আমল কাদের জন্য? | হেযবুত তওহীদ

আমল কাদের জন্য?

রাকীব আল হাসান:
মহান আল্লাহ বলেন, হে মো’মেনগণ, তোমাদের উপর সওম (রোজা) ফরদ করা হয়েছে, যেরূপ ফরদ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর, যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার (সুরা বাকারা- ১৮৩)। এই আয়াত নাজেলের মাধ্যমেই দ্বিতীয় হিজরিতে মো’মেনদের জন্য সওম ফরদ ঘোষিত হয়। এই নির্দেশ মেনেই আমরা গত এক মাস (রমজান মাস) সওম পালন করেছি। কিন্তু আল্লাহ তো শুরুতেই বললেন, হে মো’মেনগণ অর্থাৎ আল্লাহ সওম (রোজা) করতে নির্দেশ করেছেন কেবল মো’মেনদের। শুধু সওম নয়, সকল আমলই কেবল মো’মেনদের জন্য।
আল্লাহ নামাজ কায়েম করতে বলেছেন মো’মেনদেরকে (সুরা বাকারা- ১৫৩; সমগ্র কোর’আনে বহু জায়গাতেই আছে, এখানে শুধু একটা উল্লেখ করেছি), যাকাত আদায় করতে বলেছেন মো’মেনদেরকে (সুরা বাকারা- ২৫৪, ২৬৭; সমগ্র কোর’আনে বহু জায়গাতেই আছে), আল্লাহ গোনাহ ক্ষমা করবেন এবং জান্নাতে দাখিল করবেন মো’মেনদেরকে (সুরা তাহরীম- ৮; মো’মেনদের আল্লাহ জান্নাত দিবেন এটা সমগ্র কো’আনে বহু আয়াতেই আছে)। যে মো’মেন নয় তার জন্য আমল নিরর্থক। তাহলে মো’মেন কাকে বলে সেটা একটু বুঝে নেওয়া দরকার।
আমরা সাধারণ অর্থে জানি যে, কলেমা পড়ে ঈমান আনলে সে মো’মেন হয়। অন্য ধর্ম থেকে কেউ যখন ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে তখন প্রথমেই সে বলে আশহাদু (আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি), অর্থাৎ একজন মো’মেন হয় একটা সাক্ষ্য দিয়ে বা শপথবাক্য পাঠ করে। শপথ করলে সেখান থেকে আর সরে আসা যায় না। সেই শপথবাক্যটা হলো- “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ মোহাম্মাদুর রসুলাল্লাহ” অর্থাৎ “আল্লাহ ছাড়া কোনো হুকুমদাতা (ইলাহ) নেই, মোহাম্মদ (সা.) আল্লাহর রসুল।” এই শপথবাক্য পাঠ করার সাথে সাথে জীবনের সকল অঙ্গনে আল্লাহর হুকুম বাস্তবায়ন করা ফরদ হয়ে গেল। আমাদের ব্যক্তিগত জীবন, আমাদের সামাজিক জীবন, শিক্ষাজীবন, কর্মজীবন, জাতীয় জীবন এবং আন্তর্জাতিক জীবন এক কথায় সকল অঙ্গনেই আল্লাহর হুকুম প্রতিষ্ঠা করা অপরিহার্য (ফরদ) হয়ে গেল। যদি কোনো একটা অঙ্গনেও আল্লাহর হুকুমকে অস্বীকার করি তবে আর আমি মো’মেন থাকতে পারলাম না, আমার শপথ থেকে আমি সরে গেলাম, বিচ্যুত হলাম।
যদি কোনো বিশেষ পরিস্থিতিতে এক ওয়াক্ত নামাজ আপনি পড়তে না পারেন, একটা রোজা যদি করতে না পারেন তবে আপনি গোনাহগার হবেন কিন্তু মো’মেনের খাতা থেকে অন্তত আপনার নামটা কাটা পড়বে না কিন্তু যদি আপনি সিদ্ধান্ত নেন যে, এখন থেকে আপনি আর নামাজ পড়বেন না বা রোজা রাখবেন না তাহলে আপনি আর মো’মেন রইলেন না। আপনি সত্য প্রত্যাখ্যানকারী, সত্য অস্বীকারকারী তথা কাফের হয়ে গেলেন। তখন আপনার অন্য সকল আমল নিরর্থক হয়ে যাবে।
একইভাবে আপনার সমাজ যদি এই সিদ্ধান্ত নেয় যে, এ সমাজে আর আল্লাহর হুকুম-বিধান চলবে না তাহলে ঐ সমাজটা কুফরি সমাজ বলেই গণ্য হবে, সেই সমাজের একজন হিসাবে আপনিও কাফের বলেই গণ্য হবেন যদি না আপনি তওবা করে ঐ সমাজ থেকে হেযরত করে সত্যের পক্ষে চলে আসেন। রসুলাল্লাহ (সা.) এর ইন্তেকালের পর অনেক গোত্র এভাবে যাকাত না দেবার সিদ্ধান্ত নিল ফলে খলিফা আবু বকর (রা.) তাদেরকে স্বধর্মত্যাগী ঘোষণা দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করলেন যাকে ইতিহাসে রিদ্দার যুদ্ধ নামে আখ্যায়িত করা হয়েছে। একটু ভেবে দেখুন তো, যে গোত্রগুলোর বিরুদ্ধে তিনি যুদ্ধ করলেন সেই গোত্রগুলোর প্রতিটা ব্যক্তিই কি অপরাধী ছিল? প্রতিটা ব্যক্তিই কি কাফের হয়ে গিয়েছিল? হ্যাঁ, কারণ তারা সমাজের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গিয়ে সত্যের পক্ষ অবলম্বন করতে পারেনি।
এখন আমার প্রশ্ন- বর্তমান মুসলিম বিশ্ব কি আল্লাহর হুকুম অনুযায়ী পরিচালিত হচ্ছে? আমরা কেবল যাকাতভিত্তিক অর্থনীতিই প্রত্যাখ্যান করিনি, আমরা গ্রহণ করে নিয়েছি সুদভিত্তিক অর্থনীতি। আমরা আল্লাহর দেওয়া আইন, দণ্ডবিধি, অর্থনীতি, সমাজনীতি, রাজনীতি, শিক্ষাব্যবস্থা, কর্মনীতি, আন্তর্জাতিক নীতি, যুদ্ধনীতি এক কথায় সমস্ত কিছু বাদ দিয়ে গ্রহণ করেছি পাশ্চাত্য বস্তুবাদী ইহুদি-খ্রিষ্টান ‘সভ্যতা’রটা। তাহলে আমরা কীভাবে মো’মেন থাকলাম? আর আমরা যদি মো’মেনই না থাকি তাহলে তো আমাদের সমস্ত আমলও নিরর্থক হবে। এখন যদি আবু বকর (রা.) বা অন্য যে কোনো আসহাব পৃথিবীতে আসতেন তবে অবশ্যই আমাদের বিরুদ্ধে রিদ্দার যুদ্ধের মতো লড়াই করতেন।
তাহলে এখন আমাদের করণীয় কী? কীভাবে আমরা মো’মেন হবো? আমরা তো চাইলেই এখনই আল্লাহর হুকুম প্রতিষ্ঠা করে ফেলতে পারছি না। এখন উপায় কী?
মহান আল্লাহ বলেন, “মো’মেন শুধুমাত্র তারা যারা আল্লাহ ও তাঁর রসুলের উপর ঈমান আনে, পরে কোনো সন্দেহ পোষণ করে না, জীবন ও সম্পদ দিয়ে আল্লাহর রাস্তায় জেহাদ করে। তারাই সত্যনিষ্ঠ [সুরা হুজরাত- ১৫]। এই আয়াত থেকে আমরা বুঝতে পারলাম আমাদের করণীয় হলো-
আল্লাহকে হুকুমদাতা, মোহাম্মদ (সা.)কে আল্লাহর রসুল বলে স্বীকৃতি প্রদান করতে হবে (এটাই আল্লাহ ও তাঁর রসুলের উপর ঈমান, আমানু বিল্লাহি ওয়া রসুলিহি)।
কোনো সন্দেহ পোষণ করা যাবে না (ছুম্মা লাম ইয়ারতাবু) অর্থাৎ এই স্বীকৃতি বা প্রতিজ্ঞা থেকে পিছপা হওয়া যাবে না, বিচ্যুত হওয়া যাবে না।
জীবন ও সম্পদ দিয়ে আল্লাহর রাস্তায় মানবতার কল্যাণে (জীবনের সকল অঙ্গনে আল্লাহর হুকুম প্রতিষ্ঠার জন্য) জেহাদ (সর্বাত্মক প্রচেষ্টা) করতে হবে।
এই তিনটি শর্ত মানলে আমরা মো’মেন হতে পারব, অন্যথায় আমাদের সকল আমল নিরর্থক হবে। আল্লাহর হুকুম প্রতিষ্ঠার জন্য আমরা যদি প্রচেষ্টা করতে চাই, সংগ্রাম করতে চাই তাহলে প্রথমেই এই স্বীকৃতিপ্রদানকারীদেরকে (মো’মেনদাবীদার) ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। প্রচেষ্টার প্রথম অংশ হলো- যতভাবে পারা যায় মানুষকে এটা বোঝানো যে, কেন আমাদের সমাজে আল্লাহর হুকুম প্রতিষ্ঠিত হওয়া দরকার। এই কাজটিই করে যাচ্ছে হেযবুত তওহীদ। এই সত্যের উপর সকলকে ঐক্যবদ্ধ হবার আহŸান করছি আমরা। মো’মেন হবার যে শর্ত আল্লাহ দিয়েছেন সেটা পূর্ণ করার আপ্রাণ প্রচেষ্টা করে যাচ্ছি আমরা।
[লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট, ফেসবুক: / rblee77, মতামতের জন্য যোগাযোগ: ০১৬৭০-১৭৪৬৪৩, ০১৬৭০-১৭৪৬৫১]

Search Here

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ

ধর্মবিশ্বাসে জোর জবরদস্তি চলে না

April 15, 2019

মোহাম্মদ আসাদ আলী ইসলামের বিরুদ্ধে বহুল উত্থাপিত একটি অভিযোগ হচ্ছে- ‘ইসলাম বিকশিত হয়েছে তলোয়ারের জোরে’। পশ্চিমা ইসলামবিদ্বেষী মিডিয়া, লেখক, সাহিত্যিক এবং তাদের দ্বারা প্রভাবিত ও পশ্চিমা শিক্ষায় শিক্ষিত গোষ্ঠী এই অভিযোগটিকে সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার প্রচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে। তাদের প্রচারণায় অনেকে বিভ্রান্তও হচ্ছে, ফলে স্বাভাবিকভাবেই ইসলামের প্রতি অনেকের নেতিবাচক ধারণা সৃষ্টি হচ্ছে। কিন্তু আসলেই কি […]

আরও→

সময়ের দুয়ারে কড়া নাড়ছে নতুন রেনেসাঁ

April 14, 2019

হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম অন্যায়ের দুর্গ যতই মজবুত হোক সত্যের আঘাতে তার পতন অবশ্যম্ভাবী। আল্লাহ ইব্রাহিম (আ.) কে দিয়ে মহাশক্তিধর বাদশাহ নমরুদের জুলুমবাজির শাসনব্যবস্থার পতন ঘটালেন। সেটা ছিল প্রাচীন ব্যবিলনীয় সভ্যতা যার নিদর্শন আজও হারিয়ে যায়নি। তৎকালে সেটাই ছিল বিশ্বের শীর্ষ সভ্যতা। তারা অহঙ্কারে এতটাই স্ফীত হয়েছিল যে উঁচু মিনার তৈরি করে তারা আল্লাহর আরশ দেখতে […]

আরও→

Categories