প্রশ্ন-উত্তর

আমরা উম্মতে মোহাম্মদী। আমরা মনে করি বিভিন্ন তরিকা, মাজহাব, ফেরকার নামে দুঃখজনক বিভাজন সৃষ্টি করে জাতিটাকে ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। কিন্তু এক আল্লাহ, এক রসুল, এক কোর’আন, এক জাতি হওয়ারই কথা ছিল। সমস্ত পৃথিবীতে ন্যায় সত্য প্রতিষ্ঠা করার জন্য আল্লাহর রসুল যে জাতিটি গঠন করলেন সে জাতিটাকে তিনি সংগ্রামের দিকে পরিচালিত করে আল্লাহর কাছে চলে গেলেন। তারপর স্ত্রী, পুত্র পরিজন, সহায়, সম্পত্তি সব কিছু কোরবান করে দিয়ে সেই উম্মতে মোহাম্মদীর সদস্যরা দুনিয়ার বুকে ছড়িয়ে পড়লেন। তারা অর্ধ পৃথিবীতে ন্যায়, সুবিচার প্রতিষ্ঠা করলেন। একটা পর্যায়ে এসে এ উম্মতে মোহাম্মদী তাদের উদ্দেশ্য ভুলে গেল। এরপর তারা নিজেদের মধ্যে মতভেদ করে শিয়া-সুন্নি, শাফেয়ী-হাম্বলি হলো, নকশাবন্দিয়া, মুজাদ্দেদিয়া ইত্যাদি হলো। তারা আর উম্মতে মোহাম্মদী রইলেন না, এক জাতি রইলেন না। আল্লাহ তাদেরকে লানত দিলেন। ফলে তারা এখন সমস্ত দুনিয়ায় অন্য জাতিগুলোর গোলাম। তারা আজকে আল্লাহর গজবের বস্তু। কাজেই আমরা হেযবুত তওহীদ কোনো নির্দিষ্ট তরিকাপন্থি না। আমরা প্রকৃত উম্মতে মোহাম্মদী হবার চেষ্টা করছি, কারণ উম্মতে মোহাম্মদীর জন্যই জান্নাত সুনিশ্চিত, আল্লাহর রসুল তাদেরকেই শাফায়াত করবেন।

আমাদেরকে অনেকে অভিযোগ করে থাকেন যে, আপনারা সরকারের সাথে কাজ করছেন কেন? আবার অনেকে কথাটা অন্যভাবে বলেন যে, সরকারের দালালী অথবা লেজুড়বৃত্তি করছেন কেন? আসলে এই প্রসঙ্গে কথা বলতে গেলে কয়েকটা ধাপে কথাগুলি বলতে হবে নয়তো সামগ্রিক বিষয়টা পরিষ্কার হবে না।
প্রথমত, আওয়ামী লীগের সঙ্গে কাজ করছি বলতে যা বোঝানো হচ্ছে বিষয়টা তেমন নয়, আমরা আসলে সরকারের সঙ্গে কাজ করছি। আমরা যে বিশেষ করে এই সরকারের সঙ্গেই কাজ করছি বা করতে চাই তাও নয়, বিগত বিশ বছরে যে কয়টি সরকার পেয়েছি সবগুলো সরকারের সঙ্গে বা সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গেই কাজ করেছি। কারণ এমামুয্যামান আন্দোলনের জন্য এই নীতিটি স্থির করে দিয়ে গেছেন যে, সব সময় সরকারের সংস্পর্শে থেকে, সরকারকে জানিয়ে, সরকারের কর্মকর্তাদেরকে পরিষ্কার ধারণা দিয়ে কাজ করতে হবে। কারণ আমরা ইসলাম নিয়ে কাজ করি, ভুল বোঝাবুঝির অনেক সুযোগ এখানে থেকে যেতে পারে। তাই আমরা বিগত সরকারগুলোর সঙ্গেও কাজ করেছি, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সঙ্গেও কাজ করেছি, এমামুয্যামান জঙ্গিবাদ দমনের ব্যপারে আদর্শ দিয়ে সহযোগিতা করার জন্য লিখিতভাবে প্রস্তাবও দিয়েছিলেন। সুতরাং খালি যে এই সরকারের সঙ্গে বা এই সরকারের আমলে কাজ করছি বিষয়টি সত্য নয়। আর সরকার ও সরকারী দলকে আলাদা করা যায় না। তবে সরকার প্রথমে। এটা হচ্ছে প্রথম কথা।
দ্বিতীয় কথা হচ্ছে, আপনারা জানেন যে, আমরা একটা জাতিকে যদি একটা সমস্ত দেহের সঙ্গে তুলনা করি তাহলে সরকার হলো সেই দেহের মস্তিষ্কের জায়গায় আর জনগণ হলো সেই শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ। কাজেই মস্তকবিহীন যেমন শরীর চলে না তেমনি সরকারবিহীন জাতির কোনো কিছুই কল্পনা করা যায় না। আমাদের যে কাজ, যে যে কর্মকা- সেটি সমস্ত জাতিকে নিয়ে, একটি সামষ্টিক কর্মকা-। একটি জাতিকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে, অশান্তি-অপরাজনীতি, ধর্মব্যবসা, জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ করা। সেটা করা একটি আন্দোলনের একার পক্ষে, একজন ব্যক্তি বা কয়েকজন ব্যক্তির পক্ষে অসম্ভব, আর এটি গোপনে লুকিয়ে করার তো বিষয়ই নয়। আর এ কাজটি প্রকৃতপক্ষে সরকারেরই কাজ। আমরা করছি আমাদের ধর্মীয় দায়িত্বজ্ঞান ও সামাজিক কর্তব্যবোধ থেকে, সমাজে অশান্তি থাকলে সেটা আমাদেরকেও কষ্ট দেয় সেজন্য আমরা করছি, যেহেতু এটা করার পথ আমাদের কাছে আছে। কিন্তু এটা করতে সরকারের সহযোগিতা অপরিহার্য। সরকারের কাছে আছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শক্তি, অর্থ, আইন ইত্যাদি কিন্তু সমাজকে অন্যায়-অপরাধমুক্ত করতে সর্বাগ্রে প্রয়োজন সঠিক শিক্ষা ও আদর্শ দ্বারা মানুষের মানসিক পরিবর্তন সাধন অর্থাৎ মোটিভেশন, সেই আদর্শ আমাদের কাছে আছে যা আমাদেরকে, আমাদের এমামুয্যামানকে দান করেছেন। সরকারের শক্তি ও আমাদের আদর্শ এ দুইয়ের সম্মিলনে একটি শান্তিময় সমাজ আমরা গড়ে তুলতে পারি। এই কথাটিই আমরা সরকারকে পত্রিকার মাধ্যমে বুঝানোর চেষ্টা করছি, সাধারণ মানুষকেও বুঝাচ্ছি। আমরা সবাইকে উদ্বুদ্ধ করছি যেন তারা কেউ কোনো অন্যায়কারীকে সহযোগিতা না করে, দেশের ও জাতির ক্ষতি হয় এমন কোনো কাজে নিজেরাও অংশ না নেয়, অন্যকেও বাধা দেয় এবং তারা সম্মিলিতভাবে দেশের উন্নয়নে এগিয়ে আসে। এটি কেবল দেশপ্রেমই নয় তাদের এবাদত হিসাবে গণ্য হবে। তাহলে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সরকারের পক্ষে দেশের শান্তি রক্ষার জন্য এমন হিমসিম খেতে হবে না। সেই আদর্শ আমরা নিঃস্বার্থভাবে মানবতার কল্যাণে দিতে চাই। সরকার যদি আমাদের এই আদর্শকে অনুধাবন করেন এবং মানবতার কল্যাণে যদি সেটা কাজে লাগান তবে মানুষ উপকৃত হবে, সরকার উপকৃত হবে, সবাই উপকৃত হবে।
একটি জাতিকে ন্যায়ের পথে পরিচালিত করার ক্ষেত্রে মুখ্য দায়িত্ব কিন্তু সরকারের, সরকার জাতির অভিভাবক, তারা জনগণের ভালোমন্দ দেখার দায়িত্বটি গ্রহণ করেছেন। সরকার জনগণ থেকে অর্থ আদায় করেন এবং উন্নয়নমূলক কাজ করেন। এক কথায় জনগণের ভালো-মন্দের দায়-দায়িত্ব কিন্তু সরকারের। তাই জাতিকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে, অসত্যের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়ে গণপ্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য উদ্বুদ্ধ করার মুখ্য দায়িত্ব সরকারেরই। আমরা এখানে আল্লাহর রহমে বলতে পারি, একটা সঠিক আদর্শ সরকারকে দিয়ে সরকারকে সহযোগিতা করতে চাচ্ছি। যদি আমার ব্যক্তি স্বার্থ থাকতো তাহলে কেউ হয়তো আপত্তি তুলতে পারেন যে, আমরা সরকারের থেকে কোনো সুযোগ সুবিধার বিনিময়ে কাজ করছি। আমরা সরকারে যে দল আছে তাদেরকে মিটিংয়ে দাওয়াত দিচ্ছি, আমরা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদেরকে দাওয়াত দিচ্ছি, মন্ত্রীদেরকে বোঝানোর চেষ্টা করছি, এমপিদেরকে বোঝানোর চেষ্টা করছি, অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদেরকেও আমরা বোঝানোর চেষ্টা করছি। কাজেই সরকারের লোকদেরকে এই মহতি কাজে সম্পৃক্ত করে জাতির উন্নয়নের জন্য কাজ করা সরকারের দালালী করা বুঝায় না, দালালির সঙ্গে হীনস্বার্থ জড়িত থাকে। আমাদের প্রতিটি কাজকেই বাঁকা চোখে দেখার একটি শ্রেণি আছে। আমরা যখন ধর্মব্যবসায়ের বিরুদ্ধে কাজ করি তখন ধর্মব্যবসায়ীরা বলেন আমরা ইসলামবিরোধী, খ্রিষ্টান, মুরতাদ, কাফের। আমরা আল্লাহ-রসুলের কথা বলি, তাই বলা হয়েছে হেযবুত তওহীদ জঙ্গি। সরকারসহ এ জাতির অধিকাংশ মানুষই আমাদের সম্পর্কে এই ভুল ধারণাগুলো নিয়েই ছিল। আজ যখন আমাদের প্রাণান্তকর প্রয়াসে এবং আল্লাহ দয়াই সেই মিথ্যাগুলো বিদূরিত হচ্ছে, তখন সরকারসহ অনেকেই আমাদের সম্পর্কে সত্য জেনে এই মহৎ কাজে অংশ গ্রহণ করছেন। এখন একেও বাঁকা চোখে দেখে বলছে যে আমরা সরকারের দালালি করছি। সরকারের সঙ্গে আমাদের কোনো লিখিত চুক্তি বা মৌখিক চুক্তি হয়েছে তেমনও নয়। যারা ব্যক্তিগতভাবে আমাদের ব্যাপারে নিশ্চিতভাবে জেনেছেন তারা আমাদেরকে সহযোগিতার আশ্বাস দিচ্ছেন। এই হলো একদিকের কথা, আর অন্যদিকের কথা হলো:
বছর দুয়েক আগে আমরা যখন ব্যাপকভাবে এই সেমিনার-আলোচনা অনুষ্ঠান করতে লাগলাম তখন কিন্তু আমরা অন্যান্য দলের লোকদেরকে তেমন পাই নাই, আমরা দাওয়াত দিয়েছি তাদের। বিভিন্ন মামলা-মকদ্দমা, বিভিন্ন রাজনৈতিক সংকটের কারণে। যারা বিরোধীদলে আছেন বা যারা অন্যান্য দল করছেন, তাদেরকেও আমরা দাওয়াত করেছি। তাদের বাড়িতে গিয়েছি, অফিসে গিয়েছি। কিন্তু তাদের অনেককেই আমরা পাই নি। অনেকে বলেছেন, আমাদের নামে মামলা আছে, আমরা কীভাবে আপনাদের অনুষ্ঠানে আসবো? অনেকে বলেছেন যে, আমরা আপনাদেরকে সহযোগিতা করবো তবে এখন তো আমরা পারছি না। অনেকে আবার এই অভিযোগ করেছেন যে, সরকারী দলের লোকেরা মিটিংয়ে থাকবেন আমরা কিভাবে আসবো? এই পরিস্থিতিতে বাস্তব ক্ষেত্রে অনেককেই আমরা পাই নি। কিন্তু আমাদের কাজ তো করতে হবে, কাজেই আমরা আমাদের চলার পথে সহযোগী হিসেবে যাদেরকে পেয়েছি তাদেরকে নিয়েই কাজ করছি। আমরা আসলে ১৬ কোটি মানুষকে নিয়েই কাজ করতে চাই, এখানে এতে সরকার আর বিরোধীদলের মধ্যে ধারণাগতভাবে কোনো পার্থক্য আমাদের কাছে নেই।
আরেকটি কথা কিন্তু বলতে হয়। আপনারা ভালো করেই জানেন যে, সরকারের নিয়ন্ত্রণে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসন পরিচালিত হচ্ছে। বর্তমানে ইসলামের নামে সারা দুনিয়াতে একটা জঙ্গিবাদী কর্মকা- চলছে। ঢালাওভাবে পশ্চিমারা যারা ইসলামের কথা বলছে, ইসলামী দল করছে তাদেরকেই জঙ্গি হিসেবে আখ্যায়িত করা হচ্ছে, হয়রানি করা হচ্ছে। কাজেই আমাদের এখানেও এই দৃষ্টিভঙ্গির ব্যতিক্রম নয়। ‘হেযবুত তওহীদ’ প্রকৃত ইসলামের কথা বলছে। এইক্ষেত্রে আমরা যদি শান্তিপূর্ণভাবে কাজ করতে চাই তবে অবশ্যই আমাদের সরকারকে সুস্পষ্ট ধারণা দিয়েই করতে হবে, আমাদের ন্যায্যতার ব্যাপারে সরকারের দৃঢ় প্রত্যয় উৎপাদন করেই করতে হবে, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অবহিত করেই করতে হবে। তাদেরকে পাশ কাটিয়ে, তাদের থেকে গোপন থেকে কিছু করা যাবে না, তারা করতে দেবেও না। এবং সবচেয়ে বড় কথা আমাদের গোপন করার কিছু নেই। ঈসা (আ.) বলেছিলেন, প্রদীপ জ্বালিয়ে কেউ খাটের নিচে রাখে না। সূর্যের পক্ষে যেমন নিজের প্রভাকে গোপন করা অসম্ভব, তেমনি হেযবুত তওহীদ। এখানে গোপনের কিছু নেই, কাউকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ারও কিছু নেই যেহেতু জাতির কাজ। সেইজন্যই যেই সরকারই থাকুক না কেন সরকারকে নিয়ে কাজ করতে হবে।
আরেকটি কারণ হচ্ছে, ৭১ সালে যেহেতু আওয়ামী-লীগের একটা গৌরবময় ভূমিকা রয়েছে। জাতিকে শান্তি দেওয়ার স্বপ্ন ও প্রতিশ্র“তি নিয়েই কিন্তু তাদের নেতৃত্বে ৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধ হয়েছিল। আমরা তাদেরকে এটা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি যে, আপনারা জাতিকে শান্তি-সমৃদ্ধি, সুখ দেওয়ার জন্য জাতির প্রতি অঙ্গিকারাবদ্ধ; যদিও গত ৪৪ বছরে সেই সুখ-শান্তি আপনারা বা অন্য কেউই জাতিকে দিতে পারে নাই। কারণ একটা আদর্শের অভাব ছিল। সেই আদর্শটা আমরা দিচ্ছি। আসুন; আপনারা সেটা প্রয়োগ করে জাতির প্রতি আপনাদের অঙ্গীকার পূর্ণ করুণ।

এই কথা সত্য যে, বর্তমানে যে গণতন্ত্র চলছে এমন গণতন্ত্র আমরা চাই না। আমরা কী চাই তা একটু আগে বলেছি। গণতন্ত্রের নামে এখন যে তা-ব চলছে তা আমরা চাই না, তা কেউ চায় কিনা আমরা জানি না। আপনারা খোঁজ নিয়ে দেখতে পারেন এই গণতন্ত্র কেউ চায় কিনা।

 হ্যাঁ, আমাদের পিছনে অনেক বড় শক্তি আছে। বিরাট বিশাল শক্তি আছে। অসম্ভব, অসীম শক্তি আছে। এত বড় শক্তি পেছনে না থাকলে আমরা এই বিশ্বজোড়া অন্যায়ের বিরুদ্ধে জীবনেও দাঁড়াতে পারতাম না। আমাদের কি আছে? কিচ্ছু নেই। সমাজে আমাদেরকে কেউ চেনে না। আমাদের কোনো পরিচিতি নাই, আমরা সাধারণ পরিবারের লোক সবাই। আমাদের তেমন অর্থনৈতিক সামর্থ্যও নাই। গরিব নিঃস্ব লোক সবাই। আমরা দাঁড়িয়েছি এই পশ্চিমা বস্তুবাদী সভ্যতা দাজ্জালের বিরুদ্ধে, ধর্মব্যবসার বিরুদ্ধে, অসত্যের বিরুদ্ধে, এই পাহাড় পরিমাণ অন্ধকারের বিরুদ্ধে। যমুনা নদীর স্রোতকে উল্টে দেয়ার মতো প্রায় অসম্ভব কাজ নিয়ে আমরা দাঁড়িয়েছি। আমাদের পিছনে এই বিরাট শক্তি হলেন মহান রাব্বুল আলামিন। যিনি সমস্ত কিছু সৃষ্টি করেছেন, যিনি একটি অণু পরমাণু থেকে বিশ্বজগত সৃষ্টি করেছেন। যিনি কুন শব্দ দিয়ে সব কিছু সৃষ্টি করেন এবং যিনি একদিন সমস্ত কিছু ধ্বংস করে দিবেন। যিনি প্রত্যেকটা মানুষের মনকে নিয়ন্ত্রণ করেন, তিনি আমাদের সঙ্গে আছেন। আল্লাহ ভরসা, হাসবুন আল্লাহ নিশ্চয় আমাদের বিজয় সুনিশ্চিত। এত বড় শক্তি আমাদের সঙ্গে আছে, আমরা কাউকে পরোয়া করি না। এজন্য বলি আমরা বলি কোর’আনের ভাষায় যত পারো ষড়যন্ত্র করো আমাদেরকে বিরাম দিয়ো না।

হুজুর বলতে আজ যাদেরকে বোঝানো হয় তারা আসলে ইসলামের কেউ নয়। আজকে সমাজে এই পুরোহিত শ্রেণিটি ব্রিটিশদের দেয়া আল্লামা, মুফতি, মাওলানা, ইত্যাদি টাইটেল নিজেদের নামের আগে পিছে যোগ দিচ্ছেন এগুলো কতটুকু বৈধ, কতটুকু অবৈধ সেটা নিয়ে চিন্তা করার অবকাশ রয়েছে। আল্লাহর রসুলের সাহাবিরা কি এদের চেয়ে ইসলাম কম জানতেন? তাদের নামের সঙ্গে তো কোনো মাওলানা, গাউস কুতুব, আল্লামা জাতীয় খেতাব দেখি না? মাওলানা শব্দের অর্থ কী? মাওলা মানে প্রভু, আর মাওলানা মানে আমাদের প্রভু। ওরা কি আমাদের প্রভু? এই সত্য কথাগুলো বলি দেখে বলা হয়, আমরা হুজুরদের পেছনে লেগেছি। এ অভিযোগ সত্য নয়। আমরা বলছি ধর্ম এসেছে মানুষের কল্যাণ সাধনের জন্য, এটা বিক্রি করে খাওয়ার জন্য নয়। এটা করলে ধর্ম বিকৃত হয়ে যায়, সেটা থেকে মানুষ আর কল্যাণ পায় না, অকল্যাণ পায়। এজন্য আল্লাহ ধর্মব্যবসাকে হারাম করেছেন। এই সত্যটি আমরা মানবজাতির সামনে তুলে ধরেছি। এতে যাদের কায়েমি স্বার্থে আঘাত লেগেছে তারাই আমাদের বিরুদ্ধে লেগেছে, আমরা কারো পিছনে লাগি নি। আমরা হুজুর বলতে বুঝি কেবল একজনকেই, তিনি মহানবী (দ.)। সমাজে যারা আজ হুজুর হিসাবে পরিচিত আমরা তাদেরকে ছোট করছিনা। তারা আগেই ছোট হয়ে আছেন। সবাই তাদেরকে বলে দুই টাকার মোল্লা, দুই টাকা দিয়ে কেনা যায়। মসজিদ কমিটির সুদখোর সেক্রেটারির হাতে তার চাকরি বাঁধা, সেই কমিটির লোকদের জুতার তলা মুছতে মুছতে তাদের দফারফা, তাদের পেছনে আমরা লেগে কী করব? এত নিকৃষ্ট অবস্থা হয়েছে মসজিদের এমামদের, মুয়াজ্জিনদের। ধর্মব্যবসা করে, হারাম খেয়ে তারা নিজেদেরকে অনেক ছোট করে ফেলেছে। মানুষের কল্যাণে ভূমিকা রাখার জন্য তাদের কোনো আত্মিক শক্তি বা নৈতিক মনোবল কিছুই নেই। ছোট হতে হতে এত ছোট হয়েছেন যে সমাজে তাদেরকে আর খুঁজে পাওয়া যায় না, গোনা যায় না। এখন তারা কয়দিন পর পর কুয়ার ব্যাঙ এর মতো কুয়ার থেকে বেরিয়ে এসে একটা তা-ব সৃষ্টি করে, নৈরাজ্য সৃষ্টি করে আবার ইঁদুরের মতো পাগড়ির লেজ হাওয়ায় উড়িয়ে গর্তে লুকায়। এরা না পারছে মানবতার কল্যাণ করতে, না পারছে নিজেদের কল্যাণ করতে। কাজেই এরা নিজেরা নিজেদেরকে ছোট করেছে। আমরা বরং তাদেরকে ডেকে ডেকে এনে বড় করার চেষ্টা করছি। আমরা বলছি, আপনারা ধর্মব্যবসা থেকে হালাল উপার্জন করেন, মানুষের কল্যাণে কাজ করে, তাহলে আপনারা আল্লাহর কাছে বড় হবেন, মানুষের কাছে বড় হবেন। কিন্তু তারা এ ক্ষুদ্র স্বার্থে ধর্মব্যবসাকে টিকিয়ে রাখার জন্য অনেক ক্ষুদ্র হয়ে গেছেন। আজকে মুর্দা দাফন করলে তাদেরকে প্রয়োজন, বাচ্চার নাম রাখার জন্য তাদের ডেকে আনে, তাদেরকে আর কোনো কাজে সমাজের প্রয়োজন নাই। একজন অপরাধীকে অপরাধীকে হিসেবে চিহ্নিত করা কি তাকে ছোট করা হয়? মানবজাতির মধ্যে সবচেয়ে বড় অপরাধী এই ধর্মব্যবসায়ীরা।

 এ কথাটা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। এরা হঠাৎ করে এ দেশে সৃষ্টি হয়েছিল আর হঠাৎ করে সন্ত্রাসী কর্মকা- ঘটিয়েছিল। মানুষ তাদের সম্পর্কে জেনেছেই তাদের সন্ত্রাসী কর্মকা-ের দ্বারা। পক্ষান্তরে হেযবুত তওহিদ ২০ বছর ধরে এ দেশে কাজ করছে। এ ধরণের কথাবার্তা হেযবুত তওহীদের ব্যাপারে বলা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক এবং অন্যায়। আমাদের সম্পর্কে এ ধারণা করার মূল কারণ আমাদের বিরুদ্ধে অনেক অপপ্রচার হয়েছে।
বাংলা ভাইকে আজ এত গালাগালি করা হয়, মন্দ বলা হয়। কিন্তু আমাদের দেশে যারা গণতান্ত্রিক বা সমাজতান্ত্রিক ধারার রাজনীতি করছেন তারা কি নৃশংসতা, সন্ত্রাস, সহিংসতার দিক থেকে বাংলা ভাইকে ছাড়িয়ে যান নি? ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধেও পর ডান বলেন, বাম বলেন, সেকুলার বলেন এ পর্যন্ত যারা এদেশে রাজনীতি করেছেন তারা বাংলা ভাইকে ছাড়িয়ে গেছেন অনেক আগেই। বাংলা ভাই কয়টা লোক মেরেছেন, কয় জায়গায় বোম মেরেছেন, কয়জন ছাত্র হত্যা করেছেন, কয়জন মানুষ গুম করেছেন? তার তুলনায় গত ৪৪ বছরে এই রাজনীতিকরা কী করেছেন? কাজেই বলব, নিজের দিকে একটু তাকান, তারপর অন্যদের দিকে তাকাবেন। হেযবুত তওহীদকে এসব বাংলা ভাইদের সঙ্গে মিলিয়ে লাভ নেই। বাংলা ভাইদের উত্থানের বহু আগে থেকে এদেশে হেযবুত তওহীদ আছে। তাদের উত্থানের পর যখন গণমাধ্যমগুলো তাদের বিরুদ্ধে একচেটিয়া লিখতে লাগলো তারা হয়ে গেল ভিলেন। তাদের সম্পর্কে মানুষের মনে ঘৃণা বিদ্বেষ সৃষ্টি হলো। এরপর থেকে হেযবুত তওহীদের সদস্যরা যেখানেই কাজ করতে যেত, বহু স্থানে তাদেরকেও জে.এম.বি. সন্দেহ করে গ্রেফতার করা হয়েছে। আমাদের বিরুদ্ধে অন্তত চার শতাধিক মামলা হয়েছে যেখানে হেযবুত তওহীদকে জঙ্গি সন্দেহে আদালতে প্রেরণ করা হয়েছে, সেগুলোতে বিভিন্ন দলের সঙ্গে হেযবুত তওহীদকে জড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। পত্রিকায় হাজার হাজার সংবাদ ছাপা হয়েছে হেযবুত তওহীদের বিরুদ্ধে যেখানে বিভিন্ন নিষিদ্ধ দলের সঙ্গে হেযবুত তওহীদকে সুকৌশলে জড়িয়ে দেওয়া হয়েছে কিন্তু লাভ হয় নি। তদন্তে প্রতিবারই হেযবুত তওহীদ নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছে। যে আন্দোলনটা ২০ বছর যাবত কোনো আইন ভঙ্গ করে নি, কোনো অন্যায় করে নি, জীবন সম্পদ দিয়ে মানবতার কল্যাণে কাজ করে যাচ্ছে, নিজেদের সবকিছু বিলিয়ে দিয়ে নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে কতবড় নির্লজ্জ হলে তারা বাংলা ভাইদের সাথে হেযবুত তওহীদকে মেলায়? যারা এ প্রশ্নগুলো করে তাদের চরিত্র কী এ ৪৪ বছরে? এদেশে বামদের ইতিহাস আমরা জানি, নকশালপন্থী সর্বহারাদের ইতিহাস আমরা জানি, এদেশে যারা গণতন্ত্র করে তাদের ইতিহাস আমরা জানি। ২০১৩ সালে এই গণতান্ত্রিকরা ও ধর্মব্যবসায়ীরা সম্মিলিতভাবে যে তা-ব করেছে ১০০ বাংলা ভাইও একাজ করতে পারবে না। সত্য কথা তিতা হলেও বলতে হবে, না হলে মিথ্যা কখনও দূরীভূত হবে না।

 তাঁরা কেউই মাদ্রাসায় পড়েন নি। আল্লাহ রসুলের সময় বর্তমানের মতো কোনো মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থা ছিল না। সুতরাং মাদ্রাসায় না পড়লেই যে ইসলাম সম্পর্কে কথা বলতে পারবে না, এমন ধারণা অযৌক্তিক। বর্তমানে মুসলিম বিশ্বে যে মাদ্রাসাগুলো আপনারা দেখতে পাচ্ছেন সেগুলো আল্লাহর নাজেল করা প্রকৃত ইসলাম শিক্ষার প্রতিষ্ঠান নয়। এটা হলো একটি বিকৃত শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে মুসলিম জাতিকে রাজনীতিক ও ধর্মীয় নানা মতে পথে বিভক্ত করে পদানত করে রাখার একটি ব্রিটিশ ষড়যন্ত্র। ব্রিটিশরা যখন আমাদেরকে পদানত করেছিল তখন তারা আমাদেরকে একটি বিকৃত ইসলাম শিক্ষা দেয়ার জন্য এই মাদ্রাসাগুলো প্রতিষ্ঠা করেছিল, তারাই এর সিলেবাস কারিকুলাম সব তৈরি করেছিল। তাদের উদ্দেশ্য ছিল আমরা যেন আর কোনোদিন ইসলামের সেই নীতি আদর্শের দিকে ফিরে না যাই, শাসকের অন্যায়ের বিরুদ্ধে যেন ঐক্যবদ্ধ হয়ে সংগ্রাম করতে না পারি। ব্রিটিশদের তৈরি বিকৃত ইসলাম শিখেই মাদ্রাসা থেকে বেরিয়ে এসেছে ধর্মব্যবসায়ী শ্রেণি, বিকৃত ইসলামের আলেমরা, যারা ফতোয়াবাজী, মাসলা-মাসায়েল, ফেরকা-মাযহাব ইত্যাদি নিয়ে নিজেরা দ্বন্দ্ব, বাহাসে, দলাদলিতে লিপ্ত থাকে। দেশ জাতি ধ্বংস হয়ে গেলেও সেদিকে তাদের কোনো ভ্রুক্ষেপ থাকে না। তারা কোনোদিন মানবতার কল্যাণে এতটুকু ভুমিকা রাখতে পারে নি। হয়তো দু একজন ব্যতিক্রম থাকতে পারেন যারা মানবতার মুক্তির জন্য সংগ্রাম করেছেন তবে সেটা অন্য কোনো মহান ব্যক্তির দ্বারা দীক্ষিত ও অনুপ্রাণিত হয়ে, মাদ্রাসার শিক্ষার প্রভাবে নয়। ধর্মব্যবসা করেই তাদের জীবন চলে। কাজেই আল্লাহ রসুলের বর্ণনা মোতাবেক এ শ্রেণির আলেমরা হলো আসমানের নিচে নিকৃষ্টতম জীব। সুতরাং এসব মাদ্রাসায় যে আমরা পড়ি নাই এ জন্য আল্লাহর শোকর। আমাদের এমামুয্যামান ও মাননীয় এমামের যোগ্যতা হলো- তাদেরকে আল্লাহ রব্বুল আলামিন সত্য মিথ্যার পার্থক্য করার জ্ঞান দান করেছেন এবং সত্য পথে সংগ্রাম করার তওফিক দান করেছেন। এ থেকে বড় যোগ্যতা আল্লাহর পক্ষ থেকে আর নাই।

এই প্রশ্নটি আমাদেরকে প্রায়ই করা হয়। আমরা অনেককে জিজ্ঞাসা করেছি যে “শরীরে ইসলাম নাই” বলতে আপনি কি বুঝাতে চেয়েছেন? তারা বলেছেন, ‘আপনাদের দাড়ি নাই, টুপি নাই, পাগড়ি নাই, গায়ে জোব্বা নাই। আগে নিজেদের শরীরে ইসলাম কায়েম করতে হবে, তারপরে দুনিয়াতে কায়েম করার প্রশ্ন’। এ প্রশ্নের জবাবে প্রথমেই আমি বলব, ইসলাম আসলে কি এবং কেন, তা আগে আমাদের বুঝতে হবে। এটা পরিষ্কার হলে আমরা বুঝতে পারব আসলে দাড়ি, টুপি, পাগড়ির সাথে এসলামের সম্পর্ক কতটুকু।
ইসলাম শব্দটি এসেছে ‘সালাম’ থেকে যার অর্থ শান্তি। শান্তি ও ইসলাম সমার্থক। সমস্ত রকম অন্যায়, অত্যাচার, জুলুম, মারামারি, রক্তপাত থেকে মানবজাতির মুক্তির জন্য আল্লাহ আদম থেকে শুরু করে শেষ রসুল পর্যন্ত সকল নবী-রসুল-অবতারদের মাধ্যমে যে জীবন-ব্যবস্থা পাঠিয়েছেন তার নাম আল্লাহ রেখেছেন ইসলাম। সকল সত্যই ইসলামের অন্তর্ভুক্ত। সত্য হচ্ছে শান্তির উৎস, মিথ্যা যাবতীয় অশান্তির উৎস। আল্লাহর দেওয়া এই সত্যময় জীবন-ব্যবস্থা, দীনুল হক যদি মানুষ পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, বিচার-ব্যবস্থায় অর্থাৎ তার সমগ্রিক জীবনে চর্চা করে তাহেেল তারা শান্তিতে থাকবে। এই শান্তির নামই ইসলাম। ১৪০০ বছর আগে এই শান্তি এসেছিল অর্ধেক দুনিয়াতে।
এই হল ইসলাম শব্দের শাব্দিক ও প্রায়োগিক অর্থ। এই ধারণা মোতাবেক এসলামের সাথে দাড়ি, টুপি, পাগড়ি, জুব্বার সম্পর্ক কোথায়? ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন-ব্যবস্থা অর্থাৎ রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি, বিচারব্যবস্থা ইত্যাদি সব কিছুই ইসলাম নামক জীবন-ব্যবস্থার এক একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সুতরাং যারা আমাদের শরীরে ইসলাম নাই এই প্রশ্ন করেন তাদের কাছে আমার প্রশ্ন একটি দেশের সব মানুষ যদি দাড়ি রাখে, টুপি পরে, জোব্বা গায়ে দেয় কিন্তু তাদের সামষ্টিক জীবনের ঐ বিষয়গুলো যদি এসলামের না হয় তাহলে কি সেই দেশে শান্তি এসে যাবে? আসবে না। কারণ ইসলাম আসার আগেও আরবের মানুষগুলো আরবীয় পোশাকগুলো পরত, তাদেরও দাড়ি ছিল। আসলে এই শেষ দীনে কোন নির্দিষ্ট পোষাক হতে পারে না, কারণ এটা এসেছে সমস্ত পৃথিবীর মানুষের জন্য। পৃথিবীর মানুষ প্রচ- গরমের দেশে, প্রচ- শীতের দেশে, নাতিশীতোষ্ণ দেশে, অর্থাৎ সর্বরকম আবহাওয়ায় বাস করে, এদের সবার জন্য এক রকম পোষাক নির্দেশ করা অসম্ভব। তা করলে এ দীন সমস্ত মানব জাতির জন্য প্রযোজ্য হতে পারত না, সীমিত হয়ে যেতো। তাই আল্লাহ ও তার রসুল (দ.) তা করেনও নি। বিশ্বনবীর (দ.) সময়ে তার নিজের এবং সাহাবাদের পোষাক-পরিচ্ছদ ও তখনকার আরবের মোশরেক ও কাফেরদের পরিচ্ছদ একই ছিল। বর্তমানেও আরবে মুসলিম আরব, খ্রিষ্টান আরব ও ইহুদি আরবদের একই পোষাক-পরিচ্ছদ। দেখলে বলা যাবে না কে মুসলিম, কে খ্রিষ্টান আর কে ইহুদি। এসলামে পোশাকের ব্যাপারে আল্লাহ এমন বিশ্বজনীন একটি নীতি দিয়েছেন যা পৃথিবীর যে কোন প্রান্তের মানুষের জন্যই অনুসরণযোগ্য, সেটা হচ্ছে তিনি পুরুষদের জন্য সতর নির্দ্ধারণ করেছেন নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত (এ নিয়েও মতভেদ আছে)। আল্লাহ বা রসুল কেউই বলে দেন নি যে দেহের এই স্থান কী পোশাক দিয়ে আবৃত করতে হবে।
টুপি ইহুদী, শিখ বা অন্যান্য ধর্মের ধর্মগুরুরাও পরেন, তাদেরও দাড়ি আছে, তারাও জুব্বা পরেন, তাদের অনেকেই পাগড়ি পরেন। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দাড়ি, টুপি, জোব্বা সবই ছিল। আল্লাহর অস্তিত্বে সম্পূর্ণ অবিশ্বাসী হিসাবে পরিচিত অনেকেরই দাড়ি ছিল যেমন কার্ল মার্কস, চার্লস ডারউইন, আব্রাহাম লিঙ্কন প্রমুখ। হয়ত বলতে পারেন তাদের টুপি, জুব্বা, পাগড়ি, দাড়ি মুসলিমদের মত না। হ্যাঁ, তা হয়ত ঠিক, কিন্তু টুপির আকার-আকৃতি ও রং নিয়ে, জুব্বার আকার-আকৃতি নিয়ে, পাগড়ির রং, দাড়ির পরিমাণ ইত্যাদি নিয়ে আলেম ওলামাদের মধ্যে বিস্তর মতভেদ রয়েছে। ছোটখাটো বিষয় নিয়ে মতবিরোধে গিয়ে মূল উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত হয়ে যাওয়া একপ্রকার মুর্খতা বলেই আমরা মনে করি। গত কয়েক শতাব্দী ধরে এ জাতির দুর্ভাগ্যজনক পরাজয়ের কারণ এগুলিই। অথচ এটা ইতিহাস যে রসুলের সাহাবিদের অনেকেরই গায়ে জোব্বা তো দূরের কথা ঠিকমত লজ্জাস্থান ঢাকার মত কাপড় সংস্থান করতেও কষ্ট হতো।
কোন সন্দেহ নেই, বিশ্বনবী (দ.) তার অনুসারীদের একটা নির্দিষ্ট দৈর্ঘ্যের দাড়ি রাখতে বলেছেন। কেন বলেছেন? এই জন্য বলেছেন যে, তিনি যে জাতিটি, উম্মাহ সৃষ্টি করলেন তা যেমন পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ জাতি তেমনি বাইরে থেকে দেখতেও যেন এই উম্মাহর মানুষগুলি সুন্দর হয়। আদিকাল থেকে দাড়ি মানুষের পৌরুষ ও সৌন্দর্যের প্রতীক হয়ে আছে। সিংহের যেমন কেশর, ময়ূরের যেমন লেজ, হাতির যেমন দাঁত, হরিণের যেমন শিং, তেমনি দাড়ি মানুষের প্রাকৃতিক পৌরুষ সৌন্দর্য। এই সৌন্দর্য নষ্ট না করার উদ্দেশ্যেই দাড়ি রাখার নির্দেশ।
দাড়ি, টুপি, পাগড়ি, জোব্বা ইত্যাদিকে আমরা অপ্রয়োজনীয় বিষয় বলছি না বা কোন রকম অসম্মানও করছি না। আমরা শুধু বলছি এই দীনের প্রকৃত উদ্দেশ্য আজ যেমন উল্টো হয়ে গিয়েছে তেমনি এর বাহ্যিক দিকটিও বিকৃত দীনের আলেমরা অপরিসীম অজ্ঞতায় উল্টে ফেলেছেন। দাড়ি রাখা, বাহ্যিক পোষাক-পরিচ্ছদ ইত্যাদি এই দীনের বুনিয়াদী কোন ব্যাপার নয় অর্থাৎ ফরদ নয়, সুন্নত। তাও রসুলের একেবারে ব্যক্তিগত সুন্নত যে ব্যাপারে রসুলাল্লাহ তাঁর একটি অন্তীম অসিয়তে বলেছেন, হে মানবজাতি! আগুনকে প্রজ্জলিত করা হয়েছে এবং অশান্তি অন্ধকার রাত্রির মতো ধেয়ে আসছে। আল্লাহর শপথ, আমি আমার থেকে কোনো কাজ তোমাদের উপর অর্পণ করি নি, আমি শুধু সেটাই বৈধ করেছি যেটা কোরা’আন বৈধ করেছেন, আর শুধু সেটাই নিষেধ করেছি যেটা কোর’আন নিষেধ করেছে। রসুলাল্লাহর প্রথম জীবনীগ্রন্থ সেরাত ইবনে ইসহাকে এ কথাটি আছে। সুতরাং দাড়ি-টুপি (লেবাস) যদি এই দীনের কোন ফরদ বা বুনিয়াদী বিষয় হতো, তবে কোর’আনে একবার হলেও এ বিষয়ে নির্দেশ দেওয়া হতো। আল্লাহর রসুল এটা সুস্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছেন যে- আল্লাহ তোমাদের বাহ্যিক অবস্থা, পোশাক, চেহারা বা সম্পদ কোন কিছুর দিকেই দৃষ্টিপাত করেন না, তিনি দেখেন তোমাদের হৃদয় এবং তোমাদের কাজ। [আবু হুরায়রা (রা.) থেকে মুসলিম]।
তাই ‘দাড়ি এসলামের চিহ্ন’, ‘দাড়ি না রাখলে এসলামের কথা বলা যাবে না’ এ ধারণা সঠিক নয়। সেজন্য হেযবুত তওহীদে কেউ যদি দাড়ি রাখতে চায় আমরা এটুকুই বলি, যদি দাড়ি রাখেন তবে, রসুল যেভাবে দাড়ি রাখতে বলেছেন সেভাবে রাখুন যেন সুন্দর, পরিপাটি (ঝসধৎঃ) দেখায়। রসুলাল্লাহর যে কোনো সুন্নাহই কল্যাণকর, তাই ব্যক্তিগত জীবনেও রসুলাল্লাহর যা কিছু অনুসরণ করা হবে তাতে মানুষ কল্যাণ পাবে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে আগে কোনটা? আজ সারা পৃথিবীতে কোথাও আল্লাহকে বিধানদাতা হিসাবে মানা হচ্ছে না। মুসলিম নামের এই জনসংখ্যাও পাশ্চাত্যের বস্তুবাদী সভ্যতাকে বিধাতার আসনে বসিয়ে রেখেছে। এ কারণে আল্লাহর দৃষ্টিতে তারা কাফের-মোশরেক হয়ে আছে। আল্লাহর রসুল বলেছেন, এমন সময় আসবে যখন মানুষ তাহাজ্জুদ পড়বে কিন্তু ঘুম কামাই করা হবে, সওম রাখবে কিন্তু না খেয়ে থাকা হবে (হাদিস)। রসুলাল্লাহ বর্ণিত সেই সময়টি এখন। যেখানে তাহাজ্জুদ, সওমের মত একনিষ্ঠ আমলও বৃথা যাবে, সেখানে দাড়ি, টুপি, পাগড়ি, জোব্বার মত আমল গৃহীত হওয়ার তো প্রশ্নই আসে না।

আসলে বর্তমানে মানুষের মনে ইসলাম সম্পর্কে ধারণা হচ্ছে, ইসলাম মানেই দাড়ি, টুপি, মসজিদ, মাদ্রাসা, আলেম ওলামা, সুর করে কোর’আন তেলাওয়াত, আযান দেয়া, হজ্জ করা ইত্যাদি। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ইসলাম শব্দের অর্থ হলো শান্তি অর্থাৎ ন্যায়বিচার, ঐক্য, সাম্য, ভ্রাতৃত্ব, শৃংখলা, আনুগত্য, কোথাও অভাব নেই, অনটন নেই, দুঃখ নেই, যন্ত্রণা নেই এমন একটা পরিস্থিতির নাম ইসলাম। এই ১৬ কোটি বাঙালি কি মসজিদ মাদ্রাসায় বসবাস করে? না, তারা প্রেসক্লাবে থাকে, উপাসনালয়ে থাকে, সিনেমা হলে থাকে, সংসদে থাকে, ঘরে থাকে, তারা হাটে থাকে, বাজারে থাকে, রাস্তাঘাটে থাকে, অনেক আপত্তিকর জায়গায়ও তারা সর্বত্র থাকে। মানুষ যেখানে আছে সেখানেই সত্য পৌঁছানো আমাদের কর্তব্য। ইসলামের মানে বুঝতে হবে। ইসলাম মানে দাড়ি, টুপি, পাগড়ি পায়জামা নয়। ইসলামকে এখানে বন্দী করা হয়েছে।
আমরা মসজিদ মাদ্রাসায় কাজ করছি না, এটা সম্পূর্ণ সত্য নয়। বেশ কিছু মাদ্রাসায় আমরা প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনী অনুষ্ঠান ইতোমধ্যে করেছি। পত্রিকা তো যাচ্ছেই। কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে এড়িয়ে কাজ করা আমাদের নীতি নয়। আমরা আমাদের কর্মকা-ে সর্বশ্রেণির মানুষের সম্পৃক্ততা আশা করি। কিন্তু মসজিদ মাদ্রাসায় যারা থাকেন তাদের অধিকাংশই ধর্মব্যবসায়ী এবং আমরা ধর্মব্যবসায়ীদের মুখোশ উন্মোচন করে দিচ্ছি। এ কারণে ধর্মব্যবসায়ীরা আমাদের কাজে সহযোগিতা করা দূরে থাক, গত ২০ বছর ধরে ঘোর বিরোধিতা করে আসছে। এখনও তারা আমাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা কথা বলে মানুষকে ক্ষেপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছে। তথাপিও আমরা আশাবাদী যে সত্যনিষ্ঠ আলেমদের সহযোগিতা পেলে মাদ্রাসার ছাত্রদের সঙ্গে ব্যাপক আকারে কাজ করার ক্ষেত্র প্রস্তুত হবে।

আমাদের এমামুয্যামান সরকারকে বেশ কয়েকবার ভিন্ন ভিন্ন বিষয়ে পত্র মারফত প্রস্তাবনা দিয়েছেন। ১৮ মে ২০০৮ এ তিনি প্রথম চিঠিটি দেন হেযবুত তওহীদের কার্যক্রমের বিষয়ে সরকারকে কোনো সুস্পষ্ট নীতি অর্থাৎ ঈড়হংরংঃধহপব ঢ়ড়ষরপু গ্রহণ করে একটি সমঝোতায় উপনীত হওয়ার প্রস্তাব করেন। তখন দেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছিল। পরে যখন নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এলো, তিনি আবারও সেই প্রস্তাবনা নতুন সরকারকে প্রেরণ করেন। জঙ্গিবাদ নির্মূলে বাংলাদেশ সরকারকে সহায়তা করার প্রস্তাব দিয়ে এমামুয্যামান চিঠি প্রেরণ করেন ২২ এপ্রিল ২০০৯ তারিখে। তিনি সে প্রস্তাবনায় বলেছিলেন শক্তি প্রয়োগে জঙ্গি দমন সম্ভব নয়। সেটার সত্যতা প্রমাণিত হয়েছে। আজ পর্যন্ত দমন হয়নি বরং বৃদ্ধি পেয়েছে। তবু ভুল পথেই এখনো চেষ্টা চালানো হচ্ছে। অপচয় হচ্ছে সরকারের বিপুল অর্থ ও সময়।

হ্যাঁ। সৃষ্টি বা ক্রিয়েচার হিসাবে পৃথিবীর সমস্ত গরু যেমন এক জাতি, তেমনি পৃথিবীর সমস্ত মানুষ এক জাতি। এই হিসাবে আপনার কথা ঠিক আছে। কিন্তু গরুরা গরুদের বিরুদ্ধে লড়াই করছে না, একের অধিকারে অন্যে হস্তক্ষেপ করছে না। মানুষ সেটা করছে তাই কার্যত তারা এক জাতি নেই, তারা হাজার হাজার দলে বিভক্ত হয়ে গেছে। এদের সবাইকে একতাবদ্ধ না করা গেলে রক্তপাত, হানাহানি বন্ধ হবে না- এটাই আমরা বলতে চাই। আমরা পৃথিবীর সমস্ত মানবজাতিকে বলছি যে, তোমরা এক জাতি আরেক জাতিকে হামলা করো না, ধ্বংস করো না, খনিজ সম্পদ লুটে নিও না, পানি আটকে রেখে কষ্ট দিও না, সেও তোমার ভাই, সেও মানুষ। আল্লাহ সৃষ্টি আলো, বাতাস, পানিতে তোমার যেমন অধিকার তেমনি তারও অধিকার। তুমি যে আল্লাহর সৃষ্টি, সেও ওই আল্লাহরই সৃষ্টি। তোমরা উভয়ই আদম-হাওয়ার সন্তান। ভাই-ভাই লড়াই করলে পিতা-মাতা যেমন খুশি থাকতে পারে না তেমনি তোমাদের ভ্রাতৃঘাতী লড়াই দেখে তোমাদের আদি পিতা-মাতা কষ্ট পাচ্ছেন। তোমরা এক জাতি। এই যে ধারণা- আমরা সকলের মধ্যে এই ধারণা সৃষ্টি করতে চাই যে, ধারণাগতভাবে, অনুভূতির দিক থেকে সকল মানুষই এক জাতি।
তখন মানুষ চিন্তা করবে যে, তাদের বর্ডার তারা রাখবে কিনা, দুই ভাইয়ের বাড়ির মাঝে কোনো বেড়া থাকবে কি থাকবে না, সেটা সময়ই বলবে। এখানে তো বর্ডার তুলে ফেলার বা সরকার সরিয়ে ফেলার কোনো প্রশ্ন আসছে না। আমরা তো আসল কাজটিই করতে পারছি না। আমরা চাই একজাতির ধারণা সৃষ্টি করতে। বর্তমানে আমেরিকানরা চিন্তা করছেন ইরাকিরা মরলে মরুক, আমেরিকানরা বেঁচে থাকলেই হলো, আবার ভারতীয়রা হয়তো ভাবছেন, পাকিস্তানিরা মরলে মরুক, আমরা বাঁচলেই যথেষ্ট। আমরা এই ভাবনাটাকে অস্বীকার করে, আমরা ভাবতে চাই, তারাও আমার ভাই। আমার ভাই মরুক এটা আমি চাই না। এই ধারণাটা সবার মধ্যে আসলে মনের মধ্যে যে বর্ডার সেটা লুপ্ত হয়ে যাবে, তখন কাঁটাতারের বর্ডার কোনো সমস্যা সৃষ্টি করতে পারবে বলে মনে করি না। তখন একদেশের সীমানায় নদীতে বাধ দিয়ে ভাটির দেশকে মরুকরণ করা হবে না। সেটা হচ্ছে আন্তর্জাতিক প্রসঙ্গ। আমাদের নিজেদের দেশের মধ্যে তো কোনো বর্ডার নেই। তাহলে আগে আমরা এই ষোল কোটি এক হই না কেন? আমাদের মধ্যেও তো এই ভ্রাতৃত্বের ধারণা নেই। আমরা ভাবি অমুকে আওয়ামী লীগ, অমুকে বিএনপি, অমুকে হিন্দু, অমুকে চাকমা। আগে তাদের মধ্যে ধারণা সৃষ্টি হতে হবে যে, আমরা ভাই ভাই। আজ হিন্দুর ঘরে মুসলিম খায় না, প্রতিবেশী বাঙালির ঘরে আগুন দেয় চাকমা, চাকমাকে আক্রমণ করে বাঙালি। আগে এই দেওয়াল ভাঙতে হবে। তাদের বুঝতে হবে, স্রষ্টার কোনো জাত নেই, তাই মানুষেরও কোনো জাত নেই। সবাই একজাতি, কেউ উপজাতি নয়, কেউ সংখ্যালঘু নয়। এক মানুষের ঘরে আরেক মানুষ খেলে কারো জাত যাবে না। এই ধারণাই তো হয় নি এখনও, এটা আমরা সৃষ্টি করতে চাই। এই শিক্ষাটা ব্যাপকভাবে প্রসার করে আমরা ধারণাগতভাবে (ঈড়হপবঢ়ঃঁধষষু) মানবজাতিকে একজাতি করতে চাই।

এটি দুঃখজনক বিষয় যে আমাদের দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ কি ইসলামের চেতনার পক্ষে হয়েছে না বিপক্ষে হয়েছে– এ প্রশ্নের সমাধান আজও হয় নি। অধিকাংশ আলেম মনে করেন ইসলামের চেতনার বিরুদ্ধে হয়েছে, অন্যরা মনে করেন এর সঙ্গে ইসলামের কোনো স¤পর্ক নেই। এ প্রশ্নটি নিয়ে ৪৪ বছর পরও রাজনীতি ও ধর্মব্যবসা দুটোই চলমান আছে। আমরা যতই একাত্তরের চেতনা নিয়ে আবেগ প্রদর্শন করি না কেন, ধর্মের প্রশ্নে এসে সেই আবেগ, জাতীয় ঐক্য দেশপ্রেম দ্বিধাবিভক্ত ও পরাজিত হতে বাধ্য। তাই এ প্রশ্নের সমাধান হওয়াটা জরুরি।
উত্তরবঙ্গের জনৈক পুলিশ সুপার হেযবুত তওহীদের একজন সদস্যকে প্রশ্ন করেছিলেন, আপনারা একাত্তর সাল (মুক্তিযুদ্ধ) স্বীকার করেন কিনা? আবার এক জায়গায় জিজ্ঞাসা করা হয়, একাত্তর সালে বাংলাদেশের কয়জন মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল বলে মনে করেন? মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এমন আরও অনেক প্রশ্নের মুখোমুখী হতে হয়েছে আমাদের। একদিকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, অন্যদিকে স্বাধীনতাবিরোধী চেতনা নাম দিয়ে যে বিতর্ক ও বিভক্তি বছরের পর বছর জিইয়ে আছে, তা কারা কী উদ্দেশ্যে জিইয়ে রেখেছে সেটাই এক দুর্বোধ্য বিষয়।
এক শ্রেণির বুদ্ধিজীবী আছেন যারা অবিশ্রান্ত প্রচারণা চালিয়ে একটি মতবাদ প্রায় প্রতিষ্ঠা করে ফেলেছেন যে, ‘একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল ধর্মের বিরুদ্ধে, বিশেষত ইসলামের বিরুদ্ধে। অতঃপর নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ইসলামপন্থীরা পরাজিত হয় আর ধর্মবিরোধীদের উত্থান ঘটে।’ যারা এই প্রচারণায় প্রভাবিত তারা যখন হেযবুত তওহীদকে ধর্মের কথা বলতে শোনেন, ইসলামের কথা বলতে শোনেন, তাদের মনে স্বাভাবিকভাবেই সন্দেহের উদ্রেক হয় যে, হেযবুত তওহীদ মুক্তিযুদ্ধকে স্বীকার করে কিনা। তাদের জ্ঞাতার্থে বলছি ’৭১ এর যুদ্ধ ইসলামের বিরুদ্ধে হয় নি, ধর্মের বিরুদ্ধে হয় নি, যুদ্ধ হয়েছিল পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকদের অন্যায়, অবিচার, যুলুম, বঞ্চনা, শোষণ ও বৈষম্যমূলক নীতির বিরুদ্ধে। এখনও অনেক মুক্তিযোদ্ধা জীবিত আছেন, তারা কেউই বলেন না যে, তারা ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধে গিয়েছিলেন। আসলে লক্ষ লক্ষ বাঙালি যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল ন্যায়, শান্তি ও সাম্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে, নিজেদের অধিকার আদায় করতে। পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকরা ধর্মকে অপরাজনীতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতো, ধর্মের নাম করে অধর্ম করতো, বাঙালিরা লড়েছে সেই অধর্মের বিরুদ্ধে। সুতরাং ন্যায়, শান্তি ও সাম্য প্রতিষ্ঠার লড়াইকে হেযবুত তওহীদ অস্বীকার করতে পারে না, কেননা হেযবুত তওহীদের সদস্যরা পৃথিবীতে ন্যায় ও সত্য প্রতিষ্ঠার জন্যই সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে।
ইসলামের আলোকে স্বাধীনতা যুদ্ধ সম্পর্কে বিবেচনা করতে গেলে প্রথমেই আমাদেরকে দেখতে হবে এ যুদ্ধের প্রেক্ষাপটটা কী। ইতিহাস যদি আমরা ভুলে যাই তাহলে বর্তমানকে উপলব্ধি করতে পারব না, আমার ভবিষ্যৎ গন্তব্যও বিভ্রান্তিময় হবে।
এ উপমহাদেশ দু’শ বছর ব্রিটিশদের অধীনে ছিল। পুরো ভারতবর্ষকে শোষণ করতে করতে তারা সমৃদ্ধ হয়েছে, আর আমাদেরকে নিঃস্ব ভিখারি বানিয়েছে। তারা এখানে হিন্দু-মুসলিম শত্র“তা ও দাঙ্গা সৃষ্টি করেছে। এভাবে আমাদের জাতীয় রাজনীতিতে দুটি মেরু সৃষ্টি করেছিল সেই ব্রিটিশরাই যারা নিজেদেরকে ধর্মনিরপেক্ষতার অবতার মনে করে। তারাই বানিয়েছিল কংগ্রেস আর মুসলিম লীগ। এভাবে উপমহাদেশে তারা সাম্প্রদায়িকতাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে। ধর্মের ভিত্তিতেই তারা ভারতবর্ষের মানচিত্রে দেশবিভাগ ঘটিয়েছে- হিন্দুস্তান ও পাকিস্তান। এ ছিল এক সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্র যার ফলে এই উপমহাদেশে আজও বিরাজ করছে রাষ্ট্রীয় ও ধর্মীয় শত্র“তার সম্পর্ক।
দেশবিভাগের সময় পাকিস্তানের নেতারা দাবি করলেন যে, পাকিস্তান হবে ইসলামী রাষ্ট্র, নাম দিল ওংষধসরপ জবঢ়ঁনষরপ ড়ভ চধশরংঃধহ, কিন্তু বাস্তবে তারা কী করলেন? তারা আল্লাহর সাথে, ঈমানদার মানুষের সাথে ও মানবতার সাথে গাদ্দারি করে ভোগ-বিলাসে গা ভাসিয়ে দিলেন পূর্বতন ভাইসরয়দের মতোই। পূর্ব পাকিস্তানকে উপনিবেশ বানিয়ে ব্রিটিশদের মতই শোষণ করতে লাগলেন। এ দেশের মানুষকে তারা মানুষই মনে করলেন না, এদের ভাষাকেও তারা পরিবর্তন করে দিতে চাইলেন। এভাবে চব্বিশটি বছর বঞ্চনার শিকার হয়েছে পূর্ব পাকিস্তানের নাগরিকগণ, যাদের অধিকাংশই পাকিস্তানীদের মতই মুসলিম বলে পরিচয় দেয়। এই বঞ্চিত মানুষগুলোর মনে ক্ষোভ থাকাটা অস্বাভাবিক ছিল না। অত্যাচারিত মানুষ ঐক্যবদ্ধ হলে সেখানে শক্তির বিস্ফোরণ হয় এটাই স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক। কাজেই পাকিস্তানি শাসকদের ধর্মের নামে প্রতারণা, সামরিক শাসন, অবিচার, অত্যাচারের চূড়ান্ত পরিণতিই একাত্তরের যুদ্ধ। যুদ্ধ ছাড়া পূর্ব পাকিস্তানের কোনো উপায় ছিল না। রাজনৈতিকভাবে বহু সমাধানের চেষ্টা করেও পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকদের পক্ষে থেকে কোনো ইতিবাচক মনোভাব দেখা যায় নি। বঙ্গবন্ধু ’৭০ এর নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছিলেন, কিন্তু সেই বিজয়কে অস্বীকার করা হয়েছিল। উপরন্তু ২৫ মার্চ রাতে অতর্কিত হামলা করে নির্মমভাগে কথিত ‘মুসলিম’ ভাইদের উপর গণহত্যা চালিয়েছিল পাকিস্তানী সেনাবাহিনী। সুতরাং আত্মরক্ষার প্রশ্নেও যুদ্ধ সর্ববিধানে বৈধতা পায়। আর অন্যায়ের প্রতিবাদ না করে পড়ে পড়ে মার খাওয়াকে কখনোই ইসলাম সমর্থন করে না।
তাছাড়া পূর্ব পাকিস্তান আর পশ্চিম পাকিস্তান – হাজার মাইল দূরত্বে অবস্থিত এই দুটি ভূখ- কোনোভাবেই একসাথে চলতে পারত না। ভাষা, পোশাক, আচার-আচরণ, দৃষ্টিভঙ্গি সব দিক থেকে পশ্চিম পাকিস্তান ও পূর্ব পাকিস্তান ছিল পৃথক। একটি মাত্র ঐক্যসূত্র হতে পারত ধর্ম। কিন্তু প্রকৃত ইসলাম তো হারিয়েই গেছে ১৩০০ বছর পূর্বেই। তথাপি যে ইসলামের ধুয়া তুলে তারা সাতচল্লিশে ভাগ হলো সেই চেতনাকেই কবর দিয়ে, একমাত্র ঐক্যসূত্রকে ছিঁড়ে ফেলে ব্রিটিশদের মতো ঔপনিবেশিক শাসননীতি চালিয়ে পাকিস্তান কী করে এই দেশকে নিজেদের আয়ত্ব রাখতে পারত? অধিকন্তু দেশটি যখন পাকিস্তানের বৈরী দেশ ভারতের পেটের ভেতরে, তখন এই বিচ্ছিন্নতা ৭১ সালে হোক আর তার পরেই হোক, সেটা হতোই। এটা বুঝেই তারা যতটুকু পেরেছে এদেশটিকে ধ্বংস করেছে, এদেশের মানুষের বিরুদ্ধে তাদের প্রতিহিংসা চরিতার্থ করেছে।
এই বাস্তবতাকে যারা অস্বীকার করবে তারা বোকার স্বর্গে বাস করে। মনে রাখতে হবে যারা অন্যায় করে, অন্যের অধিকার কেড়ে নেয়, যুলুম করে তারা কখনও মুসলিম হতে পারে না। তারা যতই নামাজ পড়–ক, রোজা রাখুক, হজ্ব করুক, কোনো মুসলিম তাদেরকে ভাই বলে গণ্য করতে পারে না। তাদের একটাই পরিচয় তারা ইসলামের শত্র“, আল্লাহর শত্র“, লেবাস-সুরত তাদের যেমনই হোক। তাছাড়া পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকরা এ দেশের মুসলিমদেরকেও যে ভাই মনে করতো না তার প্রমাণ তারা নির্বিচারে গণহত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ ইত্যাদির মাধ্যমে দিয়েছে। ভাই কখনও ভাইয়ের বুকে গুলি চালাতে পারে না। এমন পরিস্থিতিতেও যারা ধর্মের অজুহাতে মুক্তিযুদ্ধকে, স্বাধীনতাকে অস্বীকার করে তারা ধর্মান্ধ ছাড়া কিছু নয়। আবার যারা একাত্তরকে অবলম্বন করে ধর্মবিদ্বেষী চেতনার বিস্তার ঘটাচ্ছে নিঃসন্দেহে তারাও দেশবাসীর সাথে প্রতারণা করছে। আমরা এই ধর্মান্ধতা ও ধর্মবিদ্বেষ উভয়কেই পরিত্যাজ্য মনে করি।
একইভাবে যারা মুক্তিযুদ্ধে নিহতের সংখ্যা নিয়ে আমাদের মতামত জানতে চান তাদেরকে বুঝতে হবে যুদ্ধে তিরিশ লক্ষ নিহত হোক কিংবা তিনজন নিহত হোক, অন্যায়ভাবে একজন মানুষ হত্যা করাও ভয়াবহ অপরাধ। আল্লাহর দৃষ্টিতে একজন মানুষকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা সমস্ত মানবজাতিকে হত্যা করার সমান। অন্যায় অন্যায়ই, তিরিশ লক্ষ মানুষকে হত্যা করেছে বলে অন্যায়কারী হবে, একজন মানুষকে হত্যা করলে অন্যায়কারীর লাঞ্ছনা থেকে মুক্তি পাবে তেমনটা মনে করার কারণ নেই। সুতরাং মৃতের সংখ্যা নিয়ে অহেতুক বিতর্কে যেতে আমরা রাজি নই।
এখন আমাদের কথা হলো- আমাদের স্বাধীনতাকামী নেতৃবৃন্দ বহু কষ্ট করে, বহু ত্যাগ তিতীক্ষার বিনিময়ে দেশকে শত্র“মুক্ত করেছিলেন। কিন্তু কেন করেছিলেন সেটাই এখন মুখ্য বিষয়। তারা চেয়েছিলেন একটি শোষণমুক্ত, বৈষম্যহীন, বঞ্চনাহীন একটি শান্তিময় জীবন এ জাতিকে উপহার দিতে, সেটা আমরা কতটুকু বাস্তবায়ন করতে পারলাম। নাকি আজও আমরা সেই আগের মতোই কেঁদে চলেছি, নাকি অবস্থা আগের চেয়েও খারাপ? এ প্রশ্নের মধ্যে আমাদের স্বাধীনতার সফলতা-ব্যর্থতার জবাব রয়েছে।
সত্য হচ্ছে স্বাধীনতার যুদ্ধ যে স্বপ্ন নিয়ে সেটার বাস্তবায়ন আমরা ৪৪ বছরেও দেখতে পাচ্ছি না। সেটা বাস্তবায়ন করাই আমাদের কাজ, শুধু স্বাধীনতার চেতনা নিয়ে গলাবাজি, রাজনীতি আর ব্যবসা করে দিনপার করলে চলবে না। জাতি আজ বহুধাবিভক্ত, ক্ষয়িষ্ণু, শক্তিহীন, ভঙ্গুর। তাদেরকে কেউ ঐক্যবদ্ধ রাখতে পারে নি বিগত ৪৪ বছরে। ফলে উন্নয়ন অগ্রগতি মুখ থুবড়ে পড়েছে। এক পা এগোলে আমরা দশ পা পিছিয়েছি, আগে গরিবের টাকা শোষণ করত পাকিস্তানী বুর্জোয়ারা, আর এখন করছে দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিবিদেরা, আমলা ও পুঁজিবাদী বুর্জোয়ারা। সুতরাং অন্যায়, অবিচার, শোষণের অবসান এখনো হয় নি। ’৭১ সলে সেই বুর্জোয় শোষকদের বিরুদ্ধে বঞ্চিত জনতাকে ঐক্যবদ্ধ করলেন বঙ্গবন্ধু। এখন বর্তমানের এই বঞ্চিত, নিপীড়িত জনতাকে ধান্ধাবাজ রাজনীতিক ও ধর্মব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে, সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে কে ঐক্যবদ্ধ করবে? সেই কাজটিই করে যাচ্ছে হেযবুত তওহীদ।
এখন একটাই কাজ, জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে। কীসে কীসে অতীতে ঐক্যভঙ্গ করেছে সেগুলোর খতিয়ান নিয়ে তা পরিহার করতে হবে। আমরা দেখেছি এ জাতি সবচেয়ে বেশি বিভক্ত হয়েছে বহুদলীয় গণতন্ত্রের নামে অপরাজনীতিক কর্মকা-ের দ্বারা, রাজনীতিক দলগুলোর ক্ষমতার লড়াই আজও এ জাতিকে পিষে যাচ্ছে। এগুলো দূর করতে প্রয়োজন জাতির ঐক্যবদ্ধ হওয়া। আমরা বিশ্বাস করি, একাত্তর ছিল বাঙালির জন্য আশীর্বাদ ও শিক্ষা, কারণ একাত্তর আমাদেরকে ঐক্যবদ্ধ করেছিল। সেই ইতিহাস থেকে প্রেরণা নিয়ে আমরা যদি একাত্তরের আশীর্বাদকে কাজে লাগাতে না পারি তাহলে মুক্তিযুদ্ধ অপূর্ণাঙ্গ ও ব্যর্থ হয়ে যাবে। এখন আমাদের দেশকে আসন্ন সঙ্কট থেকে মুক্ত করতে হলে ঐক্যবদ্ধ জাতিসত্ত্বা গঠন করতে হবে। এমতাবস্থায়, ১৬ কোটি বাঙালির ঐক্যবদ্ধ হওয়া ছাড়া উপায় নেই। তেমন ঐক্যবদ্ধ, সুশৃঙ্খল ও ন্যায়নিষ্ঠ জাতিসত্ত্বা গড়ে তোলার লক্ষ্যেই কাজ করছে হেযবুত তওহীদ। আমাদের অবস্থান মুক্তিযুদ্ধকে স্বীকার করা না করা কিংবা স্বাধীনতার পক্ষ-বিপক্ষ বিতর্কের অনেক ঊর্ধ্বে।

ধর্মব্যবসায়ী মোল্লারা বাস্তবেই মেয়েদেরকে ঘরের চার দেওয়ালের মধ্য বন্দী করে রাখতে চায়, হেযবুত তওহীদের বেলায় এ কথাটি বহুবার বহুভাবে প্রমাণিত হয়েছে। মোল্লারা যখন ফতোয়া দেয়, তাদের কথাগুলি মানুষ আল্লাহ-রসুলের কথা বলেই বিশ্বাস করে। শিক্ষিত শ্রেণির এ এক অন্ধত্ব। তারা যাচাই করে না যে সেগুলি ইসলামের ইতিহাসের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ কি না। এটা বিবেচনা না করেই মানুষ ইসলামকে বর্বর, পশ্চাৎমুখী বলে অপবাদ দেওয়া হয়। অথচ পর্দা প্রথার নামে যে জগদ্দল পাথর মোল্লারা মেয়েদের উপরে চাপিয়ে রেখেছে সেটা এসলাম সম্মত নয়। আমাদের নারী কর্মীরা যখন সত্য প্রচারে বা পত্রিকা বিক্রি করতে বের হয়, তাদেরকে অনেকেই প্রশ্ন করে, ‘তোমরা ঘর থেকে বের হলে কেন? মেয়েদেরকে রাস্তায় বের করে দিয়ে হেযবুত তওহীদ তো এসলামটা ধ্বংস করে দিচ্ছে।’ আবার কেউ বলে, ‘রাস্তার মধ্যে এসলামের কথা বলে, এটা আবার কোন এসলাম? হকারি করে মেয়েরা, পত্রিকা বিক্রি করে মেয়েরা, এটা তো কোন দিন দেখি নি।’ অনেকে সময় তারা সন্দেহ করে পুলিশে খবর দেয়। পুলিশ অফিসারও একই মন্তব্য করেন, ‘মেয়ে মানুষ পত্রিকা বিক্রি করে এমন কখনও দেখি নি।’
এইসব অদ্ভুত ও যুক্তিহীন প্রশ্নের একটাই অর্থ দাঁড়ায়- মেয়েরা ইটভাটায় দিনমজুরের কাজ থেকে শুরু করে দেশ পরিচালনা পর্যন্ত সবই কোরতে পারবে, কিন্তু এসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে তারা ঘর থেকেও বের হতে পারবে না। জাতির এই মানসিক পক্ষাঘাত কবে ঘুঁচবে? এসলামের প্রকৃত ইতিহাস সম্পর্কে অজ্ঞতাই এ প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। আল্লাহর রসুলের সময় মেয়েরা রসুলের সঙ্গে যুদ্ধে পর্যন্ত গেছেন। তারা সামাজিক সকল কর্মকা-ে ভূমিকা রেখেছেন, মসজিদে পুরুষদের সঙ্গেই সালাতে অংশ নিয়েছেন, পরামর্শ সভায় পরামর্শ দিয়েছেন, হাসপাতালের অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেছেন, বাজার নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব পালন করেছেন। রসুলের সময় সবকাজে মেয়েদের অংশগ্রহণ ছিল অবারিত। অথচ আজ মেয়েদের কেবলই ঘরের কাজে আটকে রাখতে চায় ধর্মব্যবসায়ীরা। জাতির অর্ধেক শক্তিকে এভাবে অপচয় করে তারা জাতির ধ্বংস ডেকে এনেছেন এটা বোঝার শক্তিও তাদের নেই। আমাদের মেয়েরা পত্রিকা বিক্রি করেন এটা তাদের পেশা নয়, সংগ্রাম। এটি নারীমুক্তির একটি সোপান।

আমাদের কথা হল মানুষকে আল্লাহ কণ্ঠ দিয়েছেন বলার স্বাধীনতা দিয়েছেন। মানুষ কথা বলবে। মানুষকে আল্লাহ লেখার স্বাধীনতা দিয়েছেন। মানুষ লিখবে। মানুষকে চিন্তার স্বাধীনতা দিয়েছেন, তাই মানুষ যে কোনো বিষয়ে চিন্তা করবে। এসব স্বাধীনতা আল্লাহ প্রদত্ত স্বাধীনতা, এতে কারোর হস্তক্ষেপ করার অধিকার নেই। বাক-স্বাধীনতার সংজ্ঞায় রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বলে থাকেন,  সমগ্র জাতির মতের বিরুদ্ধেও যদি আমার কিছু বলার থাকে সেটা আমি নির্ভয়ে বলতে পারব, এজন্য আমার কোনো ক্ষতির আশঙ্কা থাকবে না। এই বাক-স্বাধীনতায় আমরা বিশ্বাস করি, এবং একমাত্র সত্য ইসলাম এই স্বাধীনতা দিতে পারে। আর কেউ দিতে পারবে না, যদিও সবাই দাবি করে থাকে। যাই হোক, এই স্বাধীনতার মানে কিন্তু এটা নয় যে, আমি মিথ্যা কথা বলব। মিথ্যা কথা বলার অধিকার অবশ্যই বাক-স্বাধীনতা নয়। আপনি যদি কারো প্রতি অপবাদ আরোপ করেন এবং সেটা যদি প্রমাণিত হয়, তবে অবশ্যই আপনাকে জবাবদিহিতার সম্মুখীন হতে হবে। এখন আমরা প্রায়ই দেখি, মিডিয়ায় তিলকে তাল বানানো হয়, মানুষের কথাকে টুইস্ট করে বা অফ দ্যা রেকর্ড কথা প্রকাশ করা হয়, গোপনীয় বিষয় খুঁজে বের করা হয়, এভাবে মানুষের সারাজীবনের অর্জিত মান-সম্মান ধূলায় মিশে যায়। এটাও স্বাধীনতা নয়। এভাবে অন্যের মানহানি করা, জাতির মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করা, এসবের অনুমতি কোনো জীবনবব্যস্থাই দেয় না। হ্যাঁ, কেউ যদি ইসলামের বিরুদ্ধে যুক্তিসঙ্গত, সত্য ইতিহাসভিত্তিক, তথ্যবহুল কিছু লিখেন সেটার স্বাধীনতা অবশ্যই থাকবে, কেউ তার কলমকে বন্ধ করতে পারবে না। কিন্তু কেউ যদি কোনো ধর্মের নবী-রসুল বা অবতারকে নিয়ে অমর্যাদাসূচক মিথ্যাচার করে, যা সমাজের সাম্প্রদায়িক সহাবস্থানের জন্য প্রতিকূল পরিস্থিতি সৃষ্টি করবে সেটা নিশ্চয়ই বাক-স্বাধীনতা নয়, সেটা তথ্য-সন্ত্রাস। স্বাধীনতা তো সেটাই যেটা অন্যের স্বাধীনতাকেও সমুন্নত রাখে।

অন্যান্য ধর্ম বলতে কী বুঝাচ্ছেন আসলে? আমি তো অন্যান্য ধর্মকেও আমার ধর্ম বলছি। অন্যান্য ধর্ম বলে যে বিভক্তি সৃষ্টি করা হয় তা অসত্য ও অন্যায়। আমি বলছি ঈসা (আ.) আমার নবী, তাঁর অনুসারীরা আমার ভাই। মুসা (আ.) আমারও রাসুল, আমি তাঁকে শ্রদ্ধা করি, তাঁর নিদের্শাবলীকেও সত্য বলে শিরোধার্য মনে করি। মুসা (আ.) এর উম্মাহ বলে দাবিদার ইহুদিরা আমার বাবা আদম-হাওয়ারই সন্তান। মহাভারতে যারা এসেছেন কৃষ্ণ, মনু, যুধিষ্ঠির তাঁরাও একই স্রষ্টার পক্ষ থেকে আসছেন, তাঁদের স্রষ্টা তো আলাদা স্রষ্টা নয়। তাঁদের কেতাবগুলো আমার আল্লাহরই পক্ষ থেকে অবতীর্ণ, তাই ওগুলো আমারও ধর্মগ্রন্থ। সনাতন ধর্ম মানে হল চিরন্তন শাশ্বত ধর্ম, ইসলামের একটি নাম দীনুল কাইয়্যেমা, তার মানেও চিরন্তন শাশ্বত জীবনবিধান। ধর্ম তো একটাই, আপনারা অন্য ধর্ম বলেন কেন? আমরা কোনো ধর্মের অনুসারীদের প্রতি তাচ্ছিল্য, বিদ্বেষ পোষণ করি না, আমাদের সংগ্রাম অন্যায়ের বিরুদ্ধে, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে – সেটা যে ধর্মের লোকই করুক, যে রাজনীতিক মতবাদের লোকই করুক। ইসলামের আকীদা মোতাবেক সকল নবী-রসুল ও তাঁদের আনীত কেতাবগুলোর উপর ঈমান আনা অবশ্য কর্তব্য বা ফরদ। একজন নবীকে শ্রদ্ধা করলাম আরেকজনকে অস্বীকার করলাম বা অশ্রদ্ধা করলাম তবে তো আমি মো’মেনই হতে পারব না। ইসলাম অর্থই শান্তি, ইসলাম প্রতিষ্ঠা করা মানে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা। জোর করে লেবাস চাপিয়ে দেওয়া নয়, একটি নির্দিষ্ট আইন-বিধান একটি জাতির ইচ্ছার বিরুদ্ধে চাপিয়ে দেওয়া নয়। প্রত্যেক মানুষ যার যার বিশ্বাস নিয়ে সম্মানের সঙ্গে বসবাস করবে। কেউ কাউকে আক্রমণ করবে না, কেউ কারো অধিকার বিনষ্ট করবে না, কোনো মানুষ অপর কোনো মানুষের থেকে ক্ষতির আশঙ্কা করবে না। মেজরিটি, মাইনরিটি কথাগুলো ইসলামে নেই কারণ এসব কথা ভাইয়ের বেলায় খাটে না। আমার ভাইয়ের সম্পদ আর ইজ্জত রক্ষা করা আমার দায়িত্ব।