ধর্মবিশ্বাসে জোর জবরদস্তি চলে না | হেযবুত তওহীদ

ধর্মবিশ্বাসে জোর জবরদস্তি চলে না

মোহাম্মদ আসাদ আলী

ইসলামের বিরুদ্ধে বহুল উত্থাপিত একটি অভিযোগ হচ্ছে- ‘ইসলাম বিকশিত হয়েছে তলোয়ারের জোরে’। পশ্চিমা ইসলামবিদ্বেষী মিডিয়া, লেখক, সাহিত্যিক এবং তাদের দ্বারা প্রভাবিত ও পশ্চিমা শিক্ষায় শিক্ষিত গোষ্ঠী এই অভিযোগটিকে সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার প্রচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে। তাদের প্রচারণায় অনেকে বিভ্রান্তও হচ্ছে, ফলে স্বাভাবিকভাবেই ইসলামের প্রতি অনেকের নেতিবাচক ধারণা সৃষ্টি হচ্ছে। কিন্তু আসলেই কি ইসলাম প্রচারে জোর-জবরদস্তির কোনো স্থান আছে? রসুলাল্লাহ ও তাঁর হাতে গড়া উম্মতে মোহাম্মদী জাতির ইতিহাস কী বলে?

ইসলাম প্রতিষ্ঠার নীতিমালা আল কোর’আন থেকেই পরিষ্কার বোঝা যায়। এই দীনে কোনো জোর জবরদস্তির স্থান আল্লাহ রাখেন নি। তিনি বলেছেন- দীনের ব্যাপারে কোনো জোর-জবরদস্তি নেই, কারণ সত্য থেকে মিথ্যা পৃথক হয়ে গেছে (সুরা বাকারা, ২৫৬)। অন্যত্র তিনি বলছেন-আল্লাহ কখনও কাউকেই তার সাধ্যের বাইরে কোনো কাজের দায়িত্ব চাপিয়ে দেন না (সুরা বাকারা, ২৮৬)। কোর’আনে রসুলাল্লাহর যে দায়িত্ব আল্লাহ সুনির্দিষ্ট করে দিলেন সেখানেও জোর জবরদস্তির কোনো স্থান রাখলেন না। কোর’আনে আল্লাহ রসুলকে বলছেন, তুমি তোমার মালিকের পথে প্রজ্ঞা ও সদুপদেশ সহকারে উৎকৃষ্ট পন্থায় আহ্বান করো। (সুরা নাহল, ১২৫) তোমার কাজ হচ্ছে শুধু ঠিক ঠিক মতো পৌঁছে দেওয়া। (সুরা আন নুর, ৫৪; সুরা ইয়াসীন, ১৭)। অর্থাৎ বোঝা যাচ্ছে- আল্লাহ কারও ধর্মবিশ্বাসের ওপর জোর-জবরদস্তি চালিয়ে ইসলাম প্রতিষ্ঠাকে সমর্থন করছেন না। আল্লাহর নীতি হলো বুঝিয়ে, যুক্তি দিয়ে, বলে-লিখে, বক্তৃতা করে ইত্যাদি যত শান্তিপূর্ণ উপায়ে সম্ভব মানুষের সামনে সত্যকে উপস্থাপন করা, হক্বের পথে আহ্বান করা, কিন্তু সিদ্ধান্ত নিবে মানুষ। নিজের সিদ্ধান্ত অন্যের উপর জোর করে চাপিয়ে দেওয়া আল্লাহর হুকুম অমান্য করার শামিল। ধর্মবিশ্বাস নিয়ে, সত্য গ্রহণ বা বর্জন করা নিয়ে, আল্লাহর প্রতি, রসুলের প্রতি, কেতাবের প্রতি ঈমান আনা নিয়ে কোনো জবরদস্তি চলে না। সত্যকে দেখে যারা গ্রহণ করে নেবে তারা আলোকিত হবে, আর যারা সত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে তারা অন্ধকারেই রয়ে যাবে। সত্যের বার্তাবাহকদের এ ক্ষেত্রে একটি মাত্রই কাজ, সত্য উপস্থাপন করা। এমনভাবে উপস্থাপন করা যার বিরোধিতা করার মতো বা ত্রুটি বের করার মতো কোনো সুযোগ না থাকে। যার সংস্পর্শে আসলেই মানুষ সত্যকে চিনতে পারে, উপলব্ধি করতে পারে। কিন্তু আজ ইসলামের নাম করে নিজেদের মনগড়া মতামতকে অন্যের বিশ্বাস ও মতের উপর জোর করে চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতা লক্ষ করা যায়। এটা ইসলাম নয়, ইসলাম প্রতিষ্ঠার সঠিক প্রক্রিয়াও নয়।

জবরদস্তি বিভিন্ন প্রকারের আছে। শুধু ইসলাম নয়, যারা আজ ইসলামের সমালোচনা করেন, সেই পশ্চিমা শিক্ষায় শিক্ষিত কথিত ধর্মনিরপেক্ষবাদীদের ইতিহাসও জোর-জবরদস্তিমূলক ইতিহাস। দেশে দেশে গণতন্ত্রকে গেলানোর জন্য কত কিছুই না করা হচ্ছে। পৃথিবীতে সাড়ে সাতশ’ কোটি মানুষের বসবাস। এই সাড়ে সাতশ’ কোটি মানুষের রুচি-অভিরুচি, সংস্কৃতি, কৃষ্টি-কালচার, মননশীলতা, স্বভাব, পছন্দ-অপছন্দ এক নয়। একেক দেশের মানুষের চরিত্র একেক ধরনের। যে গণতন্ত্র ইউরোপের মানুষকে কিছুটা সাফল্যের ভাগী করতে পেরেছে সেই গণতন্ত্র এশিয়া বা আফ্রিকার মানুষকে সাফল্য নাও দিতে পারে। আবার মধ্যপ্রাচ্যে যে সিস্টেম ফলপ্রসূ সেটা আমেরিকার জনজীবনে হয়তো খাপ খাওয়ানো মুশকিল হয়ে দাঁড়াবে। বড় কথা হচ্ছে- এসব সিস্টেম মানবসৃষ্ট হওয়ায় এবং মানুষের শক্তি-ক্ষমতা সীমিত হওয়ায় মানুষের তৈরি এসব সিস্টেম পৃথিবীর কোনো এক ক্ষুদ্র অংশে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠিত করতে পারলেও সারা পৃথিবীতে তা ব্যর্থ হতে বাধ্য, যেমন আজ হয়েছে। কিন্তু পশ্চিমা সভ্যতা ও তার তল্পিবাহক মিডিয়া এই প্রাকৃতিক সত্যের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। তারা যে কোনো উপায়ে সারা পৃথিবীতে কথিত গণতন্ত্র কায়েম করার প্রচেষ্টায় মত্ত। এটা করতে গিয়ে বিভিন্ন দেশের বিরুদ্ধে, বিভিন্ন জাতির বিশ্বাসপ্রসূত সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছে, শক্তি প্রয়োগ করছে। যারা তাদের মতবাদ মানতে চায় না তাদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করছে, আর তাতেও ফল না হলে সামরিক হামলা করে দেশ দখল করছে, ঘর-বাড়ি, স্থাপনা ধ্বংস করছে। এখানে মানবতার কোনো বালাই নেই, জনগণের মতামতের কোনো জায়গা নেই। বৈধ-অবৈধ’র কোনো মানদণ্ড নেই। যার যে বিশ্বাসই থাকুক, যে জাতি যে মতবাদই পছন্দ করুক পশ্চিমা সভ্যতার কাছে তার কোনো দাম নেই। পুঁজিবাদী গণতন্ত্র সবাইকে মানতে হবে, সব জাতিতে কার্যকর করতে হবে এটাই যেন শেষ কথা। প্রশ্ন হচ্ছে- যারা দু’বেলা ‘তলোয়ারের জোরে ইসলাম প্রচার হয়েছে’ বুলি আউড়িয়ে সত্যের উপর মিথ্যার প্রলেপ লাগাচ্ছে তারাই আবার কোন যুক্তিতে একটি নির্দিষ্ট মতবাদ প্রতিষ্ঠা করার জন্য স্বাধীন দেশের মাটিতে বোমা ফেলছে?

ইসলামের ইতিহাস থেকে জানা যায়, আল্লাহর রসুল মক্কা জীবনে বহু জুলুম-নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, কিন্তু প্রতিপক্ষকে কোনো আঘাত করেন নি। দৃষ্টান্তহীন নির্যাতনের শিকার হয়েও তিনি তাঁর অনুসারীদের বলতেন- আসবের আসবের, সবর কর। তিনি কারও উপর ক্রুদ্ধ হন নি, অভিশাপ দেন নি, বরং ওই নির্যাতনকারী মানুষগুলোর পক্ষ নিয়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা ভিক্ষা করেছেন। তাদের হেদায়াতের জন্য আল্লাহর কাছে আকুল হৃদয়ে প্রার্থনা করেছেন। এরপর যখন তারা ঈমান আনলো, সত্যকে আলিঙ্গন করল তখন ওই মানুষগুলোই রসুলাল্লাহকে তাদের প্রাণের চেয়েও বেশি ভালোবাসতে শুরু করল। উমর (রা.) রসুলকে নাঙ্গা তলোয়ার নিয়ে হত্যা করতে ছুটে গেলেন, কিন্তু অচীরেই রসুলের চরণতলে নিজেকে নিবেদন করলেন- এই পরিবর্তন কি তলোয়ারের শক্তিতে হয়েছিল?

ইতিহাস মতে রসুলাল্লাহ ও তাঁর জাতি যে যুদ্ধ-বিগ্রহ করেছিল এবং রক্তপাত ঘটিয়েছিল সেটা কারও ধর্মবিশ্বাসের বিরুদ্ধে ছিল না। আসলে ওই যুদ্ধ-বিগ্রহগুলো হয়েছিল সম্পূর্ণ রাজনৈতিক কারণে। এই জাতির ইতিহাস পড়লে খুব সহজেই বোঝা যায় যে, রসুলের হাতে গড়া ওই উম্মতে মোহাম্মদী জাতি কোনোদিন কোনোজাতির ধর্মবিশ্বাসে আঘাত করে নি। মুসলিম শাসনের অধীনে থেকে অন্যান্য ধর্মের মানুষ অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি স্বাধীনভাবে তাদের ধর্ম পালন করে গেছে। এমনকি তাদের কেউ কোনো অপরাধ করলে তার শাস্তি কোন ধর্মের বিধান থেকে দেওয়া হবে সেটাও বেছে নিয়েছে ওই অপরাধীই, উম্মতে মোহাম্মদী তা কার্যকর করেছে মাত্র। শুধু তাই নয়, ওই জাতি ভবিষ্যৎ সম্পর্কেও কতটা সচেতন ছিল তা বোঝা যায় ওমর (রা.) এর একটি ঘটনা থেকে। ওমর (রা.) তখন আমিরুল মু’মিনিন, জাতির ইমাম বা নেতা। পবিত্র জেরুজালেম শহর মুজাহিদ বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করার পর খলিফা ওমর বিন খাত্তাব (রা.) ঘুরে ঘুরে শহরের দর্শনীয় বস্তুগুলি দেখার সময় যখন খ্রিস্টানদের একটি অতি প্রসিদ্ধ গীর্জা দেখছিলেন তখন নামাযের সময় হওয়ায় তিনি গীর্জার বাইরে যেতে চাইলেন। জেরুজালেম তখন সবেমাত্র মুসলিমদের অধিকারে এসেছে, তখনও কোন মসজিদ তৈরিই হয় নি, কাজেই নামায খোলা ময়দানেই পড়তে হতো। জেরুজালেমের প্রধান ধর্মাধ্যক্ষ বিশপ সোফ্রোনিয়াস ওমরকে (রা.) অনুরোধ করলেন ঐ গীর্জার মধ্যেই তার সঙ্গী-সাথীদের নিয়ে নামায পড়তে। ভদ্রভাবে ঐ অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করে ওমর (রা.) গীর্জার বাইরে যেয়ে নামায পড়লেন। কারণ কি বললেন তা লক্ষ্য করুন। বললেন- আমি যদি ঐ গীর্জার মধ্যে নামায পড়তাম তবে ভবিষ্যতে মুসলিমরা সম্ভবতঃ একে মসজিদে পরিণত করে ফেলত।

আজকে যারা ধর্মনিরপেক্ষতার ছাতা ধরে আছেন, প্রচলিত পুঁজিবাদী ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্রকেই উৎকৃষ্ট পন্থা বিবেচনা করেন, ইসলামকে মনে করেন প্রগতিবিরোধী, বাকস্বাধীনতা-বিরোধী, তাদের প্রতি প্রশ্ন- প্রকৃত ইসলাম মানুষকে যে ধর্মীয় স্বাধীনতা দিয়েছিল, মত প্রকাশের স্বাধীনতা দিয়েছিল, নিরাপত্তা দিয়েছিল আজকের কথিত ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্র কি তার এক ভগ্নাংশও দিতে পেরেছে? এটা ঠিক যে, কূপমণ্ডূক সংকীর্ণমনা ধর্মব্যবসায়ীদের হাতে পড়ে ইসলামের প্রকৃত রূপ আজ হারিয়ে গেছে। তাদের অতি বিশ্লেষণ, বাড়াবাড়ী আর সত্যকে অস্বীকার করার কারণে ইসলাম আজ আর আল্লাহ রসুলের সেই ইসলাম নেই। কিন্তু প্রকৃত ইসলামের বিপরীতমুখী এই বিকৃত ইসলাম দেখে ইসলাম সম্পর্কে বিরূপ ধারণা করা নিশ্চয়ই বোকামি। আল্লাহর অসীম করুণা যে, প্রকৃত ইসলামের জ্ঞান তিনি হেযবুত তওহীদকে দান করেছেন। সেই প্রকৃত ইসলামের অনাবিল রূপটি আমরা সর্বস্তরের মানুষের সামনে উপস্থাপন করছি।

Search Here

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ

ধর্মবিশ্বাসে জোর জবরদস্তি চলে না

April 15, 2019

মোহাম্মদ আসাদ আলী ইসলামের বিরুদ্ধে বহুল উত্থাপিত একটি অভিযোগ হচ্ছে- ‘ইসলাম বিকশিত হয়েছে তলোয়ারের জোরে’। পশ্চিমা ইসলামবিদ্বেষী মিডিয়া, লেখক, সাহিত্যিক এবং তাদের দ্বারা প্রভাবিত ও পশ্চিমা শিক্ষায় শিক্ষিত গোষ্ঠী এই অভিযোগটিকে সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার প্রচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে। তাদের প্রচারণায় অনেকে বিভ্রান্তও হচ্ছে, ফলে স্বাভাবিকভাবেই ইসলামের প্রতি অনেকের নেতিবাচক ধারণা সৃষ্টি হচ্ছে। কিন্তু আসলেই কি […]

আরও→

সময়ের দুয়ারে কড়া নাড়ছে নতুন রেনেসাঁ

April 14, 2019

হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম অন্যায়ের দুর্গ যতই মজবুত হোক সত্যের আঘাতে তার পতন অবশ্যম্ভাবী। আল্লাহ ইব্রাহিম (আ.) কে দিয়ে মহাশক্তিধর বাদশাহ নমরুদের জুলুমবাজির শাসনব্যবস্থার পতন ঘটালেন। সেটা ছিল প্রাচীন ব্যবিলনীয় সভ্যতা যার নিদর্শন আজও হারিয়ে যায়নি। তৎকালে সেটাই ছিল বিশ্বের শীর্ষ সভ্যতা। তারা অহঙ্কারে এতটাই স্ফীত হয়েছিল যে উঁচু মিনার তৈরি করে তারা আল্লাহর আরশ দেখতে […]

আরও→

Categories