প্রশ্ন-উত্তর

জনতার প্রশ্ন- আমাদের উত্তর
হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম, এমাম, হেযবুত তওহীদ

প্রশ্ন: হেযবুত তওহীদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য কী?
উত্তর: যদি আক্ষরিক অর্থে ‘হেযবুত তওহীদ’ নামটিকে বিশ্লেষণ করি তবে, ‘হেযব’ শব্দটির অর্থ হলো দল, ইংরেজিতে পার্টি (Party), আর তওহীদ শব্দটি আরবি ওয়াহ্দানিয়াত থেকে এসেছে যার অর্থ আল্লাহর একত্ববাদ। ‘হেযবুত তওহীদ’ এর আক্ষরিক অর্থ দাঁড়ায় আল্লাহর একত্ববাদের দল অর্থাৎ যারা ‘এক আল্লাহ ছাড়া আর কারো হুকুম মানি না’ এ বিশ্বাসে বিশ্বাসী তাদের দল। প্রকৃতপক্ষে এই নামের মধ্যেই হেযবুত তওহীদের উদ্দেশ্য পরিষ্কার বোঝা যায়, আর তা হচ্ছে মানুষের মধ্যে বিরাজিত যাবতীয় বিভেদ, বৈষম্য ইত্যাদি নির্মূল করে দিয়ে আল্লাহর হুকুমের ভিত্তিতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করা।
মানুষ সামাজিক জীব, তাকে সমাজবদ্ধ হয়ে বসবাস করতে হয়। আর সমাজবদ্ধভাবে বসবাস করতে গেলেই ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র অর্থাৎ জীবনের সর্বাঙ্গনে একটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্তদাতা কর্তৃপক্ষের দরকার পড়ে, কাউকে না কাউকে হুকুমদাতা (ইলাহ) হিসেবে মেনে নিতে হয়। এই সিদ্ধান্তদাতা কর্তৃপক্ষ হতে পারে মূলত দুইটি- স্রষ্টা ও সৃষ্টি। মানুষ তাদের সর্বময় জীবনের একমাত্র হুকুমদাতা হিসেবে স্রষ্টা আল্লাহকে গ্রহণ করে নিতে পারে, অথবা অহংকারবশত: আল্লাহকে অস্বীকার করে নিজেরাই হুকুমদাতার আসনে বসতে পারে। এক্ষেত্রে মানুষের পূর্ণ স্বাধীনতা আল্লাহ দিয়েছেন এবং এই স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি পেয়ে মানুষ কী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল তার উপরেই নির্ভর করছে মানুষের আখেরাত। এদিকে ইবলিস আল্লাহকে চ্যালেঞ্জ দিয়ে রেখেছে সে মানুষকে দিয়ে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব অস্বীকার করিয়ে মানুষকেই মানুষের ইলাহ বা হুকুমদাতার আসনে বসাবে এবং যুগে যুগে যখনই সুযোগ পেয়েছে মানুষকে দিয়ে তা-ই করিয়ে নিয়েছে। পক্ষান্তরে নবী-রসুলরা এসে মানুষকে তওহীদের দিকে আহ্বান করেছেন, ইবলিসের ষড়যন্ত্রকে নস্যাত করে দিয়েছেন।
আল্লাহর শেষ রসুল মোহাম্মদ (সা.) ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। চল্লিশ বছর বয়সে অর্থাৎ ৬১০ খ্রিষ্টাব্দে তিনি নবুয়তপ্রাপ্ত হন। নবুয়তপ্রাপ্ত হওয়ার পর তিনি সাফা পাহাড়ের পাদদেশে দাঁড়িয়ে সকলকে একটি কথার দিকেই আহ্বান করলেন, “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” আল্লাহ ছাড়া কারো হুকুম মানাবো না। তিনি দেখলেন তৎকালীন আরব সমাজে অন্যায়, অবিচার, অশান্তি, জুলুম, রক্তপাত ইত্যাদি প্রতিদিনকার ব্যাপার। সমাজে মানুষের কোনো অধিকার নেই, নারীদের কোনো সম্মান নেই, লোকজন মদ খেয়ে বুঁদ হয়ে পড়ে থাকছে, যুদ্ধ বিগ্রহ লেগেই রয়েছে, সাথে ডাকাতি, মূর্তিপূজা ইত্যাদি যেন স্বাভাবিক ব্যাপার। বলতে গেলে সকল দিক দিয়ে সমাজের অবস্থা ছিল দুর্বিসহ, যার কারণে তৎকালীন আরব সমাজকে বলা হয় আইয়্যামে জাহেলিয়াত বা জাহেলিয়াতের যুগ। রসুল (সা.) এই জাহেলিয়াতের অন্ধকার থেকে সমাজকে মুক্ত করার জন্য, সমাজে শান্তি, ভ্রাতৃত্ব আনার জন্য উপায় খুঁজতে লাগলেন। তিনি হেরা গুহায় মানবজাতির মুক্তির উপায় নিয়ে চিন্তায় মগ্ন হলেন। আল্লাহ তাঁর হৃদয়ের আকুলতা শুনলেন এবং সারা মানবজাতির ‘রহমতস্বরূপ’ প্রেরণ করলেন। তাঁর মাধ্যমে মানুষকে যাবতীয় অন্যায়, অবিচার, যুদ্ধ, রক্তপাত থেকে রক্ষা পাওয়ার এবং আখেরাতে জান্নাত লাভের সঠিক পথ (হেদায়াহ) দান করলেন।
আল্লাহ আমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন, কাজেই আমরা কিভাবে জীবনযাপন করলে আমাদের সামগ্রিক জীবনে শান্তি আসবে তা মহান আল্লাহর চাইতে আর কে ভালো জানে? আল্লাহ যেমন নিখুঁত, ত্রুটিহীন, তাঁর প্রদত্ত জীবনব্যবস্থাও হচ্ছে ত্রুটিহীন। মানুষ যখন তওহীদের স্বীকৃতি প্রদান করে অর্থাৎ “এক আল্লাহ ছাড়া আর কারো হুকুম মানব না” এই কথার উপর ঐক্যবদ্ধ হয়, কার্যত এর দ্বারা নিজেদের সমষ্টিগত জীবন পরিচালনার জন্য তারা একটি ত্রুটিহীন জীবনব্যবস্থা নির্বাচন করে। পক্ষান্তরে যেহেতু মানুষকে আল্লাহ এতখানি জ্ঞান-বুদ্ধি ও সামর্থ্য দান করেন নি যেটা খাটিয়ে তারা নিজেদের জন্য একটি নিখুঁত জীবনব্যবস্থা নিজেরাই তৈরি করে নিতে পারে, সেহেতু আল্লাহকে একমাত্র হুকুমদাতা হিসেবে স্বীকার না করে মানুষ যখন নিজেই জীবনবিধান তৈরি করে নিতে গেছে, অনিবার্যভাবে তারা অন্যায়, অবিচার, যুদ্ধ, রক্তপাতে জর্জরিত হয়ে পড়েছে। উদাহরণ- বর্তমান সময়।
আল্লাহর হুকুম কী? আল্লাহর হুকুম হচ্ছে ন্যায় ও সুবিচার। যেটা ন্যায়, যেটা সত্য, সেটাই আল্লাহর হুকুম। আর এর বিপরীতে যেটা অন্যায়, অবিচার সেটাই ইবলিসের হুকুম। আল্লাহর এই হুকুমসমূহ আল্লাহ ধীরে ধীরে নবুয়্যতের তেইশ বছর ধরে রসুল (স.) এর কাছে প্রেরণ করেছেন যার সংকলিত রূপই হচ্ছে আল কোর’আন। কোর’আনে একশ’ ১৪টি সুরা রয়েছে কিন্তু মনে রাখতে হবে এ সম্পূর্ণ কোর’আন একদিনে নাযিল হয়নি। প্রথম থেকেই আল্লাহর রসুল সবাইকে কালেমার উপর, তওহীদের উপর ঐক্যবদ্ধ করার আহ্বান করেছেন। অর্থাৎ মানুষকে সেই গোড়ার সিদ্ধান্তের দিকে ডেকেছেন যে, তারা কাকে হুকুমদাতা হিসেবে মানবে। যারা আল্লাহকে মানতে অঙ্গীকারাবদ্ধ হলেন তাঁরা হলেন মো’মেন। তাদের নিয়ে যে জাতি গঠিত হলো সেই জাতি হলো মো’মেন জাতি, আর তার নেতা হলেন রসুলে পাক (সা.)। জাতি পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় প্রতিটি বিষয় সেভাবেই পরিচালনা করল যেভাবে আল্লাহ হুকুম করলেন। একজন ব্যক্তি শুকরের গোশত খাবে নাকি গরুর গোশত খাবে, বিয়েতে যৌতুকের প্রচলন চলবে নাকি মোহরানার প্রচলন চলবে, ব্যবসাকার্যে সুদের কারবার চলবে নাকি মুনাফার ভিত্তিতে চলবে, দাসব্যবস্থা চলবে নাকি সেবাব্যবস্থা চলবে ইত্যাদি সমস্তক্ষেত্রে জাতি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল আল্লাহর হুকুম মোতাবেক এবং এই সিদ্ধান্তসূত্রটিই হলো তওহীদ, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ। আল্লাহর রসুল বলেছেন যারা তওহীদে অঙ্গীকারাবদ্ধ হবে আল্লাহ তাদের সকল গুনাহ মাফ করে দিবেন। আর এই তওহীদের বিপরীতেই রয়েছে শিরক, যার কোনো ক্ষমা নেই, ছাড় নেই (সুরা নিসা ৪৮)। ওই তওহীদের দিকে মানবজাতিকে আহ্বান করার আন্দোলনই হচ্ছে হেযবুত তওহীদ।
প্রশ্ন আসতে পারে- হেযবুত তওহীদ কেন তওহীদের দিকে ডাকছে? মানুষ তো কলেমা পড়ছেই, আমল করছেই, মসজিদ-মাদ্রাসায় আল্লাহর মহীমা কীর্তন করছেই। হ্যাঁ, এটা সত্য যে, কোটি কোটি মানুষ প্রতিনিয়ত আল্লাহর উপাসনা আরাধনায় নিমগ্ন রয়েছে, খুব আন্তরিকতার সাথেই রয়েছে, কিন্তু আল্লাহর হুকুম মানছে না! পৃথিবীর এক ইঞ্চি জমিনেও আল্লাহকে একমাত্র হুকুমদাতা (ইলাহ) হিসেবে মানা হচ্ছে না এবং তার প্রাকৃতিক পরিণতি হয়েছে এই যে, সমস্ত অন্যায়, অবিচার, যুদ্ধ, রক্তপাত মাত্রা ছাড়িয়েছে। পৃথিবী নামক এই গ্রহটিই এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে। এমনকি মুসলিম নামক জাতিটিও গত কয়েক শতাব্দী ধরে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীদের চাপিয়ে দেওয়া বিভিন্ন তন্ত্র, মন্ত্র, মতাদর্শ দিয়ে নিজেদের সমষ্টিগত জীবন পরিচালনা করে চলেছে।
এক জাতির দুই ইলাহ হতে পারে না। ব্যক্তিগত জীবনের নামাজ, রোজা ইত্যাদিতে আল্লাহকে ইলাহ মানলাম, পক্ষান্তরে জাতীয় জীবনে অন্য কাউকে ইলাহ মানলাম- এটা স্পষ্টত শিরক, যার ব্যাপারে আল্লাহ কোর’আনে বলেন, তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশ বিশ্বাস কর আর কিছু অংশ অবিশ্বাস কর? যারা এরূপ করে পার্থিব জীবনে দুর্গতি ছাড়া তাদের আর কোনো পথ নেই। কিয়ামতের দিন তাদেরকে কঠোরতম শাস্তির দিকে পৌঁছে দেয়া হবে। (বাকারা: ৮৫)
চৌদ্দশ’ বছরের কালপরিক্রমায় বর্তমানে এসে আমরা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি যে তওহীদ ত্যাগ করার ফলে রসুলের সেই জাতি আজ আর নেই। সেই এক জাতি আজ হাজারো ফেরকা, মাজহাব, দল, উপদল, তরিকাতে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। অন্যান্য জাতির গোলামে পরিণত হয়েছে। অন্যান্য জাতিরা আজ তাদের প্রতিটি ভূখণ্ডকে একটি একটি করে ধ্বংস করে দিচ্ছে, তারা হচ্ছে উদ্বাস্তু। পরিণত হয়েছে পৃথিবীর সবচেয়ে নিকৃষ্ট জাতিতে। তারা আজ অন্যান্য সকল জাতির ঘৃণার পাত্র। ব্যক্তিগত জীবনে আল্লাহকে বিশ্বাস করে, সালাহ করে, সওম পালন করে, হজ করে, যাকাত দিয়ে তারা নিজেদের পরিচয় দিচ্ছে মুসলিম, আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণকারী, কিন্তু বাস্তবে তারা আত্মসমর্পণ করে আছে পশ্চিমা বস্তুবাদী দাজ্জালীয় সভ্যতার কাছে, যাবতীয় অন্যায়-অবিচারের কাছে। এখন জাতিকে সর্বপ্রথম এই সূত্রে অঙ্গিকারবদ্ধ হতে হবে যে আল্লাহর হুকুম ছাড়া কারো হুকুম মানবো না। তাহলে এ জাতি পুনরায় শ্রেষ্ঠ জাতিতে পরিণত হবে, সমৃদ্ধ হবে। শিক্ষাতে, প্রযুক্তিতে সর্বদিক দিয়ে এগিয়ে থাকবে এবং পরিণত হবে একটি শিক্ষকের জাতিতে যেমন রসুল গঠন করে গিয়েছিলেন তওহীদের ভিত্তির উপরে। আমরা হেযবুত তওহীদ এই লক্ষ্যেই সংগ্রাম করে চলেছি।
আজ পুরো মানবজাতি সামগ্রিক অন্যায়ের মধ্যে ডুবে রয়েছে, তারা অ্যাটম বোমার তাণ্ডবের ভয়ে আতঙ্কিত, সভ্যতা এসে উপনীত মহাযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে। প্রযুক্তিগত একটি ছোট্ট ভুলের কারণেও যে কোনো সময় লণ্ডভণ্ড হয়ে যেতে পারে এই সুন্দর পৃথিবী। জাতিসংঘ রক্ষা করতে পারে নি, প্রতিটি দেশের নিজস্ব আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকে আরো অধিক সমৃদ্ধ করা হচ্ছে কিন্তু এর থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যাচ্ছে না। নতুন নতুন আইন প্রণিত হচ্ছে, সাজার কঠোরতা বাড়ানো হচ্ছে, কিন্তু অন্যায়-অপরাধও তার সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। সকল তন্ত্রমন্ত্রই আজ ব্যর্থ। এই অবস্থায় হেযবুত তওহীদের প্রতিষ্ঠাতা এমামুয্যামান জনাব মোহাম্মদ বায়াজীদ খান পন্নী মানবজাতির মুক্তির একমাত্র উপায় তওহীদের ঝাণ্ডা তুলে ধরলেন।
আমরা হেযবুত তওহীদ এই একটি লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্যই দিন-রাত কাজ করে যাচ্ছি। আমরা এক আদম হাওয়ার সন্তান। আমাদের প্রভু একজন, আমাদের জাতি হবে একটি, আমাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হবে মানুষকে তওহীদের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ করে ন্যায়, সাম্য ও শান্তি প্রতিষ্ঠা। মানবজাতি আমাদের এই ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান গ্রহণও করতে পারে আবার বর্জনও করতে পারে। উভয় স্বাধীনতাই রয়েছে। কিন্তু অবশ্যই আমরা আমাদের এই সংগ্রাম চালিয়ে যাব এবং মানবজাতি যদি একে গ্রহণ করে তবে অবশ্যই একটি সুন্দর শান্তিময় সমাজ প্রতিষ্ঠা হবে, নয়তো জাতি এ ক্রান্তিকাল থেকে অন্য কোনো উপায়েই মুক্ত হতে পারবে না।

মানবতার কল্যাণে নিবেদিত হেযবুত তওহীদের সদস্যরা যখন আল্লাহর তাওহীদের প্রচারে থাকেন তখন এ প্রশ্নটি প্রায়শই করা হয়ে থাকে। আমরা অনেককে জিজ্ঞাসা করেছি যে “শরীরে ইসলাম নাই” বলতে আপনি কি বুঝাতে চেয়েছেন? তারা বলেছেন, ‘আপনাদের দাড়ি নাই, টুপি নাই, পাগড়ি নাই, গায়ে জোব্বা নাই। আগে তো নিজেদের শরীরে ইসলাম কায়েম করতে হবে’? তাদের এ প্রশ্নের প্রেক্ষিতে যদি পাল্টা প্রশ্ন করা হয়- দাড়ি, টুপি, পাগড়ি ধারণ না করলে ইসলামের কথা বলা যাবে না এমন কোনো কথা পবিত্র কোরআন-বা হাদিসে উল্লেখ আছে কি? স্বাভাবিকভাবেই এমন কোনো শর্ত আল্লাহ বা রসুল (স.) দেননি। তাহলে এমন প্রশ্ন কেন উঠল?
কারণ গুরুত্বের উলট-পালট। ইসলামের মূল বিষয়বস্তুকে বাদ দিয়ে সুক্ষèাতি-সুক্ষè বিশ্লেষণের ফলে এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এখন যদি জিজ্ঞেস করা হয় ইসলামের উদ্দেশ্য কি? তাহলে ১৫০ কোটি মুসলিমের কাছে অন্ততঃ ভিন্ন ধরনের কয়েক কোটি উত্তর পাওয়া যাবে। তাই আগে আমাদেরকে ইসলামের উদ্দেশ্য কী সেটা উপলব্ধি করতে হবে।
মানবসৃষ্টির সূচনালগ্নে মহান আল্লাহর সঙ্গে ইবলিসের একটি চ্যালেঞ্জ হয়। সেই চ্যালেঞ্জটি বিষয়বস্তু ছিল মানবজাতি পৃথিবীতে শান্তিতে বসবাস করবে, নাকি মারামারি কাটাকাটি হানাহানি, যুদ্ধ, রক্তপাতে লিপ্ত থাকবে? মানুষ যদি শান্তিতে থাকে তাহলে চ্যালেঞ্জে আল্লাহ বিজয়ী হবেন, আর যদি অশান্তি অরাজকতার মধ্যে বাস করে তাহলে ইবলিস বিজয়ী হবে। শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য আল্লাহ নবী রসুলদের মাধ্যমে জীবনবিধান পাঠালেন। সেটা মানুষের সামগ্রিক জীবনে প্রতিষ্ঠা করলে সমাজে শান্তি আসবে। আর অন্য জীবনব্যবস্থা দিয়ে জীবন চালালে অশান্তি বিরাজ করবে। নবী-রসুলগণ এভাবে আল্লাহকে বিজয়ী করার লক্ষ্যে দীন প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম করে গেছেন।
সত্য দীনের ফল হচ্ছে শান্তি, এ কারণে ইসলামের শাব্দিক অর্থই হচ্ছে শান্তি। আজ ধর্মের নামে বহু বাহ্যিক আড়ম্বর করা হয়, উপাসনা, আনুষ্ঠানিকতার কোনো শেষ নেই, অথচ আমরা আমাদের সামগ্রিক জীবন পরিচালনা করছি আল্লাহর হুকুম বাদ দিয়ে। আজ সর্বত্র ঘোর অশান্তি, যার অর্থ আজ ইবলিস বিজয়ী হয়ে আছে। আর আল্লাহর দীন, জীবনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা ব্যতিরেকে আর কোনো কিছু দিয়েই আল্লাহকে বিজয়ী করা সম্ভব না। ফলে যে কাজের দ্বারা আল্লাহ বিজয়ী হন না, সমাজে ন্যায়, শান্তি, সুবিচার প্রতিষ্ঠা হয় না, সে কাজের সাথে ইসলামের কোনো সম্পর্ক নেই।
এখন চিন্তা করুন, ইসলামের সাথে দাড়ি, টুপি, পাগড়ি, জুব্বার সম্পর্ক কোথায়? ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন-ব্যবস্থা অর্থাৎ ব্যক্তি, পরিবার, যুদ্ধনীতি, বাণিজ্যনীতি, রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি, বিচারব্যবস্থা ইত্যাদি সব কিছুই ইসলাম নামক জীবন-ব্যবস্থার এক একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সুতরাং যারা আমাদের শরীরে ইসলাম নাই এই প্রশ্ন করেন তাদের কাছে আমার প্রশ্ন একটি দেশের সব মানুষ যদি দাড়ি রাখে, টুপি পরে, জোব্বা গায়ে দেয় কিন্তু তাদের সামষ্টিক জীবনের ঐ বিষয়গুলো যদি ইসলামের না হয় তাহলে কি সেই দেশে শান্তি এসে যাবে? আসবে না। কারণ রসুলের (স.) আগমণের পূর্বেও আরবের মানুষগুলো দাড়ি রাখত, টুপি, পাগড়ি, জোব্বা পরত।
প্রকৃতপক্ষে এই শেষ দীনে কোন নির্দিষ্ট পোষাক হতে পারে না, কারণ এটা এসেছে সমস্ত পৃথিবীর মানুষের জন্য। পৃথিবীর মানুষ প্রচ- গরমের দেশে, প্রচ- শীতের দেশে, নাতিশীতোষ্ণ দেশে, অর্থাৎ সর্বরকম আবহাওয়ায় বাস করে, এদের সবার জন্য এক রকম পোষাক নির্দেশ করা অসম্ভব। তা করলে এ দীন সমস্ত মানব জাতির জন্য প্রযোজ্য হতে পারত না, সীমিত হয়ে যেত। তাই আল্লাহ ও তাঁর রসুল (দ.) তা করেনও নি। বিশ্বনবীর (দ.) সময়ে তাঁর নিজের এবং সাহাবাদের পোষাক-পরিচ্ছদ ও তখনকার আরবের মোশরেক ও কাফেরদের পরিচ্ছদ যেমন একই ধরনের ছিল, বর্তমানেও মুসলিম আরব, খ্রিষ্টান আরব ও ইহুদি আরবরও একই ধরনের পোষাক-পরিচ্ছদ পড়ে। দেখলে বলা যাবে না কে মুসলিম, কে খ্রিষ্টান আর কে ইহুদি। ইসলামে পোশাকের ব্যাপারে আল্লাহ এমন বিশ্বজনীন একটি নীতি দিয়েছেন যা পৃথিবীর যে কোন প্রান্তের মানুষের জন্যই অনুসরণযোগ্য, সেটা হচ্ছে তিনি পুরুষদের জন্য সতর নির্দ্ধারণ করেছেন নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত (এ নিয়েও মতভেদ আছে)। তবে আল্লাহ বা রসুল কেউই বলে দেন নি যে দেহের এই স্থান কী পোশাক দিয়ে আবৃত করতে হবে।
টুপি ইহুদী, শিখ বা অন্যান্য ধর্মের ধর্মগুরুরাও পরেন, তাদেরও দাড়ি আছে, তারাও জুব্বা পরেন, তাদের অনেকেই পাগড়ি পরেন। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দাড়ি, টুপি, জোব্বা সবই ছিল। আল্লাহর অস্তিত্বে সম্পূর্ণ অবিশ্বাসী হিসাবে পরিচিত অনেকেরই দাড়ি ছিল যেমন কার্ল মার্কস, চার্লস ডারউইন, আব্রাহাম লিঙ্কন প্রমুখ। হয়ত বলতে পারেন তাদের টুপি, জুব্বা, পাগড়ি, দাড়ি মুসলিমদের মত না। হ্যাঁ, তা হয়ত ঠিক, কিন্তু টুপির আকার-আকৃতি ও রং নিয়ে, জুব্বার আকার-আকৃতি নিয়ে, পাগড়ির রং, দাড়ির পরিমাণ ইত্যাদি নিয়ে আলেম ওলামাদের মধ্যেও মতভেদ কম নেই। ছোটখাটো বিষয় নিয়ে মতবিরোধে গিয়ে মূল উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত হয়ে যাওয়া একপ্রকার মুর্খতা বলেই আমরা মনে করি। গত কয়েক শতাব্দী ধরে এ জাতির দুর্ভাগ্যজনক পরাজয়ের কারণ এগুলিই। অথচ এটা ইতিহাস যে রসুলের সাহাবিদের অনেকেরই গায়ে জোব্বা তো দূরের কথা ঠিকমত লজ্জাস্থান ঢাকার মত কাপড় সংস্থান করতেও কষ্ট হতো।
তবে এতে কোন সন্দেহ নেই, বিশ্বনবী (দ.) তার অনুসারীদের একটা নির্দিষ্ট দৈর্ঘ্যরে দাড়ি রাখতে বলেছেন। কেন বলেছেন? এই জন্য বলেছেন যে, তিনি যে জাতিটি, উম্মাহ সৃষ্টি করলেন তা যেমন পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ জাতি তেমনি বাইরে থেকে দেখতেও যেন এই উম্মাহর মানুষগুলি সুন্দর হয়। আদিকাল থেকে দাড়ি মানুষের পৌরুষ ও সৌন্দর্যের প্রতীক হয়ে আছে। সিংহের যেমন কেশর, ময়ূরের যেমন লেজ, হাতির যেমন দাঁত, হরিণের যেমন শিং, তেমনি দাড়ি মানুষের প্রাকৃতিক পৌরুষ সৌন্দর্য। এই সৌন্দর্য নষ্ট না করার উদ্দেশ্যেই দাড়ি রাখার নির্দেশ। দীন প্রতিষ্ঠা করে ইবলিশের চ্যালেঞ্জে আল্লাহ জয়ী করার উদ্দেশ্যে নয়।
তবে দাড়ি, টুপি, পাগড়ি, জোব্বা ইত্যাদিকে আমরা অপ্রয়োজনীয় বিষয় বলছি না বা কোন রকম অসম্মানও করছি না। আমরা শুধু বলছি এই দীনের প্রকৃত উদ্দেশ্য আজ যেমন উল্টো হয়ে গিয়েছে তেমনি এর বাহ্যিক দিকটিও বিকৃত দীনের আলেমরা অপরিসীম অজ্ঞতায় উল্টে ফেলেছেন। দাড়ি রাখা, বাহ্যিক পোষাক-পরিচ্ছদ ইত্যাদি এই দীনের বুনিয়াদী কোন ব্যাপার নয় অর্থাৎ ফরদ নয়, সুন্নত। তাও রসুলের একেবারে ব্যক্তিগত সুন্নত যে ব্যাপারে রসুলাল্লাহ তাঁর একটি অন্তীম অসিয়তে বলেছেন, হে মানবজাতি! আগুনকে প্রজ্জলিত করা হয়েছে এবং অশান্তি অন্ধকার রাত্রির মতো ধেয়ে আসছে। আল্লাহর শপথ, আমি আমার থেকে কোনো কাজ তোমাদের উপর অর্পণ করি নি, আমি শুধু সেটাই বৈধ করেছি যেটা কোরা’আন বৈধ করেছেন, আর শুধু সেটাই নিষেধ করেছি যেটা কোর’আন নিষেধ করেছে। রসুলাল্লাহর প্রথম জীবনীগ্রন্থ সেরাত ইবনে ইসহাকে এ কথাটি আছে। সুতরাং দাড়ি-টুপি (লেবাস) যদি এই দীনের কোন ফরদ বা বুনিয়াদী বিষয় হতো, তবে কোর’আনে একবার হলেও এ বিষয়ে নির্দেশ দেওয়া হতো। আল্লাহর রসুল এটা সুস্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছেন যে- আল্লাহ তোমাদের বাহ্যিক অবস্থা, পোশাক, চেহারা বা সম্পদ কোন কিছুর দিকেই দৃষ্টিপাত করেন না, তিনি দেখেন তোমাদের হৃদয় এবং তোমাদের কাজ [আবু হুরায়রা (রা.) থেকে মুসলিম]।
তাই ‘দাড়ি ইসলামের চিহ্ন’, ‘দাড়ি না রাখলে ইসলামের কথা বলা যাবে না’ এ ধারণা সঠিক নয়। সেজন্য হেযবুত তওহীদে কেউ যদি দাড়ি রাখতে চায় আমরা এটুকুই বলি, যদি দাড়ি রাখেন তবে, রসুল যেভাবে দাড়ি রাখতে বলেছেন সেভাবে রাখুন যেন সুন্দর, পরিপাটি (Smart) দেখায়। রসুলাল্লাহর যে কোনো সুন্নাহই কল্যাণকর, তাই ব্যক্তিগত জীবনেও রসুলাল্লাহর যা কিছু অনুসরণ করা হবে তাতে মানুষ কল্যাণ পাবে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে আগে কোনটা? আজ সারা পৃথিবীতে কোথাও আল্লাহকে বিধানদাতা হিসাবে মানা হচ্ছে না। মুসলিম নামের এই জনসংখ্যাও পাশ্চাত্যের বস্তুবাদী সভ্যতাকে বিধাতার আসনে বসিয়ে রেখেছে। এ কারণে আল্লাহর দৃষ্টিতে তারা মোমেন নেই, রসুলে কথা মতে উম্মতে মোহাম্মদীও নেই। কাজেই তারা আগে ফরজ- যা সরাসরি আল্লাহর হুকুম তা পালন করুক। পরে সামর্থ্য মোতাবেক সুন্নত, নফল, মুস্তাহাব পালন করুক কোনো আপত্তি নেই। আল্লাহর রসুল বলেছেন, এমন সময় আসবে যখন মানুষ তাহাজ্জুদ পড়বে কিন্তু ঘুম কামাই করা হবে, সওম রাখবে কিন্তু না খেয়ে থাকা হবে (হাদিস)। রসুলাল্লাহ বর্ণিত সেই সময়টি এখন। যেখানে তাহাজ্জুদ, সওমের মত একনিষ্ঠ আমলও বৃথা যাবে, সেখানে দাড়ি, টুপি, পাগড়ি, জোব্বার মত আমল গৃহীত হওয়ার তো প্রশ্নই আসে না।

উত্তরে: মো. মশিউর রহমান, সাধারণ সম্পাদক, হেযবুত তওহীদ

হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম:
হেযবুত তওহীদ সমাজ পরিবর্তনের জন্য যে আদর্শটি প্রস্তাব করছে তা হচ্ছে প্রকৃত ধর্ম। সুতরাং প্রতিষ্ঠিত বিকৃত ধর্মের ধ্যান ধারণায় বিশ্বাসীরা আমাদের সম্পর্কে জানার আগ্রহ থেকে অনেক প্রশ্ন করে থাকেন। আমি আমার সাধ্যমত চেষ্টা করি তাদের সবার উত্তর দিতে। এই প্রশ্নকারীদের মধ্যে হেযবুত তওহীদের অনেক সদস্যও যেমন রয়েছেন, তেমনি রয়েছেন হেযবুত তওহীদের বাইরের অনেক মানুষ। আমি এই লেখার মধ্যে কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর দেব যেগুলো অনেকের মনেই রয়েছে। হেযবুত তওহীদের একজন সমর্থক আমাকে বলেছিলেন যে-

প্রশ্ন: আপনারা মানবতার কথা বলেন তাহলে আপনারা শীতার্তদের, উদ্বাস্তুদের ত্রাণ বিতরণে অংশগ্রহণ করেন না কেন?

উত্তর: অনেকই হেযবুত তওহীদকে এই প্রশ্নটি করে থাকেন। তাদের অবগতির জন্য প্রথমেই জানাচ্ছি যে আমরা হেযবুত তওহীদ সাধ্যমত ত্রাণ সামগ্রী প্রেরণ করি কিন্তু সেগুলো আমরা প্রচার করি না কারণ দানের বিষয়টি প্রচার করার বিষয় না। আল্লাহর রসুল বলেছেন এমন ভাবে দান করা উচিত যেন ডান হাত দান করলে বাম হাত টের না পায়।
আমরা যদি কোন দুর্যোগে আক্রান্ত হই তবে তার থেকে পরিত্রাণের জন্য সরকারকে সর্বপ্রথম ব্যবস্থা নেয়া উচিত। কারণ একটি দেশ সরকার সে দেশের যে কোন সমস্যা মোকাবেলার জন্য দায়বদ্ধ। আমরা প্রতিবছর সরকারকে নানা রকম কর প্রদান করি যার মূল উদ্দেশ্যই হলো সরকার যাতে আমাদের দেশের উন্নয়ন করতে পারে ও সংকটকালীন সময়ে সেই অর্থ দ্বারা সংকট নিরসন করতে পারে। তাই মূলত শীতার্ত, উদ্বাস্তু, এতিমদের সাহায্য করার কাজ সরকারের। তারাই মূলত দায়বদ্ধ।
কিন্তু এই ত্রাণ প্রেরণের ব্যাপারে আমাদের মতামত ভিন্ন। ধরুন, আমরা কয়েকশো বন্যার্ত, উদ্বাস্তু মানুষকে ত্রাণ দিয়ে আসলাম, রেল স্টেশনে বাসকারী বস্ত্রহীন মানুষটিকে কম্বল দিয়ে আসলাম, গণমাধ্যমে সেটা আবার ফলাও করে প্রচারও করলাম কিন্তু এরপর সারা বছর তার আর কোন খোঁজ নিলাম না, এই নীতিতে আমরা বিশ্বাসী নাই। আমাদের কর্মকাণ্ড আপনাদের বুঝতে হবে। আমরা এমন একটি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করার জন্য নেমেছি যা প্রতিষ্ঠিত হলে কোন মানুষকে রাস্তায় ঘুমাতে হবে না, কোন মানুষকে বাস্তুহারা হতে হবে না, কোন মানুষকে ঠাণ্ডায় কষ্ট করতে হবে না।
আমাদের দেশে যে রোহিঙ্গা শরণার্থীরা প্রবেশ করেছে পরিসংখ্যান মতে তাদের সংখ্যা প্রায় ৮ লক্ষ। এই ৮ লক্ষ মানুষকে একক কোন মানুষ বা একক কোন দল কিভাবে খাওয়াবে? কতদিন খাওয়াতে পারবে? তাদের শিক্ষা নিয়ে ভাবতে হবে, তাদের চিকিৎসার ব্যাপারে আমাদের খেয়াল রাখতে হবে। বর্তমানে যখন একটি পরিবারের খেয়াল রাখতেই অনেকে হিমশিম খায় সেখানে ৮ লক্ষ মানুষের খেয়াল রাখা কোন দল বা ব্যক্তির পক্ষে অসম্ভব। এ দায়িত্ব রাষ্ট্রের। কিন্তু এই অপ্রাকৃতিক সমস্যাকে সামাল দেয়ার ক্ষমতা রাষ্ট্রেরও নেই। তাদের যদি কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে না দেয়া হয়, তাদের নিজের ভূমিতে যতদিন না তারা চাষাবাদ করছে, ব্যবসা বাণিজ্য করছে ততদিন তাদের বসে বসে খাওয়ানো কোন রাষ্ট্রের পক্ষেই সম্ভব নয়।
এমন পরিস্থিতি যাতে তৈরি না হয় সে জন্যই আমরা চেষ্টা করছি। আমরা আমাদের সবকিছু দিয়ে সংগ্রাম করে চলছি। আমাদের ভাই ও বোনেরা তাদের সমস্ত কিছু কোরবানী করে দিচ্ছেন। অনেকই ভাল চাকরি করতেন কিন্তু তারা সেই চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন, মেয়েরা তাদের স্বর্ণালঙ্কার বিক্রি করেছেন শুধু মাত্র মানবতার কল্যাণের জন্য। এই কাজ আমরা ছাড়া আর কেউ করে নি। আপনারা যারা লাখ লাখ টাকা চাঁদা তুলে কয়েকজন মিলে ত্রাণ দিয়ে, ছবি তুলে গণমাধ্যমে দিচ্ছেন আর পরের দিন সব ভুলে নিজের ঘরে বসে আছেন। কিন্তু আমরা আমাদের প্রতিটি সকাল শুরু করি জাতির কল্যাণের কথা চিন্তা করে। সারাদিন কাটে জাতিকে রক্ষার জন্য সর্বাত্মক সংগ্রামের মাধ্যমে, কারণ আমরা দাঁড়িয়েছি এজন্যই যেন আজ বাদে কাল আমাদের অবস্থাও অন্যান্য যুদ্ধবিধ্বস্ত মুসলিম দেশগুলোর নাগরিকদের মতো না হয়, রোহিঙ্গাদের মতো না হয়।
আল্লাহর রসুল যখন এসেছেন তখন তিনি সমাজের দুরাবস্থা রোধের জন্য কী পদক্ষেপ নিয়েছিলেন? তিনি কী এতিমখানা বসিয়েছিলেন? তিনি কী ত্রাণ প্রকল্প চালু করেছিলেন? না। তিনি জানতেন যদি শিকড় থেকে অন্যায়-অত্যাচার-অবিচারের উৎস সমাজব্যবস্থাকে পরিবর্তন করে ন্যায় ও সুবিচারের সিস্টেম প্রতিষ্ঠা করা যায় তবেই সমাজের সকল সমস্যা দূর হবে। তাই রসুল অমানবিক বৃদ্ধাশ্রম বা এতিমখানা বানান নি। তিনি এমন সমাজ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠা করেন যেখানে মানুষ অসহায়দের পরিবারভুক্ত করে নিয়েছিল। আপনার ক্যান্সার হয়েছে, তার কারণে আপনার চুল পড়ে যাচ্ছে এটা আপনাকে বুঝতে হবে। যদি আপনি এখন চুল পড়ে যাওয়ার ঔষধ খান তবে কোন লাভ হবে না। আসল কাজ হবে এই শোষণের সিস্টেমকে ছুড়ে ফেলে দিয়ে একটি সঠিক সিস্টেম প্রতিষ্ঠা করা। এমন সমাজ আনা যেখানে ত্রাণ দেয়ার পরিস্থিতিই সৃষ্টি হবে না। আমরা সেই সমাজকেই প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম করছি। আপনাদেরকে ও আমরা আহ্বান করবো আসুন আমাদের সাথে প্রকৃত সংগ্রামে নামুন। সেই সিস্টেম প্রতিষ্ঠায় নিজেদের আত্মত্যাগ করুন যেই সিস্টেমে কেউ উদ্বাস্তু হবে না, কোন এতিমখানা লাগবে না, বৃদ্ধাশ্রম লাগবে না, কেউ শীতে কষ্ট পাবে না।

 

আরও প্রশ্নের উত্তর পড়ুন:

প্রশ্ন: আপনারা পশ্চিমাদের পক্ষ হয়ে মুসলমানদের ক্ষতি করছেন না তো?
প্রশ্ন: এত ধর্ম-কর্ম! তবু কেন অশান্তিতে সমাজ?
প্রশ্ন: আপনারা অপশক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর কথা বলেন। আসলে অপশক্তি বলতে কোন দল বা গোষ্ঠীকে বোঝাচ্ছেন?
প্রশ্ন: হেযবুত তওহীদের কথা বলতে গিয়ে আমি প্রশাসনকে ভয় পাই। এই ভীতি থেকে আমি কী করে রক্ষা পেতে পারি?

 

উত্তর: এ ধরনের সন্দেহের কোনোই ভিত্তি নেই, বরং অনেকে আমাদেরকে প্রশ্ন করেন, আমরা পশ্চিমাদের বিরোধিতা কেন করছি, কেন ভারতের বিরুদ্ধে কিছু বলি না ইত্যাদি। বাস্তবতা হলো- আমরা না পশ্চিমাদের পক্ষে বলছি, না আমরা আরবীয় ইসলামের কথা বলছি। আসলে আমরা মুসলমান জনগোষ্ঠীর ঈমানকে সঠিক পথে প্রবাহিত করার চেষ্টা করছি। যারা অপপ্রচার করেন হেযবুত তওহীদ সরলমনা মুসলমানদের ঈমান নষ্ট করে দিচ্ছেন, তাদের বোঝা উচিত যে, তাদের ঈমান আমরা কী নষ্ট করব, ঈমান তো বহু আগেই নষ্ট করে দিয়েছে এই জাতির ধর্মব্যবসায়ী শ্রেণি আর পশ্চিমা ষড়যন্ত্রমূলক দ্বিমুখী শিক্ষাব্যবস্থা। ধর্মব্যবসায়ীরা তাদের ঈমানকে ছিনতাই করে নিয়ে নিজেরা টাকা কামাচ্ছে, কেউ রাজনীতির মাঠে ছক্কা মারতে চাইছে, কেউ জঙ্গি বানিয়ে আত্মঘাতি হতে উদ্বুদ্ধ করছে। সেখান থেকে ধর্মপ্রাণ মানুষের ঈমানকে উদ্ধার করতে চাইছি আমরা। এবং সেটাকে সঠিক পথে ব্যবহার করতে চাইছি যেন সে দুনিয়াতেও লাভবান হয়, আখেরাতেও লাভবান হয়। এই যে বলা হয় ধর্মপ্রাণ মানুষের ঈমান, আমরা এ কথার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করি। আগে বলুন ধর্মপ্রাণ কী? ধর্ম যাদের প্রাণের মধ্যে তারাই ধর্মপ্রাণ। আজ মুসলমান জনগোষ্ঠীর কাছে ধর্ম হচ্ছে নামাজ, রোজা, ঈদ, মিলাদ, ওয়াজ, ধ্যান, যিকির-আজকার ইত্যাদি। ধর্ম কি এগুলো? না। মানুষের প্রকৃত ধর্ম হচ্ছে মানবতা, মনুষ্যত্ব। এটি যার নেই সে ধার্মিক নয়, নামাজ রোযা যতই করুক না কেন। প্রতিটি ধর্মের এক উদ্দেশ্য, মানুষের দুঃখ দুর্দশা, অন্যায়-অবিচার, শ্রেণি-বৈষম্য দূর করে একটি শান্তিময় সমাজ নির্মাণের পথনির্দেশ দান করা। মানবতা বাদ দিয়ে ধর্ম নেই, এটাই ধর্মের আত্মা, এই আত্মাকে বাদ দিলে ধর্ম মৃত। আজ আমরা পৃথিবীতে যে ধর্মগুলো দেখছি সব মৃত, উপাসনাসর্বস্ব। এ কথা আমরা সকল ধর্মগ্রন্থ থেকে প্রমাণ করেছি। মানুষ যখন ধর্মের আত্মার সন্ধান অর্থাৎ মানবতাবোধ ফিরে পাবে তখন সে আর অন্যের বিপদ দেখে চোখ বুঁজে থাকবে না, সে ধর্ম দ্বারা তাড়িত হয়ে ছুটে যাবে- ঠিক যেভাবে এখন সে ধর্মীয় অনুভূতি দ্বারা তাড়িত হয়ে মসজিদে-মন্দিরে ছুটে যায়, মক্কা-মদিনায় ছুটে যায়, তেমনি সে অন্যায়ের প্রতিবাদ করবে। সে বুঝতে পারবে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোই আসল এবাদত। আমরা ধর্মের এই সঠিক রূপ আবার তুলে ধরছি। অথচ আমাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয় আমরা মানুষের ঈমান নষ্ট করছি!
প্রশ্ন হলো কেন আসছে এই অভিযোগ? কারণ আমাদের কথাগুলো ধর্ম সম্পর্কে প্রতিষ্ঠিত ভুল ধারণাগুলোকে চুরমার করে দেয়। এটা তো সবযুগেই হয়েছে। সকল নবী-রসুলই তাঁর সমসাময়িক বিকৃত ধর্মের ধারক বাহকদের মিথ্যার ইমারতে আঘাত করেছেন এবং তাদের দ্বারা নির্যাতিত হয়েছেন, বাধাগ্রস্ত হয়েছেন। ঈমান নষ্ট করে দেওয়ার অভিযোগ স্বয়ং আমাদের নবী মোহাম্মদ (দ.) এর বিরুদ্ধেও উঠেছিল। আল্লাহর অশেষ শোকর, এ অভিযোগটি আমাদের বিরুদ্ধেও করা হয়। এ বিষয়ে আমাদের কথা হচ্ছে, বাংলাদেশের সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কিছু করা হলে তার সমালোচনা হবে এটা যেমন স্বাভাবিক, তেমনি স্রষ্টার দেওয়া সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কিছু বললে বা আচার-আচরণ করলে, সেটারও সমালোচনা করা স্বাভাবিক এবং করা কর্তব্য। আমরা সেটাই করছি। আমরা শত শত বিষয়ে প্রমাণ দিচ্ছি যে ধর্মব্যবসায়ীরা যা বলছেন ও করছেন তা আল্লাহর সংবিধান তথা কোর’আন হাদিসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তারাই ঈমানদার মানুষকে দিয়ে অবৈধ কাজ করাচ্ছে, তাদেরকে জাহান্নামের দিকে চালিত করছে। তাদের কাজের ফলে মানুষ ধর্ম থেকেই মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে, আল্লাহ-রসুলকে গালাগালি করছে। সুতরাং আমরা ধর্মের অবমাননা করছি না, অবমাননা থেকে ধর্মকে রক্ষা করতে চাইছি। ধর্মবিশ্বাস বা ঈমানকে জাতীয় উন্নতি ও অগ্রগতিতে কাজে লাগাতে চাইছি।

আরও পড়ুন:
প্রশ্ন: যারা অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করছেন, আপনারা তাদেরকে জঙ্গি বলছেন কী করে? আপনারা ইসলামের কথা বলেন, তারাও তো ইসলামের জন্য যুদ্ধ করছেন। তাদেরকে অন্যরা জঙ্গি বলতে পারে, আপনারা বলেন কেন?
প্রশ্ন: আপনারা অপশক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর কথা বলেন। আসলে অপশক্তি বলতে কোন দল বা গোষ্ঠীকে বোঝাচ্ছেন?
প্রশ্ন: হেযবুত তওহীদের কথা বলতে গিয়ে আমি প্রশাসনকে ভয় পাই। এই ভীতি থেকে আমি কী করে রক্ষা পেতে পারি?
আপনাদের প্রোগামে প্রধান অতিথি, বিশেষ অতিথি হিসাবে যারা গিয়েছিলেন তারা তাদের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ দ্বারা বিভিন্ন প্রকার প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছেন। পরবর্তীতে তাদের আপনারা অতিথি হিসাবে পাবেন না।

উত্তর: ন্যায়-অন্যায়, সত্য-মিথ্যার দ্বন্দ্বই হচ্ছে মানবসমাজের শ্বাশ্বত ইতিহাস। এই দ্বন্দ্ব সত্য হচ্ছে শুভশক্তি আর মিথ্যা হচ্ছে অপশক্তি। যাবতীয় সত্য এসেছে স্রষ্টার পক্ষ থেকে, সত্যের ফল হচ্ছে শান্তি, ঐক্য, সম্প্রীতি, মানবতা। পক্ষান্তরে মিথ্যার ফল হচ্ছে অশান্তি, অনৈক্য, বিদ্বেষ ও পাশবিকতা। সুতরাং কোনো স্বার্থের দ্বারা প্রণোদিত হয়ে যারাই মিথ্যার পক্ষ অবলম্বন করে, মিথ্যার বিস্তার ঘটায় তারাই অপশক্তি। তারা মানবসমাজের অশান্তির কারণ। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে, যারা ধর্মের প্রকৃত সত্যগুলোকে গোপন করে এবং ধর্মকে নিজেদের স্বার্থ হাসিলের মাধ্যম হিসাবে ব্যবহার করে তারা সমাজে মিথ্যার বিস্তার ঘটায়। সুতরাং তারা বড় একটি অপশক্তি। যারা জনসেবার নামে রাজনীতি করেন আর ব্যক্তিগত আয়-উন্নতির জন্য দুর্নীতি, লুটতরাজ করেন তারা একটি বড় অপশক্তি। বর্তমান পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় অপশক্তি হচ্ছে দাজ্জাল অর্থাৎ ইহুদি-খ্রিষ্টান বস্তুবাদী ‘সভ্যতা’, যা আত্মাহীন, আত্মকেন্দ্রিক, জড়বাদী, ভোগবাদী, স্বার্থপর একটি জীবনযাত্রায় মানুষকে অভ্যস্ত করে তুলেছে। পরিণামে মানুষ দিন দিন পশুতে পরিণত হয়েছে। আজ আমাদের ব্যক্তিগত থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিহিংসা আর স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য যে হানাহানি, রক্তপাত, যুদ্ধ-বিগ্রহ, সামাজিক ও আন্তর্জাতিক ধর্মব্যবসা ও স্বার্থের রাজনীতি চলছে তার মূল হোতা এই পাশ্চাত্য জড়বাদী সভ্যতা। একেই আল্লাহর রসুল রূপকভাবে বলেছেন যে আখেরি যুগে একটি বিরাট শক্তিশালী দানব আসবে যার এক চক্ষু কানা হবে অর্থাৎ সে শুধু জড়ের দিক, বস্তুর দিক দেখবে, আত্মার দিক দেখবে না। তার কপালে কাফের লেখা থাকবে। কাফের শব্দের তাৎপর্য হচ্ছে সে স্রষ্টার প্রেরিত মূল্যবোধ, ন্যায়-অন্যায়ের মানদণ্ডকে প্রত্যাখ্যান করবে, তার দ্বারা মানবতার অকল্যাণ হবে, অশান্তি বিস্তার হবে। আমরা এই সব অপশক্তিগুলোর বিরুদ্ধেই রুখে দাঁড়ানোর কথা বলছি।

প্রশ্ন: যারা অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করছেন, আপনারা তাদেরকে জঙ্গি বলছেন কী করে? আপনারা ইসলামের কথা বলেন, তারাও তো ইসলামের জন্য যুদ্ধ করছেন। তাদেরকে অন্যরা জঙ্গি বলতে পারে, আপনারা বলেন কেন?

উত্তর: আপনি বলছেন যে তারা ইসলামের জন্য যুদ্ধ করছেন, আমরা কিন্তু সেটা বলছি না। তারা যেটাকে ইসলাম মনে করছে আমরা সেটাকে ইসলামই মনে করি না, বরং আমরা শত শত প্রমাণ দিয়েছি যে সেটা একটি বিকৃত ও বিপরীতমুখী ইসলাম। আমাদের সুস্পষ্ট বক্তব্য হলো, জঙ্গিবাদ আসলে মানুষের ধর্মীয় চেতনার অপব্যবহার। মানুষের ধর্মবিশ্বাসকে বহু পন্থায় হাইজ্যাক করা হয়, এটি তারই একটি উপায়। এর দ্বারা ব্যক্তি, জাতি ও সমাজ সবাই ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে।
গত তেরশো বছরে বিকৃত হতে হতে আল্লাহ রসুলের ইসলাম বর্তমানে একেবারে বিপরীত হয়ে গেছে। সবশেষে ইউরোপীয় প্রভুরা এ জাতিকে পদানত করে মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করে এবং আরো বহু প্রকার ষড়যন্ত্র করে এরকম একটা বিকৃত ইসলাম শিক্ষা দিয়ে গেছে। কাজেই কেবল যুদ্ধ করলেই তো হবে না, যেটার জন্য যুদ্ধ সেটা আল্লাহর ইসলাম হতে হবে। এটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ওটা কখনোই আল্লাহ-রসুলের ইসলাম না। এটা প্রতিষ্ঠা হলে শান্তি পাবে না মানুষ। তালেবানরা শরিয়া প্রতিষ্ঠা করেছে, সৌদিরা করেছে, ইরান করেছে, আই.এস. করেছে কিন্তু শান্তি আসে নাই। যাদের উপরে সেটা প্রয়োগ করা হয়েছে তাদের আত্মা মুক্তির জন্য ত্রাহিসুরে চিৎকার করে উঠেছে। সুতরাং তারা যতই বলুক যে ইসলামের জন্য যুদ্ধ করছে আমরা মনে করি তারা বিভ্রান্তির মধ্যে আছে।
দ্বিতীয় কথা হচ্ছে তারা যে প্রক্রিয়ায় প্রচেষ্টা করছেন সেটা অবশ্যই ভুল তরিকা। আল্লাহ্র রসুল এভাবে করেন নি। তারা এখানে-ওখানে বোমা মেরে, আতঙ্ক সৃষ্টি করে, নিরীহ মানুষকে হত্যা করে, গাড়িতে বোম মেরে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করতে চাচ্ছেন। কিন্তু এসব করে তারা আরো জনবিচ্ছিন্ন হয়ে গেছেন, জনগণ তাদেরকে ভালোবাসে নি। কিন্তু আল্লাহর রসুল আগে মানুষের মন জয় করেছেন। এই জঙ্গিদের কর্মকাণ্ড ইসলামের শত্রুরাই লাভবান হচ্ছে। তারা ইসলামের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়ানোর সুযোগ পেয়ে যাচ্ছে যে, ‘দেখো, ইসলাম কত খারাপ, এরা জঙ্গি, এরা মানুষদের হত্যা করে, এরা শিশু-নারী হত্যা করছে, এরা কত নিষ্ঠুর’। তাদের অপপ্রচারের ফলে মানুষ এখন জেহাদ ও কেতালকে ঘৃণা করছে, ইসলামকে ঘৃণা করছে। ইসলাম ধর্মকে মানবতাবিরোধী, নৃশংস-বর্বর, অযৌক্তিক ইত্যাদি বলে ইসলামকে উপস্থাপন করছে। আমাদের কথা হলো, এই জঙ্গিবাদ প্রকৃতপক্ষে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীদের একটি পাতানো ফাঁদ বা পাতানো খেলা মাত্র। যারা ইসলামকে সত্যিকারভাবে ভালোবাসে এমন হাজার হাজার কিংবা লক্ষ লক্ষ মানুষ তাদের পাতানো এই ফাঁদে পা দিয়েছে। আফগানিস্তানের রণাঙ্গন, সিরিয়ার রণাঙ্গন, বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের রণাঙ্গন তার প্রমাণ। আমরা তাদের প্রতি করুণা বোধ করি, তাদের জন্য আমাদের দুঃখ হয় কিন্তু সত্যের খাতিরে আমরা বলতে বাধ্য যে, এই সরলপ্রাণ মানুষগুলোর ধর্মবিশ্বাসকে মানবতার অকল্যাণে এবং ইসলামের বিরুদ্ধেই ব্যবহার করেছ পশ্চিমা ষড়যন্ত্রকারী সভ্যতা।
কাজেই ইসলামের নামে যারা অস্ত্র ধরেছে তাদেরকে আমরা জঙ্গি বলে গালাগাল দিচ্ছি না। বরং আমরা জঙ্গিবাদকে ভুল পন্থা বলে চিহ্নিত করছি। যারা এই ভুল পথে পা বাড়িয়েছে তাদেরকে বোঝানোর চেষ্টা করছি যে, এইপথ ভুল। আপনারা এইপথ ত্যাগ করুন। কারণ এতে আপনারা দুই জীবনেই ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন, আপনাদের দ্বারা মানবজাতিও ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে, ইসলাম তো প্রতিষ্ঠা করতে পারবেনই না, কারণ ইসলাম আপনাদের কাছে নেই। শুধু শুধু আপনাদের দ্বারা ইসলামের বদনাম হচ্ছে। বরং আপনাদের কর্তব্য হলো, আগে প্রকৃত ইসলাম কি তা বুঝুন, তারপর সেই সত্যের ভিত্তিতে মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করুন।

উত্তর: এই অভিযোগ আমরা প্রায়শই শুনি। পাহাড় সমান মিথ্যার বিরুদ্ধে যখন কোনো সত্যকে তুলে ধরতে হয়, সেই সত্যের পক্ষে মানুষকে উজ্জীবিত করতে হয়, তখন সেই সত্যকে বারবার উত্থাপন করতে হয়, বারবার বলতে হয়, বিভিন্নভাবে নানা আঙ্গিকে উল্লেখ করতে হয়। আমরা ১৩০০ বছরের জমানো জঞ্জালকে পরিষ্কার করার উদ্যোগ নিয়েছি। গত ১৩‘শ বছর থেকে বিকৃত হতে-হতে আল্লাহর প্রকৃত ইসলাম একেবারে হারিয়ে গেছে। যে বিষয়টার গুরুত্ব নেই, সেটাকে এক নাম্বারে আনা হয়েছে, আর যেটার গুরুত্ব এক নাম্বারে সেটা গায়েব করে দেয়া হয়েছে। বহুত সুন্নত-মোস্তাহাব জাতীয় আমলকে ফরযের উপরে জায়গা দেয়া হয়েছে। কাজেই এখন প্রকৃত ইসলামের কথা বলতে গেলে মানুষ মনে করে, আমরা পুরো ইসলামের বিরুদ্ধেই কাজ করছি। আসলে কিন্তু ঘটনা তা নয়। এখন এই বিষয়টাকে বোঝানোর জন্য বারবার উল্লেখ না করে আমাদের কোনো উপায় নাই। যে মিথ্যাগুলো শিক্ষা ব্যবস্থা, প্রচার মাধ্যম, বই-পত্র, আলেম ওলামাদের ওয়াজে খোতবায় লক্ষ লক্ষবার প্রচার করা হয়েছে, যা মানুষের মনে মগজে স্থায়ীভাবে গেড়ে বসেছে, সেটাকে পরিবর্তন করে সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য আমাদের ক্ষীণ কণ্ঠে একটি বিষয় হাজার হাজার বার বললেও কমই বলা হবে।
দ্বিতীয় কথা হলো, আমাদের পত্রিকাটি প্রচলিত যে মাধ্যমগুলোর দ্বারা পত্রিকা পাঠকের হাতে পৌঁছায় আমরা সেই মাধ্যম ব্যবহার করতে পারছি না। আমাদের পত্রিকা সাধারণ হকাররাও বিক্রি করেন না, কারণ তাদেরকে যে মূল্যে পত্রিকা দিতে হয়, তার বহুগুণ টাকা আমাদের খরচ করতে হয় পত্রিকা প্রকাশ করতে। অন্যান্য পত্রিকাগুলোর প্রধান আয়ের উৎস বিজ্ঞাপন, অন্যদিকে আমাদের পত্রিকা বাণিজ্যিক নয়, আদর্শিক। এসমস্ত কারণে আমাদের পত্রিকা আমাদের নিজেদের লোকেরাই অর্থাৎ হেযবুত তওহীদের সদস্য-সদস্যারাই হকারি করে বিক্রি করে থাকেন। এজন্য আজ যে এলাকায় পত্রিকা যাচ্ছে, পরদিন হয়তো সেই এলাকায় পত্রিকা যাচ্ছে না। প্রতিদিন নতুন নতুন মানুষের হাতে আমাদের পত্রিকা পড়ছে। দেখা গেল একই আর্টিকেল বা বিষয়বস্তু একজনে পেলেন আরেকজনে পেলেন না। এজন্য আমাদেরকে বারবার দিতে হচ্ছে। আর বক্তব্যের পুনরাবৃত্তির কথা যদি বলেন তাহলে আল্লাহর পবিত্র কোর’আন সম্পর্কেও একই কথা প্রযোজ্য। এটা গুরুত্বের উপর নির্ভর করে। কাজেই বারবার দেয়াটা দোষের কিছু না।

দেখুন লক্ষ্য হারিয়ে বিভক্ত হয়ে এবং তওহীদ থেকে বহির্গত হয়ে এই জাতির জীবনে যে লাঞ্ছনাদায়ক আযাব নেমে এসেছে তা থেকে বাঁচার জন্য অনেকে অনেকভাবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কেউ ব্যক্তিগতভাবে কিছু করার চেষ্টা করছেন, কেউ দলগতভাবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এমনকি এই অপমানের জীবন থেকে মুক্তি পাওয়ার আশায় অনেকে নিজের মুসলিম নাম-পরিচয় মুছে ফেলার চেষ্টাও করছেন। ইউরোপ-আমেরিকার কোনো দেশের নাগরিকত্ব নিয়ে ভিন্ন ধর্মাবলম্বী কাউকে বিয়ে করছেন, এফিডেভিট করে প্রয়োজনে নিজের নাম পরিবর্তন করছেন। তাও যদি মুসলিম হয়ে জন্মগ্রহণের ‘লজ্জা’ থেকে বেরিয়ে আসা যায়! কথা হলো, এভাবে কি জাতির ভাগ্য পরিবর্তন সম্ভব? এতে কি মুক্তি আসবে? আমি বলব, না; এই চেষ্টা আমাদেরকে মুক্তি এনে দিতে পারবে না। আমাদেরকে বাঁচতে হলে মুসলিম পরিচয় নিয়েই বাঁচতে হবে,  ইসলামকে ধারণ করেই বাঁচতে হবে। ভিন্ন কোনো প্রচেষ্টা আমাদেরকে মুক্তি এনে দিতে পারবে না।
একই সাথে দুই মালিকের দাসত্ব করা যায় না। ইউরোপীয়রা মুসলিম ভূ-খণ্ডগুলো দখল করার পর তাদের উপর নিজেদের শাসনব্যবস্থা চাপিয়ে দিল। এভাবে এই মুসলিম নামক জাতি আল্লাহর দাসত্ব থেকে সরে এসে কার্যত ইংরেজদের দাসত্ব করতে লাগল। আল্লাহর হুকুম বাদ দিয়ে তাদের হুকুম-বিধান নিজেদের জীবনে গ্রহণ করে নিতে বাধ্য হলো। আমরা মুসলমানরা ইংরেজ শাসকদের তৈরি আইন, তাদের তৈরি বিচারব্যবস্থা, শাসন পদ্ধতি, সুদভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, অনৈক্য ও হানাহানির রাজনৈতিক সিস্টেম সবকিছু গ্রহণ করে নিলাম। আদর্শ হিসাবে রসুলাল্লাহকে (সা.) বাদ দিয়ে আমরা গ্রহণ করে নিলাম আব্রাহাম লিংকন, কার্লমার্কস, লেনিন, ম্যাকিয়েভেলি, হ্যাগেল, এ্যাঙ্গেল প্রমুখদেরকে। আমরা গোলাম হয়ে তাদের সমস্ত কিছু গ্রহণ করে নিলাম, তাদের তৈরি শিক্ষাব্যবস্থাও গ্রহণ করলাম। তারা বস্তুবাদী ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে নাস্তিকতার শেকড় গেড়ে দিল আমাদের মননে। আজ বস্তুবাদী শিক্ষায় শিক্ষিত শ্রেণিটির বড় একটা অংশই ধর্মের প্রতি বীতশ্রদ্ধ, বিদ্বেষপূর্ণ ভাব পোষণ করে। তারা মনে করে কোর’আন মানুষের রচনা করা প্রাচীন একটা গ্রন্থ যা এই যুগে অচল, মধ্যযুগের বর্বর আরবজাতির জন্য এটা প্রয়োগযোগ্য হলেও বিজ্ঞানের এই যুগে এটা চলবে না। জান্নাত, জাহান্নাম, আখেরাত এগুলো সব বানানো গল্প মাত্র। তারা কেবল এটা বিশ্বাসই করে না তারা এটা প্রচারও করে। তারা মনে করে নাস্তিকতার প্রচার করলে পশ্চিমা দেশের নাগরিকত্ব পাওয়া যাবে, সেখানে গিয়ে আরাম-আয়েশে জীবন পার করা যাবে। কিন্তু তাদেরকে বুঝতে হবে নাস্তিক পরিচয় দিয়েও আপনি বাঁচতে পারবেন না। আপনি হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান-নাস্তিক যাই হোন না কেন, আল্লাহর আযাব আপনার পেছনে পেছনে ধাওয়া করবে। নাম পাল্টে মোহাম্মদ থেকে উইলিয়াম করতে পারেন কিন্তু আপনাকে তারা মুসলিম হিসাবেই দেখবে এবং অবিশ্বাস করবে। গত কয়েক শতাব্দী থেকে তারা ইসলামের বিরুদ্ধে, মুসলিমদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাতে চালাতে পুরো মানবজাতির মধ্যে একটা ধারণা প্রতিষ্ঠা করে ফেলেছে- মুসলিমরা খারাপ, মুসলিমরা জঙ্গি-সন্ত্রাসী; ইসলাম মৌলবাদি, কূপমণ্ডূক, ধর্মান্ধ, যুক্তিবোধহীন। অন্য সকল জাতিই এখন মুসলিমদেরকে ঘৃণা করে। মুসলিম যেই দেশে থাকবে সেই দেশেই বিপদ। কাজেই এদেরকে রাখা যাবে না, তাদেরকে ইউরোপ-আমেরিকায় প্রবেশ করতে দেয়া যাবে না। আজকে এভাবে সারা পৃথিবীতে মুসলিমদের বিরুদ্ধে বহু প্রপাগাণ্ডা চালানো হয়েছে। এখন তাদের মধ্যে ইসলামের প্রতি, মুসলিমদের প্রতি একটা ভীতি তৈরি হয়ে গেছে। ইউরোপে এটার নাম দিয়েছে ‘ইসলামোফোবিয়া’ অর্থাৎ ইসলামভীতি। ‘মুসলিম! ওরে বাপরে বাপ!!’ কিছুদিন আগে পত্রিকায় এসেছে, পোল্যান্ড এবং জার্মানির কয়েকশত মাইল লম্বা সীমান্ত এলাকার মধ্যে প্রায় পাঁচশত গীর্জায় প্রার্থনা সভা হয়। হাজার হাজার খ্রিস্টান যোগ দেয় ওই প্রার্থনা সভায়। প্রার্থনার মূল বিষয় ছিল- কোনো মুসলিম যেন ইউরোপে ঢুকতে না পারে। একটা এন্টি-ইসলামিক মুভমেন্ট শুরু হয়েছে। ভারতে, ইউরোপে, আমেরিকায়, সর্বত্র। ডোনাল্ড ট্রাম্প তো ক্ষমতায় আসার আগে থেকেই মুসলিমদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়ে আসছেন। এখন অবস্থা এমন যে, মুসলিমরা যেন শুধুই মার খাবে। সবাই মিলে সম্মিলিতভাবে ‘মুসলিম তাড়াও’ অভিযানে নেমেছে। এখন কোথায় যাবেন। মিয়ানমার থেকে পালিয়ে তো এখানে আসলেন, এখানেও যদি শুরু হয় তাহলে কোথায় যাবেন? যাওয়ার জায়গা নেই, দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে।
এই দুর্দশা থেকে এখন বাঁচতে হলে আত্মপরিচয় মুছে দিয়ে লাভ নেই। লা’নত আপনার পিছু পিছু ধাওয়া করবে। বাঁচতে হলে মুসলিম পরিচয় নিয়েই বাঁচতে হবে। আবার ইসলামকে ধারণ করতে হবে। যে পরশ পাথরের ছোঁয়ায় এসে বর্বর আরবরা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠত্বের আসনে আসীন হয়েছিল সেই পরশ পাথর আবার খুঁজে নিতে হবে। আল্লাহর হুকুম বাদ দিয়ে আপনারা কয়েক শতাব্দী থেকে পশ্চিমাদের হুকুম মেনে নিয়েছেন, বাঁচতে পারছেন কোথাও? সুতরাং খ্রিস্টান কিংবা নাস্তিক হয়েও বাঁচতে পারবেন না। এখন আপনারা প্রায় সাত কোটি উদ্বাস্তু। বাড়ি নেই, ঘর নেই, বসবাসের জায়গা নেই। পলিথিন ব্যাগের ভেতর গাদাগাদি করে থাকতে হচ্ছে। মান-সম্মান, ইজ্জত সব শেষ। কাজেই মুসলিমদেরকে এখন বাঁচতে হলে একটা কথার উপরে তাদেরকে আসতে হবে, আমাদের ইসলাম নিয়ে বাঁচতে হবে, মুসলিম পরিচয়েই বাঁচতে হবে। এখন আমাদেরকে তওবা করতে হবে, ক্ষমা চাইতে হবে। আমরা ছিলাম আল্লাহর পছন্দনীয় বান্দা। আল্লাহ আমাদেরকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠা করার জন্য। আমাদের প্রিয় নবীকে (সা.) পাঠিয়েছিলেন একটা কিতাব দিয়ে, আমরা আল্লাহর হুকুম প্রত্যাখ্যান করেছি। এখন তওবা করে মুসলিমদেরকে এই পরিচয় দিতে হবে যে, আমরা মুসলিম।
এখানে একটা বড় প্রশ্ন হচ্ছে, আজ তো বহু রকমের ‘ইসলাম’ সমাজে চালু আছে, তাহলে আমরা কোন্ ইসলাম গ্রহণ করব? কোন্ ইসলাম আমাদেরকে সত্যিকার অর্থে মুক্তি দেবে? একেক পীরের একেক ইসলাম, একেক তরিকা। সেখানে গিয়ে আত্মার ঘষা-মাজা কর আর তাদেরকে টাকা দাও। মুসলিম জাতির মুক্তি নিয়ে তাদের কোনো চিন্তা নেই। আবার রাজনৈতিকভাবে যারা ইসলাম প্রতিষ্ঠা করতে চায় তাদের মধ্যেও রয়েছে বিভিন্ন ধরন, বিভিন্ন কর্মসূচি, বিভিন্ন রূপরেখা। তাহলে মানুষ কোন্ ইসলাম গ্রহণ করবে? বলার অপেক্ষা রাখে না, যে বিকৃত ইসলাম বর্তমানে দুনিয়াজুড়ে প্রচলিত আছে তা দিয়ে এই জাতি শ্রেষ্ঠ জাতিতে পরিণত হতে পারবে না। যদি পারতো তাহলে আগেই পারতো।
যে ইসলাম মানবজাতির মধ্যে ঐক্য সৃষ্টি করবে, যে ইসলাম সমাজকে দারিদ্র্যমুক্ত করবে, সমৃদ্ধ করবে, যে ইসলাম মানুষের অন্ধত্ব দূর করবে, আমাদের কূপমণ্ডূকতা দূর করবে, যে ইসলাম মানুষকে চিন্তা-ভাবনায় সভ্য করবে, জ্ঞানে-বিজ্ঞানে, সামরিক শক্তিতে, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে, নৈতিক চরিত্রে, নব নব আবিষ্কারে এক কথায় সকল দিক থেকে আমাদেরকে শিক্ষকের আসনে নিয়ে যাবে সেই ইসলাম গ্রহণ করতে পারলে আমরা মুসলিম হিসাবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারব। সেটা কোন্ ইসলাম? আল্লাহর রসুল পৃথিবীতে যে ইসলাম নিয়ে এসেছিলেন সেই ইসলাম। প্রশ্ন হতে পারে, সেই ইসলাম কি এখন পৃথিবীতে আছে? উত্তরে বলব, হ্যাঁ, রসুলাল্লাহর সেই প্রকৃত ইসলাম আবার মহান আল্লাহ অতীব দয়া করে মাননীয় এমামুয্যামানকে তথা হেযবুত তওহীদকে দান করেছেন। শত শত বছরের অজস্র বিকৃতির আড়ালে চাপা পড়ে আছে যে  সহজ-সরল সত্যিকার ইসলাম, হেযবুত তওহীদ মানুষের সামনে সেই ইসলামটিই তুলে ধরছে। এখন এই মুসলিম নামক জাতিকে বাঁচতে হলে একটাই পথ, তাদেরকে এই প্রকৃত ইসলাম ধারণ করতে হবে। আল্লাহর তওহীদে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। তা না হলে তারা আর বাঁচবে না। তারা এতদিন সমাজতন্ত্রী হয়েছে, গণতন্ত্রী হয়েছে, মাওবাদী হয়েছে, লেলিনপন্থী হয়েছে, পশ্চিমাপন্থী হয়েছে কিন্তু তারা বাঁচতে পারেনি। এগুলো করে করে আমরা নিজেরা নিজেরা শত শত ভাগে বিভক্ত হয়েছি। ভূখণ্ডগতভাবে, শরীয়াগতভাবে, আধ্যাত্মিকভাবে, রাজনৈতিকভাবে, এক কথায় সর্বপ্রকারে আমরা বিভক্ত হয়েছি। যদি এভাবেই চলতে থাকে তাহলে আগামীতেও আমাদের চোখের সামনে আমাদের নারীরা ধর্ষিতা হবে, আমাদের যুবকেরা বেয়নেটের খোঁচায় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়বে, আমাদের বৃদ্ধ ও শিশুদেরকেও মেশিনগান চালিয়ে হত্যা করা হবে। আমরা কিছুই করতে পারব না। আমাদের ধন-সম্পদ, ঘর-বাড়ি সমস্ত কিছু আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়া হবে, আমরা অসহায়ের মতো শুধু চেয়ে দেখব, প্রতিরোধ করতে পারব না।

দাজ্জাল সম্পর্কে হাদিসে যে অতিকায় দানবের কথা বলা আছে সেটা বর্তমানের পাশ্চাত্য সভ্যতার রূপক বর্ণনা, মাননীয় এমামুয্যামান তাঁর দাজ্জাল বইতে এটা প্রমাণ করেছেন। তাঁর যুক্তিগুলো কেউ খণ্ডাতে পারেন নি, পারবেও না। সংক্ষেপে মূল কথা হচ্ছে, ইউরোপের মধ্যযুগে যখন চার্চ ও রাজতন্ত্রের দ্বন্দ্ব চরমে উঠেছিল, ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছিল, তখন রাজা অষ্টম হেনরি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে চার্চের ক্ষমতাকে খর্ব করেন এবং রাজাকে চার্চের প্রধান বলে ঘোষণা করেন। সেই থেকে জাতীয় জীবনে ধর্মের আর কোনো গুরুত্ব রইল না, ধর্ম ব্যক্তিগত বিষয়ে পরিণত হলো।
এর পূর্বে মানুষের ইতিহাস যতদূর জানা যায়, ধর্মের দ্বারাই রাষ্ট্র পরিচালিত হয়েছে, সেই ধর্ম সঠিক হোক আর বিকৃতই হোক। ১৫৩৭ এর পরের রেনেসাঁ যুগের দার্শনিক, সাহিত্যিক ও রাষ্ট্রনীতির কারণে ধর্মহীন একটি জীবনব্যবস্থা সৃষ্টি হলো যাকে কেতাবি ভাষায় ধর্মনিরপেক্ষতা বলা হচ্ছে। পরবর্তীতে ঔপনিবেশিক যুগে প্রায় সমগ্র বিশ্বে এটি চালু করা হয়। এর কু-প্রভাবে মানুষের জীবনের উদ্দেশ্য হয়ে গেল যে কোনো উপায়েই হোক অধিক উপার্জন, ভোগবিলাস, বস্তুগত স্বার্থোদ্ধার। একেই বলা হচ্ছে জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন। অথচ মানুষ দেহসর্বস্ব নয়, তার আত্মাও আছে। তার আত্মিক পরিশুদ্ধির ও চারিত্রিক উৎকর্ষের জন্য ধর্মীয় শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু ধর্মহীন জীবন ব্যবস্থার প্রভাবে ব্যক্তিজীবন থেকেও ধর্ম লুপ্ত হয়ে মানবসমাজে চরম নৈতিক অবক্ষয় সৃষ্টি হলো। সর্বত্র বিরাজমান স্রষ্টার ভয়ে ধর্মবিশ্বাসী মানুষ অপরাধ করে না, কিন্তু স্রষ্টাহীন জীবনব্যবস্থায় পুলিশের চোখ ফাঁকি দিতে পারলেই অপরাধ সংঘটন করে। এভাবে সর্বপ্রকার অপরাধ মাত্রা ছাড়িয়ে গেল। এই যে একদিকে প্রযুক্তির উন্নয়ন, অপরদিকে মনুষ্যত্বের চরম অধঃপতন পৃথিবীতে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি অবশ্যই মানবজাতির জন্য আশীর্বাদ ও স্রষ্টার নেয়ামত, কিন্তু আজ এগুলো যতটা না মানুষের কল্যাণে ব্যবহৃত হচ্ছে তার বহুগুণ ব্যবহৃত হচ্ছে মানবতার বিরুদ্ধে। সংবাদপত্রগুলো দুঃসংবাদে ভরা, রাজনীতি আর মিথ্যা সমার্থক হয়ে দাঁড়িয়েছে, নিকৃষ্ট চরিত্রের মানুষ সম্মানিত হচ্ছে। ধর্মকে জাতীয় জীবন থেকে নির্বাসন দেওয়ার পরিণামেই এই ভয়ঙ্কর বস্তুবাদী সভ্যতার জন্ম হয়েছে। তাই একে আল্লাহর রসুল দানবের সঙ্গে তুলনা করেছেন।
ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষা মানুষের কোনো উপকারে আসছে কিনা জানতে চেয়েছিলেন। আমাদের কথা হচ্ছে, ধর্মনিরপেক্ষতা যদি ধর্মহীনতায় পর্যবসিত হয় তাহলে তা মানবজাতিকে আত্মিকভাবে ভারসাম্যহীন করবে, মানুষ জ্ঞান বিজ্ঞানে উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে আত্মাহীন পশুতে পরিণত হবে- যার প্রমাণ বর্তমান সময়। আর জ্ঞান-বিজ্ঞান প্রযুক্তির উন্নয়নের জন্য ধর্মকে বিসর্জন করার প্রয়োজন নেই, ধর্মকে বাদ দিলে জ্ঞান বিজ্ঞানের ব্যবহার হয় মানুষের ক্ষতিসাধনে। এটা ভুলে গেলে চলবে না যে, ইসলামের সোনালি যুগে অর্থাৎ ১২৫৮ সনে আব্বাসীয় খেলাফতের পতন পর্যন্ত বিজ্ঞানের প্রতিটি শাখায় মুসলিমরাই ছিল শিক্ষকের আসনে। ঐ সময়ে ইউরোপে চলছিল মধ্যযুগীয় বর্বর যুগ। আজকের আধুনিক বিজ্ঞানে ইউরোপীয়দের একচেটিয়া আধিপত্য যার ভিত্তি রচনা করে গেছেন মুসলিম বিজ্ঞানীরাই। এটা ইতিহাস যদিও আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় সেগুলো চাপা দেওয়া হয়েছে।

একই কথা। আপনি বাংলায় বা ইংরেজিতে যা বলছেন সেটাই আরবি করলে দাঁড়াচ্ছে আমীর। এ পদবি যে কোনো সংগঠনেই থাকতে পারে। আপনি মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধবাদীদের দলের কথা বললেন। ’৭১ সনে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে আমরা যুদ্ধ করেছি। তাদের সেনাবাহিনীর পদবিগুলো ছিল জেনারেল, মেজর, ক্যাপ্টেন, ব্রিগেডিয়ার ইত্যাদি, আমাদের সেনাবাহিনীর পদগুলোও কি তা-ই ছিল না? আজও আমাদের দেশের সেনাবাহিনী এ পদবিগুলোই ব্যবহার করছে। ওটা নিয়ে তো কথা উঠছে না। কেন উঠছে না? কারণ এগুলো পারিভাষিক শব্দ, যে কোনো দেশের সেনাবাহিনী এ পদবিগুলো ব্যবহার করতে পারে। পাকিস্তান আর্মি পদবিটি ব্যবহার করে বলে অন্য কোনো দেশের আর্মি সেটা ব্যবহার করতে পারবে না এটা ভাবা ঠিক নয়। আমীর শব্দটি ইসলামের পরিভাষা, শব্দটি কোর’আনে আছে, খলিফাদেরকেও আমীরুল মো’মেনীন বলা হতো। মধ্যপ্রাচ্যে অনেক দেশ আছে আমিরাত, সেগুলোতে রাষ্ট্রনায়কের পদবি আমীর। মনে হয় সুচতুরভাবে ইসলামের যে কোনো কিছুর প্রতিই একটা অ্যালার্জি সৃষ্টি করা হয়েছে আমাদের সমাজে।

দেখুন আনুগত্যের নির্দেশ দিয়েছেন আল্লাহ ও তাঁর রসুল, আমরা হেযবুত তওহীদ সেটাই বাস্তবায়নের চেষ্টা করি মাত্র। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেছেন, “তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর, রাসুলের আনুগত্য কর আর আনুগত্য করো তোমাদের আমীরের (নিসা-৫৯)।’’ আল্লাহর এই কথার প্রতিধ্বনি করে আমীর কেমন হলেও আনুগত্য করতে হবে সে সম্পর্কে রসুল (সা.) বলেছেন, “আমীর কানকাটা নিগ্রো, ক্রীতদাস, ক্ষুদ্রমস্তিষ্ক হলেও তার আনুগত্য করবে।” কাজেই আনুগত্য হচ্ছে ঈমানী কর্তব্য।
আপনি যদি হেযবুত তওহীদের কর্মসূচি পড়েন তাহলে বুঝবেন এই কর্মসূচি আমাদের নিজেদের তৈরি করে নেওয়া নয়, এটা আল্লাহর দেওয়া কর্মসূচি যেটা আল্লাহর রসুল তাঁর উম্মতের জন্য রেখে গিয়েছিলেন। তিনি জাতির ভবিষ্যৎ কর্মসূচি ঠিক করে দিয়ে বলেছিলেন, ‘আল্লাহ আমাকে পাঁচটি কাজের দায়িত্ব অর্পণ করেছেন, আমি সারাজীবন সেই পাঁচটি কাজ করেছি এবং তোমাদেরকেও সেই পাঁচটি কাজের দায়িত্ব দিয়ে যাচ্ছি। সেগুলো হলো- ঐক্যবদ্ধ হবে, (নেতার আদেশ) শুনবে, পালন করবে (অর্থাৎ আনুগত্য করবে), হেজরত করবে এবং সংগ্রাম করবে। যে ব্যক্তি এই ঐক্যবদ্ধনী থেকে এক বিঘত পরিমাণও সরে যাবে তার গলদেশ থেকে ইসলামের রজ্জু খুলে যাবে, যদি না সে তওবা করে ফিরে আসে। আর যদি কেউ (এর বাইরে) জাহেলিয়াতের কোনোকিছুর দিকে আহ্বান করে তাহলে সে জাহান্নামের জ্বালানি পাথরে পরিণত হবে, যদিও সে নামাজ পড়ে, রোজা রাখে এবং নিজেকে মুসলিম বলে দাবি করে (আহমদ ইবনে মাজাহ, বাব উল ইমারত, মেশকাত)’। খেয়াল করুন কর্মসূচির তৃতীয় দফাটিই কিন্তু আনুগত্য। অর্থাৎ বোঝা যাচ্ছে, অন্যসমস্ত কিছু ঠিক থাকলেও একজন মানুষের জ্বাহান্নামের জ্বালানি পাথর হবার জন্য আনুগত্য না করাটাই যথেষ্ট হতে পারে!
প্রশ্ন হচ্ছে, আনুগত্যের এত প্রয়োজনীয়তা কেন? এই কারণে যে, আনুগত্য ছাড়া কোনো শক্তিশালী জাতিসত্ত্বা গঠন সম্ভব নয়। জনসাধারণ অবাধ্য হলে, কথায় কথায় কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধাচারণ করলে তাদেরকে দিয়ে মহান কোনো লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হয় না এবং জাতির সমস্ত উন্নতি, প্রগতি, গতিশীলতাই রুদ্ধ হয়ে পড়ে। এজন্য ঐক্য, শৃঙ্খলা ও আনুগত্যের কোনো বিকল্প নেই। আল্লাহর রসুল মূলত এই তিনটি বিষয়ের সমন্বয়েই এক অপ্রতিরোধ্য জাতি গঠন করেছিলেন তাঁর ইন্তেকালের পরে যে জাতির সামনে ঝড়ের মুখে তুলোর মত উড়ে গিয়েছিল তৎকালীন দুইটি সুপার পাওয়ার রোমান ও পারস্য সা¤্রাজ্য। আজও যদি আমরা তেমন একটি শক্তিশালী জাতি গড়ে তুলতে চাই তাহলে সেই জাতির সদস্যদের নির্দিষ্ট লক্ষ্য ঠিক করার পরেই প্রয়োজন হবে ঐক্য, শৃঙ্খলা ও আনুগত্যের।
ইবলিশকে যখন আল্লাহ হুকুম দিলেন আদম (আ.) কে সেজদা করার জন্য তখন ইবলিশ অহংকার করে সেজদা করল না অর্থাৎ আনুগত্য করল না। এর ফল কী হলো? তার বহু বছরের আমলসহ আল্লাহ তাকে রাজীম (বহিষ্কৃৃত) করে দিলেন। এই ঘটনা থেকেও আমরা আনুগত্যের প্রয়োজনীয়তা বুঝতে পারি। কিন্তু দুঃখের বিষয় হচ্ছে, আল্লাহর দেওয়া কর্মসূচি থেকে বহির্গত হয়ে আমরা মুসলমানরা আজ এমন একটি পর্যায়ে এসে পৌঁছেছি যেখানে আমাদের না আছে ঐক্য, না আছে শৃঙ্খলা, না আছে আনুগত্য। আল্লাহর রসুল এই জাতিকে যে লক্ষ্যের দিকে ধাবিত করে গিয়েছিলেন সেই লক্ষ্য বহু শতাব্দী আগেই আমাদের সামনে থেকে হারিয়ে গেছে। লক্ষ্য হারিয়ে আমরা একেক ভাগ একেক দিকে যাত্রা করেছি। তৈরি হয়েছে নানাবিধ ফেরকা-মাজহাব, দল-উপদল। জাতি হয়ে গেছে বিশৃঙ্খল, লক্ষ্যহীন, উদ্দেশ্যহীন। এখন এই জাতির নির্দিষ্ট কোনো নেতাই নেই, কে কার আনুগত্য করবে? সুতরাং আনুগত্যও নেই।
এই যে আমরা আনুগত্যের কথা বলছি, প্রথমত এই আনুগত্য কিন্তু ন্যায়-অন্যায় নির্বিশেষে নয়। ইমাম ও আমীর হুকুম করবেন আল্লাহ-রসুলের হুকুম মোতাবেক, সেই হুকুমের আনুগত্য জাতির জন্য বাধ্যতামূলক, কেননা কলেমার চুক্তি অনুযায়ী প্রত্যেক মুসলিম আল্লাহ-রসুলের হুকুম মানতে অঙ্গীকারাবদ্ধ। দ্বিতীয়ত, আমীরের আদেশের পূর্বে পরামর্শ দেবার বেলায় সবাই কিন্তু সম্পূর্ণ স্বাধীন, কাউকে ভয় না করে জাতির কল্যাণ অকল্যাণ চিন্তা করে উন্মুক্তভাবে পরামর্শ সবাই দিতে পারবেন। সেখানে দোষ-ত্রæটি, সমালোচনা সবই করা যাবে। কিন্তু একবার আমীরের সিদ্ধান্ত হয়ে গেলে তখন আর কোনো প্রশ্ন থাকবে না। তখনই শর্তহীন, দ্বিধাহীন আনুগত্য করার প্রশ্ন আসবে। আল্লাহ নিজেই মানুষ সৃষ্টির পূর্বে মালায়েকদের নিয়ে আলোচনা করেছিলেন। কিন্তু যখন তিনি সিদ্ধান্ত দিলেন সকল মালায়েককে যে, তোমরা আদমকে সেজদা কর, তখন ইবলিশ সেজদা করল না, অবাধ্য হলো, এর শাস্তি তাকে ভোগ করতে হলো। আল্লাহর অবাধ্যতা যেই করবে তাকেই প্রাকৃতিক নিয়মেই শাস্তি ভোগ করতে হয়। কারণ আল্লাহ তাঁর সমুদয় সৃষ্টিজগত পরিচালনা করছেন এক নিখুঁত শৃঙ্খলা দিয়ে, যেখানেই তাঁর আনুগত্য লঙ্ঘন হবে সেখানেই অশান্তি ও অস্থিরতা সৃষ্টি হবে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেই আনুগত্যের জায়গটাতেই আজ এই জাতি ব্যর্থ।

১৯ ডিসেম্বর ২০১৬ রাজধানীর উত্তরায় শুভ উদ্বোধন হলো তওহীদ ফুটবল ক্লাব আন্তঃশাখা ফুটবল প্রতিযোগিতা ২০১৬-১৭। হেযবুত তওহীদের ঢাকা মহানগর সভাপতি আলী হোসেনের সভাপতিত্বে রাজধানীর উত্তরা ১৪ নং সেক্টর কল্যাণ সমিতির মাঠে গতকাল সকাল ৭টায় এই প্রতিযোগিতার উদ্বোধন করেন হেযবুত তওহীদের এমাম হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম। ঢাকা মহানগর হেযবুত তওহীদের উদ্যোগে এই প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছে।
উদ্বোধনী বক্তব্যে হেযবুত তওহীদের এমাম হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম বলেন, একটি শক্তিশালী, প্রগতিশীল ও সমৃদ্ধ জাতি গঠনের জন্য প্রয়োজন সুস্থ নাগরিক। আর সুস্থ, সুঠাম, বলিষ্ঠ নাগরিক গঠনে খেলাধুলার গুরুত্ব অপরিসীম। তিনি এমন একটি মহতী উদ্যোগ নেওয়ার জন্য হেযবুত তওহীদের ঢাকা মহানগর কমিটির সংশ্লিষ্টদের স্বাগত জানান। তিনি বলেন, ফুটবল এমন একটি খেলা যা একজন মানুষকে একই সাথে গতিশীল, ক্ষিপ্র, সাহসী ও সুস্বাস্থ্যের অধিকারী করে তোলে, পাশাপাশি হৃদয়কেও প্রফুল্ল, উজ্জীবিত করে তোলে। জাতির অগ্রগতিতে অবদান রাখার গুণাবলি সৃষ্টিতে এ ধরনের প্রতিযোগিতা দারুন ভূমিকা পালন করে বলে তিনি অভিমত ব্যক্ত করেন। তবে তা যেন অসুস্থ প্রতিযোগিতায় পরিণত না হয়, সে ব্যাপারেও গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দেন হেযবুত তওহীদের এমাম।
উদ্বোধনী দিনে প্রথম ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হয় উত্তরা শাখা ও মিরপুর শাখার মধ্যে। খেলার প্রথমার্ধে উত্তরা শাখা এক গোলে এগিয়ে গেলেও দ্বিতীয়ার্থে সমতায় ফেরে মিরপুর শাখা। নির্ধারিত সময়শেষে ১-১ গোলের সমতায় খেলাটি শেষ হয়। দিনের দ্বিতীয় ম্যাচে অংশ নেয় মতিঝিল শাখা ও কেরানীগঞ্জ শাখা। খেলার প্রথমার্ধে দুই গোলে এগিয়ে যায় মতিঝিল শাখা। দ্বিতীয়ার্থে কোনো পক্ষে আর গোল না হলে ২-০ গোলে ম্যাচটি জিতে নেয় মতিঝিল শাখা।
অন্যদিকে ১-০ গোলে লালবাগ শাখাকে হারিয়ে দিনের তৃতীয় ম্যাচটি জিতে নেয় রামপুরা শাখা এবং ১-০ গোলে যাত্রাবাড়ি শাখাকে হারিয়ে চতুর্থ ম্যাচটি জিতে নেয় নারায়ণগঞ্জ শাখা। ম্যাচে রেফারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন বিশিষ্ট ক্রিড়াবিদ শহীদুল ইসলাম।

এক্ষেত্রে প্রথম কথা হলো, আমাদের নবীজী এসেছেন সমস্ত দুনিয়ার মানুষের জন্য। আল্লাহ বলছেন, “হে মুহাম্মদ (দ.)! ঘোষণা করে দাও, ওহে মানবজাতি! আমি তোমাদের সকলের প্রতি মহান আল্লাহর রসুল (সুরা আরাফ-১৫৮)”। কাজেই তিনি সমস্ত মানব জাতির জন্য রসুল, তিনি রহমাতাল্লিল আলামিন। সমস্ত মানুষকে সুখ-শান্তি দেওয়ার জন্য ওনার আবির্ভাব হয়েছে, আর সুখ-শান্তির প্রথম শর্ত হচ্ছে ঐক্য।
এখন সমস্ত মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করা উম্মতে মোহাম্মাদির উপর রেখে যাওয়া আল্লাহর রসুলের দায়িত্ব। এখন হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান যারা তারা শত-সহস্র বছর থেকে তারা বিভিন্ন পরিস্থিতি এবং বিভিন্ন কারণে সংঘাত-সংঘর্ষ করতে করতে আজকের এ পর্যায় এসেছে। হিন্দু দেখতে পারে না মুসলমানদেরকে, মুসলমান দেখতে পারে না হিন্দুকে। তারা একে অপরের ধর্মকে গালাগালি করে। আমাদের দেশে অনেক মানুষ আছে যারা খ্রিষ্টান শব্দটি গালি হিসাবে ব্যবহার করে। আবার পাশ্চাত্যের অনেক দেশে মুসলমানদেরকে হাজার উপায়ে নিগ্রহ করা হয়, থুথু দেওয়া হয়, মেয়েদের হেজাব টেনে খুলে দেওয়া হয়, বাসা ভাড়া দেওয়া হয় না, সামাজিক মর্যাদা থেকে বঞ্চিত করা হয়। এখন এই পৃথিবীর বাস্তবতার আলোকে আপনি সমস্ত জাতি-গোষ্ঠিীকে এক মঞ্চে, এক প্লাটফর্মে কিভাবে আনবেন? তারা তো কোর’আনকে স্বীকার করে না, নবীকে স্বীকার করে না, আপনারা তাদেরকে স্বীকার করেন না।
আমরা বলতে চাচ্ছি যে, অন্তত কয়েকটা মৌলিক বিষয়ে আমরা ঐক্যবদ্ধ হই। প্রতিটি ধর্মের মূল সত্য হচ্ছে মানবতার কল্যাণ। এটাই সকল ধর্মের শ্বাশ্বত শিক্ষা। এই শিক্ষাকে পরিত্যাগ করে কেউ ধার্মিক হতে পারবে না, সে যতই উপাসনা, পূজা, অর্চনা করুক না কেন। আমরা প্রতিটি ধর্মগ্রন্থ থেকে মিলগুলো খুঁজে নিয়ে তাদেরকে এক ঐক্যসূত্রে বাঁধতে চাই। আমরা যেন ঐক্যবদ্ধ না হতে পারি সেজন্য হাজার হাজার গ্রন্থ লেখা হয়েছে, কিন্তু আমরা বলছি, ঐক্যবদ্ধ হওয়ার জন্য একটি লাইনও যদি আমরা পাই, সেটাকে সূত্র ধরে আমাদের আজ ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। কিনউত আমরা একটি লাইন না, আমরা হাজার হাজার লাইন উপস্থাপন করছি বাইবেল থেকে, কোর’আন থেকে, বেদ থেকে, গীতা থেকে। আমরা বলেছি যে, সকল নবীই এসেছেন আল্লাহর পক্ষ থেকে, কেতাবগুলিও এসেছে আল্লাহর থেকে যদিও সেগুলো পরবর্তীতে বিকৃত করে ফেলা হয়েছে। কাজেই আপনারা এই কথাগুলো স্বীকার করেন যে; আমরা এক স্রষ্টার সৃষ্টি, এক পিতা-মাতা আদম-হাওয়ার সন্তান, আমাদের নবী-রসুলরা এক আল্লাহর থেকে আসছেন। সকলের শিক্ষাগুলো একই, সেই একই শিক্ষাটা কি? এক কথায়, মানবতার কল্যাণসাধনই স্রষ্টাকে পাওয়ার একমাত্র উপায়।
আসুন না, আমরা এক স্রষ্টার বিধানের অন্তত এই কথাটির উপর ঐক্য হই। আমরা মানুষের কল্যাণ সাধনের জন্য সকল অন্যায়ের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হই, ন্যায়ের পক্ষ অবলম্বন করি। যেটা সত্য-হক, সেটার আমরা স্বীকৃতি দেই। আমরা বলি না যে সবাইকে শেষ রসুল মোহাম্মদ (দ.) এর উপর ঈমান আনতে হবে, সবাইকে হিন্দু বা খ্রিষ্টানও বানাতে চাই না, আমরা চাই সবাই যার যার ধর্মের এই একটি শিক্ষাকে নিজেদের জীবনে প্রয়োগ করুন, তাহলেই মানবজাতি সুখে, শান্তিতে, নিরাপত্তায় সহাবস্থান করতে পারবে, তাদের মধ্য থেকে সাম্প্রদায়িক বিভেদ দূরীভূত হয়ে যাবে। তারা যার যার জায়গায় থাকুন, যেহেতু তারা ধর্ম পরিবর্তন করবেন না, এখন অন্তত শত্র“তা পরিহার করুন। যে বিষয়গুলোয় মতভেদ নাই, ঐকমত্য আছে সেগুলোতে অন্তত এক হই। এইজন্য অনেকে ভুল বোঝেন যে, আমরা নতুন ধর্ম শেখাতে চাই। না, আমরা চাচ্ছি মূলত মানবতার কল্যাণ, এজন্য মানবজাতির ঐক্য অপরিহার্য।

আমরা ঢালাওভাবে জাতিকে কাফের, মোশরেক বলছি না। আমরা বলছি জাতি কার্যত  কাফের-মোশরেক। এখানে কিন্তু আলেমরা দুটো ভাগ করেছেন, যেমন শেরকের ক্ষেত্রে বলা হয় আমলগত শেরক আর বিশ্বাসগত শেরক। আমরা বলি, জাতির যে ব্যক্তিগণ আল্লাহকে বিশ্বাস করেন, যারা অন্যান্য বাধ্যতামূলক বিষয় যেমন নবী-রসুল, কেতাব, হাশর, তকদির ইত্যাদিতে বিশ্বাস করেন তারা বিশ্বাসগতভাবে মুমিন দাবি করতে পারেন, কিন্তু তাদের আমল বা কাজকে বিবেচনায় নিলে অর্থাৎ কার্যত তারা কাফের ও মোশরেক ছাড়া কিছুই না। মক্কার কাফেররাও কিন্তু তাদের মত আল্লাহয় বিশ্বাস করতো, নামাজ, রোযা, হজ্ব, কোরবানি ইত্যাদি আমল করত, কিন্তু জাতীয় জীবনে আল্লাহর বিধান মানতো না, তাই তারা কাফের মোশরেক ছিল। একইভাবে এই জাতিটিরও আল্লাহ-রসুলের প্রতি বিশ্বাস থাকা সত্বেও, কার্যত তারা কাফের। কারণ তারা আল্লাহর সার্বভৌমত্ব ও দীনকে প্রত্যাখ্যান করে পশ্চিমা বস্তুবাদী সভ্যতার তৈরি জীবনব্যবস্থা ও মূল্যবোধকে জাতিগতভাবে বরণ করে নিয়েছে। জাতীয় জীবনে আল্লাহর হুকুম প্রত্যাখান করার কারণে এরা কাফের হয়ে গেছে। এটা আমাদের কথা না, আল্লাহর কথা এবং আল্লাহর রসুল যে কারণে আবু জাহেল, আবু লাহাবদের কাফের বলেছেন সেই একই কারণে আমরা এ জাতিকে কার্যত কাফের ও মোশরেক বলছি।

এই একটা অভিযোগ আমরা প্রায়শই শুনি। কিন্তু পাহাড় সমান মিথ্যার বিরুদ্ধে যখন কোনো সত্যকে তুলে ধরতে হয়, সেই সত্যের পক্ষে মানুষকে উজ্জীবিত করতে হয়, তখন সেই সত্যকে বারবার উত্থাপন করতে হয়, বারবার বলতে হয়, বিভিন্নভাবে নানা আঙ্গিকে উল্লেখ করতে হয়। আমরা ১৩০০ বছরের জমানো জঞ্জালকে পরিষ্কার করার উদ্যোগ নিয়েছি। গত ১৩‘শ বছর থেকে বিকৃত হতে-হতে আল্লাহর প্রকৃত ইসলাম একেবারে হারিয়ে গেছে। যে বিষয়টার গুরুত্ব নেই, সেটাকে এক নাম্বারে আনা হয়েছে, আর যেটার গুরুত্ব এক নাম্বারে সেটা গায়েব করে দেয়া হয়েছে। বহুত সুন্নত-মোস্তাহাব জাতীয় আমলকে ফরযের উপরে জায়গা দেয়া হয়েছে। কাজেই এখন প্রকৃত ইসলামের কথা বলতে গেলে মানুষ মনে করে, আমরা পুরো ইসলামের বিরুদ্ধেই কাজ করছি। আসলে কিন্তু ঘটনা তা নয়। এখন এই বিষয়টাকে বোঝানোর জন্য বারবার উল্লেখ না করে আমাদের কোনো উপায় নাই। যে মিথ্যাগুলো শিক্ষা ব্যবস্থা, প্রচার মাধ্যম, বই-পত্র, আলেম ওলামাদের ওয়াজে খোতবায় লক্ষ লক্ষবার প্রচার করা হয়েছে, যা মানুষের মনে মগজে স্থায়িভাবে গেড়ে বসেছে, সেটাকে পরিবর্তন করে সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য আমাদের ক্ষীণ কণ্ঠে একটি বিষয় হাজার হাজার বার বললেও কমই বলা হবে।
দ্বিতীয় কথা হলো, আমাদের পত্রিকাটি প্রচলিত যে মাধ্যমগুলোর দ্বারা পত্রিকা পাঠকের হাতে পৌঁছায় আমরা সেই মাধ্যম ব্যবহার করতে পারছি না। আমাদের পত্রিকা সাধারণ হকাররাও বিক্রি করেন না, কারণ তাদেরকে যে মূল্যে পত্রিকা দিতে হয়, তার বহুগুণ টাকা আমাদের খরচ করতে হয় পত্রিকা প্রকাশ করতে। অন্যান্য পত্রিকাগুলোর প্রধান আয়ের উৎস বিজ্ঞাপন যা আমরা বলতে গেলেই একেবারেই পাই না। এসমস্ত কারণে আমাদের পত্রিকা আমাদের নিজেদের লোকেরাই অর্থাৎ হেযবুত তওহীদের সদস্য-সদস্যারাই হকারি করে বিক্রি করে থাকেন। এজন্য আজ যে এলাকায় পত্রিকা যাচ্ছে, পরদিন হয়তো সেই এলাকায় পত্রিকা যাচ্ছে না। প্রতিদিন নতুন নতুন মানুষের হাতে আমাদের পত্রিকা পড়ছে। কাজেই একই আর্টিকেল বা বিষয়বস্তু একজনে পেলেন আরেকজনে পেলেন না। এজন্য আমাদেরকে বারবার দিতে হচ্ছে। আর বক্তব্যের পুনরাবৃত্তির কথা যদি বলেন তাহলে আল্লাহর পবিত্র কোর’আন সম্পর্কেও এই অভিযোগ আছে। এটা গুরুত্বের উপর নির্ভর করে। কাজেই বারবার দেয়াটা দোষের কিছু না।