ধর্মীয় নেতারাই যখন ধর্মের পথে প্রাচীর হয়ে দাঁড়ান! -মোহাম্মদ আসাদ আলী | হেযবুত তওহীদ

ধর্মীয় নেতারাই যখন ধর্মের পথে প্রাচীর হয়ে দাঁড়ান! -মোহাম্মদ আসাদ আলী

ইসলামবিদ্বেষীরা চায় ইতিহাসকে এমনভাবে বর্ণনা করতে যাতে ধর্মকে খুব সহজে প্রশ্নবিদ্ধ করা যায়। তাই প্রকৃত ধর্মের ইতিহাস নিয়ে তারা খুব কমই কথা বলেন, সেটার বদলে তারা বিকৃত ধর্ম ও তার অপপ্রয়োগের দিকগুলোকেই ধর্মের ইতিহাস বলে চালিয়ে দিতে চান, যাতে মানুষ কেবল ধর্মের অপব্যবহারের কথাই বেশি বেশি শোনে ও ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা হারাতে থাকে। তেমনি ধর্মবিশ্বাসীদের মধ্যেও যে ধর্মবেত্তা পুরোহিত শ্রেণিটি রয়েছে তারা চায় যে কোনো পন্থায় ইতিহাস থেকে পুরোহিত শ্রেণিটির অপকর্মগুলোকে মুছে ফেলতে এবং ইতিহাসকে এমনভাবে বর্ণনা করতে যেন আলেম-পুরোহিত শ্রেণিটিকে ধর্মের একেবারে অনিবার্য অংশ বলে মনে হয়। অর্থাৎ যার যার স্বার্থ অনুযায়ী তারা ইতিহাসের নির্দিষ্ট পাতায় আলো ফেলেন মাত্র, বাকিটা সাধারণ মানুষের দৃষ্টি ও চিন্তার আড়ালেই রয়ে যায়।

আমরা দেখি ওয়াজ মাহফিল, মিলাদ মাহফিল, ধর্মসভা ইত্যাদিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধর্মের ইতিহাস ও নবী-রসুলদের জীবনী আলোচনা করা হয়, কিন্তু যে কথাগুলো ভুলেও উচ্চারণ করা হয় না তা হচ্ছে- আখেরী নবীর প্রধান শত্রু আবু জাহেল তৎকালীন সমাজের একজন বিজ্ঞ আলেম ছিল। মুসা (আ.) এর বিরোধিতাকারী ফেরাউন কেবল রাষ্ট্রনেতাই ছিল না, ধর্মনেতাও ছিল। ঈসা (আ.) এর সাথে শত্রুতা করেছিল তৎকালীন ইহুদি ধর্মগুরু রাব্বাই ও ফরিসিরা এবং মূলত তাদের দাবিতেই ঈসা (আ.) কে ক্রুশবিদ্ধ করার চেষ্টা হয়েছিল। ইউসুফ (আ.) এর প্রধান শত্রু ছিল মিশরের ধর্মীয় পুরোহিতরা, যারা মানুষের ধর্মীয় সেন্টিমেন্টকে পুঁজি করে বারবার ইউসুফ (আ.) কে ঘায়েল করার চেষ্টা করেছে। বনি ইজরাইলের অনেক নবীকে জীবন দিতে হয়েছিল জাতিটির ধর্মীয় নেতাদের হাতেই। সঙ্গত কারণেই এই বিষয়গুলো আজকের পুরোহিত আলেম সমাজ সচেতনভাবে এড়িয়ে যেতে চান, ফলে ধর্মের ইতিহাসে পুরোহিততন্ত্রের অবদান যে ইতিবাচক নয় ঘোর নেতিবাচক সে সত্যটি সাধারণ ধর্মবিশ্বাসী মানুষ জানতেও পারে না, সচেতনও হতে পারে না।

ইতিহাস এই যে, একজন নবী হয়ত অক্লান্ত সংগ্রামের মাধ্যমে কোথাও সত্যদ্বীন প্রতিষ্ঠা করলেন। মানুষ অন্যায়, অবিচার, রক্তপাত থেকে রেহাই পেল, জীবনে শান্তি নেমে এল। নবী তার জাতিকে সাবধান করে দিলেন যে, তোমরা আল্লাহর দ্বীনকে পার্থিব স্বার্থোদ্ধারের কাজে ব্যবহার করবে না। কিন্তু নবী চলে যাবার পর সেই জাতির মধ্যে গজিয়ে উঠল একদল পুরোহিত শ্রেণি যাদের কথাই হয়ে উঠল ধর্মের আইন, বিধান। এরা ধর্ম নিয়ে ব্যবসা করতে লাগল, এমনকি নিজেদের সুযোগ-সুবিধা ঠিক রাখতে হারামকে হালাল আর হালালকে হারাম ফতোয়া দিতেও কুণ্ঠিত হলো না। সাধারণ মানুষ তাদেরকে ধর্মের একচ্ছত্র কর্তৃপক্ষ বিশ্বাস করে তাদের মনগড়া বক্তব্যকে মেনে চলতে লাগল। কেউ যাচাই করল না তারা সত্য বলছে কিনা, সত্যের সাথে মিথ্যা মিশ্রিত করে দিচ্ছে কিনা, এক কথায় অন্ধ অনুসরণ করতে লাগল। এদের ব্যাপারে কোর’আনে আল্লাহ বলেন, তারা আল্লাহকে ছেড়ে নিজেদের আলেম ও ধর্ম-যাজকদের প্রভু বানিয়ে নিয়েছে (সুরা তাওবা: ৩১) অর্থাৎ তাদের আলেমরা যা হালাল করেছে তাকে তারা হালাল এবং যা হারাম করেছে তাকে তারা হারাম বলে মেনে নিয়েছে। স্বভাবতই তার পরিণতিতে ধর্মে একটু একটু করে বিকৃতি প্রবেশ করতে লাগল। একটা সময় এসে সেই ধর্ম আর শান্তি দেওয়ার মত অবস্থায় থাকল না। ধর্মই হয়ে উঠল অধর্মের কল। তখন আল্লাহ পূর্বের ঐ নবীর আনিত দ্বীনকে সংশোধন করার জন্য নতুন আরেকজন নবী পাঠালেন। সেই নবী এসে বললেন, ‘আমি আল্লাহর মনোনীত রসুল। তোমরা যে নবীর আনিত দ্বীনের অনুসরণ করছো সেই নবীকে আমি সত্যায়ন করছি, তার দ্বীনকেও সত্যায়ন করছি, কিন্তু সমস্যা হচ্ছে তোমাদের নবীর আনিত দ্বীনকে তোমরা বিকৃত করে ফেলেছো। এটা আর নবীর আনিত সেই সত্যদ্বীন নেই। কাজেই আমি তোমাদেরকে যেই দ্বীন দিচ্ছি সেটা গ্রহণ করে নাও আর আমাকে নবী হিসেবে স্বীকৃতি দাও।’ নবীর এই কথাকে আগের দ্বীনের আলেম পুরোহিত শ্রেণিটি কখনই স্বীকার করে নাই, প্রয়োজনে তারা নবী-রসুলদেরকে হত্যা পর্যন্ত করেছে। কারণ এই কথা স্বীকার করে নেওয়ার অর্থ তাদের জ্ঞানের অহংকার, সামাজিক মর্যাদা-প্রতিপত্তি, সুযোগ সুবিধা সবকিছু চূর্ণ হয়ে যাওয়া। আবার এমনও হয়েছে, নতুন নবীর প্রতি কিছু লোক ঈমান এনেছে ও তাঁর আনিত দ্বীনকে নিজেদের জীবনে কার্যকরী করেছে, আর বাকিরা ধর্মব্যবসায়ী পুরোহিতদের অন্ধ অনুসরণ করে পূর্বের বিকৃত দ্বীনেই থেকে গেছে। এভাবে একটিমাত্র জাতির মধ্যে নতুন জাতির পত্তন হয়েছে, নতুন দ্বীনের নামকরণ হয়েছে। যেমন ঈসা (আ.) এসেছিলেন মুসা (আ.) এর উম্মত দাবিদার ইহুদিদের দ্বীনকে সংশোধন করে পুনরায় তাদেরকে সঠিক পথে ওঠাতে। কিন্তু ইহুদি ধর্মীয় নেতাদের অর্থাৎ রাব্বাই ফরিসিরা প্রবল বিরোধিতা শুরু করল। শেষ পর্যন্ত ঈসা (আ.) কে হত্যার চেষ্টা করল। ঈসা (আ.) কে আল্লাহ উঠিয়ে নেবার পরে তাঁর মুষ্টিমেয় অনুসারীরা বনি ইজরাইলের ব্যাপারে সম্পূর্ণ নিরাশ হয়ে ইউরোপে ঈসা (আ.) এর শিক্ষা প্রচার করতে লাগলেন এবং সেখানে তা ‘খ্রিষ্টধর্ম’ নামে গৃহীত হয়ে গেল। জন্ম হলো আরেকটি নতুন ধর্মের। একই ধরনের ঘটনা আমরা পাই মহামতি বুদ্ধের জীবনে। তাকেও পূর্বের ধর্মাদর্শের পুরোহিত শ্রেণিটির প্রবল বিরোধিতার মুখে পড়তে হয় এবং তাদের বিরোধিতার কারণেই সনাতন ধর্ম থেকে আলাদা হয়ে বৌদ্ধ ধর্ম নামের নতুন একটি ধর্মের জন্ম হয়। এ ব্যাপারে স্বামী বিবেকানন্দের একটি বাণী উল্লেখযোগ্য। তিনি বলেন, ‘বুদ্ধদেব এর শিষ্যগণ তাঁহাকে ঠিক ঠিক বুঝিতে পারেন নাই। ইহুদি ধর্মের সহিত খ্রিস্টানধর্মের যে সম্বন্ধ, হিন্দুধর্ম অর্থাৎ বেদবিহিত ধর্মের সহিত বর্তমানকালের বৌদ্ধধর্মের প্রায় সেইরূপ সম্বন্ধ। যীশুখ্রিস্ট ইহুদি ছিলেন ও শাক্যমুনি (বুদ্ধদেব) হিন্দু ছিলেন। শাক্যমুনি নতুন কিছু প্রচার করিতে আসেন নাই। যীশুর মতো তিনিও (পূর্ব ধর্মমতকে) পূর্ণ করিতে আসিয়াছিলেন, ধ্বংস করিতে আসেন নাই। [১৮৯৩ সালের ২৬শে সেপ্টেম্বর শিকাগোতে অনুষ্ঠিত বিশ্বধর্ম মহাসভায় স্বামী বিবেকানন্দ প্রদত্ত বক্তৃতা]।

বস্তুত সকল ধর্মেই একটা সময় পুরোহিত শ্রেণিটি গজিয়েছে এবং যখনই তাদের মধ্যে কেউ মহাসত্য নিয়ে আবির্ভুত হয়েছে, তাদের বিকৃতিগুলো সংশোধন করতে চেয়েছে, তখন এই ধর্মব্যবসায়ী শ্রেণিটি তাদের কায়েমী স্বার্থ বাঁচিয়ে রাখতে নির্লজ্জভাবে সত্যের বিরোধিতা করেছে এবং ফলশ্রুতিতে জাতির মধ্যে এসেছে বিভক্তি, বিদ্বেষ ও শত্রুতা। পুরোহিততন্ত্রের এই অভিশাপ কেবল ইতিহাসকেই নয়, বর্তমানকেও কলঙ্কিত করে চলেছে। কারণ এটা স্বতঃসিদ্ধ যে, যেখানেই ধর্ম কোনো বিশেষ শ্রেণির পার্থিব স্বার্থোদ্ধারের পথে ব্যবহৃত হবে সেখানেই ধর্মের নামে অধর্ম হতে থাকবে, প্রকৃত ধর্ম উদ্ভাসিত হবার পথ সংকুচিত হয়ে পড়বে এবং বর্তমানে সেটাই হয়েছে।

আজকের এই একবিংশ শতাব্দীতে যখন ধর্মের নামে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ, হানাহানি, রক্তপাত ও ধর্মীয় উগ্রপন্থা মহামারীর ন্যায় পৃথিবীকে গ্রাস করে চলেছে তখন কোনো ব্যক্তি যদি আল্লাহর অশেষ কৃপায় প্রকৃত ধর্মকে উপলব্ধি করতে পারেন এবং মানবজাতিকে সেই সত্যের দিকে আহ্বান জানান তাহলে তার কী পরিণতি হবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। নিশ্চিতভাবেই তাকে ধর্মব্যবসায়ী আলেম-পুরোহিতদের রোষাণলে পড়তে হবে এবং তাদেরও রোষানলে পড়তে হবে যারা ধর্মব্যবসায়ী আলেমদের অন্ধ অনুসরণ করতে এতটাই অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে যে, নিজেদের যুক্তি বুদ্ধি উপলব্ধির শক্তি কাজে লাগিয়ে কোনোকিছু যাচাই করার সামর্থ্য তাদের নেই।

লেখক: সহকারী সাহিত্য সম্পাদক, হেযবুত তওহীদ।

Search Here

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ

ধর্মবিশ্বাসে জোর জবরদস্তি চলে না

April 15, 2019

মোহাম্মদ আসাদ আলী ইসলামের বিরুদ্ধে বহুল উত্থাপিত একটি অভিযোগ হচ্ছে- ‘ইসলাম বিকশিত হয়েছে তলোয়ারের জোরে’। পশ্চিমা ইসলামবিদ্বেষী মিডিয়া, লেখক, সাহিত্যিক এবং তাদের দ্বারা প্রভাবিত ও পশ্চিমা শিক্ষায় শিক্ষিত গোষ্ঠী এই অভিযোগটিকে সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার প্রচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে। তাদের প্রচারণায় অনেকে বিভ্রান্তও হচ্ছে, ফলে স্বাভাবিকভাবেই ইসলামের প্রতি অনেকের নেতিবাচক ধারণা সৃষ্টি হচ্ছে। কিন্তু আসলেই কি […]

আরও→

সময়ের দুয়ারে কড়া নাড়ছে নতুন রেনেসাঁ

April 14, 2019

হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম অন্যায়ের দুর্গ যতই মজবুত হোক সত্যের আঘাতে তার পতন অবশ্যম্ভাবী। আল্লাহ ইব্রাহিম (আ.) কে দিয়ে মহাশক্তিধর বাদশাহ নমরুদের জুলুমবাজির শাসনব্যবস্থার পতন ঘটালেন। সেটা ছিল প্রাচীন ব্যবিলনীয় সভ্যতা যার নিদর্শন আজও হারিয়ে যায়নি। তৎকালে সেটাই ছিল বিশ্বের শীর্ষ সভ্যতা। তারা অহঙ্কারে এতটাই স্ফীত হয়েছিল যে উঁচু মিনার তৈরি করে তারা আল্লাহর আরশ দেখতে […]

আরও→

Categories