বঞ্চিত মানুষের দীর্ঘশ্বাস আর কতদিন? | হেযবুত তওহীদ

বঞ্চিত মানুষের দীর্ঘশ্বাস আর কতদিন?

আদীবা ইসলাম

পুঁজিবাদী গণতন্ত্রের আদর্শিক শূন্যতা পূরণ করতে জন্ম নিয়েছিল সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শ। সেই সমাজতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠা ও কার্যকর করতে গিয়ে গত শতাব্দীতে বহু রক্তক্ষয় হলো, কোটি কোটি বনি আদম প্রাণ হারাল, বহু দেশের সীমানাপ্রাচীর ধ্বংস-বিধ্বস্ত হলো। কিন্তু প্রায় এক শতাব্দীর পরীক্ষা নিরীক্ষা শেষে দেখা গেল ঠিক উল্টো চিত্র। যারা পুঁজিবাদী গণতন্ত্রের শোষণ-বঞ্চনা থেকে বাঁচতে সমাজতন্ত্রকে আলীঙ্গন করেছিল তাদের হলো স্বপ্নভঙ্গ। তারা দেখল পুঁজিবাদী গণতন্ত্রের চাইতে সমাজতন্ত্র আরও বেশি শোষণ ও বঞ্চনাবান্ধব ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে। কোটি কোটি বিক্ষুব্ধ মানুষ পতন ঘটাল সোভিয়েত ইউনিয়নের এবং ব্যর্থতার গ্লানি কাঁধে নিয়ে সমাজতন্ত্রকেও দাঁড়াতে হলো পুঁজিবাদী গণতন্ত্রের কাতারে। গত শতাব্দীর নব্বইয়ের দশকে ঐ যে আদর্শিক শূন্যতা তৈরি হলো আজ পর্যন্ত সেই শূন্যতা কেবল বেড়েই চলেছে। এমন কোনো ব্যবস্থা মানুষ আবিষ্কার করে নিতে পারে নি যেটা দিয়ে একাধারে তার রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক সমস্যার সমাধান হতে পারে এবং একইসাথে মানুষের দেহ-আত্মার চাহিদা পূরণ করতে পারে। মানবজাতির এই আদর্শের খরা কবে কাটবে কেউ জানে না, আদৌ কাটবে কিনা তারও নিশ্চয়তা নেই। তবে ব্যর্থ আদর্শগুলো দিয়ে যে কাক্সিক্ষত মুক্তি সম্ভব হবে না সে বিষয়ে চিন্তাশীল মানুষমাত্রই একমত না হয়ে পারেন না। প্রখ্যাত সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তার ‘ইতিহাসের স্বপ্নভঙ্গ’ বইতে এ বিষয়ে কিছু চরম সত্য উপস্থাপন করেছেন, যেগুলো চিন্তাশীল বিবেকবান মানুষের একেবারে আত্মার কথা। বইটি থেকে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের লেখা অংশবিশেষ আজকে বজ্রশক্তির পাঠকদের জন্য এখানে তুলে ধরা হলো। যারা সমাজ ও সভ্যতা নিয়ে ভাবেন এবং মানবজাতির ভবিষ্যতের কথা ভেবে চিন্তিত হন, এই লেখাগুলো তাদের ভাবনার পরিধীকে আরও বিস্তৃত করবে বলে আমাদের বিশ্বাস। উল্লেখিত বইয়ের ৮৫পৃষ্ঠায় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় লিখেছেন-
‘‘বয়স্ক নেতৃত্ব সুবিধাবাদকে আঁকড়ে ধরে, তারা কথার ফুলঝুড়ি দিয়ে সাধারণ মানুষের মন ভোলায়, মঞ্চের ওপর উদ্দীপ্ত ভাষণের সঙ্গে তাদের ব্যাক্তিগত জীবনযাপনের কোনও মিল থাকে না, তাদের নিজস্ব উচ্চাকাক্সক্ষা, তাদের ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকার লালসা আর সব কিছুকে তুচ্ছ করে দেয়। কিন্তু কৈশোর-তারুণ্যের সময় অনেকেই খাঁটি আদর্শবাদী থাকে। আদর্শের জন্য তারা যে-কোনও মুহূর্তে জীবন দিতেও ইতস্তত করে না। যে বয়সে জীবন সবচেয়ে মূল্যবান, সেই বয়সেই মানুষ মাথা উঁচু করে মৃত্যুর দিকে যেতে পারে। সারা দেশে অনাচার, বৈষম্য ও দুর্নীতি দেখে ফুঁসে ওঠে তরুণ সমাজ, একটা বিপ্লবের ডাক শুনলে তারা সব তুচ্ছ করে বেরিয়ে আসে, নিজেদের প্রাণের বিনিময়েও বিপ্লব সফল করতে চায়। কিন্তু বিপ্লব সফল হলে তারা নতুন শাসনভার তুলে দেবে তাদেরই হাতে, যারা আবার ক্ষমতা কুক্ষিগত করে সাধারণ মানুষদের স্তোকবাক্যে ভোলাবে? বিপ্লব যারা সফল করে আর বিপ্লবের পরবর্তীকালে যারা দেশ গড়ার ভার নেয়, এদের চরিত্রগত একটি তফাত এসে যায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই। এই যদি হয় বিপ্লবের পরিণাম, তা হলে পরবর্তীকালের তরুণরা কোন বিপ্লবের স্বপ্ন দেখবে? পূর্ব ইউরোপের দেশগুলিতে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠাকে এখন আর বিপ্লব বলা হচ্ছে না, যে-অভ্যুত্থানের ফলে সেই ব্যবস্থার পতন হল, তাকেই এখন বলা হচ্ছে বিপ্লব। এটা একটা নিয়তির পরিহাস নয়? যতবার এই বিপ্লব শব্দটি শুনেছি, আমার কানে খট করে লেগেছে।
গণতন্ত্রই বা মানুষকে কতখানি মুক্তি দিতে পারে? সব গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মধ্যেই রয়েছে অসংখ্য ছিদ্র। নির্বাচন ও ভোটে জিতে যারা ক্ষমতা হাতে পায়, তারা যদি সত্যিই দেশের সমস্ত মানুষের ইচ্ছা-অনিচ্ছার মূল্য দেয়! ভোটে জেতার জন্য সর্বত্রই চলে টাকার খেলা এবং গায়ের জোর, সুতরাং যারা জয়ী হয়, তারাই যে যোগ্যতম, তা কিছুতেই বলা যায় না। ব্রিটেন এবং আমেরিকা গণতন্ত্রের গর্ব করে, কিন্তু ওইসব দেশের শাসকরা যখন একটা আগ্রাসী যুদ্ধ বাধিয়ে দেয় তখন কি তারা দেশের মানুষের মতামতের তোয়াক্কা করে? তারা চিন্তার স্বাধীনতা, বাক স্বাধীনতার ধ্বজা তুলে ধরলেও যুদ্ধের প্রকৃত খবর জানতে দেয় না দেশবাসীকে, মিথ্যে খবর জানাতে দ্বিধা করে না। যুদ্ধের সময় পরিকল্পিতভাবে দেশের মধ্যে কুৎসিত রকমের উগ্র দেশাত্ববোধ জাগিয়ে তোলা হয়, ছড়ানো হয় অন্য দেশের প্রতি ঘৃণা। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট যখন প্রকাশ্যে বলেন যে তিনি ইরাকের প্রেসিডেন্টের মৃত্যু চান, তখন মনে হয় পৃথিবী কি সত্যিই সভ্য হয়েছে? এই কি সভ্যতার নমুনা? তা হলে বর্বরতা কাকে বলে? আমাদের ভারতবর্ষে প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে গণতন্ত্রের পরীক্ষায় আমরা কী পেয়েছি? দিন দিন বেড়ে চলেছে গণতন্ত্রের ব্যাভিচার। এক রকম প্রতিশ্রুতি দিয়ে নির্বাচন হয়, শাসনভার হাতে পেলেই তা তুচ্ছ হয়ে যায়। একই দল বিরোধীপক্ষে থাকলে বলে, হরতাল ডাকো, শাসনক্ষমতা পেলে বলে, হরতাল ভাঙো! নির্বাচিত হবার পর আজ যে বিরোধী পক্ষে কাল সে সরকার পক্ষে। নীতির কোনও বালাই নেই। যে দল গতকাল বৃহৎ ব্যবসায়ীগোষ্ঠীকে শোষক ও শ্রেণীশত্রু বলেছে, আজ সে তাদেরই সঙ্গে হাত মেলাচ্ছে। আমাদের গণতন্ত্র বাক-স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে অথচ দেশের শতকরা ষাটজন মানুষকেই অশিক্ষিত রেখেছে। ধর্ম-নিরপেক্ষতার নীতি কাগজে-কলমে গ্রহণ করা হলেও এত বছরের মধ্যে সাধারণ মানুষকে বোঝানোই হল না ধর্মনিরপেক্ষতা কাকে বলে। আমাদের দেশের গ্রামে-গঞ্জে, আধা মফস্বলে আমি ঘুরেছি অনেক। আমি দেখেছি বাঁধের ওপর বসে থাকা বিষণ্ন  মানুষ, যার কোনও কাজ নেই, পেটে ভাত নেই। দেখেছি খরায় বিবর্ণ ফসলের খেতের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বিমর্ষ চাষীকে। বস্তির ধারে ছোট ছোট বাচ্চারা খেলা করে ধুলোর মধ্যে। শহরের চৌরাস্তায় গাড়িগুলো থামলে শিশু কোলে নিয়ে ভিক্ষে চাইতে আসে জননী। পূরীষের পাত্র মাথায় করে নিয়ে যায় হরিজন। এরা যেন অনন্তকালের স্রোতে এক একটি বিন্দু। কোনও পরিবর্তন নেই। আমাদের শৈশবে যেমন শিশুকোলে জননীকে ভিক্ষে করতে দেখেছি আজও তাই দেখছি। গণতন্ত্র এই শিশু ও জননীকে মাথার ওপর একটা আচ্ছাদন দিতে পারেনি, দিতে পারেনি একটা সম্মানজনক জীবিকা। কোনও শিল্পী হয়তো সেই ভিখারিণীর মর্মন্তুদ ছবি আঁকেন, তার জন্য বাহ্বা পান, লেখা হয় কবিতা, মঞ্চস্থ হয় নাটক, তবু চৌরাস্তার মোড়ে শিশুকোলে জননীকে দেখতে পাওয়া যাবেই। ছেলেবেলায় রাস্তার মুচিকে ঠিক যে-অবস্থায় যে পোশাকে বসে থাকতে দেখতাম, এখনও তারা ঠিক সেরকমই রয়েছে। বাড়িতে ধাঙড়েরা আসে খালি পায়ে, নেংটি পড়ে, আমাদের ঠাকুরদারা যেমন দেখেছিলেন, আমরাও সে রকমই দেখছি। প্রতিদিন যে-মানুষটি আসে তার নামও আমরা জানি না, ওরা সবাই ধাঙর বা মেথর। আফ্রিকার কেনিয়া শহরে আমি জুতো-পায়ে মেথর দেখছি, পরনে প্যান্ট-শার্ট, আমাদের এখানকার যে-কোনও ধনী কিংবা সাম্যবাদীর বাড়ির মেথরের একই রকম চেহারা। কাশী শহরে ভিখারির লাইনের মধ্যে এক বৃদ্ধকে দেখে আমি চমকে উঠেছিলাম, তার মুখে অজ¯্র আঁকিবুকি, সামনে হাত পেতে বসে সে ঘুমে ঢুলছে। আমার মনে হয়েছিল, ওই ভিখারির বয়স আড়াই হাজার বছর, গৌতম বুদ্ধ ওকে যেমন দেখেছিলেন, আমরাও সেই অবস্থাতেই দেখছি। কিছুই বদলাতে পারিনি। এই গণতন্ত্র আমাদের কোন ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যাবে? কোন পথে আসবে সমস্ত মানুষের মুক্তি? নাকি সেই মুক্তি কোনওদিনই আসবে না? তার আগেই ধ্বংস হয়ে যাবে পৃথিবী কিংবা মানব সভ্যতা? যদি মানব সভ্যতার বিনাশ হয়ই, তবে তা পরমাণু অস্ত্র বা বিষবাষ্পে হবে না। হবে বঞ্চিত মানুষদের দীর্ঘশ্বাসে।’’

Search Here

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ

ধর্মবিশ্বাসে জোর জবরদস্তি চলে না

April 15, 2019

মোহাম্মদ আসাদ আলী ইসলামের বিরুদ্ধে বহুল উত্থাপিত একটি অভিযোগ হচ্ছে- ‘ইসলাম বিকশিত হয়েছে তলোয়ারের জোরে’। পশ্চিমা ইসলামবিদ্বেষী মিডিয়া, লেখক, সাহিত্যিক এবং তাদের দ্বারা প্রভাবিত ও পশ্চিমা শিক্ষায় শিক্ষিত গোষ্ঠী এই অভিযোগটিকে সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার প্রচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে। তাদের প্রচারণায় অনেকে বিভ্রান্তও হচ্ছে, ফলে স্বাভাবিকভাবেই ইসলামের প্রতি অনেকের নেতিবাচক ধারণা সৃষ্টি হচ্ছে। কিন্তু আসলেই কি […]

আরও→

সময়ের দুয়ারে কড়া নাড়ছে নতুন রেনেসাঁ

April 14, 2019

হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম অন্যায়ের দুর্গ যতই মজবুত হোক সত্যের আঘাতে তার পতন অবশ্যম্ভাবী। আল্লাহ ইব্রাহিম (আ.) কে দিয়ে মহাশক্তিধর বাদশাহ নমরুদের জুলুমবাজির শাসনব্যবস্থার পতন ঘটালেন। সেটা ছিল প্রাচীন ব্যবিলনীয় সভ্যতা যার নিদর্শন আজও হারিয়ে যায়নি। তৎকালে সেটাই ছিল বিশ্বের শীর্ষ সভ্যতা। তারা অহঙ্কারে এতটাই স্ফীত হয়েছিল যে উঁচু মিনার তৈরি করে তারা আল্লাহর আরশ দেখতে […]

আরও→

Categories