বনি কুরাইজা: হত্যাকাণ্ড নাকি রাষ্ট্রদ্রোহীর দণ্ড? (শেষ পর্ব) | হেযবুত তওহীদ

বনি কুরাইজা: হত্যাকাণ্ড নাকি রাষ্ট্রদ্রোহীর দণ্ড? (শেষ পর্ব)

মোহাম্মদ আসাদ আলী

(পূর্ব প্রকাশের পর) বনি কুরাইজা গোত্রের এই যে রাষ্ট্রদ্রোহী চক্রান্ত, এর ভয়াবহতা কতখানি তা বুঝতে হবে। যেই মুহূর্তে প্রত্যেক গোত্র প্রশ্নহীন শর্তহীনভাবে রাষ্ট্রের প্রতি অনুগত থেকে রাষ্ট্রপ্রধানের হাতকে শক্তিশালী করার কথা, সেই মুহূর্তে তারা চুক্তিপত্র ছিঁড়ে ফেলে শত্রুসেনার সাথে হাত মিলিয়ে যে পরিস্থিতির সূচনা করেছিল- তার পরিণতি কী হতে পারত? সম্মিলিত আক্রমণ প্রতিরোধ না করতে পেরে নিঃসন্দেহে হাজার হাজার নিরাপরাধ মানুষ মৃত্যুবরণ করত, যার মধ্যে নারী-শিশুও থাকত। আর তেমনটা হলে আজকে যারা তিনশ’ জন ইহুদি হত্যা নিয়ে অশ্রুবর্ষণ করেন, হাজার হাজার মুসলিম হত্যার ঘটনায় এক লাইন লেখারও প্রয়োজন বোধ করতেন না। পাঠকদের নিশ্চয়ই অজানা নয় ইহুদিরা অন্তত দুই হাজার বছর ধরে ইউরোপের নানা দেশে নির্যাতিত হয়েছে, গণহত্যার শিকার হয়েছে। খ্রিষ্টানরা সংঘবদ্ধভাবে ইহুদিদের বাড়িঘরে আক্রমণ করে তাদের গণহত্যা করেছে, মেয়েদের ধর্ষণ করেছে, অবাধ লুটপাট চালিয়েছে, যেই হত্যালীলা বোঝাতে ইংরেজিতে একটি শব্দেরই জন্ম হয় ‘পোগরোম’। পোগরোমের সর্বশেষ সংস্করণ হিসেবে একজন খ্রিষ্টান রাষ্ট্রপ্রধান হিটলার ষাট লক্ষ ইহুদিকে নৃশংসভাবে হত্যা করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়। এই যে খ্রিষ্টানদের হাতে নিহত লক্ষ লক্ষ ইহুদি, কোনো এক রহস্যময় কারণে এদের জন্য ইসলামবিদ্বেষী লেখকদের কোনো মমতাবোধ জাগ্রত হয় না। এদের যারা হত্যা করল তাদের বিরুদ্ধে কলমের ডগায় প্রতিবাদের ফোয়ারা সৃষ্টি হয় না। তাদের দুঃখ কেবল ওই তিনশ’ জন ইহুদির জন্য যারা রাষ্ট্রদ্রোহী ষড়যন্ত্র ও যুদ্ধে পরাজিত হয়ে মৃতুদণ্ড ভোগ করে। এতেই বোঝা যায় মানবতার আড়ালে তাদের আসল উদ্দেশ্য ভিন্ন। সেটা হলো আল্লাহর রসুলের বিরুদ্ধে অপপ্রচার। নিহত ইহুদির সংখ্যা যদি লক্ষাধিকও হয়, কিন্তু হত্যাকারী অন্য কেউ হয় তাহলে তাদের আপত্তি নেই।

আমার প্রশ্ন হচ্ছে, আজকের দুনিয়াতেও ওই ধরনের অপরাধের কী শাস্তি দেওয়া হয়? কোনো রাষ্ট্রপ্রধানই বিশ্বাসঘাতকদের ক্ষমা করেন না। আমাদের দেশে ছিচল্লিশ বছর পরেও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করে ফাঁসিতে ঝোলানো হচ্ছে। সেই সাথে এ বিচার যুদ্ধের পরপরই হওয়া উচিত ছিল বলে আফসোস করা হচ্ছে। আল্লাহর রসুল যাদেরকে অতীতে একবার ক্ষমা করেছেন, আবার ক্ষমা করবেন কি নতুন কোনো ষড়যন্ত্রের সুযোগ করে দেবার জন্য? অতীতে ক্ষমা করা হয়েছে বলেই রাষ্ট্রদ্রোহী চক্রান্তকে মামুলি বিষয় মনে করা হয়েছে, ধরেই নেওয়া হয়েছে যদি চক্রান্ত ভেস্তেও যায় প্রাণদণ্ড হবে না, বড়জোর নির্বাসিত করা হবে। এভাবে বারবার ক্ষমা পেতে থাকলে কোনো গোত্রই রসুলাল্লাহর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করতে দুশ্চিন্তাবোধ করত না। অথচ খন্দকের যুদ্ধে আল্লাহর পক্ষ থেকে অলৌকিক সাহায্য না পেলে ঘটনা ঘটত উল্টো। সম্মিলিত আক্রমণ প্রতিরোধে মুসলিম সৈন্যবাহিনী ব্যর্থ হত, আর ওইদিনই দুনিয়া থেকে ইসলামের নাম-গন্ধ মুছে যেত। আল্লাহর রসুল অবর্ণনীয় দুঃখ কষ্ট, দারিদ্র্য, অপমান, নির্যাতন আর লাঞ্ছনার বিনিময়ে একটি জাতি গঠনের পর সেই জাতিকে চোখের সামনে ধ্বংস হতে দেখতেন।

একটি জাতি তিনি গঠন করতে চেয়েছেন। তার জন্য নিজের গোত্রের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করেছেন, তাঁর অনুসারীরা নিজেদের বাপ-ভাইদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন, বদরে ওহুদে কত সাহাবী হাসতে হাসতে প্রাণত্যাগ করেছে! এত কোরবানির বিনিময়ে জাতি গঠিত হবার পর কোনো নেতাই ওই জাতির অস্তিত্বের প্রশ্নে যাকে হুমকি মনে করবেন তার সাথে আপস করবেন না। তিনি আল্লাহর সত্যনবী, তিনি কেবল মানুষকে শান্তি ও সুবিচারের গালভরা বাণী মুখস্থ করাতে আসেননি, তিনি শান্তি ও সুবিচার কায়েম করতে এসেছিলেন। সাধুদের পরিত্রাণ আর দুষ্কৃতিকারীদের বিনাশ করতেই তার আগমন।

আল্লাহর রসুল বনি কুরাইজা গোত্রের সবার প্রাণদণ্ড কার্যকর করেননি, তবে যোদ্ধাদের মধ্যে অনেককে প্রাণ হারাতে হয়েছিল। সেই সংখ্যা নিয়েও মতভেদ আছে। সিরাতে যদিও ৭০০’র কথা বলা হয়েছে, হাদিসে তিনশ’র কথাও আছে। তবে এ নিয়ে সন্দেহ নেই যে, যদি রসুলাল্লাহ আবারও উদারতা দেখিয়ে ক্ষমা করে দিতেন বা পুরো গোত্রকে অন্য কোথাও চলে যাবার সুযোগ করে দিতেন তারা ঠিকই অন্যান্য ইহুদিদের জোটবদ্ধ করে আবারও মদীনাকে ধ্বংস করতে ফিরে আসত। এই কারণেই বিশ্বাসঘাতকদের সহজে ছেড়ে দেওয়ার সুযোগ ছিল না, কিন্তু যদি কেউ ভেবে থাকেন ওরা নিছক অন্য ধর্মের হবার কারণেই বিদ্বেষপ্রসূত শাস্তি দেওয়া হয়েছে, তাহলে সেটা ইতিহাসের প্রতি অন্যায় করা হবে। খন্দকের যুদ্ধের আগেও মুসলমানরা যুদ্ধবিজয় করেছে, পরেও বহু যুদ্ধ বিজয় করেছে, কয়টা গোত্রের পুরুষ যোদ্ধাকে হত্যা করেছে? মক্কা বিজয়ের পর রসুলাল্লাহ যে ক্ষমার ঘোষণা দিবেন তা মক্কাবাসীও কি কল্পনা করতে পেরেছিল? পারেনি। ক্ষমার এমন নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন যে মহামানব তিনি তিনশ’ জন ইহুদির প্রতি রাগ সংবরণ করতে পারলেন না- তা বিশ্বাসযোগ্য নয়। তিনি এত বড় শাস্তি হতে দিলেন কারণ এই শাস্তি অনিবার্য হয়ে উঠেছিল। এ ছাড়া অন্য কোনো উপায় তাঁর সামনে ছিল না। (সমাপ্ত)

Search Here

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ

ধর্মবিশ্বাসে জোর জবরদস্তি চলে না

April 15, 2019

মোহাম্মদ আসাদ আলী ইসলামের বিরুদ্ধে বহুল উত্থাপিত একটি অভিযোগ হচ্ছে- ‘ইসলাম বিকশিত হয়েছে তলোয়ারের জোরে’। পশ্চিমা ইসলামবিদ্বেষী মিডিয়া, লেখক, সাহিত্যিক এবং তাদের দ্বারা প্রভাবিত ও পশ্চিমা শিক্ষায় শিক্ষিত গোষ্ঠী এই অভিযোগটিকে সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার প্রচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে। তাদের প্রচারণায় অনেকে বিভ্রান্তও হচ্ছে, ফলে স্বাভাবিকভাবেই ইসলামের প্রতি অনেকের নেতিবাচক ধারণা সৃষ্টি হচ্ছে। কিন্তু আসলেই কি […]

আরও→

সময়ের দুয়ারে কড়া নাড়ছে নতুন রেনেসাঁ

April 14, 2019

হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম অন্যায়ের দুর্গ যতই মজবুত হোক সত্যের আঘাতে তার পতন অবশ্যম্ভাবী। আল্লাহ ইব্রাহিম (আ.) কে দিয়ে মহাশক্তিধর বাদশাহ নমরুদের জুলুমবাজির শাসনব্যবস্থার পতন ঘটালেন। সেটা ছিল প্রাচীন ব্যবিলনীয় সভ্যতা যার নিদর্শন আজও হারিয়ে যায়নি। তৎকালে সেটাই ছিল বিশ্বের শীর্ষ সভ্যতা। তারা অহঙ্কারে এতটাই স্ফীত হয়েছিল যে উঁচু মিনার তৈরি করে তারা আল্লাহর আরশ দেখতে […]

আরও→

Categories