাবুঝির অনেক সুযোগ এখানে থেকে যেতে পারে। তাই আমরা বিগত সরকারগুলোর সঙ্গেও কাজ করেছি, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সঙ্গেও কাজ করেছি, এমামুয্যামান জঙ্গিবাদ দমনের ব্যপারে আদর্শ দিয়ে সহযোগিতা করার জন্য লিখিতভাবে প্রস্তাবও দিয়েছিলেন। সুতরাং খালি যে এই সরকারের সঙ্গে বা এই সরকারের আমলে কাজ করছি বিষয়টি সত্য নয়। আর সরকার ও সরকারী দলকে আলাদা করা যায় না। তবে সরকার প্রথমে। এটা হচ্ছে প্রথম কথা।
দ্বিতীয় কথা হচ্ছে, আপনারা জানেন যে, আমরা একটা জাতিকে যদি একটা সমস্ত দেহের সঙ্গে তুলনা করি তাহলে সরকার হলো সেই দেহের মস্তিষ্কের জায়গায় আর জনগণ হলো সেই শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ। কাজেই মস্তকবিহীন যেমন শরীর চলে না তেমনি সরকারবিহীন জাতির কোনো কিছুই কল্পনা করা যায় না। আমাদের যে কাজ, যে যে কর্মকা- সেটি সমস্ত জাতিকে নিয়ে, একটি সামষ্টিক কর্মকা-। একটি জাতিকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে, অশান্তি-অপরাজনীতি, ধর্মব্যবসা, জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ করা। সেটা করা একটি আন্দোলনের একার পক্ষে, একজন ব্যক্তি বা কয়েকজন ব্যক্তির পক্ষে অসম্ভব, আর এটি গোপনে লুকিয়ে করার তো বিষয়ই নয়। আর এ কাজটি প্রকৃতপক্ষে সরকারেরই কাজ। আমরা করছি আমাদের ধর্মীয় দায়িত্বজ্ঞান ও সামাজিক কর্তব্যবোধ থেকে, সমাজে অশান্তি থাকলে সেটা আমাদেরকেও কষ্ট দেয় সেজন্য আমরা করছি, যেহেতু এটা করার পথ আমাদের কাছে আছে। কিন্তু এটা করতে সরকারের সহযোগিতা অপরিহার্য। সরকারের কাছে আছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শক্তি, অর্থ, আইন ইত্যাদি কিন্তু সমাজকে অন্যায়-অপরাধমুক্ত করতে সর্বাগ্রে প্রয়োজন সঠিক শিক্ষা ও আদর্শ দ্বারা মানুষের মানসিক পরিবর্তন সাধন অর্থাৎ মোটিভেশন, সেই আদর্শ আমাদের কাছে আছে যা আমাদেরকে, আমাদের এমামুয্যামানকে দান করেছেন। সরকারের শক্তি ও আমাদের আদর্শ এ দুইয়ের সম্মিলনে একটি শান্তিময় সমাজ আমরা গড়ে তুলতে পারি। এই কথাটিই আমরা সরকারকে পত্রিকার মাধ্যমে বুঝানোর চেষ্টা করছি, সাধারণ মানুষকেও বুঝাচ্ছি। আমরা সবাইকে উদ্বুদ্ধ করছি যেন তারা কেউ কোনো অন্যায়কারীকে সহযোগিতা না করে, দেশের ও জাতির ক্ষতি হয় এমন কোনো কাজে নিজেরাও অংশ না নেয়, অন্যকেও বাধা দেয় এবং তারা সম্মিলিতভাবে দেশের উন্নয়নে এগিয়ে আসে। এটি কেবল দেশপ্রেমই নয় তাদের এবাদত হিসাবে গণ্য হবে। তাহলে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সরকারের পক্ষে দেশের শান্তি রক্ষার জন্য এমন হিমসিম খেতে হবে না। সেই আদর্শ আমরা নিঃস্বার্থভাবে মানবতার কল্যাণে দিতে চাই। সরকার যদি আমাদের এই আদর্শকে অনুধাবন করেন এবং মানবতার কল্যাণে যদি সেটা কাজে লাগান তবে মানুষ উপকৃত হবে, সরকার উপকৃত হবে, সবাই উপকৃত হবে।
একটি জাতিকে ন্যায়ের পথে পরিচালিত করার ক্ষেত্রে মুখ্য দায়িত্ব কিন্তু সরকারের, সরকার জাতির অভিভাবক, তারা জনগণের ভালোমন্দ দেখার দায়িত্বটি গ্রহণ করেছেন। সরকার জনগণ থেকে অর্থ আদায় করেন এবং উন্নয়নমূলক কাজ করেন। এক কথায় জনগণের ভালো-মন্দের দায়-দায়িত্ব কিন্তু সরকারের। তাই জাতিকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে, অসত্যের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়ে গণপ্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য উদ্বুদ্ধ করার মুখ্য দায়িত্ব সরকারেরই। আমরা এখানে আল্লাহর রহমে বলতে পারি, একটা সঠিক আদর্শ সরকারকে দিয়ে সরকারকে সহযোগিতা করতে চাচ্ছি। যদি আমার ব্যক্তি স্বার্থ থাকতো তাহলে কেউ হয়তো আপত্তি তুলতে পারেন যে, আমরা সরকারের থেকে কোনো সুযোগ সুবিধার বিনিময়ে কাজ করছি। আমরা সরকারে যে দল আছে তাদেরকে মিটিংয়ে দাওয়াত দিচ্ছি, আমরা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদেরকে দাওয়াত দিচ্ছি, মন্ত্রীদেরকে বোঝানোর চেষ্টা করছি, এমপিদেরকে বোঝানোর চেষ্টা করছি, অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদেরকেও আমরা বোঝানোর চেষ্টা করছি। কাজেই সরকারের লোকদেরকে এই মহতি কাজে সম্পৃক্ত করে জাতির উন্নয়নের জন্য কাজ করা সরকারের দালালী করা বুঝায় না, দালালির সঙ্গে হীনস্বার্থ জড়িত থাকে। আমাদের প্রতিটি কাজকেই বাঁকা চোখে দেখার একটি শ্রেণি আছে। আমরা যখন ধর্মব্যবসায়ের বিরুদ্ধে কাজ করি তখন ধর্মব্যবসায়ীরা বলেন আমরা ইসলামবিরোধী, খ্রিষ্টান, মুরতাদ, কাফের। আমরা আল্লাহ-রসুলের কথা বলি, তাই বলা হয়েছে হেযবুত তওহীদ জঙ্গি। সরকারসহ এ জাতির অধিকাংশ মানুষই আমাদের সম্পর্কে এই ভুল ধারণাগুলো নিয়েই ছিল। আজ যখন আমাদের প্রাণান্তকর প্রয়াসে এবং আল্লাহ দয়াই সেই মিথ্যাগুলো বিদূরিত হচ্ছে, তখন সরকারসহ অনেকেই আমাদের সম্পর্কে সত্য জেনে এই মহৎ কাজে অংশ গ্রহণ করছেন। এখন একেও বাঁকা চোখে দেখে বলছে যে আমরা সরকারের দালালি করছি। সরকারের সঙ্গে আমাদের কোনো লিখিত চুক্তি বা মৌখিক চুক্তি হয়েছে তেমনও নয়। যারা ব্যক্তিগতভাবে আমাদের ব্যাপারে নিশ্চিতভাবে জেনেছেন তারা আমাদেরকে সহযোগিতার আশ্বাস দিচ্ছেন। এই হলো একদিকের কথা, আর অন্যদিকের কথা হলো:
বছর দুয়েক আগে আমরা যখন ব্যাপকভাবে এই সেমিনার-আলোচনা অনুষ্ঠান করতে লাগলাম তখন কিন্তু আমরা অন্যান্য দলের লোকদেরকে তেমন পাই নাই, আমরা দাওয়াত দিয়েছি তাদের। বিভিন্ন মামলা-মকদ্দমা, বিভিন্ন রাজনৈতিক সংকটের কারণে। যারা বিরোধীদলে আছেন বা যারা অন্যান্য দল করছেন, তাদেরকেও আমরা দাওয়াত করেছি। তাদের বাড়িতে গিয়েছি, অফিসে গিয়েছি। কিন্তু তাদের অনেককেই আমরা পাই নি। অনেকে বলেছেন, আমাদের নামে মামলা আছে, আমরা কীভাবে আপনাদের অনুষ্ঠানে আসবো? অনেকে বলেছেন যে, আমরা আপনাদেরকে সহযোগিতা করবো তবে এখন তো আমরা পারছি না। অনেকে আবার এই অভিযোগ করেছেন যে, সরকারী দলের লোকেরা মিটিংয়ে থাকবেন আমরা কিভাবে আসবো? এই পরিস্থিতিতে বাস্তব ক্ষেত্রে অনেককেই আমরা পাই নি। কিন্তু আমাদের কাজ তো করতে হবে, কাজেই আমরা আমাদের চলার পথে সহযোগী হিসেবে যাদেরকে পেয়েছি তাদেরকে নিয়েই কাজ করছি। আমরা আসলে ১৬ কোটি মানুষকে নিয়েই কাজ করতে চাই, এখানে এতে সরকার আর বিরোধীদলের মধ্যে ধারণাগতভাবে কোনো পার্থক্য আমাদের কাছে নেই।
আরেকটি কথা কিন্তু বলতে হয়। আপনারা ভালো করেই জানেন যে, সরকারের নিয়ন্ত্রণে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসন পরিচালিত হচ্ছে। বর্তমানে ইসলামের নামে সারা দুনিয়াতে একটা জঙ্গিবাদী কর্মকা- চলছে। ঢালাওভাবে পশ্চিমারা যারা ইসলামের কথা বলছে, ইসলামী দল করছে তাদেরকেই জঙ্গি হিসেবে আখ্যায়িত করা হচ্ছে, হয়রানি করা হচ্ছে। কাজেই আমাদের এখানেও এই দৃষ্টিভঙ্গির ব্যতিক্রম নয়। ‘হেযবুত তওহীদ’ প্রকৃত ইসলামের কথা বলছে। এইক্ষেত্রে আমরা যদি শান্তিপূর্ণভাবে কাজ করতে চাই তবে অবশ্যই আমাদের সরকারকে সুস্পষ্ট ধারণা দিয়েই করতে হবে, আমাদের ন্যায্যতার ব্যাপারে সরকারের দৃঢ় প্রত্যয় উৎপাদন করেই করতে হবে, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অবহিত করেই করতে হবে। তাদেরকে পাশ কাটিয়ে, তাদের থেকে গোপন থেকে কিছু করা যাবে না, তারা করতে দেবেও না। এবং সবচেয়ে বড় কথা আমাদের গোপন করার কিছু নেই। ঈসা (আ.) বলেছিলেন, প্রদীপ জ্বালিয়ে কেউ খাটের নিচে রাখে না। সূর্যের পক্ষে যেমন নিজের প্রভাকে গোপন করা অসম্ভব, তেমনি হেযবুত তওহীদ। এখানে গোপনের কিছু নেই, কাউকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ারও কিছু নেই যেহেতু জাতির কাজ। সেইজন্যই যেই সরকারই থাকুক না কেন সরকারকে নিয়ে কাজ করতে হবে।
আরেকটি কারণ হচ্ছে, ৭১ সালে যেহেতু আওয়ামী-লীগের একটা গৌরবময় ভূমিকা রয়েছে। জাতিকে শান্তি দেওয়ার স্বপ্ন ও প্রতিশ্র“তি নিয়েই কিন্তু তাদের নেতৃত্বে ৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধ হয়েছিল। আমরা তাদেরকে এটা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি যে, আপনারা জাতিকে শান্তি-সমৃদ্ধি, সুখ দেওয়ার জন্য জাতির প্রতি অঙ্গিকারাবদ্ধ; যদিও গত ৪৪ বছরে সেই সুখ-শান্তি আপনারা বা অন্য কেউই জাতিকে দিতে পারে নাই। কারণ একটা আদর্শের অভাব ছিল। সেই আদর্শটা আমরা দিচ্ছি। আসুন; আপনারা সেটা প্রয়োগ করে জাতির প্রতি আপনাদের অঙ্গীকার পূর্ণ করুণ।

এই কথা সত্য যে, বর্তমানে যে গণতন্ত্র চলছে এমন গণতন্ত্র আমরা চাই না। আমরা কী চাই তা একটু আগে বলেছি। গণতন্ত্রের নামে এখন যে তা-ব চলছে তা আমরা চাই না, তা কেউ চায় কিনা আমরা জানি না। আপনারা খোঁজ নিয়ে দেখতে পারেন এই গণতন্ত্র কেউ চায় কিনা।

 হ্যাঁ, আমাদের পিছনে অনেক বড় শক্তি আছে। বিরাট বিশাল শক্তি আছে। অসম্ভব, অসীম শক্তি আছে। এত বড় শক্তি পেছনে না থাকলে আমরা এই বিশ্বজোড়া অন্যায়ের বিরুদ্ধে জীবনেও দাঁড়াতে পারতাম না। আমাদের কি আছে? কিচ্ছু নেই। সমাজে আমাদেরকে কেউ চেনে না। আমাদের কোনো পরিচিতি নাই, আমরা সাধারণ পরিবারের লোক সবাই। আমাদের তেমন অর্থনৈতিক সামর্থ্যও নাই। গরিব নিঃস্ব লোক সবাই। আমরা দাঁড়িয়েছি এই পশ্চিমা বস্তুবাদী সভ্যতা দাজ্জালের বিরুদ্ধে, ধর্মব্যবসার বিরুদ্ধে, অসত্যের বিরুদ্ধে, এই পাহাড় পরিমাণ অন্ধকারের বিরুদ্ধে। যমুনা নদীর স্রোতকে উল্টে দেয়ার মতো প্রায় অসম্ভব কাজ নিয়ে আমরা দাঁড়িয়েছি। আমাদের পিছনে এই বিরাট শক্তি হলেন মহান রাব্বুল আলামিন। যিনি সমস্ত কিছু সৃষ্টি করেছেন, যিনি একটি অণু পরমাণু থেকে বিশ্বজগত সৃষ্টি করেছেন। যিনি কুন শব্দ দিয়ে সব কিছু সৃষ্টি করেন এবং যিনি একদিন সমস্ত কিছু ধ্বংস করে দিবেন। যিনি প্রত্যেকটা মানুষের মনকে নিয়ন্ত্রণ করেন, তিনি আমাদের সঙ্গে আছেন। আল্লাহ ভরসা, হাসবুন আল্লাহ নিশ্চয় আমাদের বিজয় সুনিশ্চিত। এত বড় শক্তি আমাদের সঙ্গে আছে, আমরা কাউকে পরোয়া করি না। এজন্য বলি আমরা বলি কোর’আনের ভাষায় যত পারো ষড়যন্ত্র করো আমাদেরকে বিরাম দিয়ো না।

হুজুর বলতে আজ যাদেরকে বোঝানো হয় তারা আসলে ইসলামের কেউ নয়। আজকে সমাজে এই পুরোহিত শ্রেণিটি ব্রিটিশদের দেয়া আল্লামা, মুফতি, মাওলানা, ইত্যাদি টাইটেল নিজেদের নামের আগে পিছে যোগ দিচ্ছেন এগুলো কতটুকু বৈধ, কতটুকু অবৈধ সেটা নিয়ে চিন্তা করার অবকাশ রয়েছে। আল্লাহর রসুলের সাহাবিরা কি এদের চেয়ে ইসলাম কম জানতেন? তাদের নামের সঙ্গে তো কোনো মাওলানা, গাউস কুতুব, আল্লামা জাতীয় খেতাব দেখি না? মাওলানা শব্দের অর্থ কী? মাওলা মানে প্রভু, আর মাওলানা মানে আমাদের প্রভু। ওরা কি আমাদের প্রভু? এই সত্য কথাগুলো বলি দেখে বলা হয়, আমরা হুজুরদের পেছনে লেগেছি। এ অভিযোগ সত্য নয়। আমরা বলছি ধর্ম এসেছে মানুষের কল্যাণ সাধনের জন্য, এটা বিক্রি করে খাওয়ার জন্য নয়। এটা করলে ধর্ম বিকৃত হয়ে যায়, সেটা থেকে মানুষ আর কল্যাণ পায় না, অকল্যাণ পায়। এজন্য আল্লাহ ধর্মব্যবসাকে হারাম করেছেন। এই সত্যটি আমরা মানবজাতির সামনে তুলে ধরেছি। এতে যাদের কায়েমি স্বার্থে আঘাত লেগেছে তারাই আমাদের বিরুদ্ধে লেগেছে, আমরা কারো পিছনে লাগি নি। আমরা হুজুর বলতে বুঝি কেবল একজনকেই, তিনি মহানবী (দ.)। সমাজে যারা আজ হুজুর হিসাবে পরিচিত আমরা তাদেরকে ছোট করছিনা। তারা আগেই ছোট হয়ে আছেন। সবাই তাদেরকে বলে দুই টাকার মোল্লা, দুই টাকা দিয়ে কেনা যায়। মসজিদ কমিটির সুদখোর সেক্রেটারির হাতে তার চাকরি বাঁধা, সেই কমিটির লোকদের জুতার তলা মুছতে মুছতে তাদের দফারফা, তাদের পেছনে আমরা লেগে কী করব? এত নিকৃষ্ট অবস্থা হয়েছে মসজিদের এমামদের, মুয়াজ্জিনদের। ধর্মব্যবসা করে, হারাম খেয়ে তারা নিজেদেরকে অনেক ছোট করে ফেলেছে। মানুষের কল্যাণে ভূমিকা রাখার জন্য তাদের কোনো আত্মিক শক্তি বা নৈতিক মনোবল কিছুই নেই। ছোট হতে হতে এত ছোট হয়েছেন যে সমাজে তাদেরকে আর খুঁজে পাওয়া যায় না, গোনা যায় না। এখন তারা কয়দিন পর পর কুয়ার ব্যাঙ এর মতো কুয়ার থেকে বেরিয়ে এসে একটা তা-ব সৃষ্টি করে, নৈরাজ্য সৃষ্টি করে আবার ইঁদুরের মতো পাগড়ির লেজ হাওয়ায় উড়িয়ে গর্তে লুকায়। এরা না পারছে মানবতার কল্যাণ করতে, না পারছে নিজেদের কল্যাণ করতে। কাজেই এরা নিজেরা নিজেদেরকে ছোট করেছে। আমরা বরং তাদেরকে ডেকে ডেকে এনে বড় করার চেষ্টা করছি। আমরা বলছি, আপনারা ধর্মব্যবসা থেকে হালাল উপার্জন করেন, মানুষের কল্যাণে কাজ করে, তাহলে আপনারা আল্লাহর কাছে বড় হবেন, মানুষের কাছে বড় হবেন। কিন্তু তারা এ ক্ষুদ্র স্বার্থে ধর্মব্যবসাকে টিকিয়ে রাখার জন্য অনেক ক্ষুদ্র হয়ে গেছেন। আজকে মুর্দা দাফন করলে তাদেরকে প্রয়োজন, বাচ্চার নাম রাখার জন্য তাদের ডেকে আনে, তাদেরকে আর কোনো কাজে সমাজের প্রয়োজন নাই। একজন অপরাধীকে অপরাধীকে হিসেবে চিহ্নিত করা কি তাকে ছোট করা হয়? মানবজাতির মধ্যে সবচেয়ে বড় অপরাধী এই ধর্মব্যবসায়ীরা।

 এ কথাটা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। এরা হঠাৎ করে এ দেশে সৃষ্টি হয়েছিল আর হঠাৎ করে সন্ত্রাসী কর্মকা- ঘটিয়েছিল। মানুষ তাদের সম্পর্কে জেনেছেই তাদের সন্ত্রাসী কর্মকা-ের দ্বারা। পক্ষান্তরে হেযবুত তওহিদ ২০ বছর ধরে এ দেশে কাজ করছে। এ ধরণের কথাবার্তা হেযবুত তওহীদের ব্যাপারে বলা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক এবং অন্যায়। আমাদের সম্পর্কে এ ধারণা করার মূল কারণ আমাদের বিরুদ্ধে অনেক অপপ্রচার হয়েছে।
বাংলা ভাইকে আজ এত গালাগালি করা হয়, মন্দ বলা হয়। কিন্তু আমাদের দেশে যারা গণতান্ত্রিক বা সমাজতান্ত্রিক ধারার রাজনীতি করছেন তারা কি নৃশংসতা, সন্ত্রাস, সহিংসতার দিক থেকে বাংলা ভাইকে ছাড়িয়ে যান নি? ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধেও পর ডান বলেন, বাম বলেন, সেকুলার বলেন এ পর্যন্ত যারা এদেশে রাজনীতি করেছেন তারা বাংলা ভাইকে ছাড়িয়ে গেছেন অনেক আগেই। বাংলা ভাই কয়টা লোক মেরেছেন, কয় জায়গায় বোম মেরেছেন, কয়জন ছাত্র হত্যা করেছেন, কয়জন মানুষ গুম করেছেন? তার তুলনায় গত ৪৪ বছরে এই রাজনীতিকরা কী করেছেন? কাজেই বলব, নিজের দিকে একটু তাকান, তারপর অন্যদের দিকে তাকাবেন। হেযবুত তওহীদকে এসব বাংলা ভাইদের সঙ্গে মিলিয়ে লাভ নেই। বাংলা ভাইদের উত্থানের বহু আগে থেকে এদেশে হেযবুত তওহীদ আছে। তাদের উত্থানের পর যখন গণমাধ্যমগুলো তাদের বিরুদ্ধে একচেটিয়া লিখতে লাগলো তারা হয়ে গেল ভিলেন। তাদের সম্পর্কে মানুষের মনে ঘৃণা বিদ্বেষ সৃষ্টি হলো। এরপর থেকে হেযবুত তওহীদের সদস্যরা যেখানেই কাজ করতে যেত, বহু স্থানে তাদেরকেও জে.এম.বি. সন্দেহ করে গ্রেফতার করা হয়েছে। আমাদের বিরুদ্ধে অন্তত চার শতাধিক মামলা হয়েছে যেখানে হেযবুত তওহীদকে জঙ্গি সন্দেহে আদালতে প্রেরণ করা হয়েছে, সেগুলোতে বিভিন্ন দলের সঙ্গে হেযবুত তওহীদকে জড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। পত্রিকায় হাজার হাজার সংবাদ ছাপা হয়েছে হেযবুত তওহীদের বিরুদ্ধে যেখানে বিভিন্ন নিষিদ্ধ দলের সঙ্গে হেযবুত তওহীদকে সুকৌশলে জড়িয়ে দেওয়া হয়েছে কিন্তু লাভ হয় নি। তদন্তে প্রতিবারই হেযবুত তওহীদ নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছে। যে আন্দোলনটা ২০ বছর যাবত কোনো আইন ভঙ্গ করে নি, কোনো অন্যায় করে নি, জীবন সম্পদ দিয়ে মানবতার কল্যাণে কাজ করে যাচ্ছে, নিজেদের সবকিছু বিলিয়ে দিয়ে নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে কতবড় নির্লজ্জ হলে তারা বাংলা ভাইদের সাথে হেযবুত তওহীদকে মেলায়? যারা এ প্রশ্নগুলো করে তাদের চরিত্র কী এ ৪৪ বছরে? এদেশে বামদের ইতিহাস আমরা জানি, নকশালপন্থী সর্বহারাদের ইতিহাস আমরা জানি, এদেশে যারা গণতন্ত্র করে তাদের ইতিহাস আমরা জানি। ২০১৩ সালে এই গণতান্ত্রিকরা ও ধর্মব্যবসায়ীরা সম্মিলিতভাবে যে তা-ব করেছে ১০০ বাংলা ভাইও একাজ করতে পারবে না। সত্য কথা তিতা হলেও বলতে হবে, না হলে মিথ্যা কখনও দূরীভূত হবে না।

 তাঁরা কেউই মাদ্রাসায় পড়েন নি। আল্লাহ রসুলের সময় বর্তমানের মতো কোনো মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থা ছিল না। সুতরাং মাদ্রাসায় না পড়লেই যে ইসলাম সম্পর্কে কথা বলতে পারবে না, এমন ধারণা অযৌক্তিক। বর্তমানে মুসলিম বিশ্বে যে মাদ্রাসাগুলো আপনারা দেখতে পাচ্ছেন সেগুলো আল্লাহর নাজেল করা প্রকৃত ইসলাম শিক্ষার প্রতিষ্ঠান নয়। এটা হলো একটি বিকৃত শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে মুসলিম জাতিকে রাজনীতিক ও ধর্মীয় নানা মতে পথে বিভক্ত করে পদানত করে রাখার একটি ব্রিটিশ ষড়যন্ত্র। ব্রিটিশরা যখন আমাদেরকে পদানত করেছিল তখন তারা আমাদেরকে একটি বিকৃত ইসলাম শিক্ষা দেয়ার জন্য এই মাদ্রাসাগুলো প্রতিষ্ঠা করেছিল, তারাই এর সিলেবাস কারিকুলাম সব তৈরি করেছিল। তাদের উদ্দেশ্য ছিল আমরা যেন আর কোনোদিন ইসলামের সেই নীতি আদর্শের দিকে ফিরে না যাই, শাসকের অন্যায়ের বিরুদ্ধে যেন ঐক্যবদ্ধ হয়ে সংগ্রাম করতে না পারি। ব্রিটিশদের তৈরি বিকৃত ইসলাম শিখেই মাদ্রাসা থেকে বেরিয়ে এসেছে ধর্মব্যবসায়ী শ্রেণি, বিকৃত ইসলামের আলেমরা, যারা ফতোয়াবাজী, মাসলা-মাসায়েল, ফেরকা-মাযহাব ইত্যাদি নিয়ে নিজেরা দ্বন্দ্ব, বাহাসে, দলাদলিতে লিপ্ত থাকে। দেশ জাতি ধ্বংস হয়ে গেলেও সেদিকে তাদের কোনো ভ্রুক্ষেপ থাকে না। তারা কোনোদিন মানবতার কল্যাণে এতটুকু ভুমিকা রাখতে পারে নি। হয়তো দু একজন ব্যতিক্রম থাকতে পারেন যারা মানবতার মুক্তির জন্য সংগ্রাম করেছেন তবে সেটা অন্য কোনো মহান ব্যক্তির দ্বারা দীক্ষিত ও অনুপ্রাণিত হয়ে, মাদ্রাসার শিক্ষার প্রভাবে নয়। ধর্মব্যবসা করেই তাদের জীবন চলে। কাজেই আল্লাহ রসুলের বর্ণনা মোতাবেক এ শ্রেণির আলেমরা হলো আসমানের নিচে নিকৃষ্টতম জীব। সুতরাং এসব মাদ্রাসায় যে আমরা পড়ি নাই এ জন্য আল্লাহর শোকর। আমাদের এমামুয্যামান ও মাননীয় এমামের যোগ্যতা হলো- তাদেরকে আল্লাহ রব্বুল আলামিন সত্য মিথ্যার পার্থক্য করার জ্ঞান দান করেছেন এবং সত্য পথে সংগ্রাম করার তওফিক দান করেছেন। এ থেকে বড় যোগ্যতা আল্লাহর পক্ষ থেকে আর নাই।