প্রশ্ন-উত্তর

একটাই উদ্দেশ্য, মানুষকে সত্য জানানো, সত্যের পক্ষে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হতে গড়ঃরাধঃব করা, উদ্বুদ্ধ করা। কারণ, এমন অনেক মানুষ আছে যারা লেখা-পড়া জানেন না, পড়তে পারেন না। আমরা পত্রিকায় বহু লিখেছি কিন্তু পড়ার প্রতি অনেকের আগ্রহ কম থাকায় আমাদের বক্তব্য অনেকেই সুস্পষ্টরূপে জানতে পারছেন না। অনেকে অল্প একটু জেনেই বাকিটা বোঝার জন্য নামধারী আলেমদের কাছে দৌঁড়ে যান, আর আলেমরা নিজেদের অবস্থান ও ধর্মব্যবসাকে নিরাপদ রাখার জন্য আমাদের ব্যাপারে ভুল বুঝিয়ে দেন। আমরা অসংখ্য হ্যান্ডবিল দিয়েছি, অনেকে পড়েনই না। ইসলাম-বিদ্বেষী মিডিয়ার অপপ্রচারে যাদের মনোভাব আমাদের বিরুদ্ধে চলে গেছে তারা আমাদের হ্যান্ডবিল, বই ইত্যাদি প্রচার করতেও বাধা দেন, বলেন জঙ্গিদের হ্যান্ডবিল, কেউ ধরবেন না, ধরলে পুলিশে ধরবে। তারপরে মোল্লারা অপপ্রচার চালিয়েছে যে, এ হ্যান্ডবিল পড়লে তাদের ঈমান চলে যাবে। বিবিধ কারণে বহু সংখ্যক মানুষ আমাদের কোন হ্যান্ডবিলও পড়েন না, এমামুয্যামানের লেখা কোন বইই তারা পড়েন না। কিন্তু মানুষকে তো জানাইতে হবে আমাদের সম্পর্কে। তখন আমরা এই ভিজ্যুয়াল মিডিয়ার চিন্তা করলাম। এই যুগটি ইলেকট্রনিক মিডিয়ার। মানুষ এখন পড়ার থেকে শোনে বেশি। সেজন্য আমরা আমাদের এ সীমিত সম্পদ ও সামর্থ্য দিয়ে ঘরোয়াভাবে আমাদের বক্তব্যটাকে বোঝার মতো করে সংক্ষিপ্ত কিছু ডকুমেন্টারি আমরা নির্মাণ করেছি এবং বিভিন্ন জায়গায় আমরা প্রদর্শন করেছি যাতে মানুষ শোনে এবং বোঝে। এটাই উদ্দেশ্য যে, মানুষকে অধর্মের বিরুদ্ধে, অসত্যের বিরুদ্ধে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে অনুপ্রাণিত করা। আর কোনো উদ্দেশ্য নাই।

অত্যন্ত যৌক্তিক প্রশ্ন। প্রশ্নকারীকে অসংখ্য ধন্যবাদ। এমামুয্যামান যখন হেযবুত তওহীদ গঠন করেছেন তখন থেকেই তিনি একটি কথা প্রায়ই বলতেন, ‘হেযবুত তওহীদ যে কাজ নিয়ে দাঁড়িয়েছে, দুনিয়াবি হিসাবে এ এক অসম্ভব কাজ। অল্প কিছু মানুষ দাঁড়িয়েছে এই বড় যমুনা নদীর উল্টে দেওয়ার জন্য। আমাদের মত কয়েকজন দরিদ্র্য সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ, অস্ত্র নেই, শক্তি নেই, এই আমরা যে দাজ্জালের বিরুদ্ধে সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়েছি সে দাজ্জাল বর্তমান দুনিয়ার প্রভুর আসনে উপবিষ্ট। তার হাতে রয়েছে বিরাট সামরিক শক্তি, সমস্ত মিডিয়া, বিশাল অর্থ-সম্পদ। কাজেই এত বিরাট অপশক্তির বিরুদ্ধে জয়লাভ অসম্ভব ব্যাপার। ‘হেযবুত তওহীদ’ সেই দাজ্জালের তুলনায় একটা বিন্দু বা একটা ক্ষুদ্র কণার মতো। এই অসম শক্তির মোকাবেলা কী আদৌ সম্ভব?
হ্যাঁ। এই অসম শক্তির মোকাবেলা করতে সক্ষম কেবলমাত্র সর্বশক্তিমান মহান আল্লাহ। তিনিই আমাদের শক্তি। তিনিই হেযবুত তওহীদের দ্বারা বিরাট দাজ্জালকে পরাজিত করবেন ইনশাল্লাহ। তিনি বলেছেন, “তোমরা হতোদ্দম হয়ো না, নিরাশ হয়ো না, তোমরাই বিজয়ী হবে, যদি তোমরা মুমিন হও।” যদি আমরা আল্লাহকে আমাদের সমুদয় জীবন-সম্পদ দিয়ে আপ্রাণ প্রচেষ্টা চালাই তাইলে আল্লাহ মুমিনদের প্রতি ওয়াদাবদ্ধ-অঙ্গিকারাবদ্ধ যে তিনি তাদের পৃথিবীময় কর্তৃত্ব দিবেন, এই হলো আল্লাহর ওয়াদা (সুরা নুর ৫৫)। তাছাড়া ২০০৮ সনে যাত্রাবাড়ীতে এমামুয্যামানের ভাষণের মধ্যে দিয়ে আল্লাহ স্বয়ং এক মহান মো’জেজা ঘটিয়েছিলেন, সেখানে তিনি নিশ্চয়তা দিয়েছেন যে, তিনি হেযবুত তওহীদ দিয়ে সমস্ত দুনিয়াময় তার সত্যদীন প্রতিষ্ঠা করবেন। এটা শুধু আমাদের ঈমান নয়, এটা আমরা জানি, এটা আমাদের ইলমাল ইয়াকীন বা নিশ্চিত জ্ঞান। এমামুয্যামান বলেছেন, “পৃথিবীতে ‘হেযবুত তওহীদ’ দিয়ে সত্যদীন প্রতিষ্ঠা হবে না, হয়ে গেছে। এটা অতীতের মতো সত্য। আল্লাহ এনশাল্লাহ বিজয় করবেন। কারণ ‘হেযবুত তওহীদ’ আল্লাহর। একে অশান্তির বিরুদ্ধে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিজয়ী করার দায়িত্ব আল্লাহর। কীভাবে সম্ভব? ঐ যে বললাম, আল্লাহ করবেন। তবে শর্ত হলো, আমাদের জীবন-সম্পদ দিতে হবে। আমরা আমাদের শর্ত পূরণ করার চেষ্টা করছি।

ন্যায়-অন্যায়, সত্য-মিথ্যার দ্বন্দ্বই হচ্ছে মানবসমাজের শ্বাশ্বত ইতিহাস। এই দ্বন্দ্বে সত্য হচ্ছে শুভশক্তি আর মিথ্যা হচ্ছে অপশক্তি। যাবতীয় সত্য এসেছে স্রষ্টার পক্ষ থেকে, সত্যের ফল হচ্ছে শান্তি, ঐক্য, সম্প্রীতি, মানবতা। পক্ষান্তরে মিথ্যার ফল হচ্ছে অশান্তি, অনৈক্য, বিদ্বেষ ও পাশবিকতা। সুতরাং কোনো স্বার্থের দ্বারা প্রণোদিত হয়ে যারাই মিথ্যার পক্ষ অবলম্বন করে, মিথ্যার বিস্তার ঘটায় তারাই অপশক্তি। তারা মানবসমাজের অশান্তির কারণ। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে, যারা ধর্মের প্রকৃত সত্যগুলোকে গোপন করে এবং ধর্মকে নিজেদের স্বার্থ হাসিলের মাধ্যম হিসাবে ব্যবহার করে তারা সমাজে মিথ্যার বিস্তার ঘটায়। সুতরাং তারা বড় একটি অপশক্তি। যারা জনসেবার নামে রাজনীতি করেন আর ব্যক্তিগত আয়-উন্নতির জন্য দুর্নীতি, লুটতরাজ করেন তারা একটি বড় অপশক্তি। বর্তমান পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় অপশক্তি হচ্ছে দাজ্জাল অর্থাৎ ইহুদি-খ্রিষ্টান বস্তুবাদী ‘সভ্যতা’, যা আত্মাহীন, আত্মকেন্দ্রিক, জড়বাদী, ভোগবাদী, স্বার্থপর একটি জীবনযাত্রায় মানুষকে অভ্যস্ত করে তুলেছে। পরিণামে মানুষ দিন দিন পশুতে পরিণত হয়েছে। আজ আমাদের ব্যক্তিগত থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিহিংসা আর স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য যে হানাহানি, রক্তপাত, যুদ্ধ-বিগ্রহ, সামাজিক ও আন্তর্জাতিক ধর্মব্যবসা ও স্বার্থের রাজনীতি চলছে তার মূল হোতা এই পাশ্চাত্য জড়বাদী সভ্যতা। একেই আল্লাহর রসুল রূপকভাবে বলেছেন যে আখেরি যুগে একটি বিরাট শক্তিশালী দানব আসবে যার এক চক্ষু কানা হবে অর্থাৎ সে শুধু জড়ের দিক, বস্তুর দিক দেখবে, আত্মার দিক দেখবে না। তার কপালে কাফের লেখা থাকবে। কাফের শব্দের তাৎপর্য হচ্ছে সে স্রষ্টার প্রেরিত মূল্যবোধ, ন্যায়-অন্যায়ের মানদ-কে প্রত্যাখ্যান করবে, তার দ্বারা মানবতার অকল্যাণ হবে, অশান্তি বিস্তার হবে। আমরা এই সব অপশক্তিগুলোর বিরুদ্ধেই রুখে দাঁড়ানোর কথা বলছি।

এটি খুব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। সরকার কর্তৃক অনুমোদিত শুধু তাই নয়, হাইকোর্ট থেকেও নির্দেশনা, রায়, অনুমোদন ও স্বীকৃতিপ্রাপ্ত, প্রত্যেকটা আদালতের রায় আছে। পুলিশ, র্যাব সদস্যরা আমাদের বই-পুস্তক যাচাই বাছাইয়ের জন্য সন্দেহবশত জব্দ করছে বিভিন্ন সময়ে, কিন্তু আদালত সেগুলো কিন্তু ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। কাজেই আপনারা বলতে পারেন যে, সরকার কর্তৃক আমরা অনুমোদিত এবং আমরা প্রতিটা কাজ করি অনুমতি নিয়ে। আমাদের মত এতো অনুমোদন নিয়ে, এতো বিধিবিধান মেনে, সরকারের নিয়ম-নীতি রক্ষা করে, সাংবিধানিক নিয়ম-নীতি রক্ষা করে এদেশে এমন শান্তিপূর্ণ আন্দোলন আর দ্বিতীয় কেউ করছে না তা আমরা চ্যালেঞ্জ করে বলতে পারি। কিন্তু তবুও এই হয়রানি করছে কেন? এখানেই হলো প্রশ্ন।
প্রথমত ভুল প্রচারণা। ধরুণ এক জায়গায় আমাদের হ্যান্ডবিল বিতরণ বা পত্রিকা বিক্রি করা হচ্ছে, কেউ একজন অতি উৎসাহী হয়ে তাদেরকে থামিয়ে থানায় ফোন করে দিল যে, ওখানে জঙ্গিরা হ্যান্ডবিল বিতরণ করছে। শুনেই পুলিশ হাজির। কোনো কথা-বার্তা নাই, তিনজন লোককে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে থানায় নিয়ে এলো। থানায় সাংবাদিকরা বসেই থাকে ক্রাইম রিপোর্টের আশায়। তারা পুলিশকে তাদের সঙ্গে দাঁড় করিয়ে বুকে নেমপ্লেট লিখে ছবি তুলে পত্রিকায় প্রকাশ করে দিল যে, হেযবুত তওহীদের তিন জঙ্গি গ্রেফতার। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এটাই হয়েছে। জনগণ, সাংবাদিক জানাজানি হয়ে গেছে এই অজুহাতে ৫৪ ধারায় পুলিশ তাদেরকে আদালতে ও হাজতে চালান দিয়েছে, কিছুদিন বাদে ৫৪ ধারা থেকে অব্যহতি চেয়ে তারাই তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। আবার কোনো ক্ষেত্রে গ্রেফতারের পর আমরা থানায় যোগাযোগ করলে ভুল বুঝতে পেরে পুলিশ তাদেরকে থানা থেকেই ছেড়ে দিয়েছে। এইভাবে সন্দেহবাদীদের বা স্বার্থান্বেষীদের অপপ্রচারে, মিথ্যা তথ্য দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আমাদেরকে প্রশাসন হয়রানি করেছেন।
দ্বিতীয়ত, প্রশাসনের মধ্যে এমন অনেক লোক আছেন যারা আদর্শিকভাবে আমাদেরকে সঠিক বলে গ্রহণ করেন নি। হয়তো তারা কোনো না কোনো পীরের অনুসারী ওনারা বা কোনো আলেমের অনুসারী, বা কোনো দলের মতবাদের অনুসারী। আবার অনেকেই আছেন উর্ধতন কর্মকর্তার কাছে ভালো হওয়ার জন্য, জঙ্গি ধরেছি বলে নিজেদের চাকুরির সুবিধাবৃদ্ধির জন্য ইত্যাদি বিবিধ কারণে আমাদেরকে হয়রানি করেছেন।
তবে বর্তমানে পরিস্থিতির অনেকটা উন্নতি হয়েছে। আইন-শৃংখলা বাহিনীর মধ্যে অনেকে আমাদের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও কার্যক্রম বুঝতে সক্ষম হয়েছেন এবং এনশা’আল্লাহ অন্যরাও অচিরেই বুঝবেন। ফলে এখন হয়রানির মাত্রা অনেকটাই কমে এসেছে। আমাদেরকে হয়রানি করার পেছনে প্রধানত দু’টি শ্রেণির অপপ্রচার দায়ী- ধর্মব্যবসায়ী ও ইসলামবিদ্বেষী গণমাধ্যম। গণমাধ্যমকর্মীরা বিন্দুমাত্র যাচাই-বাছাই না করে আমাদেরকে জঙ্গি, চরমপন্থী, নিষিদ্ধ, গোপন বলে প্রচারণা চালিয়েছে হাজার হাজার বার। বিষোদগার করার সুবিধার্থে এমামুয্যামানের নাম পর্যন্ত বিকৃত করেছে, আন্দোলনের নাম বিকৃত করেছে, বিভিন্ন নিষিদ্ধ বা সন্ত্রাসী দলের সঙ্গে, হিজবুত তাহরীর, জেএমবি, হুজি, শিবির ইত্যাদির সঙ্গে হেযবুত তওহীদের নাম মিশিয়ে প্রচারণা চালিয়েছে। জেএমবির সঙ্গে তওহীদ প্রচার করেছে। বিভিন্ন নামি-বেনামি সংগঠনের সাথে..তারা অপপ্রচার চালিয়েছে। ফলে অনেক কর্মকর্তা আছেন; (আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীতে যারা নতুন নতুন নিয়োগ পেয়েছেন) ভালোভাবে এখনও কাজের ওনার অভিজ্ঞতা হয় নাই, আমাদের সংস্পর্শে অনেকে আসেন নাই। ফলে এসমস্তকিছুর মধ্যে উরভবৎবহপব টা কি? পার্থক্য নির্ণয় করতে না পেরে সবগুলিকে এক কাতারে ফেলেছেন। একই রকম আচরণ আমাদের সাথে করেছেন। এর ফলেও আমরা অনেকটাই হয়রানির স্বীকার হয়েছি।

আপনি বলছেন যে তারা ইসলামের জন্য যুদ্ধ করছেন, আমরা কিন্তু সেটা বলছি না। তারা যেটাকে ইসলাম মনে করছে আমরা সেটাকে ইসলামই মনে করি না, বরং আমরা শত শত প্রমাণ দিয়েছি যে সেটা একটি বিকৃত ও বিপরীতমুখী ইসলাম। আমাদের সুস্পষ্ট বক্তব্য হলো, জঙ্গিবাদ আসলে মানুষের ধর্মীয় চেতনার অপব্যবহার। মানুষের ধর্মবিশ্বাসকে বহু পন্থায় হাইজ্যাক করা হয়, এটি তারই একটি উপায়। এর দ্বারা ব্যক্তি, জাতি ও সমাজ সবাই ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে।
গত তেরশো বছরে বিকৃত হতে হতে আল্লাহ রসুলের ইসলাম বর্তমানে একেবারে বিপরীত হয়ে গেছে। সবশেষে ইউরোপীয় প্রভুরা এ জাতিকে পদানত করে মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করে এবং আরো বহু প্রকার ষড়যন্ত্র করে এরকম একটা বিকৃত ইসলাম শিক্ষা দিয়ে গেছে। কাজেই কেবল যুদ্ধ করলেই তো হবে না, যেটার জন্য যুদ্ধ সেটা আল্লাহর ইসলাম হতে হবে। এটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ওটা কখনোই আল্লাহ-রসুলের ইসলাম না। এটা প্রতিষ্ঠা হলে শান্তি পাবে না মানুষ। তালেবানরা শরিয়া প্রতিষ্ঠা করেছে, সৌদিরা করেছে, ইরান করেছে, আই.এস. করেছে কিন্তু শান্তি আসে নাই। যাদের উপরে সেটা প্রয়োগ করা হয়েছে তাদের আত্মা মুক্তির জন্য ত্রাহিসুরে চিৎকার করে উঠেছে। সুতরাং তারা যতই বলুক যে ইসলামের জন্য যুদ্ধ করছে আমরা মনে করি তারা বিভ্রান্তির মধ্যে আছে।
দ্বিতীয় কথা হচ্ছে তারা যে প্রক্রিয়ায় প্রচেষ্টা করছেন সেটা অবশ্যই ভুল তরিকা। আল্লাহ্র রসুল এভাবে করেন নি। তারা এখানে-ওখানে বোমা মেরে, আতঙ্ক সৃষ্টি করে, নিরীহ মানুষকে হত্যা করে, গাড়ীতে বোম মেরে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করতে চাচ্ছেন। কিন্তু এসব করে তারা আরো জনবিচ্ছিন্ন হয়ে গেছেন, জনগণ তাদেরকে ভালোবাসে নি। কিন্তু আল্লাহর রসুল আগে মানুষের মন জয় করেছেন। এই জঙ্গিদের কর্মকা-ে ইসলামের শত্র“রাই লাভবান হচ্ছে। তারা ইসলামের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়ানোর সুযোগ পেয়ে যাচ্ছে যে, ‘দেখো, ইসলাম কত খারাপ, এরা জঙ্গি, এরা মানুষদের হত্যা করে, এরা শিশু-নারী হত্যা করছে, এরা কত নিষ্ঠুর’। তাদের অপপ্রচারের ফলে মানুষ এখন জেহাদ ও কেতালকে ঘৃণা করছে, ইসলামকে ঘৃণা করছে। ইসলাম ধর্মকে মানবতাবিরোধী, নৃশংস-বর্বর, অযৌক্তিক ইত্যাদি বলে ইসলামকে উপস্থাপন করছে। আমাদের কথা হলো, এই জঙ্গিবাদ প্রকৃতপক্ষে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীদের একটি পাতানো ফাঁদ বা পাতানো খেলা মাত্র। যারা ইসলামকে সত্যিকারভাবে ভালোবাসে এমন হাজার হাজার কিংবা লক্ষ লক্ষ মানুষ তাদের পাতানো এই ফাঁদে পা দিয়েছে। আফগানিস্তানের রণাঙ্গন, সিরিয়ার রণাঙ্গন, বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের রণাঙ্গন তার প্রমাণ। আমরা তাদের প্রতি করুণা বোধ করি, তাদের জন্য আমাদের দুঃখ হয় কিন্তু সত্যের খাতিরে আমরা বলতে বাধ্য যে, এই সরলপ্রাণ মানুষগুলোর ধর্মবিশ্বাসকে মানবতার অকল্যাণে এবং ইসলামের বিরুদ্ধেই ব্যবহার করেছ পশ্চিমা ষড়যন্ত্রকারী সভ্যতা।
কাজেই ইসলামের নামে যারা অস্ত্র ধরেছে তাদেরকে আমরা জঙ্গি বলে গালাগাল দিচ্ছি না। বরং আমরা জঙ্গিবাদকে ভুল পন্থা বলে চিহ্নিত করছি। যারা এই ভুল পথে পা বাড়িয়েছে তাদেরকে বোঝানোর চেষ্টা করছি যে, এইপথ ভুল। আপনারা এইপথ ত্যাগ করুন। কারণ এতে আপনারা দুই জীবনেই ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন, আপনাদের দ্বারা মানবজাতিও ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে, ইসলাম তো প্রতিষ্ঠা করতে পারবেনই না, কারণ ইসলাম আপনাদের কাছে নেই। শুধু শুধু আপনাদের দ্বারা ইসলামের বদনাম হচ্ছে। বরং আপনাদের কর্তব্য হলো, আগে প্রকৃত ইসলাম কি তা বুঝুন, তারপর সেই সত্যের ভিত্তিতে মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করুন।

যেহেতু আল্লাহ বাংলাদেশ থেকে হেযবুত তওহীদ নামক পবিত্র আন্দোলনের সূচনা করেছেন, তাই বাংলাদেশ আমাদের চোখে বাকি দুনিয়া থেকে আলাদা। এদেশে আমরা জন্ম নিয়ে, দেশের সম্পদে ও প্রতিপালনে লালিত হয়েছি, তাই এদেশের প্রতি আমাদের আত্মিক দায়বদ্ধতা রয়েছে। আমরা চাই এ জাতিটি শাশ্বত ও চিরন্তন সত্যের উপর ঐক্যবদ্ধ হোক। কোনটি সত্য কোনটি মিথ্যা, কোনটি ন্যায়, কোনটি অন্যায় তা বোঝার জন্য প্রতিটি মানুষের বিবেকই যথেষ্ট। তারপরও আমরা সবচেয়ে মারাত্মক কয়েকটি অন্যায় যা আমাদের সমাজকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্ত পর্যন্ত নিয়ে গেছে সেই অন্যায়গুলোকে বিশেষভাবে প্রতিরোধ করতে চাই যেমন জঙ্গিবাদ, স্বার্থের রাজনীতি, ধর্মব্যবসা ইত্যাদি। আমরা চাই মানুষ ধর্ম বলতে বুঝুক মানবতা, এবাদত বলতে বুঝুক দেশ ও জাতির কল্যাণে আত্মোৎসর্গ করা। এই শিক্ষাগুলো এ জাতিকে দেওয়া হলে জাতির বিরুদ্ধে দেশে ও আন্তর্জাতিক অংগনে যে ষড়যন্ত্র চলছে তা রুখে দেওয়া যাবে এবং ষোল কোটি মানুষের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টায় এ জাতি বিশ্বের শ্রেষ্ঠ জাতিতে পরিণত হতে পারবে। একটি অধঃপতিত জাতি থেকে রেনেসাঁ সৃষ্টির জন্য যে আদর্শিক প্রেরণা দরকার তা আমাদের কাছে আছে। আর অন্যায় প্রতিহত করার জন্য যে শক্তি দরকার তা সরকারের কাছে আছে। শুধু শক্তি দিয়ে হবে না, শুধু আদর্শ দিয়েও হবে না। দুটোই একসঙ্গে লাগবে। জাতিকে উন্নতি অগ্রগতির দিকে ধাবিত করার জন্য এবং একটি আদর্শকে গণমানুষের কাছে শিক্ষাব্যবস্থা, গণমাধ্যম প্রভৃতি ব্যবহার করে পৌঁছে দেওয়ার জন্য যা কিছ প্রয়োজন সবই সরকারের কাছে আছে, এবং এটা সরকারেরই কাজ। এই কাজে আমরা চাই সরকারকে আদর্শ দিয়ে সহযোগিতা করতে। রাজনীতি বা রাষ্ট্রক্ষমতা কোনোটাই আমাদের প্রয়োজন নেই, ইচ্ছাও নেই। কারণ দেশের কর্ণধারগণ তিনি যে-ই হোন, যদি সত্যের পক্ষে ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হন তাহলে দেশে শান্তি আসবে, আর সেটাই আমাদের একমাত্র চাওয়া। আমরা সুস্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিচ্ছি, হেযবুত তওহীদ কোনোদিন বাংলাদেশে সহিংসতা সৃষ্টি করে নি, করবে না, দেশের কোনো আইনভঙ্গ করে নি, করবে না। কারণ যিনি আমাদের আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা, আমরা যাঁর অনুসারী- তিনি এই নীতি নির্ধারণ করে দিয়ে গেছেন। তাঁর অবাধ্যতা করলে আমরা ধ্বংস হয়ে যাব এটা আমরা মনে প্রাণে বিশ্বাস করি।
আজকাল তো সবকিছু বস্তুবাদী দৃষ্টিতে বিচার করা হয়, কিন্তু আমরা তা করি না, কারণ আল্লাহ আমাদের দৃষ্টিশক্তি দিয়েছেন। আমরা বিশ্বাস করি, হেযবুত তওহীদের পরিচালক ও রক্ষাকর্তা মহান আল্লাহ। তাই কারো দ্বারাই হেযবুত তওহীদের কোনো ক্ষতি হওয়া সম্ভব নয়। বিশ্বের মানুষের সুখ, দুঃখ নিয়ে ভাবার দায়িত্ব আমাদের আছে, কারণ একদিকে আমরা এই পৃথিবীর মানুষ। অপরদিকে আমরা আল্লাহর মনোনীত আন্দোলন হেযবুত তওহীদ। আমরা শুধু বিশ্বাস করি না, আমরা জানি যে, হেযবুত তওহীদ দিয়েই সমগ্র পৃথিবীতে এনশা’আল্লাহ শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু সিনসিয়ারলি বলছি, সেটা কীভাবে হবে তা আমাদের জানা নেই। আল্লাহ কীভাবে সেটা করবেন আল্লাহই জানেন। হেযবুত তওহীদের ক্ষেত্রে আল্লাহই সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর। আমরা উপস্থিত সংকট নিয়ে কাজ করছি, কিন্তু চূড়ান্ত লক্ষ্য সারা দুনিয়ায় শান্তি প্রতিষ্ঠার মতো বড় কাজ কী প্রক্রিয়ায় সিদ্ধ হবে সেটা আমরা জানি না।

আমি টু দি পয়েন্টে উত্তর দিতে চেষ্টা করব কিন্তু যদি বলেন এক কথায় উত্তর দিতে, সেটা পারব না। কারণ ইসলামের প্রতিটি বিষয় নিয়েই প্রচুর কন্ট্রোভার্সি আছে, সেগুলো নিষ্পন্ন করেই আমাদেরকে কথা বলতে হয়, তাই আমাদের কোন একটা বিষয়ই এক কথায় বা এক লাইনে দু-এক শব্দের ভিতর দেওয়া সম্ভব নয়। আপনি এমামুয্যামানের সামরিক নীতি জানতে চেয়েছেন। অ্যাকচুয়ালি এমামুয্যামানের নিজস্ব কোন সামরিক নীতি নেই, তিনি মহানবীর নীতি অর্থাৎ ইসলামের রূপটাকেই তুলে ধরেছেন।
আল্লাহর তওহীদ ভিত্তিক এই সত্যদীনকে পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠা করার নীতি হচ্ছে জেহাদ। আদর্শিক লড়াই যেকোনো যুদ্ধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ যা জেহাদের অন্তর্ভুক্ত, এরপর আছে সশস্ত্র যুদ্ধ যাকে কেতাল বলা হয়। ইসলাম প্রতিষ্ঠার নীতি যে জেহাদ তার মধ্যে আদর্শিক লড়াই ও সামরিক লড়াই উভয়ই অন্তর্ভুক্ত। আদর্শিক লড়াই যে কেউ করতে পারে কিন্তু সশস্ত্র যুদ্ধ ইসলামের নীতি মোতাবেক কেবল সার্বভৌম রাষ্ট্র করতে পারে, ব্যক্তি বা দল সেটা করতে পারে না। করলে তা অবৈধ হবে। কিন্তু আদর্শিক ও সামরিক যুদ্ধ উভয়টাই ইসলামের নীতি, যখন যেটা প্রয়োজন সেটাই প্রয়োগ করা যেতে পারে।
ইসলাম কোনো নির্দিষ্ট ভূখ-ের জন্য আসে নি, এর আওতা সমগ্র মানবজাতি ও সমগ্র বিশ্ব। উম্মতে মোহাম্মদীর দৃষ্টিভঙ্গিও তাই বিশ্বকেন্দ্রিক হতে হবে। কিন্তু সমগ্র বিশ্বে ইসলাম প্রতিষ্ঠা একবারে হওয়া সম্ভব নয়, যেহেতু তা চিরকালই বিভিন্ন সার্বভৌমত্বের অধীনে খ-িত অবস্থায় আছে। ইসলামে একটি শব্দ আছে আকীদা যার অর্থ ধারণাগতভাবে (ঈড়হপবঢ়ঃঁধষষু)। শেষ নবীর আনীত জীবনব্যবস্থাটি আকীদাগতভাবে সমস্ত দুনিয়াতে প্রতিষ্ঠার নীতি হলো সামরিক। খেয়াল করলে দেখবেন, এ প্রসঙ্গে প্রতিবার এমামুয্যামান সমস্ত দুনিয়াতে শব্দটি ব্যবহার করেছেন। এটা আসলে এমামুয্যামানের ব্যবহার না, আল্লাহ কোর’আনে ফিল আরদ কথাটি ব্যবহার করেছেন। সমগ্র পৃথিবীতে, সকল জাতি গোষ্ঠীর মধ্যে কেবল ইসলামই নয়, যে কোনো আদর্শ বা জীবনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে গেলে এই সামরিক নীতি গ্রহণ করতে হয়েছে, সেটা সাম্যবাদই হোক, রাজতন্ত্রই হোক বা গণতন্ত্রই হোক। প্রচার দ্বারা, যুক্তিতর্ক দ্বারা মাহাত্ম্য বর্ণনা করে হয়তো একটি ব্যবস্থা একটা নির্দিষ্ট অঞ্চলে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হতে পারে, কিন্তু সমস্ত দুনিয়া জুড়ে, উত্তর-দক্ষিণ-পূর্ব-পশ্চিমের সমস্ত জনপদে, পাহাড়ে, সমতলে, মরুভূমি-বনাঞ্চল-দ্বীপাঞ্চলের মানুষকে একটি সিস্টেমে আনতে হলে সেটা প্রচারের দ্বারা অসম্ভব। পৃথিবীর যে সমস্ত দেশে গণতন্ত্র নেই সেখানে পশ্চিমারা গণতন্ত্র আনার নামে সামরিক নীতিই প্রয়োগ করছে। বলতে পারেন এটাই প্রাকৃতিক নিয়ম। তবে প্রচারের মাধ্যমে রাষ্ট্র ও জনসাধারণকে মোটিভেট করেও কিছু কিছু এলাকায় শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব। উদাহরণ: মদীনা। অন্য অনেক এলাকাতেও পরবর্তীতে বিনা যুদ্ধে ইসলাম (শান্তি) প্রতিষ্ঠা করা গেছে, কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই যুদ্ধ হয়েছে। তাই ইসলাম প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সামরিক পদক্ষেপের গুরুত্ব কোনো মুসলিম বা সত্যনিষ্ঠ মানুষ অস্বীকার করতে পারবে না, করলে সে কাফের হয়ে যাবে। কারণ আল্লাহ এটি কোর’আনে বলেছেন। সমস্ত পৃথিবীতে যতক্ষণ একটি মানুষও কষ্টে থাকবে, একটি জনপদেও ফেতনা থাকবে ততক্ষণ উম্মতে মোহাম্মদীর উপর স্রষ্টা কর্তৃক প্রদত্ত শান্তি প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব শেষ হবে না। এই সত্যটিই এমামুয্যামান তাঁর বইতে তুলে ধরেছেন। সকল নবী ও রসুল এসেছেন মানুষকে অশান্তি থেকে মুক্তি দিতে, তাঁদের জাতির উপরেও সেই একই দায়িত্ব বর্তায়। বিশ্বের যে কোনো অঞ্চলে মানবিক বিপর্যয় ঘটলে এ কারণেই জাতিসংঘসহ অন্যান্য শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোও হস্তক্ষেপ করে, প্রয়োজনে সামরিক পদক্ষেপও নেয়, (যদিও তাদের মূল উদ্দেশ্য ভিন্ন)। সুতরাং শান্তির লক্ষ্যে যুদ্ধ সর্বযুগে কর্তব্য বলে স্বীকৃত।
আল্লাহ বলেছেন, সমস্ত পৃথিবীতে সশস্ত্র সংগ্রাম কর যতক্ষণ না ফেতনা দূর হয়ে দীন (শান্তিময় জীবনব্যবস্থা যা ফেতনার বিপরীত) প্রতিষ্ঠিত হয় (সুরা আনফাল ৩৯)। কাজেই এমামুয্যামান বইতে যে কথাটি বলেছেন, এর তাৎপর্য হলো একটা অঞ্চল না, একটা এলাকাতে না, সমস্ত দুনিয়াময় (অষষ ড়াবৎ ঃযব ড়িৎষফ) ন্যায় সত্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে, এবং তা সম্পূর্ণরূপে করতে হলে সামরিক ছাড়া আর কোনো ভাবে সম্ভব নয়। আপনি আলোচনা করে মাহাত্ম্য বর্ণনা করে, যুক্তি দিয়ে বই লিখে হয়ত একটি নির্দিষ্ট কিছু লোককে এই সত্যের পথে আনতে পারবেন, কিন্তু সমস্ত দুনিয়ার মানুষকে আনা অসম্ভব। পৃথিবীর কোন মতবাদ এই পর্যন্ত তা পারে নি। সেই জন্য আল্লাহ অতি প্রাকৃতিক, অতি যৌক্তিক এই নীতিটি শান্তি প্রতিষ্ঠার মিশনে উম্মতে মোহাম্মদীর জন্য নির্ধারণ করেছেন আর এমামুয্যামান সেটাই উল্লেখ করেছেন। যারা ইসলামের যুদ্ধকে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন বলে অপপ্রচার করে, তিনি অকাট্য যুক্তি দিয়ে তাদের দাবিকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছেন।
শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে অহিংস পন্থায় বহুদূর যাওয়া যায়, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে শেষ পর্যন্ত যাওয়া যায় না। যেমন ১৯৭০ সালে বঙ্গবন্ধু এদেশের অধিকাংশ লোকের সমর্থন নিয়ে নির্বাচিত হয়েছিলেন। কিন্তু তাকে প্রধানমন্ত্রিত্ব দেয়া হয় নাই। অবশেষে পুরো জাতির ঐক্যবদ্ধ সামরিক মোকাবেলার দ্বারাই পাকিস্তানকে পরাভূত করা গেছে। এমন অসংখ্য উদাহরণ আছে। আমি যেটা বুঝানোর চেষ্টা করছি যে, সমস্ত দুনিয়াময় একটা জীবনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হলে শেষ পর্যন্ত সামরিক নীতি লাগবে। কারণ একটি ছোট এলাকা হলে কথা ছিল, বিষয়টা সারা দুনিয়ার। পুরো দুনিয়াবাসীকে আলোচনা করে, বুঝিয়ে শুনিয়ে একটি সিস্টেমের মধ্যে আনতে পারবে না, মুখের কথায় এত বড় কাজ হবে না, এটা অসম্ভব। কারণ অধিকাংশ মানুষই তাদের অভ্যস্ত বিশ্বাসের প্রতি যুক্তিহীন ও অন্ধ থাকে। বুদ্ধি বিবেচনা দিয়ে একটি আদর্শকে সবাই মেনে নেয় না। বিশেষ করে রাষ্ট্রক্ষমতা কেউ বিনা যুদ্ধে ছেড়ে দেয় না। পুরো জনগোষ্ঠী ইন্টেলেচুয়াল হলে একটা কথা ছিল। তাই পৃথিবীর সমস্ত আদর্শ যথা গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, সবকিছুই সামরিক পন্থাতেই বিজয় লাভ করছে। কাজেই এটা একটি প্রাকৃতিক নীতি, এটা ইসলামেরও নীতি। ইসলামের একটি নাম তাই দীনুল ফিতরাহ বা প্রকৃতিনির্ভর জীবনব্যবস্থা। এই সত্যকে কোনো সত্যনিষ্ঠ মানুষ অস্বীকার করতে পারবে না।

প্রথমেই একটি বিষয় জেনে রাখা প্রয়োজন যে, ইসলাম হলো একটি সত্য জীবনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা ও প্রয়োগের ফলে আর্থ-সামাজিকভাবে দৃশ্যমান শান্তিময় অবস্থা। যেই দ্বীন বা জীবনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা ও প্রয়োগের ফলে শান্তি আসবে সেটাই ইসলাম, আর যেটা অশান্তি সৃষ্টি করবে তা ইসলাম নয় অর্থাৎ আল্লাহর মনোনীত নয়। আল্লাহ তাঁর দীন মানবজাতির প্রতি নাযেল করেছেন একটি মাত্র কারণে, আর তা হলো- মানবজাতি যেন অন্যায় অবিচার থেকে বেঁচে একটি শান্তিপূর্ণ, প্রগতিশীল সমাজে জীবনযাপন করতে পারে। তাই এই দীনের প্রতিটি আদেশ মানুষের সুখের জন্য এবং প্রতিটি নিষেধ মানুষকে ক্ষতি থেকে, অশান্তি থেকে রক্ষা করার জন্য। এমন কোন আদেশ বা নিষেধ ইসলামে থাকা সম্ভব নয় যেটার সঙ্গে মানুষের ভালো মন্দের কোন সম্পর্ক নেই। যে জিনিস বা যে কাজ মানুষের জন্য অপকারী তা-ই আল্লাহ নিষেধ করেছেন। এই আলোকে আমাদের জানা দরকার, ভাস্কর্য নির্মাণ বা চিত্রাঙ্কন আমাদের জন্য ক্ষতিকর কিনা। এখানে আমাদেরকে একটি বিষয় আরও পরিষ্কার হতে হবে যে, প্রতিমা আর ভাস্কর্য কিন্তু এক নয়। প্রতিমাকে পূজা করা হয়, তার কাছে প্রার্থনা করা হয়। এছাড়া প্রতিমাকে ভাগ্যবিধাতা, রিজিকদাতা, শক্তিদাতা এমনকি এলাহ বা হুকুমদাতার আসনেও বসানো হয়, যা স্পষ্ট শেরক। প্রতিমা নির্মাণের ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, অতীতে যে সমাজেই মূর্তিকে বিধাতার আসনে বসানো হয়েছে সে সমাজ পরিচালিত হয়েছে মূর্তিগুলোর পুরোহিতদের সিন্ধান্ত বা ফতোয়া দ্বারা। পুরোহিতদের প্রতিটি সিদ্ধান্ত ধর্মের বিধান বলে স্বীকৃত হয়েছে। বিভিন্ন পুরোহিত বিভিন্ন বিধান, আইন-কানুন, দ-বিধি রচনা করেছে এবং প্রয়োগ করেছে, যাকে কেন্দ্র করে বিবিধ অন্যায়, অবিচার, অশান্তির জন্ম হয়েছে। এ কারণে প্রতিমাপূজা ইসলামে নিষিদ্ধ। অপরদিকে ভাস্কর্য একটি প্রাচীনতম শিল্পকলা। একটি জাতির ইতিহাস-ঐতিহ্য, শিল্পকলা, রুচিবোধের নিদর্শন হিসেবে এটি ব্যবহৃত হয়, যার কোনো ক্ষতিকর প্রভাব নেই। বরং এই ভাস্কর্য শিল্পের দরুন হাজার হাজার বছর পূর্বের বিভিন্ন সভ্যতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া আজ সহজ হচ্ছে। সুতরাং ইসলামে ভাস্কর্য নিষিদ্ধ হবার কোনো কারণ নেই। এক কথায়- মানবতার জন্য ক্ষতিকর হওয়ায় কাঠ-পাথরের প্রতিমা ইসলামে নিষিদ্ধ, কিন্তু ক্ষতিকর না হওয়ায় কাঠ-পাথরের ভাস্কর্য নিষিদ্ধ নয়। কোনটা নিষিদ্ধ কোনটা বৈধ তার মানদ- হচ্ছে মানবতার কল্যাণ অথবা অকল্যাণ।
এখানে একটি বিষয় বলে রাখা দরকার- ইসলামে প্রতিমা নির্মাণ ও ব্যবহার নিষিদ্ধ বটে, তবে তার মানে এই নয় যে, ইসলাম শক্তির জোরে প্রতিমাধ্বংসকে জায়েজ করছে। এমন ধারণা করা ভুল হবে। ইসলামের নীতি হলো ধর্মবিশ্বাসের উপর জোর-জবরদস্তি করা চলবে না। ব্যক্তিগতভাবে মুশরিকরা প্রতিমাপূজা করতে পারে তাতে কারও বাধা দেবার অধিকার নেই। প্রশ্ন করতে পারেন- তাহলে রসুলাল্লাহ ক্বাবাঘরের মূর্তি ভেঙেছিলেন কেন? রসুলাল্লাহ মক্কা বিজয়ের দিন কাবাঘরে অবস্থিত মূর্তি ভেঙেছিলেন। এর কারণ প্রথমত, সেগুলি ছিলো লাত, মানাত, উজ্জা, হোবল ইত্যাদির মূর্তি। আরবের গোত্রগুলি পরিচালিত হতো এই মূর্তিগুলির পুরোহিতদের সিদ্ধান্ত বা ফতোয়া দ্বারা। পুরোহিতদের প্রতিটি সিদ্ধান্ত ধর্মের বিধান বলে স্বীকৃত হতো। এই মূর্তিগুলিকে কেন্দ্র করে তাদের নিজস্ব আইন কনুন, দ-বিধি ইত্যাদি প্রয়োগ করত। অর্থাৎ এক কথায় ঐ মূর্তিগুলিকে তারা বিধাতার আসনে এবং সমাজ পরিচালক বা এলাহের আসনে বসিয়েছিল, যাকে কেন্দ্র করে বিবিধ অন্যায়, অবিচার, অশান্তির জন্ম হতো। কাজেই মহানবী (দ.) এ সমস্ত গুঁড়িয়ে দিয়েছেন। দ্বিতীয়ত, ক্বাবাঘর হচ্ছে পৃথিবীর বুকে আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণার জন্য পবিত্রতম স্থান, যা আল্লাহ নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। এমন স্থানে সত্য বিরোধীদের কোনো অবৈধ কার্যক্রম চলতে পারে না। কাজেই এই গৃহের মর্যাদা ও পবিত্রতা রক্ষাও মূর্তিধ্বংসের অন্যতম কারণ ছিল। কিন্তু আমরা যদি তার পরের ইতিহাস দেখি অর্থাৎ সাহাবায়ে কেরাম যখন সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে আল্লাহর সত্যদীন প্রতিষ্ঠার জন্য দুনিয়ার বুকে বেরিয়ে পড়েছেন তখন যে সমস্ত এলাকা বিজীত হয়েছিল, ঐ সমস্ত স্থানে অন্যধর্মের লোকদের উপাস্য মূর্তি, ধর্ম উপাসনালয় ধ্বংস করেছেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায় না। বরং কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনায় যদি বিধর্মীদের কোন মূর্তির অঙ্গহানীও হয়ে থাকে, সাহাবীরা সেগুলিও মেরামত করে দিয়েছেন। ঐ সমস্ত এলাকার মূর্তিগুলি আর জাতীয় পর্যায়ে বিধাতার আসনে অধিষ্ঠিত ছিলো না কাজেই ঐগুলি ভাঙ্গার প্রয়োজন পড়ে নি। অর্থাৎ ইসলামের নীতি হলো জাতীয়ভাবে চলবে আল্লাহর হুকুম ব্যক্তিগতভাবে যে যার বিশ্বাস স্থাপন করুক তাতে কোনো আপত্তি নেই। ব্যক্তিগত ধর্মবিশ্বাস পরিবর্তনে কোনরূপ জোরাজুরি চলবে না। এক কথায় ইসলামের নীতি হলো- রাষ্ট্র চলবে সত্য ও ন্যায়ের ভিত্তিতে, কিন্তু ব্যক্তিকে তার ইচ্ছার উপর (ধর্মবিশ্বাসের ব্যাপারে) ছেড়ে দিতে হবে। সুতরাং বর্তমানে যারা ইসলামের ধুয়া তুলে ভিন্নধর্মাবলম্বীদের মূর্তি ধ্বংস করছে, এমনকি চূড়ান্ত অজ্ঞতা ও মূর্খতার পরিচয় দিয়ে বহু মূল্যবান ঐতিহাসিক ভাস্কর্য গুড়িয়ে দিচ্ছে তারা সম্পূর্ণ ইসলামপরিপন্থী কাজ করছে সন্দেহ নেই। এর জন্য তাদেরকে আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে।

আমাদের সমাজে শিল্প ও সংস্কৃতির পথেও সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ধর্মের অপব্যাখ্যা। আমাদের সমাজে যারা সাংস্কৃতিক কর্মকা-ে অংশগ্রহণ করছেন তাদের অনেকের মধ্যেই একটা দ্বিধা ও অপরাধবোধ আজীবন কাজ করে। কেননা তারা মনে করেন যে, তারা খুব গোনাহের কাজ করছেন। ফলে প্রতিভার পূর্ণ বিকাশ হচ্ছে না।
আবার অনেক সংস্কৃতিমনা মানুষ ধর্মের নামে চলা কূপম-ূকতাকে মেনে নিতে না পেরে ধর্ম বিদ্বেষী হয়ে গেছেন। তারা দেখছেন ধর্মান্ধরা কীভাবে বোমা মেরে সুপ্রাচীন নান্দনিক ভাস্কর্যগুলো গুড়িয়ে দিচ্ছে, সঙ্গীতানুষ্ঠানে, সিনেমা হলে বোমা হামলা করছে। এসব দেখে ধর্মবিদ্বেষীরা ধর্মকেই গালাগালি করছেন ব্লগে, পত্রিকায়, চলচ্চিত্রে, যা ধর্মপ্রাণ মানুষকে আহত করছে, ধর্মব্যবসায়ীরাও পেয়ে যাচ্ছে দাঙ্গা সৃষ্টি করার সুযোগ। তারা খোদ চলচ্চিত্র, ব্লগ ও শিল্পমাধ্যমকেই প্রতিপক্ষে পরিণত করছে।
এ বিষয়ে হেযবুত তওহীদের বক্তব্য হচ্ছে, বিজ্ঞান, সংস্কৃতি বা শিল্প যে কোনো কিছুরই ভালো-মন্দ নির্ভর করে তার ব্যবহারের উপর। শিল্পের নামে অশ্লীলতা, মিথ্যা ও অন্যায়ের প্রসার শুধু ধর্মে নয় বিশ্বের সমস্ত আইনেও নিষিদ্ধ হওয়ার দাবি রাখে, কিন্তু সুস্থধারার শিল্পচর্চা নিষিদ্ধ হওয়ার কোনো কারণ নেই।
আল্লাহর রসুল কি সঙ্গীত, শিল্প-সাহিত্যের প্রতি বিরূপ ছিলেন? না, ইতিহাসের এই ব্যস্ততম মহামানব যাঁর নবী জীবনের প্রায় প্রতিটি মুহূর্ত কেটেছে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রামে, তাঁর পক্ষে শিল্পচর্চায় মেতে থাকা সম্ভব ছিল না। তথাপি এত ব্যস্ততার মধ্যেও তিনি গান শুনেছেন। আরবের বিভিন্ন ঐতিহাসিক দিবসে, বিবাহে, যুদ্ধে সর্বত্র গানের চর্চা ছিল, রসুলাল্লাহ সেগুলোকে উৎসাহিত করেছেন। মিনার এক উৎসবের দিন আবু বকর (রা.) আম্মা আয়েশার (রা.) ঘরে এসে দেখেন দু’টি মেয়ে দফ বা তাম্বুরা সহযোগে গান গাইছে। নবীগৃহে গান-বাজনা দেখে আবু বকর (রা.) কন্যা আয়েশাকে তিরস্কার করতে আরম্ভ করলেন। তখন মহানবী বললেন, ‘আবু বকর! ওদেরকে বিরক্ত করো না, আজ ওদের উৎসবের দিন (বোখারি, মুসলিম)। এমন কি আল্লাহর রসুল নিজে একজন আনসার সাহাবির বিয়ের আসরে গায়ক রাখার হুকুম দিয়েছেন, কেননা আনসারেরা ছিলেন গোত্রীয়ভাবে সঙ্গীতপ্রিয়। অথচ বর্তমানে কেবল হামদ-নাত জাতীয় সঙ্গীত গাওয়াকেই আলেমগণ বৈধ বলে মনে করে থাকেন। তাদের কাছে স্বাধীনতা দিবস, একুশে ফেব্র“য়ারি বা পহেলা বৈশাখের গান দূরে থাক, কোনো ধর্মীয় অনুষ্ঠানের সঙ্গে জাতীয় সঙ্গীতও সঙ্গতিপূর্ণ নয়।
কোন ধর্মই শিল্পকলাকে নাজায়েজ করতে পারে না। কেননা স্বয়ং স্রষ্টাই সুর ও নৃত্যকলা সৃষ্টি করেছেন। প্রজাপতির ডানায় তিনি এঁকেছেন মনোমুগ্ধকর আল্পনা। শেষ প্রেরিত গ্রন্থ আল কোর’আনকে আল্লাহ পাঠিয়েছেন ছন্দবদ্ধ করে। কেবল কোর’আন নয়, যবুর, গীতা, পুরান, ত্রিপিটক ইত্যাদি ধর্মগ্রন্থও আল্লাহ পাঠিয়েছেন কাব্যময় কোরে। গীতা শব্দের অর্থই তো গান। অনেক আলেম মনে করেন, ইসলামী গান করা বৈধ হলেও সেটা বাদ্য বাজিয়ে গাওয়া যাবে না। কিন্তু ইমাম আবু হামিদ আল-গাজ্জালী তাঁর ‘এহইয়াও উলুমদ্দিন’ নামক গ্রন্থে লিখেছেন, “কোকিলের সুর শোনা যেমন হারাম নয়, তেমনি মানুষের ইচ্ছা মোতাবেক কণ্ঠ নিঃসৃত সুর শ্রবণ করাও হারাম নয়। প্রাণহীন যন্ত্রের সুর এবং প্রাণীর স্বর পৃথক নয়। মানুষের কণ্ঠ নিঃসৃত সুর, বিভিন্ন তারযন্ত্রের ওপর আঘাত বা ঘর্ষণজনিত আওয়াজ, দফ, তবলা বা অন্যান্য বাদ্যযন্ত্রের আওয়াজও হারাম নয়”।
আমাদের কথা হচ্ছে, একজন লেখকের কলমের কালী যদি শহীদের রক্তের চেয়ে পবিত্র হতে পারে তবে একজন গায়কের গান যদি মানুষকে মানবকল্যাণে আত্মদান করতে উদ্বুদ্ধ করে, তখন সে গান কেন এবাদত বলে গণ্য হবে না? তাই আল্লাহ যাদেরকে শিল্পপ্রতিভা দান করেছেন তাদেরকে এর হক আদায় করতে হলে এই গুণকে স্বার্থহাসিলের জন্য ব্যবহার না করে মানবতার কল্যাণে ব্যবহার করতে হবে।

আমাদের দেশের অনেক আলেম ও মুফতির দৃষ্টিতে চৈত্র সংক্রান্তি, পহেলা বৈশাখ, নবান্ন উৎসব ইত্যাদি উদ্যাপন করা প্রকৃতপক্ষে হিন্দুয়ানী সংস্কৃতি, শেরক ও বেদাত। তাদের জ্ঞানের প্রতি যথাযথ সম্মান রেখেই বলছি, এ বিষয়ে আমাদের কিঞ্চিৎ দ্বিমত রয়েছে। দু’টি দিক থেকে বিষয়টি উপস্থাপনের চেষ্টা করছি, (ক) ইসলামের আকীদা, (খ) শরিয়াহ।
ইসলাম এমন একটি জীবনব্যবস্থা যা সমগ্র মানবজাতির উপযোগী করে আল্লাহ রচনা করেছেন। এতে যে বিধানগুলো স্থান পেয়েছে সেগুলো কোনোটাই কোনো ভৌগোলিক সীমারেখা দ্বারা সীমাবদ্ধ নয়। প্রতিটি জনপদের মানুষের একটি নিজস্ব সংস্কৃতি থাকে যা তাদের ভৌগোলিক ও আর্থ-সামাজিক অবস্থার সঙ্গে সঙ্গতিশীল, যা গড়ে ওঠে হাজার হাজার বছরের ক্রমবিবর্তনের মাধ্যমে। ইসলাম কোনো বিশেষ অঞ্চলের সংস্কৃতিকে অন্য অঞ্চলের উপর চাপিয়ে দেয় নি, তেমনি কোনো আঞ্চলিক সংস্কৃতিকে নিষিদ্ধও করে নি। ইসলাম নিষিদ্ধ করেছে কেবল অশ্লীলতা, অন্যায় ও আল্লাহর নাফরমানিকে। সে বিচারে আমাদের দেশে আবহমান কাল থেকে চলে আসা নবান্ন উৎসব, চৈত্র সংক্রান্তি বা পহেলা বৈশাখ ইত্যাদি কোনো উৎসবই শরিয়ত পরিপন্থী হতে পারে না। তবে উৎসবের নামে যদি অশ্লীলতা, অপচয় ও অন্যায়ের বিস্তার ঘটানো হয়, সেটা অবশ্যই নিষিদ্ধ। কেননা তার দ্বারা মানবসমাজে অশান্তি সাধিত হবে এবং যা কিছুই অশান্তির কারণ তা-ই যে কোনো জীবনব্যবস্থায় নিষিদ্ধ হওয়ার দাবি রাখে। একজন বাংলাদেশি নেতা বাংলায় কথা বলবেন, বাঙালি পোষাক পরবেন এটাই স্বাভাবিক। তেমনি আল্লাহর শেষ রসুল আরবে এসেছেন, তাঁর আসহাবগণও আরবের মানুষ হিসাবে স্বভাবতই আরবীয় সংস্কৃতির পোষাক, ভাষা, আচার-আচরণ, রুচি-অভিরুচি, খাদ্যাভ্যাস অনুসরণ করতেন। কিন্তু এর সঙ্গে ইসলামের কোনো সম্পর্ক নেই। অথচ আমাদের সমাজে ইসলামী সংস্কৃতির নামে আরবীয় সংস্কৃতি চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। যেমন: ইসলামের অধিকাংশ আলেমদের সিদ্ধান্তমতে পুরুষের ছতর হলো নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত ঢাকতে হবে। এখন কেউ যদি ধুতি পরিধান করে তাহলেও কিন্তু তার ছতর আবৃত হয়। কিন্তু ধুতি পরাকে কি আলেমরা ইসলামী সংস্কৃতি বলে মেনে নেবেন? না। তারা চান মানুষকে তেমন জোব্বা পরাতে যেটা আরবের লোকেরা পরে থাকেন।
বাংলার নিজস্ব সংস্কৃতি বলতে কৃষি সংস্কৃতিই বোঝায়। বাংলার কৃষক ধর্মে হিন্দু বা মুসলিম যেটাই হোক, তার জীবনের আনন্দ, বেদনা, উৎসব, আশা-নিরাশার সঙ্গে ফসল ও ফসলী বছরের নিবিড় বন্ধন থাকবে এ কথা সাধারণ জ্ঞানেই বোঝা যায়। তাই চৈত্রসংক্রান্তি, পহেলা বৈশাখ, নবান্ন উৎসব ইত্যাদি কৃষিনির্ভর বাঙালির জীবনমানের মানদ-।
আসুন দেখা যাক এই উৎসবগুলো কি ইসলামের দৃষ্টিতে বৈধ না অবৈধ? শরিয়তের মানদ- হচ্ছে, আল্লাহ নির্দিষ্টভাবে যে বিষয় বা বস্তুগুলোকে হারাম করেছেন তার বাইরে সবই হালাল বা বৈধ। এছাড়া কোনো বিষয় (যেমন একটি উৎসব) হালাল না হারাম তা নির্ভর করে তার উদ্দেশ্য ও ফলাফলের উপর। কোনো কাজের উদ্দেশ্য বা পরিণতি যদি মানুষের অনিষ্টের কারণ হয় তাহলে সেটা কখনোই ইসলাম সমর্থন করে না। আর যদি তার উদ্দেশ্য হয় মানুষের কল্যাণ তাহলে একে হারাম ফতোয়া দেওয়ার কোনো কারণ থাকতে পারে না। আমরা পবিত্র কোর’আনে কৃষি-সংস্কৃতির দিবস উদ্যাপন প্রসঙ্গে আল্লাহর নীতিমালা জানতে পারি। আল্লাহ বলছেন, তিনিই লতা ও বৃক্ষ-উদ্যানসমূহ সৃষ্টি করেছেন এবং খেজুর বৃক্ষ, বিভিন্ন স্বাদ বিশিষ্ট খাদ্যশস্য, জলপাই ও ডালিম জাতীয় ফলও সৃষ্ট করেছেন। এইগুলো একে অন্যের সদৃশ এবং সাদৃশ্যহীন। যখন তা ফলবান হয় তখন তার ফল আহার করবে আর ফসল তোলার দিনে (ইয়াওমুল হাসাদ) এগুলোর হক প্রদান করবে এবং অপচয় করবে না। নিশ্চয়ই তিনি অপচয়কারীদেরকে পছন্দ করেন না (সুরা আন’আম, আয়াত- ১৪১)।
এ আয়াতে তিনটি শব্দ লক্ষণীয়, (ক) ফসল তোলার দিন, (খ) হক আদায় করা, (গ) অপচয় না করা। কোর’আনের প্রসিদ্ধ ইংরেজি অনুবাদগুলোতে (যেমন আল্লামা ইউসুফ আলী, মারমাডিউক পিকথল) ফসল তোলার দিনের অনুবাদ করা হয়েছে ঐধৎাবংঃ ফধু. আয়াতটিতে আমরা কয়েকটি বিষয় পাচ্ছি:
১. ফল বা ফসল তোলার দিন এর হক আদায় করতে হবে। সেই হক হচ্ছে- এর একটি নির্দিষ্ট অংশ হিসাব করে গরিব মানুষকে বিলিয়ে দিতে হবে। ফসলের এই বাধ্যতামূলক যাকাতকে বলা হয় ওশর।
২. যেদিন নতুন ফসল কৃষকের ঘরে উঠবে সেদিন স্বভাবতই কৃষকের আনন্দ হবে। যে কোনো আনন্দই পূর্ণতা পায় অপরের মধ্যে তা সঞ্চারিত করার মাধ্যমে। নতুন ফসল তোলার আনন্দের ভাগিদার যেন গরিবরাও হতে পারে সেজন্য তাদের অধিকার প্রদান করে তাদের মুখেও হাসি এনে দিতে হবে। কিন্তু আল্লাহ সাবধান করে দিলেন এই আনন্দের আতিশয্যে যেন কেউ অপচয় না করে।
আমাদের দেশে ফসল কাটার দিনে আনন্দ করা হয়, বিভিন্ন ফসলের জন্য বিভিন্ন পার্বণ পালন করা হয়। এ আয়াতের প্রেক্ষিতে দেখা গেল এই দিবসগুলোতে উল্লিখিত কাজগুলো করা ফরদ। কেবল ইসলামের শেষ সংস্করণ নয়, মুসা (আ.) এর উপর যে শরিয়ত নাজেল হয়েছিল সেখানেও আল্লাহ বলেন, “তুমি ফসল কাটার উৎসব অর্থাৎ ক্ষেতে যা কিছু বুনেছ তার প্রথম ফসলের উৎসব পালন করবে। বছর শেষে ক্ষেত থেকে ফসল সংগ্রহ করার সময় ফলসঞ্চয় উৎসব পালন করবে” (তওরাত: এক্সোডাস ২৩:১৬)। সুতরাং আল্লাহর হুকুম মোতাবেকই বিভিন্ন জনপদে বিভিন্ন আঞ্চলিক উৎসব প্রচলিত হয়েছে।
কিন্তু বর্তমানে যেভাবে দিবসগুলো পালিত হচ্ছে সেটাও সঠিক নয়। ক্রিসমাস, ঈদ, পূজা ইত্যাদি ধর্মীয় উৎসব হলেও বাস্তবে এগুলোর আসল উদ্দেশ্য ধর্মানুরাগ নয়, গরিবের মুখে হাসি ফোটানোও নয়। এগুলোর নিরেট উদ্দেশ্য বাণিজ্যিক স্বার্থ। পহেলা বৈশাখও তাই। এদিন একটি ৫০০ টাকার ইলিশের দাম হয়ে যায় ১০,০০০ টাকা, যা সেই দরিদ্র কৃষকের ধরাছোঁয়ার সম্পূর্ণ বাইরে থাকে। অপরপক্ষে যারা সারা বছর বার্গার, পিজা খায় তারা এই একদিন মাটির বাসনে পান্তা-ইলিশ খাওয়ার জন্য হা-পিত্তেশ করেন; যেন একদিনের মাতৃভক্তি, দিন শেষ ভক্তি শেষ। ব্যবসায়ী শ্রেণি ও মিডিয়ার প্রচারণায় ভুলে আমাদের তারুণ্যও উন্মাদনা আর অপচয়ে মত্ত হয়ে যাচ্ছে। বহিঃর্বিশ্বেও এমনই হচ্ছে। অস্ট্রেলিয়ার শিনচিলা শহরে প্রতিবছর উদযাপিত তরমুজ উৎসবে হাজার হাজার তরমুজের রস দিয়ে পিচ্ছিল পথ তৈরি করে তাতে স্কি করা হয়। বিভিন্ন দেশে আঙ্গুর, টমাটো ইত্যাদি নিয়েও অপচয়ের মহোৎসব হয়। কিন্তু আল্লাহ বলেছেন, “খাও, পান কর, কিন্তু অপচয় করো না।… হে রসুল! আপনি বলে দিন, কে হারাম করেছে সাজসজ্জা গ্রহণ করাকে–যা আল্লাহ তার বান্দাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন?” (সুরা আরাফ ৩১-৩২)। অর্থাৎ আনন্দ ফুর্তি, সাজগোজ করতে আল্লাহ নিষেধ করেন নি। এই মুহূর্তে পৃথিবীতে প্রায় এক বিলিয়ন মানুষ আছে যারা দুর্ভিক্ষপীড়িত, আমাদের দেশেও অধিকাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে অবস্থান করছে। এই মানুষগুলোর হক আছে আল্লাহ প্রদত্ত সকল ফল ও ফসলে, এই নবান্নে, পহেলা বৈশাখে, চৈত্রসংক্রান্তির পার্বণে। তাদের সেই হক আদায় করা হলেই এই উৎসব হবে পবিত্র দিন। উৎসব আর ঈদ আসলে একই কথা। উৎসবের নামে আজ অর্থের যে নিদারুণ অপচয় হচ্ছে, বাণিজ্যিক স্বার্থ হাসিল করা হচ্ছে তা না করে যদি আল্লাহর হুকুম মোতাবেক গরিব-দুখী মানুষকে তাদের অধিকার প্রদান করা হতো, তাহলে এ আনন্দ পূর্ণতা পেত, আর এই উৎসবগুলো এবাদতে পরিণত হতো।

এ প্রসঙ্গে বিস্তারিত বলা আগে দু’টি পূর্বসিদ্ধান্ত আমাদেরকে জানতে হবে –
(১) পারিবারিক জীবনের বিধান রাষ্ট্রে চলে না, উভয় অঙ্গনে আলাদা বিধান লাগবে।
(২) আল্লাহ বিধানের ভারসাম্য এর অপূর্ব বৈশিষ্ট্য। এই ভারসাম্য নষ্ট হলে ধর্ম অধর্মে পরিণত হয়।
মানবসমাজের ক্রমবিকাশের বিভিন্ন পর্যায়ে এবলিস প্ররোচনা দিয়ে এই দীনের ভারসাম্য বিনষ্ট করেছে। ফলে মানুষ ভুলে গেছে কার কি কর্তব্য ও স্রষ্টা নির্ধারিত দায়িত্ব। দায়িত্ব সুনির্দিষ্ট না থাকলে অশান্তি ও বিশৃঙ্খলা হতে বাধ্য, যেমন একটি ফুটবল টিমে মাঠের কে কোথায় খেলবে তা ঠিক করা থাকে। অন্যায় অবিচারে মানবজাতি ডুবে গেলে আল্লাহ কোন নবী রসুল পাঠিয়ে সেই ভারসাম্যকে ফিরিয়ে এনেছেন। বর্তমানের ইহুদি-খ্রিস্টান বস্তুবাদী সভ্যতা (দাজ্জাল) মানুষের জীবন থেকে সর্বপ্রকার নৈতিকতার শিক্ষাকে বিলুপ্ত করে দিয়েছে এবং স্রষ্টা ও আখেরাতের ধারণাকে উচ্ছেদ করে দিয়েছে। সেই সঙ্গে সমাজে নারী ও পুরুষের কার কী অবস্থান, কার কী দায়িত্ব ও কর্তব্য তা মানুষ একেবারেই ভুলে গেছে। সকল ধর্ম বিকৃত হয়ে যাওয়ার কারণে এ বিষয়ে স্রষ্টার দেওয়া মানদ-ও দুনিয়া থেকে হারিয়ে গেছে। প্রচলিত বিকৃত ইসলামে নারী পুরুষের সঠিক অবস্থান নিয়ে বিস্তর মতভেদ আছে। তবে সকল আলেমই “সুরা নেসার ৩৪ নং আয়াত”কে ভিত্তি হিসাবে উপস্থাপন করেন।
“আর রেজালু কাওয়্যামুনা আলান্নেসায়ী” – এ আয়াতটিকে ইসলামের বিরুদ্ধে অপপ্রচারের অন্যতম হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করা হয়। এ আয়াতটির অনুবাদ করা হয়, “পুরুষেরা নারীদের উপর কর্তৃত্বশীল এ জন্য যে, তারা তাদের অর্থ ব্যয় করে। সে মতে নেককার স্ত্রীলোকগণ হয় অনুগতা এবং আল্লাহ যা হেফাযতযোগ্য করে দিয়েছেন লোকচক্ষুর অন্তরালেও তার হেফাযত করে।” (সুরা নিসা: ৩৪)
দেখুন, আমরা একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষকে যে কাজের দায়িত্ব দেই, একজন শিশুকে তা দেই না। কারণ তাদের শারীরিক ও মানসিক অক্ষমতা ও সক্ষমতার তারতম্য। তারা উভয়েই একই পরিবারে থাকে কিন্তু উভয়ের কাজের ক্ষেত্র আলাদা। ঐ ফুটবল টিমের মত, সবাই মাঠেই আছে কিন্তু সবার দায়িত্ব আলাদা। পরিবার হচ্ছে মানবসমাজের ক্ষুদ্রতম সংগঠন। এই আয়াতে ইসলামে নারী ও পুরুষের সমন্বয়ে গঠিত পরিবারে কার কী অবস্থান, অধিকার ও কর্তব্য সে সম্পর্কে একটি মূলনীতি ঘোষিত হয়েছে। এই আয়াতে আল্লাহ পুরুষের ক্ষেত্রে বিশেষণ ব্যবহার করেছেন ‘কাওয়্যামুনা’। শাসক, কর্তৃত্বের অধিকারী, আদেশদাতা, ক্ষমতাশালী, নেতৃত্বের অধিকারী, অঁঃযড়ৎরঃু চড়বিৎ ইত্যাদি বোঝাতে আরবিতে আমীর, সাইয়্যেদ, এমাম, সুলতান, হাকীম, মালিক ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার করা হয়। আল্লাহ কোন যুক্তিতে এবং কোন ক্ষেত্রে পুরুষকে নারীর উপরে কর্তৃত্বশীল করেছেন তা এই ‘কাউয়ামুনা’ শব্দের মধ্যেই নিহিত রোয়েছে। কাউয়ামুনা শব্দের অর্থ হচ্ছে সুঠাম ও সুডৌল দেহবিশিষ্ট, মানুষের গঠন কাঠামো, ঠেক্না, পরিচালক, ব্যবস্থাপক, তত্ত্বাবধায়ক, অভিভাবক, শাসক, নেতা (আরবি-বাংলা অভিধান ২য় খ-, পৃ ৫৩১- ই.ফা.বা.)। সুতরাং এই আয়াতের মর্মার্থ হচ্ছে, পুরুষ শারীরিক দিক থেকে নারীর চেয়ে শক্তিশালী, তার পেশী, বাহু, হাড়ের গঠন, মেরুদ- এক কথায় তার দেহকাঠামো নারীর তুলনায় অধিক পরিশ্রমের উপযোগী, আল্লাহই তাকে রুক্ষ পরিবেশে কাজ করে উপার্জন করার সামর্থ্য বেশি দান করেছেন, তাই পুরুষের দায়িত্ব হলো সে পুরুষ শক্তি সামর্থ্য প্রয়োগ করে, কঠোর পরিশ্রম করে রোজগার করবে, মাথার ঘাম পায়ে ফেলে ভূমি কর্ষণ করে ফসল ফলিয়ে, শিল্পকারখানায় কাজ করে উপার্জন করবে এবং পরিবারের ভরণপোষণ করবে। এই শারীরিক বৈশিষ্ট্যের কারণেই পুরুষকে আল্লাহ নারীর তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব দিয়েছেন, নারীর অভিভাবক করেছেন। এটা মানব সমাজে বিশেষ করে পরিবারে পুরুষের বুনিয়াদি দায়িত্ব। অপরদিকে নারীদেরকে আল্লাহ সন্তান ধারণের উপযোগী শরীর দান করেছেন, সন্তানবাৎসল্য ও সেবাপরায়নতা দান করেছেন। তাই প্রকৃতিগতভাবেই তাদের মূল কাজ হচ্ছে সন্তানধারণ করা, তাদের লালন-পালন করা, রান্না-বান্না করা এক কথায় গৃহকর্ম করা। সংসদ বাঙ্গালা অভিধানে স্বামী শব্দের অর্থ দেওয়া হয়েছে পতি, ভর্তা, প্রভু, মনিব, অধিপতি, মালিক। আল্লাহর একটি সিফত হচ্ছে রাব্বুল আলামীন বা বিশ্বজগতের প্রতিপালক। আল্লাহ যেমন কোন প্রাণী সৃষ্টি করার আগেই তার রেজেকের বন্দোবস্ত করে রাখেন, কেবল আহার্য নয় জীবনোপকরণ হিসাবে তার যখন যা দরকার তাই তিনি নিরন্তর সরবরাহ করে যান। বিশ্বজগতে প্রতিপালক হিসাবে আল্লাহর যে ভূমিকা, একটি পরিবারে আল্লাহরই প্রতিভূ (খলিফা) হিসাবে পুরুষেরও অনেকটা সেই ভূমিকা, কিন্তু ক্ষুদ্র পরিসরে।
সালাহ বা নামাজ হচ্ছে উম্মতে মোহাম্মদী জাতিটির মডেল। এখানে প্রথম সারিতে পুরুষ এবং দ্বিতীয় সারিতে নারী। বাস্তব জীবনেও এই মডেলের রূপায়ণ ঘটা ইসলামের কাম্য। উপার্জন করা পুরুষের কাজ, তাই বলা যায় জীবিকার যুদ্ধক্ষেত্রে মেয়েরা দ্বিতীয় সারির সৈনিক। কখনও কখনও যদি অবস্থার প্রয়োজনে নারীকে প্রথম সারিতে গিয়ে জীবিকার লড়াইতে অবতীর্ণ হতে হয় সেটার সুযোগ আল্লাহ রেখেছেন। শোয়াইব (আ.) বৃদ্ধ হয়ে যাওয়ায় এবং তাঁর পুত্র সন্তান না থাকায় তাঁর দুই তরুণী কন্যা তাঁদের পশুপালের দেখাশোনা করতেন (সুরা কাসাস ২৩)। এছাড়া ইসলামের বিধান হলো স্বামীর উপার্জনের উপর স্ত্রীর অধিকার রয়েছে কিন্তু স্ত্রীর উপার্জনের উপর স্বামীর কোন অধিকার নেই। এখানেও নারীর উপার্জন করার অধিকারকে সম্পূর্ণরূপে স্বীকার করে নেওয়া হলো। রসুলাল্লাহর অনেক নারী আসহাব পরিবারে পুরুষ সদস্য না থাকায় বা পুরুষ সদস্যরা জেহাদে অধিক ব্যস্ত থাকায় নিজেরাই কৃষিকাজ করে, কুটির শিল্পের মাধ্যমে উপার্জন করতেন, অনেকে ব্যবসাও করতেন। রসুলাল্লাহর আহ্বানে সর্বপ্রথম যিনি ইসলাম গ্রহণ করলেন তিনি একজন নারী, আম্মা খাদিজা (রা.)। তিনি তাঁর সকল সম্পদ আল্লাহর রাস্তায়, মানবতার কল্যাণে বিলিয়ে দিয়েছিলেন। সর্বোচ্চ ত্যাগের পরিচয় তিনি দিয়ে গেছেন। আবার ইসলামের জন্য সর্বপ্রথম যিনি জীবন দিলেন, শহীদ হলেন তিনি একজন নারী, সুমাইয়া (রা.)।
এবার আসা যাক সত্যিকার যুদ্ধের ক্ষেত্রে। যুদ্ধক্ষেত্রেও প্রথম সারিতে (ঋৎড়হঃ খরহব) থেকে সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নেওয়ার দায়িত্ব পুরুষদের। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থাতেও সকল সামরিক বাহিনীতে এটাই হয়ে থাকে। এখানেও কারণ পুরুষের শারীরিক বৈশিষ্ট্য, শক্তি, সামর্থ্য, কষ্টসহিষ্ণুতা ইত্যাদি। সেখানে নারীর স্বাভাবিক অবস্থান দ্বিতীয় সারিতে। তাদের কাজের মধ্যে প্রধান কাজ হচ্ছে রসদ সরবরাহ। যুদ্ধের বেলাতে রসদ সরবরাহকে যুদ্ধের অর্ধেক বলে ধরা হয়। সৈনিকদের খাদ্য, পানি, যুদ্ধাস্ত্র, যুদ্ধের আনুষঙ্গিক উপাদান সরবরাহ, আহতদেরকে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে নিরাপদ স্থানে সোরিয়ে নেওয়া ও চিকিৎসা সেবা দেওয়া, নিহতদেরকে দাফন করা ইত্যাদি সবই দ্বিতীয় সারির কাজ। রসুলাল্লাহর সময় নারীরা প্রায় সকল যুদ্ধেই প্রথমে এই দ্বিতীয় সারির দায়িত্ব পালন করেছেন। তারা আহতদের চিকিৎসা দিয়েছেন, নিহতদের দাফনে সহায়তা করেছেন। যুদ্ধক্ষেত্রে আহত সৈন্যদেরকে পানি পান করিয়েছেন। তাছাড়া মসজিদে নববীর এক পাশে যুদ্ধাহতদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছিল, যার প্রধান ছিলেন একজন নারী রুফায়দাহ (রা.)। যোদ্ধাদেরকে যদি রসদ ও এই সেবাগুলি দিয়ে সাহায্য না করা হয় তবে তারা কখনোই যুদ্ধ করতে পারবে না।
তবে যুদ্ধে এমন এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় যখন মেয়েদেরকেও অস্ত্র হাতে নিতে হয়। ওহুদের যুদ্ধে যখন মুসলিম বাহিনী বিরাট বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়, বহু সাহাবি শহীদ হয়ে যান, স্বয়ং রসুলাল্লাহ মারাত্মকভাবে আহত হন, কাফেররা প্রচার করে দেয় যে, রসুলাল্লাহও শহীদ হয়ে গেছেন এমনই বিপজ্জনক মুহূর্তে মেয়েরা আর দ্বিতীয় সারিতে থাকলেন না, তারা অস্ত্র হাতে নিয়ে রসুলাল্লাহকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য কাফের সৈন্যদের বিরুদ্ধে বিপুল বিক্রমে ঝাঁপিয়ে পড়েন। ওহুদ যুদ্ধে নারী সাহাবি উম্মে আম্মারার (রা.) অবিশ্বাস্য বীরত্ব সম্পর্কে রসুলাল্লাহ বলেছিলেন, ‘ওহুদের দিন ডানে-বামে যেদিকেই নজর দিয়েছি, উম্মে আম্মারাকেই লড়াই করতে দেখেছি।’
এর অনেক পরে ইয়ারমুকের যুদ্ধে বীর যোদ্ধা দেরার বিন আজওয়ার যখন শত্র“র হাতে আটকা পড়েন তখন তারই বোন খাওলা ঘোড়ায় চড়ে এমন লড়াই শুরু করে ভাইকে উদ্ধার করেন যে স্বয়ং খালিদ (রা.) বিস্ময়প্রকাশ করেন। অর্থাৎ রসুলাল্লাহর সময়ে নারীরা ঠিকই প্রয়োজনবোধ প্রথম সারির ভূমিকাও পালন করেছেন, মাসলা মাসায়েলের জটিল জাল বিস্তার করে কোনো কাজেই তাদের অংশগ্রহণে বাধা সৃষ্টি করা হয় নি, আজ যেমনটা করা হচ্ছে। নারীর নেতৃত্ব প্রদানের যোগ্যতাকে ইসলাম মোটেও অস্বীকার করে না। উটের যুদ্ধে নেতৃত্ব দেন উম্মুল মো’মেনীন আয়েশা (রা.), বহু সাহাবি তাঁর অধীনে থেকে যুদ্ধ করেছেন। যুদ্ধটির বিভিন্ন দিক নিয়ে ঐতিহাসিকরা সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করেছেন, সমালোচনা করেছেন কিন্তু “ইসলামে নারী নেতৃত্ব হারাম” বলে তখন তাঁর পক্ষে বিপক্ষে যুদ্ধরত কোন সাহাবি ফতোয়া দিয়েছেন বলে ইতিহাসে পাওয়া যায় না।
আল্লাহর বিধানমতে কেবল একটি মাত্র পদ নারীকে দেওয়া বৈধ নয়, সেটি হলো- সমস্ত পৃথিবীময় উম্মতে মোহাম্মদী নামক যে মহাজাতি সৃষ্টি হবে সে জাতির এমামের পদ। আল্লাহ স্রষ্টা হিসাবে জানেন যে নারীর শারীরিক গঠন যেমন পুরুষের তুলনায় কোমল, তার হৃদয়ও পুরুষের তুলনায় কোমল, আবেগপ্রবণ ও সংবেদনশীল। সহজেই তার চিত্তচাঞ্চল্য ঘটে, তার স্থৈর্য্য, দূরদর্শীতা পুরুষের চেয়ে কম, তাকে প্রভাবিত করা সহজতর। এবলিস নারীকেই প্রথম আল্লাহর হুকুম থেকে বিচলিত করেছিল। এ কারণেই আল্লাহর অগণ্য নবী-রসুলের মধ্যে একজনও নারী নেই। পারস্যের সঙ্গে রোমের যুদ্ধের সময় রসুলাল্লাহ একটি পূর্বাভাষে বলেছিলেন, নারীর হাতে যে জাতি তার শাসনভার অর্পণ করেছে যে কখনো সফল হতে পারে না (তিরমিজি)। তবে স্বীয় যোগ্যতাবলে উম্মতে মোহাম্মদীর এমামের পদ ছাড়া অন্যান্য যে কোন পর্যায়ের আমীর বা নেতা সে হতে পারবে। এমন কি একজন নারী কোন এলাকার রাজনৈতিক প্রশাসকও (এড়াবৎহড়ৎ) হতে পারেন। শুধু নারী হওয়া ইসলামের দৃষ্টিতে নেতৃত্বলাভের যোগ্যতা অযোগ্যতার মাপকাঠি নয়।
পুরুষ যেহেতু পরিবারের সবাইকে ভরন-পোষণ করাচ্ছে, লালন-পালন করছে কাজেই তার কথা পরিবারের অন্যান্য সদস্যকে শুনতে হবে, এটা একটি পারিবারিক শৃঙ্খলা। কিন্তু পারিবারিক জীবনের শৃঙ্খলা সম্পর্কিত এই আয়াতটিকে সামষ্টিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনের সর্বত্র প্রয়োগ করার চেষ্টা করছেন একশ্রেণির আলেম। তাদের এই অপচেষ্টার ফলে নারী সমাজের মধ্যে নেতৃত্বের গুণাবলী বিকশিত হচ্ছে না, তারা তাদের যোগ্যতার প্রমাণও দেওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। আজকের বিকৃত ইসলামের কূপম-ূক ধর্মজীবী আলেম-মোল্লারা এটা বুঝতে সক্ষম নন যে, একটি পরিবার পরিচালনার শৃঙ্খলা দিয়ে রাষ্ট্র চলতে পারে না, বা জীবনের অন্যান্য অঙ্গনগুলি চলতে পারে না। তাই জীবনের অন্যান্য অঙ্গনে যার নেতৃত্ব দেওয়ার যোগ্যতা বেশি সে পুরুষই হোক আর নারীই হোক, তাকেই নেতা মনোনীত করা যাবে।

 অসম্ভব, আমরা অস্বীকার করছি না তো। কোর’আনে যুদ্ধ আছে, আল্লাহর রসুলের অর্ধেক জীবন গেছে যুদ্ধ করে। সেটা কোন যুদ্ধ? কোন পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ রসুল যুদ্ধ করেছন সেটা বুঝতে হবে। সেটা আমরা আমাদের জেহাদ, কেতাল সন্ত্রাস বইতে পরিষ্কার তুলে ধরেছি। তবু সংক্ষেপে বলছি, আল্লাহ বিশ্বনবীকে (দ.) পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন এই জন্য যে তিনি যেন পৃথিবীতে প্রচলিত সব রকম (পূর্ববর্তী বিকৃত ধর্ম ও মানুষের তৈরি জীবনব্যবস্থা) দীন অর্থাৎ জীবন-ব্যবস্থাগুলি অকেজো, নিষ্ক্রিয়, বিলুপ্ত করে দিয়ে এই শেষ ইসলামকে সমগ্র পৃথিবীময় প্রতিষ্ঠা করে মানবজীবন থেকে সর্বরকম অন্যায়, অবিচার, যুদ্ধ, রক্তপাত, ক্ষুধা, দারিদ্র্য ইত্যাদি দূর করে ন্যায়, সুবিচার অর্থাৎ শান্তি প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে। অর্থাৎ আল্লাহ শেষনবীকে (দ.) তার জীবনের সমস্ত কর্মকান্ডে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। যে কেউ মহানবীর (দ.) জীবনী পড়লেই দেখতে পাবেন তাঁর সমস্তটা পবিত্র জীবন ঐ একটি কাজে ব্যয় হয়েছে, আল্লাহর নির্দিষ্ট করে দেয়া লক্ষ্য মানবজীবনে শান্তি প্রতিষ্ঠার জেহাদে। জেহাদ শব্দের অর্থ হলো কোনো লক্ষ্য অর্জনের জন্য পূর্ণভাবে চেষ্টা করা (ঝঃৎঁমমষব) সর্বতোভাবে, অক্লান্তভাবে চেষ্টা করা। আর অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করা হলো কেতাল, অর্থাৎ সশস্ত্র সংগ্রাম। তাহলে কেতাল, সশস্ত্র সংগ্রাম হলো জেহাদের একটা অংশ। সামগ্রিকভাবে এই জীবন-ব্যবস্থাকে সমস্ত পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠা করার প্রয়াস, সংগ্রামে সব রকমের চেষ্টাই অন্তর্ভুক্ত। প্রথমে যুক্তি দিয়ে, বুঝিয়ে, লিখে, হাতে-কলমে দেখিয়ে এবং কোনো কিছুতেই কাজ না হলে সশস্ত্র সংগ্রাম অর্থাৎ কেতালের মাধ্যমে। এখানে একটি কথা অতি অবশ্যই মনে রাখতে হবে, ব্যক্তি বা দলগত পর্যায়ে কেতাল নেই। কেতাল বা সশস্ত্র যুদ্ধ হচ্ছে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে। একটা জাতি যদি তওহীদের উপর একতাবদ্ধ হয়ে রাষ্ট্র গঠন করে তখন ঐ রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, শৃঙ্খলা বিধান ইত্যাদির প্রয়োজনে যুদ্ধ। মানুষ তার অভ্যস্ত বিশ্বাসে এত যুক্তিহীন যে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ফেতনা ফাসাদ দূর করে শান্তি আনয়নের জন্য শেষ পর্যন্ত হাতে অস্ত্র নিতে হয়েছে। বিশ্বনবীকেও (দ.), তাঁর আসহাবদেরও ঐ একই কাজ করতে হয়েছে। তাই কিছুদিনের মধ্যেই জেহাদ (প্রচেষ্টা) ও কেতাল (সশস্ত্র যুদ্ধ) একার্থবোধক হয়ে গিয়েছিল। মহানবীর সমগ্র নব্যুয়তি জীবন ২৩ বছরের মধ্যে মক্কার ১৩ বছর তিনি শুধু আল্লাহর সার্বভৌমত্বের দিকে মানুষকে ডাক দিয়েছেন। এই সময় তিনি অস্ত্র হাতে নেন নি, সংঘাত-সংঘর্ষ করেন নি। এমনকি তাঁকে চরম নির্যাতন করা হয়েছিল। তবুও তিনি প্রত্যাঘাত করেন নি। তারপর মদিনার মানুষ যখন তাঁর তওহীদের ডাক গ্রহণ করল, তখন তিনি হেজরত করে সেখানে যেয়ে রাষ্ট্র গঠন করলেন। যেই রাষ্ট্র গঠন করলেন তখনই নীতি বদলে গেল। কারণ কোনো রাষ্ট্র কোনোদিন ব্যক্তি বা দলের নীতিতে টিকে থাকতে পারে না। তখন তাঁর প্রয়োজন হবে অস্ত্রের, সৈনিকের, যুদ্ধের প্রশিক্ষণের। আল্লাহর রসুলও তাই করলেনÑ হাতে অস্ত্র নিলেন এবং তখন থেকে তাঁর পবিত্র জীবনের বাকিটার সমস্তটাই কাটল যুদ্ধ করে। অর্থাৎ তওহীদ ভিত্তিক এই সত্যদীন প্রচার ও প্রতিষ্ঠায় ব্যক্তি গোষ্ঠী বা দলগতভাবে কোনো কেতাল অর্থাৎ সশস্ত্র যুদ্ধ নেই, আছে শুধু তওহীদের, আল্লাহর সার্বভৌমত্বের আহ্বান, বালাগ দেয়া। ঠিক তেমনি রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে আছে সশস্ত্র যুদ্ধ। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে অস্ত্র, যুদ্ধ ইত্যাদি যদি আইন সম্মত না হয় তবে পৃথিবীর সব দেশের সামরিক বাহিনীই বে-আইনী, সন্ত্রাসী। কোর’আন ও হাদীসে যে জেহাদ ও কেতালের কথা আছে তা রাষ্ট্রগত।
তাই কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী বা দল যদি দীন প্রতিষ্ঠার জন্য অস্ত্র হাতে নেয় তবে সেটা হবে মারাত্মক ভুল। তাদের কাজ হবে মানুষকে যুক্তি দিয়ে কোর’আন-হাদিস দেখিয়ে, বই লিখে, বক্তৃতা করে অর্থাৎ সর্বপ্রকারে মানুষকে এ কথা বোঝানো যে পৃথিবীতে অন্যায়, অবিচার, নির্যাতন, শোষণ, ক্রন্দন, রক্তপাত, যুদ্ধহীন একটি সমাজে নিরাপত্তা ও ন্যায় বিচারের মধ্যে অর্থাৎ নিরঙ্কুশ শান্তিতে বাস করতে হলে একমাত্র পথ যিনি আমাদের সৃষ্টি করেছেন তাঁর দেয়া জীবন বিধান মোতাবেক আমাদের জীবন পরিচালনা করা। সাধারণ জ্ঞানেই বোঝা যায় যে, যিনি যে জিনিস তৈরি করেছেন তাঁর চেয়ে আর কে বেশি জানবে যে জিনিসটি কীভাবে চালালে সেটা ঠিকমত, ভালোভাবে চলবে। আল্লাহ সুরা মুলকের ১৪ নং আয়াতে বলেছেন যে সৃষ্টি করেছে তার চেয়ে বেশি জান? (তুমি সৃষ্ট হয়ে?) এ যুক্তির কোনো জবাব আছে? কিন্তু আমরা মো’মেন মুসলিম হবার দাবিদার হয়েও দাজ্জালের (ইহুদি খ্রিষ্টান বস্তুবাদী সভ্যতা) নির্দেশে আল্লাহর দেয়া দীন, জীবন-ব্যবস্থা থেকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত অংশটুকু ছাড়া সমষ্টিগত (যেটাই প্রধান) অংশটুকু বাদ দিয়ে সেখানে নিজেরা বিধান, আইন-কানুন, নিয়মনীতি নির্ধারণ করে সেই মোতাবেক আমাদের সমষ্টিগত জীবন পরিচালিত করছি। ফল কি হয়েছে? শিক্ষা দীক্ষায়, বিজ্ঞানে, প্রযুক্তিতে মানব ইতিহাসের চূড়ান্ত স্থানে উপস্থিত হয়েও আজ পৃথিবী অশান্তি, অন্যায়, অত্যাচার, অবিচার আর মানুষে মানুষে সংঘর্ষ ও রক্তপাতে অস্থির। তাহলে প্রমাণ হয়ে যাচ্ছে যে মানুষ তার জীবন পরিচালনার জন্য যে ব্যবস্থা তৈরি করে নিয়েছে তা তাকে শান্তি ও নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। কাজেই মানুষকেই বোঝাতে হবে যে এ পথ ত্যাগ করে মানুষের সার্বভৌমত্বকে ত্যাগ করে আল্লাহর রসুল যা শিখিয়েছেন সেই আল্লাহর সার্বভৌমত্বে ফিরে যেতে হবে, সেই সার্বভৌমত্বকে গ্রহণ করে তাঁর দেয়া দীন, জীবন-ব্যবস্থাকে গ্রহণ করে আমাদের জীবনে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এই কাজ কি জোর করে করাবার কাজ? এটাতো সাধারণ জ্ঞানেই বোঝা যায় যে জোর করে, শক্তি প্রয়োগ করে মানুষকে কোনো কিছু বিশ্বাস করানো অসম্ভব।

পন্নী পরিবারের দুটি ভাগ। তাঁদের বংশের অনেকেই ওলি আল্লাহ ছিলেন, আধ্যাত্মিক সাধক ছিলেন। আবার অনেকে উপমহাদেশের পরিচিত রাজনীতিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন। ভারতের বিখ্যাত সুফি সাধক সৈয়দ খাজা মোহাম্মদ হোসাইনী গেসুদারাজ বন্দে নেওয়াজ (র.) (১৩২১-১৪২২), টাঙ্গাইলের হযরত মুঈন খান পন্নী (র.) ছিলেন এমামুয্যামানের পূর্বপুরুষ। উপমহাদেশের বিখ্যাত সাধক হায়দার আলী খান পন্নী (রহ.) ছিলেন এমামুযযামানের দাদাজান। তাঁরা চিরকালই মানুষের কল্যাণে কাজ করেছেন। প্রখ্যাত দানবীর ওয়াজেদ আলী খান পন্নী ওরফে চান মিয়া ছিলেন এমামুয্যামানের দাদার বড় ভাই। পন্নী পরিবার অনেক বড়। একটা বড় পরিবারে বিভিন্ন মতের বিভিন্ন চরিত্রের মানুষ থাকে। এখানে অনেকেই আছেন যাদের মধ্যে কে বিএনপি করেন, কে আওয়ামী লীগ করেন, কে বিদেশে গিয়ে কী করছেন এগুলো তো এমামুয্যামানের উপর বর্তানোর কোনো মানে হয় না। এটা ইতিহাস যে, তৎকালীন আরবের কোরাইশ বংশে আল্লাহর রসুল এসেছেন। মক্কার সবচাইতে সম্ভ্রান্ত পরিবার কোরাইশ আপনারা জানেন। তারা কাবা নিয়ন্ত্রণ করতেন। সেই কোরাইশ বংশের আবু লাহাব, আবু জাহেল, ওতবা, শায়েবা এমন এমন জঘন্য কাজ করেছেন যে তারা ঐতিহাসিকভাবে ঘৃণিত হচ্ছেন। তারা কাবাকে অপবিত্র করেছেন। তাদের কেউ কেউ রসুলাল্লাহর আপন চাচা। কিন্তু তাদের দুষ্কর্ম কি আল্লাহর রসুলের উপর বর্তাবে? রসুলাল্লাহ ছিলেন মক্কার সেই কোরাইশদের থেকে আলাদা। সেই কোরাইশরা আল্লাহ রসুলকে বলতো আল-আমিন, আস-সাদেক, সত্যবাদী। তিনি কখনও মিথ্যা বলতে পারেন না, ওয়াদা নষ্ট করেন না, কারও হক নষ্ট করেন না, তিনি ন্যায় নীতিবান। মানুষের কল্যাণের চিন্তাই তিনি সবসময় করেন। আমাদের এমামুয্যামানও তাঁর পরিবারের মধ্যে সত্যবাদী, আল্লাহর পছন্দনীয় চরিত্রবান ও সাহায্যপ্রাপ্ত ছিলেন। উপমহাদেশের প্রখ্যাত পন্নী পরিবারের শাসনকার্য পরিচালনা, আধ্যাত্মিক ও রাজনীতিক কর্মকা-ের ইতিহাস হাজার বছরের। এমন একটি সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান এমামুয্যামান বংশের অন্য অনেকের থেকে একেবারেই ভিন্ন প্রকৃতির ছিলেন, এ কথা তাঁর পরিবার ও পরিচিতমহলের সকলেই জানেন।

যারা ধর্মের বিনিময় নেয় তারা সবাই। ধর্মের নামে কোনো বিনিময় চলে না। এটা একেবারে সুত্রের মতো মনে রাখতে হবে। আল্লাহ বলছেন শুয়োর খাওয়া হারাম, মৃত জন্তু খাওয়া হারাম, তারপর বলছেন নিরুপায় হলে তাও খেতে পারো। কিন্তু ধর্মের বিনিময় নেয়া একেবারে নিষেধ। এটা কোনোভাবে ক্ষমা করবেন না আল্লাহ এবং তাদেরকে পবিত্রও করবেন না আল্লাহ। সুরা বাকারার ১৭৪ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলছেন, “আল্লাহ যে কেতাব অবতীর্ণ করেছেন যারা তা গোপন করে এবং বিনিময়ে তুচ্ছ মূল্য গ্রহণ করে তারা (১) নিজেদের পেটে আগুন ছাড়া কিছুই পুরে না, (২) কেয়ামতের দিন আল্লাহ তাদের সঙ্গে কথা বলবেন না, (৩) আল্লাহ তাদের পবিত্রও করবেন না, (৪) তারা ক্ষমার পরিবর্তে শাস্তি ক্রয় করেছে, (৫) তারা হেদায়াতের পরিবর্তে পথভ্রষ্টতা বা গোমরাহী ক্রয় করেছে, (৬) তারা দীন সম্পর্কে ঘোরতর মতভেদে লিপ্ত আছে (৭) আগুন সহ্য করতে তারা কতই না ধৈর্যশীল”। সুতরাং ধর্মকে স্বার্থহাসিলের উপায় বানানোর ব্যাপারে ইসলামে কোনো শিথিলতা নেই। কারণ এটা করলে ধর্মই বিকৃত হয়ে যাবে, মানুষ আর সঠিক পথ পাবে না, মুক্তির পথ পাবে না। ভুল পথে চলতে বাধ্য হবে, সে দুনিয়াও হারাবে আখেরাতও হারাবে। তাই ধর্মের কাজ হবে সম্পূর্ণ নিঃস্বার্থভাবে। এ ধর্মের কাজ করে একেবারে শুরুতে নামাজ পড়িয়ে, ওয়াজ করিয়ে, মুর্দা দাফন করিয়ে, এখান থেকে শুরু করে একেবারে রাজনীতি পর্যন্ত যে অঙ্গনেই হোক ধর্মের কাজ করে পার্থিব স্বার্থ হাসিল করবে সেই ধর্মব্যবসায়ী। ধর্মব্যবসায়ী বলতে কাদের বোঝাচ্ছেন?
উত্তর: যারা ধর্মের বিনিময় নেয় তারা সবাই। ধর্মের নামে কোনো বিনিময় চলে না। এটা একেবারে সুত্রের মতো মনে রাখতে হবে। আল্লাহ বলছেন শুয়োর খাওয়া হারাম, মৃত জন্তু খাওয়া হারাম, তারপর বলছেন নিরুপায় হলে তাও খেতে পারো। কিন্তু ধর্মের বিনিময় নেয়া একেবারে নিষেধ। এটা কোনোভাবে ক্ষমা করবেন না আল্লাহ এবং তাদেরকে পবিত্রও করবেন না আল্লাহ। সুরা বাকারার ১৭৪ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলছেন, “আল্লাহ যে কেতাব অবতীর্ণ করেছেন যারা তা গোপন করে এবং বিনিময়ে তুচ্ছ মূল্য গ্রহণ করে তারা (১) নিজেদের পেটে আগুন ছাড়া কিছুই পুরে না, (২) কেয়ামতের দিন আল্লাহ তাদের সঙ্গে কথা বলবেন না, (৩) আল্লাহ তাদের পবিত্রও করবেন না, (৪) তারা ক্ষমার পরিবর্তে শাস্তি ক্রয় করেছে, (৫) তারা হেদায়াতের পরিবর্তে পথভ্রষ্টতা বা গোমরাহী ক্রয় করেছে, (৬) তারা দীন সম্পর্কে ঘোরতর মতভেদে লিপ্ত আছে (৭) আগুন সহ্য করতে তারা কতই না ধৈর্যশীল”। সুতরাং ধর্মকে স্বার্থহাসিলের উপায় বানানোর ব্যাপারে ইসলামে কোনো শিথিলতা নেই। কারণ এটা করলে ধর্মই বিকৃত হয়ে যাবে, মানুষ আর সঠিক পথ পাবে না, মুক্তির পথ পাবে না। ভুল পথে চলতে বাধ্য হবে, সে দুনিয়াও হারাবে আখেরাতও হারাবে। তাই ধর্মের কাজ হবে সম্পূর্ণ নিঃস্বার্থভাবে। এ ধর্মের কাজ করে একেবারে শুরুতে নামাজ পড়িয়ে, ওয়াজ করিয়ে, মুর্দা দাফন করিয়ে, এখান থেকে শুরু করে একেবারে রাজনীতি পর্যন্ত যে অঙ্গনেই হোক ধর্মের কাজ করে পার্থিব স্বার্থ হাসিল করবে সেই ধর্মব্যবসায়ী।

প্রশ্নই আসে না। এমামুযযামান বলতেন আমি আল্লাহর এক গুনাহগার বান্দা, আল্লাহ রসুলের গুনাহগার উম্মত। তিনি আল্লাহ রসুলকে যেভাবে সম্মান করতেন, শ্রদ্ধা করতেন আমাদের চর্মচক্ষুতে কখনও দেখি নি কেউ আল্লাহ রসুলকে এভাবে সম্মান করে। আমরা দেখেছি এমামুযযামান কখনও পশ্চিম দিকে ফিরিয়ে জুতা রাখতেন না, কখনও তিনি পশ্চিম দিকে পিঠ দিয়ে বসতেন না। রসুলের সম্মানে তিনি শ্রদ্ধায় বিগলিত হয়ে যেতেন। তাঁর নবী হওয়ার বা নবী দাবি করার প্রশ্নই আসে না, মানুষ যেন আমাদের কথা না শোনে, আমরা যেন সর্বত্র হয়রানির শিকার হই এজন্য এরকম কথাবার্তা ধর্মব্যবসায়ীরা অপপ্রচার চালিয়েছে। তাঁর ‘এ ইসলাম ইসলামই নয় বই’-তে তিনি হাজার হাজার বার শেষ নবী, আখেরি নবী রসুল (দ.) বলেছেন। আমাদের সব লেখায় আমরা মোহাম্মদ (দ.) কে আখেরি নবী, শেষ নবী বলেছি সুতরাং এমামুয্যামানের নবী দাবি করার অভিযোগ অবান্তর। আমরা বিশ্বাস করি তিনি ইসলাম সম্পর্কে যে বক্তব্য উপস্থাপন করেছেন সেগুলো শতভাগ সত্য। তাঁর একটি বক্তব্যকেও আজ পর্যন্ত কেউ মিথ্যা প্রমাণ করতে পারে নি। তাই তাঁকে আমরা এই যুগের নেতা বলে বিশ্বাস করি।