হতাশার অন্ধকারে আলোর রেখা হেযবুত তওহীদ | হেযবুত তওহীদ

হতাশার অন্ধকারে আলোর রেখা হেযবুত তওহীদ

হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম
[গত বৃহস্পতিবার বরিশাল নগরীর প্রাণকেন্দ্রের ‘অশ্বিনী কুমার টাউন হল’ এ অনুষ্ঠিত হয় হেযবুত তওহীদের সম্মেলন। সেখানে প্রধান অতিথি হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দান করেন হেযবুত তওহীদের এমাম হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম। তাঁর ভাষণের সারসংক্ষেপ পাঠকদের জন্য এখানে তুলে ধরা হলো।]
‘সম্মানীত উপস্থিতি, আপনাদের জানার কথা সমগ্র মুসলিম জাতির জীবনে কী ভয়াবহ দুর্ভোগ নেমে এসেছে। এই জাতিকে ধ্বংস করে দেওয়ার জন্য সর্বদিক দিয়ে আক্রমণ চালানো হচ্ছে। মুসলিমপ্রধান দেশগুলোয় হামলা চালানো হচ্ছে, নির্বিচারে নারী-পুরুষ শিশু-কিশোর সবাইকে হত্যা করা হচ্ছে। আমাদের প্রিয় মাতৃভূমিও এই ষড়যন্ত্রের বাইরে নেই। একাত্তরে নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ করে আমরা এ দেশটি অর্জন করেছিলাম। আমরা স্বপ্ন দেখেছিলাম ঐক্যবদ্ধ ও শক্তিশালী একটি জাতিসত্ত্বার। কিন্তু স্বাধীনতা অর্জিত হলেও কাঙ্ক্ষিত ঐক্য আমরা প্রতিষ্ঠা করতে পারিনি। ফলে শক্তিশালী জাতিসত্ত্বাও গঠিত হয়নি। আমাদের মধ্যে রাজনৈতিক বিভক্তি, ধর্মীয় বিভক্তি, ফেরকাগত বিভক্তি ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। আর সেই সাথে আমরা দিনকে দিন দুর্বল হয়ে পড়ছি। এমতাবস্থায় আমাদের এই বাংলাদেশকে নিয়ে যে ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে তা ভয়াবহ। এই ষড়যন্ত্র যদি সফল হয় তাহলে কিছুই থাকবে না। আমাদের সেই দশা হবে যেটা ইরাক-সিরিয়া-আফগানিস্তান-লিবিয়া-ইয়েমেনের হয়েছে। এই সঙ্কট উপলব্ধি করেই আমরা হেযবুত তওহীদ বেরিয়ে পড়েছি। রাজধানী থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে ছুটে চলেছি। সকল শ্রেণি-পেশা-দল-মতের মানুষের সামনে তুলে ধরছি আসন্ন সঙ্কট ও একমাত্র মুক্তির পথ। আমরা সেই আদর্শ তুলে ধরছি যেটা ধারণ করে ১৬ কোটি মানুষ ঐক্যবদ্ধ হতে পারে।
আল্লাহ-রসুলের প্রকৃত ইসলামের একটাই রূপ ছিল। সবার আকিদা ছিল একরকম। কিন্তু আমাদের মধ্যে ভিন্ন চিত্র। নানা ধাঁচের ইসলাম। যেমন, রাজনৈতিক ইসলামে বিশ্বাসী দল আছে হাজার হাজার। তারা পাশ্চাত্যের তৈরি প্রক্রিয়ায় নির্বাচন করে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করতে চায়। একই দেশে বহু দল আছে, তাদের ভিন্ন ভিন্ন মার্কা। সবাই ধর্মবিশ্বাসী জনগণকে বোঝায়- ‘আমাকে ভোট দাও, জান্নাতে যাবে।’ প্রশ্ন হচ্ছে- কোন মার্কায় ভোট দিলে মানুষ জান্নাতে যাবে? আম গাছ মার্কাও মুসলমান দাবি করে, জামগাছ মার্কাও মুসলমান দাবি করে, তালগাছ মার্কাও মুসলমান দাবি করে। সরকারের লোকেও নামাজ পড়ে, বিরোধী দলের লোকেও নামাজ পড়ে কিন্তু একে অপরের সাথে রক্তারক্তির সম্পর্ক! একদল ক্ষমতায় গেলে অন্যরা জ্বালাও পোড়াও শুরু করে। পুলিশ বাধা দিতে গেলে পুলিশকেই কাফের আখ্যা দিয়ে হামলা করা হয়, মাথা থেঁতলে দেওয়া হয়। আবার পুলিশের গুলিতেও হামলাকারী নিহত হলে বলা হয় সে ‘শহীদ’ হয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে- এখানে মো’মেন কে? সবাই তো নিজেদেরকে মুসলমান দাবি করছে, মো’মেন দাবি করছে।
আবার সুফিবাদী ইসলামের দিকে দেখুন- পীরের কোনো অভাব নাই। প্রতিটি পীরের লক্ষ লক্ষ মুরিদ। কিন্তু এক পীরের সাথে অন্য পীরের শত্রুতা। এক পীরের মুরিদ হামলা করে অন্য পীরের মুরিদ হত্যা করে। সবাই বলে- আমাকে টাকা দাও, বাইয়াত নাও, আমি জান্নাতের সুপারিশকারী হব। তাহলে কার হাতে বাইয়াত নিলে জান্নাত মিলবে?
আরও আছে উগ্রপন্থী ইসলাম। চরমপন্থীদের কথা হচ্ছে, অন্য কোনো পথে হবে না বোমা মেরে ইসলাম কায়েম করতে হবে। যারা আমার সাথে একমত হবে না তাদেরকে কতল করে ফেলতে হবে! তারা কোর’আন থেকে যুদ্ধের আয়াতগুলো আংশিকভাবে তুলে আনে, যুদ্ধের হাদিস তুলে আনে, তারপর সেগুলোকে সুযোগ-সুবিধামত ব্যবহার করে মানুষকে চাপাতিবাজি ও বোমাবাজির পথে চালিত করে। এদের মধ্যেও হাজার হাজার ভাগ, একভাগের সাথে আরেকটার আকিদা মেলে না। এক সিরিয়াতেই ২০/২৫টার বেশি জঙ্গিবাদী দল সক্রিয় আছে! আমাদের দেশেও বহু জঙ্গিবাদী দল আছে, একটা আরেকটাকে দেখতে পারে না। একদল অপরদলকে কাফের আখ্যা দিয়ে হত্যা করতেও দ্বিধা করে না। এই ছাড়াও মাদ্রাসাকেন্দ্রিক, মসজিদকেন্দ্রিক বহু দল-উপদল আছে। আবার এসবের বাইরে বৃহত্তর একটি জনসাধারণ বলে, ধুর! এইসব কোনো দল-টলই সহিহ নয়। তার চাইতে ব্যক্তিগতভাবে নামাজ পড়ব, রোজা রাখব, সত্য কথা বলব, সৎ জীবনযাবন করব- ব্যস! জান্নাতে চলে যাব।
তাহলে এই যে এত পথ, এত মত, এত প্রক্রিয়া, এত তরিকা, এত আকিদা, এত জান্নাতে যাওয়ার রাস্তা- এর মধ্যে কোনটা ঠিক? আপনারা একটি প্রশ্নের জবাব দিবেন আমাকে। আমি জানতে চাই- জান্নাতের পথ কি হাজার হাজার হতে পারে? জান্নাতে যাবার পথ একটাই, সেটা হচ্ছে হেদায়াহ, সেরাতুল মোস্তাকীম, সহজ-সরল পথ। কিন্তু আজ আমাদের সামনে হাজার হাজার পথ, হাজার হাজার তরিকা, হাজার হাজার কর্মসূচি, হাজার হাজার ফেরকা, দল-উপদল। এক হাদিসে আল্লাহর রসুল বলেছেন, ‘ইহুদি জাতি বাহাত্তর ভাগে বিভক্ত হয়েছিল, আমার উম্মত তিহাত্তর ভাগে বিভক্ত হবে। তার মধ্যে মাত্র একটি ভাগ হবে জান্নাতি, বাকি সমস্ত হবে জাহান্নামি। তাহলে এই যে চারদিকে আমরা হাজার হাজার মত-পথ দেখছি, সেগুলো কি মানুষকে জান্নাতে নিবে? কখনই নয়। এইগুলো হচ্ছে রসুল বর্ণিত সেই বাহাত্তর ফেরকা।
এখন এই খণ্ড-বিখণ্ড জাতিকে কীভাবে ঐক্যবদ্ধ করবেন? ঐক্যবদ্ধ না হলে তো ইহকালেই তারা গজবের মুখে পড়ে ধ্বংস হয়ে যাবে। কে ওদেরকে বলবে- ‘ভাই শিয়া, ভাই সুন্নি, ভাই হানাফি, ভাই হাম্বলি, ভাই সরকারি, ভাই বিরোধী, ভাই অমুক মার্কা তমুক মার্কা, ভাই কওমী, ভাই আলীয়া- তোমরা যেই ফেরকারই হও, এক আল্লাহই বিশ্বাসী তো? এক রসুলের উম্মত তো? এক কিতাবের অনুসারী তো? তাহলে এসো- আমরা সবাই মিলে ঐক্যবদ্ধ হই একটি কথার ভিত্তিতে- ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, আল্লাহর হুকুম ছাড়া কারো হুকুম মানব না।’ আল্লাহর হুকুম মানে কী? যাবতীয় ন্যায় ও সত্যই হচ্ছে আল্লাহর হুকুম।
ইবরাহীম (আ.) মানুষকে তওহীদে ঐক্যবদ্ধ করে একজাতি বানিয়েছিলেন। কালক্রমে মানুষ অনৈক্য করে বিভিন্ন গোত্রে, সম্প্রদায়ে বিভক্ত হয়ে পড়ল। একে অপরের সাথে যুদ্ধ-রক্তপাতে নিমজ্জিত হলো। দ্বীনকে বিকৃত ফেলল। এমনকি তওহীদ থেকেই সবাই বহির্গত হয়ে গেল। তখন আল্লাহ সমস্ত মানুষকে তওহীদে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য আখেরী নবীকে পাঠালেন। আল্লাহর শেষ রসুল মোহাম্মদ (সা.) এসে মানুষকে পুনরায় তওহীদে ঐক্যবদ্ধ করলেন। কিন্তু আজ পুনরায় আমরা তওহীদ থেকে সরে গেছি, বিভন্ন দল-মত-ফেরকা-মাজহাব-তরিকায় বিভক্ত হয়ে গেছি। এমতাবস্থায় সবাইকে তওহীদে ঐক্যবদ্ধ করার জন্যই হেযবুত তওহীদ কাজ করে যাচ্ছে। চারদিকে আজ হতাশার ঘুটঘুটে অন্ধকার, আর এরই মাঝে হেযবুত তওহীদ এক খণ্ড আলোর রেখা। একমাত্র শেষ সম্বল। হেযবুত তওহীদের আহ্বান প্রত্যাখ্যান করে জাতি যদি আত্মঘাতী ফেরকাবাজী ও কোন্দল করতেই থাকে তাহলে মহাধ্বংস তাদেরকে গ্রাস করবে। ইহুদিদের মতই এই জাতির জীবনেও নেমে আসবে পোগরোম। এই কথা আমি কীভাবে বলছি? বলছি ঘটনাপরম্পরা দেখে। অতীত ইতিহাস ও বর্তমানের প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে।
সম্মানীত উপস্থিতি, আমরা হেযবুত তওহীদ টাকা-পয়সা চাই না। ভোটের রাজনীতিও করি না। আমাদের কোনো স্বার্থ নেই। আমরা এই জাতিকে বাঁচানোর জন্যই নিজেদের সর্বস্ব উৎসর্গ করে সচেতন করে চলেছি। কিন্তু এক শ্রেণির ধর্মব্যবসায়ী আমাদের পদে পদে কাঁটা বিছিয়ে রাখতে ব্যস্ত। এই ধর্মব্যবসায়ীরা সাধারণ ধর্মভীরু মানুষের ঈমানকে হাইজ্যাক করে জাতির ক্ষতি সাধন করে। নিজেদের স্বার্থের জন্য হীন চক্রান্ত করে। আমাদের বিরুদ্ধে তারাই নানাধরনের মিথ্যাচার চালু করে দিয়েছে, যাচাই করে দেখুন, কারো কথা অন্ধভাবে বিশ্বাস করবেন না। অতীতে তারা মানুষের ঈমানকে ব্যবহার করে ধর্মোন্মাদনা সৃষ্টি করে দেশের প্রভূত ক্ষতিসাধন করেছে এটা আপনারা জানেন। তাদের একমাত্র হাতিয়ার হলো ‘পাবলিক সেন্টিমেন্ট’। এই পাবলিক সেন্টিমেন্ট এক ভয়ংকর দানব। একে বোতলে ঢুকিয়ে রাখা হয়েছে। পুষে রাখা হয়েছে। এর ফল হবে ভয়ংকর।
আল্লাহর রসুল মক্কা বিজয়ের পর বেলাল (রা.)কে ক্বাবার ছাদে উঠালেন, যেই বেলালকে কোরাইশরা মানুষ মনে করত না। তিনি প্রমাণ করে দিলেন- সবার ঊর্ধ্বে মানুষ, সবার ঊর্ধ্বে মানবতা। আল্লাহর কাছে একজন মো’মেনের সম্মান তাঁর কাবারও ঊর্ধ্বে। আল্লাহর রসুল কি ভাবলেন না- কোরাইশরা এই বিষয়কে কীভাবে নেবে? ভেবেছেন, কিন্তু তিনি অনর্থক ধর্মীয় সেন্টিমেন্টের তোয়াক্কা করলেন না। তিনি কারো তোয়াজ করেননি। যখন মিথ্যার মস্তকে আঘাত করেছেন, তখন একেবারে চ‚র্ণবিচূর্ণ করে ফেলেছেন, কারো মান মর্যাদার দিকে তাকাননি, কারো প্রভাব-প্রতিপত্তির তোয়াক্কা করেননি। এই নীতি সবাইকে উপলব্ধি করতে হবে যারা আজকে আমাদের চিন্তাশীল আছেন বা যারা সত্যি সত্যি আল্লাহ রসুলকে ভালোবাসেন এবং ইসলামের কল্যাণ চান। যারা চান যে মানুষ বুঝুক, মানুষ জানুক, মানুষের সামনে সত্য-মিথ্যা পরিষ্কার হয়ে যাক, তাদেরকে অন্তত এটুকু দুঃসাহসিক ভূমিকা রাখতেই হবে যে, সমাজে চলমান ধর্মের নামে সমস্ত অধর্ম, যত বড়ই হোক এটার বিরুদ্ধে কথা বলতে হবে। ভয় পাওয়া চলবে না।
আজকে ভুয়া ধর্মীয় সেন্টিমেন্ট তৈরি করে দিয়ে যা ইচ্ছা করা হচ্ছে। একেক হুজুরের লক্ষ লক্ষ অনুসারী। ভয়ে কেউ কোনো কথা বলতে পারে না। ডিসি, এসপি, এমপি, মন্ত্রী পর্যন্ত তোয়াজ করে চলে। পাছে কোনো ফতোয়া দিয়ে দেয়, কোনো দাঙ্গা-হাঙ্গামা লেগে যায়। এখানে ন্যায়-অন্যায়ের কোনো বিষয় নেই, সত্যের বদলে শক্তির পূজা করা হয়। অথচ ইসলামের নীতি হচ্ছে- ন্যায়সঙ্গত কথা বলবান বললেও শিরোধার্য করতে হবে, শক্তিহীন অন্ধ খোঁড়া বললেও তার কথা শিরোধার্য করতে হবে। নইলে সমাজ বাঁচবে না, ধর্মও বাঁচবে না। কোনো মিথ্যা সেন্টিমেন্টকে প্রশ্রয় দেওয়ার সুযোগ নেই। এগুলো দানব, বোতলে ভরা দানব। যেকোনো সময় মুখটা খুলে গেলেই সমাজ, দেশ, মানুষকে ধ্বংস করে দিতে পারে। এই দানবকে বিনাশ করতে হবে, শেষ করতে হবে।
আল্লাহর রসুল বহু ধরনের কুসংস্কারকে ভেঙেছেন। সমাজে প্রচলিত মিথ্যা প্রথা, রীতি, রেওয়াজ, কুসংস্কার তিনি ভেঙে দিয়েছেন। তিনি সত্যকে উদ্ভাসিত করেছেন। আজ সময় এসেছে আমাদের সমাজে প্রচলিত যাবতীয় কুসংস্কার ও অনর্থক কর্মকাণ্ডের শৃঙ্খল ভেঙে প্রকৃত ধর্মকে মুক্তি দেওয়ার। তা করতে না পারলে এই সমাজ থেকে জঙ্গিবাদও বিনাশ হবে না, দাঙ্গাও দূর হবে না, ধর্মব্যবসাও দূর হবে না।
রমরমা ধর্মব্যবসা চলছে, চোখ মেললেই দেখতে পাবেন। একেক জায়গায় একেক রকম ব্যবসা। সারারাত ওয়াজ করে এক বান্ডিল টাকা নিয়ে চলে যাচ্ছেন ওয়াজকারী। বক্তা ভাড়া করতে হয় চুক্তির মাধ্যমে, সে চুক্তি নিয়ে মারামারিও হয়। এছাড়া মসজিদের ইমাম নিয়ে মারামারি, মসজিদ কমিটি নিয়ে মারামারি, ওয়াজ মাহফিল নিয়ে মারামারি, নামাজ নিয়ে মারামারি, এমনকি খুন হয়েছে মানুষ। ধর্মের অনাবিল, সঠিক চেহারাটা, সঠিক রূপটা নাই কোথাও। এখন সত্যের পূজারী নাই। শক্তির পূজারী। এখানে সত্যের কোনো মূল্য নাই, এখানে মিথ্যার প্রভাব। আমরা শুনেছি, আমাদের এমামুয্যামান বলেছেন যে, রয়েল বেঙ্গল টাইগারের কারণে পৃথিবীর অন্যতম বিপদজনক বন হচ্ছে সুন্দরবন। আমার কাছে মনে হয় শুধু ধর্মান্ধতার কারণে পৃথিবীর অন্যতম বিপদজনক দেশ হচ্ছে বাংলাদেশ। ইরাক, সিরিয়া সে সমস্ত পরিস্থিতিতে যে সমস্ত কারণে আজকের মত ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়েছে, এই পরিস্থিতি এই প্রেক্ষাপট আমাদের দেশে বহু আগেই তৈরি হয়ে আছে। তারপরও আমাদের দেশে ওইরকম হয় নাই সেটাই আমাদের সৌভাগ্য। তবে এই সৌভাগ্য খুব বেশিদিন থাকবে না যদি সচেতন না হই।
আমাকে তো ফেসবুকে প্রতিনিয়ত হত্যার হুমকি দিয়ে যাচ্ছে ধর্মব্যবসায়ীরা। আমাকে হত্যা করবে কারণ আমি নারী-পুরুষকে নিয়ে একসাথে মিটিং করি। তারা কি ইতিহাস পড়ে দেখেন না? রসুলাল্লাহর (সা.) আবির্ভাবের আগে মেয়েদের কোন সম্মান ছিল না। তারা যে মানুষ, তাদের দ্বারা যে সৃষ্টিশীল কিছু হতে পারে, তাদের দ্বারা জাতীয়, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামরিক ক্ষেত্রে উন্নয়নমূলক কিছু হতে পারে এ ধারণাই তাদের ছিল না। তাদের ভিতরে যে প্রতিভা আছে এ স্বীকৃতিই ছিল না। তাই তখন নারীদেরকে অনর্থক পরগাছা মনে করে জীবন্ত কবর দেওয়া হত। রসুলাল্লাহ (সা.) সেই জাহেলিয়াত দেখে খুবই মর্মাহত হলেন, ব্যথিত হলেন। তিনি বিয়ে করলেন আম্মা খাদিজাকে (রা.), যিনি ছিলেন তৎকালীন সময়ের অনেক বড় একজন ব্যবসায়ী। আপনারা খেয়াল করুন- আল্লাহর রসুলের সাংসারিক জীবন শুরু হলো কার সাথে? কোনো অন্তপুরবাসিনীর সাথে নয়, একজন ব্যবসায়ী নারীর সাথে। আম্মা খাদিজা শুধু ব্যবসায়ীই ছিলেন না, তিনি রাজনৈতিক প্রভাবশালী নারীও ছিলেন। উনার পরিবার এবং উনার নিজেরই অনেক প্রভাব ছিল। আল্লাহর রসুল কোথাও গেলে আম্মা খাদিজাকে (রা.) সাথে নিয়ে যেতেন। এমনকি নব্যুয়তের প্রাথমিক পর্যায়ে ক্বাবায় যখন সালাহ কায়েম করতেন তখনও আম্মা খাদিজা (রা.) পাশে থাকতেন। রসুল (সা.) প্রথম আম্মা খাদিজাকে (রা.) দিয়েই এই অন্ধত্বের প্রাচীর ভাঙ্গা শুরু করলেন। স্বামী-স্ত্রী যে একসাথে কাজ করা যায় তিনি আগে এটার প্রমাণ দিলেন। এই শুরু হল। তারপর তওহীদের ভিত্তিতে তিনি যেই জাতিটি গঠন করলেন সেই জাতির নারীদেরকে তিনি প্রথমেই শালীনতার চাদর পরিয়ে দিলেন। তারপর তিনি কী করলেন? তিনি কি মেয়েদেরকে বলেছেন, মেয়েরা তোমরা ঘর থেকে বের হবা না, পরপুরুষ দেখলে ঈমান চলে যাবে, এই কথা বলেছেন? মেয়েদেরকে বাক্সবন্দী করেছেন? না, তিনি তা করেননি। তিনি পুরুষদের সাথেই নারীদেরকে সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রত্যেকটি অঙ্গনে অংশগ্রহণের সুযোগ করে দিলেন। পাঁচ ওয়াক্ত সালাতে মেয়েরা মসজিদে যেত। পুরুষদের সাথে এক জামাতে সালাহ কায়েম করত। জুমআ’র সালাতে, ঈদের সালাতে তাদের উপস্থিতি ছিল বাধ্যতামূলক। তাদেরকে তলোয়ার, তীর-ধনুক, বল্লম চালানো শিখালেন। আপনারা জানেন পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে দুধর্ষ ঘোড়া হলো আরবের ঘোড়া। সেই আরবের ঘোড়ায় আমাদের মত ছেলেরা উঠতে পারবে কিনা সন্দেহ আছে। ওই জাতির নারীরা লাফ দিয়ে ধাবমান ঘোড়ার পিঠে উঠে যুদ্ধের ময়দানে ছুটে চলল পুরুষদের সাথেই। আমরা ইতিহাসে কী পাই? প্রত্যেকটি যুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন নারীরা। যেখানে পুরুষরা পালিয়ে গেছেন, মেয়েরা দাড়িয়ে ছিল। রসুল (সা.) চলে যাওয়ার পর মহাবীর খালিদ ইবনে ওয়ালীদ (রা.) এর নেতৃত্বেও মেয়েরা রোমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে গেছেন। যেখানে পুরুষ যোদ্ধাদের বন্দী করে নিয়ে গেছে সেখানে সেই বন্দী যোদ্ধাদের মুক্ত করে এনেছেন নারী যোদ্ধারা। সেই নারীদেরকে আবার পিছনের দিকে টানতে টানতে আজ ২০১৮ সালে মেয়েরা এখন বাক্সবন্দী। আল্লাহ-রসুলের প্রকৃত ইসলাম যেমন নেই, আল্লাহ-রসুল যেভাবে নারী-পুরুষের সমান অংশগ্রহণে একটি শক্তিশালী জাতি গঠন করেছিলেন সেই জাতিও নেই। এরই মধ্যে ঘটে গেছে আরেকটি ঘটনা। ইউরোপের বস্তুবাদী, অশ্লীল সভ্যতা দুনিয়াকে দখল করেছে। তারা নারীদেরকে বলেছে, তোমাদেরকে আমরা স্বাধীনতা দিব। তোমাদের ধর্ম খারাপ। কারণ তোমাদের ধর্ম ফতোয়াবাজী করে তোমাদেরকে ঘরবন্দী করে রেখেছে। তোমাদের প্রতিভা থাকা সত্তে¡ও তোমাদের ধর্মের কারণে তোমরা কোথাও অংশগ্রহণ করতে পারছ না। এইভাবে পশ্চিমারা সম্পূর্ণ দোষটা চাপিয়ে দিল ধর্মের উপর। তারপর যুক্তিশীল নারীরা দেখল যে তারা আসলেই অনেক কিছু করতে পারে। পুরুষরা পারলে তারা কেন পারবে না? তাদেরও জ্ঞান আছে, বুদ্ধি আছে, সাহস আছে। তারা দুনিয়াকে দেখার জন্য পশ্চিমাদের পিছু ছুটল। পশ্চিমারা তাদেরকে ঠেলে দিল অশ্লীলতা আর ধর্মহীনতার দিকে, শুরু হলো আরেক প্রতারণা। এভাবে একদিকে ধর্মের নামে নিষ্পেষণ, আরেকদিকে ধর্মহীনতার প্রতারণা- আর কতদিন নারীরা এই দুর্ভোগের শিকার হতে থাকবে? আল্লাহর অশেষ কৃপায় হেযবুত তওহীদ তাদের মুক্তির বার্তা নিয়ে হাজির হয়েছে। আমাদের নারীরা জাতির সঙ্কটকালে পুরুষদের মতই স্বীয় দায়িত্ব পালনে এগিয়ে এসেছে। এটাই ইসলাম, আল্লাহ-রসুলের প্রকৃত ইসলাম।’
সম্পাদনা: মোহাম্মদ আসাদ আলী।

Search Here

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ

ধর্মবিশ্বাসে জোর জবরদস্তি চলে না

April 15, 2019

মোহাম্মদ আসাদ আলী ইসলামের বিরুদ্ধে বহুল উত্থাপিত একটি অভিযোগ হচ্ছে- ‘ইসলাম বিকশিত হয়েছে তলোয়ারের জোরে’। পশ্চিমা ইসলামবিদ্বেষী মিডিয়া, লেখক, সাহিত্যিক এবং তাদের দ্বারা প্রভাবিত ও পশ্চিমা শিক্ষায় শিক্ষিত গোষ্ঠী এই অভিযোগটিকে সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার প্রচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে। তাদের প্রচারণায় অনেকে বিভ্রান্তও হচ্ছে, ফলে স্বাভাবিকভাবেই ইসলামের প্রতি অনেকের নেতিবাচক ধারণা সৃষ্টি হচ্ছে। কিন্তু আসলেই কি […]

আরও→

সময়ের দুয়ারে কড়া নাড়ছে নতুন রেনেসাঁ

April 14, 2019

হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম অন্যায়ের দুর্গ যতই মজবুত হোক সত্যের আঘাতে তার পতন অবশ্যম্ভাবী। আল্লাহ ইব্রাহিম (আ.) কে দিয়ে মহাশক্তিধর বাদশাহ নমরুদের জুলুমবাজির শাসনব্যবস্থার পতন ঘটালেন। সেটা ছিল প্রাচীন ব্যবিলনীয় সভ্যতা যার নিদর্শন আজও হারিয়ে যায়নি। তৎকালে সেটাই ছিল বিশ্বের শীর্ষ সভ্যতা। তারা অহঙ্কারে এতটাই স্ফীত হয়েছিল যে উঁচু মিনার তৈরি করে তারা আল্লাহর আরশ দেখতে […]

আরও→

Categories