পেশীশক্তির রাজনীতি! | হেযবুত তওহীদ

পেশীশক্তির রাজনীতি!

মোহাম্মদ আসাদ আলী

প্রচলিত রাজনৈতিক সিস্টেমের অন্যতম সমস্যা হচ্ছে, এখানে সততা ও যোগ্যতার চাইতে পেশীশক্তির প্রয়োজন পড়ে বেশি। একটি দল ক্ষমতায় আসলো। সরকার গঠন করলো। এই ক্ষমতায় আসার জন্য তাদের যতখানি ভোটের প্রয়োজন, তার চেয়েও বেশি প্রয়োজন পড়ে পেশীশক্তির। কারণ দলীয় ক্যাডারবাহিনী না থাকলে, নিজেরা ভোটকেন্দ্রের দখল নিতে না পারলে হাজারো জনসমর্থন দিয়েও লাভ হয় না। এগুলো বাস্তবতা।
আবার ক্ষমতায় যাওয়ার পরে টিকে থাকার জন্যও পেশীশক্তির প্রয়োজন পড়ে। বিরোধী পক্ষগুলো বিভিন্ন ইস্যু সৃষ্টি করে দিয়ে কথায় কথায় আন্দোলনের ডাক দেয়, সরকারকে গদিচ্যুত করার প্রচেষ্টায় লিপ্ত থাকে। তাদেরকে শক্ত হাতে দমন করতে হয়। সরকারী দলকে রাজপথ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয়। প্রয়োজনে বিরোধী পক্ষগুলোর উপর হামলে পড়তে হয়। লাঠিসোঠায় কাজ না হলে গোলা-বারুদ, দা-কিরিচ, হাতুড়ি মেরে হলেও তাদেরকে পরাজিত করতে হয়। এটাই হয়ে দাঁড়ায় রাজনীতির অলিখিত নিয়ম।
প্রশ্ন হচ্ছে, এই বাস্তবতায় একটি রাজনৈতিক দলের কাছে কার মূল্য বেশি হবে? একজন সৎ ও ন্যায়নিষ্ঠ কর্মীর? নাকি একজন গু-া-মাস্তান, একজন সন্ত্রাসী, একজন খুনি, একজন অবৈধ অস্ত্রধারীর? সাধারণ জ্ঞানেই বোঝা যাচ্ছে এই রাজনীতির খেলায় জিততে হলে সততার চাইতে বড় যোগ্যতা হয়ে দাঁড়ায় মাস্তানি করতে পারা, বিরোধী পক্ষগুলোর অন্তরে ত্রাস সৃষ্টি করতে পারা, কুপিয়ে মানুষ মারতে পারা ইত্যাদি। এদিকে আন্দোলনে সফল করতে বিরোধী পক্ষগুলোকেও শক্তির পূজা করতে হয়। প্রয়োজনে সন্ত্রাসী ভাড়া করতে হয়।
কাজেই দেখা যাচ্ছে প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থাটাই এমন যে, এখানে সরকার বলুন আর বিরোধী দল বলুন উভয়কেই তাদের লক্ষ্য অর্জনের জন্য আশ্রয় দিয়ে প্রশ্রয় দিয়ে দলীয় ক্যাডারবাহিনী পুষতে হয়। এদের কাউকে যদি পুলিশে ধরেও ফেলে রাজনৈতিক নেতাদেরকে হস্তক্ষেপ করে ছাড়িয়ে আনতে হয়। পেপারে সশস্ত্র হামলার ছবি ছাপা হবার পর তাকে শাস্তি দেওয়ার বদলে পুরস্কৃত করতে হয়। কারণ তাদেরকে তো রাখাই হয়েছে ওই ধরনের কর্মকা-ের জন্য। যারা তাদেরকে পোষেন তারা ভালোমতই জানেন- এদেরকে প্রশ্রয় দেওয়া উচিত না, এরা সমাজের ক্ষতি, দেশের ক্ষতি। এরা নিরীহ জনগণকে জিম্মি করে চাঁদাবাদী করে, টেন্ডারবাজী করে, রাস্তাঘাটে মাস্তানি করে বেড়ায়, ছিনতাই করে, কেউ প্রতিবাদ করলে মেরে হাড়গোড় ভেঙে দেয়, ইভ টিজিং করে, ধর্ষণ করে, অন্যের জায়গা দখল করে ইত্যাদি সমস্ত রকম জঘন্য অপকর্ম করে। এতে সরকারেরই ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হয়। কিন্তু জানলেও এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যায় না। ভাবমূর্তির চেয়েও পেশীশক্তি বেশি প্রয়োজন।
এই যে ক্ষমতা বাঁচাতে ভাবমূর্তিকে জলাঞ্জলি দেওয়া, এতে সাধারণ জনগণ ক্রমেই ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে সরকারের বিরুদ্ধে। অনেক সময় সেই ক্ষোভের সুযোগ নিয়ে নতুন নতুন ইস্যু সৃষ্টি করে দিয়ে আখের গোছায় বিরোধী পক্ষগুলো। দেখা যায় সরকারের বিরুদ্ধে তারা আন্দোলনের ডাক দেয়, সেই আন্দোলন মোকাবেলা করতে গিয়ে সরকারকে আরও বেশি পেশীশক্তি নির্ভর হয়ে উঠতে হয়, আরও বেশি করে গু-া মাস্তানদের, সন্ত্রাসীদের, চাঁদাবাজদের সুযোগ সুবিধা দিয়ে খুশি রাখতে হয়। তাদের অন্যায়কে অন্যায় মনে করলে সরকারের চলে না। তাদের সন্ত্রাসীপনাকে কঠোর হস্তে দমন করলে সরকার হয়ে পড়ে অচল। তাদের হাত থেকে অবৈধ অস্ত্রপাতি কেড়ে নিলে সরকার হয়ে পড়ে দুর্বল। পরিণামে কোনো সরকারই, কোনো রাজনৈতিক দলই প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থায় পেশীশক্তির বদলে আদর্শের ভিত্তিতে রাজনীতি করতে পারে না। সবাইকেই অন্যায়ের প্রতি স্যারেন্ডার করতে হয় ক্ষমতা বাঁচানোর জন্য অথবা ক্ষমতায় যাবার জন্য।
আমরা যারা ভেবে থাকি সরকার পরিবর্তন করেই এই সমস্যার সমাধান করে ফেলব তাদের ধারণা সংশোধনের সময় এসেছে। আমাদেরকে বুঝতে হবে, এই সমস্যা না তো কোনো সরকারের আর না তো কোনো রাজনৈতিক দলের, এই সমস্যার গোড়া নিহিত আছে প্রচলিত রাজনৈতিক সিস্টেমের ভেতর। সিস্টেমের মধ্যে গেঁথে থাকা এই সন্ত্রাসীপনার বীজ ছুঁড়ে ফেলতে পারলেই কেবল রাজনীতির এই কলুষিত অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটা সম্ভব। আমাদের উচিত সেদিকটিতেই মনোযোগ দেওয়া।

Search Here

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ

জনতার প্রশ্ন আমাদের উত্তর

December 13, 2018

“জান্নাতি ফেরকার দায়িত্ব পালন করছে হেযবুত তওহীদ”-হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম [ঢাকা মহানগর নাট্যমঞ্চে হেযবুত তওহীদের এমাম হোসাইন মোহাম্মদ সেলিমকে দর্শক গ্যালারি থেকে বিভিন্ন প্রশ্ন করা হয়। এমনই একটি প্রশ্নের উত্তরে তিনি যা বলেছিলেন তা এখানে তুলে ধরা হলো। – বি.স.] প্রশ্ন: অনেকেই বলে মুসলমান জাতি এমনিতেই সর্বদা হাজারো ফেরকা ও মাজহাবে বিভক্ত। আপনারা আবার ঐক্যবদ্ধ হওয়ার […]

আরও→

একটি বিশেষ শ্রেণি বললেই সেটা ইসলাম হয় না, আল্লাহ ও তাঁর রসুল (সা.) যা বলেছেন সেটাই ইসলাম

December 11, 2018

রিয়াদুল হাসান স্বাধীনতার ৪৭ বছর চলছে। এই দীর্ঘ সময়েও আমাদের জাতীয় সংহতি গড়ে উঠতে পারেনি, যার জন্য বিশেষভাবে দায়ী ধর্মকে ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহারকারী একটি গোষ্ঠী। একেক জন একেকভাবে ইসলামকে ব্যাখ্যা করছে। একটি নির্দিষ্ট শ্রেণি প্রিয় ধর্ম ইসলামের অপব্যাখ্যা করে বিভিন্ন ধরনের জাতিবিনাশী কর্মকা- করে যাচ্ছে। অথচ মানুষের ঈমানকে ভুল খাতে প্রবাহিত করে ব্যক্তি […]

আরও→

Categories